বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
ডাকিণী-১, পর্ব-২৬,২৭,২৮,২৯,৩০
লিখেছেনঃ সানজিদা সুলতানা সুমা
(গল্পে কিছু অ্যাডাল্ট কন্টেন্ট আছে, যা নিতান্তই গল্পে পূর্ণতা আনতে ব্যবহার করা হয়েছে । দয়া করে নেতিবাচক ভাবে নেবেন না ।)
ও রাজি হয়ে গেল। আমরা ঠিক করলাম অফিস শেষে আজ বিকাল ৬টায় আমরা “জিনেটস্কি হুইস্কি ” রেস্তোরায় এক সাথে ডিনার করব। আমার অফিস শেষ হয় বিকাল ৫টায়। অফিসের পর প্রায় একটা ঘন্টা আমি বাল্টিসের সৈকতের ধার দিয়ে গাড়ি চালিয়েই কাটিয়ে দিলাম। তারপর ৬টা বাজার ঠিক পাঁচ মিনিট আগেই আগেই আমি রেস্তোরাঁয় হাজির হলাম। আদিন তখনো আসে নি। ওর সাথে এই প্রথম আমার সরাসরি সাক্ষাৎ। এর আগে ইয়াহুতে ভিডিও চ্যাটে ওকে চার মাস আগে শেষ দেখেছিলাম। মুখে দাড়িগোঁফের জঙ্গল আর মাথা বাজপাখির বাসা। ওর আগের চেহারাটা যখন আমি কল্পনা করছি তখন এক সুট পরা ক্লিন শেইভড জেন্টুলম্যান আমার সামনের চেয়ারে এসে বসলো। আমি খেঁকিয়ে উঠে বললাম, এই যে মিস্টার, এই ডেস্কে আমি বসেছি আর আমার সাথে একজন দেখা করতে আসছে যার জন্যেই এই সিটটা রিজার্ভড। আপনি অন্য কোথাও বসুন। লোকটা তো উঠলোই না তার উপর আবার হো হো করে হাসতে শুরু করলো। দেখতে জেন্টল হলেও আচরণে কি অসভ্য রে বাবা! কিন্তু ওর চোখ দুটো খুব চেনা চেনা মনে হলো। আরে! এতো আদিন। দাড়িগোঁফের জঙ্গল ছাড়া আদিন। সে আগাগোড়া বদলে গেছে! আলেসের ডায়ারীর একটা লাইন মনে পড়লো, “কত দ্রুতই না মানুষ বদলে যায়।” আমিই খাবার অর্ডার করলাম। খেতে খেতে আমি ওকে সবকিছুই খুলে বললাম। ও বলল সে আজ চেষ্টা করে দেখবে। ও প্রথমে আমার কটেজ সম্পর্কে জানতে চাইলো। আমি ওকে বিস্তারিত বললাম। একতলা কটেজটায় মোট দশটা রুম। তিনটা বেডরুম, প্রত্যেকটার সাথে সংযুক্ত বাথরুম, একটা কিচেন, একটা ডায়ানিং, একটা ড্রয়িং, দুটো স্টোর রুম, আর দুটো গেস্ট রুম। এটা একটি মধ্যযুগের পরিত্যাক্ত গির্জা। এর বেসমেন্টে একটা পাঁচ সেল বিশিষ্ট বন্দিশালা আছে। ওটারই কোন একটায় আলেসকে আটকে রাখা হয়েছিলো। সম্ভবত ডানদিকের তিন নম্বর সেলটায়। গতরাতে আমিও ওখানে আটকে পড়েছিলাম। সারারাত বিদঘুটে স্বপ্ন দেখে কাটিয়েছি। আমি দেখলাম, ,,,,,,, আদিন আমার কথাগুলি হাঁ করে গিলতে থাকলো। সবটুকু শুনে ও বলল এখন খেয়ে তার বাড়ি গিয়ে কিছু ইন্সট্রুমেন্ট নিয়ে আসতে চায়। ও মনে করে আলেসকে তাড়ানো খুব একটা সহজ নয় তবে অসম্ভব ও নয়। খাবার শেষে ও জোর করে ডিনারের বিল মিটিয়ে দিলো। তারপর আমরা যার যার গাড়িতে উঠে, দুজন দুদিকে রওনা হলাম। আমি কটেজের প্রধান ফটকের সামনে গাড়িটা পার্ক করে ভেতরে বসে রইলাম। একা একা কটেজটায় ঢুকতে সাহসে কুলাচ্ছিলো না। যতই চেষ্টা করছি আলেসকে ভয় না পেতে ততই সে আমার মনে ভয়ের সঞ্চার করছে। গাড়িতে একটা হিপ হপ গান ছেড়ে আদিনের আগমনের জন্যে অপেক্ষা করতে লাগলাম। অপেক্ষার প্রহরটা বড্ড বিরক্তিকর। একটা সময় গাড়ির সিটে বসেই ঘুমিয়ে পড়লাম। ঘুম ভাঙ্গলো আদিনের গাড়ির হর্ণের শব্দে। যাক বাবা। ও চলে এসেছে। এবার হয়তো ও আলেসকে মুক্তি দিয়ে আমার কটেজটাকে আবার নিরাপদ করে তুলবে। দুটো গাড়ি নিয়ে একসাথেই ভেতরে প্রবেশ করলাম। গ্যারেজে গাড়ি পার্ক না করে আমরা ড্রাইভ করে সোজা বাড়িটার সামনে চলে এলাম। সদর দরজার সামনে গাড়ি দুটো রেখে আমরা নেমে পড়লাম। আমার সেই পুরানো ভয়ভয় অনুভূতিটা আবার ফিরে এলো। মনে হলো আজ অশুভ কিছু ঘটতে যাচ্ছে। দরজাটা খুলার আগে আমি ভয়ার্ত চোখে আদিনের দিকে তাকালাম। ও গাড়ি থেকে কতগুলি বিশাল ইহুদি ধর্মীয় বই, কতগুলি মোমবাতি, এক ব্যাগ ভর্তী শুকনো পাতা, এক বোতল পানি আরো কি সব যেন গাড়ি থেকে বের করে নিয়ে আসলো। ওর সাথে চোখাচোখি হতেই আমি ওর চোখে নির্ভরশীলত খুজলাম। কিন্তু আমি যা খুজছিলাম তা ওর চোখে ছিলো না। ওর চোখে ছিলো অনিশ্চয়তা আর কৌতুহ তবে কনফিডেন্সের বড়ই অভাব সেখানে। দরজা খুলে আমরা আবারো সেই অভিশপ্ত কটেজে ঢুকে পড়লাম। আদিন প্রতিটা কক্ষে ঢুকে ওর ধর্মীয় বই থেকে হিব্রু ভাষায় কি যেন পড়লো। তারপর প্রতিটা কক্ষের মেঝের মাঝখানে কিছুটা শুকনো পাতা ছড়িয়ে তার উপর একটি করে ধর্মীয় বইটা রাখলো। তারপর সে বইগুলির পাশে একটা করে মোমবাতি জ্বালিয়ে দিলো। কাজ শেষে ওকে বেশ সন্তুষ্ট মনে হল। এবার ও আমার দিকে ফিরে বলল কাজ শেষ। মোমবাতিটা পোড়া শেষ হলেই এসব কক্ষে যদি কোন অশরীরী থেকে থাকে তবে তা চলে যেতে বাধ্য হবে। আমি কেন জানি ওর কথায় বিশ্বাস রাখতে পারছিলাম না। তবুও মৃদু হেসে ওকে ধন্যবাদ জানালাম। আমি ওকে কিছু কোল্ড ড্রিংক্স সাধলাম। এত কিছু করার পর ওর গলাটা হয়তো শুকিয়ে গেছে। কিন্তু ও হুইস্কি খেতে চাইলো। আমি ওকে বিনীত ভাবে বললাম আমি মদ খাইনা। তাই কটেজে কোন হুইস্কি নেই। ওকে অনেকটাই হতাশ দেখালো। বুঝলাম ওর আগের সব অভ্যাস পরিবর্তন হলেও ও এখনো মদটা ছাড়তে পারেনি। ও আর কিছু না খেয়েই বেরিয়ে পড়লো। ও গাড়ি ঘুরিয়ে চলে যাবার সময় আমি হাত নেড়ে ওকে বিদায় জানালাম। গোধূলির আধাঁরে ও গাড়ি ছুটিয়ে ধীরে ধীরে দুরে সরে যেতে লাগলো। অভিশপ্ত কটেজটায় আমি একা পড়ে রইলাম আরেকটা রাতের জন্যে। সত্যিই কি একা? নাকি এক ঝুড়ি দুঃস্বপ্ন নিয়ে আমায় সঙ্গ দেয়ার জন্যে আলেস ও সাথে আছে? আদিন ড্রাইভওয়ে ধরে এগিয়ে যাচ্ছিলো মসৃণ গতিতে। ওর গাড়িটা যেই প্রধান ফটকের সামনে কুয়োর নিকটবর্তী হলো অমনি রাস্তা থেকে ছিটকে সোজা কুয়ার দেয়ালে ধাক্কা খেলো! হায় খোদা! ও আক্সিডেন্ট করেছে! দৌড়ে ওর গাড়ির কাছে গিয়ে দেখি ওর মাথাটা স্টিয়ারিং হুইলের উপর ঝুলে আছে। আমি বার দুয়েক ডেকে কোন সাড়া পেলাম না। ওকে অনেক কষ্টে টেনে গাড়ি থেকে বের করে মাটিতে শুইয়ে দিলাম। যাক বাবা। বেঁচে আছে। শ্বাস নিচ্ছে। তবে মাথা থেকে তখনো ফিনকি দিয়ে রক্ত বেরুচ্ছে। আমি পুলিশে ফোন দিলাম। পুলিশ আসার আগেই ওর জ্ঞান ফিরলো। আমি ওর শার্ট খুলে মাথাটার ক্ষতটা পেঁচিয়ে দিলাম। রক্তক্ষরণ ততক্ষণে প্রায় থেমে গেছে। তবে কিছুটা রক্ত এখনো চুইয়ে পড়ছে মাথা থেকে। ও চোখ মেলে আমার দিকে তাকালো। কেমন নিষ্প্রাণ সেই চাউনি। ওর চোখের দিকে তাকিয়েই আমি বললাম কি ব্যাপার আদিন? জীবনে প্রথম গাড়ি চালাচ্ছিলে নাকি? এরকম সোজা রাস্তায় কেউ এমন আক্সিডেন্ট করে। ও বিড়বিড় করে বলল, “ওর আংটি প্রয়োজন। সেই আংটি।” এইটুকু বলেই সে আবার জ্ঞান হারালো। ততক্ষণে পুলিশ চলে এসেছে। ওরা আদিনকে আম্বুল্যান্সে করে নিয়ে গেল। আমি ওদের যাত্রাপথে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলাম। যতক্ষণ না গাড়িগুলি বাঁক নিয়ে অদৃশ্য হয়ে যায়। ওরা চলে যেতেই নিজেকে খুবই অপরাধী মনে হতে লাগলো। দুদিন পর ছেলেটার বিয়ে ছিলো। এ ঝামেলায় ওকে না জড়ালেও তো চলতো। ওর জীবনকে আমিই সংকটে ফেলে দিলাম। আদিনকে নিয়ে যেতে যেতে সন্ধ্যা হয়ে এসেছিলো। এবার আমার কটেজে ফিরতে হবে। মনটা সায় না দিলেও আমি নিরুপায়। কটেজে ঢুকতেই লাইব্রেরীতে দাউদাউ লেলিহান শিখা দেখতে পেলাম। দৌড়ে যেয়ে লাইব্রেরীর দরজা খুলতেই আমি স্তম্ভিত হয়ে গেলাম। লাইব্রেরীর মেঝেতে রাখা আদিনের ধর্মগ্রন্থে আগুন লেগে গেছে। পাশেই জ্বালানো মোমবাতিটা নিভে আছে। লাইব্রেরীতে এতগুলি বই পুস্তক রয়েছে। এসবে আগুন লাগলে আর থামানো যাবে না। তাড়াতাড়ি আমাকে কিছু একটা করতে হবে। লাইব্রেরী থেকে এক দৌড়ে আমার রুমে চলে এলাম। উদ্দেশ্য ছিলো বাথরুম থেকে পানি নিয়ে লাইব্রেরীতে জ্বলন্ত ইহুদি ধর্মীয় পুস্তকে ঢালবো। কিন্তু রুমে ঢুকতেই দেখলাম এখানকার মেঝেতে রাখা বইটিও সমানে পুড়ছে। তবে কি বাড়ির প্রতি কক্ষের মেঝেতে রাখা সবগুলি বই পুড়তে শুরু করেছে! এ যেন অনেকটা “সর্বাঙ্গে ব্যাথা-পানি দিবো কোথা” পরিস্থিতি। এই বইগুলি থেকে সারাটা কটেজে আগুন ছড়িয়ে পড়তে খুব একটা বেশী সময় লাগবে না। তার আগেই আমাকে এই কটেজ ছেড়ে বেরুতে হবে। যেই আমি ঘুরে চলে যেতে শুরু করলাম তখনই আগুনটা দপ করে নিভে গেলো। পেছনে ফিরে তাকালাম। মেঝেতে শুধু বইটার ছাই অবশিষ্ট রয়েছে। আমি দৌড়ে লাইব্রেরীতে গিয়েও দেখলাম একই অবস্থা। আগুন নিভে গেছে। তারপর ডায়নিং রুমে গেলাম। কিন্তু কি আশ্চর্য। এখানকার বইটা অক্ষত আছে এবং মোমবাতিটাও জ্বলছে। কটেজের সবগুলি কক্ষই আমি চেক করলাম। বেসমেন্ট, আমার বেডরুম আর লাইব্রেরী বাদে বাকী সব কক্ষেই বইগুলি অক্ষত অবস্থায় আছে আর পাশেই মোমবাতি জ্বলতেছে। হঠাৎ আলেসের ব্যাপারটা ধরে ফেললাম। গতরাতে ও আমায় বেসমেন্টে নিয়ে গিয়ে সেরাতে দুঃস্বপ্ন দেখিয়েছিলো। সেই স্বপ্নে আলেসের জায়গায় আমি নিজেকে দেখতে পেয়েছিলাম। ওর মৃত্যুদণ্ডের পর ওর দেহটাকে প্রথমে প্রধান ফটকের পাশের কুয়োতে চুবানো হয়, তারপর লাইব্রেরীর টেবিলে শুয়ানো হয়। অতঃপর তৎকালিক প্রিস্টের কক্ষ তথা আমার বেডরুম ধর্ষণ করা হয়। ওর লাশটা যেসব জায়গায় নেয়া হয়েছিলো ওর আত্মার প্রভাব সেই সব জায়গাতেই সীমাবদ্ধ। তাইতো কুয়োর পাশ দিয়ে ড্রাইভ করে যাওয়ার সময় আজ আদিনের আক্সিডেন্ট হয়েছে। বাড়িতে অন্যসব কক্ষের বইগুলি অক্ষত থাকলেও লাইব্রেরী আর আমার বেডরুমের বই দুটো পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। অনুভব করলাম আমাকে দেখানো স্বপ্ন গুলি নিছক ভয় দেখানোর জন্যেই নয়। আলেসের ডায়ারীর প্রতিটা পাতা, রাতে দেখা প্রতিটা স্বপ্ন আলেসের পক্ষ হতে নির্দিষ্ট বার্তা বহন করছিলো। কিন্তু ভয়ে আমার চিন্তাশক্তি লোপ পাওয়ায় আমি সেগুলির মর্ম উদ্ধার করতে পারিনি। সেরাতে আমি আলেসের ডায়ারীটা আবার পড়লাম। সাথে সাথে ওর দেখানো স্বপ্ন গুলি নিয়েও চিন্তা করলাম। ধীরেধীরে সবকিছুই দিনের আলোর মতোই পরিষ্কার হয়ে গেল। আলেস ডায়ারীর প্রথম পাতায় নিজের পরিচয় দিয়েছে। তারপর স্বাভাবিক দিনপঞ্জিকা। তারপর তার জীবনে মার্টিনীর আগমন। অতপর মার্টিনীর বিদায়। সবশেষে তার মৃত্যুদণ্ড ঘোষনা ও কপালে আংটির ছ্যাকা প্রদান। ডায়ারী থেকে এটা নিশ্চিত যে আলেস এবং মার্টিনীর মৃত্যু সামান্য কদিনের ব্যবধানে একই ভাবে অর্থাৎ ফাঁসিতে ঝুলে হয়েছিলো। তারমানে আলেস যদি ভুত হয়ে গিয়ে থাকে তবে সম্ভবত মার্টিনীর ও একই পরিণতি হয়েছে। আর ওর কপালে দেয়া আংটির দাগটা নিছক যন্ত্রনা প্রদানের জন্যে দেয়া হয়নি। ওর ডায়ারীতে এ দাগকে ডাইনী চিহ্নিতকারী চিহ্ন হিসাবে উল্লেখ করেছে। তারমানে কেবলমাত্র ডাইনীদের কপালেই এভাবে ছ্যাকা দেওয়া হতো। অন্যকোন অপরাধীকে নয়। প্রাচীন পুরাতত্ত্ব (Anthropology) এর একটা বইতে পড়েছিলাম প্রাচীন ফারাও সম্রাটরা তাদের মৃত্যুর পর সমাধিস্থ করার জন্যে জীবদ্দশায়ই পিরামিড বানাতেন। তাদের মৃত্যুর পর সমাহিত করার সময় ধন রত্নের সাথে অনেক জীবন্ত দাস দাসীকেও জীবন্ত কবর দেওয়া হত। কবর দেয়ার পুর্বে তাদের বুক পীঠ ও শরীরের অন্যান্য অংশে দাসত্বের বন্ধন হিসেবে খাঁজকাটা উত্তপ্ত ধাতব পিণ্ড দিয়ে ছ্যাকা দেয়া হতো। অতপর সেই ধাতব পিণ্ডটা সম্রাটের মুকুটে এটেঁ দিয়ে সেটা মাথায় পরিয়ে মৃতদেহকে গোপন কক্ষে সমাহিত করতো। ফারাওরা নাকি বিশ্বাস করতো এসব পুড়া দাগ দাসদাসীদের আত্মাকে পরলোকে পাড়ি জমানো থেকে বিরত রাখবে এবং ঐ ধাতব পিণ্ডটা মাথায় থাকার দরুন মৃত সম্রাট সেসব দাসদাসীদের আত্মাকে নিয়ন্ত্রণ করতে সক্ষম হবেন। আমার ধারণা আলেসের কপালে ঐ আংটির ছ্যাকাটাও সে ধরনের একটা বিশ্বাস থেকেই দেয়া হয়েছিলো। ঐ শয়তান প্রিস্টটা জানতো সে চিরকাল বেঁচে থাকবে না। একটা সময় তাকে মৃত্যুবরণ করতেই হবে। কিন্তু ও যদি মৃত্যুর পর মহাযাত্রায় সামিল হয় তবে তাকে জীবদ্দশায় কৃত অপরাধের জন্যে নির্ঘাত নরকে চরম শাস্তি পেতে হবে। তাই সে জীবদ্দশায়ই তন্ত্র মন্ত্র খাটিয়ে মৃত্যুর পর তার মহাযাত্রাকে থামানোর আয়োজন করে। মৃত্যু পরবর্তী জীবনকে সুখকর ও যৌনসম্ভোগময় করার জন্যে সে ফারাওদের বানানো ধাতব পিন্ডের আদলে একটা জাদুকরী আংটি বানিয়ে নেয়। সেই আংটির বৈশিষ্ট্য ছিলো এটা দ্বারা যার কপালেই ছ্যাকা দেয়া হবে তার আত্মাই মৃত্যুর পর এই আংটির মালিকের দাসে পরিণত হবে। শুধু আলেস আর মার্টিনী নয়। জীবদ্দশায় শতশত মেয়েকে সে ডাইনী অপবাদ দিয়ে মৃত্যু দন্ডে দণ্ডিত করে।
মৃত্যুর পুর্বে তাদের সবার কপালেই সে আংটির ছ্যাকা দেয় যেন মৃত্যুর পর তারা সবাই তার যৌনদাস (Sex slave) এ পরিণত হয়। অবশেষে প্রিস্টের মৃত্যুর পর তার অনুসারীরা তাকে আংটি সহ কবরস্থ করে। ওর সাথে সাথে শতশত অভাগা ডাইনিদের আত্মাও তার কবরে আটকা পড়ে দাসী হিসেবে। এতগুলি বছর ধরে সে মেয়েগুলির আত্মাকে ভোগ করে আসছে। তাদের মধ্যে থেকে মাত্র একজন সেই দাসত্বের শৃঙ্খল ভেঙ্গে বেরিয়ে আসতে পেরেছিলো। সে আর কেউ নয়, আলেস। তার কারণ আলেস বেসমেন্টে বন্দি থাকতে এক অসাধারণ কাজ করেছিলো যা অন্য মেয়েগুলি করেনি। তার প্রাত্যহিক স্মৃতিগুলিকে বাইবেলে লিপিবদ্ধ করা। তার এই স্মৃতির টানে সে প্রিস্টের বন্দিত্বের শৃঙ্খলকে উপেক্ষা করতে পেরেছিলো। তাইতো সে প্রিস্টের সাথে একই কবরের ভেতরে থাকার পরিবর্তে এই কটেজে পড়ে আছে। কিন্তু ওর সম্পূর্ণ মুক্তি এবং পরপারে যাত্রার জন্যে সেই আংটিটা প্রয়োজন। ওটা ধ্বংস করতে পারলেই আলেস সহ বাকিসব আত্মাগুলি মুক্তি মিলবে। আমাকেই ঐ আংটিটা জোগাড় করে আনতে হবে। অন্তত আলেস তাই চায়। সেজন্যেই ঐদিন আমি যখন টবে পা বেধে পড়ে জ্ঞান হারিয়েছিলাম, তখন কৌশলে আলেস স্বপ্নের মাধ্যমে আমায় প্রিস্টের কবরটা দেখিয়ে দিয়েছিলো। তারপর বাথরুমে আয়নায় ফুটে উঠা লেখা আর দুঃস্বপ্নের মাধ্যমে সে আমায় ওটা উদ্ধার করার ইঙ্গিত দেয়। কিন্তু আমি সেসব ইঙ্গিত অনবরত উপেক্ষা করায় সে ক্ষুব্ধ হয়ে আমাকে একরাত বেসমেন্টে আটকে রাখে। সেরাতে আমি বেসমেন্টে ঘুমিয়ে পড়লে স্বপ্নে সে আমায় তার জীবনের শেষ পরিণতিটা দেখিয়ে দেয়। এভাবেই ও আমায় একের পর এক বার্তা দিয়ে যাচ্ছিলো আর আমি সেগুলি উপেক্ষা করে ভাবছিলাম ও আমায় ভয় দেখাতে চাইছে। অতপর আজ যখন আলেসকে তাড়ানোর জন্যে আদিনকে কটেজে নিয়ে আসি তখন স্বাভাবতই আলেস খুবই মর্মাহত হয়। কুয়োর কাছে আদিনের আক্সিডেন্ট, আলেসের প্রভাবযুক্ত কক্ষে আদিনের বই জ্বলে যাওয়া ইত্যদির মাধ্যমে আলেস তার ক্ষোভের প্রকাশ ঘটায়। যাক তাহলে। এতদিন পর আমি আলেসকে বুঝতে শিখলাম। অশরীরী আলেসের হৃদয়ের ভাষা সত্যিই চমৎকার। আমি সিদ্ধান্ত নিলাম সব কিছুর বিনিময়ে হলেও আমি আলেসকে এখান থেকে মুক্তি পেতে সাহায্য করব। আমি যাব সেই খ্রিস্টান গোরস্তানে, প্রিস্টের কবর খুঁড়ে সেই আংটিটা নিয়ে আসতে। পরদিন অফিস শেষে আমি নিকটস্থ সিমেট্রিতে যাই। শতাব্দী প্রাচীন এক বিশাল গোরস্তান। হাজার হাজার মানুষ জীবনের কোলাহল শেষে এখানে প্রশান্তির ঘুমে মগ্ন। সিমেট্রির প্রধান ফটকে একটা পুলিশ বক্স। ঢুকার সময় জানালার পাশে দুজন গার্ডের রুক্ষ চেহারা দেখতে পেলাম। সিমেট্রির প্রধান ফটক দিয়ে ঢুকে ওপাশের দ্বিতীয় ফটক দিয়ে বেরুলেই নতুন গির্জা। অবশ্য সিমেট্রির ভেতর দিয়ে না গিয়েও ৪/৯D হাইওয়ের পাশের ছোট গলি দিয়ে সরাসরি গীর্জায় ঢুকা যায়। ওপাশের ফটকেও একজন গার্ডের দেখা পেলাম। আমার তখন হতাশায় মুষড়ে পড়ার অবস্থা। উঁচু দেয়ালে ঘেরা সিমেট্রির দুই ফটকেই পাহারার ব্যবস্থা করা হয়েছে। এদের চোখ এড়িয়ে প্রিস্টের কবর খুড়ার জন্যে প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি, যেমন শাবল, কোদাল এগুলি ভেতরে নেয়া যাবে না। আরো হতাশাজনক ব্যাপার হল পাহারাদার শুধু গেইটেই মোতায়ন করা নয়। প্রায় আধাঘণ্টা পরপর একজন করে গার্ড ভেতরে ঢুকে চক্কর দিয়ে যাচ্ছে। দুজন গার্ড ভেতরে যাওয়া আসার মধ্যে মাত্র আধাঘন্টা ব্যবধান। কোনক্রমে যদি জিনিসপত্র ভেতরে নিতেও পারি তবুও কবর খুড়ার সময় এর নজরে এড়ানো সম্ভব নয়। হঠাৎ গীর্জার দিকে নজর গেল। মনে পড়লো আলেসের ডায়ারীতে সে গীর্জাকে সাক্ষাৎ নরকের সাথে তুলনা করেছিলো। মনে পড়লে উপমহাদেশে বৃটিশ শাসনামলে এদেশীয় দরিদ্র চাষীদের গীর্জায় এনে জোরপূর্বক ধর্মান্তরিত করা হতো। যারা ধর্মান্তরিত হতে অস্বীকার করতো তাদের সহায় সম্পত্তি জাল দলিল করে দখল করে নেয়া হতো। মনে পড়লো স্কুলে পড়া সেই “সৌদামিনীর মালো” গল্পটি। বৃটিশদের পা চাটা ঐতিহাসিকরা নীলকরদের বিরুদ্ধে সৌচ্চার হলেও এই গীর্জা ব্যাপারে একদম নিশ্চুপ। কারণ তখন বৃটেনের কারখানায় অপেক্ষাকৃত সস্তায় কৃত্রিম নীল রঙ তৈরি শুরু হয়ে গিয়েছিলো। কিন্তু ভোক্তাদের নিকট কৃত্রিম নীলের চেয়ে উপমহাদেশে উৎপাদিত প্রাকৃতিক নীলই বেশী সমাদৃত ছিলো। ফলে নীল কারখানাগুলি ক্রমাগত লোকসান দিতে শুরু করে। তখন বৃটিশ বেনিয়ারা এদেশীয় নব্য সভ্য শিক্ষিতদের ব্যবহার করে। তারা তাদের শেতাঙ্গ প্রভুদের নির্দেশেই নীলকরদের অত্যাচার সাহিত্যে ফুটিয়ে তুলে। সারা উপমহাদেশের মানুষ জেনে যায় নীল কুঠোরির অত্যাচারের কথা। অতপর ঘটে নীল বিদ্রোহ। মানবাধিকারের দোহাই তুলে নীল চাষ বন্ধ করে দেয়া হয়। তারপর বাঙ্গালি যখন নীলবিদ্রোহ সফলের আনন্দে বিভোর তখন কৃত্রিম নীল বিক্রির টাকায় ইংরেজরা মদের আসর জমায়। উপমহাদেশে তখনকার গীর্জা গুলি নীলকুঠি থেকে কোন অংশেই কম ছিলো না। তবে ইংরেজ প্রভুদের অনুমতি না থাকায় গীর্জার নির্যাতনের দৃশ্য তৎকালীন সাহিত্যিকরা সম্পূর্ণভাবে এড়িয়ে যান। জাতির বিবেক তথা সাহিত্যিকরা তখন যদি প্রভুভক্তির চেয়ে দেশপ্রেমকে বড় ভেবে, গীর্জার নির্যাতনটা তাদের সাহিত্যে তুলে ধরতেন তবে আজ আমার দেশে একটাও গীর্জারূপী নরকের দোয়ার থাকতো না। নীলকুঠির মতোই সেগুলিও বিলীন হয়ে যেত।
গীর্জার ছাদের উপরে একজোড়া কাকের কর্কশ চিৎকার আমায় ইতিহাস থেকে বাস্তবে ফিরিয়ে আনলো। গীর্জার ছাদের দিকে তাকিয়ে মনে হলো এই নরকের দ্বারই আমায় সিমেট্রির ভেতরে জিনিসপত্র নিয়ে যেতে সাহায্য করবে।
»চলবে….
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now