বাংলা গল্প পড়ার অন্যতম ওয়েবসাইট - গল্প পড়ুন এবং গল্প বলুন
বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ

ধ্বংস টাওয়ার চ্যাপ্টার- ২ বাকি অংশ

"সাইমুম সিরিজ" বিভাগে গল্পটি দিয়েছেন গল্পের ঝুরিয়ান রিয়েন সরকার (০ পয়েন্ট)

X একটা ঢোক গিলল পুলিশ অফিসার এ্যালেন শেফার। থামতে হলো তাকে। পুলিশ অফিসার থামতেই হাইম বেঞ্জামিন বলে উঠল, আমার দুটি কথা। এক, আপনি বলেছেন হাসপাতালের নাম, ঠিকানা আমাদের জানাবেন না। কিন্তু ওখানে যখন যাব, তখন তা তো জানা হয়েই যাবে। তাহলে নাম, ঠিকানা জানাতে আপত্তি কেন? দুই. আব্বাকে আমাদের দেখানো হবে বলেছেন। দেখানোর অর্থ সাক্ষাত ও কথা বলা নয়। ‘দেখানো হবে’ বলতে আপনি কি অর্থ করেছেন?’ পুলিশ অফিসারটির মুখে একটা অস্বস্তির ভাব ফুটে উঠল। বিব্রতও মনে হলো কিছুটা। কিন্তু এরপরও হাসার চেষ্টা করে সে বলল, ‘ড. হাইম হাইকেলের পরিবারকে তার কাছাকাছি নিয়ে যাওয়া হবে, দেখানো হবে, কিন্তু সাক্ষাত করানো হবে না। ডাক্তারের নিষেধ। যথেষ্ট সুস্থ না হওয়ায় আত্নীয়-স্বজনের সাথে তাকে সাক্ষাত করানো যাবে না। যে কোন আবেগ উত্তেজনা তার জন্য ক্ষতিকর। এই একই কারণে তাঁকে তাঁর কোন পরিচিতজনের সাথেও সাক্ষাত করানো হচ্ছে না। যেখানে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে, সেখানকার নাম- ঠিকানা না জানানোর অর্থ হলো, ড. হাইম হাইকেলের পরিবার সেখানে যাবেন বটে, কিন্তু যাওয়ার রাস্তা এবং যাওয়ার স্থান তাদের দেখতে দেয়া হবে না। শেডে ঢাকা বন্ধ গাড়িতে করে যে ঘরে বসে তারা হাইকেলকে দেখবেন, সেই ঘরে নিয়ে নামিয়ে দেয়া হবে। দেখার পর ঐ ঘর থেকে ঐভাবেই আবার ফিরিয়ে আনা হবে।’ বিরক্তি ফুটে উঠল হাইম বেঞ্জামিনের মুখে। বলল, এত কিছুর আমি কারণ বুঝছি না। ড. হাইম হাইকেলের পরিবারকেও বিশ্বাস করা হবে না কেন? আব্বার শত্রু কে বা কারা, কেন তা আমরা জানতে পারব না?’ পুলিশ অফিসারের মুখে সেই আগের অস্বস্তিভাব আবারও ফুটে উঠল। ম্রিয়মান কন্ঠে বলল, ‘যা করা হচ্ছে সবই ড. হাইম হাইকেলের স্বার্থে।’ বলে একটু থামল পুলিশ অফিসার। তারপর পুনরায় বলা শুরু করল, ‘মুসলিম একটি মৌলবাদী চক্র বিরাট এক ষড়যন্ত্র এঁটেছে ড. হাইকেলকে ঘিরে। ড. হাইম হাইকেল একটি ঐতিহাসিক পরিবারের অত্যন্ত সুপরিচিত ও সম্মানিত ব্যক্তিত্ব। তাঁর কাছ থেকে ঐ চক্র একটা কনফেশন আদায় করতে চায় যে কোন মূল্যে। তারপর তাকে হত্যা করতে চায়, যাতে সে কনফেশনের কোন প্রতিবাদ জানানোর কোন সুযোগ না পান।’ পুলিশ অফিসার থামতেই বারবারা ব্রাউন বলে উঠল, ‘কনফেশনটা এত গুরুত্বপূর্ণ কেন? কিসের কনফেশন এটা?’ ‘এ প্রশ্নের উত্তর আমরা জানি না। তবে এইটুকু জানি যে, জাতীয় মহাগুরুত্বপূর্ণ এক ঘটনার সাথে এই কনফেশন জড়িত। এই কনফেশন শত্রুর হাতে এমন এক মহাঅস্ত্র তুলে দেবে যা ইতিহাসই পাল্টে দিতে পারে।’ বলল পুলিশ অফিসারটি। বিস্ময় ও ভীতির ছায়া নেমে এসেছে হাইম বেঞ্জামিন ও বারবারা ব্রাউনের চোখে-মুখে। পুলিশ অফিসারটি থামলেও তারা কোন কথা বলতে পারল না। ভাবছিল হাইম বেঞ্জামিন, তার আব্বা কি এমন জানেন বা চাপে পড়ে ভিত্তিহীন কি এমন কনফেশন করতে পারেন যা ইতিহাস পাল্টে দিতে পারে! তার পিতার মানসিক পরিবর্তনের সাথে এই কনফেশন ব্যাপারটার কি কোন সর্ম্পক আছে? পুলিশ অফিসারই আবার কথা বলে উঠল। বলল, ‘সব কথা আমরা জানি না। কিন্তু ষড়যন্ত্রটা অত্যন্ত ভয়াবহ। জাতির স্বার্থে, ড. হাইম হাইকেলের স্বার্থে আপনারা আমাদের সহযোগিতা করবেন বলে আমরা সবাই আশা করি।’ ভাবছিল হাইম বেঞ্জামিন। একটু পর বলল, ‘ঠিক আছে মি. এ্যালেন শেফার। আমরা কবে দেখা করতে পারি?’ ‘সুবিধা অনুসারে আমাদের পক্ষ থেকেই তা আপনাদের জানানো হবে।’ বলল পুলিশ অফিসার। হাইম বেঞ্জামিন পাশের ডেস্ক থেকে স্লিপ প্যাডের একটা পাতা নিয়ে এসে পকেট থেকে কলম বের করে পুলিশ অফিসারকে বলল, ‘আপনার অফিস ও বাসার টেলিফোন নাম্বার দিন, যাতে আমরাও যোগাযোগ করতে পারি আপনার সাথে।’ পুলিশ অফিসার কিছুটা সংকুচিত হয়ে পড়ে বাধো বাধো কন্ঠে বলল, ‘আমি অফিসে কখন থাকি, বাসায় কখন থাকি তার কোন স্থিরতা নেই। সুতরাং আমাদের সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করে লাভ হবে না। আপনারা বিশ্ববিদ্যালয়ের ডাইরেক্টরের সাথে যোগাযোগ রাখবেন, তাহলেই হবে।’ কিছুটা অপ্রস্তুত হয়ে হাইম বেঞ্জামিন তার কাগজ ও কলম রেখে দিতে দিতে বলল, ‘ধন্যবাদ ওঁদের সকলের টেলিফোন আমাদের কাছে আছে।’ হাইম বেঞ্জামিনের কথা শেষ হতেই পুলিশ অফিসার উঠে দাঁড়াল। তার সাথে উঠল নিউইয়র্ক বিশ্ববিদ্যালয়ের ডাইরেক্টর মি. ফ্রান্সিস। বলল পুলিশ অফিসার, ‘আমরা দুঃখিত। একেবারে অসময়ে আপনাদের বিরক্ত করেছি। আপনি বাড়িতে ফিরে বোধ হয় একটু রেস্টও নিতে পারেননি।’ ‘আমাদের খুশি হবার কথা। আমরা খুশি হয়েছি। আমাদের জন্যেই কষ্ট করে আপনারা এসেছেন। কষ্ট করে আসার জন্য ধন্যবাদ।’ বলল হাইম বেঞ্জামিন। পুলিশ অফিসার এ্যালেন শেফার এবং নিউইয়র্ক রাব্বানিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ডাইরেক্টর মি. ফ্রান্সিসকে গেট পর্যন্ত এগিয়ে দিয়ে এসে হাইম বেঞ্জামিন ও বারবারা ব্রাউন আবার বসল। কপাল কুঞ্চিত, চোখ আধ-বোজা। ভাবছিল হাইম বেঞ্জামিন। তার চিন্তায় বাধ সেধে বারবারা ব্রাউন বলে উঠল, ‘বলেছিলাম না বেঞ্জামিন আংকেল বড় কোন বিপদে পড়েছেন এবং বলেছিলাম যে, তোমাদের বাড়ি ও তোমাদের উপর চোখ রাখা হচ্ছে। দেখলে সবই সত্য প্রমাণ হলো। ওরাও বলে গেল এবং আমিও নিশ্চিত যে, শত্রু পক্ষ তোমাদের বাড়িতে আসবে, তোমাদের সাথে দেখা করারও চেষ্টা করবে।’ ‘কেন আসবে আমরা তো কিছুই জানি না।’ বলল হাইম বেঞ্জামিন। ‘এখন তো অনেক কিছুই জানলে’। বারবারা ব্রাউন বলল। ‘আব্বা যখন বিপদগ্রস্থ, তখন সে বিপদ আমাদের স্পর্শ করবেই।’ বলল হাইম বেঞ্জামিন। ‘ভেব না বেঞ্জামিন। শত্রুরা তোমাদের পর্যন্ত পৌঁছতেই পারবে না।’ বারবারা ব্রাউন বলল। ভ্রুকুঞ্চিত হলো হাইম বেঞ্জামিনের। বলল, ‘তুমি এতটা নিশ্চিত কেমন করে?’ একটু সংকুচিত ভাব দেখা দিল বারবারা ব্রাউনের চোখে-মুখে। একটু হেসে স্বাভাবিক হয়ে বলল, কেন যারা আংকেলের নিরাপত্তা দিচ্ছেন, তাদের কি দায়িত্ব নয় তোমাদেরকে নিরাপত্তা দেয়া?’ ‘এটা যুক্তির কথা, কিন্তু বলেছ নিশ্চিত কথা। যাক। আব্বার অপ্রকৃতিস্থ হবার বিষয়টি আমার মন মেনে নিতে পারছে না। একমাস আগেও আব্বার যে চিঠি পেয়েছি, তাতে তাঁকে সুস্থ শুধু নয়, আরও গভীর ও স্বচ্ছ চিন্তার মনে হয়েছে।’ বলল বেঞ্জামিন। ‘তুমি বলছ এক মাস আগের কথা। কিন্তু বর্তমানকে তো মানতে হবে বেঞ্জামিন।’ বারবারা ব্রাউন বলল। ‘মনটা খুবই খারাপ হয়ে গেল। কি করব বুঝতে পারছি না। আব্বার সাথে সাক্ষাত করতে পারবো না, এ কেমন কথা!’ বলল হাইম বেঞ্জামিন। ‘ডাক্তারের কথা তো মানতেই হবে। ডাক্তারের উপর ভরসা করা ছাড়া করার কি আছে!’ বারবারা ব্রাউন বলল। সেই সাথে বারবারা ব্রাউন সরে বেঞ্জামিনের ঘনিষ্ট হলো। বেঞ্জামিনের কাঁধের উপর হাত রেখে বলল, ‘আবেগ নয়, তোমাকে বাস্তববাদী হতে হবে বেঞ্জামিন। আমার মনে হচ্ছে, বিপর্যয়টাকে যতটা আমরা দেখছি, তার চেয়ে বড়। তোমাকে সবদিক দেখে চলতে হবে।’ ‘পরিবারের সবকিছু আব্বাই দেখেছেন, এখন তিনিই বিপদে। খুবই অসহায় বোধ করছি আমি।’ বলল বেঞ্জামিন। বারবারা ব্রাউন হাত দিয়ে বেঞ্জামিনের গলা জড়িয়ে ধরে বলল, ‘আমি তোমার পাশে থাকব বেঞ্জামিন।’ বেঞ্জামিন কোন কথা বলল না। মাথাটা সে এলিয়ে দিল বারবারা ব্রাউনের কাঁধে। দিলাওয়ার নদীর তীরে দিলাওয়ার এভেনিউর ঠিক উপরেই একটা হোটেলে উঠেছে আহমদ মুসা। ইউরোপীয় ট্যুরিস্টের ছদ্মবেশে। সামান্য ছদ্মবেশেই সে একেবারে বদলে গেছে। সুবেশী একজন এ্যাংলো-এশিয়ান ট্যুরিস্ট মনে হচ্ছে তাকে। দুপুরে সে হোটেলে উঠেছে। গোসল করে খাওয়ার পর একটু রেস্ট নিয়েই আহমদ মুসা বেরিয়েছিল এলাকাটা দেখার জন্যে। সেই সাথে সাথে হাইম বেঞ্জামিনের বাড়িটাও সে দেখে এসেছে। হোটেলে উঠেই আহমদ মুসা যোগাযোগ করেছে হাইম বেঞ্জামিনের সাথে। বলেছে, ‘আমি আপনার সাথে দেখা করতে এসেছি, আপনার আব্বার ব্যাপারে আপনার সাথে কিছু আলোচনার জন্যে।’ সঙ্গে সঙ্গেই উত্তর আসেনি বেঞ্জামিনের কাছ থেকে। একটু পর বলে, ‘আমরা সিন্ধান্ত নিয়েছি, আমি কিংবা আমাদের পরিবারের কেউ আমার আব্বার ব্যাপার নিয়ে কারও সাথে কথা বলব না।’ আহমদ মুসা উত্তরে এই সিদ্ধান্তের কারণ জিজ্ঞাসা করেছিল। বেঞ্জামিন বলেছিল, ‘এ ব্যাপারে আমাদের কিছু বলার নেই বলে। কারও কিছু জানার থাকলে পুলিশের কাছ থেকেই জানা উচিত।’ আহমদ মুসা বলল, ‘ধন্যবাদ আমি গত সাতদিনে নিউইয়র্কে সে রকম পুলিশ তালাশ করেছি, যিনি ড. হাইম হাইকেলের সর্ম্পকে কিছু জানেন। কিন্তু এ রকম পুলিশ পাইনি, যে অন্তত; এটুকু বলতে পারে, ড. হাইকেলের লা-পাত্তা হবার তদন্ত শুরু হয়েছে। এ ধরনের তদন্ত শুরু হয়, সংশ্লিষ্ট লোকের ঘর থেকে। কিন্তু আমি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রেসিডেন্টের কাছ থেকে শুনেছি, ঘরটি পুলিশের কেউ এখনও দেখেইনি। তাঁকে যদি অসুস্থ বা অপ্রকৃতিস্থ বলা হয়, তাহলেও এর পটভূমির জন্যে তার ঘরের ও বিশ্ববিদ্যালয়ের অফিসের তার ব্যাক্তিগত জিনিসপত্র ও কাগজপত্রের পরীক্ষা ও বিশ্লেষণ দরকার হয়। পুলিশ তার কিছুই করেনি। তদন্তের জন্যে দায়িত্বপ্রাপ্ত কোন পুলিশ অফিসারই পাইনি। সুতরাং যা জানতে চাই, কাকে জিজ্ঞাসা করব?’ আহমদ মুসার এ দীর্ঘ কথার পর সঙ্গে সঙ্গেই বেঞ্জামিন কিছু বলেনি। বোধ হয় ভাবছিল। একটু পরে বলে ওঠে, ‘আপনি নিউইয়র্কের নিউইয়র্কভীল ডিস্ট্রিক্ট পুলিশ অফিসার এ্যালেন শেফারের কাছে গেছেন? তিনি আপনাকে সাহায্য করতে পারেন।’ শুনেই আহমদ মুসা বলে উঠেছিল, ‘কি নাম বললেন পুলিশ অফিসারের?’ বেঞ্জামিন উত্তরে বলে, ‘এ্যালেন শেফার।’ আহমদ মুসা একটু ভেবে বলেছিল, ‘আমি নিউইয়র্কের নিউইয়র্কভিল ডিস্টিক্টেই রয়েছি। ওখানকার পুলিশ অফিসে আমি খোঁজ-খবর নিয়েছি। ওখানে ১১ জন তদন্তকারী অফিসার আছেন। তার মধ্যে এ্যালেন শেফার নামে কাউকে পাইনি!’ উত্তরে বলেছিল বেঞ্জামিন ‘পাননি! কয়েকদিন আগেই তো আমার সাথে কথা বলে গেল!’ ভ্রুকুঞ্চিত হয়েছিল আহমদ মুসার। একটু ভেবে নিয়ে সে, বলেছিল, ‘নিউইয়র্কের পুলিশ আপনার এখানে এসেছিল? তার নাম এ্যালেন শেফারই ছিল? ঠিক মনে আছে আপনার?’ হাইম বেঞ্জামিন বলল, ‘হ্যাঁ ঠিক আছে।’ একটু ভেবে আহমদ মুসা বলেছিল, ‘আমার অনুরোধ, আপনি সময় করে নিউইয়র্ক পুলিশের ওয়েব সাইটে নিউইয়র্কভিল ডিস্ট্রিক্টের পুলিশের লিস্টটা একটু পরীক্ষা করুন। ওখান থেকে টেলিফোন নাম্বার নিয়ে আপনি টেলিফোনও করতে পারেন।’ আহমদ মুসা থামতেই বেঞ্জামিন বলে উঠল, ‘আমি এখনি দেখছি। মিনিট দশেক পরে আপনার সাথে কথা বলব। স্যরি, এখন রাখছি।’ বলেই সে টেলিফোন রেখে দিয়েছিল। ঠিক দশ মিনিট পর আহমদ মুসা টেলিফোন করার আগে হাইম বেঞ্জামিনই আহমদ মুসাকে টেলিফোন করে। আহমদ মুসা টেলিফোন ধরে হ্যালো বলতেই হাইম বেঞ্জামিন বলতে শুরু করে, ‘স্ট্রেঞ্জ মি. .............।’ ‘আইজ্যাক দানিয়েল।’ বলল আহমদ মুসা। ‘হ্যাঁ মি. দানিয়েল, আমি কম্পিউটারের ওয়েব সাইটে চেক করেছি। নিউইয়র্কভিল ডিস্ট্রিক্ট-এ এ্যালেন শেফার নামে কোন পুলিশ নেই। আমি টেলিফোনও করেছিলাম। ওখানকার পুলিশ অফিস জানাল, ঐ নামের কোন পুলিশ অফিসার এখানে নেই। গত তিন বছরের মধ্যে ছিল না। আমি জিজ্ঞাসা করেছিলাম কোন পুলিশ অফিসার তারা আমাদের বাড়িতে পাঠিয়েছিল কিনা। তারা পাঠায়নি বলেছে। আপনার কথাই ঠিক। তারা আমার আব্বার অন্তর্দ্ধানের তদন্ত বিষয়ে কোন তদন্ত অফিসারই নিয়োগ করেনি এখনও।’ হাইম বেঞ্জামিন থামলেই আহমদ মুসা বলেছিল, ‘মি.হাইম বেঞ্জামিন আপনার সাথে আমার কথা আছে। আসতে পারি?’ একটু চুপ করে থেকে হাইম বেঞ্জামিন বলেছিল, ‘কি বলব মি. দানিয়েল, বুঝতে পারছি না।’ আহমদ মুসা বলল, ‘মি. হাইম বেঞ্জামিন আমাকে বিশ্বাস করার দরকার নেই। আমার কথা আপনি শুনবেন। আমি একাই এসেছি। একাই আপনার সাথে কথা বলব। আমাকে সার্চ করে ঢুকাবে আপনার সিকিউরিটি। আপনি যে কোন কাউকে সঙ্গে রাখতে পারেন।’ অবশেষে সাক্ষাতের সময় দেয় বেঞ্জামিন। কাপড়-চোপড় পরেই আহমদ মুসা বসেছিল। বেঞ্জামিনের বাড়িতে যাবার জন্যে ঠিক সন্ধ্যা ৭ টায় উঠে দাঁড়াল। দরজা খুলল। দরজা খুলে বাইরে মুখ বাড়াতেই একজন লোকের মুখোমুখি হয়ে গেল। লোকটি যুবক বয়সের এবং লাল শ্বেতাংগ। আহমদ মুসার দরজার দিকে তাকিয়ে দাঁড়িয়েছিল। আহমদ মুসার মুখোমুখি হতেই লোকটি চমকে উঠল এবং পেছনে ফিরে করিডোর বরাবর হনহন করে চলতে শুরু করল। আহমদ মুসা তাড়াতাড়ি দরজা বন্ধ করে লোকটির পেছনে হাঁটতে শুরু করল। আহমদ মুসা নিশ্চিত, লোকটি তার ঘরের সন্ধানেই এসেছিল। সামনেই করিডোরের একটা বাঁক। লোকটি বাঁক ঘুরে গেল। আহমদ মুসা দরজা বন্ধ করতে যেয়ে একটু পিছিয়ে পড়েছিল। আহমদ মুসাও বাঁক ঘুরল। কিন্তু বাঁক ঘুরে লোকটিকে আর দেখতে পেল না। লিফট রুম সামনে, কিন্তু বেশ একটু দূরে। এত তাড়াতাড়ি সে লিফটে নেমে যেতে অবশ্যই পারেনি। কিন্তু গেল কোথায়? লোকটি তার মতই কি হেটেলের বাসিন্দা? আহমদ মুসার দরজায় তার ঐভাবে দাঁড়িয়ে থাকাটা কি একটা বোকামি? কিন্তু লোকটির চোখ-মুখ দেখে তা মনে হয়নি। মাথায় এসব ভাবনা নিয়েই আহমদ মুসা লিফটের সামনে গিয়ে দাঁড়াল। এসে গেল লিফটটা। আহমদ মুসা চিন্তাগুলো ঝেড়ে ফেলে লিফটে প্রবেশ করল। মনে মনে বলল, এখন ড. হাইম হাইকেলের পরিবারের সদস্যের সাথে কথা বলাই তার জন্য সবচেয়ে বড় কাজ। অন্যদিকে সে নজর দেবে না। সে নিশ্চিত যে, তার ফিলাডেলাফিয়ায় আসা শত্রুর কাছে ধরা পড়ে গেছে। লোকটি তাদের হওয়াটাই ঘটনার সবচেয়ে সংগত ব্যাখ্যা। আহমদ মুসা হোটেলের সামনে কয়েক ঘন্টার চুক্তিতে একটা ট্যাক্সি ভাড়া করে যাত্রা করল। আহমদ মুসার গাড়ি দেলোয়ার এভেনিউ থেকে ক্যাথেরিন স্ট্রিটে প্রবেশ করে পশ্চিম দিকে এগিয়ে চলল। তারপর পশ্চিম দিকে বাঁক নিয়ে প্রবেশ করল থার্ড স্ট্রিটে। আহমদ মুসার গাড়ি এগিয়ে চলল ঐতিহাসিক ‘সাউথওয়াক’ আবাসিক এলাকার মধ্যে দিয়ে। ষোড়শ শব্দাতীর এ আবাসিক এলাকা। এলাকার বাড়ি ঘরগুলো কাঠামো, ডিজাইন সবই ষোড়শ শতাব্দীর। আধুনিক সংস্কার বাড়িগুলোকে আধুনিক করে তুলেছে। এই আবাসিক এলাকারই একেবারে উত্তর-প্রান্তে ড. হাইম হাইকেলের বাড়ি। আবাসিক এলাকার রাস্তাগুলো প্রশস্ত। বাড়িগুলো অনেক দূরে দূরে। সব বাড়িই চারদিক থেকে বাগানে সুসজ্জিত। এতে এলাকার শোভা বেড়েছে, কিন্তু চারদিকে একটা শুন-সান নির্জনতা নেমে এসেছে। সন্ধ্যা সাতটাতেই মধ্যরাতের নিরবতা-নির্জনতা এসে জুড়ে বসেছে। কচিৎ দুএকটা গাড়ির দেখা পাওয়া যাচ্ছে। আহমদ মুসা একটু আনমনা হয়ে পড়েছিল, অতীতে ফিরে গিয়েছিল তার মন। ভাবছিল, ষোড়শ শতাব্দীর আগে এই ফিলাডেলফিয়ার কোন অস্তিত্ব ছিল না। অস্তিত্ব ছিল না ইউরোপীয় কোন মানুষের। আমেরিকার আদিবাসী ইন্ডিনয়ানদের ‘দিলওয়ার’ জাতি গোষ্ঠি বাস করত এই ফিলাডেলফিয়া অঞ্চলে। ষোড়শ শতাব্দীর একেবারে শুরুর দিকে ইউরোপের ডাচরা প্রথমবারের মত এ অঞ্চলে এল। তারপর ১৬৪০ সালের দিকে ইউরোপের সুইডিশরা দিলওয়ার ইন্ডিয়ানদের এই অঞ্চলে এসে স্থায়ী বসতি গড়ে তুলল। ধীরে ধীরে এই অঞ্চলের উপর ইউরোপের সাম্রাজবাদী লোভাতুর দৃষ্টি তীব্র হয়ে উঠল। শুরু হলো এ এলাকার দখল নিয়ে ডাচ, সুইডিশ ও ইংরেজদের মধ্যে ঘোরতর লড়াই। এলাকার আসল মালিক সহজ, সরল দিলওয়ার ইন্ডিয়ানদের ঘরছাড়া করে আগেই হটিয়ে দেয়া হয়েছিল। দখলের লড়াই-এ অবশেষে জিতে যায় বৃটেন। আমেরিকা হয়ে দাঁড়ায় বৃটেনের উপনিবেশ। তারপর......।’ আহমদ মুসার চিন্তা আর এগুতে পারল না। ড্রাইভারের কথায় আহমদ মুসার চিন্তায় ছেদ নেমে এল। ড্রাইভার বলেছিল, ‘স্যার আপনার সাথে আর কেউ আসছে?’ ‘না তো! কেন বলছ এ কথা?’ জিজ্ঞেস করল আহমদ মুসা। ‘স্যার, ক্যাথেরিন স্ট্রিট থেকে একটা গাড়ি আমাদের পিছে পিছে আসছে। কিছুক্ষণ আগ পর্যন্ত আমাদের সমান স্পীডে এসেছে। এখন স্পিড বাড়িয়ে নিকটবর্তী হচ্ছে।’ বলল ড্রাইভার। আহমদ মুসা পেছনে তাকাল। দেখতে পেল একটা গাড়ির হেডলাইড। আহমদ মুসা খুশি হলো ড্রাইভারের উপরে। বলল, ‘ধন্যবাদ ড্রাইভার তোমার সর্তক দৃষ্টির জন্যে। তুমি যে গতিতে গাড়ি চালাচ্ছ, সেই গতি অব্যাহত রাখ! সত্যিই অনুসরণ করে থাকলে দেখা যাক ওরা কারা! পুলিশ তো নয় দেখাই যাচ্ছে।’ ‘জি স্যার, পুলিশ নয়।’ বলল ড্রাইভার। আহমদ মুসা পেছন থেকে দৃষ্টিটা ফিরিয়ে আনল ড্রাইভারের দিকে। বলল, ‘ড্রাইভার, তোমার ইংলিশ উচ্চারণ শুনে মনে হচ্ছে, ‘আরবের কোন দেশে তোমার বাড়ি। ‘জি স্যার আমি জর্দানী।’ বলল ড্রাইভার। ‘কতদিন তোমরা আছ?’ জিজ্ঞাসা আহমদ মুসার। ‘স্যার, বহুদিন। মাঝখানে টুইন টাওয়ারের ঘটনার পর আমার আব্বা আমাদের পরিবারের সবাইকে নিয়ে দেশে ফিরে গিয়েছিলন। দেশে গিয়ে আব্বা মারা যান। এখন অবস্থা আগের চেয়ে ভালো বলে এক বছর আগে আমি ফিলাডেলফিয়ায় ফেরত এসেছি।’ বলল ড্রাইভার। অবস্থা এখন ভালো মনে করছ?’ আহমদ মুসা বলল। ‘জি স্যার। এই সরকারের আগের সরকারের আমল থেকেই অবস্থা ভাল হযেছে। তবে গত এক বছর হলো পরিস্থিতি একেবারে পাল্টে গেছে। স্যার, এজন্য আমরা আমেরিকার মুসলমানসহ দুনিয়ার সব মুসলমান আহমদ মুসার প্রতি কৃতজ্ঞ। তিনি মার্কিন সরকার ও মার্কিন জনগণের চোখ খুলে দিয়েছেন। মার্কিনীদের কাছে আমাদের সম্মান রাতারাতি একেবারে যেন আকাশচুম্বি হয়ে উঠেছে। তারা এখন মুসলমাদেরকেই প্রকৃত বন্ধু মনে করে।’ উৎসাহের সাথে আবেগ-ঘন কন্ঠে বলল ড্রাইভার। ‘ভাল খবর শুনালে ড্রাইভার। কিন্তু মার্কিনীরা শুধু তোমাদেরকেই ভালবাসে, না তোমাদের ধর্মকেও ভালবাসে, তোমাদের সংস্কার-সংস্কৃতিকেও ভালোবাসে?’ আহমদ মুসা বলল। ‘ভাল কথা মনে করে দিয়েছেন স্যার। এমন প্রশ্ন কেউ কখনও জিজ্ঞাসাই করে না। অথচ অকল্পনীয় সব ঘটনা ঘটেছে এ ক্ষেত্রেই। আপনি ফিলাডেলফিয়ার মুসলিম ‘সানডে’ স্কুলগুলিতে গিয়ে দেখুন স্কুলের দুই তৃতীয়াংশ ছেলেমেয়েই আমেরিকান খৃষ্টান পরিবারের। মুসলিম স্কুলগুলোতে নৈতিক শিক্ষা ভাল হয়, ভাল অভ্যাস গড়ে ওঠে বলে খৃষ্টান পরিবারও এখানে তাদের ছেলেমেয়ে পাঠায়।’ ড্রাইভার বলল। ‘কতগুলো ‘সানডে স্কুল’ আছে তোমাদের?’ জিজ্ঞেস করল আহমদ মুসা। ‘শহরে দশটি মসজিদ আছে। দশটি মসজিদেই ‘সানডে স্কুল’ আছে। এছাড়া আরও দশ বারটা মুসলিম ‘সানডে স্কুল’ গড়ে উঠেছে শহরের বিভিন্ন জায়গায়।’ বলল ড্রাইভার। ‘আমেরিকানরা কি ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করছে?’ আহমদ মুসা বলল। বহু স্যার। প্রতি সপ্তাহে ফিলাডেলফিয়ার প্রত্যেক মসজিদে জুমুআর নামাজের পর চার পাঁচজন করে ইসলাম ধর্ম গ্রহণের ঘটনা ঘটেছে। স্যার, এই সপ্তাহে আমাদের মসজিদে ছয়জন ইসলাম গ্রহণ করেছে। তার মধ্যে স্থানীয় খৃষ্টান চার্চের ফাদার ও একজন প্রফেসর ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেছে। খৃষ্টান চার্চটা ছয় মাস আগে বন্ধ হয়ে যায় কোন প্রার্থনাকারী যায় না বলে।’ থামল ড্রাইভার। একটা দম নিল। তারপর আবার বলে উঠল, ‘স্যার কি মুসলমান? এশিয়ান তো বুঝতেই পেরেছি।’ আহমদ মুসা কিছু বলতে যাচ্ছিল। কিন্তু তার আগে ড্রাইভার আঁৎকে উঠার মত শব্দ করে চাপা কন্ঠে বলে উঠল, ‘স্যার রং সাইড নিয়ে সামনে থেকে একটা গাড়ি আমাদের দিকে ছুটে আসছে।’ আহমদ মুসা পেছনে তাকিয়েছিল। সেদিক থেকে চোখ ফিরিয়ে নিয়ে তাকাল সামনে। দেখল, ড্রাইভারের কথা ঠিক। আহমদ মুসাদের গাড়ির পথ রোধ করে গজ পাঁচেক সামনে একটা গাড়ি দাঁড়িয়ে পড়েছে। আহমদ মুসাদের গাড়িকেও ড্রাইভার থামিয়ে দিয়েছিল। পেছনের গাড়িটাও পেছনে এসে দাঁড়িয়ে গেছে। ‘স্যার কি করব? আমরা পাশ কাটাতে চাইলে ওরা নির্ঘাত গুলী করবে।’ গাড়ি থামিয়েই বলে উঠল ড্রাইভার। ‘তুমি ঠিক সিন্ধান্ত নিয়েছ ড্রাইভার। দেখা যাক ওরা কে, কি চায়।’ বলল আহমদ মুসা। থামার পরেই আগে পিছের দুগাড়ি থেকে চারজন দ্রুত নেমে এল। ছুটল তারা আহমদ মুসার গাড়ির দিকে। ‘ড্রাইভার গাড়ির জানালার কাঁচগুলো নামিয়ে ফেল। বন্ধ থাকলে ওরা ভেঙে ফেলতে পারে।’ বলল দ্রুতকন্ঠে আহমদ মুসা। ‘কিন্তু স্যার..................।’ কিছু বলতে গিয়ে থেমে গেল ড্রাইভার। বোধ হয় আহমদ মুসার নির্দেশের প্রতিবাদ করতে গিয়েছিল। কিন্তু কি মনে করে থেমে গিয়ে সুইচ টিপে সব জানালার কাঁচ খুলে দিল। ছুটে আসা ওরা চারজন দুজন করে আহমদ মুসার দুপাশের জানালায় এসে দাঁড়াল। তাদের প্রত্যেকের হাতে রিভলবার। দু’পাশের জানালা থেকে দুজন আহমদ মুসাকে উদ্দেশ্য করে বলে উঠল, ‘বেরিয়ে আসুন। এক মুহূর্ত দেরি করলে গুলী করব’। ‘দুদিক থেকেই বলছ, তোমরাই বল কোন দরজা দিয়ে বের হবো।’ শান্ত স্বাভাবিক কন্ঠে বলল আহমদ মুসা। গাড়ি দাঁড়িয়েছিল রাস্তার অনেকটা বাম প্রান্ত ঘেঁষে। ডানেই প্রশস্ত মূল রাস্তাটা। ডান দিকের দুজনের মধ্যে একজন রিভলবার নাচিয়ে বলল, ‘এদিক দিয়ে নাম।’ বলেই সে দক্ষিণ দিকের দুজনকে লক্ষ্য করে বলল, ‘তোমরা এদিক এস।’ সঙ্গে সঙ্গেই বাম পাশের দুজন দৌড় দিয়ে ডান পাশে চলে এল। ‘ড্রাইভার দরজার কী আনলক করেছ?’ ধীরে সুস্থে বলল আহমদ মুসা। ওদের চারজনের মধ্যে দরজার সামনে দাঁড়িয়েছে দুজন এবং দরজার পিছন দিকে দাঁড়িয়েছে দুজন। দরজার পাল্লা খুলে সামনের দিকে যাবে বলে ওদিকে কেউ নেই। আহমদ মুসা ড্রাইভারকে দরজা খোলার কথা বলার সাথে সাথে ক্লিক শব্দ করে দরজা খুলে গেল। আহমদ মুসা দরজার দিকে ঘুরে বসে এগুলো দরজার দিকে। হঠাৎ ওদের একজন চিৎকার করে উঠল, ‘দাঁড়াও।’ আহমদ মুসা থেমে গেল। রিভলবার বাগিয়ে রেখেই সামনে থেকে একজন ছুটে এসে বলল, ‘তোমার কাছে রিভলবার আছে, ওটা দিয়ে দাও।’ ‘তোমাদের চারজনের কাছে চার রিভলবার, এরপরও আমার এক রিভলবারের ভয় করছ।’ বিদ্রূপাত্মক হাসির সাথে একথাগুলো বলতে বলতে আহমদ মুসা পকেট থেকে রিভলবারটা বের করে ওদের দিয়ে দিল। রিভলবার হাতে নিয়ে লোকটা একটু পেছনে হটে আগের জায়গায় গিয়ে দাঁড়াল। সে যখন পেছনে হটছিল, তখন আহমদ মুসা দরজার দিকে এগুলো। দরজায় পৌঁছে পা দুটো দরজার প্রান্তে নিয়ে বাম হাত দিয়ে দরজা খুলে জোরে সামনের দিকে ঠেলে দিল। তার পরেই সে দুপায়ের উপর ভর দিয়ে দুহাত সামনে নিয়ে মাথাকে কিছুটা নিম্নমুখী করে বাইরে ড্রাইভ দিল। দুহাত তার মাটি স্পর্শ করার সাথে সাথে পা দুটি তার বিদ্যুত বেগে অর্দ্ধচন্দ্রাকারে ঘুরে গিয়ে সামনে পাশাপাশি দাঁড়ানো দুজনের বুকে আঘাত করল। ছিটকে মাটিতে পড়ে গেল ওরা। আহমদ মুসার পা দুটো ঘুরে গিয়ে মাটি স্পর্শ করতেই দুপায়ের দুমোজায় আটকানো রিভলবার বের করে নিয়ে ডান হাতের রিভলবার দিয়ে তাক করল গাড়ির দরজার পাশে দাঁড়ানো দুজনকে। তাদের একজনের কানের পাশ দিয়ে একটা ফাঁকা গুলী করে বলল, রিভলবার ফেলে দাও, না হলে পরের দুই গুলী দুজনের মাথায় ভরে দেব।’ আকস্মিক এই ঘটনায় তারা বিমূঢ় হয়ে পড়েছিল। রিভলবার সমেত হাত তাদের নিচে ঝুলে পড়েছিল। কানের পাশ দিয়ে ফাঁকা গুলীটাও ম্যাজিকের মত কাজ করল। তারা তাদের হাতের রিভলবার একটু সামনে ছুড়ে ফেলে দিল। ওদিকে মাটিতে ছিটকে পড়া দুজন উঠে তাদের হাত থেকে ছিটকে পড়া রিভলবার হাত করার জন্য এগুচ্ছিল। আহমদ মুসার বাম হাতের রিভলবার তাদের দিকে তাক করা ছিল। আহমদ মুসা ওদের নির্দেশ দিল, আর এক ইঞ্চি এগুবে না। দুজনকেই লাশ বানিয়ে দেব। ওরা দুজনেই থমকে গেল। আহমদ মুসা এবার দুদিকে রিভলবার তাক করে রেখে পা দিয়ে রিভলবার চারটিকে এক জায়গায় নিল। তারপর ওদের চারজনকেই নির্দেশ দিল ওদের পেছনের গাড়িটার পাশে এসে উপুড় হয়ে শুয়ে পড়তে। যন্ত্রের মতই ওরা নির্দেশ পালন করল। আহমদ মুসা পকেট থেকে ক্ষুদ্র একটা ক্লোরোফরম স্প্রেয়ার বের করে ওদের নাকে স্প্রে করল। তারপর কয়েক সেকেন্ড অপেক্ষার পর ওদের সংজ্ঞাহীন দেহ ওদের গাড়িতে তুলে স্টাটার থেকে চাবিটি খুলে নিয়ে গাড়ির সব জানালা-দরজা বন্ধ করে লক করে দিল। তারপর গাড়িটাকে একটা গাছের অন্ধকারে ঠেলে দিল। আহমদ মুসার ড্রাইভার বেরিয়ে মূর্তির মত দাঁড়িয়ে সবকিছু দেখছিল। তার চোখে বোবা বিস্ময়। আহমদ মুসা তার দিকে চেয়ে বলল, ‘ড্রাইভার ঐ গাড়িটাকেও রাস্তার বাইরে ঠেলে দাও। পারবে।’ ‘ইয়েস স্যার। বলে ড্রাইভার তখনি গাড়িটা রাস্তার বাইরে ঠেলে দিল।’ আহমদ মুসা ওদের গাড়ি লক করার আগে ওদের চারটি রিভলবারও ওদের গাড়িতে রেখে দিয়েছিল। কিন্তু গুলী বের করে নিয়েছিল। আহমদ মুসা এসে গাড়িতে উঠে বসল। ড্রাইভার এসে তার সিটে বসতেই আহমদ মুসা বলল, ‘একটু দেরি হয়ে গেল ড্রাইভার, ওখানে ঠিক সময় পৌঁছাতে পারলাম না। দেখ জোরে চালিয়ে পুশিয়ে নিতে পার কিনা!’ ড্রাইভারের মুখ হা হয়ে গেছে বিস্ময়ে। বলল, ‘স্যার আপনি দেরি হওযার জন্যে চিন্তা করছেন, কিন্তু এদিকে তো আপনি প্রাণে বেঁচে গেলেন। এই অবস্থায় আপনি প্রোগ্রাম বাতিলও করতে পারেন।’ ‘আমি যদি প্রোগ্রাম বাতিল করি, তাহলে যারা আমাকে বাধা দিতে এসেছিল তারা জিতে যায়, উদ্দেশ্য তাদের সফল হয়।’ আহমদ মুসা বলল। ‘বুঝেছি স্যার। কিন্তু গোয়েন্দারা আপনাকে বাধা দিতে এসেছিল কেন?’ বলল ড্রাইভার। ‘কাদের গোয়েন্দা বলছ? ওদের? কেমন করে বুঝলে ওরা গোয়েন্দা?’ জিজ্ঞাসা আহমদ মুসার। ‘আমাদের গোয়েন্দারা সাধারণত সাদা সার্টের সাথে কালো জুতা, কালো মোজা, কালো প্যান্ট এবং কালো হ্যাট পরে থাকে। আর কোন অফিসিয়াল অপারেশনে গেলে চার জনের টীম গিয়ে থাকে।’ বলল ড্রাইভার। ‘কিন্তু ড্রাইভার, ওরা গোয়েন্দা নয়। ওরা গোয়েন্দাদের ছদ্মবেশ পরেছে।’ আহমদ মুসা বলল। ‘কেমন করে আপনি এতটা নিশ্চিত কথা বলছেন?’ ড্রাইভার বলল। ‘মার্কিন গোয়েন্দা ও পুলিশরা যে রিভলবার ও অস্ত্র ব্যবহার করে থাকে তাতে একটা বিশেষ মার্কিং থাকে, এদের চারজনের রিভলবারে তা ছিল না। তবে বুট কালো বটে, কিন্তু বুটের কন্ডিশন পুলিশের মত নয়।’ বলল আহমদ মুসা। ‘আল-হামদুলিল্লাহ, আপনি মারামারির মধ্যে এত কিছু খেয়াল করেছেন। আমি এই বৈশিষ্টের বিষয়ে জানিই না।’ বলে ড্রাইভার তাকাল আহমদ মুসার দিকে পেছনে ফিরে। বলল, ‘স্যার, সিনেমার আমি একজন আগ্রহী দর্শক। ফাইটিং যেভাবে শুরু হলো এবং শেষ হলো, তেমন দৃশ্য আমি কখনও দেখিনি।’ বলেই একটু থেমেই সে আবার শুরু করল, ‘স্যার আপনার পরিচয় জিজ্ঞাসা করার অধিকার আমার নেই। আমার মাত্র একটি জিজ্ঞাসা। আমি বুঝতে পারছি, এশিয়া বা উত্তর আফ্রিকার কোন দেশে আপনার বাড়ি। আপনি মুসলিম কিনা?’ ‘এটা জানার আগ্রহ কেন?’ জিজ্ঞাসা আহমদ মুসার। ‘আমার জীবনে এটা একটা অবিস্মরণীয় ঘটনাতো! ঘটনার নায়ক মুসলিম হলে গর্বের সাথে মানুষের কাছে গল্প করতে পারব। এ রকম সাহস ও বীরত্ব তো আমরা বহুদিন আগে হারিয়ে ফেলেছি!’ শেষ দিকে তার আবেগে কন্ঠ ভেঙে পড়ল। ড্রাইভারের নিখাদ আবেগ আহমদ মুসাকেও স্পর্শ করল। আনমনা হয়ে পড়ল সেও। হঠাৎ করে তার সামনে যেন দুঃখ-বেদনা, লাঞ্ছনা-আপমানের কালো মেঘে ঢাকা এক দিগন্ত ভেসে উঠল। সে এক দীর্ঘ কালো রাত। রাজনৈতিক পরাধীনতা, সাংস্কৃতিক আধিপত্য, জ্ঞানের দেউলিয়াপানা মুসলমানদের চারদিক থেকে নিষ্পিষ্ট করেছে। তাদের অসহায় আর্তনাদ আকাশকে ভারী করেছে। সৃষ্টি হয়েছে কান্নার সমুদ্র। বহু বছরের দাসত্বে ভীরুতা-কাপুরুষতা হয়ে পড়েছিল তাদের চরিত্র-বৈশিষ্ঠ্য। ড্রাইভারের আবেগ রুদ্ধ কন্ঠ এই দুর্ভাগ্যের দিকেই ইংগিত করেছে। আহমদ মুসারও দুচোখের কোণ ভারী হয়ে উঠেছিল। একটা নিরবতা নেমে এসেছিল। নিরবতা ভাঙল আহমদ মুসা। বলল, ‘ড্রাইভার, আহমদ মুসা এই আমেরিকাতেই ইতিহাস সৃষ্টি করেছে, তুমিই তো বললে। তোমাদের অবস্থাও তিনি পাল্টে দিয়েছেন। তাকে নিয়ে তো গর্ব করতে পার।’ ‘স্যার, তিনি তো জাতির গর্বের ধন। তার স্থান সবার মাথার উপরে, আকাশে। তাকে দেখার সৌভাগ্যও কোনদিন আমার হবে না। তাকে নিয়ে গর্ব করার মত কোন গল্প নেই। আজ যে গল্প সৃষ্টি হয়েছে, তা আমার জন্যে এক গর্বের কাহিনী।’ বলল ড্রাইভার। ‘হ্যাঁ ড্রাইভার, আমি তোমার এক ভাই।’ আল-হামদুলিল্লাহ, আল-হামদুলিল্লাহ। তাহলে অনেক আহমদ মুসা তৈরি হয়েছে। তার সাথে এসেছে এক উর্বর পরিবেশও আমাদের আমেরিকায়। আল-হামদুলিল্লাহ।’ আবেগ জড়িত কন্ঠে বলল ড্রাইভার। গাড়ি হাইম হাইকেলের বাড়ি ক্রস করে চলে যাচ্ছিল। ‘ড্রাইভার গাড়ি থামাও। আমরা এসে গেছি।’ বলে আহমদ মুসা হাইম হাইকেলের বাড়ি দেখিয়ে দিল। ‘স্যরি’ বলে ড্রাইভার গাড়ি পিছিয়ে নিল। তারপর থার্ড স্ট্রিট থেকে নেমে প্রবেশ করল লাল পাথরে বাঁধানো প্রাইভেট রোডে। এগিয়ে চলল গাড়ি হাইম হাইকেলের গেটের দিকে।


এডিট ডিলিট প্রিন্ট করুন  অভিযোগ করুন     

গল্পটি পড়েছেন ২১১৪৬ জন


এ জাতীয় গল্প

→ ধ্বংস টাওয়ার চ্যাপ্টার-১ বাকি অংশ
→ ধ্বংস টাওয়ার চ্যাপ্টার- ৩ বাকি অংশ
→ ধ্বংস টাওয়ার চ্যাপ্টার- ৪ বাকি অংশ
→ ধ্বংস টাওয়ার চ্যাপ্টার- ৫ বাকি অংশ

গল্পটির রেটিং দিনঃ-

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now