বাংলা গল্প পড়ার অন্যতম ওয়েবসাইট - গল্প পড়ুন এবং গল্প বলুন
বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ

ডাকিণী-১, পর্ব-৫৬,৫৭,৫৮,৫৯,৬০

"ভৌতিক গল্প " বিভাগে গল্পটি দিয়েছেন গল্পের ঝুরিয়ান রিয়েন সরকার (০ পয়েন্ট)

X ডাকিণী-১, পর্ব-৫৬,৫৭,৫৮,৫৯,৬০ লিখেছেনঃ সানজিদা সুলতানা সুমা (গল্পে কিছু অ্যাডাল্ট কন্টেন্ট আছে, যা নিতান্তই গল্পে পূর্ণতা আনতে ব্যবহার করা হয়েছে । দয়া করে নেতিবাচক ভাবে নেবেন না ।) এই সেরেছে। আজ রাতে ও আর ঘুমাচ্ছে না। বাকি রাতটা হয়তো এসব আজেবাজে মুভি দেখেই কাটাবে। আমার কুয়ো অভিযানটা তবে আজকের মতো এখানেই শেষ হলো। মনিকা জেগে থাকতে আমি কুয়োর ভেতর ঢুকতে যাবো না। ও টের পেয়ে গেলে এলাহি কান্ড বাধিয়ে দেবে। তাছাড়া আজ অনেক ক্লান্ত লাগছে। সিদ্ধান্ত নিলাম আজ রাতটা ঘুমিয়ে কাল দিনের বেলায় কুয়োতে ঢুকবো। রাতের আধারে ওখানে ঢুকার চেয়ে দিনের আলোয় ঢুকা অনেক সহজ হবে। আমাকে বোকার মতো দাড়িয়ে থাকতে দেখে মনিকা বিরক্ত হয়েই হাক ছাড়লো, “কি ব্যাপার সাঞ্জে। তুমি কি শুধু দাড়িয়ে দাড়িয়ে দেখবে? কাছে এসে আমায় আদর করবে না? ” আমি ওকে বুঝিয়ে বললাম, “দেখ মনিকা। আমি খুবই পরিশ্রান্ত। তার উপর ওই গাড়ি আক্সিডেন্টের ধকলটা কাটাতে পারছি না। আজ রাতে আমার বিশ্রাম দরকার। আমি দুঃখিত। আমি সত্যিই দুঃখিত। ” একথা বলেই আমি ড্রয়িংরুম থেকে বেরিয়ে সোজা আমার বেডরুমের দিকে হাটা দিলাম। পেছনে মনিকার একটা দীর্ঘশ্বাস শুনতে পেলাম। কিন্তু আমি ফিরেও তাকালাম না। বেডরুমে ফিরে দেহটা বিছানায় এলিয়ে দিলাম। আহ কি প্রশান্তি। হেডফোনটা কানে লাগিয়ে ট্যাবলেটে একটা গান প্লে করলাম। একটা বাংলা গান। “সূর্যটা ফিরছে ঘরে, ক্লান্ত দিন সাঙ্গ করে একটু ঘুমানো চাই, সমুদ্র দিচ্ছে ঠাই স্রোতের বিছানায় ঢেউয়ের চাদর মুড়ে, অস্থির গাঙচিল, দিগন্তে ফিরছে নীড়ে,,,,,,,” গান শুনতে শুনতে কখন যে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম খেয়াল ছিলো না। স্বপ্নে নিজেকে কুয়োর সরু দেয়ালের উপর দাড়ানো অবস্থায় আবিষ্কার করলাম। কুয়োর ভেতর থেকে তখনো খিলখিল দুষ্ট হাসি ভেসে আসছিলো। আমি ওখান থেকে ফিরে আসতে চাইছিলাম। কিন্তু হঠাৎ একটা দমকা বাতাস আমায় ধাক্কা দিয়ে কয়োর ভেতরে ফেলে দিলো। আমি পড়ছি তো পড়ছিই। এ পতনের যেনো কোন শেষ নেই। তারপর হঠাৎ ঝপাৎ করে জলতলে আছড়ে পড়লাম। আমি হাত পা ছুড়ে নিজেকে যথাসম্ভব পানির উপর ভাসিয়ে রাখার চেষ্টা করছিলাম। স্পষ্টতই বুঝতে পারছিলাম এই গভীর কুয়ো থেকে আমি একা একা উঠে আসতে পারবো না। তাই সাহায্যের জন্যে হাক ছাড়লাম, “মনিকা, মনিকা আমি ডুবে যাচ্ছি। প্লীজ আমায় বাচাও।” একটা ক্ষীণ আশা ছিলো, হয়তো মনিকা আমার ডাক শুনে আমায় সাহায্য করতে আসবে। কিন্তু তার বদলে কুয়োর খুলা মুখে একজন মধ্যবয়ষ্ক বিদঘুটে চেহারার মহিলাকে দেখতে পেলাম। তার কপালে একটা বিশাল ক্ষত চিহ্ন ছিলো। সে আমার অসহায়ত্ব দেখে খিলখিলিয়ে হেসে উঠলো। সেই অশুভ হাসি, যা গাড়ি আক্সিডেন্টের সময় আমি শুনতে পেয়েছিলাম। তারপর ঐ মহিলাটাও কুয়োর ভেতর ঝাপ দিলো। আমার পাশেই পানিতে ঝপাং শব্দ শুনতে পেলাম। কুয়োর বদ্ধ পানিতে বিশাল ঢেউ উঠলো। কুয়োর ভেতরকার ঘুটঘুটে অন্ধকারের আমি ওকে দেখতে পাচ্ছিলাম না। কেবল ওর উপস্থিতি অনুভব করছিলাম। হঠাৎ একজোড়া কালো হাত আমার গলাচিপে ধরলো। এমনিতেই বদ্ধ পানিতে ভেসে থাকতে যেয়ে আমার অবস্থা কাহিল। মহিলাটা কোথায় আমাকে এ বিপদ থেকে উদ্ধার করবে, কিন্তু তা না। ওই এখন আমাকে মারতে উদ্ধত হয়েছে। শালী বুড়ি তুই পেয়েছিসটা কি? মাথা নিচু করে দিলাম ওর একটা হাত কামড়ে। সাথে সাথেই স্বপ্নটা ভেঙে গেলো। উহঃ। বড্ড বাচা বেচেছি। তবে আস্তে আস্তে এসবে অভ্যস্ত হয়ে যাচ্ছি। কটেজে আসার পর থেকেই প্রায় প্রতি রাতেই আমি কোন না কোন দুঃস্বপ্ন দেখে চলেছি। এখন আর এসব দেখে অতটা ভয় পাই না। কিন্তু একি! স্বপ্নটা তো ভেঙে গেছে। কিন্তু আমার শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে কেনো? গলায় সরু কি যেনো একটা চেপে বসেছে।হাতড়াতে যেয়ে অনুভব করলাম ওটা আমার হেডফোনের তার। তালগোল পাকিয়ে গলায় আটকে বসেছে আর ক্রমাগত চাপ দিয়েই চলেছে! কিন্তু আমার স্পষ্ট মনে আছে ঘুমানোর সময় ওটা আমার গলায় নয়, কানে পরানো ছিলো! হয়তো স্বপ্ন দেখার সময় যখন ছটফট করছিলাম, তখন ঘুমের মধ্যেই ওটা গলায় পেঁচিয়ে গেছে। আমি দ্রুত ওটা গলা থেকে টেনে ছাড়ানোর চেষ্টা করলাম। কিন্তু টানতে যেয়ে ওটা গলায় আরো শক্ত হয়ে আটকে গেলো। এবার আমার শ্বাস প্রশ্বাস বন্ধ হওয়ার উপক্রম। সারা শরীরে খিচুনি শুরু হয়েছে। দুচোখ ঝাপসা হয়ে আসছে। ঝাপসা চোখেই হঠাৎ দৃষ্টি গেলো বেডরুমের মাঝখানটায় ঝুলানো ঝাড়বাতির দিকে। বেডরুমের আবছা আলোয় স্বপ্নে দেখা সেই মহিলাটাকে আমি গলায় ফাঁস লাগানো অবস্থায় ঝাড়বাতি থেকে ঝুলতে দেখলাম। দেখতে দেখতে দম বন্ধ হয়ে এলো। হাত পা নিস্তেজ হয়ে আসছে। খিঁচুনির তালে চুল গুলি মুখের উপর দলা পাঁকিয়ে এসে নাকে চোখে খোঁচা দিচ্ছে। কি বিরক্তিকর। এই চুলের জ্বালায় মরার সময়ও একটু শান্তিতে মরতে পারবো না। একে তো লজ্জ্বাজনক ভাবে গলায় হেডফোন পেঁচিয়ে মরতে বসেছি তার উপর আবার চুল দিয়ে মুখ ঢাকা। এই মৃতপ্রায় অবস্থায় ও আমার আত্মসম্মানে খুব বাধলো। দেহের সকল শক্তি আর মনযোগ একত্রিত করে বা হাত দিয়ে মুখের উপর থেকে চুলগুলি সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করলাম। তখনই চুলের মধ্যেই জীয়নকাঠির সন্ধান পেলাম! আমার চুলের কাটা টি আমার আঙুলে বিঁধল। বাহ। বেশ ধারালো মনে হচ্ছে। এটা দিয়ে সহজেই হেডফোনের তার কেটে দেওয়া যাবে। কিন্তু কাটাটি চুলের মধ্যে একদম গেঁথে আছে। কিছুতেই খুলে আনতে পারছিলাম না। অবশেষে হেচকা টানে একমুঠো চুল সহ কাটাটি উপড়ে আনলাম। তারপর হেডফোনের তারের উপর ওটা ঘষতে শুরু করলাম। দু চার ঘষা দিতেই ওটা ছিঁড়ে গেলো। ওয়াও। অবিশ্বাস্য ভাবে আমি এ যাত্রায়ও বেঁচে গেলাম। মনেমনে প্রতিজ্ঞা করলাম আর কখনো কানে হেডফোন লাগিয়ে ঘুমাবো না। হঠাৎ মনে পড়লো ঝাড়বাতি থেকে ঝুলতে থাকা সেই মহিলার কথা। ওকি এখনো ঝুলছে? তড়াক করে উঠে দাড়ালাম বিছানা ছেড়ে। কিন্তু না। ঝাড়বাতিটা স্বাভাবিক ভাবেই ঝুলছে। বেশীক্ষণ দাড়িয়ে থাকতে পারলাম না। প্রচন্ড ক্লান্ত লাগছিলো। আবার বিছানায় বসে পড়লাম। তারপর জ্ঞান হারিয়ে বিছানায় শুয়ে পড়লাম। জ্ঞান ফিরলে নিজেকে বিছানায় আবিষ্কার করলাম। ভোরের সোনালী আলো জানালা দিয়ে চুইয়ে আমার বেডরুমে প্রবেশ করছে। একটা শান্ত শনিবারের সকাল। অফিসের ঝামেলা থেকে মুক্ত। মনটা নিমেষেই ভালো হয়ে গেলো। বিছানা থেকে উঠতেই মাথাটা ঘুরতে শুরু করলো। কিন্তু পরক্ষণেই তাল সামলে নিলাম। অভ্যাসবশত ঘুম থেকে উঠেই বাথরুমে ফ্রেশ হতে চললাম। কিন্তু বাথরুমের দরজার সামনে থমকে দাঁড়ালাম। কাল রাতে বাথরুমে ঘটে যাওয়া ঘটনাটা মনে পড়ে গেলো। বাথরুমের দরজার নব থেকে হাত সরিয়ে আনলাম। সে ঘটনার পর আবারো বাথরুমে ঢুকার সাহস আমার তখন ছিলো না। বাথরুমের দরজায় দাড়িয়ে যখন ইতস্তত করছিলাম তখনই আমার ট্যাবলেটটা বেজে উঠলো। যেয়ে দেখলাম মায়ের ফোন। ফোনটা রিসিভ করে চোখের সামনে ধরতেই মায়ের সেই পৃথিবী ভুলানো মিষ্টি হাসিটা দেখতে পেলাম। প্রাণ টা জুড়িয়ে গেলো। “সালাম আম্মু। কেমন আছো? ” ওপাশ থেকে মা চোখ রাঙিয়ে হুঙ্কার ছাড়লেন,” বুধবার রাতে কি করছিলি তুই?কতবার তোকে ফোন দিয়েছি তার হিসেব আছে? ” এই সেরেছে। এবার আম্মুকে কি বলবো? আম্মুকে কিভাবে বলি কবরস্থানে মারামারির অপরাধে দুজন স্টার আমাকে সে রাতে তাদের সেফ হাউসে ধরে নিয়ে গিয়েছিলো। ও কথা শুনলে তো উনি সুদুর মালকাওয়ালরুশ থেকে আমার কান মলে দেওয়ার জন্যে এক্ষুনি রওনা হয়ে যাবেন। থাক। কোনাকোনিভাবে সত্যি কথাটা বলব, আর স্টারদের সাথে ডেটিং এর ব্যাপারটা সম্পূর্ণ এড়িয়ে যাবো। আম্মু আবার জিজ্ঞেস করলো, “কিরে কিছু বলছিস না কেনো তুই? কোথায় ছিলি বোধবার?” এবার আমি বললাম, “ওহ আম্মু। আমি সত্যিই দুঃখিত। একটা সাংঘাতিক ভুল হয়ে গিয়েছিলো। বুধবার অফিসে আমার ফোনটা ফেলে এসেছিলাম।” এবার আম্মু ধমক দিয়ে বলল, “বুধবার না হয় বুঝলাম অফিসে ফোন ফেলে এসেছিলে। কিন্তু বৃহষ্পতিবার অফিসে যেয়েও তো একটা ফোন দিতে পারতে। এই বুড়ো মায়ের খোজ খবর নিতে এতো অনিহা কেনো তোর? ” আমি বললাম, “কি যে বলো না মা। আসলে অফিসের কাজে খুব ব্যাস্ত ছিলাম। এই দেখো। কানে ধরছি। আর কখনো এমন ভুল হবে না। শুধু এবারের মতো মাফ করে দাও। প্লীজ।” আম্মু: “আচ্ছা ঠিক আছে সোনা। কিন্তু তোকে এতো শুকনো দেখাচ্ছে কেনো? শরীর খারাপ না কি তোর ? ” আমি: “আহ আম্মু। আমাকে কবে ভেজা দেখাচ্ছিলো তোমার কাছে? আমি তো সব সময়ই শুকনাই থাকি। ভেজা থাকলে ঠান্ডা লেগে যাবে যে।” আম্মু: “পাজি মেয়ে আমার। বয়স তো অনেক হলো। এভার তো দুষ্টুমি ছেড়ে বিয়ে শাদী কিছু একটা কর।” আমি: “দেখো আম্মু। আমার বাবা তোমায় ৩৮ বছর বয়সে বিয়ে করে ঘরে এনেছিলো। তারই একমাত্র মেয়ে হয়ে আমি কিভাবে মাত্র ২৩ বছর বয়সে বিয়ে করি? তুমিই বলো।” আম্মু: “তোর বাপের মতো একটা এক বাউন্ডুলের জন্যে তুই আমার কথা অমান্য করবি? তুই কি কেবল তোর বাপেরই মেয়ে, আমার কিছুই না? ” আমি: “আমার লক্ষী আম্মু। কি যে বল না। তুমি তো অভিকে জানই? ওর পড়ালেখা শেষ হলেই আমরা বিয়ে করবো। তখন তোমাকে আর বলতে হবে না। এখন শুধু একটু অপেক্ষা করো। প্লীজ।” আম্মু: “বাচ্চাকাচ্চা বড় হলে মা বাবার যে কি টেনশন। তুই এসবের কি বুঝবি। বিয়ে দিয়ে দিতে পারলেই মনে হয় যেনো এসব টেনশন থেকে খানিকটা মুক্তি।” আমি: “হা হা। আগামী দুবছরের মধ্যেই তোমায় মুক্তি দিয়ে দিবো। এখন আর টেনশন করো না তো। খুব ক্ষুদা লেগেছে মা। নাস্তা করতে যাচ্ছে। রাতে ফোন দিবো। বাই।” ফোনটা কেটে দিলাম। মায়ের মাথায় বিয়ের ভুত চেপেছে। আমায় বিয়ে না দেওয়া পর্যন্ত ওটা আর নামবে না। বিয়ে বিয়ে বিয়ে আর বিয়ে। যাহ। দিলো তো সাত সকালে মাথাটা গরম করে। রাগে গজগজ করতে করতে গরম মাথায় পানি ঢালতে বাথরুমে ঢুকলাম। রাগের মাথায় গতরাতের ঘড়নাটা আমার মনেই ছিলো না। কিন্তু বাথরুমে ঢুকতেই আমি বিষ্ময়ে হতবাক হয়ে গেলাম!!! একি!!!!!!!! বাথরুমের আয়নাটা গতরাতে আমার চোখের সামনে ভেঙেছিলো। ওটা ভাঙ্গার শব্দ শুনে তাড়াতাড়ি উঠতে যেয়েই, আমি টাবে পিছলে পড়েছিলাম। কিন্তু এখন দেখছি আয়নাটা বেমালুম জোড়া লেগে আছে। দেয়ালে ঠিক আগের মতোই টাঙানো। যেন কিচ্ছু হয়নি। কিন্তু টাবটা ভাঙ্গাই পড়ে আছে। আমি কিছুক্ষণ আয়নার সামনে দাড়িয়ে থাকলাম। নাহ। আমি ছাড়া কাউকেই তো দেখা যাচ্ছে না। কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকার পর সন্তুষ্ট চিত্তে বেসিনে মাথা নিচু করে চান্দিতে পানি ঢালতে শুরু করলাম। তারপর কুলি করে, নাক মুখ ধোয়ে আবার আয়নার দিকে তাকালাম। ওমা! আমার কপালের মাঝখানে বিশাল গোলাকার একটা ক্ষত! হলদে পুঁজে ক্ষতটা ভরে উঠেছে। ছিঃ! কি বিশ্রী! আমি ভয় পেয়ে চিৎকার করে উঠলাম। না আ আ আ আ আ আ,,,,, খানিকটা ধাতস্থ হলে কপালে হাত বুলালাম। নাহ। মসৃণ অক্ষত চামড়াই অনুভব করলাম। কিন্তু আয়নায় তখনো ক্ষতটা দৃশ্যমান। কিছুক্ষণের মধ্যেই বেডরুমের কাছেই দুড়ধাড় পদশব্দ শুনতে পেলাম। সম্ভবত মনিকা আমার ভয়ার্ত চিৎকার শুনে দৌড়ে আসছে। আমি তখন নিজের উপরই চুড়ান্ত বিরক্ত। নিজের ক্ষুবটা আয়নার উপর ঝারলাম। শালা আয়নার বাচ্চা। সোপ কেসটা তুলে সোজা আয়নার উপর ছুড়ে ফেললাম। ঝনঝনিয়ে আয়নাটা ভেঙে পড়লো। তখনি বাথরুমের দরজায় দমাদম কিল ঘুষি পড়তে শুরু করলো। বুঝলাম, ওটা মনিকাই। আমি ঠিক আছি কি না তা দেখতে এসেছে। আমি রাগতস্বরে বললাম, “চলে যাও মনিকা। আমি শতভাগ ঠিক আছি। ” আমি ভেবেছিলাম মনিকা এবার চলে যাবে। কিন্তু এর পরিবর্তে ও ভয়ার্ত কন্ঠে মিনতি করলো, “সাঞ্জে, লাইব্রেরী থেকে কে যেনো আমায় ডাকছিলো। আমি প্রথমে ভেবেছিলাম ওটা বুঝি তুমি। কিন্তু যখনই লাইব্রেরীর ভেতরে ঢুকতে যাবো তখনি এদিক থেকে তোমার চিৎকার ভেসে এলো। তাই এখানে দেখতে এলাম কি হচ্ছে। তারপর কাঁচ ভাঙ্গার বিকট শব্দ। ডার্লিং প্লীজ, তুমি আমাকে সত্যি করে বলো তো এখানে এসব কি হচ্ছে? ” এই সেরেছে। এবার ওকে কি বলবো! স্পষ্টত বুঝতে পারছিলাম এই মেয়েটা তার প্রশ্নের সন্তোষজনক উত্তর না পেলে এখান থেকে যাবে না। কিন্তু ওকে দেয়ার মতো কোন উত্তর এই মুহুর্তে আমার কাছে নেই। আমি নিজেও জানি না এখানে ঠিক কি ঘটছে। কি উত্তর দিবো ওকে! আমাকে চুপ করে থাকতে দেখে ও আবার হাঁক ছাড়লো, “সাঞ্জে ডার্লিং। কথা বলছো না কেনো? প্লীজ এমন করো না। আমায় খুলে বলো, কি হচ্ছে এখানে? ” আমি বাথরুম থেকে হতদন্ত হয়ে বেরিয়ে এলাম। রাগে মাথাটা জ্বলছে। মনিকাকে সামনে পেয়েই খেকিয়ে উঠলাম,” এই মেয়ে। তুমি পেয়েছোটা কি এখানে। আমাকে সবকিছুর জন্যে তোমার কাছে কৈফিয়ত দিতে হবে কেন? আমি কারো কাছে কৈফিয়ত দিতে রাজি না। এতে যদি তোমার পোষায় তো থাকো, আর নইলে চলে যাও।” মনিকা আমার এই অপ্রত্যাশিত ব্যবহারের জন্যে মোটেও তৈরি ছিলো না। সে কিছুক্ষণ হতভম্ব হয়ে আমার দিকে তাকিয়ে রইলো, তারপর ফোঁপাতে ফোঁপাতে এক ছুটে আমার বেডরুম থেকে বেরিয়ে গেলো। ও বেরিয়ে যেতেই একটা তীব্র অনুশোচনাবোধ আমার ভেতরটা নাড়িয়ে দিলো। ওকে এভাবে বলাটা আমার মোটেও ঠিক হয়নি। নিজেকে বড্ড অপরাধী মনে হলো। আমিও গেলাম মনিকার পিছু পিছু ওর গেস্টরুমে। গিয়ে দেখি ও বিছানায় উপুর হয়ে শুয়ে কাঁদছে। নিজের উপর প্রচন্ড রাগ হলো। তারপর সেটা সংক্রমিত হলো, কুয়োর ভেতরকার ওই মধ্যবয়সী অশরীরী মহিলাটার উপর। এর জন্যেই আমার মিজাজ বিগড়ে গিয়েছিলো। এর জন্যেই এখন আমার মেয়েটা কাঁদছে। রাগে গজগজ করতে করতে ছুটলাম স্টোররুমে। সেখানে যেয়ে একটা লম্বা নাইলনের দড়ি, একটা টর্চ লাইট, আর সেই পকেট নাইফটা কুড়িয়ে নিলাম। হাতুড়িটা নেড়ে চেড়ে দেখে আবার রেখে দিলাম। ওটা নিয়ে ডাঙ্গায়ই সোজা হয়ে দাড়াতে কষ্ট হয়, কুয়োর পানিতে ভাসা তো প্রায় অসম্ভব। আমি ততক্ষণে সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছি। আজ, এক্ষুনি আমি ওই রহস্যময় কুয়োটার ভেতর নামছি। ওখানে যেই থাকুক না কেন, ওকে পরপারে পাঠিয়ে তবেই ফিরবো। রাগের ঠেলায় মন থেকে ভয় ডর সম্পূর্ণ উবে গিয়েছিলো। দৃঢ় পদক্ষেপে সোজা এগিয়ে গেলাম কুয়োর দিকে। সেখানে যেয়ে কুয়োর বালতি টানার খুটিতে দড়ির এক প্রান্ত শক্ত করে বেধেঁ অপর প্রান্ত নিচে ঝুলিয়ে দিলাম। তারপর দড়ি বেয়ে নেমে গেলাম অন্ধকার কুয়োটার ভেতরে। যতই নীচে নমছি ,অন্ধকার ততই ঘনিয়ে আসছে। টর্চটা জ্বেলে দিলাম। টর্চের মৃদু আলো কুয়োর অন্ধকারের সাথে একটুও পেরে উঠলো না। বুঝলাম এখানে দিন রাতের পার্থক্য প্রায় নেই বললেই চলে। এখানে অন্ধকারের সার্বক্ষণিক ও চিরস্থায়ী রাজত্ব।যতই নিচের দিকে নামছি ততই ভয় বাড়ছে। আমি ভালই ভয় পেতে শুরু করেছি। তারপরই হঠাৎ টর্চের আলোয় জলতল চকচকিয়ে উঠলো। যাক বাবা। আমি তো ভেবেছিলাম এই কুয়োটা পৃথিবীর এক পৃষ্ঠ থেকে অপর পৃষ্ঠ পর্যন্ত বিস্তৃত। দড়ি ছেড়ে পানিতে ঝাপ দিলাম। বদ্ধ, মজা, পঁচা পানি থেকে গাঁ গোলানো গন্ধ উঠলো। কোনমতে নাক মুখ চেপে তা সহ্য করলাম।কুয়োর একপাশের দেয়াল আকড়ে ধরে জলে ভাসতে লাগলাম। হঠাৎ গাড়িটার কথা মনে পড়লো। আরে! ওটাকে তো কোথাও দেখছি না! তবে কি এই সর্বভুক কুয়ো আমার গাড়িটাকে গিলে নিলো? খেয়াল হলো আমি পায়ের নিচে কুয়োর তল পাচ্ছি না! তারমানে ওটা একজন মানুষকে ডুবানোর জন্যে যথেষ্ট গভীর! কিন্ত কত গভীর! কোন গভীরতায় আমার গাড়িটা লুকিয়ে আছে। টর্চটা মুখে কামড়ে ধরে কুয়োর পানিতে ডুব দিলাম। টর্চের মৃদু আভায় প্রায় দশ ফুট গভীরতায় আমার গাড়িটাকে দেখতে পেলাম। গাড়ির ছাদে শেওলা আর ব্যাঙের ছাতা গজিয়েছে! প্রিয় গাড়িটার এ অবস্থা দেখে হৃদয়টা হাহাকার করে উঠলো। ডুব সাঁতার দিয়ে এগিয়ে গেলাম গাড়িটার দিকে। উইন্ডশীল্ড বরাবর টর্চ মারতেই ড্রাইভিং সীটে একটা মানুষের কঙ্কাল দেখতে পেলাম। ভয়ে আমার আত্মা শুকিয়ে এলো। মনে পড়লো,গতরাতে যদি সময় মতো গাড়ি থেকে বেরুতে না পারতাম তবে আজ ওখানে আমার দেহটা থাকতো। কিন্তু এই দেহটা কোন হতভাগার? এটা আমার গাড়িতে এলো কিভাবে? সে যাই হোক। আর ভাবতে পারছি না। অনেকক্ষণ পানির নিচে দম আটকে আছি। তাই তাড়াতাড়ি জলতলে উঠে এসে দ্রুত শ্বাস নিলাম। এখানে যা দেখার আমি দেখে নিয়েছি। এবার দড়ি বেয়ে উঠে এই মৃত্যু গহ্বর থেকে বেরুতে হবে। কিন্তু কি আশ্চর্য! দড়ি ধরে টান দিতেই ওটা সম্পূর্ণ খুলে চলে এলো। হায় হায়! আমি উপরে বেয়ে উঠবো কি করে? আমার খুব কাছ থেকেই কে যেনো খনখনিয়ে হেসে উঠলো। সেই ভয়ঙ্কর শয়তানী হাসি। বুঝলাম আমার দুঃস্বপ্নটা এবার সত্তি হতে চলেছে। হঠাৎ একটা সময় সেই আত্মা কাঁপানো হাসিটা থেমে গেলো। কুয়োর ভেতরে সুনসান নিরবতা। আমি কুয়োর দেয়ালে ঠেকা দিয়ে কোন রকমে ভেসে ছিলাম। মুখে শক্ত করে কামড়ে ধরে রেখেছি টর্চ লাইটটা। এই অন্ধকারে ওটাই একমাত্র সম্বল। খানিক পরেই নিরবতা ভেঙে কলকলিয়ে উঠা পানির আওয়াজ শুনতে পেলাম। অনেকটা বাথরুমের ফ্লাশ ছাড়লে যেমন শব্দ হয় তেমন। কুয়োর শান্ত জলতলের মাজখানে প্রথমে ছোট্ট একটা ঘুর্ণীর সৃষ্টি হলো। ঘুর্ণীটা ধীরেধীরে বড় হতে হতে কুয়োর পরিধি বরাবর ছড়িয়ে পড়লো। পানির প্রচন্ড স্রোত আমাকে সেই ঘুর্ণীর মাঝখানে টেনে নিয়ে যেতে চাইছে। আমি প্রাণপণে কুয়োর দেয়ালটা আকঁড়ে ধরে শামুকের মতো আটকে থাকতে চাইলাম। কিন্তু হলো না। হাত ফসকে গেলো। আমি ছিটকে যেয়ে পড়লাম সেই ঘুর্ণীর মাঝখানে। তারপরই টুপ করে ডুবে গেলাম। দেখতে দেখতে বদ্ধ কুয়োর পানিতে ফ্লানেল আকৃতির নিম্নমুখী ঘুর্ণী সৃষ্টি হলো। পানির তোড়ের সাথে না পেরে আমি ওতে ডুবে গেলাম। ঘুর্ণীর মাঝে ডুবতে ডুবতে আমি কুয়োর গহীনে চলে গেলাম, ঠিক গাড়িটার কাছে। টর্চের আলোয় দেখলাম ওটার দরজাটা খুলে হা হয়ে আছে। কিন্তু ভিতরের কঙ্কালটা এখন অদৃশ্য। গাড়ির গায়ের সেই শেওলা আর ব্যাঙের ছাতাও নেই। ঝকঝকে তকতকে আমার স্পিডস্টার। কিন্তু এবারের মতো গাড়ির মায়াটা আমায় ছাড়তে হবে। যে করেই হোক আমায় জলতলে ভেসে উঠতে হবে দম ফুরিয়ে যাবার আগেই। সর্বশক্তিতে সাঁতরাতে লাগলাম, কিন্তু কিছুতেই আমি উপরে যেতে পারছি না। জলের নিম্নমুখী স্রোত বারবার আমায় ডুবিয়ে দিচ্ছে। তারপরেই একটা তীব্র জলধারা আমায় ঠেলে গাড়ির খোলা দরজা দিয়ে ভেতরে ঢুকিয়ে দিলো। আমি ভেতরে ঢুকতেই গাড়ির দরজাটা নিজে থেকেই বন্ধ হয়ে গেলো। আমি জানালা দিয়ে সাঁতরে বেরুনোর চেষ্টা করলাম। কিন্তু দুপাশের জানালা দিয়ে প্রচন্ড জলস্রোত বইছে। আমি জানালা দুটোর ধারে কাছেও ঘেষতে পারলাম না। অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাস আর ক্রোধ আমাকে এই মৃত্যুগহ্বরে নিয়ে এসেছে। বুঝলাম একটু আগে গাড়ির ড্রাইভিং সীটে বসে থাকা কঙ্কালটা আমারই ছিলো। এই কুয়োয় ঢুকার পর প্রথম ডুবে আমি ভবিষ্যতটা দেখেছি। আর এখন দেখছি রূঢ় বর্তমান। এই কুয়োয় ডুবে যাওয়া গাড়ির ভেতরে আটকে মরাই আমার কপালে লিখা ছিলো। কপালের লিখন না যায় খণ্ডন। নিজেকে ভাগ্যের হাতে ছেড়ে দিয়ে খানিকটা নিশ্চিত হলাম। বুকে ব্যাথা শুরু হয়ে গেছে। তবুও একটু একটু করে শ্বাস ছাড়ছি। জীবনের শেষ নিঃশ্বাসটা যতটা দেরীতে সম্ভব ছাড়তে চাই। জীবনটা নিষ্ঠুর হলেও এতো তাড়াতাড়ি মরতে ইচ্ছে করছে না। কিন্তু একদিন না একদিন মরতে তো আমাকে হবেই। সেই দিনটা আজই হোক বা কাল। এসব ভাবতে ভাবতেই আমার চোখ গেলো গাড়ির ড্যাশবোর্ডে। ফুলে উঠা ট্রাশ বেলুন (গাড়ি আক্সিডেন্ট হলে যে বেলুন ফুলে উঠে ড্রাইভারের মাথা ড্যাশবোর্ডে ঠুকে যাওয়া থেকে রক্ষা করে) সমগ্র ড্যাশবোর্ড ঢেকে রয়েছে! গতরাতে গাড়িটা কুয়োর দেয়ালে আঘাত করার সময় ট্রাশ বেলুন ফুলেনি। কিন্তু তারপর কুয়োর মধ্যে প্রচন্ড জোরে গাড়িটা আছড়ে পড়ার সময় হয়তো ওটা ফুলে গেছে। ট্রাশ বেলুনে সাধারণত হিলিয়াম গ্যাস থাকে যা বাতাসের থেকেও হালকা। এই ট্রাশ বেলুনটাকে যদি কোনভাবে গাড়ির জানালা দিয়ে বের করে দিতে পারি তো ওটা সকল স্রোত উপেক্ষা করে সোজা জলতলের দিকে ছুটবে। তখন শুধু ওটা ধরে থাকলেই হলো। ওটাই আমাকে জলতলে নিয়ে যাবে। কটিদেশ হাতড়ে ছুরিটা বের করলাম। তারপর দ্রুত একে একে ট্রাশ বেলুনেকে আটকানোর তিনটা দড়ির বাঁধনই কেটে দিলাম। মুক্ত হয়েই ওটা সাঁ করে গাড়ির ছাদে ভেসে উঠলো। ওদিকে আমার নিশ্বাস দ্রুত ফুরিয়ে আসছে। বাতাসের অভাবে ফুসফুসটা যেন ঠেলে বেরিয়ে আসতে চাইছে। নিজের অজান্তেই মুখের মধ্যে ধরা টর্চের উপর তীব্র কামড় পড়লো। প্রাণপণে ঠেলে বেলুনটাকে গাড়ির জানালা দিয়ে বের করে দিলাম আর ওর একটা দড়ি শক্ত করে ধরে রাখলাম। কপাল ভাল যে এটা কাজ করলো। বেলুনটা আমায় জানালা দিয়ে ছেঁচড়ে বের করে আনলো। তারপর তড়িত বেগে উপরে উঠতে শুরু করলো। সাথে করে আমাকেও নিয়ে চলল। এভাবেই আমি সাক্ষাৎ মৃত্যুকে আবারো ফাঁকি দিলাম। তীব্র স্রোত উপেক্ষা করে জলতলে ভাসার পর অনুধাবন করলাম প্রচেষ্টা ব্যাতিত ভাগ্য বলতে কিছু নেই। মানুষ প্রচেষ্টার মাধম্যেই তার সৌভাগ্য গড়ে নেয়। কেবল ভাগ্যের উপর নির্ভর করে যদি গাড়ির ভেতরে হাল ছেড়ে দিতাম তো এতক্ষণে পরপারেই পৌছে যেতাম। আমি ভেসে উঠতেই জলের ঘুর্ণী থেমে গেলো। আবার সেই শান্ত বদ্ধ জল। বেলুনটা বাতাসে ভেসে উপরে চলে যেতে চাইছে। কিন্তু আমি ওটা শক্ত করে ধরে রইলাম। কেন যানি মনে হচ্ছিলো, বেলুনটা ছাড়া মাত্রই এই ক্ষুধার্ত কালো জল আবার আমাকে ভেতরে টেনে নিবে। হাতে ধরে রাখা ছুরিটার দিকে কৃতজ্ঞ দৃষ্টিতে তাকালাম। এই নিয়ে দুবার ওটা আমার জীবন বাঁচালো। ওর হাতলে একটা চুমু খেলাম। হঠাৎ মনে হলো এই ছুরিটাই আমাকে এখান থেকে বের করে নিতে পার। কুয়োর ভেজা দেয়ালটা পরীক্ষা করে দেখলাম! হা। এই দেয়ালে ছুরি চালিয়ে দেয়ালে অনায়াসে ছোট ছোট গর্ত করা যাবে। সেসব গর্তে হাত গুঁজে সহজেই এই খাঁড়া দেয়াল বেয়ে উঠে বেরিয়ে যাবো। চিন্তাটা মাথায় আসতেই কাজে লেগে গেলাম। বুদ্ধিটা কাজ করলো। কিন্তু এই পদ্ধতিতে বেয়ে উঠতে যেয়ে আমার শরীরের শেষ শক্তিটুকুও নিঃশেষিত হলো। হাঁচড়ে পাঁচড়ে কুয়োর বাহিরে বেরিয়ে আসতেই তীব্র সূর্যালোকে আমার চোখ ধাঁধিয়ে গেলো। সূর্যালোকের তীব্রতা থেকে চোখ বাঁচাতে দুহাতে চোখ ঢাকলাম। তারপর আর কিছু মনে নেই। অসম্ভব ক্লান্তিতে আমি জ্ঞান হারিয়ে লুটিয়ে পড়লাম। জ্ঞান ফিরলে জেগে দেখি মধ্যান্নের সূর্য ঠিক মাথার উপরে চলে এসেছে। সারাটি সকাল এই কুয়োর পেছনেই কাটিয়ে দিয়েছে? কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হয় নি। আমি এখনো জানতে পারিনি কে এই মহিলা, কি তার উদ্দেশ্য! ব্যর্থ মনোরথে আমি আবারো ফিরে চললাম কটেজের দিকে। কটেজে ফিরতেই সেই খনখনে হাসিটা কানে ভেসে এলো। ওটা লাইব্রেরী থেকেই আসছে। দৌড়ে গেলাম লাইব্রেরীতে। কিন্তু লাইব্রেরী দরজাটা ভেতর থেকে বন্ধ। মনিকা কি ভেতরে আটকে আছে? হায় হায়। আমি গলা ফাটিয়ে হাক ছাড়লাম, ” মনিকা। মনিকা ডার্লিং। ভেতরে কি করছো তুমি। প্লীজ আমায় ভেতরে ঢুকতে দাও। সকালের ঘটনাটার জন্যে আমি সত্যিই দুঃখিত। ” কোন সাড়া নেই। এবার প্রাণপণে দরজা ধাক্কাতে শুরু করলাম। কিন্তু দরজাটা খুললো না। স্টোররুমের সেই হাতুড়িটার কথা মনে পড়লো। এক দৌড়ে স্টোররুম থেকে ওটা নিয়ে আসলাম। যেই দরজায় একটা ঘা বসাতে যাচ্ছিলাম অমনি ওটা নিজে থেকেই খুলে গেলো। ঐ তো মনিকা লাইব্রেরীর মেঝেতে নিথর হয়ে পড়ে আছে। মেয়েটার জন্যে হৃদয়টা হাহাকার করে উঠলো। “মনিকা, এ কি হলো? ডার্লিং! ” দৌড়ে যেয়ে ওর ঘাড়ে হাত দিয়ে ক্যারোটিক ধমনিতে পালস চেক করলাম। থাকং গড, ও বেঁচে আছে। কিন্তু শ্বাসপ্রশ্বাস খুব ধীরে পড়ছে, আর শরীরটা স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক ঠান্ডা। ও আমার দিকে কেমন যেনো ঘোর লাগা দৃষ্টিতে তাকালো। আমি ওকে কোলে তুলে গেস্টরুমে বয়ে নিয়ে চললাম। আদিন ঠিকই বলেছিলো। মনিকাকে এই হউন্টেড কটেজে থাকতে দেওয়া মোটেও উচিৎ হয় নি। আজ এখানে থেকে খানিকটা ভালো হয়ে উঠুক। কাল এক সময় ওকে সবকিছু বুঝিয়ে বলে বিদায় করে দেবো। গেস্টরুমে এনে ওকে বেডশীট দিয়ে ভাল করে পেঁচিয়ে শুয়ালাম। বেচারি। ঠান্ডায় না জানি কতটা কষ্ট পেয়েছে। হঠাৎ একটা ব্যাপার খেয়াল হলো। মনিকা এই নিয়ে পরপর দুদিন লাইব্রেরীতে যেয়ে অসুস্থ হয়ে পড়েছে। আজ সকালে কুয়োতে যা খুঁজতে গিয়েছিলাম ওটা সম্ভবত লাইব্রেরীতেই আছে। মনে পড়লো লাইব্রেরীর সেই অদ্ভুত বইটার কথা। সেদিন বইটা পড়া শুরু করতেই আলার্ম বেজে উঠেছিলো। তাই ওটা পড়া হয় নি। আরে! আশ্চর্য! এই ব্যাপারটা তো আমি সম্পূর্ণ এড়িয়ে গেছি। সেদিন সকাল ৬টায় আল্যার্ম বেজে উঠেছিলো। কিন্তু আমার বেডরুমের ঘড়িতে প্রতিদিন সকাল ৮টায় আল্যার্ম দেওয়া আছে। তারমানে সেদিন বইটা পড়া শুরু করতেই নির্দিষ্ট সময়ের প্রায় দু ঘন্টা আগেই আল্যার্ম বেজে গিয়েছিলো? তারমানে অশরীরী কেউ একজন চায় না আমি বইটা পড়ি। কিন্তু কেন? কি আছে ঐ বইতে? এই প্রশ্নের উত্তর কেবল লাইব্রেরীতেই পাওয়া যাবে। দ্রুত পদক্ষেপে লাইব্রেরীর দিকে হাঠা ধরলাম। লাইব্রেরীতে গিয়ে দেখি দরজাটা ভেতর থেকে বন্ধ! আশ্চর্য! কি গোপনীয়তা এই লাইব্রেরীকে ঘিরে? আমাকে যে জানতেই হবে। এইডসের স্লোগানটা মনে পড়লো, “বাঁচতে হলে জানতে হবে”, আর জানতে হলে ঢুকতে হবে, লাইব্রেরীর ভেতরে। একটু আগে নিয়ে আসা হাতুড়িটা হাতের কাছে পড়ে ছিলো। ওটা তুলে দরজার লক বরাবর দিলাম এক ঘা। লক ভেঙে অর্ধেক ফাঁক হয়ে গেলো। দ্বিতীয়বার হাতুড়ির বাড়ি না দিয়ে কাঁধ দিয়ে ধাক্কা দিয়েই দরজাটা খুলে ফেললাম। সেই কাঙ্খিত বইটা পড়ে আছে টেবিলের মাঝখানে। মলাট উল্টাতেই লেখিকা মারগারেটের স্কেচটা আবার বেরিয়ে এলো। সেদিন চিনতে না পারলেও আজ মহিলাটাকে ভাল করেই চিনতে পারলাম। গোরস্থান থেকে ফিরার সময় একেই আমি দেখেছিলাম , গাড়ির আয়নায় আমার পাশের সীটে বসে থাকতে। এই মহিলাটাই দুঃস্বপ্নে আমায় দেখা দিয়েছিলো। একেই বেডরুমের ঝাড়বাতিটা থেকে গলায় ফাঁস লাগিয়ে ঝুলতে দেখেছি। এবার প্রথম পৃষ্টা ও সূচিপত্র উল্টে বইটা পড়তে শুরু করলাম »চলবে…


এডিট ডিলিট প্রিন্ট করুন  অভিযোগ করুন     

গল্পটি পড়েছেন ২১১২৭ জন


এ জাতীয় গল্প

গল্পটির রেটিং দিনঃ-

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now