বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
আহমদ মুসা ব্যাগের পকেট থেকে একটা কাগজ বের করল। কাগজটা একটা মানচিত্র। আজোরস দ্বীপপুঞ্জের একটা মানচিত্র।
মানচিত্রটি আহমদ মুসা সামনে মেলে ধরল। হাসান তারিকও তার উপর চোখ রাখল।
মানচিত্রের উপরের অংশে একটা দ্বীপের উপর আঙুল রেখে বলল, ফ্লোরেস দ্বীপের উত্তরে এটা করভো দ্বীপ। প্রফেসর জ্যাক সাইমনের বক্তব্য অনুসারে এই দ্বীপের কয়েক মাইল দূরে সাও তোরাহ দ্বীপ। করভোর উত্তরে যে সাদা বিন্দুটা দেখা যাচ্ছে, এটা সাও তোরাহ হতে পারে। এই দ্বীপের সবচেয়ে কাছের শহর হলো ফ্লোরেস দ্বীপের ‘সান্তাক্রুজ’। আমার মনে হয় সাও তোরাহ দ্বীপের সবচেয়ে কাছের শহর হিসেবে এর উপর WFA এর খুব বেশি দৃষ্টি থাকবে এখন। সুতরাং এখানে সাও তোরাহ দ্বীপ নিয়ে আলোচনা করা নিরাপদ হবে না। এই কারণে আমি মনে করি, সাও তোরাহ দ্বীপের পরবর্তী নিকটতম শহর হলো সান্তাক্রুজ। সান্তাক্রুজের সোয়াশ’ মাইল দক্ষিণ-পূর্বে পিকো দ্বীপের ‘হারতা’ শহর। এই হারতা শহরকেই আমরা আপাতত বেজ করতে পারি। এখান থেকে সব খবরাখবর নিয়ে প্রস্তুত হয়ে পরবর্তী বেজ হিসাবে আমরা সান্তাক্রুজে যেতে পারি।’ থামল আহমদ মুসা।
আহমদ মুসা থামতেই হাসান তারিক বলে উঠল, ‘হারতা এবং সান্তাক্রুজ সম্পর্কেও তো আমাদের কিছু জানা প্রয়োজন।’
‘হ্যাঁ, হাসান তারিক। সেটা করতে হবে। পর্তুগীজ ইয়ারবুক থেকে কিছু জানা গেছে। ওটা তুমি একটু দেখে নিও। ‘লিজে’ থেকে আমরা কিছু ট্যুরিষ্ট লিটারেচার যোগাড় করতে পারব। সেখান থেকেও কিছু জানা যাবে।’ বলল আহমদ মুসা।
একটু থেমেই আবার সে বলে উঠল, ‘আমরা আপাতত একটা টাইম সিডিউল এ ধরনের করতে পারি যে, খোঁজ-খবরের জন্যে ‘লিজে’তে তিন দিন কাটিয়ে ৪র্থ দিনে আমরা ‘হারতা’তে পৌছব এবং হারতা গিয়ে পরবর্তী পরিকল্পনা করব।’
‘হারতা গিয়ে কোথায় উঠব, এ সম্পর্কে আমরা কোন চিন্তা করব কিনা। ছোট শহরের হোটেলগুলো আমার মতে নিরাপদ নয়।’ বলল হাসান তারিক।
‘তুমি ঠিকই বলেছ হাসান তারিক। ফাইনালী কি হবে আমি জানি না। তবে আপাতত চিন্তা করেছি, হারতার ক্যাথলিক গীর্জার অতিথিশালায় উঠব। আমি ইয়ারবুকে দেখেছি, ‘হারতা সেন্টপল’ গীর্জার বিশাল অতিথিশালা সবার জন্যেই উন্মুক্ত।’ আহমদ মুসা বলল।
খুশি হলো হাসান তারিক। বলল, ‘ক্যামোফ্লেজটা ভালোই হবে ভাইয়া।’
‘এস এবার উঠি।’ বলে উঠে দাঁড়াল আহমদ মুসা।
হাসান তারিকও উঠল।
চলল তারা ডিপারচার লাউঞ্জের দিকে।
লাউঞ্জ থেকে বের হবার দরজার পাশে একটা সুদৃশ্য কাউন্টার। কাউন্টারের এক প্রান্তে বিলবোর্ডে একটি বিজ্ঞপ্তি। বলা হয়েছে, এখান থেকে গাড়ি ভাড়া করতে পারেন। যৌক্তিক ভাড়া ও বিশ্বস্ততার প্রতীক আজোরস ন্যাশনাল কোম্পানী।’
বিলবোর্ডটি পড়ে আনন্দে মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল আহমদ মুসার। বর্তমান অবস্থায় বিশ্বস্ত গাড়ি পাওয়া সৌভাগ্যের ব্যাপার।
আহমদ মুসা হাসান তারিককে কানে কানে বলল, ‘কাউন্টারে যাও। এদের থেকেই গাড়ি ভাড়া কর। বাইরে গিয়ে গাড়ি ভাড়া করার ঝুঁকি নেয়া যাবে না।’
হাসান তারিক কাউন্টারে গেল। গাড়ি ভাড়া হয়ে গেল। তাদের নিজস্ব কমিউনিকেশন নেট ওয়ার্কের মাধ্যমে বলে দেয়ার পাঁচ মিনিটের মধ্যে ইউনিফর্ম পরা ড্রাইভার লাউঞ্জে ঢুকল এবং আহমদ মুসাদের ‘ওয়েলকাম’ করে গাড়িতে নিয়ে গেল।
প্লেন থেকে নামার পর থেকেই আহমদ মুসার দুচোখ সতর্ক ছিল। চারদিকে সতর্ক দৃষ্টি রেখেই গাড়িতে উঠে বসল।
‘স্যার কোথায়?’ ড্রাইভিং সিটে বসে ষ্টিয়ারিং-এ হাত রেখে বলল ড্রাইভার।
আহমদ মুসার চিন্তা করাই ছিল। বলল, ‘গঞ্জালেস ইন্টারন্যাশনাল হোটেলে চল।’
‘লিজে’ এয়ারপোর্টের বিপরীত দিকে শহরের সাগর প্রান্তে একটা ছোট পাহাড়ের উপর এই হোটেলটি। লিজে এয়ারপোর্ট থেকে দীর্ঘ সরল এক পথ পেরিয়ে ‘লিজে’ শহরে প্রবেশ করতে হয়। তারপর শহর পেরিয়ে ছোট একটা পাহাড়ী পথ পাড়ি দিয়ে পাহাড় শীর্ষের ‘গঞ্জালেস ইন্টারন্যাশনাল’ হোটেলে পৌছতে হয়। বেশ দীর্ঘ পথ। খুশিই হলো ড্রাইভার। তার মুখ দেখা গেল প্রসন্ন।
গাড়ি ষ্টার্ট নিয়েছে। চলছে গাড়ি।
গাড়ি তখন বিমান বন্দর থেকে বেরিয়ে এসেছে।
হাসান তারিক আহমদ মুসার কানের কাছে মুখ নিয়ে বলল, ‘যাত্রার শুরুটা বোধ হয় ভালোই হলো ভাইয়া।’
‘তোমার কথা সত্য হলে ভালো। কিন্তু আমার অন্য রকম মনে হচ্ছে। ডিপারচার লাউঞ্জে একজন ক্রিমিনাল চেহারার লোক সর্বক্ষণ আমাদের উপর চোখ রেখেছে। আমরা বের হয়ে এলে সেও বেরিয়ে একটা সাদা গাড়িতে চড়েছে। এছাড়া কার-পার্কেও আরেকটা সাদা গাড়ির আরেকজন লোকের দুচোখ আঠার মত গেঁথে ছিল আমাদের উপর। আমাদের গাড়ি ষ্টার্ট নিলে সেই গাড়িকেও ষ্টার্ট হতে দেখেছি।’ বলল আহমদ মুসা।
হাসান তারিকের মুখ ম্লান হয়ে গেল। তাকাল সে পেছন দিকে। বোধ হয় সেই দুটি সাদা গাড়ি পিছু নিয়েছে কিনা তা দেখার জন্যে। কিন্তু পেছনে গাড়ির সারি। অধিকাংশই সাদা গাড়ি। হতাশ হয়ে চোখ দুটি ফিরে এল হাসান তারিকের।
কিন্তু শহর পেরিয়ে পার্বত্য পথে প্রবেশের পর সন্দেহ আর থাকলো না। দুটো সাদা গাড়িকে দেখা গেল আহমদ মুসার গাড়ির সমান গতিতে ছুটে আসছে। আহমদ মুসা ড্রাইভারকে বলে গাড়ির গতি বাড়িয়ে কমিয়ে নিশ্চিত হলো যে, গাড়ি দুটো তাদেরকেই অনুসরণ করছে।
আহমদ মুসা পরিস্থিতিটা ড্রাইভারকে জানানো ও তার মনোভাব জেনে নেয়ার জন্যে বলল, ‘ড্রাইভার, দুটো গাড়ি দেখছি আমাদের ফলো করছে।’
‘স্যার, আপনাদের কোন শত্রু আছে?’ বলল ড্রাইভার। তার কণ্ঠে উদ্বেগ।
‘এদেশে আমরা বেড়াতে এসেছি। থাকতে পারে। কিন্তু ওরা সরকারের কেউ কিংবা ডাকাত-টাকাত নয়তো?’ আহমদ মুসা বলল।
‘স্যার, সরকারী নয়। সরকারের কোন ব্যাপার হলে সেটা বিমান বন্দরেই ঘটত। আর এ ধরনের ডাকাতও আমাদের আজোরসে নেই। স্যার, হতে পারে আপনাদের কোন শত্রু পর্তুগাল থেকেই আপনাদের অনুসরণ করছে।’ বলল ড্রাইভার।
‘তাহলে এখন কি করা যায় ড্রাইভার?’ আহমদ মুসা বলল।
‘চিন্তা নেই স্যার। গঞ্জালেস ইন্টারন্যাশনাল হোটেল। ওখানে শক্তিশালী পুলিশ ষ্টেশন আছে। আমরা ঠিক হোটেলে পৌছে যাব, ওরা আমাদের ধরতেই পারবে না।’ বলল ড্রাইভার।
পার্বত্য পথে আরও কিছুটা এগুলো আহমদ মুসাদের গাড়ি।
ঝোপে ঢাকা টিলার একটা বাঁক ঘুরতেই আহমদ মুসা দেখতে পেল দুশ গজের মত দূরে একটা মাইক্রো ও একটা জীপ তাদের পথ রোধ করে দাঁড়িয়ে আছে। পেছনে তাকাল সে। দেখল পেছনে ছুটে আসা দুটি গাড়ির সাথে আরেকটি গাড়ি যোগ হয়েছে।
ড্রাইভার বিষয়টা খেয়াল করেছে। গাড়ি থামিয়ে দিয়েছে সে। তার চোখে ভয়ের ছাপ। বলল সে, ‘সর্বনাশ স্যার! ওরা দুদিক থেকে ঘিরে ফেলেছে।’
আহমদ মুসাদের গাড়ির সামনেই রাস্তার একটা ত্রিমোহনী। হোটেলগামী রোড থেকে আরেকটা রাস্তা বেরিয়ে পার্বত্য এলাকার মধ্যে দিয়ে পশ্চিম দিকে চলে গেছে।
রাস্তাটির দিকে একবার তাকিয়ে আহমদ মুসা ড্রাইভারকে লক্ষ্য করে বলল, ‘পশ্চিম এ রাস্তাটা কোথায় গেছে ড্রাইভার?’
‘স্যার, পার্বত্য এলাকা ছাড়িয়ে রাস্তাটা আমাদের এ দ্বীপের একমাত্র বীচ পর্যন্ত গেছে। সেখানে মনোরম একটা ট্যুরিষ্ট স্পট আছে।’
‘ড্রাইভার গাড়িটা পশ্চিমের ঐ রাস্তায় নাও।’ নির্দেশের স্বরে বলল আহমদ মুসা।
‘ওদিকে তো কোন আশ্রয় নেই স্যার। মাত্র ট্যুরিষ্ট স্পটে একটা পুলিশ ষ্টেশন আছে। সে তো অনেক দূরে?’
‘ভয় করো না ড্রাইভার, তোমার এবং তোমার কোম্পানীর কোন ক্ষতি হবে না। তুমি গাড়ি ঘুরিয়ে নাও।’ এবার দৃঢ় কণ্ঠে নির্দেশ দিল আহমদ মুসা।
ড্রাইভার গাড়ি ঘুরিয়ে নিয়ে পশ্চিমের রাস্তায় চলতে শুরু করল।
একটু হাসল আহমদ মুসা। বলল ড্রাইভারকে লক্ষ্য করে, ‘শত্রুর কাছে আত্মসমর্পণ করার চাইতে শত্রুর হাত থেকে বাঁচার চেষ্টা করাই উচিত নয় কি ড্রাইভার?’
‘অবশ্যই স্যার। কিন্তু শত্রুদেরকে খুব প্রবল দেখছি। স্যার, ওরা কারা আন্দাজ করতে পারেন?’ ড্রাইভার বলল।
‘বন্দী কিছু লোককে আমরা উদ্ধার করতে চাই। হতে পারে আটককারী দলের ওরা কেউ।’ আহমদ মুসা বলল।
‘বন্দীরা কে স্যার?’ বলল ড্রাইভার।
‘নিরপরাধ লোক। ওদের মুখ বন্ধ করার জন্যে ওদের অপহরণ করা হয়েছে।’ আহমদ মুসা বলল।
‘বন্দীরা কি আপনাদের আত্মীয়?’ ড্রাইভার বলল।
‘না। অন্যায়ের প্রতিবিধান করতেই আমরা ওদের সাহায্য করতে চাই।’ বলল আহমদ মুসা।
ড্রাইভারের মুখ গম্ভীর হয়ে উঠেছে। কপাল তার কুঞ্চিত।
আর কোন কথা বলল না সে।
আহমদ মুসা তখন অন্য কাজে মনোযোগ দিয়েছে। হ্যান্ড ব্যাগ থেকে চাবি বের করে লাগেজে করে আনা ব্যাগটা টেনে নিয়ে খুলে ফেলল। বের করল প্লাষ্টিক কনটেইনার থেকে তার এম-১০ মেশিন রিভলবার।
প্লাষ্টিক কনটেইনারটি বিশেষভাবে তৈরি। ‘এক্সরে’ বা কোন ‘রে’ ফেললে এর ভেতরকার কিছু দেখা যায় না। ‘রে’ ফেললেই কনটেইনারটি আয়নার মত স্বচ্ছ একটা ছবি উপহার দেয়। এই কনটেইনারে করেই আহমদ মুসা ও হাসান তারিক তাদের অস্ত্র নিয়ে এসেছে।
হাসান তারিকও তার অস্ত্র বের করে নিয়েছে।
এক জায়গায় এসে হঠাৎ ড্রাইভার হার্ড ব্রেক কষে গাড়ি দাঁড় করাল।
‘কি হলো ড্রাইভার?’ বলে উঠল আহমদ মুসা।
‘স্যার, ইঞ্জিন ট্রাবল দিচ্ছে। দেখছি আমি।’ বলে ড্রাইভার দ্রুত ষ্টার্টার থেকে চাবির রিং খুলে নিয়ে গাড়ি থেকে নেমে ঘুরে দাঁড়িয়ে দরজা বন্ধ করে ইঞ্জিনের দিকে এগুলো। তারপর ইঞ্জিনের টপটা খুলে ফেলে দাঁড় করিয়ে দিল।
আহমদ মুসা ও হাসান তারিক তখন ব্যস্ত পেছনটা দেখতে।
পেছনে ছুটে আসা গাড়ি ৫টি কত দূরে আছে সেটা আন্দাজ করতে চেষ্টা করছিল।
বেশ সময় পার হয়ে গেল।
ইঞ্জিনের দিক থেকে কোন শব্দ না পেয়ে আহমদ মুসা সামনে তাকাল। কিন্তু ইঞ্জিন নিয়ে কাজ করার কোন শব্দ সে শুনতে পেল না। তাছাড়া ড্রাইভারকেও দেখতে পেল না।
গাড়ির জানালা খুলে দেখার চেষ্টা করল আহমদ মুসা। কিন্তু গাড়ির জানালা খোলা গেল না। লক করা। দরজা খোলার চেষ্টা করল। কিন্তু দেখল দরজাও লক করা।
চমকে উঠল আহমদ মুসা।
দ্রুত সে এগিয়ে ড্রাইভারের দরজায় নব ঘুরাতে চেষ্টা করল। ঘুরল না।
‘হাসান তারিক, ড্রাইভার পালিয়েছে এবং সেই সাথে সে আমাদেরকে বন্দী করে রেখে গেছে।’ দ্রুত কণ্ঠে বলল আহমদ মুসা।
বিদ্যুতস্পৃষ্টের মত ঘুরল হাসান তারিক। বলল, ‘এ জন্যেই সে চাবি নিয়ে নেমে গেছে।’
আহমদ মুসা পেছনটা দেখে জানালার কোণা দিয়ে সামনের দিকটা দেখার চেষ্টা করে বলল, ‘হাসান তারিক, সামনে থেকেও দুটি গাড়ি আসছে। দুতিনশ গজের বেশি দূরে নয় ওরা। পেছনের পাঁচটা গাড়িও দুএকমিনিটের মধ্যে এসে পড়বে।’
‘তার মানে লক করা গাড়িতে আমরা বন্দী হয়ে পড়েছি।’ বলেই হাসান তারিক তার মেশিন রিভলবারটা তাক করল জানালা গুড়ো করে দেবার জন্যে।
আহমদ মুসা তাকে বাধা দিয়ে দ্রুত বলল, ‘গুলী নয়, বাট দিয়ে ভেঙে ফেল। গুলীর শব্দ করে আমাদের অবস্থা ওদের জানাতে চাই না।’
হাসান তারিক মেশিন রিভলবারের বাঁট দিয়ে ভেঙে ফেলল জানালা।
ভাঙা জানালা দিয়ে ব্যাগগুলো আগে বাইরে ফেলে দিয়ে হাসান তারিক ও আহমদ মুসা বাইরে বেরিয়ে এল।
বের হয়েই আহমদ মুসা বলল, ‘যতদূর ধারণা করি উত্তর দিকে কিছু দূরেই সাগর আর দক্ষিণে পার্বত্য এলাকা পার হলে পাওয়া যাবে বনাঞ্চল, তারপর লোকালয়। কোন দিকটা আমরা বেছে নেব হাসান তারিক?’
‘আমার মতে দক্ষিণ দিক ভাইয়া।’ হাসান তারিক বলল।
আহমদ মুসা ও হাসান তারিক গাড়ি ঘুরে গাড়ির দক্ষিন পাশে এসে দ্রুত রাস্তা থেকে নেমে একটা টিলার আড়াল নিয়ে দক্ষিন দিকে এগুলো।
দুদিক থেকে গাড়িগুলো তখন এসে পড়েছে।
আহমদ মুসাদের গাড়ির সামনে ও পিছনে দাঁড়াল ৭টি গাড়ির একটি বহর।
৭টি গাড়ি থেকে নামল ৪০ জনের একটি বিরাট দল। তাদের সাথে দুটি শিকারী কুকুর।
জীপ থেকে নেমে আসা দীর্ঘদেহী ঋজু শরীরের এবং উত্তেজিত চেহারার একজন লোক আহমদ মুসাদের গাড়ির ভেতরটায় একবার চোখ বুলিয়ে ভাঙা জানালা দেখে সবার উদ্দেশ্যে চিৎকার করে বলল, ‘কোন দিকে গেছে দেখ। শয়তানদের কিছুতেই পালাতে দেয়া যাবে না।’
দুটি কুকুর ধরে রাখা দুজন লোক তাদের হাতের ইনভেলাপ থেকে দুখন্ড কাপড় বের করে কুকুর দুটিকে দিয়ে তা শুকিয়ে নিল এবং কুকুর দুটিকে বেঁধে রাখা দড়ির শেষ প্রান্ত ধরে রেখে পুরো দড়ি ছেড়ে দিল।
সংগে সংগেই কুকুর দুটি গাড়ি ঘুরে উত্তর পাশ থেকে দক্ষিণ পাশে গিয়ে ছুটতে শুরু করল দক্ষিণ দিকে। কুকুরের দড়ি ধরে রাখা লোক দু’জনও ছুটল তার সাথে। অবশিষ্ট আটত্রিশজনও তাদের পিছনে চলতে লাগল।
সেই লম্বা লোকটির নেতৃত্বে ওরা চলছে অস্ত্র বাগিয়ে জংগল যুদ্ধের ফরমেশন নিয়ে।
পিঠে ব্যাগ ঝুলিয়ে পথহীন পার্বত্য ভূমির উপর দিয়ে আহমদ মুসারাও চলছিল।
পার্বত্য ভূমি চড়াই-উৎরাই, পাহাড়ের টিলা, খাড়া ও গভীর উপত্যকা এবং গাছ ও ঝোপ-জংগলে ভরা। পথ চলা খুব কঠিন। কিন্তু খুশি হলো আহমদ মুসা। এই পরিবেশে WFA-এর লোকরা তাদের খুঁজে পাবে না। আহমদ মুসা চিন্তা করল, তারা জংগলের দিকে না গিয়ে পুবে ‘লিজে’ শহরের দিকে হাঁটা শুরু করতে পারে। কিন্তু আবার ভাবল, শত্রুদের গতিবিধি সম্পর্কে নিশ্চিত না হয়ে শহরমূখী হওয়া তাদের ঠিক হবে না।
প্রায় ১ ঘন্টা চলার পর একটা উচ্চভূমির উপর বসল আহমদ মুসা ও হাসান তারিক।
উচ্চ ভূমিটা সমতল। ঝোপ ও বড় বড় গাছ-গাছড়ায় ভরা। বিশাল উচ্চ ভূমিটা পুরাকীর্তির কোন গড়ের মত। এই গড়টারই উত্তর প্রান্তে এসে বসেছে আহমদ মুসা ও হাসান তারিক। এখানে বসে পেছনে ফেলে আসা পার্বত্য অঞ্চলটার উপর চোখ রাখা যাচ্ছে। ওরা ফলো করছে না ফিরে গেছে এটা খুব জানা দরকার।
আহমদ মুসার এ চিন্তায় ছেদ পড়ল হাসান তারিকের কথায়। সে বলছিল, ‘ভাইয়া, আমরা কাক ডাকা ভোরে খালি পেটে বেরিয়েছি। খাবার বিষয়টাও আমাদের ভাবনায় রাখা যায়।’
আহমদ মুসা হাসল। বলল, ‘তুমি ঠিক বলেছ হাসান তারিক। আমিও পেটকে বুঝাতে পারছি না। কিন্তু কি খাবে? ব্যাগের পকেটে আছে বিমান থেকে পাওয়া মাত্র কয়েকটা চকলেট।’
বলে আহমদ মুসা চকলেটগুলো বের করে হাসান তারিককে দিল, নিজেও নিল।
চকলেট মুখে দিয়ে হাসান তারিক বলল, ‘ভাইয়া বুঝতে পারছি না, সাত গাড়ি লোক গেল কোথায়! আমাদের ফলো না করে ওরা ফিরে যাবে এটা কি স্বাভাবিক?’
‘না, স্বাভাবিক নয়।’ আহমদ মুসা বলল।
কথা শেষ হতেই আহমদ মুসার কানে এল একটা অপ্রত্যাশিত শব্দ। একটা কুকুরের কণ্ঠ শব্দ তুলতে গিয়েও আকস্মিকভাবে রুদ্ধ হয়ে গেল।
চমকে উঠল আহমদ মুসা।
হঠাৎ একটা চিন্তা তার মাথায় ঝিলিক দিয়ে উঠল। ওরা কি কুকুর নিয়ে এগুচ্ছে? ওরা কি আহমদ মুসাদের দেখতে পেয়েছে? উৎসাহী কুকুরকে সামলাবার জন্যেই কি ঐভাবে তার মুখ চেপে ধরতে হয়েছে?
এই চিন্তা তার মাথায় আসার সাথে সাথেই আহমদ মুসা বলে উঠল, ‘হাসান তারিক, তাড়াতাড়ি আড়াল নাও। সম্ভবত আমরা শত্রুর চোখে পড়ে গেছি।’
বলে আহমদ মুসা নিজেও দ্রুত গড়িয়ে উচ্চভূমির প্রান্ত থেকে একটু ভেতরে সরে এল।
হাসান তারিকও গড়িয়ে একটা ঝোপের আড়ালে চলে এসেছে।
আড়ালে এসেই হাসান তারিক ছুটে এল আহমদ মুসার কাছে। বলল, ‘কি ব্যাপার ভাইয়া?’
‘আমি একটা কুকুরের অসমাপ্ত চিৎকার কানে শুনেছি। কেউ কুকুরের চিৎকারকে মাঝ পথে থামিয়ে দিয়েছে। আমার বিশ্বাস, আমাদের শত্রুরা কুকুরের দিক-নির্দেশনায় নিঃশব্দে আমাদের খুব কাছে এসে পৌছেছে।’ বলল আহমদ মুসা।
‘দুঃখিত, কুকুরের চিৎকারটা আমি খেয়াল করিনি। শব্দ কোন দিক থেকে এসেছে ভাইয়া?’ হাসান তারিক বলল।
‘উত্তর দিক। একদম এই সামনে থেকে। আমার মনে হয়, এই উচ্চভূমি যেখান থেকে উঠে এসেছে সে পর্যন্ত ওরা পৌছে গেছে।’ বলল আহমদ মুসা।
‘তার মানে ওরা এখন এই হাইল্যান্ডে ওঠার প্রস্তুতি নিচ্ছে।’ হাসান তারিক বলল।
‘আমার মনে হয় কুকুরকে অনুসরণ করে আমাদের হাতের মুঠোয় পাওয়া পর্যন্ত ওরা নিরবে এগুবে এবং তারপর আমাদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়বে।’ বলল আহমদ মুসা।
‘আমরা কি করব এখন? আমরা কি আরও সামনে সরে যাব?’ হাসান তারিক বলল।
‘ওরা চায় আমাদেরকে ওদের টার্গেটের মধ্যে নিতে। আর আমরা চাইব ওদেরকে আমাদের টার্গেটের মধ্যে আনতে। এদিক থেকে আমরা যেখানে রয়েছি, সেটা আমাদের জন্যে ভালো জায়গা। আমাদের এ উচ্চভূমি থেকে যে ঢাল ওদের দিকে নেমে গেছে তা খুব ফ্ল্যাট এবং উন্মুক্ত। ছোট দুচারটা গাছ-গাছড়া ও ঘাস ছাড়া আর কিছু নেই। এই ঢালে তারা আত্মগোপনের কোন সুযোগ পাবে না এবং এই ঢাল দিয়েই তাদের উঠে আসতে হবে। পূর্ব দিকে উচ্চভূমির সাথে পাহাড় যুক্ত হয়েছে। ওদিক দিয়ে আসতে পারছে না। ঢাল ঘুরে পশ্চিম দিক হয়ে তাদের আসার কোন যুক্তি নেই। কারণ আমরা তাদের সম্বন্ধে জানতে পেরেছি এটা তারা জানে না এবং স্বাভাবিকভাবে কুকুর তাদের এই পথেই নিয়ে আসবে।’ বলল আহমদ মুসা।
হাসান তারিক হাসল। বলল, ‘আলহামদুলিল্লাহ, আল্লাহ আমাদের উপযুক্ত জায়গায় এনে ওদের মুখোমুখি করেছেন।’
আহমদ মুসা ঢালের প্রান্ত বরাবর এলাকা পর্যবেক্ষণ করে মাঝামাঝি জায়গায় একটা উঁচু স্থান দেখতে পেল। উঁচু জায়গাটা ঢালের একদম প্রান্তে বেদীর মত দেখতে এবং ওটা পরিকল্পিতভাবে তৈরি মনে হলো তার কাছে।
আহমদ মুসা ও হাসান তারিক ক্রলিং করে গিয়ে উঠল সেই বেদিতে। আহমদ মুসারা বেদিতে উঠতেই বিরাট আকারের দুটি বড় সাপ বেদি থেকে নেমে গেল।
বিস্মিত হলো আহমদ মুসা, বেদির মেঝেটা পাথরের। পাথরের জোড়াগুলো দিয়ে গাছ-গাছড়া উঠে পাথরগুলো ঢেকে দিয়েছে। বেদির উপর দুটি পাথরের বাটি। বাটিগুলো ভেজা দেখে ভ্রু কুঞ্চিত হলো আহমদ মুসার। চারদিকে চাইল।
বেদির উত্তর প্রান্তে অবস্থান নিল আহমদ মুসারা। তারা খুশি হলো যে, গোটা ঢালটাই তাদের নজরে আসছে। অবশ্য ঢালের পশ্চিম প্রান্ত দক্ষিণ দিকে বেঁকে গেছে বলে শেষটা দেখা যাচ্ছে না।
বেশিক্ষণ বসতে হলো না আহমদ মুসাদের। দেখা গেল, ঠিক তাদের সোজাসুজি জংগলের ভেতর থেকে ঢালের গোড়ায় উঠে এল দুজন লোক। তাদের সামনে দুটি কুকুর। কুকুর দুটির দড়ি তাদের হাতে। কুকুর দুটি ডবলমার্চের ভংগিতে দৌড়াচ্ছে।
কুকুর স্কোয়াডের পরই বেরিয়ে এল মূল বাহিনী। হাতে ষ্টেনগান, কোমরে পিস্তল সজ্জিত বিরাট একটা দল। সংখ্যা ৪০ থেকে ৫০এর মধ্যে হবে বলে অনুমান করল আহমদ মুসা। রীতিমত যুদ্ধের আয়োজন। বিস্মিত হলো আহমদ মুসা।
আহমদ মুসা ও হাসান তারিকের মেশিন রিভলবার প্রস্তুত।
আহমদ মুসা তাকাল হাসান তারিকের দিকে। বলল, ‘ওরা ঢালের মাঝ বরাবর আসার আগে আমরা গুলী করব না।’
ওরা ঢালের মাঝ বরাবর এসে গেছে।
আহমদ মুসা তার এম-১০ মেশিন রিভলবার ডান হাতে রেখে বাম হাত দিয়ে পকেট থেকে আরও একটা রিভলবার বের করে ওদের মাথার উপর দিয়ে গুলী করল। সংগে সংগেই ওদের কয়েক ডজন ষ্টেনগান ও রিভলবার এক সাথে গর্জন করে উঠল আহমদ মুসার রিভলবারের শব্দ লক্ষ্যে। কিন্তু তাদের গুলীগুলো প্রায় ৪০ ডিগ্রী কোণে মাথার উপর দিয়ে চলে গেল।
ওদের গুলীর প্রথম ধাপ আহমদ মুসাদের অতিক্রম করার সাথে সাথেই আহমদ মুসা ও হাসান তারিকের মেশিন রিভলবার গর্জন করে উঠল এবং ঘুরতে লাগল দলটির উপর দিয়ে।
মাত্র কয়েক সেকেন্ড। দলটির সবাই ভূমি শয্যা নিল।
কয়েকটি দেহ ঢাল বেয়ে গড়িয়ে জংগলে ঢুকে গেল।
অন্যগুলো নির্জীব পড়ে থাকল ঢালের উপর।
ঢাল থেকে দেহগুলো জংগলে গড়িয়ে যাবার পর পরই ওদিক থেকে আহমদ মুসাদের উচ্চভূমি লক্ষ্যে অনিয়মিত ব্যবধানে গুলী আসতে লাগল।
আহমদ মুসারা গুলী খরচ না করে অপেক্ষা করার নীতি অনুসরণ করল। ওখানে বসে গুলী করে ওদের লাভ নেই। সামনে এগুতেই হবে ওদের। সেই সময়ের অপেক্ষা করতে লাগল ওরা।
পল পল করে সময় পার হয়ে যাচ্ছে। ওপার থেকে সেই অনিয়মিত গুলী একটানা চলছেই।
বিরক্তি ও বিস্ময় কিছুটা আচ্ছন্ন করেছে আহমদ মুসাকে। অর্থহীন ও অব্যাহত এই গুলীর অর্থ কি? এমন কি নিহত-আহতদের নিয়ে যাবারও ওরা চেষ্টা করছে না!
এ সময় আহমদ মুসাদের ঠিক পেছনে অনেকখানি উপরে শূন্য থেকে দুটি কারবাইন হ্যান্ড মেশিনগান গর্জন করে উঠল।
আকাশ থেকে পড়ার মত প্রবল শক খেয়ে আহমদ মুসা ও হাসান তারিক দুজনেই পেছন ফিরে তাকাল।
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now