বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
ধ্বংস টাওয়ারের নীচে
চ্যাপ্টার- ৩
বাকি অংশ
আহমদ মুসা কথা শেষ করেই ড. হাইম হাইকেলের কিছু বলার আগেই আবার মুখ খুলল। বলল, ‘স্যার, প্রমাণের দ্বিতীয় বিষয়টা নিয়ে আমি চিন্তায় আছি। এ ব্যাপারে আপনার সাহায্যের প্রয়োজন আছে কিনা ভেবে দেখতে আমি আপনাকে অনুরোধ করছি।’
আহমদ মুসার কথা ড. হাইম হাইকেল মনোযোগ দিয়ে শুনল। কিন্তু কোন উত্তর দিল না। তার মুখ গম্ভীর হয়ে উঠেছে। ভাবছে সে। অনেকক্ষণ পর মুখ তুলল। বলল, ‘প্রমাণের জন্য অন্তত প্রয়োজন ঐ দিন ঐ কাজে ‘গ্লোব হক’-এর ‘অফিসিয়াল লগ’ ও ‘অর্ডার শীট’ উদ্ধার করা। আর............।’
ড. হাইম হাইকেলের কথা মাঝখানেই আহমদ মুসা বলে উঠল, ‘এ ‘লগ’ ও ‘অর্ডার শীট’ কোথায় পাওয়া যাবে?’
‘দৃশ্যত প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের ‘এয়ার সেফটি সার্ভিস’ (ASS) ডিভিশনে এটা থাকার কথা। কিন্তু আমি বিষয়টা সম্পর্কে নিশ্চিত নই।’ বলল ড. হাইম হাইকেল।
একটা দম নিয়েই আবার বলে উঠল, ‘টাওয়ার ধ্বংসে ‘সেফ ডেমোলিশন ডেভাইস’ যে ব্যবহার হয়েছিল, সেটা প্রমাণ করার জন্যে ধ্বংস টাওয়ারের ডাষ্ট-এর বিশেষ ধরনের পরীক্ষা প্রয়োজন।’
‘কিন্তু ধ্বংস টাওয়ারের ডাষ্ট এখন এত বছর পর কোথায় পাওয়া যাবে? টুইনটাওয়ারের জায়গায় তো নতুন টাওয়ার গড়ে তুলে ঐ এলাকা ঢেকে ফেলা হয়েছে।’ আহমদ মুসা বলল।
‘নিউইয়র্কের তিনটি প্রতিষ্ঠানে এই ডাষ্ট পাওয়া যাবে। ইন্টারন্যাশনাল টেরর মিউজিয়াম (ITM), ‘বিল্ডিং হিষ্টরী মিউজিয়াম’ (BHM) এবং ধ্বংস টাওয়ারের স্থানে নির্মিত নতুন টাওয়ার কমপ্লেক্সের ‘লিভিং মেমরি ল্যাবরেটরী’তে পাওয়া যাবে।’ কিন্তু এই ডাষ্ট পাউডারটাই বড় কথা নয়, এর প্রামাণ্য টেষ্ট রেজাল্ট প্রয়োজন।’ বলল ড. হাইম হাইকেল।
‘ধন্যবাদ স্যার আপনার দেয়া তথ্যগুলো অমূল্য।’ আহমদ মুসা বলল।
‘কি অমূল্য বলছ। তুমি চেষ্টা করলেও এ তথ্যগুলো যোগাড় করতে পারতে। আসলেই তোমাকে সাহায্য করার মত তেমন কিছু আমার কাছে নেই।’ বলল ড. হাইম হাইকেল।
‘বলেন কি স্যার! আপনার প্রধান যে তথ্যের জন্য এসেছিলাম তা পেয়ে গেছি। তথাকথিত বিমান হাইজ্যাকারদের সম্পর্কে যে তথ্য দিয়েছেন, এই একটা তথ্যই আমাদের জন্যে যথেষ্ট। শুধু একেই যদি আমরা সত্য প্রমাণ করতে পারি, তাহলে মুসলমানদের কপাল থেকে সন্ত্রাসী হওয়ার কলংক তিলক মুছে ফেলা যায়।’ আহমদ মুসা বলল।
‘কিন্তু ‘ও.এম.এফ গ্রুপ’-এর সর্বব্যাপী ষড়যন্ত্রের মুখোশ উন্মোচন করতে হলে গোটা ষড়যন্ত্রকেই দিনের আলোতে আনতে হবে এবং এটা তুমিই পারবে আহমদ মুসা। আমেরিকান জনগণও তোমার কাছে আরও বেশি কৃতজ্ঞ হবে। তুমি আগেও তাদের অমূল্য উপকার করেছ। এই উপকার যদি তুমি করতে পার, তাহলে আমেরিকান জনগণ পুরোপুরিই মুক্ত হবে কুগ্রহের কবল থেকে।’ বলল ড. হাইম হাইকেল।
এ কথাগুলোর খুব অল্পই আহমদ মুসার কানে প্রবেশ করেছে। আহমদ মুসা ব্যস্ত হয়ে পড়েছে তার মোবাইল নিয়ে।
ড. হাইম হাইকেল থামতেই আহমদ মুসা বলল, ‘এক্সকিউজ মি স্যার, আমি কয়েকটি টেলিফোন করে নিতে চাই।’
বলে আহমদ মুসা প্রথমে টেলিফোন করল কামাল সুলাইমানকে জার্মানীতে। বলল, ‘কামাল জার্মানীর ‘মিউজিয়াম অব ওয়ার্ল্ড ইভেন্টস’-এর প্রেসিডেন্ট মি. ব্রেম্যান তোমার বন্ধু, তাই না?’
‘হ্যাঁ।’ ওপার থেকে বলল কামাল সুলাইমান।
‘তুমি মিউজিয়ামের তরফ থেকে মি. ব্রেম্যানের একটি করে চিঠি নিয়ে এস নিউইয়র্কের ‘ইন্টারন্যাশনাল টেরর মিউজিয়াম’-এর প্রেসিডেন্ট, ‘বিল্ডিং হিষ্ট্রি মিউজিয়াম’-এর প্রেসিডেন্ট এবং গ্রাউন্ড ফরচুন’-এর নতুন টাওয়ার কমপ্লেক্সের ‘লিভিং মেমরী ল্যাবরেটরী’-এর ডিরেক্টরের নামে। এই পৃথক পৃথক চিঠিতে মিউজিয়ামের তরফ থেকে লিখতে হবে মিউজিয়ামের রেকর্ড ও প্রদর্শনী বস্তু হিসাবে পৃথক দু’প্যাকেটে ৫ গ্রাম করে টুইনটাওয়ার ধ্বংসের ডাষ্ট ডোনেট করার জন্যে। তিনটি চিঠি নিয়ে মিউজিয়ামের প্রতিনিধি হিসাবে তোমাকে এক সপ্তাহের মধ্যে নিউইয়র্ক আসতে হবে।’ বলল আহমদ মুসা।
‘বুঝেছি ভাইয়া। আপনার আদেশ অক্ষরে অক্ষরে পালিত হবে। ড. মুর হ্যামিল্টনের সাথে আসল কথাটা হয়েছে?’ ওপার থেকে বলল কামাল সুলাইমান।
‘হ্যাঁ। তার প্রেক্ষিতেই তো এ জিনিসগুলোর প্রয়োজন। কথা শেষ। এস। আস্সালামু আলাইকুম।’
আহমদ মুসা কল অফ করে দিয়ে নতুন আরেকটা নাম্বারে ডায়াল করল।
ডায়াল করল ইলিনয় ষ্টেটের রেডইন্ডিয়ান রিজার্ভ কাহোকিয়ার অধ্যাপক আরাপাহোর কাছে।
ওপার থেকে প্রফেসর আরাপাহোর কণ্ঠ শুনেই আহমদ মুসা সালাম দিয়ে বলল, ‘স্যার আমাকে চিনতে পেরেছেন?’
প্রফেসর আরাপাহো আহমদ মুসাকে সালাম দিয়ে বলল, ‘তোমাকে চিনব না? তোমার কণ্ঠের একটা শব্দ কানে আসাই যথেষ্ট তোমাকে চেনার জন্যে। কেমন আছ তুমি? কেমন আছে বউমা? তুমি কি আমেরিকায়? না আমেরিকার বাইরে? তুমি আজোরাস আইল্যান্ডে এসেছ তা জানিয়েছ। তারপর আর কোন খবর জানি না।’
‘আমরা সবাই ভাল আছি জনাব। আমি নিউইয়র্ক থেকে বলছি। ওগলালা বোধ হয় কাহোকিয়ায়। কেমন আছে সে?’ আহমদ মুসা বলল।
‘ওগলালা আমার পাশে বসে। টেলিফোনটা নেবার জন্যে হাত বাড়িয়ে আছে। তাকে দেব টেলিফোন। তবে তার আগে তোমার কথা শুনি। নিউইয়র্কে কোন কাজে এসেছ নিশ্চয়?’ বলল প্রফেসর আরাপাহো।
‘জি, কাজ নিয়ে এসেছি এবং আপনার সাহায্য চাই।’ আহমদ মুসা বলল।
‘ধন্যবাদ তোমাকে এজন্যে যে, আমার কথা তুমি চিন্তা করেছ। বল তোমার কি প্রয়োজন, আমার সব কিছু তোমার জন্যে।’ বলল প্রফেসর আরাপাহো।
‘ধন্যবাদ স্যার।’ বলে একটু থামল। তারপর বলল, ‘আপনার কাছে মাউন্ট মার্সি’র ইন্ডিয়ান রিজার্ভ-এর কথা শুনেছিলাম।’
‘হ্যাঁ শুনেছিলে। কি হয়েছে? হঠাৎ একথা তুলছ কেন?’
‘মাউন্ট মার্সি’র ইন্ডিয়ান রিজার্ভ-এর সাথে আপনার পরিচয় কেমন স্যার?’
‘ভাল। ওখানে এক অনুসন্ধান কাজে আমি তিনমাস ছিলাম। তাছাড়াও বেশ কয়েকবার গেছি আমি সেখানে।’
‘স্যার আপনাকে আবার এক অনুসন্ধানে যেতে হবে।’ বলল আহমদ মুসা সোৎসাহে।
‘আমাকে যেতে হবে এক অনুসন্ধানে? অনুসন্ধানটা তোমার এবং সেটা খুব বড় বিষয় হবে নিশ্চয়? কারণ তোমার হাতযশ বড় বিষয়কেই সব সময় টানে।’ বলল প্রফেসর আরাপাহো। তার কণ্ঠে আনন্দের সুর।
‘ঠিক ধরেছেন স্যঅর, সেটা হবে আমার অনুসন্ধান এবং তা বড় বিষয়ও।’ বলল আহমদ মুসা।
‘তোমার যদি বিষয় হয়,তাহলে আমি একবার নয় একশ’বার যেতে রাজি আছি। কারণ তোমার বিষয় মানেই হলো মানুষের কোন কল্যানের কাজ, এখন বল কবে যেতে হবে?’ প্রফেসর আরাপাহো বলল।
‘এক সপ্তাহ পর যে কোন দিন আপনার সুবিধা অনুসারে। আমিও আপনার সাথী হতে চাই।’
‘তুমিও যাবে? চমৎকার। দিনগুলো তাহলে তো উৎসবের হবে। তাহলে সপ্তাহ পর দিন ঠিক করে তোমাকে জানাব। কিন্তু কাজটা কি বললে না তো?’
‘সাক্ষাতে ছাড়া বলা যাবে না। তবে আপনাকে মাউন্ট মার্সি’র রেডইন্ডিয়ান রিজার্ভে যেতে হবে প্রতœতাত্বিক অনুসন্ধানের এক মিশন নিয়ে, যাতে স্বাভাবিকভাবে খোঁড়া-খুঁড়িরও প্রোগ্রাম থাকবে। সেখানকার সবার এটা জানা উচিত।’ বলল আহমদ মুসা।
‘ঠিক আছে। আমি বুঝেছি। তোমার কাজ যাই হোক, কাজের প্রকৃতি বুঝেছি। আমি আজই মাউন্ট মার্সি’র কমিউনিটি সরদারকে লিখে জানাচ্ছি যে, আমার গবেষণার প্রয়োজনে কিছু প্রতœতাত্বিক অনুসন্ধানের জন্যে আমি আমার কয়েকজন লোককে নিয়ে মাউন্ট মার্সিতে আসছি।’
‘অসংখ্য ধন্যবাদ স্যার।’
‘ওয়েলকাম। রাখলাম। ওয়াস্সালাম।’
আহমদ মুসা ‘ওয়া আলাইকুমুস সালাম’ বলতেই ওপার থেকে লাইনটা কট করে কেটে গেল।
আহমদ মুসা কল অফ করে দিয়ে ওয়াশিংটনে ডায়াল করল ঈগল সান ওয়াকারের কাছে।
ওপার থেকে সান ওয়াকারের কণ্ঠ পেতেই আহমদ মুসা বলে উঠল, ‘আসসালামু আলাইকুম, সান ওয়াকার। চিনতে পেরেছ?’
ওপার থেকে সান ওয়াকার আনন্দে চিৎকার করে উঠল, ‘চিনব না মানে? আপনি......।’
সান ওয়াকারকে কথা সমাপ্ত করতে না দিয়ে আহমদ মুসা বলল, ‘থাক, নাম শুনতে চাই না তোমার কাছ থেকে। বল কেমন আছ? মেরি রোজ কেমন আছে?’
‘ভাল আমরা আহ.......।’ কথা শেষ করতে পারলো না সান ওয়াকার।
আহমদ মুসা আবার তাকে থামিয়ে দিল। বলল, ‘থাক বড়দের নাম নিতে নেই। শোন, মাউন্ট মার্সি’র রেডইন্ডিয়ান রিজার্ভে তোমার একটা ফ্রেন্ড ছিল না?’
‘ছিল নয়, আছে। সান ইয়াজুনো।’ বলল সান ওয়াকার ওপাশ থেকে।
‘সে এখন কোথায়?’ জিজ্ঞেস করল আহমদ মুসা।
‘মাউন্ট মার্সিতে। সে মাউন্ট মার্সির রেডইন্ডিয়ান রিজার্ভের ফেডারেল কমিশনারের অফিসে চাকুরি করে। সেখানকার সিভিল এ্যাফেয়ার্স অফিসার সে। কিন্তু ভাইয়া হঠাৎ তাকে মনে পড়ল কেন?’ সান ওয়াকারের কণ্ঠ শেষ দিকে গম্ভীর হয়ে উঠেছে।
‘সান ওয়াকার, তুমি কি তোমার বন্ধুর সাথে দেখা করবে?’ বলল আহমদ মুসা।
সংগে সংগে উত্তর এল না সান ওয়াকারের কাছ থেকে। একটু পর ওপ্রান্ত থেকে সে বলে উঠল, ‘ব্যাপার কি বলুন তো ভাইয়া। অন্য কেউ এমন কথা বললে রসিকতা মনে করতাম। কিন্তু আপনার প্রতিটি শব্দ, প্রতিটি উচ্চারণের মূল্য আছে। আমার ভয় হচ্ছে বড় কিছু ঘটেছে কিনা!’
‘ঘটনা বড় সান ওয়াকার, কিন্তু তোমার উদ্বিগ্ন হওয়ার কিছু নেই। তোমাকে আগামী সপ্তাহে সান ইয়াজুনোর ওখানে যেতে হবে। আমিও সে সময় ওখানে থাকব। ভয় করো না সান ইয়াজুনোর সাথে এ ঘটনার কোন সম্পর্ক নেই। তুমি ওখানে যাবে মাত্র। বলবে প্রতœতাত্বিক অনুসন্ধান প্রচেষ্টার অংশ হিসাবে তুমি ওখানে যাচ্ছ। ওখানে গিয়েই সব তোমাকে বলব।’ আহমদ মুসা বলল।
‘বুঝেছি ভাইয়া। ঠিক আছে। কবে যাচ্ছি আপনাকে জানাব। মাফ করবেন ভাইয়া, আমি কিন্তু ইচ্ছা করেই আপনার সাথে যোগাযোগ করিনি।’ বলল সান ওয়াকার।
‘জানি। কিন্তু তুমি কি জান আমার টেলিফোন নাম্বার?’ জিজ্ঞাসা আহমদ মুসার।
‘ঘটনাক্রমে জেনে গেছি ভাইয়া। সেদিন এয়ারপোর্টে গিয়েছিলাম এক আত্মীয়কে বিদায় জানাতে। লাউঞ্জে দেখা হলো সারা জেফারসন আপার সাথে। তিনি ইউরোপ যাচ্ছিলেন। ক’মিনিট কথা হয়েছিল লাউঞ্জে বসে তার সাথে। তিনিই জিজ্ঞাসা করেছিলেন, ‘তোমরা তাঁর খবর রাখ?’ আমি বলেছিলাম, তিনি এসেছেন, কিন্তু ওয়াশিংটনে আসেননি। আমি যোগাযোগের সুযোগ পাইনি।’ আমার কথার পর তিনি আমাকে একটা নাম্বার দিয়ে বলেছিলেন, তাঁর সাথে যোগাযোগ রেখ। তার নিজের প্রয়োজন তিনি জানান না, জানতে হয়।’ টেলিফোন নাম্বার পেলেও আমি যোগাযোগ করতে সাহস পাইনি ভাইয়া।’ বলল সান ওয়াকার।
‘সারা তোমাকে নাম্বার দিয়েছে? কিভাবে পেল? যেদিন সকালে সে ইউরোপ গেছে, তার আগের রাতে মাত্র আমি টেলিফোনের নতুন সেট পেয়েছি! এ নাম্বার তো তার জানার কথা নয়। বলত নাম্বারটা?’ আহমদ মুসা বলল।
নাম্বারটা নিয়ে দেখল তার টেলিফোনেরই নাম্বার। ভাবল আহমদ মুসা, নাম্বারটা নিশ্চয়ই এফ.বি.আই চীফ জর্জ আব্রাহাম জনসন সারাকে দিয়েছে। বলল আহমদ মুসা সান ওয়াকারকে, ‘ঠিক আছে সান ওয়াকার। তাহলে এই কথা থাকল, তুমি যাওয়ার আগে টেলিফোন করছ। আসি। আস্সালামু আলাইকুম।’
আহমদ মুসা কল অফ করে দিয়েই ফিরল ড. হাইম হাইকেলের দিকে। বলল, ‘মাফ করবেন স্যার, আর একটা কল করব।’
‘আহমদ মুসা তুমি যা করছ, তাতে শত কল করলেও শোনার প্রতি আগ্রহ আমার উত্তরোত্তর বাড়বে। আমি বুঝতে পারছি না এত পরিকল্পনা তুমি কখন করলে? এইমাত্র তো আমার কাছে ঘটনা শুনলে!’ ড. হাইম হাইকেল বলল।
‘পরিকল্পনার প্রয়োজন হয়নি। আপনার দেয়া সুনির্দিষ্ট তথ্যগুলোই এ কাজগুলোকে টেনে নিয়ে এসেছে। ধন্যবাদ স্যার।’ বলেই আহমদ মুসা তার মোবাইলের দিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ করল।
মোবাইলের ডিজিটাল প্যানেলে কয়েকটা অংকে নক করল। সংগে সংগেই ওপার থেকে একটা ভারি কণ্ঠ ভেসে এল, ‘বল, জোসেফ জন, নিশ্চয় ড. হ্যামিল্টনের সাথে তোমার কথা হয়ে গেছে?’
‘জি জনাব। কথা হয়েছে, কিন্তু ইতি হয়নি।’ বলল আহমদ মুসা।
‘কিন্তু কোন সিদ্ধান্তে না পৌছে তো তুমি আমাকে টেলিফোন করনি!’ জর্জ আব্রাহাম জনসন বলল ওপার থেকে।
‘তা ঠিক। কিন্তু আমরা দুজন বসে এখনও কথা বলছি। কথার মাঝখানেই কয়েকটা টেলিফোন করলাম। শেষ টেলিফোনটা আপনাকে করেছি।’ বলল আহমদ মুসা।
‘ধন্যবাদ। তুমি দ্রুত আগাচ্ছ। এটাই দরকার। আমার কেমন সহযোগিতা দরকার বল।’ এফ.বি.আই প্রধান জর্জ আব্রাহাম জনসন বলল।
‘কয়েকটা জিজ্ঞাসা।’ আহমদ মুসা বলল।
‘বল।’ বলল জর্জ আব্রাহাম।
‘সেফ এয়ার সার্ভিসেস (SAS) কোন মন্ত্রণালয়ের অধীন। এর সদর দফতর কোথায়? ‘সেফ এয়ার সার্ভিসেস’-লগ রাখার দায়িত্ব কার?’ প্রশ্ন কয়েকটা করে থামল আহমদ মুসা।
ওপার থেকে জর্জ আব্রাহামের উত্তর আসতে কয়েক মুহূর্ত দেরি হলো। একটু সময় পর ওপার থেকে ভেসে এল জর্জ আব্রাহামের কণ্ঠ, ‘আরেকটা প্রশ্ন তোমার বাদ পড়েছে। সেটা হলো, ওল্ড লগগুলো রক্ষার রীতি-বিধান কি? তাই কিনা জোসেফ জন?’
‘ধন্যবাদ জনাব।’ আহমদ মুসা বলল।
‘ওয়েলকাম, জোসেফ জন। উত্তরের জন্যে আমাকে ভাবতে হবে। এক ঘণ্টার মধ্যে উত্তরগুলো তোমার হাতে পৌছে যাবে। আর কোন বিষয়?’ বলল জর্জ আব্রাহাম।
‘ধন্যবাদ জনাব, আপাতত এ পর্যন্তই।’ আহমদ মুসা বলল।
‘শোন জোসেফ জন, তুমি তোমার প্রজেক্টের চুড়ান্ত পর্যায়ে পৌছেছ। তোমাকে প্রয়োজনের অগ্রাধিকার সিলেকশন আগে করতে হবে। তারপর প্রথম কাজ প্রথমে।’ বলল জর্জ আব্রাহাম।
‘ধন্যবাদ জনাব। বুঝেছি।’ আহমদ মুসা বলল।
‘ওকে। রাখলাম। বাই।’ ওপার থেকে বলল জর্জ আব্রাহাম জনসন।
আহমদ মুসা তার মোবাইলের কল অফ করে দিল এবং ফিরে বসল ড. হাইম হাইকেলের দিকে।
আহমদ মুসা তার দিকে ফিরতেই ড. হাইম হাইকেল বলল, ‘তাহলে আগামী সপ্তাহেই মাউন্ট মার্সিতে যাচ্ছ? যাদের সাথে নিচ্ছ তারা বিশ্বস্ত? প্রফেসর আরাপাহো ও সান ওয়াকার দুজনেরই নাম আমি শুনেছি। তোমার বাছাই ঠিক। রেডইন্ডিয়ানরা সাথে থাকলে ওদের সোসাইটিতে মেশবার সুবিধা পাবে তুমি। ঈশ্বর তোমাকে সফর করুন। তবে ধ্বংস টাওয়ারের ডাষ্ট সংগ্রহের কৌশল তোমার চমৎকার হয়েছে। আমার মনে হচ্ছে SAS এর লগ পাওয়াটাই তোমার জন্যে কঠিন হবে। তবে ঈশ্বর তোমার প্রতি খুব সদয়। তোমার কয়েকটা টেলিফোনই প্রমাণ করে ঈশ্বর যেন তোমাকে হাত ধরে সামনে এগিয়ে নিচ্ছে। গড ব্লেস ইউ মাই বয়।’
ড. হাইম হাইকেল থামতেই আহমদ মুসা বলল, ‘অসংখ্য ধন্যবাদ স্যার। আমি এখন উঠতে চাই।’
‘অবশ্যই। কিন্তু আরেকটা কথা শোন। তুমি খুবই হুশিয়ার, তবু বলি। যাকে আমরা ‘অপারেশন মেগা ফরচুন গ্রুপ’ (OMF-Group) বলছি, তারা কিন্তু ছড়িয়ে আছে সবখানে। আমাদের পুলিশ, এফ.বি.আই এবং সি.আই.এ’র মধ্যে মনে করা হয় প্রতি দুজনের একজন লোক ওদের। কথাটার মধ্যে খুব অতিরঞ্জন আছে বলে আমি মনে করি না।’
ভ্রুকুঞ্চিত হলো আহমদ মুসার। বলল, ‘ব্যাপারটা আমিও জানি স্যার, কিন্তু আপনার দেয়া অংকটা উদ্বেগজনক।’
বলে আহমদ মুসা উঠে দাঁড়াতে যাচ্ছিল। তার মোবাইলটা আবার বেজে উঠল। মোবাইলের স্ক্রীনে চোখ বুলাতেই দেখল জর্জ আব্রাহাম জনসনের নাম্বার। কি ব্যাপার তাঁর টেলিফোন কেন? এক ঘণ্টার মধ্যে উত্তর আমার হাতে পৌছে দিয়ে তারপর টেলিফোন করার কথা। আহমদ মুসা মোবাইল তুলে নিয়ে ‘গুড ইভিনিং স্যার’ বলে সাড়া দিতেই ওপার থেকে জর্জ আব্রাহাম জনসন ‘গুড ইভিনিং’ জানিয়ে বলল, ‘তোমার ঘড়িতে এখন সময় কত?’
‘ঠিক সাড়ে তিনটা।’ বলল আহমদ মুসা।
‘ঠিক আছে তোমার ঘড়ি। শোন, এখন থেকে ঠিক আধা ঘণ্টার মাথায় তুমি গাড়ি নিয়ে ফিলোসফিক্যাল হলের উত্তর পার্শ্বের রোড সাইড কার পার্কিং-এর ১৫০০ নাম্বার পার্কিং ষ্ট্যান্ডে তোমার গাড়ি দাঁড় করাবে এবং গাড়িতেই বসে থাকবে। ঠিক পাঁচ মিনিট পর, একটা লাল গাড়ি এসে তোমার গাড়ির বাম পাশে দাঁড়াবে। গাড়ি দাঁড় করিয়েই গাড়ির ড্রাইভার থেকে বেরিয়ে আসবে এবং তোমাকে ‘হ্যাল্লো মি. জে জে’ বলে সম্বোধন করে ছুটে এসে একান্ত বন্ধুর মত তোমার গাড়িতে উঠবে। তোমাকে প্রায় অদৃশ্য JAJ জলছাপ ওয়ালা নাম ঠিকানাবিহীন একটা সাদা বন্ধ ইনভেলাপ দেবে। তারপর কিছু কথা বলে সে বেরিয়ে যাবে। তুমি চলে আসবে। আর শোন তোমার গাড়ির নাম্বার প্লেট চেঞ্জ করে ওখানে যাবে। নাম্বার প্লেট তোমার রুমের খাটের নিচে পাবে। ওকে। কথা শেষ। রেখে দিলাম। বাই।’
ওপ্রান্ত থেকে লাইন কেটে দিল আহমদ মুসাকে কোন কথা বলার সুযোগ না দিয়েই।
আহমদ মুসা কল অফ করে দিয়ে ড. হাইকেলের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘আসি স্যার। আমাকে এখনই একটু বাইরে বেরুতে হবে।’
‘উইশ ইউ গুডলাক।’ বলল ড. হাইম হাইকেল।
‘ধন্যবাদ’ বলে আহমদ মুসা বেরিয়ে এল ড. হাইম হাইকেলের কক্ষ থেকে।
আহমদ মুসা ১৫০০ নাম্বার কার পার্কিং ষ্টান্ডে গাড়ি দাঁড় করিয়ে অপেক্ষা করছে।
এ রোড সাইড কার পার্কিংটা ফিলোসফিক্যাল হল থেকে পঞ্চাশ গজের মত দূরে হবে। সোজা মাথার সামনে একটা ছোট বাগান। প্রাচীর ঘেরা। প্রাচীরটা ফিলোসফিক্যাল হলকেও বেষ্টন করেছে। বাগানটা হলেরই অংশ বুঝল আহমদ মুসা।
পার্কিং-এর পার্ক ষ্টান্ড আছে ৭টা। সবগুলোই শূন্য। একটি মাত্র গাড়ি দাঁড়িয়ে, সেটা আহমদ মুসার।
ঠিক পাঁচ মিনিটের মাথায় একটা লাল গাড়ি এসে পার্ক করল আহমদ মুসার গাড়ির বাম পাশে।
গাড়ির জানালা পথে আহমদ মুসা দেখতে পেল শক্ত ও লম্বা গড়নের এক বুদ্ধিদীপ্ত যুবককে।
গাড়ি দাঁড়াতেই যুবকটি তাকাল আহমদ মুসার গাড়ির দিকে। চোখা-চোখি হয়ে গেল আহমদ মুসার সাথে। যুবকটির চোখে ছিল অনুসন্ধানী দৃষ্টি এবং সেই সাথে প্রথম দৃষ্টিতেই ছিল একটা চমকে ওঠা ভাব। কিন্তু পরক্ষণেই যুবকটির মুখ উজ্জ্বল হাসিতে ভরে গেল। হাসতে হাসতেই গাড়ি খুলে বেরিয়ে এল। বলে উঠল চিৎকার করে, ‘হ্যাল্লো মি. জে জে।’
ছুটে এল যুবকটি আহমদ মুসার গাড়ির দিকে।
গাড়ির কাছে আসতেই আহমদ মুসা গাড়ির দরজা খুলে দিয়ে তাকে স্বাগত জানাল।
যুবকটি গাড়িতে ঢুকে সিটে বসে দরজা টেনে বন্ধ করে দিল। তারপর কোটের পকেট থেকে একটা ইনভেলাপ বের করে আহমদ মুসার হাতে দিয়ে বলল, ‘বোধ হয় খুব গুরুত্বপূর্ণ ও জরুরি। পাওয়ার পর মুহূর্ত নষ্ট না করে ছুটতে হয়েছে।’
ভ্রুকুঞ্চিত হলো আহমদ মুসার। কথাগুলোকে অপ্রয়োজনীয় ও কৈফিয়ত ধরনের বলে মনে হলো তার কাছে।
‘ধন্যবাদ’ বলে আহমদ মুসা ইনভেলাপটিকে উল্টে-পাল্টে দেখল। আবারও ভ্রুকুঞ্চিত হলো তার। ইনভেলাপের কোথাও JAJ -এর জলছাপ নেই।
আহমদ মুসা তাকাল যুবকটির দিকে। বলল, ‘ইনভেলাপ বদল হয়েছে। আমার ইনভেলাপ কোথায়?’ শান্ত কিন্তু শক্ত কণ্ঠস্বর আহমদ মুসার।
যুবকটি হেসে উঠে আহমদ মুসার কথা উড়িয়ে দেবার চেষ্টা করে বলল, ‘আপনি কি জ্যোতিষী নাকি যে, ইনভেলাপ খোলার আগেই এমন কথা বলছেন। ইনভেলাপ খুলে দেখুন।’
‘ইনভেলাপের ভেতরটা পরে দেখব। আগে বলুন ইনভেলাপটা কোথায়?’ আগের মতই স্থির কণ্ঠে বলল আহমদ মুসা।
‘আপনি কি বলছেন আমি বুঝতে পারছি না। ইনভেলাপ তো দিয়েছি। কি আছে দেখুন। তারপর তো বলবেন!’ বলল যুবকটি অনেকটা কৈফিয়তের সুরে।
আহমদ মুসা তার দুচোখের সবটুকু দৃষ্টি নিবদ্ধ করেছিল যুবকটির মুখের উপর। ভাবনা তার মনে, যুবকটি বারবার ভেতরটা দেখতে বলছে কেন? এ ইনভেলাপ আসল ইনভেলাপ সে দাবী কিন্তু করছে না সে। তার মানে ভেতরটা ঠিক থাকা সম্পর্কে সে নিশ্চিত। আর এর অর্থ হলো ভেতরটা সে দেখেছে। আর তার দেখার অর্থটা কি?’
কঠোর হয়ে উঠল আহমদ মুসার মুখ। বলল যুবকটিকে, ‘মেসেজের ফটোকপি যেটা আপনি করেছেন, সেটা দি.........।’
আহমদ মুসা কথা শেষ করতে পারলো না। যুবকের ডান হাতটা যেটা ওপাশে ছিল, ছুটে এল রিভলবার নিয়ে। আহমদ মুসার মাথা লক্ষ্যে তাক করল সে রিভলবার। বলল, ‘যা আমি কল্পনা করেছিলাম, তার চেয়েও তুমি চালাক। কিন্তু বেশি চালাকের......।
যুবকটিও কথা শেষ করতে পারলো না। আহমদ মুসার বাম হাত চোখের পলকে উঠে এসে যুবকটির রিভলবার ধরা হাতের কব্জী ধরে উপর দিকে পুশ করল, অন্যদিকে আহমদ মুসার মাথা তীরের মত নেমে গিয়ে আঘাত করেছে যুবকটিকে।
আকস্মিক আঘাতে যুবকটি ছিটকে গিয়ে গাড়ির দরজার সাথে ধাক্কা খেল। অন্যদিকে তার রিভলবার ধরা হাতকে উপর দিকে পুশ করার সময়ই যুবকটি গুলী করল। গুলীটা গিয়ে আঘাত করল গাড়ির ছাদকে।
যুবকটি সিট ও দরজার মাঝখানে কোনঠাসা হয়ে পড়েছিল। তাকে শামলাতে গিয়ে আহমদ মুসার ডান হাত ওদিকে এনগেজ হয়ে পড়েছিল। আর বাম হাত যুবকটির রিভলবার ধরা ডান হাতের সাথে লড়াই করছিল। যুবকটি তার ডান হাতকে আহমদ মুসার দিকে এনে তাকে রিভলবারের টার্গেটে আনবার চেষ্টা করছিল। দুহাতের লড়াই-এ সুবিধা পাচ্ছিল যুবকটিই বেশি। কারণ আহমদ মুসার শক্তি ও মনোযোগের বিরাট অংশ ব্যয় হচ্ছিল যুবকটিকে চেপে রাখতে গিয়ে। অন্যদিকে কোনঠাসা অবস্থা থেকে মুক্তির চেষ্টা না করে সর্বশক্তি নিয়োগ করেছিল আহমদ মুসাকে কোনোভাবে গুলীর আওতায় আনার জন্যে।
এক সময় আহমদ মুসা যুবকটিকে ডান হাতে চেপে রেখে নিজের দেহটাকে আলগা করে নিল। তারপর চোখের পলকে ডান হাতটা তুলে নিয়ে দুহাত দিয়ে যুবকের রিভলবার ধরা ডান হাত চেপে ধরে জোরে ঠেলে দিল যুবকের দিকেই। রিভলবারের নলও ঘুরে গেল যুবকের দিকেই। যুবকটি তার হাতের চাপ বাড়িয়ে দিল হাত ঘুরিয়ে নেবার জন্যে। এটা করতে গিয়ে রিভলবারের ট্রিগারের উপর তার তর্জনি আকস্মিকভাবে চেপে বসল ট্রিগারের উপর। সংগে সংগে একটা গুলী বেরিয়ে তার বুককে এফাড়-ওফোড় করে দিল।
আহমদ মুসা চারদিকে চেয়ে দেখল আশেপাশে কেউ নেই।
আহমদ মুসা যুবকটির রিভলবার ধরা হাত বাম হাত দিয়ে ধরে রেখে ডান হাত দিয়ে গাড়ির দরজা খুলে ফেলল। ওদিকে যুবকটির গাড়ির দরজা খোলাই ছিল।
আহমদ মুসা দ্রুত যুবকটিকে গাড়িতে নিয়ে যুবকটির পকেটগুলো সার্চ করল। তার কোটের ভেতরের পকেটেই পেয়ে গেল চার ভাজ করা একটা বড় কাগজের শিট। একটু খুলেই বুঝল জর্জ আব্রাহাম জনসনের পাঠানো মেসেজের একটা কপি। কাগজটি পকেটে পুরল আহমদ মুসা। মানিব্যাগ ছাড়া কোন পকেটেই আর কোন কাগজ ছিল না।
আহমদ মুসা যুবকটির গাড়ি থেকে বেরিয়ে গাড়ির দরজা বন্ধ করে দিল। যুবকটির ডান হাতের কাছেই পড়ে থাকল তার রিভলবার। তদন্তকারীরা দেখবে রিভলবারটির একটা গুলী যুবকের বুকে এবং দেখবে রিভলবারের বাঁটে যুবকেরই হাতের ছাপ।
এসব কথা ভাবতে ভাবতে আহমদ মুসা ফিরে এল তার গাড়িতে। যুবকের দেয়া ইনভেলাপ পড়েছিল গাড়ির সিটে। দ্রুত ইনভেলাপটি খুলে ভেতর থেকে কাগজ বের করল। খুলল। দেখল, যুবকের কাছ থেকে যে মেসেজটি পেয়েছে তারই মূল কপি এটা।
আহমদ মুসা ইনভেলাপসহ মেসেজের দুটো শিট পকেটে পুরল। দুহাত থেকে গ্লাভস খুলে পাশের সিটে রেখে গাড়ি ষ্টার্ট দিল। আর একবার চারদিকে চেয়ে দেখল রোড-সাইড বা এ পার্কে আর কোন গাড়ি নেই, মানুষও নেই।
আহমদ মুসার গাড়ি উল্টো পথে যাওয়া শুরু করল। ঘোরা পথ দিয়ে সে জেফারসন হাউজে ফিরে আসবে। চলছে গাড়ি।
হঠাৎ আহমদ মুসার মনে পড়ল ড. হাইম হাইকেলের কথা। আসার সময় তিনি বলেছিলেন সি.আই.এ, পুলিশ ও এফ.বি.আই-এর প্রতি দুজনের একজন ‘অপারেশন মেগা ফরচুন গ্রুপ’ মানে ইহুদী লবির সাথে সংশ্লিষ্ট অথবা সহানুভুতিশীল। কিন্তু তাই বলে এফ.বি.আই- প্রধানের বিশেষ গ্রুপের মধ্যেও ওরা ঢুকে পড়েছে! আহমদ মুসার ধারণা এফ.বি.আই-এর যে মেয়েটি সেদিন তাদেরকে এয়ারপোর্ট থেকে জেফারসন হাউজে রেখে গিয়েছিল, সে মেয়েটির মত এ যুবকটিও এফ.বি.আই-এর বিশেষ কেন্দ্রীয় গ্রুপের সাথে সংশ্লিষ্ট।
আহমদ মুসা জেফারসন হাউজে ফিরে নিজ ঘরে এসে কাপড় ছাড়তে ছাড়তে ভাবল, দুর্ঘটনার কথা এফ.বি.আই. প্রধান জর্জ আব্রাহাম জনসনকে জানাতে হবে। তাঁর কিছু করণীয় থাকতেও পারে। কিন্তু তার আগে তাঁর পাঠানো মেসেজটা দেখা দরকার।
আহমদ মুসা মোবাইলটি বিছানায় বালিশের পাশে রেখে মেসেজ শিট নিয়ে শুয়ে পড়ল।
শুয়ে পড়ে আহমদ মুসা মেসেজ শিটটি চোখের সামনে তুলে ধরল। পড়া শুরু করল সে ঃ
‘বিশ বছরের পুরানো মিলিটারী ডকুমেন্টগুলোকে আনক্লাসিফায়েড করে ন্যাশনাল আরকাইভস ও মিলিটারী আরকাইভসে পাঠানো হয়েছে। সংশ্লিষ্ট ডকুমেন্টটি ক্লাসিফায়েড ডকুমেন্ট ছিল না। তাই আন-ক্লাসিফায়েডও হয়নি এবং সে কারণে ন্যাশনাল আরকাইভস-এ রাখার উপযুক্তও বিবেচনা করা হয়নি। অপ্রয়োজনীয় ও সময়োত্তীর্ণ বিধায় বিভাগ থেকেই একে নষ্ট করে ফেলা হয়েছে। শুধু একটা কপি সংরক্ষণ করা হয় ‘মিউজিয়াম অব মিলিটারী হিষ্ট্রি’-এর মহাফেজখানায়। কিন্তু সেখানকার রেকর্ডে একে ‘মিষ্ট্রিয়াস মিসিং লিষ্টে’ রাখা হয়েছে। এ বিষয়ে কোন তদন্ত না হওয়ায় ডকুমেন্টটার ব্যাপারে আর কিছুই বলা যাচ্ছে না।’
মেসেজ পড়ে হতাশ হলো আহমদ মুসা। আরও দুঃখ হলো এই কারণে যে, অকাজের এ বিষয়টা নিয়ে একজন লোকের জীবনও গেল।
এ সম্পর্কিত সাত-পাঁচ অনেক চিন্তা এসে চেপে ধরল আহমদ মুসাকে। গ্লোব হকের লগ ও অর্ডার শিট উদ্ধার না হলে প্রমাণ করা যাবে না গ্লোব হকের রিমোট কনট্রোল সেদিন দুটি সিভিল এয়ার লাইন্সের প্লেনকে টুইনটাওয়ারে টেনে এনেছিল। কিন্তু গ্লোব হকের ঐ লগ ক্লাসিফায়েড হলো না কেন? কেউ এর সাথে কোন গোপন, কৌশলগত বা অস্বাভাবিক কোন কিছু জড়িত দেখেনি বলেই বোধ হয়। রুটিন কোন কিছু তো ক্লাসিফায়েড হয় না। ভয়াবহ ষড়যন্ত্রের ঐ মিশনকেও রুটিন বলে চালিয়ে দেয়া হয়েছে! শীর্ষ পর্যায়ের সংশ্লিষ্ট সবাই কি তাহলে ঘটনার সাথে জড়িত ছিল!
পাশ ফিরল আহমদ মুসা। আবার মনোযোগ দিল মেসেজটির দিকে। আবার পড়ল আহমদ মুসা হতাশা পীড়িত মন নিয়ে।
এবার হঠাৎ মেসেজের শেষ লাইনে চোখ আটকে গেল আহমদ মুসার। একটা জিনিসের হারিয়ে যাওয়াকে ‘মিষ্ট্রিয়াস মিসিং লিষ্টে’ আনা হলো, কিন্তু সে ব্যাপারে তদন্ত হলো না কেন? তদন্তের উপযুক্ত না হলে কোন বিষয়কে মিষ্ট্রিয়াস মিসিং লিষ্ট-এ আনা হবে কেন? আনা হলে রহস্য উদ্ধারের জন্যে তদন্ত হবে না কেন? বিষয়টাকে কি চাপা দেয়া হয়েছে? কেন চাপা দেয়া হলো? কোন চাপের কারণে কি? কে চাপ দিল? এ সব প্রশ্নের জবাব পেলে মিসিং ডকুমেন্টেরও খোঁজ পাওয়া যাবে নিশ্চয়। হতাশার মধ্যে একটা আশার আলো জ্বলে উঠল আহমদ মুসার সামনে। এই আলোর উৎস মিলিটারী হিষ্ট্রির মিউজিয়ামে তাকে যেতে হবে, ভাবল আহমদ মুসা।
আবার পাশ ফিরল আহমদ মুসা। হাতের কাছে পড়ল মোবাইলটা। মোবাইলটা হাতে তুলে নিল আহমদ মুসা।
হাতের চার আঙুলের উপর মোবাইলটা রেখে বৃদ্ধাঙ্গুলি কয়েকটা ডিজিটাল নাম্বারে চাপ দিল। মোবাইলের স্ক্রীনে ভেসে উঠল এফ.বি.আই প্রধান জর্জ আব্রাহাম জনসনের নাম্বার।
সংযোগ হয়ে গেল।
ওপার থেকে জর্জ আব্রাহাম জনসনের কণ্ঠ শুনতে পাওয়ার সাথে সাথেই আহমদ মুসা বলল, ‘আমি জোসেফ জন বলছি স্যার। গুড ইভিনিং।’
‘ইভিনিংটা গুড রাখলে কোথায়?’ বলল জর্জ আব্রাহাম জনসন হাল্কা কণ্ঠে।
‘সব শুনেছেন জনাব?’
‘ঘটনার রেজাল্ট শুনলাম। ঘটনা তো তুমি বলবে। আমি নিশ্চিত যে সে বিশ্বাসঘাতকতা করেছিল। কি করেছিল সে?’
‘ইনভেলাপ পাল্টেছিল।’
‘ইনভেলাপ পাল্টেছিল? তার মানে ভেতরের মেসেজ পাল্টেছিল, অথবা কপি নিয়েছিল?’
‘কপি নিয়েছিল।’
‘ইনভেলাপ পাল্টানো বুঝলে কি করে?’
‘প্রথমেই আমি ইনভেলাপটা চেক করি। তাতে যে গোপন JAJ জলছাপ থাকার কথা তা পাইনি। তখনই বিষয়টা আমার কাছে পরিষ্কার হয়ে যায় যে সে ডাবল এজেন্ট। সে ইনভেলাপ খুলে মেসেজ পাল্টেছে, অথবা কপি নিয়েছে। আমি যখন তার কাছে আসল ইনভেলাপ চাইলাম এবং অবশেষে চিঠির ফটোকপি তার কাছে চাইতে গেলাম, তখন সে রিভলবার বের করে।’
‘তারপর সে সম্ভবত নিজের রিভলবারে নিজের গুলীতেই প্রাণ হারায়।’ বলল জর্জ আব্রাহাম জনসন।
‘জনাব রিভলবারেও তারই ফিংগার প্রিন্ট পাওয়া যাবে। তবে আমি তার এ পরিনতি চাইনি। আমি চেয়েছিলাম তাকে আটক করে মেসেজের কপি নিয়ে নিতে।’ আহমদ মুসা বলল। কণ্ঠ তার ভারী হয়ে উঠেছিল।
‘দুঃখ করো না জোসেফ জন। বিশ্বাসঘাতকের এই পরিণতিই কাম্য। তোমার জন্যে না হলেও আমার জন্যে এটা অপরিহার্যভাবে কাম্য ছিল। তোমাকে ধন্যবাদ জন। এখন বল, কি করবে তুমি? ‘লগ’ তো পাচ্ছ না।’
‘আমি হতাশ নই। আশার আলো দেখতে পাচ্ছি আমি।’ আহমদ মুসা বলল।
‘কিভাবে, কোথায় তুমি আশার আলো দেখতে পাচ্ছ?’ জিজ্ঞাসা জর্জ আব্রাহাম জনসনের।
‘আপনার মেসেজের শেষ বাক্যে।’ আহমদ মুসা বলল।
‘সংগে সংগে ওপার থেকে জবাব এল না জর্জ আব্রাহাম জনসনের। একটু পর বলল, ‘বুঝেছি, তুমিই তদন্তে নামতে চাও। সত্যি আহমদ মুসা তুমি অনন্য। স্রষ্টা সব নেয়ামত তোমার উপর ঢেলে দিয়েছেন। আমি নিজেও কিন্তু এ পথটার কথা ভাবিনি।’
কথা শেষ করে একটু থেমেই আবার বলল,‘ঠিক আছে, এখন এ পর্যন্তই। আমার কিছু করার থাকলে তা জানাতে দেরি করবে না। ধন্যবাদ। বাই।’
‘অবশ্যই জনাব। বাই।’ আহমদ মুসার কথা শেষ হতেই ওপার থেকে লাইন কেটে গেল।
আহমদ মুসাও কল অফ করে মোবাইল রেখে দিয়ে আবার একটা পাশ ফিরল। কিন্তু চোখ বন্ধ করতে পারলো না। হাতঘড়ির এ্যালার্ম বেজে উঠল।
আসরের নামাজের এলার্ম। উঠে বসল আহমদ মুসা।
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now