বাংলা গল্প পড়ার অন্যতম ওয়েবসাইট - গল্প পড়ুন এবং গল্প বলুন
বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ

নাগরিক দাম্পত্য-১০

"উপন্যাস" বিভাগে গল্পটি দিয়েছেন গল্পের ঝুরিয়ান রিয়েন সরকার (০ পয়েন্ট)

X . প্রায়ই, রাতে, ঝগড়া বাঁধবে দু’জনের মধ্যে। কারণে, কিংবা অকারণে। তারপর ও এ-র সাথে কথা বলবে না, এ-ও ও-র সাথে কথা বলবে না। রাগ-অভিমানে সুশান এবং নীহা— দু’জনেই হয়ে যাবে সমানে সমান। তালাবন্ধ মুখ। সেই রাতে খাওয়াও হবে না কারো। তাড়াতাড়ি আলো-টালো বন্ধ করে শুয়ে পড়বে দু’জনেই। এবং কেউ কারো দিকে ফিরে শোবে না। শোবে দু’জন দু’দিকে ফিরে— সুশান উত্তর দিকে হলে নীহা দক্ষিণ দিক, নীহা উত্তর দিকে হলে সুশান দক্ষিণ দিক। এবং সকালবেলা বেশ তাড়াতাড়িই উঠবে সুশান। নীহা ঘুমে থাকবে তখনো। তারপর সুশান যা করবে, তা হলো— অফিসের সময় হতে অনেক বাকি থাকলেও গুছিয়ে-টুছিয়ে নিয়ে ব্যাগটা কাঁধে ঝুলিয়ে অফিসের উদ্দেশ্যেই রওনা করবে। নীহাকে ডাকবে-টাকবে না— শুধু বাইরে বেরিয়ে একটা ম্যাসেজ চালান করে দেবে নীহার মোবাইল ফোনে। সুতরাং আজও তাই। বাসা থেকে বেরিয়ে রাস্তায় উঠেই একটা রিকশা ডেকে উঠে পড়লো সুশান। তারপর পকেট থেকে মোবাইলটা বের করে সামনে এনে ম্যাসেজ টাইপ করতে ব্যস্ত হয়ে পড়লো। “ঠিক আছে, তুমি থাকো তোমার রাগ-অভিমান নিয়ে। আমি অফিস গেলাম। কাল রাতে একবার কিছু খাই নি, সকালেও কিছু খাওয়া হলো না। লাঞ্চ-আওয়ারেও আসবো না। কার কাছে আসবো— আসার পর যে আমার চারপাশ দিয়ে ঘুরঘুর করবে, অথচ আমার কাছে ঘেঁষবে না, শার্টের বোতামটা পর্যন্ত খুলে দেবে না, আমার সাথে একটা কথাও বলবে না পর্যন্ত, তার কাছে? ঠিক আছে, আমি তাহলে গেলাম। তুমি সময়মতো ব্রেকফাস্ট, লাঞ্চ— সব করে নিয়ো। আমি গেলাম।” . . রাতে ঘুমোনোর আগে যে রাগের জন্ম, সকালে ঘুমজেগে সে রাগ হাওয়া হয়ে যাওয়াটাই স্বাভাবিক। কিন্তু নীহা অস্বাভাবিক। বরাবরের মতো সুশানের ম্যাসেজটা দেখে তার রাগটা আরো চড়ে গেলো। সে নাস্তা-টাস্তা কিছু তৈরি করলো না, খেলো না কিছুই। এইভাবে সকাল গিয়ে দুপুর ছুঁ’লো। দুপুরে রান্না করলো, কিন্তু খাবার মুখে তুলতে পারলো না। অন্যগুলো দিন দুপুরে সুশান খেতে বাসায় আসে, আজ সে আসবে না। গত রাতে, আজ সকালে, এখনো, সুশান কিছু খায় নি, এমনকি রাতে বাসায় ফেরার আগ পর্যন্ত কিছু খাবে না— নীহা জানে। যে মানুষটা তার জন্য এতোকিছু করে, তাকে অভুক্ত রেখে নীহা খাবে কী করে? মানুষটাকে কি একবার একটা ফোন করা যায়? ফোন করে বলা যায়— সু, খেতে এসো? কিন্তু সুশানের সাথে তো তার রাগ। সে কেনো আগ বাড়িয়ে রাগ মিটোবে? দোষ তো তার না। দোষ তো সুশানের। তাও একটা দোষ না, অনেকগুলো দোষ। * প্রতিদিন তো নীহা বলে না যে, সুশান, মশারীটা টাঙাও। নিয়মিতই তো কাজটা নীহাই করে। কিন্তু কোনো কোনো দিন যদি সুশানকে কাজটা করতে বলা হয়। সুশান করে না। কালও তাই। আচ্ছা, মাঝেসাঝে দু’-একদিন মশারীটা টাঙালে কি হাত পঁচে যায়? * সুশান মশারী টাঙালো না— ভালো কথা। তা নিয়ে একটু রাগারাগি হয়েছে— সেও ভালো কথা। কিন্তু সেই রাগে না খেয়ে শুয়ে পড়তে হবে? সে জানে না— রাতে খাবার পরও মধ্যরাতে এমনিতেই খিদে পায় নীহার? সেইখানে না খেয়ে রাত কাটাতে নীহার কতোটা কষ্ট হবে— তার জ্ঞান করা উচিত ছিলো না? * সব মেনে নেয়া গেলো। কিন্তু ভোরে যখন সে ঘুম থেকে উঠেছে, তখন কি সে নীহাকে একটু ডাকতে পারতো না? সবকিছু ভুলে গিয়ে কি বলতে পারতো না— নী, নাস্তা রেডি করো? বললে কি নীহা তা না করে থাকতে পারতো? . একনাগাড়ে ডায়াল করেই চলেছে নীহা— সুশান ধরছে না ফোন। একসময় সে বিরক্ত হয়ে চুপ করে গেলো। পরপরই মনে হলো সুশানের দোষগুলো কারো কাছে নালিশ করা যেতো, যে তাকে কড়া করে ধমক দিয়ে শাসাবে। হ্যাঁ, বাবা— একমাত্র নীহার বাবাই তার পক্ষ নিয়ে সুশানকে ধমকা-ধমকি করতে পারবেন। আর কেউ না— মাও না। একমাত্র বাবাকেই এই মুহূর্তে ঝট করে একটা ফোন লাগানো যায়— ‘হ্যালো, আব্বু!’ সামান্য ‘হ্যালো’ শুনেই বাবা সবকিছু বুঝে যাবেন মেয়ের। সঙ্গে সঙ্গে উদগ্রীব হয়ে উঠবেন। ব্যস্তকণ্ঠে বলবেন— ‘কী রে, মা— কী হয়েছে? মন খারাপ কেনো তোর? গলাটা এমন শুকনা শুকনা লাগছে কেনো— খাওয়া-দাওয়া করিস নি এখনো?’ সাথে সাথে বরাবরের মতোই নীহা আহ্লাদে বাবার সেই ছোট্ট মেয়েটা হয়ে উঠবে। মেঘস্বরে বলবে— ‘আব্বু, তুমি আমাকে এক্ষুণি নিয়ে যাও। এখানে আমি আর এমুহূর্তও থাকবো না। তুমি আমাকে এক্ষুণি নিয়ে যাও।’ ‘কেনো রে, মা? কী হয়েছে? জামাই বাবাজীর সাথে ঝগড়া করেছিস বুঝি?’ ‘হ্যাঁ, ঝগড়া করেছি। কিন্তু আমার কোনো দোষ নেই।’ ‘কী নিয়ে ঝগড়া করেছিস? আমাকে বল, মা— আমি ওকে বকে দেবো। বল।’ ‘তুমি এক্ষুণি ওকে ফোন দিবা, দিয়ে কড়া করে বকে দিবা।’ ‘আচ্ছা আচ্ছা, মা। আমি ওকে এক্ষণি ফোন দেবো, দিয়ে কড়া করে বকে দেবো। ওর এতো বড়ো সাহস— আমার লক্ষ্মী মেয়েটার সাথে ঝগড়া করে!’ পরপরই মত পাল্টে নীহা বলবে— ‘না, থাক— তোমাকে কিছু করতে হবে না। তোমাকে বকতে হবে না। তুমি জাস্ট আমাকে নিয়ে যাও। আমি আর একমুহূর্তও এখানে থাকবো না।’ ‘ও আবার জামাই বাবাজীর সাথে ঝগড়া করেছে? দাও তো, ফোনটা দাও তো…’ বলতে বলতে কোথাও থেকে এসে হাজির হবেন মা। ফোনের এপাশ থেকে নীহা স্পষ্ট শুনতে পাবে মায়ের কণ্ঠ। মা একদম ভালো না। তিনি এই জীবনে মেয়ের পক্ষ নিয়ে কোথাও কোনো কথা বলেন নি। মেয়ের দোষ না থাকলেও খুঁজে খুঁজে দোষ বের করে বকাঝকা করেছেন। যেনো তার মেয়ে ছাড়া দুনিয়ায় আর কেউ কোনো দোষ করে না। সবাই নির্দোষ। সবাই ফেরেশতা। ফোন ধরে মা শাসানো কণ্ঠে বলবেন— ‘এই, দুইদিন অন্তর অন্তর ঝগড়া করিস কেনো ছেলেটার সাথে? দুইদিন অন্তর অন্তর ঝগড়া করে ওকে কষ্ট দিস কেনো এতো? হা? কতো সুন্দর সোনার টুকরো একটা ছেলে!’ তৎক্ষণাৎই মেজাজ গরম হয়ে উঠবে নীহার। একটু আগের আহ্লাদি কণ্ঠটা সঙ্গে সঙ্গে মেজাজি হয়ে বলবে— “‘সোনার টুকরো’ বলছো কেনো? এ তো কম হয়ে গেলো। বলো— ‘হিরের টুকরো’।” ‘হ্যাঁ, তাই-ই— সোনার টুকরো না— হিরের টুকরো। আমারই বলতে ভুল হয়েছে। আমাদের সুশান হিরের টুকরো। হিরের টুকরো ছেলে। তোর মতো মেয়েকে পেটে না ধরে আমি ওর মতো ছেলেকে পেটে ধরলেই ভালো করতাম।’ ‘হিরের টুকরো না কচুর টুকরো! চুলকোনো কচু। খেলে গাল তিড়বিড় করে। গাল চুলকোয়।’ মেয়ের জামাইয়ের বদনামে মা আরো রেগে উঠবেন। তিনি একটু পাগলাটে গোছের। উত্তেজিত হয়ে উঠলেই সেটা প্রকাশ পায়। তখন কোথায় কাকে কখন কী বলতে হয়, কী বলতে হয় না— ভুলে যান তা বেমালুম। এই সময় তিনি বলবেন— ‘দাঁড়া, আরেকটা ছেলের সাথে তোকে বিয়ে দিয়ে দেবো, তবেই বুঝবি— আমার জামাই বাবাজী হিরের টুকরো, না কচুর টুকরো। দেখিস, সেই ছেলেটা কতো বাজে হয়।’ . মায়ের পাগলাটে কথাগুলো কল্পনায় আসতেই হাসি পেয়ে গেলো নীহার। নীরবে সে হাসতে থাকলো বসে বসে। এবং হাসতে হাসতে তার সে হাসি ম্লানও হয়ে এলো একসময়। থাক, সুশানকে কারো শাসন করতে হবে না। সুশানের বদনাম করায় নীহাকে কারো বকাঝকা করতে হবে না। নীহার কেউ নেই। বাবা নেই। মা নেই। কেউ নেই। আজ, বাবা মা কেউ থাকলে, এতো এতো দিন পেরিয়ে গেছে, এতোগুলো দিন পুরোনো হয়ে গেছে— এতোদিনে ফোন দিয়ে হলেও কেউ একবার অন্তত জিজ্ঞেস করতেন— মা, তোরা কেমন আছিস? ভালো আছিস তো? বাবার কথা মায়ের কথা বাড়ির কথা ভাবতে ভাবতে যখন মনটা বিষাদে ভরে উঠছিলো নীহার, ঠিক তখনই একটা ম্যাসেজ এলো, সুশানের ম্যাসেজ। সে লিখেছে— “কাজের চাপ আছে। তাই আসতে পারবো না। আমি বাইরে খেয়ে নেবো। আর তুমি সকালেরটা আর দুপুরেরটা একসাথে খাবে। যদি না খেয়ে অসুস্থ হও, তাহলে কিন্তু সমস্যা আছে। মোটেও না খেয়ে থাকা হয় না যেনো। মোটেও না। খবরদার!” . ম্যাসেজটা পাবার পর থেকে কী এক সুখে বুকটা ভরে গেছে নীহার। খাওয়া, না খাওয়া— পরের বিষয়। তার আগের বিষয়— এখন সেও একটা ম্যাসেজ লিখবে, সুশানকে। ম্যাসেজটা অনেক বড়ো হবে। কিন্তু ম্যাসেজের কথা থাকবে একটাই— “I love you.” কথাটা কতোবার লেখা যায়— ১০ বার? ২০ বার? না, জোড় সংখ্যকবার হওয়া যাবে না— হতে হবে বিজোড় সংখ্যকবার। দোয়া-দরুদ যেমন বিজোড় সংখ্যকবার পড়তে হয়— কথাটাও বিজোড় সংখ্যকবার লিখতে হবে। দোয়া-দরুদের মতো। বিজোড় সংখ্যাগুলো হয়তো ভালো— শুভ। জোড় সংখ্যাগুলো অশুভ। সুশানকে যা কিছু সে দেবে, জীবনে— সবকিছুর ভেতর শুভ ব্যাপারটা থাকতে হবে। কোনো অশুভ থাকা চলবে না। আর ১০-২০-বারের মতো এতো কম হলেও হবে না— আরো বেশি হতে হবে। তাহলে ৪৭ বার? না, ৪৭ খুব একটা বেশি না। ৬৩? এটা একটু বেশি, কিন্তু ততোটা বেশি না। ৯১? ৯১ বার একদমই কম না। এই কয়বার “I love you” ম্যাসেজে লিখলে সে ম্যাসেজ অনেক বড়োই হবে। কিন্তু একশ’র নিচে লেখা কি ঠিক হবে? তাহলে? তাহলে? ১০১? হ্যাঁ, ১০১। দারুণ হবে! সেই কবিতাটার মতো হবে— একশ’ একটা নীলপদ্মের মতো একশ’ একটা “I love you!” কার যেনো কবিতাটা? কী যেনো কবিতাটা? “ভালোবাসার জন্য আমি হাতের মুঠোয়ে প্রাণ নিয়েছি, দুরন্ত ষাড়ের চোখে বেঁধেছি লালকাপড়, বিশ্বসংসার তন্ন তন্ন করে খুঁজে এনেছি ১০১টা নীলপদ্ম…” আচ্ছা, ১০১টা, না ১০৮টা— সেই কবিতায় কয়টা নীলপদ্মের কথা বলা আছে? আপাতত মনে পড়ছে না নীহার। না পড়ুক গে, ১০১ হোক ‘৮ হোক, যা হয়, হোক গে— এখন সে ম্যাসেজ লিখতে বসবে। আর কিচ্ছু না। আর কিচ্ছু না। . মোবাইল ফোনের New message বক্সটা ওপেন করে নীহা লিখতে বসেছে। “I love you” কথাটা একবার লিখেই তার মনে হলো আর না লিখে কথাটা Copy করে আরো একশ’বার Pest করে দিলেই তো মিটে যায়, নিমেষে ১০১ বার হয়ে যায়। পরপরই বুকের ভেতরটা ধ্বক করে উঠলো তার— না, এ কাজ করা যাবে না। একদমই করা যাবে না। “I love you” কথাটা সে একশ’ এক বার লিখতে চেয়েছে— কথাটা সে একশ’ এক বারই লিখবে। যতো কষ্টই হোক, যতো সময়ই ব্যয় হোক। এখন, এই মুহূর্তে, কথাটার ভেতর তার একশ’ এক বারের ব্যস্ততা থাকতে হবে, কথাটার ভেতর তার একশ’ এক বারের সময়-প্রবাহ থাকতে হবে, কথাটার ভেতর তার একশ’ এক বারের শ্রম থাকতে হবে— তবেই না ‘ভালোবাসা’ তার যোগ্য অর্থ পাবে। আর ভালোবাসার মানুষটা পাবে সত্য সম্মান, নিখাঁদ মর্যাদা। . . ----------------------------------------- নাগরিক দাম্পত্য ১১ বাকিটা লেখক এখনো লেখেন নি ৷ লেখা চলছে [অপেক্ষা করুন] -------------------------- -------------------------------------------------------------------------- প্রেম-অপ্রেমের গল্প— নাগরিক দাম্পত্য । সুপণ শাহরিয়ার ২১ অক্টোবর ২০১৬ । যশোর


এডিট ডিলিট প্রিন্ট করুন  অভিযোগ করুন     

গল্পটি পড়েছেন ২১১১৯ জন


এ জাতীয় গল্প

গল্পটির রেটিং দিনঃ-

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now