বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
ধ্বংস টাওয়ারের নীচে
চ্যাপ্টার- ৪
বাকি অংশ
‘নিউইয়র্ক অ্যাটোমিক ল্যাবরেটরী’র ডকুমেন্ট ডেলিভারি কাউন্টার।
সময় সকাল ৮টা। সবেমাত্র অফিস খুলেছে। দিনের কাজ গোছ-গাছ করে নিচ্ছে সবাই। ডেলিভারি কাউন্টার ল্যাবরেটরির সম্মুখভাগের একটি কক্ষ। কক্ষটির দরজা ঠেলে প্রবেশ করলেই ডেলিভারী কাউন্টার। কাউন্টারে বসে আছে একজন যুবক এবং একজন তরুণী।
কাউন্টারের ফাইল-পত্র গোছ-গাছ করে সেলফের ফাইল, প্যাকেট চেক করে ঠিক-ঠাক করে রেখে দুজনে চেয়ারে এসে বসল।
ঘরে এসে প্রবেশ করল একজন লোক। মাথায় হ্যাট। দুপাশের কানের নিচ পর্যন্ত নামানো জুলফি।
গোঁফ অর্ধ চন্দ্রের আকারে মুখের উপরটা ঘিরে রেখেছে। পরনে কাউবয় প্যান্ট ও শার্ট। পায়ে ফিল্ড বুট।
লোকটার গোটাটাই একজন কাউবয়-এর প্রতিকৃতি।
লোকটা সোজা এসে যুবকটির সামনে দাঁড়াল। একটা ইনভেলাপ থেকে একটা রিসিট বের করে তুলে দিল যুবকটির হাতে।
যুবকটি রিসিটের উপর চোখ বুলাতেই ভ্রুকুঞ্চিত হয়ে উঠল তার। দ্রুত চোখ তুলে তাকাল সে লোকটির দিকে।
লোকটিরও দুচোখ বাজের মত আটকে ছিল যুবকটির উপর। যুবকটির চোখ-মুখের পরিবর্তন তার দৃষ্টি এড়ায়নি, হ্যাটের ছায়ায় তার চোখ-দুটি শক্ত হয়ে উঠেছে।
যুবকটি লোকটির দিকে তাকিয়ে বলল, ‘স্যার একটু বসুন।’
‘ডকুমেন্ট আগেই কাউন্টারে আসার কথা। নির্দিষ্ট সময়ের চারদিন পরে আসছি।’ বলল লোকটি।
‘এসেছে স্যার। এবার ফাইনাল চেকটা করে আসি।’ বলে উঠে দাঁড়াল যুবকটি।
‘ঠিক আছে ডকুমেন্টটা দিন। আমি দেখতে থাকি। আপনি চেক করে আসুন।’ বলল লোকটি স্থির কণ্ঠে।
যুবকটি উঠে শেলফ থেকে একটা ফোল্ডার বের করে কাউন্টারে এল। বলল, ‘এই তো আপনার ডকুমেন্ট। একটু বসুন। আমি স্যারকে দিয়ে চেক করিয়েই নিয়ে আসছি।’
লোকটি কাউন্টারের ধার ঘেঁষে দাঁড়িয়েছিল। বাজের মতই ছোঁ মেরে লোকটি যুবকটির হাত থেকে ফোল্ডারটি নিয়ে নিল।
যুবকটি চিৎকার করতে যাচ্ছিল।
কিন্তু লোকটি এক হাতে ফোল্ডার কেড়ে নিয়েছে, অন্য হাত দিয়ে বের করেছে রিভলবার এবং সে রিভলবার তাক করেছে যুবককে। সেই সাথে একবার রিভলবার ঘুরিয়ে এনেছে তরুণীর দিক থেকেও।
যুবকটি হা করেছিল, কিন্তু তার কণ্ঠ থেকে চিৎকার বেরুল না। নিজেকে সামলে নিয়েই সে বলে উঠল, ‘স্যার আমাদের বিপদে ফেলবেন না। আমরা চাকুরি হারাব। ওটা আমাকে দিন।’
যুবকটি কোন কথা বলল না। রিভলবারের ট্রিগার টিপল পরপর দুবার যুবক ও তরুণীকে লক্ষ্য করে। রিভলবার থেকে দুজনের দিকে দুগুচ্ছ ধোয়া বেরিয়ে গেল। সংগে সংগেই দুজন সংজ্ঞা হারিয়ে ঢলে পড়ল।
লোকটি ফোল্ডারটা একবার দেখে নিয়ে বেরিয়ে এল ঘর থেকে।
ল্যাবরেটরি থেকে বেরিয়ে লোকটি পার্কিং-এ রাখা একটি ট্যাক্সি ক্যাবে উঠে বসল। বলল, ‘চলুন থার্ড এভেনিউ-এর স্প্রিং টাওয়ারে।’
গাড়ি চলতে শুরু করল।
কাউবয় বেশে কামাল সুলাইমান আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করল। আরও শুকরিয়া আদয় করল হাতে পাওয়া রিপোর্টের জন্যে। ডাষ্টের কমপোনেন্ট এ্যানালিসিসে পরিষ্কার বলা হয়েছে, ডাষ্টে ডেমোলিশন পাউডারের উপস্থিতি ধ্বংসকারী মাত্রায় রয়েছে।
থার্ড ষ্ট্রিটের স্প্রিং টাওয়ারে যখন কামাল সুলাইমানের গাড়ি পৌছল, তখন সকাল ৯টা।
স্প্রিং টাওয়ারের প্রথম তিনটি ফ্লোর নিয়ে ‘ল্যাবরেটরি অব ফিজিক্যাল এক্সপ্লেনেশন’ কাজ করছে। এক তলায় কাষ্টমারস সার্ভিস ডিপার্টমেন্টের দুটি উইং। একটা ডিপোজিটস, আরেকটা ডিজবারসমেন্ট।
কামাল সুলাইমান প্রবেশ করল ডিজবারসমেন্ট ডিপার্টমেন্টে। এর অনেকগুলো বিভাগ। কামাল সুলাইমান রিসিট বের করে দেখল তাকে বিল্ডিং ম্যাটেরিয়ালস সেকশনে যেতে হবে। কামাল সুলাইমান এদিক-ওদিক খুঁজে এক প্রান্তে গিয়ে পেল সেকশনটি। প্রবেশ করল কক্ষে। কাউন্টারে দুজন যুবক বসে। কাউন্টারের সামনে একপ্রান্তে সোফায় বসে আছে আরও দুজন।
কামাল সুলাইমান কাউন্টারে গিয়ে এক টুকরো কাগজে লেখা একটা নাম্বার একজন যুবকের দিকে এগিয়ে দিয়ে বলল, ‘এই নাম্বারের ডকুমেন্ট ডেলিভারির জন্যে রেডি কিনা।’
যুবকটি নাম্বার দেখেই তার রেজিষ্টারের দিকে তাকাল।
তাকানোর সংগে সংগেই তার চোখে-মুখে একটা উত্তেজনা ফুটে উঠল। তাকাল সে পাশের যুবকের দিকে এবং এগিয়ে দিল তার দিকে চিরকুটটি। দ্বিতীয় যুবকটি চিরকুটের নাম্বারটি দেখেই তাকাল সামনের সোফায় বসা যুবক দুজনের দিকে। বলল, এই যে শুনুন, ইনি ঐ ডকুমেন্টের খোঁজে এসেছেন।
সংগে সংগেই সোফায় বসা দুজন যুবক স্প্রিং-এর মত লাফিয়ে উঠল। একযোগে দৌড় দিল কামাল সুলাইমানের দিকে। তাদের দুজনেরই একটি করে হাত কোটের পকেটে।
চোখের পলকে কামাল সুলাইমানের ডান হাত পকেট থেকে ক্লোরোফরম রিভলবার নিয়ে বেরিয়ে এল। ওরাও তখন রিভলবার বের করছে। কামাল সুলাইমানের রিভলবার ‘দুপ’ ‘দুপ’ শব্দ করে উঠল দুবার। দুবার ট্রিগার টিপেই কামাল সুলাইমান তার রিভলবার ঘুরিয়ে নিল কাউন্টারের দুজন যুবকের দিকে। দেখল, যুবকদের একজন ইন্টারকমের বোতাম টিপে কিছু বলার জন্যে মুখ খুলেছে। কিন্তু কামাল সুলাইমানের রিভলবার তাদের দিকে ঘুরতে দেখে থেমে গেছে।
কামাল সুলাইমান বাম হাত বাড়িয়ে ইন্টারকমের সুইচ অফ করে দিয়ে বলল, ‘ওদের দুজনকে ঘুম পাড়িয়ে দিয়েছি, কিন্তু তোমাদের দুজনের মাথা গুড়িয়ে দেব যদি ডকুমেন্টটা দিতে এক মুহূর্ত দেরি কর।’
বলে কামাল সুলাইমান বাম হাত দিয়ে দ্বিতীয় রিভলবার বের করে তাদের দিকে তাক করল। আর ডান হাতের ক্লোরোফরম রিভলবার পকেটে রেখে দিল।
যুবক দুজন কাঁপতে কাঁপতে উঠে দাঁড়াল। একজন বলল, ‘আমাদের আপত্তি নেই স্যার। কিন্তু আমাদের উপর নিষেধ আছে। দিচ্ছি স্যার।’
বলে যুবকটি একটু এগিয়ে তাদের পেছনের সেলফ থেকে একটা ফাইল বের করে কামাল সুলাইমানের হাতে দিল।
কামাল সুলাইমান ফাইলের ভেতর ত্বরিত একবার চোখ বুলিয়ে বন্ধ করে দিল। বলল, ‘নিষেধ করেছে কেন? ওরা কারা?’
‘জানি না, ওরা খুব পাওয়ারফুল স্যার। আমাদের কোম্পানীর প্রেসিডেন্টকেই ওরা বাধ্য করে ফেলেছে। আমাদের চাকরি থাকবে না স্যার। উপরন্তু আমাদের বিপদ হবে এ ফাইল আমরা দিয়েছি বলে। আপনি কিছুক্ষণ পরে এলে ফাইল পেতেন না। ওরা নিয়ে যেত। ওরা ফাইলও চায়, আপনাদেরকেও ধরতে চায়।’
‘ধন্যবাদ সহযোগিতার জন্যে। ভয় নেই তোমাদের চাকরি থাকবে। ওদের মত তোমরাও সংজ্ঞা হারিয়ে পড়ে থাকবে। তাহলে তোমাদের দোষ দেবার সুযোগ থাকবে না।’ বলে কামাল সুলাইমান প্যাকেট থেকে আবার ক্লোরোফরম রিভলবার বের করে ক্লোরোফরম বুলেট ফাটিয়ে ওদের সংজ্ঞাহীন করে দিল।
দ্রুত বেরিয়ে এল ঘর থেকে। বেরুবার সময় ঘরটাকে লক করল যাতে করে এ বিল্ডিং থেকে তার বেরুনো পর্যন্ত এ ঘরে কেউ না ঢুকতে পারে।
বিল্ডিং থেকে বেরিয়ে এল কামাল সুলাইমান। ট্যাক্সি ক্যাবে ফিরে এল।
সিটে বসে রুমাল দিয়ে কপালের ঘামটা মুছতে মুছতে ট্যাক্সি ক্যাবের ড্রাইভারকে উদ্দেশ্য করে বলল, ‘আরও একটা অফিসে যাব। এবার চলুন কুইন্স-এর মার্টিন লুথার কিং এভেনিউতে। এভেনিউ-এর উত্তর প্রান্তে পশ্চিম পাশ ঘেঁষে পার্ক আছে। পার্কের দক্ষিণ পাশ ঘেঁষে আরেকটা ষ্ট্রিট। পার্কের অপজিটে ষ্ট্রিটের মুখে একটা চারতলা বাড়ি। ওটা ‘ল্যাবরেটরি অব সাইন্সেস’। ওখানে যাব।
‘ওকে স্যার। কিন্তু জায়গাটাতো অনেক দূর।’ বলল ড্রাইভার।
‘আপনি কি অসুবিধা মনে করছেন?’ কামাল সুলাইমান বলল।
‘না স্যার। আমার কোন অসুবিধা নেই। এখন ব্রীজ, ট্যানেল সবটাতেই প্রচন্ড জ্যাম। বেশ দেরি হবে। বোর হবেন। এজন্যেই বললাম।’ বলে ড্রাইভার ষ্টার্ট দিল। সেই সাথে অন করে দিল তার ক্যাসেট প্লেয়ার।
চলতে লাগল গাড়ি।
আর ক্যাসেট প্লেয়ারে নরম, মিষ্টি সুরের আরবী বাজনা বেজে উঠল।
একটু শুনল কামাল সুলাইমান। না, খাঁটি আরবী বাজনা, একটা বিখ্যাত আরবী যন্ত্র সংগীত।
ভ্রুকুঞ্চিত হলো কামাল সুলাইমানের। বলল, ‘ড্রাইভার এমন ক্যাসেট আপনি কোথায় পেলেন? জানেন আপনি এ গান কোন ভাষার?’
‘জানি স্যার। আরবী ভাষার। আপনি পছন্দ করবেন বলে লাগালাম।’ ড্রাইভার বলল।
‘আমি পছন্দ করব কি করে বুঝলেন?’ কামাল সুলাইমানের কণ্ঠে বিস্ময়।
‘আপনি তো মুসলমান। তাই।’
‘আমি মুসলমান কি করে বুঝলেন?’ এবার কামাল সুলাইমানের কণ্ঠে বিস্ময়ের সাথে উদ্বেগও।
‘স্যার এ পর্যন্ত আপনি দুবার গাড়ি থেকে নেমেছেন। নামার সময় দুবারই আপনি বিসমিল্লাহ বলেছেন। আস্তে বললেও আমি শুনতে পেয়েছি। আবার প্রথমবার গাড়িতে উঠার সময়ও আপনি এইভাবে বিসমিল্লাহ বলেছেন।’ ড্রাইভার বলল।
‘বিসমিল্লাহ শব্দটা আপনি কি করে বুঝলেন? আর মুসলমানরা এটা বলে কি করে জানলেন?’
‘স্যার জানব না কেন? আমি তো মুসলমান।’
‘মুসলমান? কিন্তু আপনি তো পুরাপুরি আমেরিকান শ্বেতাংগ।’
‘জি স্যার। আমি তখন ছোট। সে সময় আমার আব্বা-আম্মাসহ গোটা পরিবার ইসলামে কনভার্ট হয়। আমি গত বছর আমার স্ত্রীসহ হজও করেছি স্যার।’
‘মোবারকবাদ। মোবারকবাদ। খুব খুশি হলাম। আপনার নাম কি?’
‘আগে আমার নাম ছিল ‘অ্যান্টনীয় আব্রাহাম’। ইসলামে আসার পর আমার নাম হয়েছে ‘আহমদ ইব্রাহিম’। নামটা রাখেন আমাদের এলাকা ব্রুকলিনের এক মসজিদের ইমাম।’
‘তুমি তোমার ধর্ম ইসলামকে খুব ভালবাস, তাই না?’
‘অবশ্যই স্যার। টাওয়ার ধ্বংসের পর দুঃসময়কালে আমার আব্বা ও আমরা আমাদের সবকিছু দিয়ে মুসলিম ভাইদের সাহায্য করেছি, বাড়িতে তাদের অনেককে আশ্রয় দিয়েছি। খৃষ্টান ও ইহুদী শ্বেতাংগদের অন্যায়ের মোকাবিলা করেছি।’ বলল ড্রাইভার।
‘টুইনটাওয়ার কারা ধ্বংস করেছে মনে করেন?’
‘যারাই করুক স্যার, মুসলমানরা করেনি। কারণ টুইনটাওয়ার, টুইনটাওয়ারের মালিক, কিংবা সেখানে যারা মরেছে, তাদের সাথে মুসলমানদের কোন শত্রুতা ছিল না। মুসলমানরা কারণ ছাড়া এ ঘটনা ঘটাবে তা যুক্তিসংগত নয়।’
‘সুন্দর যুক্তি দিয়েছেন। কিন্তু দায়টা মুসলমানদের ঘাড়ে চাপল কেন?’ জিজ্ঞাসা কামাল সুলাইমানের।
‘দায় তো কারও না কারও ঘাড়ে চাপাতেই হয়। মুসলমানদের ঘাড়ে চাপানো তখনকার সরকারের জন্যে লাভজনক ছিল।’
‘লাভজনক কোন দিক দিয়ে?’ বলল কামাল সুলাইমান। তার মুখে হাসি।
‘আমাদের তদানিন্তন সরকারের আফগান ও ইরাক পলিসির ক্ষেত্রে এটা লাভজনক হয়েছে। কিন্তু স্যার মুসলমানদের অপূরণীয় ক্ষতি হয়েছে। ক্ষতির বোঝা এখনও তাদের বইতে হচ্ছে।’
‘খুব সুন্দর বলেছেন।’
‘মাফ করবেন স্যার। আপনাকে আমেরিকান মনে হয়, কিন্তু উচ্চারণ আমেরিকান নয়।’
‘আমি আমেরিকান নই। কিন্তু আমেরিকান সেজেছি।’
‘স্যারের নাম কি জানতে পারি?’ বলল ড্রাইভার।
‘অবশ্যই। আমার নাম কামাল সুলাইমান। তবে এ নামে আমাকে এখন ডাকবেন না এবং আপনার নামটাও মুখে নেবেন না বাইরে। আমি এখন পুরোপুরি আমেরিকান। নাম কুনার্ড সুলিভান।’
‘বুঝেছি স্যার। মুসলমানদের বহু ক্ষেত্রেই নাম ভাঁড়িয়ে কাজ করতে হয়।’
কামাল সুলাইমান ও ড্রাইভার আহমদ ইব্রাহিমের মধ্যে এমন আলাপ চলল ‘ল্যাবরেটরি অব সাইন্সেস’ পৌছা পর্যন্ত।
বিশাল মার্টিন লুথার কিং এভেনিউ-এর ধার ঘেঁষে ‘ল্যাবরেটরি অব সাইন্সেস’ এর বিল্ডিংটা।
রাস্তার বিশালত্বের তুলনায় গাড়ি কম। মানুষ তো চোখেই পড়ে না।
ল্যাবরেটরির সামনে পার্কিং-এর জায়গা আছে।
কামাল সুলাইমান ড্রাইভারকে বলল, ‘এমন জায়গায় গাড়ি পার্ক করুন যাতে বেরুতে কোন অসুবিধায় পড়তে না হয়।’
‘ঠিক আছে স্যার।’ বলল ড্রাইভার।
‘আর স্যার নয়, ভাই বলবেন। সব সম্পর্কের চাইতে এই ভাই সম্পর্ক সবচেয়ে বড় মুসলমানদের জন্যে।’
‘ধন্যবাদ স্যা...... ভাই।’ বলল আহমদ ইব্রাহিম হাসি মুখে।
গাড়ি পার্ক হলে নামার সময় কামাল সুলাইমান কাঁধে ঝুলানো সাইড ব্যাগ থেকে দুটি ফোল্ডার ফাইল ড্রাইভারের হাতে দিয়ে বলল, ‘এ দুটি জিনিস আপনার কাছে কিছুক্ষণের জন্যে আমানত থাকল। আমি অফিস থেকে আসছি।’
বলে কামাল সুলাইমান বিসমিল্লাহ বলে গাড়ি থেকে নামল।
কামাল সুলাইমান প্রবেশ করল অফিসে।
প্রথমেই রিসিপশন।
রিসিপশনে দুজন লোক বসে।
কামাল সুলাইমানকে দেখেই তার দিকে এমনভাবে তাকাল যেন তারই জন্যে তারা উন্মুখ হয়ে অপেক্ষা করছে।
চিন্তার একটা কালো মেঘ উঁকি দিল কামাল সুলাইমানের মনে। কিভাবে এটা সম্ভব? তাহলে এখানে খবর পৌছেছে। তার চেহারা ও পোশাকের বিবরণও কি এসেছে। মনে মনে নিজেরই একটু সমালোচনা করল কামাল সুলাইমান, তার পোশাক পাল্টানো উচিত ছিল।
কিন্তু এখন তার পিছানোর পথ নেই। তাকে তৃতীয় ডকুমেন্টটি যোগাড় করতেই হবে। এটাই আমেরিকার সবচেয়ে সম্মানিত প্রামাণ্য ল্যাবরেটিরি। মনে পড়ল আহমদ মুসার উপদেশ, দুনিয়াতে একমাত্র শিশা ছাড়া সবকিছুর মধ্যে ফাঁক আছে। সেই ফাঁক বা দুর্বলতা তোমাকে খুঁজে বের করতে হবে।
দ্বিধা দূর হয়ে গেল কামাল সুলাইমানের মন থেকে।
সে মুখোমুখি হলো রিসিপশেনর। সে রিসিট দেখিয়ে জিজ্ঞাসা করল সেকশনটা কোন দিকে?
রিসিপশনের দুজনের মধ্যেই কেমন একটা চাঞ্চল্যের ভাব। তাদের একজন রিসিপশনের পাশেই টাঙানো বোর্ডের দিকে কামাল সুলাইমানের দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলল, ‘এই চার্টে সব দেখিয়ে দেয়া আছে স্যার।’
কামাল সুলাইমান দ্রুত চোখ বুলাল চার্টটায়। গ্রাউন্ড ফ্লোরেই পেয়ে গেল সেকশনটা। পথটাও খুব ঘোরানো নয়। রিসেপশনের পরেই কাষ্টমার লাউঞ্জ। লাউঞ্জ থেকে তিনটি করিডোর তিনদিকে বেরিয়ে গেছে। যে করিডোরটা উত্তরে এগিয়ে গেছে সেটা শেষ প্রান্তে পৌছার আগে এ থেকে একটা শাখা পশ্চিম দিকে এগিয়েছে। বাঁক নেয়ার পর উত্তর পাশের প্রথম কক্ষটাই ডাষ্ট এবং সোয়েল সেকশন।
কামাল সুলাইমান রিসেপশনিষ্টদের উদ্দেশ্যে ‘ধন্যবাদ’ বলে ভেতরে এগুলো।
লাউঞ্জে মুখোমুখি সোফায় তিনজন লোক বসেছিল। কামাল সুলাইমান লাউঞ্জে ঢুকলে তিনজনই বিভিন্ন ঢং-এ হলেও তাকে দেখে নিল। তাদের চেহারা ও দৃষ্টিকে ল্যাবরেটরির কাষ্টমারের বলে মনে হলো না কামাল সুলাইমানের কাছে।
কামাল সুলাইমান তাদের এড়িয়ে উত্তরের করিডোরে ঢুকে গেল। তার একটি হাত প্যান্টের পকেটে ভয়ংকর স্প্রেগানটার উপর, আরেকটি হাত জ্যাকেটের ডান পকেটে ক্লোরোফরম গানটার গায়ে।
করিডোরের বাঁকে পৌছে কামাল সুলাইমান দেখল সোজা করিডোরটার শেষ প্রান্তে একটা দরজা। দরজা খোলা। দরজার পরে একটা প্রশস্ত ল্যান্ডিং। সেখানেও তিনজন লোক বসে। কামাল সুলাইমান নিশ্চিত ওরাও তারই জন্যে অপেক্ষা করছে। কিন্তু বিস্মিত হলো কামাল সুলাইমান। তাকে চেনার পরেও কেন আক্রমণ করতে এগিয়ে আসছে না। তাহলে কি কামাল সুলাইমান ডকুমেন্ট হাতে নেয়ার পর শতভাগ নিশ্চিত হয়ে তাকে হাতে-নাতে ধরবে! খুশি হলো কামাল সুলাইমান। সেও এটাই চায়।
কামাল সুলাইমান বাঁক ঘুরে দ্রুত এগিয়ে ঘরটির দরজায় গিয়ে দাঁড়াল।
নব ঘুরিয়ে দরজা ঠেলে ঘরে প্রবেশ করল এবং সেই সাথে দরজার লক টিপে বন্ধ করে দিল দরজা।
কাউন্টারে একজন যুবক বসেছিল। আর কাউন্টারের সামনে দাঁড়িয়েছিল আরও তিনজন যুবক।
চারজনই টের পেয়েছিল দরজা লক করার দৃশ্য। ওরা দরজার দিকেই তাকিয়েছিল। যেন ওরা অপেক্ষা করছিল।
তিনজন দাঁড়ানো যুবকের একজনের হাতে ছিল মোবাইল। কামাল সুলাইমানকে প্রবেশ করতে দেখেই সে পকেটে রাখল মোবাইলটা। ওদের মুখে কিছুটা কৌতুকের হাসি।
কামাল সুলাইমানের দুহাত পকেটের দু’রিভলবার। সে আশা করেছিল ওরা আক্রমণে আসবে। তার খবরটা আগেই এরা পেয়ে গেছে মোবাইলে। কিন্তু না তারা আক্রমণে এল না। তারা তিনজনই কাউন্টার থেকে পাশে একটু দক্ষিণে সরে গেল। ব্যাপার তাহলে এটাই যে, ওরা শতভাগ নিশ্চিত হবার জন্যে ডকুমেন্টটা নেয়া অথবা অন্তত চাওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করতে চায়। মনে মনে হাসল কামাল সুলাইমান।
কামাল সুলাইমান কাউন্টারে বসে থাকা যুবকটির সামনে দাঁড়িয়েরিসিট ও ক্লোরোফরম রিভলবারসহ ডানহাত বের করল।
কামাল সুলাইমানের রিভলবার ধরা হাতটি দ্রুত তিনজন যুবকের লক্ষ্যে উপরে উঠে এল।
শেষ মুহূর্তে ওরাও টের পেয়ে গিয়েছিল। একজন যুবকের পকেটে রাখা হাত দ্রুত বের হয়ে এল। তার হাতে রিভলবার।
অন্য দুজন বিমূঢ় হয়ে পড়েছিল আকস্মিক রিভলবারের মুখোমুখি।
কামাল সুলাইমান পরপর তিনবার ট্রিগার টিপল তার ক্লোরোফরম রিভলবারের। প্রথম ক্লোরোফরম বুলেট ছুটে গেল যে রিভলবার তাক করছিল সে যুবকের দিকে।
কিন্তু বেপরোয়া ক্ষিপ্র যুবকটি তার দিকে ক্লোরোফরম বুলেট বিস্ফোরিত হওয়ার মুখেই ট্রিগার টিপেছিল।
কামাল সুলাইমান রিভলবারের ট্রিগার টেপার অবস্থায়ই কাত হয়ে কাউন্টারের দিকে শরীরটাকে সরিয়ে নিতে চেষ্টা করেছিল। কিন্তু বুকটা তার রক্ষা পেলেও বাম বাহু রক্ষা পেল না। যুবকটির ছোঁড়া বুলেট বাম বাহুর একটা অংশ বিধ্বস্ত করে বেরিয়ে গেল।
এদিকে কামাল সুলাইমানের ছোড়া ক্লোরোফরম চোখের পলকে ওদের তিনজনকেই ঘুম পাড়িয়ে দিয়েছিল।
গলগলিয়ে রক্ত নামছিল কামাল সুলাইমানের বাম বাহু দিয়ে।
কিন্তু সেদিকে নজর দেবার সময় ছিল না কামাল সুলাইমানের। রিভলবারের শব্দ নিশ্চয় বাইরে ওরা শুনেছে। ওরা এখনই ছুটে আসবে।
কামাল সুলাইমান ফিরে দাঁড়িয়েছে কাউন্টারের যুবকটির দিকে।
কামাল সুলাইমান ইতিমধ্যে ক্লোরোফরম রিভলবার পকেটে রেখে ডান হাত দিয়ে বাঁ পকেট থেকে তার ভয়ংকর স্প্রেগান বের করে নিয়েছে।
টর্চ আকারের গানটি যুবকের দিকে তাক করে বলল, ‘রিসিটের ফাইলটি দিয়ে দাও, না হলে তোমার মাথা ভর্তা হয়ে যাবে।’
যুবকটি কাঁপছিল। বলল, ‘দিচ্ছি স্যার।’
বলেই যুবকটি ছুটল সেলফের দিকে।
যুবকটি ওদিকে গেলে কামাল সুলাইমান গানটি কাউন্টারে রেখে ডান হাত দিয়ে ব্যাগ থেকে একটা গ্যাসমাস্ক ও মার্বেলের মত দুটি বল বের করে নিল।
ঘরের দরজায় এ সময় ধাক্কা শুরু হলো।
বুঝলো কামাল সুলাইমান ওরা এসে গেছে।
কামাল সুলাইমান-এর বাম হাত দুর্বল হয়ে পড়েছে। উপরে তুলতে কষ্ট হচ্ছে। একহাত দিয়েই কামাল সুলাইমান গ্যাস-মাস্কটি পরে নিল মুখে।
অনেক কষ্টে গানটি বাম হাত দিয়ে ধরল। তার ডান হাতে থাকল দুটি গ্যাস বোম।
যুবকটি ফাইলটা নিয়ে কাউন্টারে এল।
‘খোল ফাইলটা, দেখি ঠিক আছে কিনা।’ কামাল সুলাইমান যুবককে নির্দেশ দিল।
যুবক মেলে ধরল ফোল্ডারটা।
ঠিক বিষয়ের রিপোর্ট ফাইলে আছে দেখল কামাল সুলাইমান।
বাইরে থেকে তখন দরজা ভাঙার চেষ্টা হচ্ছে।
যুবককে ফাইলটি বন্ধ করতে নির্দেশ দিয়ে বলল, ‘ফোল্ডারটা আমার ব্যাগে ঢুকিয়ে দাও।’
কম্পমান যুবকটি ফোল্ডারটা কামাল সুলাইমানের কাঁধে ঝুলানো ব্যাগে তুলে দিল।
‘থ্যাংকস’ বলে কামাল সুলাইমান পেছনে হটে দরজায় এল। দাঁড়াল দেয়াল ঘেঁষে। তারপর আস্তে ডান হাতটা নবের কাছে এগিয়ে নিয়ে দ্রুত নব ঘুরিয়ে দরজা আনলক করেই ডান হাত টেনে নিল।
দরজায় প্রচন্ড ধাক্কা চলছিল। আর মাঝে মাঝে নব ঘুরানো হচ্ছিল প্রাণপনে।
কামাল সুলাইমান দরজা আনলক করে হাত টেনে নিতেই বাইরের চাপে প্রচন্ড গতিতে দরজা খুলে গেল।
সংগে সংগেই কামাল সুলাইমান ডান হাতের একটা বল ছুড়ে মারল দরজার বাইরে। পটকা ফাটার মত শব্দ হলো। কোন ধোয়া বেরুল না। কিন্তু সংজ্ঞাহরনকারী মারাত্মক গ্যাস বাতাসের চেয়ে শতগুণ দ্রুত গতিতে চারদিকে ছড়িয়ে পড়ল।
কামাল সুলাইমান দেখল, কাউন্টারের যুবকটি জ্ঞান হারিয়ে টেবিলের উপর লুটিয়ে পড়েছে।
এবার কামাল সুলাইমান মুখ বাড়ালো বাইলে। দেখল, দশ বারোটি সংজ্ঞাহীন দেহ করিডোর ভরে তুলেছে। তাদের মধ্যে আগের দেখা তিন তিন ছয়জনও আছে। অবশিষ্টরা অফিসের সিকিউরিটি বা কৌতুহলী লোক হবে।
কামাল সুলাইমান ছুটল।
কামাল সুলাইমান কাউন্টারে এসে দেখল, কাউন্টারের একজন ছুটে এসে টেলিফোন হাতে তুলে নিয়েছে।
রক্তাক্ত কামাল সুলাইমানকে দেখে তার হাত থেকে টেলিফোন পড়ে গেল। ভয়ে তার মুখ ফ্যাকাসে হয়ে গেছে। এ সময় উপর তলা থেকে কজনকে সিঁড়ি বেয়ে নিচে নেমে আসতে দেখা গেল।
কামাল সুলাইমান হাতের অবশিষ্ট গ্যাস বোম মেঝেতে ছুড়ে মেরেই দৌড় দিল ল্যাবরেটরির কার পার্কিং-এর দিকে।
ড্রাইভার আহমদ ইব্রাহিম, ল্যাবরেটরির দিকে তাকিয়ে গাড়ির কাছে দাঁড়িয়েছিল।
কামাল সুলাইমানকে দৌড়াতে দেখে এগুলো সে সামনে। কামাল সুলাইমানকে রক্তাক্ত দেখে বিস্ময় ও উদ্বেগে তার মুখ পাংশু হয়ে গেল।
‘কি ঘটেছে? আপনি ঠিক আছেন স্যা........ ভাই?’
‘ঠিক আছি। বাম বাহুটা মাত্র আহত। গাড়ির দরজা খুলে দিন।’ বলল দ্রুত কণ্ঠে কামাল সুলাইমান।
আহমদ ইব্রাহিম তাড়াতাড়ি গাড়ির দরজা খুলে ধরল।
গাড়িতে ঢুকে গেল কামাল সুলাইমান। বলল, ‘তাড়াতাড়ি গাড়িতে উঠুন। গাড়ি ছাড়–ন। পরে বলছি সব।’
উদ্বিগ্ন ড্রাইভার আহমদ ইব্রাহিম বুঝল কোন বড় বিপদ ঘটেছে কামাল সুলাইমানের এবং বিপদ তার এখনও কাটেনি।
আহমদ ইব্রাহিম তাড়াতাড়ি গাড়িতে উঠে গাড়ি ষ্টার্ট দিল। বলল, ‘কোন দিকে যাব?’
‘গাড়িটা আগে দূরে সরিয়ে নিন, তারপর বলছি।’ কামাল সুলাইমান বলল।
‘ভাই সাহেব আপনর বিষয় কিছুই জানি না আমি। শুধু জেনেছি আপনি আমার এক ভাই এবং এটা আপনিই আমাকে স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন। আপনি যদি ভাইকে বিশ্বাস করেন, তাহলে অনুরোধ করছি আমার বাসায় চলুন। আমার মনে হয় ওটা বুলেট ইনজুরি। আরও এক দেড় ঘণ্টা দেরি করা ক্ষতিকর হবে।’ বলল গম্ভীর কণ্ঠে আহমদ ইব্রাহিম।
হাসল কামাল সুলাইমান। বলল, ‘আপনি না করার পথ একেবারে বন্ধ করে দিয়েছেন। চলুন, আপনার বাসায় যাব।’
‘ধন্যবাদ, ভাই সাহেব।’ বলল আহমদ ইব্রাহিম হাসি মুখে।
সে নড়ে চড়ে বসল ড্রাইভিং সিটে। ছুটে চলল গাড়ি।
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now