বাংলা গল্প পড়ার অন্যতম ওয়েবসাইট - গল্প পড়ুন এবং গল্প বলুন
বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ

সবুজ শহর - (পর্ব -৩)

"সাইন্স ফিকশন" বিভাগে গল্পটি দিয়েছেন গল্পের ঝুরিয়ান Sayemus Suhan (০ পয়েন্ট)

X জানালার চৌকাঠে বসে এখনও ধাক্কাধাক্কি করছে তৈমুর আর সালমা, নামার চেষ্টায়। বাইরে দাঁড়িয়ে নখ কামড়াচ্ছে তৃণা। ‘ধরো ওটাকে!’ চিৎকার করে বলল তরু। ‘কোনখানে ধরব?’ চেঁচিয়ে জবাব দিল সাব্বির। ‘ধরার মত জায়গা তো দেখছি না।’ ‘যেখানে খুশি!’দিপুকে শক্ত করে ধরে একটানে শূন্যে তুলে নিয়ে আলমারির দিকে ঘুরে গেল দানবটা। ওটাকে ধরার জন্য লাফ দিয়েছিল তরু আর সাব্বির। দানবটা ঘুরে যাওয়ায় পড়ল এসে ওটার পিঠের ওপর। মেঘের মত দেখালেও গা-টা অনেক শক্ত।ধাক্কাটা বেশ জোরেই লাগল।পলকের জন্য রেগে যাওয়া একটা ভয়ঙ্কর মুখ চোখে পড়লতরুর, ধারাল দাঁত, লালা গড়াচ্ছে। ঝাড়া দিল ওটা। উড়ে চলে গেল তরু। ভাগ্যিসমেঝেতে বা শক্ত কিছুর ওপরপড়ল না, পড়ল দিপুর বিছানায়। একটা মুহূর্তের জন্য হতচেতন হয়ে রইল। ঘোরের মধ্যে যেন দেখল, অবশেষে জানালা ডিঙাল তৃণা, দৌড়ে গিয়ে লাথি মারলদানবটার পাছায়। একেবারে সময়মত কাজটা করেছে। কারণ তখন সাব্বিরকে ধরে ওর মাথাটা কামড়ে ছিঁড়ে ফেলারচেষ্টা করছে ওটা। ‘মর শয়তান, পচা ডোবার পিচ্ছিল শামুক কোথাকার!’ গালি দিল তৃণা। আবার একই জায়গায় লাথি মারল। তাতে গায়ে কতটা ব্যথা পেল দানবটা, বোঝা গেল না, তবে মনে নিশ্চয় খুব ব্যথা পেয়েছে। হয়তো অপমানিত বোধকরল। একে তো মেয়েমানুষের লাথি, তার ওপর বিশ্রী গালাগাল। সাব্বিরকে হাত থেকে ছেড়ে দিল। তবে দিপুকে ছাড়ল না। তৃণার সাহায্যে এগিয়ে গেল তৈমুর। ঘরে একটা বেজবল ব্যাট খুঁজে পেয়েছে। তৃণাকে তুলে নেয়ার জন্য নিচু হলো দানবটা। এই সুযোগে দানবের মাথায় ব্যাট দিয়ে বাড়ি মারল তৈমুর, যতটা জোরে পারল। মনে হলো, আঘাতটা বেশ ব্যথাদিয়েছে দানবটাকে। টলে উঠলওটা। দিপুও ঢিল হয়ে গেল ওটার হাতে। পিছলে পড়ে গেলমেঝেতে। এখনও বেহুঁশ। বোঝাই যাচ্ছে, খুব বেশি মতাশালী নয় দানবটা। সহজেইকাবু হয়ে যাচ্ছে। দিপুকে তোলার চেষ্টা করল না। বরংপালাতে চাইল। ঘুরে দাঁড়িয়ে নখওয়ালা একটা থাবা বাড়িয়ে দিল আলমারির দিকে। সবুজ একটা ফোকরের মত হয়ে আছে আলমারির পিছনে। লাফ দিয়ে বিছানা থেকে নেমে চেঁচিয়ে উঠল তরু, ‘যেতে দিয়ো না! যেতে দিয়ো না! ওটার পেছন পেছন যাও!’ বলে সে-ই প্রথমে দানবের পেছনে ছুটল। উজ্জ্বল সবুজআভার দিকে। তৈমুর আর তৃণাগেল ওর পেছনে। মেঝেতে পড়েব্যথা পেয়েছে সাব্বির। উঠতে কিছুটা দেরি হলো ওর।আর সালমা দ্বিধা করতে গিয়ে দেরি করে ফেলল। তাই সে আর সাব্বির গেল সবার পরে। সবুজ ফোকরটার কাছে সময়মত পৌঁছতে পারল না। ওরা ঢোকার আগেই বন্ধ হয়ে গেল ভিন্ন জগতে যাওয়ার পথ। তরুদের সঙ্গে যেতে পারল না ওরা। মেঝেতে দাঁড়িয়ে হাঁপাতে লাগল। হতবুদ্ধি হয়ে গেছে। গুঙিয়ে উঠল মেঝেতে পড়ে থাকা দিপু। ‘ওরা চলে গেছে,’ ফিসফিস করেনিজেকেই যেন বলল সালমা, যেন বিশ্বাস করতে পারছে না। সত্যিই গেছে। কারণ ঘরে ওরা তিনজন ছাড়া আর কেউ নেই। বিষণœ ভঙ্গিতে মাথা ঝাঁকাল সাব্বির। ‘কিন্তু কোথায়?’সাতজুগরকে অনুসরণ করতে গিয়ে কান্ত হয়ে পড়েছে তিশা। বিরামহীনভাবে ছুটে চলেছে ছেলেটা। অসম্ভব প্রাণশক্তি। কান্ত হওয়ার কোন লণই নেই। পাহাড়ের ঢালবেয়ে যেমন স্বচ্ছন্দ্যে নামছে, উঠছেও ততখানি সহজেই। আজব এক সবুজ দেশ। আকাশে আলোর পরিবর্তন হচ্ছে না, একই রকম মৃদু সবুজ আভা বিকিরণ করে চলেছে, ভুতুড়ে করে রেখেছে সবকিছু। মনে হচ্ছে সবুজ অন্ধকার। খেয়াল করে দেখতেগেলে কেমন মাথা গরম হয়ে যেতে চায়। এমন অদ্ভুত আকাশ! ভাবল তিশা। মনে পড়ল, ওপর দিকে দেখাতে গিয়ে জুগর বলেছিল, স্বপ্নলোকের পর্দা! এতই নিচে, যেন হাত বাড়ালেই ছোঁয়া যাবে। সরু একটা নালার কাছে এল ওরা। কুলকুল করে বয়ে চলেছে। থামল জুগর। গম্ভীর স্বরে বলল, ‘ইচ্ছে করলে পানি খেয়ে নিতে পারো। তবে তাড়াতাড়ি করবে।’ পানির কিনারে গিয়ে বসল তিশা। ‘পানিটা ভাল?’ জিজ্ঞেস করলও। ‘ক্রিটাইনে সব পানিই ভালো পানি,’ জুগর জবাব দিল। ‘তাহলে তুমি খাচ্ছ না কেন?’ ‘আমার তৃষ্ণা পায়নি।’ ‘কিন্তু অনেকণ ধরে তো হাঁটছি আমরা।’ ‘মানুষরা অনেক বেশি দুর্বল। সহজেই কান্ত, তৃষ্ণার্ত হয়ে যায়, আমাদের ক্রিটাইনবাসীর চেয়ে অনেক তাড়াতাড়ি।’ লম্বা কোঁকড়া চুল হাত দিয়ে একপাশে ঠেলে সরাল তিশা। পানির ওপর ঝুঁকল। অঞ্জলি ভরে পানি তুলে মুখে দিল। টলটলে পরিষ্কারতরল। কিছুটা গরম। আর এক ধরনের মিষ্টি গন্ধ, মধুর মত। তবে সব মিলিয়ে খুব ভাল স্বাদ। পেটে যেতেই দ্রুত শক্তি ছড়িয়ে পড়তে লাগল শরীরে, তাজা হয়ে উঠছে। ‘মানুষের বিরুদ্ধে তোমার অভিযোগটা কিসের?’ জিজ্ঞেসকরল ও। নিচ থেকে ওপর দিকে তাকিয়ে জুগরের পায়ের পাতার ওপর চোখ পড়ল। প্রতিপায়ে চারটে করে আঙুল। একটা করে বুড়ো আঙুল, বাকিগুলো ছোট। আর তখনই ল করল, হাতেও চারটে করে আঙুল। একটা করে আঙুল কম থাকায় ওদের অসুবিধে হয় কি না ভাবছে তিশা, এ সময় জবাব দিল জুগর, ‘না, মানুষের প্রতি কোন অভিযোগ নেই আমার।’ ‘আমার আগে আর কোন মানুষের সঙ্গে দেখা হয়েছে তোমার?’ দ্বিধা করে জবাব দিল জুগর,‘খুব সামান্য সময়ের জন্য।’ ‘কোথায় ওরা এখন? রাজধানী যুহারে?’ ‘না।’ ‘তাহলে কোথায়?’ ‘ঢেঁকুরদের পেটে।’ মুখ কোঁচকাল তিশা। ‘তুমি নিজের চোখে ওদেরকে খেতে দেখেছ?’ ‘হ্যাঁ।’ ‘ওদের সাহায্য করার জন্য কিছু করনি?’ ‘না।’ রেগে গেল তিশা। ‘কেন করনি?বোলো না, ও নিয়ে তোমার কোনমাথাব্যথা ছিল না।’ থমকে গেল জুগর। ‘অনেক বেশিঢেঁকুর ছিল। একা আমার পে ওদের সঙ্গে লড়াই করা সম্ভব ছিল না।’ ওর কণ্ঠে খুব মৃদু অনুশোচনার ছোঁয়া বোঝা গেল। উঠে দাঁড়াল তিশা। ‘তোমাদের রাজা ব্রোমা ওদের এভাবে খোলামেলা চলতেদিচ্ছেন কেন?’ তীè দৃষ্টিতে তিশার দিকে তাকাল জুগর। ধমকে উঠতে গিয়েও উঠল না। আরেক দিকে চোখ ফেরাল। ‘আমি জানি না,’ মৃদুস্বরে বলল ও। ‘এই এলাকায় ঘুরে বেড়াচ্ছ কেন তুমি? যদি এতই বিপজ্জনক হয়ে থাকে?’ ‘অনেক বেশি প্রশ্ন করো তুমি, তিশা।’ ‘এগুলো ভাল প্রশ্ন। আমার জানা দরকার। এই এলাকায় কিজন্য এসেছ তুমি?’ চিন্তিত দেখাল জুগরকে। ‘এই এলাকাটা নিষিদ্ধ এলাকা। এখানে এসেছি ঢেঁকুরদের নিয়ে গবেষণার জন্য। ওদের জীবনপ্রণালী জানতে চাই।’ ‘কেন?’ ‘ব্রোমার কাছে রিপোর্ট করতে হবে।’ ‘সেজন্যই তোমাকে এখানে পাঠিয়েছেন ব্রোমা?’ ‘না। আমি আমার নিজের ইচ্ছেয়ই এসেছি।’ ‘ব্রোমার কাছে ঢেঁকুরদের বিষয়ে জানিয়ে তোমার লাভ কি?’ ‘যাতে ওদের বিরুদ্ধে ব্রোমাকে সজাগ করতে পারি।তাহলে ঢেঁকুরদের বংশবিস্তার থামানোর জন্য সেনাবাহিনী পাঠাবেন ব্রোমা।’ ‘একটা কথা বলি, কিছু মনে কোরো না। তোমাকে দেখে আমার চেয়ে বেশি বয়সী মনে হয় না। একজন তরুণকে তাঁর সঙ্গে দেখা করে এত কথা বলার সুযোগ কি দেবেন রাজা?’ ‘দেবেন। কারণ তিনি আমার চাচা।’ ‘তার মানে তুমি রাজার ভাতিজা?’ ‘হ্যাঁ।’ হাসল তিশা। ‘খুব ভাল। খুশিহলাম।’ ‘খুশি হতে তো বলিনি আমি।’ ‘আমি যে খুশি হয়েছি, এটা শুনে সত্যিই কি ভাল লাগছেনা তোমার? বুকে হাত দিয়ে বলতে পারো? একজন মানুষের মেয়েকে কি এতই অসুন্দর লাগছে তোমার কাছে?’ মাথা নামাল জুগর। ‘তোমার পানি খাওয়া শেষ হয়েছে, তিশা?’ ‘শুধু তিশা বলে ডেকো আমাকে।’ ‘তোমার শেষ হয়েছে?’ ‘হ্যাঁ। কিন্তু এত দ্রুত কি চলতেই হবে তোমাকে? আমিকান্ত হয়ে গেছি।’ ‘রাত নামার আগেই যুহারে ফিরতে হবে আমাদের।’ ‘কী বলছ তুমি? এখন কি রাত নয়?’ মাথা নাড়ল জুগর। ‘না। তোমাদের পৃথিবীতে রাত হতেপারে, তবে আমাদের এই স্বপ্নলোকে এখন দিন। রাতের বেলা কিছুই দেখা যায় না। আর তখনই ঢেঁকুরদের সুযোগ। ভয়ানক বিপজ্জনক হয়ে ওঠে ওরা।’ কেঁপে উঠল তিশা। ‘এই এলাকায় কি অনেক বেশি ঢেঁকুর আছে?’ থামল জুগর। নাক উঁচু করে বাতাস শুঁকল। ‘হ্যাঁ, অনেকআছে। সবখানেই ছড়িয়ে আছে ওরা। তাড়াতাড়ি করা দরকার আমাদের।’ নালাটার দিক থেকে ঘুরে দাঁড়াল ও। সরে এল। ওকে অনুসরণ করল তিশা। আবার একটা কান্তিকর পাহাড়বেয়ে ওঠা। ‘কথা বলব? চুপচাপ থাকতে ভাল লাগছে না,’ তিশা বলল। ‘অনর্গল বকবক তো করেই চলেছ। নাহ্, তোমার কথার কবল থেকে নিস্তার নেই। ঠিক আছে, বলো, তবে স্বর নামিয়ে, প্লিজ।’ ‘বাহ্, প্লিজ বললে। খুশি হলাম।’ ‘আমি তোমাকে বলেছি, তোমাকেখুশি করার কোন ইচ্ছে আমারনেই।’ ‘তোমার কথা বিশ্বাস করলাম,’ তিশা বলল। ‘আচ্ছা, ওই যে বললে, ঢেঁকুরদের বংশবিস্তার থামানোর জন্য- ওরা কি সংখ্যায় খুব বেশি বেড়ে যাচ্ছে?’ ‘সে-রকমই মনে হলো।’ ‘ওরা দেখতে কেমন? মানে বড়সড় কোনও জন্তুর মত?’ ‘না।’ ‘বুঝিয়ে বলবে, প্লিজ?’ ‘তুমি তো আক্রান্ত হয়েছিলে। ওটাকে দেখনি?’ ‘ভাল করে দেখার সুযোগ পাইনি। মনে হয়ে বেহুঁশ হয়ে গিয়েছিলাম।’ ‘কোথা থেকে এসেছে ওরা? অন্য প্রাণীর মত ওদেরও বাচ্চা আছে?’ ভাবল জুগর। তারপর বলল, ‘এটা এক রহস্য। এ নিয়ে যুহারের জ্ঞানী পুরুষ নারীরা অনেক তর্ক করেছে।’ আবার ভাবল ও। মনে হলো কেঁপে উঠল। তারপর বলল, ‘কারও কারও মতে অবচেতন মনের ভয় থেকে ওদের জন্ম।’ ভ্রƒকুটি করল তিশা। ‘তার মানে? তোমার লোকের ওদের সৃষ্টি করে?’ মাথা নাড়ল জুগর। বনের দিকে তাকাল। ‘এখানে এ বিষয়ে আলোচনা করাটা ঠিক হচ্ছে না।’ দ্বিধা করে স্বর নামিয়ে তিশা বলল, ‘বুঝলাম। কৌতূহলটা আসলে বেশি দেখিয়ে ফেলছি।’ ‘ঢেঁকুরদের ব্যাপারে বেশিকৌতূহল ভাল নয় মোটেও।’ ‘মানুষের জন্য?’ ‘সবার জন্য,’ জুগর বলল। ‘ব্রোমা কেমন লোক?’ ‘রাজা আবার কেমন হয়? রাজাদের মতই।’ ‘সে তো বুঝলাম। কিন্তু মানুষ হিসেবে কেমন?’‘কোন কিছুকেই না,’ জুগরের জবাব। পাহাড়ের উপত্যকা ধরে ঝোপঝাড়ের ভেতর দিয়ে দৌড় দিল ওরা। ঘন গাছের ভেতর দিয়ে দৌড়াতে অসুবিধে হচ্ছে তিশার, তা ছাড়া বারবার শিকড়ে হোঁচট খেয়েপড়ছে। তবে ওর জন্য স্বস্তির ব্যাপার হলো, কিছুতেই ওকে পেছনে ফেলে যাচ্ছে না জুগর। প্রতিবারপড়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে থেমে গিয়ে হাত ধরে টেনে তুলছে। পেছনে শোনা যাচ্ছে ছুটে আসা অসংখ্য পায়ের শব্দ। ওদের শব্দ শুনতে পাচ্ছে তিশা, কিন্তু দেখতে পাচ্ছে না। ব্যাপারটা ওর ভয় আরও বাড়িয়ে দিল। অবশেষে নদীর কিনারে পৌঁছল ওরা। দম ফুরিয়ে গেছে তিশার। তবু থামল না। জুগরের সঙ্গে নদীর উজানের দিকে দৌড়ে চলল। এক জায়গায় এসে ওকে থামিয়েদিল জুগর। ‘আর দৌড়ে লাভ নেই। দেরি হয়ে গেছে।’ ‘মানে?’ হাঁপাতে হাঁপাতে জিজ্ঞেস করল তিশা। বাতাস শুঁকল জুগর। ‘ওরা গুহাটা চেনে। আমাদের উদ্দেশ্য টের পেয়ে শর্টকাটে আগে চলে গেছে। সামনে থেকে এখন হামলা চালাবে আমাদের ওপর।’ মনে মনে সাহস সঞ্চয় করল তিশা। ‘আমাদের বাঁচার কি কোনই উপায় নেই?’ ভুরু উঁচু করল জুগর। ‘কী হবে, জানি না। রুখে দাঁড়াব। যদি মরতেই হয়, মরার আগে যে ক’টাকে পারি, শেষ করে দেব।’ ‘কিন্তু মরার কথা ভাবি না আমি। আমাকে বাঁচতে হবে।’ পেছনের পকেট থেকে একটা ছুরি বের করল জুগর। বাড়িয়ে দিল তিশার দিকে। অবশেষে ওর চোখে সমবেদনা দেখতে পেল তিশা। ‘প্রথমে লড়াই করবে’, জুগর বলল। ‘যদি দেখো হেরে যাচ্ছ, কোনমতেই আর পারবে না, নিজেকে মেরে ফেলো। কোনমতেই ওদের হাতে ধরা দিয়ো না।’ আতঙ্কিত হয়ে ছুরিটা ঠেলে সরিয়ে দিল তিশা। ‘না,’ দম আটকে আসছে ওর। ‘আমি সেটা করতে পারব না। নিজের জীবন নিজে নিতে পারব না।’ আবার ছুরিটা ওর দিকে ঠেলেদিল জুগর। ‘কিছুতেই ওদের কাছে ধরা দিয়ো না,’ কোমল কণ্ঠে বলল ও। ‘ওরা তোমাকে কি কষ্ট দেবে, কল্পনাই করতে পারবে না। তারচেয়ে মৃত্যু ভাল।’ মতিশা হয়ে মাথা নাড়ল তিশা। সবুজ অন্ধকার বনের ভেতরে পায়ের শব্দ এগিয়ে আসছে। হঠাৎ করেই ভয় কোথায় উধাও হয়ে গেল তিশার। প্রচণ্ড সাহস যেন জোয়ারের পানির মত প্লাবিত করে দিল মনকে। ‘না, আত্মহত্যা কখনই ভাল নয়,’ হাত বাড়িয়ে ছুরিটা নিতে নিতে বলল ও। ‘আমি ধরাও দেব না। যদি মরতেই হয়, ঢেঁকুরদের সঙ্গে লড়াই করতে করতে মরব।’ এই প্রথম হাসতে দেখা গেল জুগরকে। ‘তুমি একজন সাহসী মানুষ, তিশা।’ তবে এই সাহসী কথা পরের কয়েক মিনিটে তিশাকে কোনই সাহায্য করতে পারল না। বাঁয়ে একটা সবুজ বস্তুপিণ্ড চোখে পড়ল তিশার। পাক খেয়ে সেদিকে ঘুরে গেল জুগর। তীর ছুড়ল।ছোট্ট তীরটা উড়ে গেল গাছের ফাঁক দিয়ে। অন্ত্রভেদী একটা চিৎকার দিয়ে পড়ে গেল দানবটা। সঙ্গে সঙ্গে বাঁ দিকে আরওদুটো সবুজ দানব উদয় হলো। ভয়ঙ্কর চেহারা। চোখ জ্বলছে আগুনের মত। তীর ছুড়ে একটাকে মেরে ফেলল জুগর। কিন্তু ধনুকে আবার তীর পরানোর আগেই তৃতীয়টা ওদের ধরতে এল। টান দিয়ে তলোয়ার বের করল জুগর। ওর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল দানবটা। চোখের পলকে ঘটে গেল এতগুলো ঘটনা। ছুরি তুলে দানবটার পিঠে বসিয়ে দিতে গেল তিশা। টের পেল, ওর পেছনে এসে দাঁড়িয়েছে একটামস্ত আকৃতি। ছুরি বসানো আর হলো না। ঘুরে গিয়ে দেখতে পেল, মস্ত একটা থাবাওর দিকে ছুটে আসছে। প্রচণ্ড আঘাতে চোখে যেন সর্ষে ফুল দেখতে লাগল ও। মাথাটা মনে হলো ফেটে যাবে। তারপর ঘন অন্ধকার।আটতৃণা, তরু আর তৈমুরের মনে হলো, আকাশ থেকে নিচে পড়ছে ওরা। রাতের অন্ধকার থেকে সবুজ অন্ধকারে। কিন্তু মাটিতে পড়ে একটুও ব্যথা পেল না। অদ্ভুত ব্যাপার। পড়েই লাফিয়ে উঠে দাঁড়াল। যে সবুজ জানোয়ারটাকে, কিংবা দানবটাকে অনুসরণ করে আলমারির পেছনের সবুজ ফোকর দিয়ে এখানে এসেছে ওরা, ওটাকে সামনে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখল। তাড়াতাড়ি একটা পাথর কুড়িয়ে নিয়ে ওটার মাথা ল্য করে ছুড়ে মারল তৃণা। দানবটা হয়তো ভাবল, অনেক হয়েছে, বিশ্রী এই মানুষের মেয়েটা বড়ই খারাপ! জোরে একবার গর্জে ওঠে, ঘুরে দাঁড়িয়ে ছুটে হারিয়ে গেল বনের ভেতরে। এটা কিসের বন? কোথায় রয়েছে ওরা? ভাবছে তিনজনেই। অবাক বিস্ময়ে একে অন্যের দিকে তাকাতে লাগল। ‘আমরা চলে এসেছি,’ কথাগুলো যেন ছিটকে বেরোল তৈমুরের মুখ থেকে। বিষণœ হয়ে আছে তৃণা। বনটার মতই বিষণ। ‘খুশি হওয়ার মত কোন কারণ দেখছি না এখনও,’ বলল ও। ভালমত পরিবেশটা দেখে নিল তরু, বিশেষ করে আকাশটা। মনে হচ্ছে যেন ঠিক ওদের মাথার ওপরে ঝুলে রয়েছে। সবুজ রঙের মৃদু আলো বিকিরণ করছে। বলল, ‘অন্য এক ডিমেনশনে চলে এসেছি আমরা, কোন সন্দেহ নেই। আশাকরি, তিশাও এখানেই এসেছে।’ ‘আর আশা করি,’ তৃণা বলল, ‘ওকে এখনও সবুজ দানবে খেয়েফেলেনি।’ ‘তিশার মৃত্যু নিয়ে আমরা কোন কথা বলব না বলে একমত হয়েছিলাম,’ মনে করিয়ে দিল তৈমুর। মাটির দিকে তাকাল তরু। হাত তুলে দেখাল। ‘ওই দেখো,দুই জোড়া পায়ের ছাপ। এক জোড়া তো তিশার বলেই মনে হচ্ছে।’ ছাপের পাশে নরম মাটিতে হাঁটু গেড়ে বসল তৈমুর। ‘দেখো,’ বলল ও, ‘এক জোড়া ছাপের চারটে করে আঙুল।’ তৈমুরের পাশে বসে তরুও ছাপগুলো পরীক্ষা করল। মাথা ঝাঁকিয়ে বলল, ‘এই ছাপযার, সে পৃথিবীর প্রাণী বলে মনে হচ্ছে না।’ ‘ছাপগুলো কোন দানবের নয় তো?’ তৃণার প্রশ্ন। মাথা ঝাঁকাল তরু। ‘আমি এখনশিওর, রাত নামার আগেই কোনওএকটা বিশেষ জায়গায় পৌঁছানোর চেষ্টা করেছে তিশার গাইড।’ থেমে কান পাতল ও। সামনে, নিচে পানিরশব্দ শোনা যাচ্ছে। বেশ কয়েকটা নালা পেরিয়ে এসেছেওরা, তবে এখন যেটার শব্দ শুনছে, সেটাকে রীতিমত নদী মনে হলো। ‘এই, তোমরা শুনতেপাচ্ছ?’ ‘পাচ্ছি,’ তৈমুর বলল। ‘পানির শব্দ।’ ‘না,’ হাঁটা থামাল না তরু। ‘বনের মধ্যে অন্য শব্দ হচ্ছে। আমাদের কাছাকাছিই।’ আলো নিভিয়ে দিল ও। গাঢ় অন্ধকার যেন গলা টিপে ধরল ওদের। ‘আরে কী করছ! জ্বালো! জ্বালো!’ হিসিয়ে উঠল তৃণা। ‘!’ সাবধান করল তরু। ‘আলো জ্বেলেও হয়তো ওদের দেখতে পাব না আমরা, তবে আলো থাকলে ওরা আমাদের ঠিকই দেখবে। তারচেয়ে নিরাপদে থাকার চেষ্টা করা ভাল।’ ‘এ মুহূর্তে একটুও নিরাপদ বোধ করছি না আমি,’ তৃণা বলল। ‘শুনছ?’ ফিসফিস করে বলল তরু। ‘শব্দটা কাছে আসছে।’ ‘আলো জ্বালো,’ মতিশা হয়ে বলল তৃণা। ‘নিশ্চয়ই ওই দানবগুলোর একটা। আলো দেখলে ভয়ে পালিয়ে যেতে পারে।’ ‘এই একটু আগে না বললে তুমিতা মনে করো না,’ তৈমুর বলল। ‘এখন করি!’ দাঁড়কাকের কর্কশ স্বর বেরোল তৃণার গলা থেকে। ‘চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকো,’ ঘনঅন্ধকারে দাঁড়িয়ে বলল তরু। ‘আমার মনে হয় না ওটা দানবের শব্দ। মনে হচ্ছে, মানুষের পায়ের।’ ‘চার আঙুলওয়ালা মানুষ, না পাঁচ আঙুল?’ উদ্বিগ্নকণ্ঠে জিজ্ঞেস করল তৃণা। ‘পাঁচ আঙুল হলে আমি বেশি খুশি হই।’ ‘ডাক দেব ওকে?’ তৈমুর জিজ্ঞেস করল। ‘না,’ তরু বলল। ‘আমাদের উপস্থিতি টের পেয়ে গেছে ও। তাই এদিকেই আসছে।’ ‘আমাদের চেঁচানো উচিত, যাতে শুনতে পায়,’ তৃণা বলল। মনে হলো, দাঁতে দাঁতেবাড়ি খাচ্ছে ওর। অসহ্য হয়ে উঠেছে উত্তেজনা। ‘তিশা হতে পারে,’ তৈমুর বলল। ‘তাহলে ধরে নিতে হবে গত কয়েক ঘণ্টায় গাঢ় অন্ধকারেদেখার মতা অর্জন করেছে ওরচোখ,’ বলল তরু। অপো করতে লাগল ওরা। ঘামছে। ঢিপ ঢিপ করে লাফাচ্ছে হৃৎপিণ্ড। শব্দটা, যতটা সম্ভব কম শব্দ করে, এগিয়ে আসছে। অবশেষে অন্ধকারে শোনা গেলএকটা কণ্ঠ, ‘এই, তোমরা তিনজনে তিশাকে চেনো?’ সাবধানে জবাব দিল তরু, ‘হ্যাঁ, চিনি। আমরা ওর বন্ধু। তুমি কে?’ ‘আমার নাম জুগর। তোমাদের পৃথিবীর সময়ের হিসেবে কয়েক ঘণ্টা আগে ওর সঙ্গে আমার দেখা হয়েছে। ওর সঙ্গে হেঁটেছি আমি।’ ‘ও এখন কোথায়?’ জিজ্ঞেস করল তরু। ‘তোমার সঙ্গে আছে?’ দ্বিধা করে জবাব দিল জুগর,‘না। ঢেঁকুররা ওকে ধরে নিয়ে গেছে?’ ‘ঢেঁকুর?’ তৃণা জিজ্ঞেস করল। ‘বিচ্ছিরি ওই সবুজ রঙের শামুকের মত পিচ্ছিল দানবগুলো?’ ‘হ্যাঁ।’ ‘ওদের নাম ঢেঁকুর কেন? সারাণ ঘাড়–ৎ-ঘুড়–ৎ করে ঢেঁকুর তোলে?’ ‘না। কেন ঢেঁকুর নাম রাখা হয়েছে আমি জানি না,’ জুগর জবাব দিল। আবার সামান্য দ্বিধা করে বলল, ‘ভয়ঙ্কর প্রাণী ওরা। তিশা এখন ভীষণ বিপদের মধ্যে রয়েছে।ওদের ক্যাম্পটা দেখেছি আমি। ওকে মুক্ত করার চেষ্টা করব।’ ‘ওকে নিতেই বা দিলে কেন?’ ধমকের সুরে বলল তৃণা। ‘এখনমুক্ত করতে চাও।’ ‘নিচের নদীর ধারে ঢেঁকুররা হামলা করেছিল আমাদের ওপর,’ জুগরের কথায় বিষণœতার ছোঁয়া। ‘একসঙ্গে অনেক ঢেঁকুর। গোটা ছয়েককে মেরে ফেলেছি আমি। লড়াইয়ে ব্যস্ত ছিলাম, তিশার দিকে মনোযোগ দিতে পারিনি। ওর চিৎকার শুনে দেখলাম, ঢেঁকুররা ওকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে।’ ‘বানিয়ে গল্প বলার ওস্তাদ তুমি,’ তৃণা বলল। ‘আহ্, তৃণা,’ রুকণ্ঠে বলল তরু, ‘অভদ্রতা কোরো ন


এডিট ডিলিট প্রিন্ট করুন  অভিযোগ করুন     

গল্পটি পড়েছেন ২১১২৩ জন


এ জাতীয় গল্প

গল্পটির রেটিং দিনঃ-

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now