বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
হাতে রাখি হাত..."
- তানজীম আহমেদ
দুপুর ২ টা ২২,
লস অ্যাঞ্জেলস এয়ারপোর্ট, লস অ্যাঞ্জেলস, ক্যালিফোর্নিয়া।
এই মুহূর্তে আমি দাঁড়িয়ে আছি আমেরিকার তৃতীয় ব্যাস্ততম এয়ারপোর্টে। ঠিক ৩৮ মিনিট পর বাংলাদেশের উদ্দেশ্য Emirates Airlines এর বিমানটি ছেড়ে যাবে, যার যাত্রী হয়ে দেশে ফিরে যাচ্ছি আমি। হয়তোবা সহজে যাওয়া হতো না, কিন্তু যেতে হচ্ছে আমার প্রায় শূণ্য পৃথিবীর একমাত্র আপন মানুষ আমার বাবার আকস্মিক মৃত্যুতে। খুব যে বেশী বয়েস হয়েছে তার তা কিন্তু নয়। মারা গিয়েছেন ব্লাড ক্যান্সারে। বাবার ডেথ সার্টিফিকেট যে ডাক্তার লিখেছেন গতরাতে তার সাথে কথা বলে আমি জানতে পেরেছি, এও জানতে পেরেছি যে বাবা তার অসুস্থতার ব্যাপারটা জানতেন। ভেতরে ভেতরে যে এই রোগটা যে চেপে রেখেছেন সেটা কখনো কাউকে বুঝতে দেননি। অবশ্য আমি ছাড়া তার আর কেই বা আছেন? সেই আমিই বাবার কাছ থেকে দূরে আছি প্রায় ৮ টা বছর। আমেরিকায় এসেছিলাম স্কলারশীপ পেয়ে, তারপর পড়াশোনা, পার্ট টাইম জব, তারপর গ্রাজুয়েশন কমপ্লিট করে এখানেই সেটেল হয়ে যাওয়া। এর মাঝে দুবার শুধু দেশে গিয়েছি, তাও শেষ বার গিয়েছি ৪ বছর আগে। হয়তো আমার প্রতি অভিমানের কারণে নিজের রোগটা আমাকে জানান নি।
বাবার মৃত্যুতে আমার যতটা ধাক্কা খাওয়া দরকার ততটা ধাক্কা আমি খাইনি, এমনকি চোখ দিয়ে কোন জলের ফোঁটাও গড়িয়ে পড়েনি। “জাঁকজমকের নগরী ব্যস্ত লস অ্যাঞ্জেলস শহরের অধিবাসীদের ইমোশান মরে যায়” – এ কথার সত্যতা নাকি বাবার প্রতি ছোটবেলা থেকে মনের কোণায় পুষে রাখা “ক্ষোভ” এর পেছনের কারণ তা আমার কাছে স্পষ্ট নয়।
“ক্ষোভ” !!
হ্যাঁ, বাবার প্রতি আমার ক্ষোভ আছে !!
--------------------------------------------------------------------------------------
“ইউ নিড সাম ড্রিঙ্কস, স্যার?”
“ওয়ান হুইস্কি উইথ টু পিস আইস কিউব”
হোস্টেস সৌজন্যের হাসি হেসে পরের প্যাসেঞ্জারের কাছে চলে গেল অর্ডার নিতে।
আমার ছোটবেলাটা আর দশটা দরিদ্র পরিবারের সন্তানের মতই কেটেছে। বাবার একমাত্র সন্তান ছিলাম আমি। মাকে হারিয়েছি কিছু বুঝে ওঠার আগেই, তখনকার কোন স্মৃতি আমার মনে নেই/ দুই কি তিন বছর ছিলো আমার বয়স তখন। মা মারা যান রোড এক্সিডেন্টে। বাবা বলেন আমার চোখ দুটো নাকি একদম মায়ের মতো। আমি মিলিয়ে দেখেছি মায়ের ছবির সাথে, খুব একটা মিল অবশ্য পাইনি। হয়তো মায়ের প্রতি গভীর ভালোবাসা থেকে বাবা এমনটা ভাবতেন অথবা আমারই দেখার ভুল। মৃত মানুষের একটা মুখচ্ছবি কি পারে সেই মানুষটার সব আবেগের জায়গাগুলোকে তুলে ধরতে? কি জানি !! আমি জানতে চাইনি কখনো। মাকে খুব মিস করতাম আমি। তিনি থাকলে হয়তো আমার ছোট ছোট আবদার গুলো অপূর্ণ থাকতে দিতেন না, যেগুলো বাবা কখনোই পূরণ করতে পারেন নি বা করেন নি। বাবা আমার প্রতি উদাসীন ছিলেন, সেটা আমি বলবো না। ছোটবেলায় বন্ধু-বান্ধবের সাইকেল দেখে আমারো খুব ইচ্ছে হয়েছিল একটা নিজের সাইকেলের মালিক হতে। বাবাকে বলেও ছিলাম, কিন্তু তিনি বরাবর মতো সেবারও আমার আবদারটা এড়িয়ে গিয়েছিলেন সযত্নে। একটা সাইকেলের নিশ্চয়ই এমন কোন আহামরি দাম ছিলোনা যেটা কিনে দেওয়া বাবার পক্ষে অসম্ভব ছিলো। খুব অভিমান হয়ে ছিলো সেবার বাবার ওপর। কিন্তু রাতে ঘুম ভেঙ্গে যখন বাবাকে পাশে না পেয়ে তাকে খুঁজতে গিয়ে ডাইনিং রুমে কাঁদতে দেখেছিলাম, তখন আমার ৯ বছরের অপরিপক্ক মনও বুঝে গিয়েছিলো এ কান্না সন্তানের দাবী পূরণে ব্যর্থ এক বাবার কান্না। সে রাতে বাবাকে জড়িয়ে আমিও কেঁদেছিলাম অনেক। একটাই প্রশ্ন করেছিলাম বাবাকে, “বাবা আমরা এতো গরীব কেন?” বাবা প্রাণখোলা হাসি হেসে বারবার চোখ মুছে দিচ্ছিলো আর বলছিলো, “দূর ব্যাটা, টাকা পয়সা দিয়ে গরীব বড়লোকের বিচার হয়না, বড়লোক তারাই যাদের মন বড়।” সেদিন বাবার কথাটা শুনে এটাই ভেবে নিয়েছিলাম যে আসলেই গরীব বড়লোকের বিচার টাকা দিয়ে হয়না। হাহ !! কত বোকাই না ছিলাম তখন। টাকা পয়সা যে কতো বড় জিনিস সেটা সেই বোঝে যে দিনের পর দিন না খেয়ে রাস্তায় দিন কাটায়। তাও যদি সেটা হয় বিদেশের মাটিতে।
“ইয়োর ড্রিঙ্ক, স্যার।”
হঠাৎ ভাবনায় ছেদ পড়লো। তাকিয়ে দেখলাম হোস্টেস মিষ্টি হেসে একটা গ্লাস আমার দিকে বাড়িয়ে ধরেছে।
“থ্যাঙ্ক ইউ।”
শুকনো হাসি হেসে তাকে বললাম। বিনিময়ে আবার মিষ্টি হাসি সাথে ওয়েলকাম বলে আর কিছু লাগবে কিনা জিজ্ঞেস করলো হোস্টেস। আমি মাথা নাড়তেই সে আবার মিষ্টি হেসে চলে গেল। তার চলে যাওয়ার দিকে তাকিয়ে আমি ভাবতে লাগলাম, এই মেয়েগুলা এতো উৎফুল্ল থাকে কিভাবে? আসলেই কি উৎফুল্ল থাকে নাকি সবটাই অভিনয়? আর অভিনয়ই যদি হয় তবে কিভাবে পারে ওরা? মুহূর্তেই পেয়ে গেলাম প্রশ্নের উত্তর। টাকা !!!
টাকার কথা মনে পড়ায় হাইস্কুলে যাবার আগের রাতের কথাটা মনে পড়ে গেল। বাবা ডাক দিয়ে বললেন, “এখন তো বড় হয়ে গেছিস ব্যাটা। হাই স্কুলে যাবি কাল থেকে। এখন তো তোর হাত খরচ লাগবে রে।” আমি বুঝতে পারছিলাম না বাবা হঠাৎ করে এই কথা বলছিলেন কেন। বাবা আমাকে টেবিলে নিয়ে বসিয়ে পকেট থেকে টাকা বের করলেন। ৩ টা একশ টাকার কচকচে নোট। ঐ বয়েসে হাতখরচ বিষয়টা অনেক লোভনীয় একটা ব্যাপার ছিলো। আমি তো খুব খুশি হয়ে গেলাম। বাবা তিনশ টাকা আমার হাতে দিলেন আর নিজের পকেট থেকে ৫০০ টাকার একটা নোট বের করলেন। নিজের হাতের টাকাটা সামনে রাখা একটা বয়ামে পুরে বললেন, ‘এটা আমার পক্ষ থেকে ট্যাক্স।’ তারপর আমার হাতের টাকাটা নিয়ে সেখান থেকে ২০০ টাকা নিয়ে ঐ বয়ামে পুরলেন। বললেন, ‘এটা তোর পক্ষ থেকে ট্যাক্স।’ বলেই একটা আত্মতৃপ্তির হাসি হাসলেন আর বাকি ১০০ টাকা আমার হাতখরচের জন্য আমাকে দিলেন। কার জন্য ট্যাক্স বা বাবার হাসির রহস্য কিছুই বুঝিনি আমি ঐদিন। বাবাকে জাস্ট জিজ্ঞেস করলাম, ‘বাবা আমরা বড়লোক না কেন?’ বাবা উত্তর দিলেন, ‘তোমার কাছে কতটা আছে সেটার ওপর বড়লোক হওয়া নির্ভর করেনা, নির্ভর করে কতটা তুমি দিচ্ছ।’ বাবার দর্শনে আমার মনটা ভালো না হয়ে মনটা খারাপ হয়ে গেল, কিন্তু আর কিছু জিজ্ঞেস করিনি আমি বাবাকে। তারপর থেকে ঐ বয়ামটাকে আমি নিয়মিত দেখতাম বাবার ঘরের কোণায়। আসলে ওটা আগেও ছিলো, আমি কখনো খেয়াল করিনি। খেয়াল করি বা না করি এরপর থেকে বয়ামটাকে আমি মনে প্রাণে ঘৃণা করতাম।
তবে বাবার ওপর সেদিন থেকে আমার মনটা উঠে গেল সেদিন যেদিন আমি বাবার আঁকা মিকি মাউসের ছবিটা দেখি। সেদিন মাথা ব্যাথা করায় আমি ৯টা বাজতেই আমি বাবার রুমে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। রাত ১ টার দিকে ঘুম ভেঙ্গে গেলে বাবাকে পাশে না পেয়ে চোখ কচলাতে কচলাতে ডাইনিং রুমে গিয়ে দেখি বাবা টেবিল ল্যাম্প জালিয়ে ডাইনিং টেবিলে কি যেন করছিলেন। পা টিপে টিপে পিছে গিয়ে দেখি বাবা গভীর মনোযোগে কি যেন আঁকছেন, এতোটাই মনোযোগ ছিলো যে আমি পিছে এসে দাঁড়িয়েছি সেটা টেরই পাননি। একটু উঁকি দিয়ে দেখি মিকি মাউসের ছবি আঁকছেন ছোট্ট একটা কার্ডে। পাশে লেখা, “তুমি একদিন অনেক বড় হবে”। দেখেই আমি অনেক বেশী খুশি হয়ে গিয়েছিলাম। বাবা আমার ছোট্ট পছন্দটাও মনে রেখেছে। আঁকা শেষ হলে বাবা সেটা হাতে নিয়ে নেড়ে চেড়ে দেখছিলেন। আমি টুপ করে বাবার হাত থেকে সেটা নিয়ে নিলাম। বাবার মুখে একটা হাসি ফুটে উঠলো, হয়তো আমার চকচকে চোখ দেখে, কিন্তু পরমুহূর্তেই সেটা মুছে গেল। আমি দেখে নিয়ে আবার সেটা বাবার হাতে দিয়ে দিলাম, চাচ্ছিলাম বাবা নিজের মুখে বলুক, ওটা যে আমার জন্য বানিয়েছি। কিন্তু আমাকে অবাক করে দিয়ে দিয়ে বাবা বললেন, “এটা তোমার জন্য না। তোমাকে কাল রাতে একটা বানিয়ে দেবো।” ঐদিন এত কষ্ট পেলাম যে বলার মত না। মাথায় শুধু অচেনা একটা কন্ঠস্বর বলছিল, ‘রাজিন, এটা তোর জন্য না।’ একবারও আমার মাথায় এই প্রশ্নটা আসলো না যে, আমার জন্য না বানালে বাবা এটা কার জন্য বানালেন। আমি মাথা নিচু করে আস্তে সেখান থেকে চলে গেলাম। পেছন থেকে বাবা আমাকে ডাকছিলেন কিন্তু কান্নাভেজা চোখ বাবাকে দেখাতে ইচ্ছে হচ্ছিলো না বলে বাবার ডাক উপেক্ষা করে নিজের রুমে গিয়ে দরজা বন্ধ করে শুয়ে পড়লাম।
“উই আর অ্যাবাউট টু ল্যান্ডিং। প্লিজ, ফ্যাসেন ইয়োর সিট বেল্ট” স্পীকার থেকে ফ্লাইট এটেন্ডেন্টের গমগমে আওয়াজ ভেসে আসলো। সবাই ব্যস্ত হয়ে পড়লো সিট বেল্ট বাঁধায় । আমি একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে সিটবেল্ট বাঁধায় মনোযোগ দিলাম।
--------------------------------------------------------------------------------------
“আমার শেষ ইচ্ছাটা কি তুমি রাখবে? আমার মৃত্যুর পর তুমি আমার দেহটা লিটল গার্ডেনে সমাধি করো আর আমার রুমে খাটের নিচে একটা ট্রাংক আছে, সেটা খুলে দেখো। তোমার জন্য অমূল্য সম্পদ রেখে যাচ্ছি আমি। ভালো থেকো, বাবা। আর পারলে আমাকে ক্ষমা করে দিয়ো। ইতি তোমার অযোগ্য পিতা”
এটা ছিলো আমার উদ্দেশ্যে বাবার শেষ চিঠি। বাবার শেষ ইচ্ছা অনুযায়ী তার মৃতদেহ লিটল গার্ডেনে সৎকার করা হয়েছে। সৎকারকর্ম করে আমি ট্যাক্সিতে ছুটে চলেছি সেই বাড়িতে, যেখানে কেটেছে আমার শৈশবের ফিকে দিনগুলো। হ্যাঁ, সবার শৈশব রঙিন হলেও আমার শৈশবকে আমি ফিকেই বলবো।
চাবি নিয়ে দরজা খুলতেই মান্ধাতার আমলের দরজা ক্যাঁচক্যাঁচ করে উঠলো। পুরো বাসায় কেমন একটা ভ্যাপসা গন্ধ। টিমটিমে লাইট জ্বালিয়ে চারপাশটা দেখে নিলাম। নাহ, আগের মতই আছে সব। শুধু সেই মানুষটাই নাই, যত ক্ষোভই থাকুক মানুষটা আমার বাবা, মানুষটা ছিলো আমার একমাত্র আপনজন। হঠাৎ করে মনটা খুব খারাপ হয়ে গেল। দীর্ঘ পথ জার্নি, বিষন্ন মন নিয়ে বাবার মৃতদেহ সৎকার সবমিলিয়ে আমি অনেক বেশী টায়ার্ড। খেতে ইচ্ছা করছিলো না, হাত মুখ ধুয়ে শুয়ে পড়লাম। কিন্তু হঠাৎ মনে পড়ে গেল বাবার সেই ট্রাংক এর কথা। সেখানে কি পরিমাণ সম্পদ আছে না আছে তা নিয়ে আমার ইন্টারেস্ট আছে কিনা সেটা আমিই জানি। বলাবাহুল্য, আমেরিকায় আমার যে পরিমাণ সম্পদ আছে তার বর্তমান মূল্য এইখানকার সকল সম্পদের চাইতে যে অনেক বেশী সেটা বলার অপেক্ষা রাখে না। তাও কোন এক অজানা টানে আমি ট্রাংকটা খুঁজতে গেলাম। একটু খুঁজতেই ট্রাংকটা পেয়ে গেলাম। ভেবেছিলাম ট্রাঙ্ক ময়লায় ছেয়ে আছে, কিন্তু আমার ধারণা ভুল করে দিয়ে চকচকে লোহার বাক্সটা আমার দিকে তাকিয়ে থাকলো। বোঝাই যাচ্ছে, বাবা ট্রাঙ্কটার নিয়মিত যত্ন নিতো। ট্রাঙ্কটা খুলতেই সেখান থেকে কিছু চিঠি, একটা সঙ এর পোষাক আর একটা দলিল বের হয়ে আসলো, দলিলে লেখা ছিলো এই বাড়িসহ বাবার সকল সম্পত্তির মালিক আমি। দামি বলতে এটাই ছিলো। তবে কি বাবা অমূল্য বলে এই দলিলটার কথাই আমাকে বুঝিয়েছিলেন? ভাবতে ভাবতে আমি চিঠিগুলো দেখতে লাগলাম। চিঠিগুলো সব একটা জায়গা থেকেই এসেছে, সেটা হলো লিটল গার্ডেন। লিটল গার্ডেন হলো একটা অরফানেজ। চিঠিগুলোর সারমর্ম ছিলো, ডোনেশনের জন্য ধন্যবাদ। তার থেকেও আশ্চর্য ব্যাপার হলো চিঠি গুলোতে আমার নাম মেনশন করা ছিলো মানে সেখানে আমাকে ধন্যবাদ দেয়া হয়েছে যে আমি তাদেরকে দান করেছি বলে। ব্যাপারটা আমার কাছে রহস্যজনক মনে হলো। তারওপর সঙ এর ড্রেসটা। আমি পরের দিন লিটল গার্ডেনে গিয়ে আসল ব্যাপারটা জানবো ঠিক করে শুয়ে পড়লাম।
--------------------------------------------------------------------------------------
“আপনিই রাজিন?”
একটা কমবয়স্কা মেয়ে এসে জিজ্ঞেস করলো আমাকে।
কৌতূহল দমিয়ে রাখতে না পেরে সকাল হতে না হতেই চলে এসেছি লিটল গার্ডেন অরফানেজে। প্রায় বিশ মিনিট একা একা বসে থাকার পর মেয়েটি আসলো।
“জ্বী, আমিই রাজিন।”
সপ্রতিভ হেসে উত্তর দিলাম।
“আপনার জন্য একজন ওয়েট করছে” মেয়েটা জানালো।
“কে ওয়েট করছে? আমি তো কিছুই বুঝতে পারছি না, আমি জাস্ট জানতে এসেছি এই চিঠি গুলো আমার বাসায় আসলো কি করে? আমি তো এখানে কোন ডোনেট করিনি।” বেশ খানিকটা অবাক হয়ে আমি জানতে চাইলাম।
“সব প্রশ্নের উত্তর আপনি উনার সাথে দেখা করলেই পাবেন” মেয়েটি জানালো।
অগত্যা কি আর করা। মেয়েটির পেছন পেছনে যেতে লাগলাম। আসার পথে বড় একটা হলঘর এ পড়লো, সেখানে অনেক গুলো ছোট্ট ছোট্ট বাচ্চা খেলছিল, বাচ্চাগুলোর নিঃস্পাপ মুখ দেখে মুহূর্তেই মনটা ভালো হয় গেল। হলঘরটা পার হয়ে আমরা একটা রুমে এসে দাঁড়ালাম।
“স্যার, রাজিন সাহেব এসেছেন” হুইল চেয়ারে বসা একটা লোককে উদ্দেশ্য করে বললো মেয়েটা। লোক না বলে ছেলে বলাই ভালো, বয়সে আমার চেয়েও দু তিন বছরের ছোট হবে। ছেলেটা পেছন ফিরে ছিলো, সামনে ফিরতেই আমাকে দেখে প্রচন্ড খুশি হয়ে বললো-
“রাজিন সাহেব, বসুন। আর আপনি এখন যেতে পারেন” মেয়েটির উদ্দেশ্যে বললো ছেলেটি।
মেয়েটি চলে গেল।
“আমার নাম রবিন খান” করমর্দনের জন্য হাত বাড়িয়ে বললো ছেলেটি। আমিও হাত মেলালাম।
“আমি বর্তমানে লিটল গার্ডেন অরফানেজের ম্যানেজিং কমিটিতে আছি। আপনার বাবা রফিক সাহেবও এই অরফানেজের একজন ম্যানেজিং কমিটির মেম্বার ছিলেন। তার মৃত্যুতে আমরা যে কতটুকু ব্যথিত হয়েছি তা হয়তো আপনাকে বলে বোঝানো যাবে না। তিনি কেমন মানুষ ছিলেন তা আপনাকে বলা মানে মায়ের কাছে মাসীর গল্প করার মতো হয়ে যাবে। তিনি আমাদের এই অরফানেজের জন্য যা করেছেন তা মুখে বললে কম হয়ে যাবে। আমি জানি তার অর্থনৈতিক অবস্থা খুব একটা ভালো ছিলো না। তা সত্ত্বেও তিনি প্রতিনিয়ত এই অরফানেজের জন্য বিপুল পরিমাণ সাহায্য করেছেন। শুধু অর্থনৈতিক সাহায্যই না, তিনি ছিলেন এই সংস্থাটির প্রাণ। কখনো তিনি বুদ্ধি দিয়ে সাহায্য করেছেন, কখনো বা বাচ্চাদের মন ভালো করার জন্য নিজেকে সঙ সাজিয়েছেন।”
ধরা গলায় এইটুকু বলে ছেলেটা চশমা খুলে চোখ মুছতে লাগলো। আমিও হতবাক কথাগুলো শুনে। সঙ এর ড্রেসটার কথা মনে পড়ে গেল সাথে সাথেই।
নিজেকে সামলে নিয়ে ছেলেটা আবার কথা শুরু করলো-
“আমি নিজেও এই অরফানেজেই বড় হয়েছি। আমি দেখেছি এই মানুষটা কিভাবে নিঃস্বার্থভাবে নিজেকে বিলিয়ে দিয়েছিলেন এই অরফানেজের জন্য। আমি ছোটবেলা থেকেই খুব হতাশ একটা ছেলে ছিলাম। পুরো পৃথিবীর কোন কিছুতেই আমার মন বসতো না। বাবা মা হারা পঙ্গু একটা ছেলের আসলে বেঁচে থাকা সম্ভব হতো না যদি না এই মানুষরুপী দেবদূতের দেখা পেতাম। মানুষটা আমাকে নিজের সন্তানের মতো দেখতেন। আমার ভালোলাগা খারাপলাগা, ভালোবাসার পাবার চাহিদা সবকিছুই পূরণ করেছেন এই মানুষটি। শুধু আমাকে না এই অরফানেজের প্রতিটি বাচ্চারই বাবা ছিলেন যেন মানুষটি। দাঁড়ান, আপনাকে একটা জিনিস দেখাই”
বলে হুইল চেয়ারটা টেনে বুকসেলফের দিকে নিয়ে গেল।
“বইটা তিনি আমাকে গিফট করেছিলেন। বইটাতে কি ছিলো জানিনা কিন্তু মানুষটার ভালোবাসা লেগে ছিলো প্রতিটা পৃষ্ঠায়” – বইটা আমাকে দিতে দিতে কথাটা বলতে লাগলো।
বইটা হাতে নিয়ে আমি উল্টেপাল্টে দেখতে লাগলাম। গলার কাছে কি যেন একটা দলা পাকিয়ে আটকে আছে আমার। উঠে আসতে চাইছে কিন্তু আমার জোর জবরদস্তিতে যেন আসতে পারছে না। বইটা হাতে নিয়ে উল্টাতে উল্টাতে উল্টাতে টুপ একটা কার্ড পড়লো ফ্লোরে। কার্ডটা আমার খুব পরিচিত লাগলো। হ্যাঁ, ভুল হয়নি আমার, এটাই সেই ছোটবেলায় না পাওয়া অভিমানের টুকরো। এবার আর আমি কান্না আটকে রাখতে পারলাম না।
রবিন হুইল চেয়ার ঠেলে ঠেলে আমার কাছে এসে আমাকে যতটুকু সম্ভব জড়িয়ে ধরলো। তাতে আমার কান্না থামলো তো নাই বরং আরো বেড়ে গেল। বাবার জন্য খুব গর্ব হচ্ছিল ঐ মুহূর্তে আবার একই সাথে মাটিতে মিশে যাচ্ছিলাম আমি লজ্জায়, হতাশায়। এমন একটা মানুষ আমার এত কাছে ছিলো আর আমি কিনা !!! ছিহ !! নিজের ওপরই ঘেন্না লাগছে। রবিন সাত্ত্বনা দিয়েই যাচ্ছিল আর আমি শিশু বাচ্চার মত আকুল নয়নে কাঁদছিলাম।
--------------------------------------------------------------------------------------
“ঐ দেখ, জোকার আঙ্কেল ফিরে এসেছে, দেখ দেখ”
একটা বাচ্চার চীৎকারে খেলা বাদ দিয়ে ফিরে তাকালো সবগুলো বাচ্চা, সেই সাথে লিটল গার্ডেন অরফানেজের সব স্টাফ। আমি আস্তে আস্তে লিটল গার্ডেনের অফিস ভবনটা পার করে বাচ্চাদের মাঝে চলে গেলাম, আমার পরনে বাবার ট্রাঙ্কের সেই সঙ এর পোষাক। বাচ্চাগুলো আমাকে ঘিরে ছোট ছোট লাফ দিচ্ছিলো আর আমি পরম আনন্দে যে কয়টা বাচ্চাকে পারলাম জড়িয়ে ধরলাম । কেউ জোকারের হাস্যকার লাল নাকটা ধরে টানাটানি করছিলো কেউ বা রঙিন চুলগুলো এলোমেলো করে দিচ্ছিলো। আমি বাচ্চাদের এই রকম দুষ্টুমিতেই জীবনের অর্থ খুঁজে পেয়েছি। আজ আমি বাবার সকল সম্পত্তি এই অরফানেজের নামে উইল করে এসেছি। বাবা ঠিকই বলেছিলেন, ‘তোমার কাছে কতটা আছে সেটার ওপর বড়লোক হওয়া নির্ভর করেনা, নির্ভর করে কতটা তুমি দিচ্ছ।’
“আপনার বাবা এই চিঠিটা আপনাকে একটা নির্দিষ্ট সময়ে দিতে বলেছিলেন। আমার মনে হয় সে সময় চলে এসেছে।”
পেছন থেকে এসে বললেন রবিন সাহেব। একটা কাগজ সামনে বাড়িয়ে ধরলেন তিনি। আমি কাগজটা হাতে নিয়ে বাবার কবরের কাছে চলে গেলাম।
“এই চিঠিটা যখন তুই পেয়েছিস তখন আমি যেখানেই থাকি না কেন আমি অনেক শান্তিতে আছি বাবা। তোকে কি দিতে পেরেছি জানিনা, কিন্তু মানুষ হিসেবে নিজের কাছে আত্মতৃপ্তি পাবার সন্ধানটা দিয়ে গেলাম। তুই বল, এর থেকে বড় কোন সম্পদ হয়? আমার হাত তোর দিকে বাড়িয়ে দিয়েছিলাম আমি, সেই হাত তুই ধরেছিস। বাবা হিসেবে আমি তোর জন্য গর্বিত। এভাবে তোর হাতটাও বাড়িয়ে দিস মানুষের কাছে। আর একটা কথা মনে রাখিস, তোর কাছে কতটা আছে সেটার ওপর বড়লোক হওয়া নির্ভর করেনা, নির্ভর করে কতটা তুই দিচ্ছিস। ভালো থাকিস বাবা”
টুপ করে একফোঁটা জল চিঠিটা ভিজিয়ে দিলো। কখন যে মনের অজান্তে চোখে জল চলে এসেছে আমি টেরই পাইনি। তবে এ জল আনন্দের, বাবা যে আমাকে নিয়ে গর্ব করে।
হঠাৎ হাতে একটা হাতের স্পর্শ পেলাম। তাকিয়ে দেখি বাবা আমার হাতটা ধরে রেখেছেন সেই ছোট্টবেলার মতো আর নিঃশব্দে হাসছেন। আমি বাবার দিকে তাকিয়ে পাল্টা হাসি দিয়ে ফিসফিসিয়ে বললাম-
“তুমিও ভালো থেকো বাবা, অনেক ভালো।”
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now