বাংলা গল্প পড়ার অন্যতম ওয়েবসাইট - গল্প পড়ুন এবং গল্প বলুন
বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ

ডাকিণী-১, পর্ব-১৬,১৭,১৮,১৯,২০

"ভৌতিক গল্প " বিভাগে গল্পটি দিয়েছেন গল্পের ঝুরিয়ান রিয়েন সরকার (০ পয়েন্ট)

X ডাকিণী-১, পর্ব-১৬,১৭,১৮,১৯,২০ লিখেছেনঃ সানজিদা সুলতানা সুমা (গল্পে কিছু ১৮ কথা আছে, যা নিতান্তই গল্পে পূর্ণতা আনতে ব্যবহার করা হয়েছে । দয়া করে নেতিবাচক ভাবে নেবেন না ।) ওদের একনিষ্ঠ পরিশ্রমে আমার জীর্ণ দেহটা খানিকটা হলেও আকর্ষণীয় হয়ে ঊঠলো। কিন্তু কপালে আংটির পোড়া দাগটা থেকেই গেল। এত সহজে যাবে বলে মনেও হয় না। একটা ছোট্ট আংটি, কিন্তু ক্ষতটা পুরো কপাল ভরে ছড়িয়ে গেছে। মনে হচ্ছে কপালে কেউ একটা পুকুর খুঁড়েছিলো। আর যন্ত্রনার কথা না হয় নাই বললাম। পুরো মাথা ঝিমঝিম করতেছে। মেঝে থেকে মাথাটা তুলতে প্রচন্ড কষ্ট হচ্ছে আমার। অসম্ভব ভারী হয়ে গেছে যেন। বাকিটা দিন আমি শুয়েই কাটালাম। কিন্তু মনেই হলো নাহ যে আমি পবিত্র গীর্জায় শুয়ে আছি। মনে হচ্ছিল যেন আমি নরকের তপ্ত অগ্নি পিন্ডে ঝলসে যাচ্ছি। অনুভব করলাম নরকের কীট এই লোকগুলি পবিত্র গীর্জাকেও নরকে পরিণত করে ফেলেছে। ছোটবেলায় যখন আমি এ গীর্জার শিক্ষানবিশ ছিলাম তখন আমাদের রোজ সকালে বলা হতো, ” ঈশ্বর এই গীর্জার পুজো বেদীর উপর স্থাপিত ক্রুশে বিদ্ধ হয়ে আছেন। যাও, তাকে ফুল দিয়ে সম্মান জানাও।” কিন্তু আজ বুঝলাম ঈশ্বর কখনোই কোন গীর্জায় থাকেন নাহ। গির্জায় প্রিস্টের মতো কতগুলি ছদ্মবেশী নরকের কীটগুলি বাস করে। আর ঈশ্বর থাকেন বিশ্বাসীদের হৃদয়ের মনিকোঠায় চিরভাস্বর হয়ে।” ডায়ারীটা সমাপ্ত। আলেসের আর কোন লেখা খুঁজে পেলাম না। হৃদয়টা হাহাকার করে উঠলো। ওর শেষ উক্তিটি বারবার চোখের সামনে ভাসতে লাগলো। ঈশ্বর গীর্জায় থাকেন নাহ। গীর্জায় প্রিস্টের মতো কতগুলি ছদ্মবেশী নরকের কীট বাস করে। ঈশ্বর থাকেন বিশ্বাসীদের হৃদয়ের মনিকোঠায় চিরভাস্বর হয়ে! ও এক চিরায়ত সত্য কথা বলেছিলো যা প্রায় সব ধর্মের জন্যেই প্রযোজ্য। খৃষ্টানদের গীর্জা, মুসলমানদের মাজার, বৌদ্ধদের পাগোডা, হিন্দুদের মন্দির এগুলি শুধুই মানুষের ধর্মীয় অনুভূতিকে পুঁজি করে বানানো এক একটা ব্যাবসা প্রতিষ্টান ছাড়া আর কিছুই নয়। এগুলিতে কখনই ঈশ্বর থাকতে পারেন নাহ। মনে পড়লো বাংলাদেশে থাকতে আমি একবার শাহজালালের মাজারে গিয়ে ১০০ টাকা দিয়েছিলাম। নিজের বোকামির কথা মনে পড়ায় নিজেকেই ধিক্কার দিলাম। কিন্তু আমার একটা প্রশ্নের উত্তর এখনো পাইনি। আলেস কেন এই কটেজে আটকে আছে? কেন পরপারে যেতে পারছে নাহ! কিসের মায়ায় ও এখানে এতদিন ধরে পড়ে আছে? যাহোক গত রাত আমি লাইব্রেরীতে কাটিয়েছি আলেসের ডায়ারীটা পড়ে পড়ে। আজকের রাতটাও প্রায় শেষ হয়ে এসেছে। এবার আমার ঘুমানোর প্রয়োজন। লাইব্রেরীর আলো নিভিয়ে আমার বেডরুমের দিকে রওনা হলাম। কিন্তু তখনো লাইব্রেরীতে একটা নারী কণ্ঠ কেঁদেই যাচ্ছিলো। একটানা বিলাপের সুর। আমি ওকে কাঁদতে দিলাম। ওর উপর দিয়ে সীমাহীন ঝড় বৃষ্টি বয়ে গেছে। প্রাণ খুলে কাঁদলে হয়তো ওর দুঃখের বোঝাটা কিছুটা হলেও হালকা হবে। নিজের বেডরুমে এসে দেহটাকে বিছানায় ছুড়ে দিলাম। মনে হল সমগ্র পৃথিবীটাই নরকের মতো অশান্তিপূর্ণ। শুধু বিছানাটা ছাড়া। বিছানার প্রশান্তিতে মুহূর্তেই গভীর ঘুমে তলিয়ে গেলাম। সে রাতে তিনটে বিদঘুটে স্বপ্ন দেখেছিলাম আমি। প্রথমে দেখলাম আমি অফিস শেষে গাড়িতে করে প্রতিদিনের মতোই আমার কর্টেজে ফিরছি। গ্যারেজে গাড়ি পার্ক করে হেঁটেহেঁটে কর্টেজের দিকে আসছিলাম। হঠাৎ দেখলাম আমার কটেজের ছাদ থেকে গলায় দড়ি দিয়ে বাথরুমের আয়নায় দেখা সেই মেয়েটা ঝুলে আছে। তার ঘাড় ভেঙ্গে একপাশে বেঁকে আছে। হা করা মুখটা আমার দিকেই ফেরানো। নিষ্প্রাণ চোখ দুটো আমারই দিকে অপলক চেয়ে আছে। হায় হায়! আমার কটেজে একটা মরা লাশ ঝুলছে! আমি ভাবতে শুরু করলাম এটা কে নিয়ে কি করা যায়। পুলিশে ফোন দিবো না কি বিশাল কটেজের কোথাও গর্ত করে পুঁতে দিবো। কিছুই বুঝতে পারছিলাম নাহ। তখনই লাশটা আমার দিকে তাকিয়ে এক বিকৃত হাসি দেয় এতে আমার অন্তরাত্মা কেঁপে উঠে। ওর চোখ দুটো যেন জ্বলছিলো! আমি ভয় পেয়ে কটেজ থেকে দৌড়ে পালাতে শুরু করি। দৌড়াতে দৌড়াতে যখনই কুয়ার পাশ দিয়ে প্রধান ফটকের কাছে চলে আসি তখনই আমার পথ রোধ করে একটা অগ্নিকুণ্ড প্রজ্জলিত হয়। আমি বিষ্ময়ে দু পা পিছিয়ে আসে। অগ্নিকোণ্ডে সুষ্পষ্ট দেখলাম একটা লাশ পোড়ানো হচ্ছে। আমি বাংলাদেশে থাকতে বেশ কয়েকবার শশ্মান ঘাটে লাশ পুড়াতে দেখেছি। তাই ব্যাপারটা এতটা ভয়াবহ লাগল নাহ। কিন্তু লাশটা কার? মনে কৌতুহল নিয়ে আমি অগ্নিকুণ্ডের কাছাকাছি গেলাম। কাছে যেতেই পুড়তে থাকা লাশটা হঠাৎ দাড়িয়ে গেল। লাশটার ঘাড়টা ছিলো পেছনের দিকে বাঁকানো! বুঝতে বাকি রইল না এটা সেই মেয়েটার লাশ যাকে আমি খানিক আগে আমার কটেজের ছাদে ফাঁসিতে ঝুলতে দেখেছি। ভয়ে আমি জমে কাঠ হয়ে গেলাম। পা দুটোর সাথে যেন কয়েক মন ওজনের পাথর আটকে দেয়া হয়েছে! একসময় পুড়তে থাকা লাশটা চিৎকার করে উঠলো! লাশটার আর্তচিৎকারে আমি হিতাহিত জ্ঞান ফিরে পেলাম। বুঝলাম আমাকে এখান থেকে পালাতে হবে। তাই ঘুরেই কটেজের দিকে ফিরে দৌড় দিলাম। কিছুদূর যেতেই কতগুলি হাত আমায় ঝাপটে ধরলো। ঘাড় ঘুরিয়ে দেখলাম কতগুলি কালো আলখাল্লা পরিহিত লোক আমাকে ধরে বয়ে নিয়ে যাচ্ছে। আমি এই ছোটাছোটিতে এতটাই ক্লান্ত ছিলাম যে ওদের বাঁধা দিতে পারলাম নাহ। ওরা সিঁড়ি বেয়ে আমায় কটেজের ছাদে নিয়ে গেল। ছাদে পৌছতেই ওরা আমাকে একটা ঝুলন্ত কাঠের ফ্রেমের সাথে হাত পা বেধে দিলো। আমি কটেজের ছাদ থেকে মাটির দিকে মুখ করে ঝুলছি। নীচে আমি একদল অপেক্ষমান জনতাকে দেখতে পেলাম, কিন্তু এদের কাউকেই আমি চিনি নাহ। অতপর আমি শুনলাম কে যেন চেঁচিয়ে বলছে “তিন তিনজন মানুষ খুনের অপরাধে তোমাকে আগামী রোববার প্রার্থনার পর ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হবে। অতপর এক বিশ্রী চেহারার মুখে খোঁচা খোঁচা দাড়িওয়ালা, সাদা আলখাল্লা পরিহিত এক মাঝ বয়সী লোক এসে আমায় কষে থাপ্পড় মারলো! আমি ব্যাথায় কেঁদে ফেললাম। চারপাশে তখন হাসির রোল উঠলো। তারপর দেখলাম লোকটা তার হাতের কড়ে আঙ্গুল থেকে বিচিত্র নকশা খচিত আংটি খলে নিয়ে একটা ধাতব শিকে ঝুলিয়ে জ্বলন্ত গনগনে কয়লার উপর বসিয়ে গরম করতে লাগলো। আলেসের ডায়ারীটা পড়া থাকায় আমি বুঝতে পারলাম এখন কি হতে যাচ্ছে। ওই লোকটা আংটি গরম করে আমার কপালে ছ্যাঁকা দিতে যাচ্ছে। আতংকে আমার হাত পা অসার হয়ে আসলো। দেহের সবটুকু শক্তি দিয়ে আমি হাত পায়েবাঁধন খুলার চেষ্টা করলাম। কিন্তু যতই চেষ্টা করছি দড়ির বাঁধন গুলি যেন মাংস কেটে আরো গভীরে বসে যাচ্ছে। এরই মধ্যে উত্তপ্ত আংটি টকটকে লাল হয়ে গেছে। লোকটা আংটা দিয়ে সেটা ধরে ধীরে ধীরে আমার দিকে এগিয়ে আসতে লাগল। সবকিছুই যেন স্লোমোশনে হচ্ছিলো। যেন অনন্তকাল লাগলো লোকটার দশ কদম হেটে আমার কাছে পোঁছাতে। অতঃপর লোকটা গরম আংটিটা বাগিয়ে ধরলো আমার কপাল বরাবর। ওটা ধীরেধীরে এগিয়ে আসছে, আরো কাছে! আমি যতটা সম্ভব মাথাটা পেছনে হেলিয়ে ওটার কাছ থেকে যতটা সম্ভব দুরে সরে যেতে চেষ্টা করলাম। কিন্তু লোকটা শেষ পর্যন্ত আমার নাগাল পেয়ে গেলো। উত্তপ্ত আংটিটা ও ঠেসে ধরলো আমার কপালে। আমি এতদিন জানতাম মানুষের স্বপ্নের কোন রং থাকে নাহ। স্বপ্নে মানুষ স্পর্ষ, ব্যাথা অনুভব করে নাহ। কিন্তু গতরাতের স্বপ্নে আমি গনগনে কয়লার টকটকে লাল রঙ দেখেছি। তারপর লোকটা যখন ওটা আমার কপালে ঠেসে ধরলো তখন মনে হলো আমার কপালে একটা বুলেট ঢুকছে। এটা যেন আমার কপাল পুড়িয়ে হাড় ভেদ করে আমার মস্তিষ্কে ঢুকে যাচ্ছে! এত্ত বেশী যন্ত্রনা হচ্ছিলো যে আমি ঘুমের মাঝে চিৎকার করে উঠে বসলাম। যাক বাবা। একটা ভয়াবহ স্বপ্ন থেকে বাঁচা গেলো। আজ ঘুম থেকে উঠতে অনেক দেরি হয়ে গেছে! আজ অফিসে যে কি হবে। লাফিয়ে বিছানা থেকে উঠেই তৈরি হয়ে অফিসপাণে ছুটলাম। তাড়াহুড়োয় নাস্তা করতে ভুলে গেলাম। অফিসে পৌছাতে পৌছাতে আধা ঘন্টা দেরি হয়ে গেল। যে অফিসের প্রধান নির্বাহীই অফিসে আসতে আধাঘণ্টা দেরি করে সে অফিসের ভবিষ্যৎ তো শুধুই অন্ধকার। সবার সামনে দিয়ে মাথা নিচু করে হাটতে হাটতে নিজের অফিসে গিয়ে বসলাম। আমি এসব আর সইতে পারছি নাহ। আলেসের ব্যাপারটা একটা এসপারওসপার করতেই হবে আমাকে। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব। এসব উদ্ভট স্বপ্ন গুলির পেছনে নিঃসন্দেহে ওর হাত আছে। কিন্তু আমাকে এসব দেখিয়ে ওর লাভটা কি? প্রকৃতপক্ষে ও কি চায় আমার কাছ থেকে? ও কি সত্যিই বন্ধুপ্রতিম? নাকি বন্ধুত্বের নাম ভাঙ্গিয়ে ও আমার উপর ভর করে এই জীবন্ত জগতে ফিরে আসতে চায়? আমি কিছুই জানি না। এতগুলো প্রশ্ন মাথায় নিয়ে আমি কিছুতেই অফিসে মনযোগ দিতে পারলাম না। আজ অফিসের সময়টা যেন খুব তাড়াতাড়ি ফুরিয়ে গেল। অফিস ছেড়ে আমার কর্টেজে ফিরতে কেমন জানি ভয়ভয় করছে। কেন জানি মনে হচ্ছে আমি ওখানে নিরাপদ না। ওখানে আজ রাতে বাজে কিছু হতে চলেছে। গতরাতের ভয়াবহ স্বপ্নটা যেন তারই আগামবার্তা বহন করছিলো। আজ বাহিরে একটা রেস্টুরেন্টে ডিনার করলাম। সাধারণত আমি বাহিরে খাই না। তবে আজ অফিস শেষে বাড়ি ফিরতে ইচ্ছা করছিলো না বলে এভাবে খানিকটা অতিরিক্ত সময় বাহিরে কাটালাম। অতঃপর নিজের মনকে অনেক কিছু বলে প্রবোধ দিয়ে কটেজের পথ ধরলাম। ফিরতে ফিরতে সূর্যাস্ত হয়ে গেল। গুধুলির আধারে কটেজটা সেই অভিশপ্ত গীর্জার অবয়ব ধারণ করলো। মনের মধ্যে চাপা দেওয়া ভয়টা আবার ফিরে এলো। গ্যারেজে গাড়িটা পার্ক করে কটেজের দিকে হাটা শুরু করলাম। হাটতে হাটতে হঠাৎ মনে প্রশ্ন জাগলো কি হবে যদি গতরাতের স্বপ্নটা এখন সত্যি হয়ে যায়? যদি ওখানে গিয়ে দেখি ছাদ থেকে একটা মরা লাশ ফাঁসিতে ঝুলছে! কটেজের ছাদের দিকে তাকালাম। এতদুর থেকে গুধুলির অধাঁরে কিছুই দেখতে পারলাম না। সত্যি সত্যিই ঝুলছে কি না তা নিশ্চিত হতে আমাকে কটেজের আরো কাছে যেতে হবে। বুকের ভেতর হৃদপিণ্ডটা হাতুড়ি পিটাচ্ছে। আমি এলো মেলো পদক্ষেপে কাপাঁ কাপাঁ পা ফেলে এগিয়ে যাচ্ছি সেই অভিশপ্ত কটেজটার দিকে। নাহ। কটেজের ছাদটা তো একদমই ফাঁকা। গলায় দড়ি দিয়ে কেউ ঝুলছে না। সামান্য একটা স্বপ্নকে নিয়ে আমি এতটা ভয় পেয়েছিলাম। ভাবতেই নিজেকে হাস্যকর মনে হল। খুশি মনে শিস দিতে দিতে ঘরের দরজা খুলে ভেতরে ঢুকলাম। উহঃ, ঘরের ভেতরটা একদম ঘুটঘুটে অন্ধকার হয়ে আছে! অন্ধকারে হাতড়ে হাতড়ে দেয়ালে সুইচ খুজতে লাগলাম। হঠাৎ কিসে যেন পা বেধে আমি মেঝেতে পড়ে গেলাম। মাথাটা মেঝেতে ঠুকে গেল। অনেকটা নিঃশব্দেই জ্ঞান হারালাম। যখন চোখ খুললাম তখন নিজেকে পার্শবর্তী খ্রিস্টান সিমেট্রিতে আবিষ্কার করলাম। সারি সারি কবরের নাম ফলক দাড়িয়ে আছে চারপাশে। আমি চারদিকে অপ্রস্তুত হয়ে হেটে হেটে দেখতে লাগলাম কবর গুলি। হঠাৎ একট কবরের নাম ফলকে চোখ আটকে গেল। ওতে লেখা ছিল, “স্যারিয়ান জোসেফ ভেলমন্ড, গীর্জার সম্মান্বিত প্রিস্ট। ১৪২০-১৪৯৮।” কেন জানি মনে হল এটাই সেই নরপশু প্রিস্টের কবর। ওর কবরের কাছে যেয়ে নাম ফলকের উপর খুদাই করা একটা আংটির চিহ্ন। সেই আংটি যা দিয়ে সে ডাকিনীদের কপালে ছ্যাঁকা দিত। এই আংটিকেই আমি স্বপ্নে দেখেছিলাম। যাক, আর কোন সন্দেহ নেই এটাই সেই শয়তানের কবর। একরাশ ঘৃনা হৃদয়ের গভীর থেকে ওর জন্যে উগলে বেরিয়ে এলো। মনে মনে প্রতিজ্ঞা করলাম জীবনে যদি কখনো এই শহরের গভর্ণর নির্বাচিত হই তবে আমার প্রথম কাজ হবে এই শয়তানটার কবরের উপর একটা পাবলিক টয়লেট স্থাপন করা। আইডিয়াটা আমার খুব মনে ধরলো। চারিদিকে তাকিয়ে দেখলাম আশেপাশে কেউ নেই। মনে একটা দুষ্টু বুদ্ধির উদয় হলো। ভবিষ্যতের পাবলিক টয়লেটের উদ্ধোধন আজকে করে ফেললে কেমন হয়? আজই, এখনই এই শয়তানটার কবরে প্রসাব করে দিলেই তো উদ্ধোধন হয়ে যাবে! যেই ভাবা সেই কাজ। স্কার্টটা নিচে নামিয়ে, দিলাম শয়তানটাকে ভিজিয়ে। প্রস্রাব শেষে অনেক খানি থুথু ও ছিটিয়ে দিলাম ওর কবরে। অতপর লাথি মেরে কবরের নামফলটা মাটিতে ফেলে দিলাম। যাক। এখন অনেকটাই সন্তুষ্ট মনে হচ্ছে। এবার কটেজে ফিরতে হবে। রাত অনেক হয়ে গেছে। অভিশপ্ত কবরটা ফেলে চলে যাওয়ার জন্যে যখনই উঠে দাড়ালাম, সাথে সাথেই মাটি ফুড়ে একটা হাত এসে আমার পায়ে আঁকড়ে ধরলো। চাঁদনি আলোয় স্পষ্ট দেখলাম ঐ হাতের মধ্যমায় জ্বলজ্বল করছে সেই গনগনে লাল আংটি। ভয় পেয়ে চিৎকার করে উঠলাম। কি অসুরিক শক্তি হাতটায়। আমার এক পা এত শক্ত করে আকড়ে ধরেছে যেন মনে হচ্ছে ছিঁড়ে নিয়ে যাবে। আমি প্রাণপণে অপর পা দিয়ে অনবরত ওর হাতে লাথি মারতে লাগলাম। কিন্তু ও আমায় কিছুতেই ছাড়লো নাহ। একটু একটু করে কবরের পাশে টেনে নিয়ে গেল। তারপর একটা হেচকা টানে টেনে নিলো একদম কবরের ভেতরে। কবরের ভেতরটায় নিরেট অন্ধকার। কিছুই দেখা যাচ্ছিলো নাহ। ঐ আংটি পরা হাতটাকে নাহ। তবে এইটুকু জানি ঐ হাতের মালিক এ অন্ধকারে ঘাপটি মেরে আশেপাশে কোথাও বসে আছে। আমাকে চরম শাস্তি দেয়ার জন্যে। হঠাৎ মনে পড়লো আমার পকেটে নেক্সাস ফোনটা আছে। ওটা বের করে ওর স্কিনের আলোয় কিছুটা হলেও ভেতরটা দেখতে পারবো। প্রয়োজন হলে সাহায্যের জন্যে পুলিশে ফোন দেয়া যাবে। পকেট টা হাতড়ে ফোনটা বের করে আনলাম। পাওয়ার বাটনটা টিপে সামনে বাড়িয়ে ধরলাম। আরে! এটাতো সেই কবরের ভেতরটা নয়। এটা আমার কটেজ। পাশেই দেখলাম একটা ফুলের টব ভেঙ্গে পড়ে আছে। বুঝলাম আমার কটেজে প্রবেশের পর এই টবে পা বেধেই আমি উল্টে পরে আমি জ্ঞান হারিয়েছিলাম। কবরস্থান আর প্রিস্টের কবরের ঘটনাটা নিছক অজ্ঞান অবস্থায় দেখা আরেকটি দুঃস্বপ্ন। আমার যেন ঘাম দিয়ে জ্বর ছাড়লো। একটা লম্বা শ্বাস নিয়ে উঠে বসলাম। তারপর খেয়াল হলো আমার স্কার্ট সম্পূর্ণ ভিজে গেছে! হায় ঈশ্বর! আমি স্বপ্ন দেখতে দেখতে কাপড় ভিজিয়ে ফেলেছি! ধ্যাত। মোবাইলের আলোয় সহজেই দেয়ালের সুইচবোর্ড খুজে নিয়ে ঘরের আলো জ্বেলে দিলাম। উজ্জ্বল আলোয় চোখ সয়ে এলে যেখানে আমি পড়ে গেছিলাম সেদিকে ফিরে তাকালাম। আমার প্রস্রাবটুকু সেখানে কার্পেটকে ভিজিয়ে একটা গোলাকার চাকতির মতো দাগ তৈরি করেছে। অনেকটা স্বপ্নে দেখা সেই আংটির আকৃতি। কিন্তু এই আংটির রহস্যটা কি? আলেস কি এই আংটির জন্যে এত দিন এখানে পড়ে আছে। সম্ভবত ও চায় যেন আমি আংটিটা এনে দেই। অন্তত উদ্ভট স্বপ্ন গুলি আমাকে সেই ইঙ্গিতই দিচ্ছে। একটু আগে ও আমায় দেখিয়ে দিয়েছে আংটিটা কোথায় আছে। খ্রিস্টান কবরস্থানে সেই মৃত প্রিস্টের কবরের ভেতর। চোখ বন্ধ করতেই সেই আংটি পরা হাতের ছবি মনে ভেসে উঠলো, যা স্বপ্নে আমার পা চেপে ধরেছিলো। উহঃ। আমি আর ভাবতে পারছিনা। মাথায় আঘাতের যন্ত্রনা, প্রস্রাবের উৎকট গন্ধ, সারাদিনের ক্লান্তি সব মিলিয়ে একটা নরকের আবহাওয়া তৈরি হয়েছে। আমি সব কিছুকেই উপেক্ষা করে, সোজা বাথরুমে গোসল করতে ঢুকলাম। গোসল করতে করতে হঠাৎ আয়নায় চোখ গেল। আমার প্রতিবিম্ব দেখলাম কপালটা ফুলে একটা আলু গজিয়েছে। বুঝলাম এটা একটু আগে পড়ে যাওয়ার ফল। ইশ। কেন যে মোবাইলের আলো জ্বালানোর কথা প্রথমেই মাথায় এলো নাহ। তাহলে এভাবে অন্ধকারে পড়ে যেতে হত নাহ। এসব যখন ভাবছিলাম তখন হঠাৎ আয়নায় আমার প্রতিবিম্বটা বদলে আলেসের চাহারা ফুটে উঠলো। আসলে ওর উপস্থিতিটা এখন অনেকটা গা সহা হয়ে গেছে। এখন আর ওকে দেখে এখন আর আগের মতো ভয় বা আনন্দ কিছুই হয়। মুখে স্পষ্ট বিরক্তি নিয়ে তাকিয়ে রইলাম ওর দিকে। খানিক পরে ও আয়না থেকে চলে গেল। কিন্তু আয়নার ধুলোর মাঝে লেখা ফুটলো, “আংটিটা পুড়াও। আমায় মুক্তি দাও।” আমি লেখাটা মুছে না যাওয়া পর্যন্ত ওটার দিকে তাকিয়ে রইলাম। প্রকৃতপক্ষে কি চায় আলেস? প্রথমে আমায় ওর ডায়ারী পড়াতে চাইলো। এখন আবার একটা আংটি চাইছে যেটা কবরের ভেতরে প্রিস্টের লাশের হাতে পড়ানো আছে। কি করতে চায় ও সেই আংটি দিয়ে? ঐ আংটি এনে না দিলে ও কি আমার ক্ষতি করবে? আর কি করলে এসব বিদঘুটে স্বপ্ন আমার পিছু ছাড়বে? এ প্রশ্নগুলি আমায় পাগল করে দিচ্ছে। আমি এর সমাধান চাই। আমাকে এর সমাধান করতেই হবে। গোসল সেরে খানিকটা হালকা লাগলো। তোয়ালে পেঁচিয়ে বেরিয়ে এলাম। বাহিরে আসা মাত্র শুনতে পেলাম একটা মেয়েলী কন্ঠ একটানা আমার নাম ধরে ডেকে যাচ্ছে। সাঞ্জে সাঞ্জে সাঞ্জে …… এক অমোঘ আকর্ষণ এ ডাকে। আমি অনেকটা মোহবিষ্টের মতো এগিয়ে গেলাম ঐ ডাকটা লক্ষ্য করে। কিন্তু এটা আগের মতো লাইব্রেরী থেকে আসছে নাহ। এটা আসছে আমার ঠিক পায়ের নীচ থেকে! বেসমেন্ট! আলেস আমাকে সেই বেসমেন্টের বন্দিশালায় ডাকছে? কিন্তু ওখানে তো সম্পূর্ণ অন্ধকার। বেসমেন্টে বিদ্যুৎ সংযোগ লাগানো হয়নি। আমি সেই ডাক উপেক্ষা করে আবার আমার বেডরুমে ফিরে এসে দু গ্লাস পানি খেলাম। ডাকটা তখনো চলছে। আমার মনের একটা অংশ বলছে বেসমেন্টে নেমে দেখে আসো, আলেস কি জন্যে ডাকছে। হয়তো ও আমায় এমন কিছু দেখাতে চায় যা ওর আত্মার মুক্তিতে সহায়তা করবে। অপর অংশ বলছে আলেস থেকে দুরে থাকো। যাই হোক না কেন ও একটা অশরীরী। ওই অন্ধকার বেসমেন্টে ও আমার যে কোন ধরনের ক্ষতি করতে পারে! কিছুক্ষণ ভাবতে ভাবতে এ দুটো মনের লড়াইয়ে অনুসন্ধিৎসু মনটাই বিজয়ী হল। আমি বেসমেন্টের দরজা খুলে আমার ফোনটায় আলো জ্বেলে ভেতরে ঢুকে পড়লাম। সিড়ি ভেঙ্গে যতই নিচে নামছি ডাকটা যেন ততই জোরালো হচ্ছে। একটা সময় সেই এক সারির পাঁচটা সেলের সামনে এসে দাড়ালাম। বুঝতে পারলাম ডাকটা আসছে ডান দিক থেকে ৩ নম্বর সেলের ভেতর থেকে। ভয়ে হৃদপিণ্ডটা যেন গলার কাছে উঠে এসেছে। সমস্ত মানসিক শক্তি একত্রিত করে আমি ঐ সেলে ফোনের আলো ফেললাম। নাহ। বাকি সেল গুলির মতোই ওটাও সম্পূর্ণ খালি। সেই পুরানো দিনের মতো সেলটায় কোন তালা ঝুলছে নাহ। ভেতরে কোন বন্দিও নেই। তবুও সেল গুলির অবয়বে নিষ্ঠুরতার ছাপ এতটুকু কমে নি। হঠাৎ মনে খেয়াল জাগলো, ভেতরে ঢুকে দেখলে কেমন হয়? আমি বুঝতে চাই কিভাবে আলেস আর মার্টিনী এখানে জীবনের শেষ দিনগুলি কাটাতো। দরজাটা খুলে ভেতরে ঢুকে পড়লাম। ৮ ফিট বাই ৮ ফিটের এক বর্গাকার সেল। তিন দিকেই পাথুড়ে দেয়াল। শুধু সামনের দিকটায় শিখ দিয়ে আটকানো। তাতে ৫ ফিট বাই ৩ ফিটের একটা দরজা, কয়েদীদের ভেতরে আনা নেয়ার জন্যে। ভেতরটা সম্পূর্ণ খালি। কোন আসবাবপত্র নেই। এসব যখন ঘুরে ফিরে দেখছিলাম তখনই হঠাৎ সেলের দরজাটা ঠাস করে বন্ধ হয়ে গেল! আমি উন্মাদের মতো দরজায় ঝাঁপিয়ে পড়ে সর্বশক্তিতে ঠেলতে লাগলাম। কিন্তু তালা না থাকা সত্ত্বেও দরজাটা শক্ত হয়ে আটকে গেছে। হায় হায়। এই শতাব্দী প্রাচীন বন্দিশালায় এখন আমি বন্দি হয়ে পড়েছি! না কি আলেস আমাকে এখানে বন্দি করে রেখেছে! ভয়ের এক ঠান্ডা স্রোত ঘাড় বেয়ে নেমে গেল! আবার মনে পড়লো হাতে ধরে থাকা ফোনটার কথা। আমি পুলিশে মেসেজ দিয়ে আমাকে এখান থেকে উদ্ধারের জন্যে বলতে পারি। কিন্তু ফোনের দিকে তাকাতেই সেই আশা গুড়েবালি হয়ে গেল। ওয়াই ফাই কানেকশন লস্ট দেখাচ্ছে। তার চেয়েও ভয়াবহ কথাটা হল ফোনে মাত্র ৪% চার্জ আছে। একটু পরেই এর স্কিনের আলো বন্ধ হয়ে যাবে। আমি ভয়ে গলা ফাটিয়ে চেঁচাচ্ছি। যদিও জানি এ বিশাল শূন্য কটেজে কেউই আমার চিৎকার শুনবে নাহ। সেলের দরজায় ধাক্কাতে ধাক্কাতে কাঁদ ব্যাথা হয়ে গেছে। তবুও খুলছে নাহ। একসময় চলতে চলতে বার দুয়েক লো ব্যাটারি সিগনাল দিয়ে ফোনটা অফ হয়ে গেল। নিরেট আধার পুরো সেলটা কে গ্রাস করে নিল। অবিশ্বাস্য ভাবে বদ্ধ বেসমেন্টের ভেতরই একটা ঝটকা বাতাস এসে আমার শরীরে পেঁচানো তোয়ালেটা উড়িয়ে নিয়ে গেল। সেলের ভেতর প্রায় সব জায়গা হাতড়েও আমি তোয়ালেটা পেলাম নাহ। আমি এটারই ভয় পাচ্ছিলাম। আলেসের মৃত্যুর শত শত বছর পরে ওর সেলে, ওরই মতো সম্পূর্ণ নগ্ন অবস্থায় আমি আটকে পড়েছি! »চলবে….


এডিট ডিলিট প্রিন্ট করুন  অভিযোগ করুন     

গল্পটি পড়েছেন ২১১২৮ জন


এ জাতীয় গল্প

গল্পটির রেটিং দিনঃ-

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now