বাংলা গল্প পড়ার অন্যতম ওয়েবসাইট - গল্প পড়ুন এবং গল্প বলুন
বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ

স্বপ্নের কৃষ্ণপক্ষ

"রোম্যান্টিক" বিভাগে গল্পটি দিয়েছেন গল্পের ঝুরিয়ান রিয়েন সরকার (০ পয়েন্ট)

X “স্বপ্নের কৃষ্ণপক্ষ” ইকবাল মাহমুদ ইকু ১ গতকাল শাহেদ এর চিঠি এসেছে রুনুর কাছে, এখন পর্যন্ত সেটা বুকে নিয়ে নিয়ে ঘুরছে সে। পড়লেই তো শেষ হয়ে যাবে সব। প্রবল উৎকণ্ঠার মধ্যে বাসার সবাই, প্রায় এক মাস পর শাহেদ এর চিঠি আসল। রুনু কিছুতেই বিশ্বাস করতে পারছেনা এই চিঠি টা শাহেদ পাঠিয়েছে। রুনু এর শ্বশুর হায়দার সাহেব ছেলের চিঠি টা পড়তে চাচ্ছেন, কিন্তু রুনু এর কাছে চিঠি টা চাইতেও পারছেন না, বিয়ের পর ছেলের প্রথম চিঠি তার বউ এর কাছে। কি না কি লেখা থাকবে শেষে তিনি অপ্রস্তুত হয়ে যাবেন। অন্তত ছেলে এখন কেমন আছে, কি করছে সেটা জানতে পারলেও তো হত । শেষ পর্যন্ত হায়দার সাহেব আর থাকতে না পেরে তার স্ত্রী এর কাছে গেলেন, বিকেল হয়ে আসছে এখন। দিনের আলো কেমন যেন ফিকে ফিকে লাগছে, মরিয়ম বেগম মনে হয় ঘুমাচ্ছেন। “মরিয়ম! ঘুমাচ্ছ?” গায়ে আলতো ধাক্কা দিয়ে হায়দার সাহেব জিজ্ঞেস করলেন। কোন উত্তর না পেয়ে হায়দার সাহেব উঠে দাঁড়ালেন বিছানা থেকে। পাঞ্জাবী গায়ে দিলেন, একটু বাইরে থেকে হাঁটাহাঁটি করে আসলে মন্দ হত না। সন্ধ্যার আগে আগেই আবার ঘরে ফিরে আসতে হবে। দেশের যে অবস্থা, তাতে সন্ধ্যার পরে বাইরে থাকা টা তেমন একটা নিরাপদ হবে হবে মনে হয় না। দরজা খুলে বের হতে যাবেন এমন সময় পিছন থেকে রুনু ডাক দিয়ে বলল “ বাবা কি কোথাও যাচ্ছেন?” “হ্যাঁ, এইতো একটু বের হচ্ছি। হেটে আসি আর মোড়ের দোকান থেকে একটু চা খেয়ে আসি। তুমি দরজা টা দাও তো মা” বলে হায়দার সাহেব দরজা খুললেন। “এই সময়ে বাইরের যাবেন না, বাবা! আপনি বাসায় থাকেন। আমি আপনাকে চা বানিয়ে দিচ্ছি” রুনু বলে ওঠে। “না থাক, কষ্ট করতে হবেনা। আমি বাইরে থেকেই খেয়ে আসি। তুমি বরং তোমার শাশুড়ি আম্মা কে চা দাও” হায়দার সাহেব বললেন। “বাবা! বাইরে যাবেন না” এবার করুন চোখে রুনু তাকাল হায়দার সাহেবের দিকে। “কেন? কি হয়েছে?” কিছু টা অবাক হলে হায়দার সাহেব রুনু এর কথা শুনে। এর আগে কখনো রুনু এভাবে না করেনি উনাকে কোন কিছু করতে। “কিছু না বাবা! বাসায় ছেলে মানুষ আর কেউ নেই। আপনি না থাকলে খুব ভয় করে” করুন মুখ করে রুনু বলল। হায়দার সাহেব আর কিছু বললেন না, দরজা বন্ধ করে দিলেন। বাইরে যাওয়ার দরকার নাই এখন। “দাও বউ মা, চা দাও এক কাপ” বলে সোফায় গা এলিয়ে দেন হায়দার সাহেব। সন্ধ্যা হতে আর কতক্ষণ লাগবে কে জানে। জানালা দিয়ে বাইরের দিকে তাকালেন হায়দার সাহেব। বিকেলের আলো টা আরো ফিকে লাগছে এখন। ঘরের মধ্যে একটা আবছা আলো বিরাজ করছে, দেয়ালে টাঙ্গানো ইয়াহইয়া খান এর ছবি টার দিকে ঘৃণা নিয়ে তাকিয়ে আছেন হায়দার সাহেব। তিনি উঠে দাঁড়ালেন জানালার পাশে দাড়িয়ে বাইরে তাকালেন। সুনসান ঢাকা শহর। হঠাৎ আবার শাহেদ এর কথা মনে পড়তেই চোখে জল চলে এলো , ছেলে টা এখন কোথায় আছে কেমন আছে, কে জানে? পিছনে শব্দ শুনে তাকালেন হায়দার সাহেব, রুনু চা আর বিস্কিট রাখল টেবিলের উপর। “বাবা! নিন চা খান। আর আপনার ছেলে একটা চিঠি দিয়েছে। আপনাদের কে দেয়া হয়নি গতকাল থেকে। আসলে চিঠি টা পড়ে ফেললে শেষ হয়ে যেত, তাই কেন জানি পড়তে ইচ্ছে করছিল না” বলতে বলতে রুনু চিঠি টা হায়দার সাহেব এর দিকে বাড়িয়ে দিল। কাঁপা কাঁপা হাতে চিঠি টা নিয়ে হায়দার সাহেব আশ্চর্য এর সাথে লক্ষ্য করলেন তার ও এখন আর চিঠি টা পড়তে ইচ্ছে করছেনা। চিঠি টা পকেটে ঢুকিয়ে রাখলেন তিনি গম্ভীর মুখে। এমন সময় দরজায় টোকার শব্দ হল। এমন সময় কে আসবে? আর আসবেই বা কে? কারো তো আসার কথা নয় বাসায়! উৎকণ্ঠায় পড়ে গেলেন তিনি। বেশ কয়েকদিন থেকে লক্ষ্য করছেন উৎকণ্ঠা বেড়ে গেছে সবখানে, অফিসের লোকজন কেউ কারো সাথে ঠিক মত কথা বলছেনা, সবাই সবার দিকে চাপা সন্দেহ এর নজর নিয়ে তাকাচ্ছে। কার সাথে কি কথা বলে কে ফেঁসে যায় , শুধু উৎকণ্ঠা চারদিকে। চা এর কাপ টা পিরিচ দিয়ে ঢেকে রুনু কে চোখের ইশারা করলেন ভীতরে চলে যেতে। দরজা খুলতেই ছানাউল্লা কে দেখতে মন টা তিতিয়ে গেলো হায়দার সাহেব এর। মনে মনে শুয়োরের বাচ্চা বলে একটা গালি দিলেন। ছানাউল্লা তার বাসায় কেন? লক্ষণ ভালো না , লক্ষণ খুব খারাপ। মনে মনে আরেকবার শুয়োরের বাচ্চা গালি দিয়ে তাকালেন ছানাউল্লা এর দিকে। “কেয়া বাত হ্যায়! হায়দার সাব। আপ এয়সে ঘুর ঘুর কে কেয়া দেখ রাহে হো?” পিত্তি জালানো একটা হাসি দিয়ে ছানাউল্লাহ বলল হায়দার সাহেব কে। “উর্দু তে কবে থেকে কথা বলা শুরু করেছেন? বাংলা তেও তো কথা বলা যায়” গম্ভীর মুখে তাকিয়ে বললেন হায়দার সাহেব। “হে হে হে! কি যে বলেন? কয়দিন পর তো পার্মানেন্ট ভাবে উর্দু তে কথা কইতে হবে। সেটার প্র্যাকটিস করি আর কি বলতে পারেন” ছানাউল্লা এর পিত্তি জ্বালানো হাসি দেখে রাগে গা জলে যাচ্ছে হায়দার সাহেব এর। কিছু বলতে পারছেন না তিনি, ছানাউল্লা আল বদর বাহিনীর একজন নেতৃত্ব স্থানীয় লোক। ছানাউল্লাহ এর মত শুয়োরের বাচ্চা গুলার জন্য ই আজ দেশের এই অবস্থা। মনে মনে আবার গালি দিলেন হায়দার সাহেব। মুখে কিছু বললেন না, গম্ভীর মুখে তাকিয়ে থাকলেন ছানাউল্লাহ এর দিকে। ছানাউল্লাহ ড্রইং রুমের ভীতরে উঁকি দিল হায়দার সাহেব এর কাঁধের উপর দিয়ে – “কই বাসার বাকি সবাই কই? বউ মা কই?” “তারা সবাই আছে। বিশ্রাম নিচ্ছে” হায়দার সাহেব বললেন। “হে হে হে! ঠিক আছে বিশ্রাম নেক” থেমে একটু দম দিল ছানাউল্লা “তয় বউ মা কিন্তু মাশাল্লাহ অনেক সুন্দরী আছে” চোয়াল জোড়া শক্ত হয়ে উঠলো হায়দার সাহেব এর। ইচ্ছে করছে জুতা দিয়ে এই লোকটার গালে দুইটা ঠাস ঠাস করে বাড়ি দিতে। “বাহ বাহ ড্রইং রুমে দেখি স্যার এর ছবি ও লাগাইছেন। খুব ভালো খুব ভালো” ছানাউল্লা মাথা নাড়ল জোরে জোরে। “তা হায়দার ভাই! আপনার ছেলে নাকি শুনলাম মুক্তি বাহিনী তে যোগ দিসে? ঘটনা কি সত্য?” ভ্রূ নাচায় ছানাউল্লা। হায়দার সাহেবের তলপেটে মোচড় দিয়ে উঠলো। এই খবর এই শুয়োরের বাচ্চা এর কাছে কিভাবে গেলো? নিজের জন্য তার ভয় নেই। কিন্তু ঘরে ছেলের যুবতী স্ত্রী আছে, তার ব্যাপার টাও ভাবতে হয়। “না !” দ্রুত বলে উঠলেন হায়দার সাহেব। “ছেলে তো গ্রামে গিয়েছে সব কিছু গুছিয়ে নিতে। জানেন ই তো দেশের কি অবস্থা! কাল পরশু চলে আসবে” বলে হাঁপ ছাড়লেন মনে মনে। তীক্ষ্ণ দৃষ্টি তে তাকিয়ে দেখলেন ছানাউল্লা কোন সন্দেহ করছে কিনা। “ও আচ্ছা! দেশের অবস্থা ভালো না। আপনার ছেলে ঢাকা আসলে দেখা করতে বলবেন আমার সাথে। আমি গেলাম” বলে ছানাউল্লা গেলো। ভেতর থেকে দরজা বন্ধ করে হাঁপ ছাড়লেন হায়দার সাহেব। ভয়ে তার গলা শুকিয়ে এসেছিল প্রায়। “কে আসছিল বাবা?” রুনু এর প্রশ্ন শুনে চমকে ওঠেন হায়দার সাহেব। নাহ বেচারি কে এসব না বলাই ভালো। খামোখাই ভয় পেয়ে যাবে। ভাবেন তিনি। “পরিচিত এক কলিগ অফিসের। খোঁজ খবর নিতে আসল, কোন সমস্যা হচ্ছে কিনা” বললেন হায়দার সাহেব। রুনা এই ব্যাপারে আর কোন কথা বাড়ায় না। টেবিলের দিকে ইশারা দিয়ে বলে, “বাবা! আপনার চা ঠাণ্ডা হয়ে যাচ্ছে।” হায়দার সাহেব একটা দীর্ঘশ্বাস খুব কষ্ট করে লুকিয়ে নিয়ে টেবিলে রাখা চা এর দিকে এগুলেন। ২ এক মাস হয়ে গেলো শাহেদ বাসা থেকে বের হয়েছে, বুকে একটাই স্বপ্ন স্বাধীন দেশের পতাকা ওড়ানোর। শেষ রাতে নৌকার গুলুই এর উপর নড়ে চড়ে বসে শাহেদ। বুক পকেটে হাত দিয়ে পতাকাটার অস্তিত্ব আরেকবার অনুভব করে সে। মার্চের ২৭ তারিখ বাসা থেকে বের হয় সে, আসার সময় ভেবেছিল রুনু অনেক বাঁধা দিবে তাকে। আশ্চর্য একটা মেয়ে রুনু, একটি বারের জন্য ও কাঁদেনি। তার বুক পকেটে একটা পতাকা গুজে দিতে দিতে বলেছিল, “এই পতাকা নিয়েই ফিরে এসো, আমরা দু জন একসাথে পতাকা ওড়াবো। স্বাধীন দেশের পতাকা” চোখ বন্দ হয়ে আসছিল শাহেদ এর হঠাৎ গুলির শব্দে টনক নাড়ে তার। নৌকার মধ্যেও একটা আলোড়ন লক্ষ্য করে সে। ভৈরব থেকে কয়েক মাইল দূরে রাজেন্দপুর গ্রামের পাশ দিয়ে বয়ে চলা নদীর একদম মাঝে তাদের নৌকা অপেক্ষা করছে মাঝ রাত নেমে আসার জন্য। চোখে টর্চ এর আলো পড়তেই চোখ কুঁচকে ফেলে শাহেদ। “কি করছ? লাইট বন্ধ কর” ফিস ফিস করে বলে শাহেদ। সে জানে এই রকম নিস্তব্ধ রাতে কথা বাতাসে ভেসে ভেসে অনেক দূর দূরান্তে চলে যায়। এটা শিখিয়েছিলেন বদিউল ভাই, তার ট্রেইনার। বদিউল ভাই এর কি অবস্থা কে জানে, মনে মনে ভাবে শাহেদ। “কি মিয়া! এত রাইতে কি ভাবতাস উদাস হইয়া” সাবেরুদ্দিন এর কথায় টনক নাড়ে তার। আসলেই তো! কি ভাবছে এত! “তেমন কিছু না সাবের ভাই, ঢাকার কথা ভাবছিলাম আর বদিউল ভাই এর কথা ভাবছিলাম” “ঢাকার কথা খুব মনে পড়তাসে, না?” সাবেরুদ্দিন সিগারেটে একটা সুখ টান দিয়ে সেটা বাড়িয়ে দিল শাহেদ এর দিকে। “এত ভাইবা কাম নাই মিয়া, পোয়াতি বউ রাইখা আইসি বাড়িত। দেখস আমারে একদিন মন খারাপ কইরা বইসা থাকতে? মন টা রে শক্ত কর মিয়া। শাহেদ কিছু বলেনা, চুপচাপ হাত বাড়িয়ে সিগারেট টা নিয়ে, একটা টান দেয়। সাবের ভাই যা বলছেন তা মোটেও সত্য নয় শাহেদ জানে। জানে সাবের ভাই এর মানিব্যাগে তার বউ এর ছবি আছে একটা, আর সবাই যখন ঘুমায় তখন প্রায়ই সাবের ভাই সেই ছবি টা বের করে রাতের অন্ধকারের মধ্যে দেখার চেষ্টা করেন, তখন তার চোখ টা খুব চিকচিক করে। রুনু কে পাঠানো চিঠি টা কবে পৌঁছাবে তার কাছে জানেনা শাহেদ। যার হাতে দিয়েছে সে আদৌ ঢাকা পৌছাতে পারবে কিনা এটা একটা ভাবনার ব্যাপার। পানির ছলাৎ শব্দে টনক নড়ে শাহেদের। “সবাইরে জাগায়ে দেন সাবের ভাই, সময় হয়ে আসছে” বলে শাহেদ। হাত ঘড়ি না থাকায় চাঁদ এর দিকে তাকিয়ে সময় বুঝার চেষ্টা করে সে। এগুলা সব ই বদিউল ভাই তাকে শিখিয়েছিলেন। বদিউল ভাই এখন যথাসম্ভব চাঁদ পুরে। অনেকদিন যোগাযোগ নেই লোকটার সাথে বেচে আছে নাকি মারা গেছে যুদ্ধে। এই মুহূর্তে কিছু জানার উপায় নেই। খুব কষ্টে প্রায় বের হয়ে আসা একটা দীর্ঘশ্বাস গোপন করে শাহেদ। পাঁচ জনের একটা টিম এর দলনেতা শাহেদ। সেই যদি মন শক্ত না করতে পারে বাকি সবার কি অবস্থা হবে। সাবিরুদ্দিন সবাইকে জাগিয়ে দেয়। নৌকার মাঝের পাটাতনে সবাই কাছা কাছি হয়ে বসে। আজকে তাদের প্ল্যান হল নাজিরপুর গ্রামে নতুন পাকিস্তান মিলিটারি ক্যাম্প ধ্বংস করে দেয়া। শাহেদ, সবার দিকে তাকায়। সবার চোখে স্বপ্ন চিক চিক করছে। ওরা মাত্র পাঁচ জন অথচ পাকিস্তানের ক্যাম্প এ প্রায় ৬২ জনের মত লোক আছে। এই মিশন প্রায় আত্মহত্যার শামিল। সামনে নিশ্চিত মৃত্যু জেনেও এদের কারো চোখে মুখে এক ফোঁটা ভয় নেই, বরং সেখানে আত্মবিশ্বাস খেলা করছে। এই দেশ স্বাধীন হবেই,মনে মনে বলে ওঠে শাহেদ। এদের মত ছেলে রা যতদিন থাকবে এই দেশের কন ক্ষতি কেউ করতে পারবেনা। ঝুঁকে আসে শাহেদ, সবার আরও কাছাকাছি হয়ে যায়। এর পর ফিসফিস করে তাদের পূর্বে ঠিক করে রাখা প্ল্যান টা সবার মাঝে আরেকবার ঝালিয়ে নেয় সে। নদীর ঠাণ্ডা বাতাসে গায়ে কাটা দিয়ে ওঠে শাহেদের। তবে সে জানে এর চেয়ে বেশি শীতল অথচ আগ্নেয়গিরি এই পাঁচ জনের মধ্যে আছে। সাবিরুদ্দিন নৌকা থেকে নেমে পড়ে ঠাণ্ডা পানিতে। মাথার একটা বোম বাঁধা তার। মাথা উঁচু করে সাতার কাটতে হচ্ছে তার। সেদিকে তাকায় শাহেদ, এখন শুধু অপেক্ষা সাবির ভাই ফিরে আসার অপেক্ষা। এর পর সবাই একসাথে হামলা চালাতে হবে পাকিস্তানী দের ক্যাম্পে। চোয়াল দিঢ় হয়ে ওঠে তার। আজকের অপারেশন সাকসেস করতেই হবে যে কোন মূল্যে। ৩ কলাবাগানের এই বাড়ি টা দেখতে অতটা সুন্দর না হলেও বেশ বড়। দো তোলা একটা বাড়ি তার আশে পাশে বেশ কিছু খালি জায়গা পড়ে আছে। সেখানে কয়েকটা নারিকেল গাছ ও আছে। একটা কাঠবেড়ালি খুব অস্থির হয়ে নারিকেল গাছের পাশে একটা কাঁকড়া বিছে দেখে। ছাদ থেকে অনেক্ষন ধরে এক দৃষ্টি তে সেদিকে তাকিয়ে আছে রুনু। হাতে শাহেদ এর চিঠি ধরা, এখনো পড়া হয়নি তার। যুদ্ধে যাবার প্রায় দেড় মাস পরে চিঠি দুটো আসে। একটা শুধু রুনুর জন্য আরেক টা বাসার বাকি সবার জন্য। চিঠি যে দুটো এটাই বুঝেনি রুনু প্রথমে, কারণ খামটা কিছুতেই খুলতে ইচ্ছে হচ্ছিল না তার। মনে হচ্ছিল খুললেই তো পড়ে ফেলা হবে আর শেষ হয়ে যাবে চিঠি টা। খুব সাদাসিধে এই মানুষ টা, ঢাকা ভার্সিটির বাংলা বিভাগের ছাত্র। ভার্সিটি তেই পরিচয় দুজনের, যদিও একটা ছেলে আর একটা মেয়ে ভার্সিটি তে একসাথে কথা বলা খুব দুরহ ব্যাপার। তারপরেও কিভাবে কিভাবে যেন তাদের সম্পর্ক টা হয়ে গেলো। দারুণ কবিতা লিখতে পারে এই ছেলে টা, ভার্সিটির প্রকাশিত একটা ছোট সাহিত্য পত্রিকায় শাহেদের লেখা পড়ে তার সাথে কথা বলতে গিয়েছিল রুনু। স্মৃতির পাতা গুলো খুব দ্রুত উল্টে যাচ্ছে তার চোখের ভাঁজে। হাতের চিঠি টা ধীরে ধীরে খুলে সে, আর পারছেনা থাকতে এভাবে। চিঠি টা খোলার সাথে সাথেই চোখ ভিজে উঠলো তার। শাহেদ যখন যুদ্ধে যায় তখন রুনু, শাহেদ কে দেখিয়েছে সে অনেক শক্ত একটা মেয়ে। ছাদের এক কোনে বসে পড়ে রুনু, হাতে শাহেদ এর খোলা চিঠি, প্রিয় রুনু, “ধুর ছাই! চিঠির শুরুতেই একটা কেমন জানি শব্দ দিয়ে দিলাম। “প্রিয়” শব্দ টা কি তোমার সাথে মানায় বল? ভাবছিলাম অতি প্রিয় শব্দ টা দিব। অথচ লেখার সময় খুব করে মনে হচ্ছিল এই শব্দ টাও অনেক কম পড়ে যাবে তোমার জন্য। জানো? আমাদের এখানে চাঁদ টার সাথে প্রতি রাতে আমার কথা হয়। চাঁদ টা আমাকে প্রায় ই তোমার ছবি দেখায়, আমি হাত বাড়িয়ে ছুঁই। মনে মনে ভালোবাসার কথা বলি তোমাকে। কি? মনে মনে বলি কেন জানো? সবাই শুনে যাবে তো! তুমি কিছু বোঝনো। বোকা একটা তুমি। তুমি ভেবেছ কান্না লুকিয়ে প্রমাণ করবে তুমি একটু ও কষ্ট পাচ্ছ না? তোমার চোখের কালশিটে আমার চোখে পড়েছে ঠিক ই। এক রাতে কিভাবে একজন মানুষের চোখের নিচে কালশিটে পড়ে যায় আমি প্রায় সময় ই অবাক হয়ে ভাবি বসে বসে। আচ্ছা, আমি যদি কখনো ফিরে না আসি। তবে আমাদের এই প্রেম কি ব্যার্থ? প্রায় ই ভাবি আমি। আচ্ছা, ব্যর্থ প্রেম এর সংজ্ঞা দেবে? জানিনা প্রেম কি আর ব্যার্থ প্রেম কি? তবে এতটুকু জানি যে, আমি তোমাকে অনেক ভালোবাসি। আসার সময় আমি জানতাম তুমি চোখে পানি আনবেনা, কারণ এতে আমার আসা টা অনেক কষ্টকর হয়ে যেত। আর এই কষ্ট আমি পাই তুমি চাওনা, তুমি ও যে খুব ভালোবাসো আমি সেটা ঠিক ই টের পাই। প্রতি রাতে ঘুম ভেঙ্গে যখন দেখতাম তুমি ঠিক ই এক হাত দিয়ে আমার ধরে আছ, আমি ঠিক তখনই জানতাম তুমি আমাকে ছাড়া কিছুতেই থাকতে পারবেনা। মনে পড়ে সেই ফাগুনের রাতের কথা? দীর্ঘ সে রাত খুব দ্রুত শেষ হয়ে গিয়েছিল। তুমি সেদিন আমাকে গুনগুণ করে গান শুনিয়েছিলে। এত গুলো রাত কিভাবে আমাকে ছেড়ে আছ তুমি?” এতটুকু পড়তেই রুনু আর নিজেকে আটকাতে পারেনা। হাউমাউ করে কেঁদে ওঠে সে। কতটা কষ্ট হয় তার সেটা রুনু ছাড়া আর কেউ বুঝবেনা। নিচে মানুষের শব্দে চোখ মুছে উঠে দাড়ায় রুনু। এই সময়ে কে আসতে পারে? চিঠি টা বুকের মাঝখানে দেখে দেয় সে। কাছে থাকুক, শাহেদ খুব কাছে থাকুক তার। নিচের সদর দরজার সামনে দাড়ায় সে, “কে?” প্রশ্ন করে রুনু। “বৌ মা! আমি তোমার ছানাউল্লাহ চাচা!” দরজার ওপাশ থেকে বলে ওঠে এলাকার আল বদর বাহিনীর এই নেতা। “জি! বাবা তো বাসায় নাই। আপনি পরে আসেন?” রুনু বলে ওঠে। অজানা আশংকায় তার বুক ধড়ফড় করে ওঠে রুনুর। ওইদিন ও এই লোক এসেছিল, অথচ সে ভয় পাবে বলে বাবা বলেছিল তাঁর একজন কলিগ এসেছেন। “আরে মা! আমি তো তোমার কাছেই আসছি!” ওপাশ থেকে ছানাউল্লাহ বলে। “আমার সাথে কি কাজ?” রুনু দিঢ় কণ্ঠে প্রশ্ন ছুড়ে দেয়। “সেটা কিভাবে বলব দরজাই যদি না খুলে দাও?” ছানাউল্লাহ বলে ওঠে আবার। “জি! দরজা খোলা যাবেনা। বাবা অফিসে যাওয়ার সময় নিষেধ করে গিয়েছেন। আপনি পরে আসেন” রুনু বলে। “হাম আপকা ঘার তালাশি লেঙ্গে, আপ দরোজা খুলিয়ে। নেহি তো হাম দরওয়াজা তোড় দেঙ্গে। অর ও আপকি লিয়ে আচ্ছা নেহি হোগা” আরেকটি কণ্ঠ দরজার ওপাশ থেকে বলে ওঠে। “আমি দরজা খুলব না” দিঢ় কণ্ঠে বলতে গিয়েও রুনু বুঝতে পারে তাঁর কণ্ঠ কেঁপে উঠছে। পিছনে এসে দাঁড়ানো রাহেলা বেগম এর হাত তার কাঁধে শক্ত করে ধরে আছে টের পাচ্ছে রুনু। এটুকু বলতে না বলতেই দরজা ভেঙ্গে ছানাউল্লাহ ও তার দলবল ঢুকে পরে বাসায়। ঢুকেই রুনুর দিকে লোলুপ দৃষ্টি দেয় ছানাউল্লাহ। নিজেকে ঘোমটা দিয়ে লুকাতে ব্যার্থ চেষ্টা করে রুনু। “প্যাহলে আপ জাইয়ে স্যার” পাশে দাড়িয়ে থাকা মিলিটারি অফিসারের দিকে তাকিয়ে রুনুর দিকে ইশারা দেয় ছানাউল্লাহ, “প্যাহলে ইস কি তালাশি লিজিয়ে আপ, বাদ মে হাম দেখেঙ্গে” বলে সে ইঙ্গিতপুর্ন হাসি দেয় ছানাউল্লাহ। রাহেলা বেগম বাঁধা দিতে চেষ্টা করতেই তার চুলের মুঠি ধরে দেয়ালের সাথে বাড়ি দেয় ছানাউল্লাহ। মাথা ফেটে অজ্ঞান হয়ে পরে যান রাহেলা বেগম। সেদিকে বিস্ফোরিত চোখে তাকিয়ে থাকে রুনু। হাতে টান লাগতেই তাকিয়ে দেখে পাকিস্তানী মিলিটারি অফিসার তার হাত ধরে তাকে ভিতরের দিকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে। বাঁধা দেয়ার ব্যার্থ চেষ্টা করে কোন লাভ হয় না। তাকে মেঝে তে টেনে টেনে ভিতরের রুমের দিকে নিয়ে যাওয়া হয়। শেষবারের মত অস্ফুট একটা শব্দ বের হয় রুনুর মুখ দিয়ে “জয় বাংলা” ৪ হায়দার সাহেব অফিস থেকে সাধারণত ৫ টার দিকে বাসায় ফিরেন। আজ একটু তাড়াতাড়ি বাসায় ফিরছেন, কেন জানি মন টা খুব অস্থির হয়ে আছে তাঁর। রাস্তা ঘাটে মানুষ প্রায় নাই বললেই চলে, দ্রুত পা চালালেন হায়দার সাহেব। কলাবাগানে তার বাসার গলির মুখে আসতেই একটা ছোট পিচ্চি এসে তার হাত ধরে টান দেয়, সেদিকে লক্ষ্য করেন হায়দার সাহেব। একেবারে ছোট একটা ছেলে,বয়েস কত ই বা আর হবে এই ছয় থেকে সাত বছরের মত। “কিরে কি চাস” হায়দার সাহেব জিজ্ঞেস করেন। "স্যার দুইটা দিন ধইরা কিছু খাইতে পারতাসিনা। কিছু খাইতে দিবেন?” ছেলে টা করুন মুখে তাকায় হায়দার সাহেব এর দিকে। হায়দার সাহেব এর বড় মায়া হল ছেলেটার প্রতি। এলাকার একমাত্র খোলা দোকান টির দিকে এগিয়ে গেলেন। “এই, এই ছেলে টা কে একটা বনরুটি আর একটা কলা দাও তো” ছেলে টার দিকে ইশারা দিয়ে দোকানী কে বললেন হায়দার সাহেব। “সালাম হায়দার স্যার, আপনার বাসার দিকে মিলিটারি গেসে। লগে ছানাউল্লাহ হারামজাদা আছে, আফনে তাড়াতাড়ি বাসায় যান স্যার। কি অবস্থা কে জানে! আমার তো সাহসে কুলায় না। নাইলে আমি ই যাইতাম” বলে ওঠে দোকানী। হায়দার সাহেব রীতিমত দৌড় দিচ্ছেন বাসার দিকে। অজানা আশংকায় বুক টা ধড়ফড় করছে তার। খুব বাজে ধরনের আশংকা তার মনের মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছে। সদর দরজায় দু জন পাকিস্তানী মিলিটারি দাড়িয়ে থাকার পরেও কেউ তাকে বাঁধা দিল না। ড্রয়িং রুমে ঢুকে মেঝে তে তার স্ত্রী রাহেলা বেগম কে নিথর পরে থাকতে দেখে হায়দার সাহেব ডুকরে কেঁদে উঠলেন। চারপাশে কে আছে আর সেদিকে লক্ষ করলেন না। চারপাশে দিনের আলো, অথচ হায়দার সাহেবের মনে হতে লাগলো চারপাশে থেকে কিছু তীব্র অন্ধকার তাকে ক্রমশ চেপে ধরতে চাচ্ছে। হঠাৎ তার রুনু এর কোথা মনে পড়তেই এদিক ওদিক তাকালেন। চারপাশে কয়েক জন মিলিটারি এর সাথে ছালাউদ্দিন কে দেখে তীব্র ঘৃণায় তার চোখ কুঁচকে আসলো। বুঝতে পারলেন সব ই এই লোক টার কীর্তি। “শূয়রের বাচ্চা রাজাকার!” তীব্র ঘৃণার সাথে উচ্চারণ করতে যেয়ে দাঁত আর কপাট ঈষৎ ফাঁক হয়ে আছে হায়দার সাবেহ এর। “তুমহারি লাড়কা মুক্তি হ্যাঁয়” হাতে একটি চিঠি উঁচিয়ে দেখাল মিলিটারি অফিসার। “ইসিলিয়ে ইয়ে হাল হুয়া, পাকিস্তান কি সাথ গাদ্দারি কারণে কা ইয়ে নতীজা হুয়া” হায়দার সাহেব রুনু কে রুমে দেখতে না পেয়ে কাঁপা কাঁপা পায়ে ভিতরের রুমের দিকে এগুতেই মিলিটারি অফিসার আবার বলে উঠলো_ “উধার মাত জাইয়ে হায়দার সাব। উধার আপকি বাহু সুহাগ রাত বানা রাহি হ্যাঁয় হামারি লাড়কো কো সাথ” এতটুকু শুনে হায়দার সাহেব যেন জমে গেলেন ঐ অবস্থায়। তার বিশ্বাস হতে চাচ্ছেনা এসব আর কিছু। মনে হতে লাগলো সব দুঃস্বপ্ন। একটু পরেই ঘুম ভেঙ্গে দেখবেন সব কিছু ঠিক। তীব্র অন্ধকার টা আবার চেপে আসতে লাগলো চারপাশে। আর দাড়িয়ে থাকতে পারলেন না হায়দার সাহেব , পা টলতে লাগলো। চারপাশ অন্ধকার হয়ে আসলো, মাথা ঘুরিয়ে পড়ার ঠিক আগ মুহূর্তে ছালাউদ্দিন এর বিকট হাসি কানে বাজতে লাগলো। ৫ স্বাধীনতার ছয় মাস পর এক বিকেলে অনেক্ষন ধরেই রুমের মধ্যে খুট খুট শব্দ হচ্ছে কিসের যেন। বিকেলের রোদ এসে গায়ে লাগছে রুনুর, একটা আলস্যতা চোখে মুখে ফুটে উঠছে তার। খুট খুট শব্দ টা কিসের জন্য হচ্ছে জানতে খুব ইচ্ছে করছে , আবার এই বিকেলের মিষ্টি রোদ ছেড়ে নড়তেও ইচ্ছে করছেনা তার। ঘাড় ফিরিয়ে রুমের ভিতরে দেখার চেষ্টা করল রুনু, ভিতরে যাওয়া দরকার। কারণ এই মুহূর্তে বাসায় কেউ নেই তাই শব্দ হওয়ার কথা না। শাহেদ এত তাড়াতাড়ি বাসায় ফেরে না। আজকাল তার বাসায় ফিরতে অনেক রাত হয়ে যায়, বাসায় ফেরে চোখ প্রচণ্ড লাল অবস্থায়। সব ই বুঝে রুনু, কিন্তু তার কিছু বলতে ইচ্ছে করেনা। বলেই বা লাভ কি? বিকেলের মিষ্টি রোদ অগ্রাহ্য করে শেষ পর্যন্ত কৌতূহল এর জয় হল। রুনু ছোট ছোট পায়ে রুমের দিকে এগিয়ে গেলো। দেখে শাহেদ এসেছে বাসায়, চেয়ারে বসে পা নাড়াচ্ছে উদাস ভঙ্গীতে। তাই অমন খুট খুট শব্দ হচ্ছে । রুনু ধীরে ধীরে বিছানার পাশে আলমারি ঘেঁসে দাঁড়ালো, “কখন ফিরলে? আমাকে ডাকলেনা যে?” আলমারি তে হালকা হেলান দিয়ে রুনু জিজ্ঞেস করে। শাহেদ উত্তর দেয়না, জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে থাকে আগের মত। ঘরের মধ্যে একটা কেমন জানি থমথমে নিস্তব্ধতা বিরাজ করে সবসময়। শাহেদ কিছু বলছেনা দেখে, রুনু ই আবার আগ বাড়িয়ে প্রশ্ন করে “চা খাবে? চুলোয় চা দিব?” “না, চা লাগবেনা। তুমি দাড়িয়ে কেন?” শাহেদ ঘাড় ফিরিয়ে রুনুর দিকে তাকায়। এই কয়টা মাসের মধ্যেই রুনু শুকিয়ে একদম কাঠ হয়ে গেছে। তবে চেহারার লাবন্যতা কমেনি একটু ও বরং বেড়েছে। রুনু কে আগের চেয়েও বেশি সুন্দর লাগে এখন। শাহেদ চোখ ফিরিয়ে নিলো জানালার দিকে। বাইরে সূর্য একটু পরেই অস্ত যাবে। স্বাধীন দেশের সূর্য, অথচ স্বাধীন দেশের সূর্য ও অস্ত যায়! মাথা ঝাঁকিয়ে ওঠে শাহেদ। কি সব আবোল তাবোল ভাবছি আমি? মনে মনে বলে ওঠে শাহেদ। “দাও, একটু চা দাও। চা খেয়েই বের হই” শাহেদ রুনুর দিকে আবার ফিরে তাকায়। “বের হই মানে? আবার কোথায় যাবে?” রুনু প্রশ্ন করলেও সে জানে শাহেদ কোথায় যাবে আবার। শাহেদ একবার চোখ তুলে রুনুর দিকে তাকিয়ে আবার চোখ ফিরিয়ে নেয়। উত্তর দেয়না, উত্তর দিয়েই কি হবে। ব্যাপার টা রুনুর জানা, তাই আর বলতে ইচ্ছে করেনা। চা খেয়ে শাহেদ বের হয়ে যেতেই রুনু আবার বাসায় একা হয়ে গেলো। যুদ্ধের পর শাহেদ ফিরে আসে স্বাধীনতার পতাকা হাতে, কিন্তু সেই পতাকা আর ছাদে ওড়ানো হয়ে উঠেনি। আলমেরা থেকে রুনু পতাকা টা বের করে বুকে জড়িয়ে চুপচাপ বিছানায় বসে থাকে। এই পতাকার জন্য শাহেদ এখন আর তাকে স্পর্শ করেনা। কখনো কিছু বলেনি শাহেদ, তবু রুনু বুঝে নেয় সব কিছু। যেই শরীরে হানাদার বাহিনীর লোলুপ স্পর্শ লেগেছিল সেই শরীরের প্রতি শাহেদের একটা ঘৃণা জন্ম নিয়েছে। পাশাপাশি একই ছাদের নিচেও তারা আজ যোজন যোজন দূরত্বে বসবাস করছে। শাহেদ এর বাবা হায়দার সাহেব নাকি প্রতিদিন তার স্ত্রী’র কবরের পাশে চুপচাপ বসে থাকেন। অপেক্ষা, মৃত্যুর অপেক্ষা এখন শুধু। আর কিছুই যেন বাকি নেই। রুনু জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে থাকে, সে কিসের জন্য অপেক্ষা করবে? শাহেদ এর স্বাভাবিক হয়ে ওঠার জন্য? জানালার বাইরে এখন অন্ধকার বেশ জাঁকিয়ে বসেছে, শাহেদ প্রতিদিন রাত একটা দেড় টার দিকে বাসায় ফেরে । প্রবল নেশার ঘোরে শাহেদের চোখ টকটকে লাল হয়ে থাকে প্রতিদিন। একই ছাদ একই বাসা তবুও যোজন যোজন দূরত্ব, একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসে রুনুর বুক চিড়ে। শাহেদের টকতকে চোখ কে অনেকটা ভোরের সূর্যের মত লাগে তার। তবে সেই সূর্য ও আধারে ঢেকে গেছে। পতাকার দিকে তাকিয়ে থাকে রুনু, এইতো এই সেই পতাকা। রুনু উঠে দাড়ায়, চোখ বেয়ে দরদর করে জল গড়ায় তার। ধীরে ধীরে সে পতাকা কে শরীরে জড়াতে থাকে শাড়ির মত। দেশ তার আচ্ছাদন হয়ে থাকুন। দেশের জন্য উৎসর্গ হোক তার স্বপ্ন, দুজন মিলে পতাকা ওড়ানোর স্বপ্ন। পরিশিষ্ট: সেদিন শাহেদ বাসায় ফিরে এক গুচ্ছ গোলাপ হাতে। রুনু কে দেয়ার জন্য। আহা! কতদিন বেচারির মুখে হাসি নেই। এত বড় ত্যাগ এর পরেও রুনুর প্রতি শাহেদ অনেক অন্যায় করে ফেলেছে। অনুশোচনায় শাহেদ এর বুক ভারী হয়ে আসে। আজ রুনু কে স্পর্শ করবে সে। এসব কথা ভাবতে ভাবতে নিজের কাছে থাকা অতিরিক্ত চাবি দিয়ে দরজা খুলে তার রুমে প্রবেশ করতেই শাহেদের হাত থেকে গোলাপ গুলো মেঝে তে পরে যায়। গায়ে পতাকা জড়ানো রুনু সিলিং এর সাথে ঝুলছে। গোলাপের পাপড়ি গুলো মেঝে তে কেমন যেন কালো বর্ণ ধারণ করতে থাকে। জানালা দিয়ে আসা বাতাসে রুনুর গায়ে স্বাধীনতার পতাকা আচল হয়ে উড়ছে। দুজন মিলে আর কখনোই পতাকা ওড়ানো হবেনা, শাহেদ হাঁটু গেড়ে মেঝে তে বসে পরে। সে বুঝতে পারে অনেক বেশি দেরি করে ফেলেছে সে গোলাপ গুলো আনতে, অনেক বেশি ই দেরি করে ফেলেছে। "স্বপ্ন" স্বাধীনতা সংখ্যায় প্রকাশিত


এডিট ডিলিট প্রিন্ট করুন  অভিযোগ করুন     

গল্পটি পড়েছেন ২১১২৩ জন


এ জাতীয় গল্প

গল্পটির রেটিং দিনঃ-

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now