বাংলা গল্প পড়ার অন্যতম ওয়েবসাইট - গল্প পড়ুন এবং গল্প বলুন
বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ

সোনালি স্বপ্ন

"ছোট গল্প" বিভাগে গল্পটি দিয়েছেন গল্পের ঝুরিয়ান রিয়েন সরকার (০ পয়েন্ট)

X ইলোরার গল্প 'সোনালি স্বপ্ন' মোহসেনা হোসেন ইলোরা ব্যস্ত হাতে পাট খড়িগুলো উনুনের ভেতর ঠেলে অন্য হাতের ওড়নটা দিয়ে পায়েসের হাঁড়িতে দু চারবার নেড়েই নারকেলের বাকী অংশটা কোড়াতে থাকেন রহিমা খাতুন। নারকেল কোড়া দিয়ে খেজুর গুড়ের পায়েস রতনের খুব পছন্দ। সন্ধ্যা পেরিয়েছে অনেকক্ষণ। গ্রাম্য পরিবেশে সন্ধ্যা মিলিয়ে যেতে না যেতেই নিশুতি রাত বলে মনে হয়। এরই মাঝে চারিদিক শুনশান হয়ে আসছে। ক্রমাগত ঝিঁঝিঁ পোকার একটানা ডাক যেন আরও বেশী প্রকট হয়ে কানে বাজছে। পাড়া পড়শী প্রায় সকলেই অন্যান্য দিনের মতো সব কাজ শেষ করে ঘুমাতে যাবার প্রস্তুতিতে ব্যর্থ হলেও রতনের বাড়ির চিত্রটা অন্যরকম। যেন রাজ্যের ব্যস্ততা। রহিমা খাতুন সেই সকাল থেকে রান্নাঘরে ব্যস্ত। রতনের পছন্দের খারারগুলো আজ সব তৈরী করতেই হবে। যেভাবেই হোক। বোনেরা শেষ মুহূর্তের গোছগাছে ব্যস্ত। কোনও কিছু বাকি রইল কিনা, আরো কিছু দিতে হবে কিনা। একেবারে সুঁই-সুতা থেকে শুরু করে সব। চিড়া, মোয়া, মুড়কি আর নাড়ুর বোঝা তো আছেই। ভাইটা তাদের ছেড়ে চলে যাচ্ছে, আবার কবে দেখা হবে কে জানে? মনের ভেতর উত্তেজনা, আনন্দ আর সীমাহীন শূন্যতা নিয়ে সবাই যেন নিজেকে আঁড়াল করার চেষ্টায় ব্যস্ত। কেউ কারো সামনে ভেঙে পড়বে না। আজমত সাহেব ঘরের পৈঠায় বসে আছেন শূন্য দৃষ্টি মেলে। এত ব্যস্ততা তবুও কেমন যেন নীরবতা চারিদিকে। লোকজন আসছে রতনের সাথে দেখা করতে। বাংলা ঘরের লোক সমাগম যেন আজ কমছেই না। রাত বাড়ার সাথে সাথেই বন্ধু -আত্মীয় স্বজন, পাড়া-প্রতিবেশীদের আনাগোনাও বাড়ছে। রহিমা খাতুন শেষ মুহূর্তের রান্নায় ব্যস্ত। ছেলের পছন্দের কত কিছুই যে রান্না করেছেন তাও যেন মন ভরছে না। শুধুই মনে হচ্ছে আরও কত কি যে পছন্দ করে ছেলেটা। সব কিছু মনের মতো করে খাওয়াতে পারলে যেন তৃপ্তি পেতেন। আবার কতদিন পর যে ছেলেকে কাছে পাবেন? কবে নিজে হাতে রান্না করে খাওয়াবেন ছেলেকে কে জানে? ভোরে ফ্লাইট। বুকের মানিক চলে যাবে সাত সমুদ্র তের নদী পার হয়ে জীবিকার সন্ধানে। চাপ ধরা জমাট কষ্ট টা যেন যে কোন মুহূর্তে ফেঁটে পড়বে। ঝিঁঝিঁ পোকার একটানা ডাক আর উনুনের আঁচে খড়ি ফোটার শব্দ যেন পরিবেশটা আরও ভারী করে তুলছে। কাজের মাঝেই যেন বারবার হারিয়ে যাচ্ছেন। ডুবে যাচ্ছেন চিন্তায়। আগুনের লাল আচে বিচ্ছুরিত স্ফুলিঙ্গ আর রহিমা খাতুন যেন এক হয়ে যাচ্ছেন। মাঝে মধ্যেই হাতের কাজ থামিয়ে এক দৃষ্টিতে চেয়ে দেখছেন চুলার গনগনে আগুনের শিখা। তার ভেতরের যে তোলপাড়, যে জ্বলুনি সেটা কি এই আগুনের চেয়ে কম না বেশি। ধুর ছাই কি সব ভাবছি- বাস্তবে ফিরে আসেন। ছেলেটা এতদুর যাবে। নিজ হাতে খাইয়ে তবেই শান্তি। সেই ছোট্ট রতন যে কিনা মায়ের আঁচল ছাড়া হয়নি কখনো। মা ন্যাওটা বলে কতই না রসিকতা করেছে সবাই। ছোট বেলার মতো বুকে জড়িয়ে ধরতে মন চাইছে। সেই রতন আজ কত বড় হয়ে গেছে। নিজে উপার্জন করতে যাচ্ছে। কত স্বপ্ন বিদেশ গিয়ে উপার্জন করবে। বাবার স্বচ্ছলতা ফিরিয়ে আনবে। বোনদের বিয়ে দেবে ধুমধাম করে। কত যে কল্পনার রঙিন জাল বুনে, স্বপ্নের সাগরে পাড়ি জমাচ্ছে। সব কিছু ছাপিয়ে রহিমা খাতুন শুধুই মনে মনে বলে চলেছেন খোদা আমার বুকের মানিককে তুমি ভালো রেখ, নিরাপদে রেখ। ভাবনায় বাধা পড়ে আজমত আলীর কথায়- কই তোমার হলো? এশার নামাযের সময় হয়ে গেল, তোমার রান্নার কতদুর? ছেলেটাকে খাওয়া দাওয়া করে একটু বিশ্রাম নিতে দাও। হাতে তো বেশী সময় নাই। হ্যা - এই তো আর একটু। কপালে জমে থাকা বিন্দু বিন্দু ঘামের সাথে ভীজে ওঠা চোখটাও মুছে নেন রহিমা খাতুন। হ্যান্ড ব্যাগের এ পকেট ও পকেটে কত কিছুই না দিয়েছে বোনেরা। সবাই যেন গোপনে তাদের ভালোবাসা প্রকাশে ব্যস্ত। আজমত সাহেব তার সঞ্চিত সঞ্চয় সব কিছু এমনকি পশ্চিম পাড়ার ধানী জমিটাও বিক্রি করেছেন। শুধু মাত্র এই বসতভিটে টা ছাড়া আর কিছুই রইল না। তাতে কি - রতন আমার বিদেশ যাচ্ছে। এক জমির বদলে কত জমি হবে। কত ভালো ঘরে বিয়ে দেবে মেয়েদের। কোন কার্পণ্য করেননি ছেলেকে বিদেশ পাঠাবার ব্যাপারে। এমন কি এয়ারপোর্ট পর্যন্ত যেতে ছেলের যেন কষ্ট না হয়, রাস্তার ঝক্কি এড়াতে মাইক্রোবাসও ভাড়া করেছেন। ঢাকা শহর পেরিয়ে বেশ খানিকটা দূরে টাঙ্গাইলের কাছাকাছি অজ পাড়া গাঁ থেকে বাসে করে ঢাকা, ঢাকা থেকে আবার এয়ারপোর্ট যেতেই শরীরের বারোটা বেজে যায়। একমাত্র ছেলে রতনকে সেই কষ্টটুকুও দিতে নারাজ আজমত আলী। রাতের খাবার খেতে বসেছে রতন। মা তুলে তুলে দিচ্ছেন। খাবার ঘরের জলচৌকিটাতে তিল ধরনের ঠাই নাই। কত যে খাবারে ঠাসা। সব যেন একবার করে চেখে দেখে রতন তার প্রিয় খাবারগুলো। কোনটাই যেন বাদ রাখেননি তবু মায়ের মন ভরছে না কিছুতেই। বিষ্ময়ে হতবাক রতন বলে মা আমি কি রাক্ষস নাকি? এত কিছু রান্না করেছ পাগলের মতো? আমি কি এত খেতে পারবো? রহিমা খাতুন ভীজে ওঠা চোখ আর কেঁপে কেঁপে ওঠা ঠোঁটে হাসি ফুটিয়ে বলে বাবা আরেকটু দেই। কৈ মাছের ঝোলটা তো তুই খুব ভালোবাসিস, আর এই যে টাকি মাছের ভর্তা, শুটকি আর নোনা ইলিশের দোপেয়াজা। বিদেশ বিভুঁইয়ে এসব খাবার কোথায় পাবি? আরাম করে খাও বাবা। রতম মা কে থামিয়ে বলে মা বাবাকে তুলে দাও, আমি খাচ্ছি তো। আজমত আলীর পাতে তুলে দিতেই তিনি থামিয়ে দিয়ে বলেন আরে আরে রতনরে দেও, আমার খাওয়া শেষ। রতনের পাতের দিকে এগুতেই রতন থামিয়ে দিয়ে বলে মা তুমিও খাও আমাদের সাথে। আব্বা আপনি এই মাছের পেটিটা খান বলে নিজ হাতে তুলে দেয়। রহিমা খাতুন নিরবে শুধু বাটি চামচ হাতড়ে বেড়ান। কই মা তুমিও বসো তো। আমি পরে খাবো বাবা, তুই আরাম করে খা। তাদের ছোট ছোট কথা, নিরবতার মাঝেই যেন হৃদয়ের গভীর ভালোবাসা প্রকট ভাবে প্রকাশ পাচ্ছে। আজ এই মুহুর্তে এই সত্যটি যেন সকলেই উপলব্ধি করতে পারছে। রতন জানে কতদিন যে মা আমার ভালো করে খেতে পারবেনা। খেতে বসলেই তার কথা মনে পড়বে। হঠাৎ করেই ভাতের নলাটা মায়ের মুখের দিকে এগিয়ে দেয় রতন। ঘোর লাগা আচ্ছন্নতার মাঝে রহিমা খাতুন চমকে ওঠেন। ছেলের কান্ড দেখে ভেতরের জমাট কান্নাটা যেন আর বাধ মানেনা। ছেলেকে জড়িয়ে ধরেন। এক আবেগে সকলের চোখই ভিজে ওঠে। মাইক্রোবাস চলে এসেছে। লাগেজ, হ্যান্ড ব্যাগ সব তোলা হয়েছে। এখন বিদায়ের পালা। রতন সবার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে পাড়ী জমাবে সুদুর প্রবাসে। কেমন যেন উত্তেজনা, অস্থিরতা, কৌতুহল, আপনজনদের ছেড়ে যাবার হাহাকার সব মিলিয়ে এক অদ্ভুত অনুভুতি কাজ করছে। অজানা এক শিহরণ, এক শীতল স্রোত বয়ে যাচ্ছে মেরুদন্ড বরাবর। কেমন যেন ঘোর লাগা অনুভূতি। ঠিক বুঝতে পারছে না রতন কি হচ্ছে, কি করছে, এই মুহূর্তে কি করা উচিত তার ? একদিকে মা, বাবা, বোন , বন্ধু-বান্ধব, আত্মীয় স্বজন, পরিবার সবাইকে ছেড়ে যাবার কষ্ট। আবার নতুন দেশ নতুন ভাবে নিজেকে নতুনকরে গড়ে তোলার অদম্য ইচ্ছা তাকে পুলকিত করছে। কান্না ভেজা কন্ঠ আর হাহাকার মেশানো করুন দৃষ্টি যেন বুকের ভেতর ঝড় তুলছে। বাবার পায়ে হাত দিয়ে সালাম করতেই কাঁপা হাতে রতনকে থামিয়ে বুকে জড়িয়ে ধরেন আজমত আলী। বলেন ভালো থাকিস বাবা। মায়ের কাছে এগিয়ে যেতেই রতনের হাতদুটো ধরে ফেলেন রহিমা খাতুন। হাঁড়ি-খড়ির সাথে খেলা করতে করতে মায়ের হাতটাও যেন কেমন রুক্ষ হয়ে গেছে। এই রুক্ষ হাতের ছোয়া, হাতের গন্ধটা বুক ভরে নেয় রতন। থরথর করে কাঁপছে মায়ের হাতদুটো, কাঁপছেন তিনি, কাঁপছে রতন। বিদায় লগ্নে মা-ছেলে জড়িয়ে ধরে কাপছেন আর অঝোরে কাঁদছেন। প্রকৃতিও বোধ হয় মানুষের মনের কথা বুঝতে পারে। হঠাৎ করেই আকাশটা আরও ঘন কালো হয়ে আসে। মনের না বলা কথা, জমে থাকা কষ্ট আকাশের বুক ফেটে ঝড়ে পড়তে থাকে মা-ছেলের বুক ফাটা আর্তনাদের মতোই, অঝোরে.......। আসলেই অদ্ভুত মানুষের মন আর প্রকৃতি........ কত কিছু বলার ছিল কিন্তু কিছুই বলতে পারেন না কেউই। তরমুজের মতো লাল হয়ে ওঠা চোখ মুছতে মুছতে বলেন - বাবা রতন ভালো থাকিস, নিজের খেয়াল রাখিস। আল্লাহ্ র হাতে তোকে সপে দিলাম। নাড়ি ছেঁড়ার কষ্টটা যেন আবার অনুভব করলেন। বোনেরা জড়িয়ে ধরে ভাইয়াকে। কত যে আবদার ছিল তাদের। এই মুহূর্তে সব আবদার যেন ভাইয়ের মঙ্গল কামনায় পরিণত হয়। একে একে বোনদের ও সবার কাছে বিদায় নিয়ে গাড়ির দিকে পা বাড়ায় রতন। অজানার পথে। একবুক সোনালি স্বপ্ন নিয়ে পা বাড়ায় সোনার হরিণের খোঁজে।


এডিট ডিলিট প্রিন্ট করুন  অভিযোগ করুন     

গল্পটি পড়েছেন ২১১২২ জন


এ জাতীয় গল্প

গল্পটির রেটিং দিনঃ-

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now