বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
কালাপানির আন্দামানে
চ্যাপ্টার- ৪
বাকি অংশ
কথা শেষ করেই পকেট থেকে মোবাইল বের করল। টেলিফোন করল হোটেল সাহারার মালিক হাজী আবদুল আলী আবদুল্লাহকে।
ওপার থেকে হাজী আবদুল আলীর কণ্ঠ পেয়েই আহমদ মুসা বলল, ‘জনাব আমি বেভান বার্গম্যান। আমি আপনার হোটেলের একজন............।’
‘বাসিন্দা। সকালে আমার সাথে কথা হয়েছিল- এই বলবেন তো। বলুন, নিশ্চয় গুরুত্বপূর্ণ কিছু হবে।’
‘জি জনাব। আমি জানতে চাচ্ছিলাম। কোন ‘ফ্যামিলি সুট’ আপনার হোটেলে খালি আছে? নিরাপদ হয় এমন একটা লোকেশান?’
আহমদ মুসা থামার সাথে সাথেই ওপার থেকে হাজী আবদুল আলীর কণ্ঠ ভেসে এল, ‘আমার হোটেলের প্রত্যেক ফ্লোরে দুটি করে ফ্যামিলি সুট আছে। কয়েকটি খালি। আপনার ফ্লোরেরটাও খালি আছে। কিন্ত কেন জানতে চাচ্ছেন? ফ্যামিলি সুটে ট্রান্সফার হবেন?’
‘না জনাব। আমার এক আত্মীয়ের জন্যে একটা ফ্যামিলি সুট দরকার। আমার ফ্লোরেরটা হলেই ভাল হয়।’
‘আপনার দরজার ঠিক মুখোমুখি দরজা, ওটা একটা ফ্যামিলি সুট, আর আপনার সারির সর্ব দক্ষিণে আরেকটা। কোনটা চাই? কাছের টা নিশ্চয়?’
‘জি।’ বলল আহমদ মুসা।
‘ঠিক আছে। ওরা কি আজই আসবেন?’
‘আজ নয়, এখনি জনাব।’
‘আসুন। ওয়েলকাম।’
‘ধন্যবাদ জনাব।’
মোবাইল অফ করেই আহমদ মুসা তাকাল শাহ বানুর মার দিকে।
বলল, ‘সব তো শুনলেন মা। আমি মনে করি হোটেলই বেশি নিরাপদ হবে।’
‘তুমি যা ভাল মনে কর বেটা। কিন্তু হোটেলের ফ্যামিলি সুট তো খুব ব্যয়বহুল।’
‘মা, আপনার ছেলে না ফেরা পর্যন্ত মনে করুন আপনি আপনার আরেক ছেলের মেহমান।’ বলল আহমদ মুসা।
হঠাৎ শাহ বানুর মার দুচোখ অশ্রুতে ভরে গেল। বলল, ‘আমার ছেলে ফিরবে বেটা?’ বলে কান্না চাপার চেষ্টা করতে লাগল।
‘আমার মন বলছে আসবে মা। ওরা যে আপনার বাড়ি আক্রমণ করেছে আপনাদের কিডন্যাপ করার জন্যে। এটাও একটা প্রমাণ যে আপনার ছেলে বেঁচে আছে।’
‘আলহামদুলিল্লাহ। আল্লাহ তোমার কথা সত্য করুন।’
‘হোটেল আপনার নাম কি বেভান বার্গম্যান?’ জিজ্ঞাসা করল শাহ বানু।
‘হ্যাঁ, শাহ বানু। হোটেলের বোর্ডার হিসাবে তোমাদের নাম পাল্টাতে হবে।’
‘কেন?’ জিজ্ঞাসা করল শাহ বানুর মা।
‘আপনারা বাড়ি থেকে বেরিয়ে কোন অজ্ঞাত কোথাও চলে গেছেন, হারিয়ে গেছেন, এটাই সকলকে জানাতে হবে। তা না হলে শত্রুরা আপনাদের পিছু ছাড়বে না।’ আহমদ মুসা বলল।
শাহ বানু ও শাহ বানুর মার মুখে ভয়ের ছায়া নামল। বলল শাহ বানু, ‘আমরা বাড়ি থেকে চলে গেলেও ওরা খুঁজবে আমাদের?’
‘আমি মনে করি খুঁজবে।’
‘কেন?’ বলল শাহ বানু।
‘এই ‘কেন’র সঠিক উত্তর জানি না। এটা আহমদ আলমগীরকে পেলে জানা যাবে, অথবা শত্রুদের কারো কাছে জানা যেতে পারে।’
আহমদ মুসার কথার উত্তরে শাহ বানুর মা কিছু বলতে যাচ্ছিল। এ সময় ড্রইংরুমে প্রবেশ করল গংগারাম। থেমে গেল শাহ বানুর মা।
‘স্যার, এ অঞ্চলে গাড়ি পাওয়া যায় না। একটি ক্যারিয়ার পেয়েছি। এতে চলবে স্যার। ওদের লাগেজ নিয়ে আমি ক্যারিয়ারের সাথে যাব। আপনি ওদের নিয়ে আমার গাড়িতে ড্রাইভ করবেন।’
‘ধন্যবাদ গংগারাম।’ বলে আহমদ মুসা তাকাল শাহ বানুর মার দিকে।
আহমদ মুসা কিছু বলার আগেই শাহ বানুর মা উঠে দাঁড়িয়েছে। বলল, ‘আমরা তৈরি হয়ে নিচ্ছি বেটা। কিন্তু বাড়ি আমরা কিভাবে রেখে যাব! কি নেব, কি নেব না বুঝতে পারছি না।’ কান্নায় রুদ্ধ হয়ে এল শাহ বানুর মার শেষের কথাগুলো।
‘ব্যক্তিগত প্রয়োজনের জন্যে আশু অপরিহার্য এমন জিনিসই নেবেন মা। আর কোন পারিবারিক ডকুমেন্ট থাকলে সেগুলো অবশ্যই নেবেন।
শাহ বানু ও শাহ বানুর মা দুতলায় উঠে গেল।
পাঁচ মিনিটের মধ্যেই শাহ বানু ও তার মা দুজনে কাঁধে একটি করে ব্যাগ ও হাতে একটি স্যুটকেস নিয়ে বেরিয়ে এল।
গংগারাম তাদের হাত থেকে ব্যাগ ও সুটকেস নিয়ে কাঁধে ও হাতে ঝুলিয়ে ছুটল গেটের দিকে।
‘মা, উপরের ঘরগুলো লক করেছেন?’ বলল শাহ বানুর মাকে লক্ষ্য করে আহমদ মুসা।
‘হ্যাঁ, বেটা।’ কান্না চাপতে চাপতে বলল শাহ বানুর মা।
তারা সবাই বেরিয়ে এল। নিচের ঘরগুলো চেক করে লক করে দিল আহমদ মুসা। বাড়ির বাইরে চলে এল সকলে।
ব্যাগ ও সুটকেসগুলো ক্যারিয়ারে নিয়ে গাড়ির পাশে দাঁড়িয়ে ছিল গংগারাম।
আহমদ মুসা বাইরের গেট লক করে দিয়ে গাড়ির কাছে এল। শাহ বানু ও শাহ বানুর মাকে গংগারামের ক্যাবের পেছনের সিটে বসিয়ে গংগারামের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘এদিকে এস।’
গংগারাম এলে আহমদ মুসা বলল, ‘তুমি রিভলবার চালাতে জান?’
‘না স্যার। কেন স্যার?’ বলল গংগারাম।
‘আজ ওদের কাছ থেকে ছয়টি রিভলবার কুড়িয়ে পেয়েছি। তার একটা তোমাকে দিতাম।’
‘কেন স্যার?’
‘থাক। যাও, গিয়ে ক্যারিয়ারে ওঠ। তোমাদের গাড়িটা আগে যাবে, আমারটা পেছনে।’
‘আচ্ছা স্যার।’ বলে গংগারাম ছুটে গেল তার গাড়ির দিকে।
আহমদ মুসা গিয়ে ড্রাইভিং সিটে বসল।
গংগারামের পিক ক্যারিয়ারটা চলতে শুরু করলে আহমদ মুসাও তার ক্যাবটি ষ্টার্ট দিল।
আহমদ মুসা ষ্টিয়ারিং এ হাত রেখে মুখটা পেছনে ফিরে বলল, ‘মা, আপনারা এমনভাবে থাকলে ভাল হয় যাতে বাইরে থেকে কারো চোখে না পড়েন।’
‘ঠিক আছে বেটা।’
‘ধন্যবাদ মা।’
ফুল স্পিডে তখন চলতে শুরু করেছে গাড়ি।
শাহ বানুর বাড়ি চার’শ গজের মত দূরে যেখানে শাহ বানুর বাড়ির দিক থেকে আসা একমাত্র রাস্তাটি ‘এল’ টার্ন নিয়ে দক্ষিণে চলে গেছে, সেখানে রাস্তার পাশে জংগলের ধার ঘেঁষে পাঁচজন লোক উদগ্রীব হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। তাদের সকলের দৃষ্টি উপর থেকে নেমে আসা মাইক্রোর দিকে।
এলাকাটা এবড়ো-থেবড়ো জংগলাকীর্ণ। একেবারে নির্জন। অনেক দূর পর্যন্ত কোন বাড়িঘর নেই। আন্দামানের অন্যান্য এলাকার মত হারবারতাবাদের বাড়িগুলোও গুচ্ছাকৃতির। এই এলাকাটা এবড়ো-থেবড়ো ও কিছুটা খাড়া হওয়ার কারণে এই এলাকায় কোন বাড়িঘর নেই।
লোকগুলো যেখানে দাঁড়িয়ে মাইক্রোটির অপেক্ষা করছে, তার পেছনেই জংগল। জংগলের ফাঁক দিয়ে একটা ছোট্ট হেলিকপ্টার দেখা যাচ্ছে। জংগলটার পরেই একটা বড় পাথুরে চত্বর। ওখানেই দাঁড়িয়ে আছে হেলিকপ্টারটা।
মাইক্রোটা লোকগুলোর সামনে এসে দাঁড়াল। লোকদের মধ্য থেকে নেতা গোছের একজন ছুটে গেল মাইক্রোর সামনের জানালায়। দ্রুত কণ্ঠে জিজ্ঞাসা করল, ‘মিশন সাকসেসফুল? মা, বেটি দুজনকেই পেয়েছ?’
কিছু না বলে ড্রাইভিং করা লোকটি নিচে নেমে এল। তার সাথে সাথে পেছন থেকেও নেমে এল তিন জন। তাদের সকলেরই দুহাত ছিল রক্তাক্ত।
যে উৎসাহ নিয়ে লোকেরা মাইক্রোর দিকে ছুটে এসেছিল, সে উৎসাহ তাদের উবে গেল।
মাইক্রো ড্রাইভ করছিল যে লোক, সে গাড়ির জানালার সামনে আসা নেতা গোছের লোকটিকে লক্ষ্য করে আর্তকণ্ঠে বলল, ‘শংকরজী, আমাদের শিবরাম ও বলবন্ত দুজনেই নিহত হয়েছে। আমরা.........।’
‘দেখতেই পাচ্ছি, আহত হয়ে পালিয়ে এসেছ। কি করে এতবড় ঘটনা ঘটল লক্ষ? আমাদের ইনফরমেশন কি ভুল ছিল। গোপনে ওখানে পাহারা রেখেছিল? কিন্তু ওরা তো কিছু জানার কথা নয়? কেন পাহারা রাখবে?’ বলল শংকর নামের লোকটি।
‘না সেখানে কোন পাহারা ছিল না। আমরা মা বেটি দুজনকেই ধরে নিয়ে আসতে শুরু করেছিলাম। বাড়ি থেকে বেরুবার আগেই হঠাৎ দুজন লোক এসে হাজির হলো বাইরে থেকে।’ বলে লক্ষণ পরের সব ঘটনা জানাল।
ঘটনা শুনে বিস্মিতকণ্ঠে শংকর চিৎকার করে বলে উঠল, ‘দুজন নিরস্ত্র লোক তোমাদের ছয় জনকে নিহত-আহত করল? এটা বিশ্বাস করতে বল?’
‘ঘটনা বিশ্বাস করার মত নয় শংকরজী। কিন্তু আমরা কিছু করার আগেই সবকিছু শেষ হয়ে গেছে।’ বলল লক্ষণ।
শংকর পকেট থেকে মোবাইল বের করল। কোথাও যোগাযোগ করে বলল, ‘মহাগুরু স্বামীজী, সর্বনাশ হয়ে গেছে। ওরা শয়তানটার মা-বোনকে ধরে আনতে পারেনি। শিবরাম ও বলবন্ত নিহত হয়েছে। লক্ষণরা গুলীবিদ্ধ আহত অবস্থায় ফিরে এসেছে।’
কথা শেষ করল শংকর। ওপারের জবাব বোধ হয় সুখকর ছিল না। ভীত ও মলিন হয়ে উঠেছে শংকরের মুখ।
সে টেলিফোন লক্ষণের দিকে এগিয়ে দিয়ে বলল, ‘ওখানে কি হয়েছে, কি ঘটেছে, কি দেখেছ সব স্বামীজীকে জানাও।’
লক্ষণ টেলিফোন নিয়ে কম্পিতকণ্ঠে কিভাবে তারা গেল,ত কিভাবে মা-বেটিকে ধরে নিয়ে আসতে শুরু করেছিল, তারপর বাইরে থেকে আসা দুজন লোক কি ঘটাল, কিভাবে তারা চারজন সরে পড়েছে সব বিবরণ দিল। কথা শেষ হবার পর ওপারের এক প্রশ্নের জবাবে বলল, ‘ওরা মনে হয় অন্য কোন শহর থেকে সেখানে যায়। গেটে একটা ট্যাক্সি ক্যাবকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখেছি। তাতে ড্রাইভার অবশ্য ছিল না। মনে হয় ড্রাইভারও ভেতরে ঢুকেছিল। কারণ ভেতরে ঢোকা দুজনের একজনকে আমার ড্রাইভার বলে মনে হয়েছে।’
কথা শেষ করে ওপারের কথা শুনেই বলল, ‘ঠিক আছে স্বামীজী, শংকরকে টেলিফোন দিচ্ছি।’
শংকর টেলিফোন হাতে নিল। ওপারের কথা শুনে কম্পিতকণ্ঠে শংকর বলল, ‘জি গুরুজী, আপনার কথা বুঝেছি। অক্ষরে অক্ষরে তা আমরা পালন করব।’
‘জয় গুরুজী’ বলে মোবাইল অফ করেই সকলের দিকে ঘুরে দাঁড়াল শংকর। বলল, ‘শোন নির্দেশ, ঐ মা-বেটিকে ধরে নিয়ে যেতেই হবে। আর যে দুজন আমাদের দুজনকে খুন করেছে এবং চারজনকে আহত করেছে, তাদেরকেও ধরতে হবে। না হলে খুন করতে হবে।’
একটু থামল শংকর। সংগে সংগেই আবার বলে উঠল, ‘কিন্তু তার আগে তোমরা কেউ যাও হেলিকপ্টার থেকে ফাষ্ট এইড নিয়ে এসে ওদের ব্যান্ডেজ করে দাও। যা দেখছি কারো হাতেই গুলী ঢোকেনি বলে আমার বিশ্বাস।’
শংকরের কথা শেষ না হতেই একজন দৌড় দিয়েছে হেলিকপ্টারের উদ্দেশ্যে।
কথা শেষ করেই শংকর ফিরল লক্ষণ নামের লোকটির দিকে। বলল, ‘লক্ষণ, প্রথমে দুটি ব্যাপার আমাদের নিশ্চিত হওয়া দরকার। এক. শয়তান লোক দুজন ঐ বাড়িতে আছে কিনা, দুই. ঐ দুই হারামজাদি বাড়িতেই অবস্থান করছে, না অন্যত্র সরে পড়েছে।’
‘বাইরে চলে যাবার এই একটি মাত্র রাস্তা। আমরা তো রাস্তার উপরই আছি। সুতরাং বাইরে কোথাও যায়নি এটা নিশ্চিত। আশে-পাশে প্রতিবেশী কারও বাড়িতে আশ্রয় নেবার সম্ভাবনা আছে। প্রতিবেশীদের কারো বাড়িতে সরে না পড়লে তারা বাড়িতেই আছে। শয়তান দুজনের ব্যাপারে এই একই কথা। তারা ট্যাক্সি ক্যাবত নিয়ে ওখানে গেছে। তারা বাইরে থেকে গেছে এটা নিশ্চিত। সুতরাং ফিরতে হলে এ পথ দিয়েই ফিরতে হবে। আমার মনে হয় খোঁজ নেবার জন্য লোক পাঠানো দরকার। সেটা দেখার জন্য আমরা ওদিকে যাব।’ বলল লক্ষণ।
‘ঠিক বলেছ লক্ষণ’ বলেই শংকর একজনকে সব কথা বুঝিয়ে দিয়ে, বলল, ‘তুমি মোবাইলে বললেই আমরা আসব।’
লোকটি দৌড় দিল।
অন্য কয়েকজন ওদের চারজনের হাতে ফাষ্ট এইড ও ব্যান্ডেজ দিতে ব্যস্ত হয়ে পড়ল।
আর শংকর একজনকে নিয়ে হেলিকপ্টারে গেল অস্ত্র নিয়ে আসতে যাতে মোবাইল পেলেই তৎক্ষণাৎ যাত্রা শুরু করতে পারে।
প্রায় চল্লিশ মিনিট পর টেলিফোন এল লক্ষণের।
বিরক্ত, ক্রুব্ধ শংকর মোবাইল ধরেই ধমক দিল। ধমক খেয়ে ওপার থেকে লক্ষণ বলল, ‘পথেই একটা বিপদে পড়েছিলাম। পরে বলব। শোন, এইমাত্র এসেই দেখলাম, সেই ট্যাক্সি ক্যাবে দুই মা-বেটি যাচ্ছে। ড্রাইভ করছে ক্যাব চালক। ঐ দুজনকে দেখছি না।’
‘যাচ্ছে মানে কি এদিকে আসছে?’ জিজ্ঞাসা করল শংকর।
‘হ্যাঁ।’
‘ঠিক আছে। আপাতত এ দুজনকে পেলেও চলবে। দুই শয়তানকে আমরা পরে দেখব।’
কথা শেষে মোবাইল অফ করেই ফিরল সকলের দিকে। বলল, ‘একটা ট্যাক্সি ক্যাব আসছে। আটকাতে হবে। ওতেই দুই মা-বেটি আছে।’
সবাই রাস্তার পাশে জংগলের মধ্যে পজিশন নিল। শংকর সবাইকে ব্রিফিং দিয়ে রাস্তার পাশে একটা গাছে হেলান দিয়ে সিগারেট ফুঁকতে লাগল।
পিক আপ ভ্যানটি তার চোখের সামনে দিয়ে চলে গেল। আধা মিনিটের মধ্যেই ক্যাবটি চলে এল।
শংকর দুহাতে দুই রিভলবার নিয়ে রাস্তার মাঝখানে গিয়ে দুটি ফাঁকা ফায়ার করে ক্যাবকে দাঁড়াতে নির্দেশ দিল।
আহমদ মুসা চারদিকে তাকাল। আর কাউকে দেখল না। লোকটি একা? পুলিশ নয় দেখেই আহমদ মুসা নিশ্চিত হয়েছে, এ খুনি দলেরই কেউ হবে। ক্যাব দাঁড়াতে বলছে কেন? আহতরা কি তাহলে সব খবর দিয়েছে ওদের? দিয়েছে নিশ্চয়ই। কিন্তু এভাবে গাড়ি আটকাচ্ছে কেন? ওরা কি তাহলে জানে গাড়িতে আহমদ আলমগীরের মা বোনরা আছে?’
বাম পাশে সিটের উপর ও ড্যাশবোর্ডের রিভলবার দুটির দিকে একবার তাকিয়ে আহমদ মুসা গাড়িতে ব্রেক কষল এবং পেছন দিকে না তাকিয়েই বলল, ‘শাহ বানু, তোমরা সিটের নিচে লুকিয়ে পড়।’
গাড়ি দাঁড়াতেই শংকর ছুটে এল। ‘ড্রাইভার, তোমার দুজন যাত্রী কোথায়? দেখছি না যে?’
শংকরের জিজ্ঞাসায় আহমদ মুসা নিশ্চিত হলো যে, কিডন্যাপকারীরাই এরা?
আহমদ মুসা আগেই গাড়ির জানালা খুলে ফেলেছিল।
শংকর গাড়ির তিন চার গজের মধ্যে এসে গেছে।
আহমদ মুসার ডান হাতটা তখনো ষ্টিয়ারিং হুইলে। তার বাম হাত সিটের উপরের রিভলবার নিয়ে চোখের পলকে উঠে এল গাড়ির জানালায়।
দুবার ট্রিগার টিপল আহমদ মুসা।
দুহাত লক্ষ্যে দুটি গুলী করেছে সে।
প্রথম গুলীটি ডান হাতকে বিদ্ধ করল। দ্বিতীয় গুলীটি ছুটে যাচ্ছিল। কিন্তু প্রথম গুলীটি খাওয়ার পরেই শংকর তার দেহকে বাঁ দিকে সরিয়ে নিয়েছিল। ফলে গুলী তার বাঁ হাতের বদলে তার তলপেটকে বিদ্ধ করল।
আহমদ মুসা রিভলবার ধরা বাম হাতটা সরিয়ে নিল গাড়ির জানালা থেকে। মনটা খারাপ হয়ে গেছে তার। লোকটাকে মারতে চায়নি আহমদ মুসা। লোকটির হাত দুটিকে নিস্ক্রিয় করে নিরাপদে গাড়ি নিয়ে সরে পড়তে চেয়েছিল সে।
আহমদ মুসা গাড়ি ষ্টার্ট দিতে যাচ্ছিল।
এ সময় রাস্তার পাশে জংগলের দিক থেকে বৃষ্টির মত গুলী ছুটে আসতে লাগল গাড়ি লক্ষ্যে।
মুহূর্তেই গাড়ির কাঁচ চূর্ণ-বিচুর্ন হয়ে গেল। টায়ারও ঝাঁঝরা হয়ে গের। সামনের দিকটা বসে পড়ল গাড়ির।
আহমদ মুসা বসে পড়ে গাড়ির বিপরীত দিকের দরজা দিয়ে বেরিয়ে অর্থাৎ দক্ষিণ পাশেল দরজার দিকে ক্রলিং করে এগুতে এগুতে বলল, ‘শাহ বানু, তোমরা গাড়ির ফ্লোর থেকে মাথা তুলো না।’
গুলীবৃষ্টির আধিক্য গাড়ির সামনের দিকেই বেশি এবং গাড়ির সামনের দিকের চাকাটাই নষ্ট হয়ে গেছে। আহমদ মুসা বুঝল, যারা গুলী করছে তারা গাড়ির সামনের সোজাসুজি রাস্তার পাশে অবস্থান নিয়েছে অথবা তাদের লক্ষ্য গাড়ির সামনের দিকটা। আহমদ মুসা গাড়ির পেছন দিকটা ঘুরে পেছনের উত্তর দিকের চাকার পাশ দিয়ে তাকাল রাস্তার ওপাশের দিকে। গুলী আসছে এখনও ওদিক থেকে। তবে গুলীর পরিমাণ কমে গেছে।
আহমদ মুসার দুহাতে রিভলবার। রাস্তার ওপাশের দিকে তাকিয়ে অপেক্ষা করছে। আহমদ মুসা নিশ্চিত, এদিক থেকে গুলীর জবাব না পেলে এক সময় ওরা জংগলের আড়াল থেকে বেরিয়ে আসবে প্রতিপক্ষের কি অবস্থা হয়েছে তা দেখার জন্যে। সেই সুযোগ আহমদ মুসা গ্রহণ করবে।
ওরা জংগর থেকে বেরিয়ে এসেছে। তাদের দুজনের হাতে ষ্টেনগান। অন্য পাঁচজনের হাতে রিভলবার।
গাড়ি লক্ষ্যে বিস্মিত দুচারটা গুলী ছুড়তে ছুড়তে ওরা এগিয়ে আসছে।
আহমদ মুসা তার দুরিভলবার ওদের দিকে তাক করল। ওরা গাড়ি পর্যন্ত পৌছার আগেই তাকে এ্যাকশনে যেতে হবে।
আহমদ মুসার সমস্ত মনোযোগ যখন গাড়ির দিকে এগিয়ে আসা লোকদের দিকে। তখন পেছন থেকে দ্রুত ছুটে আসা পায়ের শব্দে চমকে উঠে আহমদ মুসা মুখ ঘুরিয়ে পেছনে তাকাল। দেখল, একজন লোক ছুটে আসছে। লোকটিও আহমদ মুসাকে দেখতে পেয়েছে। আহমদ মুসাকে দেখতে পেয়েই সে দৌড়ানো অবস্থাতেই পকেটে হাত ঢুকিয়েছে।
কি ঘটতে যাচ্ছে বুঝল আহমদ মুসা এবং বুঝতে পারল যে, লোকটি এই গ্রুপেরই সদস্য।
লোকটি পকেট থেকে হাত বের করার আগেই আহমদ মুসার বাম হাতের রিভলবারের নল ঘুরে গেছে লোকটির দিকে এবং ট্রিগার টেপা হয়েছে তার সাথে সাথেই। লোকটি মাথায় গুলী খেয়ে উল্টে পড়ে গেল।
গুলী করেই আহমদ মুসা তার মুখ ও বাম হাত ঘুরিয়ে নিল গাড়ির লক্ষ্যে এগিয়ে আসা লোকদের দিকে। দেখল, ওদের সকলেরই নজরে এসেছে ঘটনাটা। আহমদ মুসার অবস্থানও ওদের নজরে পড়েছে।
আহমদ মুসার একাংশ গাড়ির চাকার আড়ালে। অন্য অংশ ওদের অধিকাংশের নজরে এসেছে।
কিন্তু আহমদ মুসা সিদ্ধান্ত নিয়েই তার মাথা ও হাত ঘুরিয়ে নিয়েছিল এবং তার দুরিভলবার এক সাথেই গুলী বর্ষণ করেছিল।
আহমদ মুসার প্রথম টার্গেট ছিল এদিকের লোকরা। ছয় রাউন্ডের বেশি গুলী ছোড়া তার পক্ষে সম্ভব হলো না। ওপাশ থেকে গুলী বর্ষণ শুরু হয়ে গেছে। একটি গুলী এসে তার বাম হাতকে আঘাত করল, অন্য আর একটি গুলী কাঁধের নিচে বাহুর মাসলের একটা অংশ উড়িয়ে নিয়ে গেল। অধিকাংশ গুলীই আঘাত করছিল গাড়ি এবং গাড়ির চাকাকে। এতেই রক্ষা পেল আহমদ মুসা।
গুলীর আঘাতে আহমদ মুসার বাম হাতের রিভলবার ছিটকে চলে গিয়েছিল।
এদিক দিয়ে আক্রমণে যাওয়া কঠিন দেখে আহমদ মুসা দ্রুত পেছনে ব্যাক করল।
গাড়ির এপাশে চলে এসে আহত হাতটাকেও যথাসম্ভব কাজে লাগিয়ে দ্রুত ক্রলিং করে গাড়ির সামনের দিকে চলে এল।
গাড়ির সামনের দিকটা ঘুরে গাড়ির উত্তরপূর্ব প্রান্তের কোনায় আশ্রয় নিয়ে তাকাল গাড়ির এপাশটার দিকে। দেখল, চারজন ওরা গুলী করতে করতে এগুচ্ছে গাড়ির পশ্চিম প্রান্তের দিকে।
তাদের পাশে তিনজনের লাশ পড়ে আছে। বুঝল আহমদ মুসা, তার ছয় রাউন্ড গুলীতে ওরা তিনজন শেষ হয়েছে। তড়িঘড়ি টার্গেট নেয়া হলে রেজাল্ট খারাপ হয়।
আহমদ মুসার বাম হাত এই মুহূর্তে রিভলবার ধরার মত নয়।
তার ডান হাতের রিভলবার পাল্টে পকেট থেকে একটা ফুল লোডেড রিভলবার নিল।
আহমদ মুসা উঠে দাঁড়াল। ওদের দিকে রিভলবার তাক করে বলল, ‘তোমরা হাতের রিভলবার ও ষ্টেনগান ফেলে দিয়ে হাত তুলে দাঁড়াও। মনে রেখ এক কথা আমি দুবার বলি না।’
ওরা চারজনই একসাথে ঘুরে দাঁড়াল চোখের পলকে। কেউ ওরা অস্ত্র ফেলে দেয়নি, হাত তোলেনি।
আহমদ মুসার রিভলবার পরপর চারবার গুলী বর্ষণ করল। ওদের ষ্টেনগান ও রিভলবার উঠে আসছিল। কিন্তু মাঝপথেই গতি থেমে গেল। ওরা চারজন বুকে গুলী খেয়ে পড়ে গেল মাটিতে।
আহমদ মুসা চারদিকে দেখল কেউ নেই।
সে দ্রুত এগুলো গাড়ির দিকে। টান দিয়ে দরজা খুলে দেখল ওপাশের দরজার পাশে দুই মা-মেয়ে কুকড়ে শুয়ে আছে।
‘শাহ বানু, তোমরা ভাল আছ, ঠিক আছ?’ দ্রুত কণ্ঠে আহমদ মুসা জিজ্ঞেস করল।
ভয়ে-আতংকে ওরা নির্বাক হয়ে গিয়েছিল। আহমদ মুসাকে দেখে আকাশের চাঁদ হাতে পাওয়ার মত চোখ-মুখ উজ্জ¦ল হয়ে উঠল, তারা আশা করতে পারছিল না যে তারা আবার আহমদ মুসাকে দেখতে পাবে।
কথা বলে উঠল শাহ বানুর মা। বলল, ‘বেটা, আমরা মরে গেলে ক্ষতি নেই। আমরা চিন্তিত ছিলাম তোমাকে নিয়ে। আল্লাহর হাজার শোকর তোমাকে পেয়েছি আমরা।’
শাহ বানুর নজর পড়েছিল আহমদ মুসার রক্তাক্ত হাত ও বাহুর দিকে। ভয়ে আঁৎকে উঠেছিল সে। মুখ খুলেছিল কিছু বলার জন্যে।
তার আগেই আহমদ মুসা বলে উঠল, ‘মা, আসুন আপনারা। এ গাড়ি শেষ হয়ে গেছে। অন্য গাড়ি দেখতে হবে।’
বলেই আহমদ মুসা সোজা হয়ে দাঁড়াল। তাকাল রাস্তার পাশে দাঁড়ানো মাইক্রোর দিকে।
শাহ বানুরা বেরিয়ে এল গাড়ি থেকে। আটটা রক্তাক্ত লাশ পড়ে থাকতে দেখে আরেক দফা আঁৎকে উঠল তারা। কিছু বলতে যাচ্ছিল শাহ বানুর মা।
আহমদ মুসা তাকে বাধা দিয়ে বলল, ‘আসুন মা, ঐ মাইক্রোতে উঠতে হবে। তাড়াতাড়ি সরে পড়তে হবে এখান থেকে।’
বলে আহমদ মুসা ছুটল মাইক্রের দিকে।
যাবার সময় দুটো ষ্টেনগান ও কয়েকটা রিভলবার কুড়িয়ে নিল।
সুন্দর নতুন মাইক্রো। কীহোলে চাবি ঝুলছে।
মাইক্রোর দরজা খুলে দিল শাহ বানুদের উঠার জন্যে।
গাড়িতে উঠতে গিয়ে আহমদ মুসার রক্তাক্ত বাম বাহুর দিকে নজর পড়তেই শাহ বানুর মা আর্তনাদ করে বলে উঠল, ‘একি হয়েছে বেটা, তুমি তো সাংঘাতিক আহত!’
‘আমি আগেই দেখতে পেয়েছি। ওঁর হাতে দুটা গুলী লেগেছে মা। আহত জায়গা এখনই বেঁধে ফেলা দরকার। তাতে অন্তত রক্ত বন্ধ হবে।’ বলল শাহ বানু কম্পিত কণ্ঠে।
‘এখন সময় নেই শাহ বানু। তোমরা গাড়িতে উঠ। ঝামেলায় পড়ার আগে আমরা সরে পড়তে চাই।’ শান্ত, কিন্তু শক্ত কণ্ঠে বলল আহমদ মুসা।
আর দ্বিরুক্তি না করে শাহ বানুরা গাড়িতে উঠে গেল।
গাড়িতে দরজা বন্ধ করতে গিয়ে মাইক্রোর পেছন দিকে হঠাৎ নজর গেল আহমদ মুসার। তিনটি ছোট বাক্স দেখতে পেল। ভাল করে দেখল। তিনটিই গুলীর বাক্স। দুটি ষ্টেনগানের এবং একটি রিভলবারের।
আনন্দে উজ্জ্বল হয়ে উঠল আহমদ মুসার মুখ। বলল, ‘মা, দেখুন আল্লাহর সাহায্য কিভাবে আসে। আমি খালি হাতে আন্দামানে এসেছি। আজই বেশ অনেকগুলো রিভলবার হাতে এসে গেল। দুটি ষ্টেনগানও এখন যোগাড় হলো। কিন্তু গুলী ছিল না হাতে। ভাবছিলাম গুলীর সন্ধান এ অজানা জায়গায় কিভাবে করব! দেখুন আপনাদের পিছনে তিনটাই গুলীর বাক্স। আলহামদুলিল্লাহ।’
‘আল্লাহ তো তোমাকেই সাহায্য করবে বেটা! যে আমাদের মত অসহায়দের সাহায্যের জন্যে নিজের জীবনের পরোয়া করে না। আল্লাহর সাহায্য তো তোমার মত লোকদের জন্যেই।’ বলল গভীর আবেগ জড়ি কণ্ঠে শাহ বানুর মা।
‘ওকে মা’ বলে আহমদ মুসা আর কোন কথা না বলে দরজা বন্ধ করে দিয়ে ড্রাইভিং সিটে এসে বসল। গাড়ি চলতে শুরু করল।
শাহ বানু আস্তে আস্তে তার মাকে বলল, ‘আমার ওড়নাটা অনেক লম্বা এবং অনেক চওড়া। লম্বালম্বি ছিড়লে ওঁর দুটো ব্যান্ডেজ ভাল মত হয়ে যাবে। এভাবে রক্ত পড়তে থাকলে তো ক্ষত ছাড়াও মানুষেরও তা নজরে পড়ে যাবে।’
‘ঠিক বলেছ মা’ বলে শাহ বানুর মা আহমদ মুসাকে লক্ষ্য করে বলল, ‘বেটা, তোমার বাঁ হাতটা এদিকে দাও। শাহ বানু ব্যান্ডেজ করে দেবে। ওর ভাল ফাষ্ট এইড ট্রেনিং আছে।’
‘দরকার নেই মা। কিছুক্ষণের মধ্যেই তো আমরা হোটেলে পৌছে যাচ্ছি।’ আহমদ মুসা বলল।
‘কিছুক্ষণ কোথায়? যে রাস্তার অবস্থা, দুঘণ্টার আগে যাওয়া যাবে না। তাছাড়া রক্ত পড়া চলতে থাকলে, তা হোটেলের অনেকেরই চোখে পড়ে যেতে পারে।’ বলল শাহ বানুর মা।
সঙ্গে সঙ্গে আহমদ মুসা কিছু বলল না। শাহ বানুর মা’র শেষ যুক্তিটা অবশ্যই বিবেচনার বিষয়। রক্তাক্ত দৃশ্যটা হোটেলের লোকদের চোখ থেকে আড়াল করা দরকার। এই চিন্তা করে আহমদ মুসা বলল, ‘কিন্তু ব্যান্ডেজ বাঁধার জন্যে কাপড় পাবেন কোথায়?’
‘সে চিন্তা তোমার নয় বেটা।’ বলল শাহ বানুর মা।
সঙ্গে সঙ্গেই শাহ বানু লম্বালম্বি তার ওড়না ছিঁড়ে ফেলল।
ছয়ফুট লম্বা চার ইঞ্চি চওড়া একটা খ- বেরিয়ে এল। দীর্ঘ খ-টিকে মাঝামাঝি ছিঁড়ে দুই খ-ে পরিণত করল।
তারপর শাহ বানু উঠে গেল ড্রাইভিং সিটের পাশের সিটে।
হ্যান্ড ব্যাগ থেকে কিছু টিস্যু পেপার বের করে নিল।
আহমদ মুসা ষ্টিয়ারিং এ ডান হাত রেখে সামনে তাকিয়ে ছিল। শাহ বানুর দিকে না তাকিয়েই বাম হাতটা শাহ বানুর দিকে একটু এগিয়ে দিয়ে বলল, ‘ফাষ্ট এইড ট্রেনিং দেয়ার পর ট্রেনিং কাজে লাগাবার বাস্তব সুযোগ কখনও পেয়েছ শাহ বানু?’
‘শাহ বানু আহমদ মুসার হাত হাতে তুলে নিয়েছিল। সে দেখে খুশি হলো যে পাঁচটি আঙুলই অক্ষত আছে। কিন্তু বুড়ো আঙুলের সন্ধিস্থল হাতের তালুর উচ্চভূমিটা উড়ে গেছে গুলীতে। অন্যদিকে কাঁধের নিচের সুগঠিত শক্ত পেশীটারও বড় অংশ উঠে গেছে।
শাহ বানু টিস্যু পেপার দিয়ে হাত পরিষ্কার করতে করতে আহমদ মুসার জিজ্ঞাসার উত্তরে বলল, ‘আমি ভাগ্যবান। জীবনের ঐতিহাসিক দিনে ঐতিহাসিক একজনকে ফাষ্ট এইড দেয়ার মাধ্যমে আমার বাস্তব অভিজ্ঞতার যাত্রা শুরু হলো।’
আহমদ মুসা কোন কথা বলল না। তার স্থির দৃষ্টি সামনে নিবদ্ধ।
শাহ বানু আহমদ মুসার আহত দুটি জায়গা পরিষ্কার করে ব্যান্ডেজ বেঁধে দিল।
আহত দুটি জায়গা পরিষ্কার করতে গিয়ে শাহ বানু বিস্মিত হয়েছে এবং দেখেছে, অসহনীয় বেদনাকে আহমদ মুসা কত অবলীলায় হজম করেছে। তার চোখের পাতা সামান্য নড়েনি। মুখে বেদনার সামান্য একটা ভাঁজও পড়েনি। মনে হয়েছে আহত স্থান দুটো দেহের অংশই নয়।
আহমদ মুসা তার হাত ফেরত পাওয়ার পরে বলল, ‘বাঃ, হাত আমার খুব হালকা হয়ে গেছে। দুহাতেই এখন আমি ড্রাইভ করতে পারবো। ধন্যবাদ শাহ বানু।’
‘একটা কথা জিজ্ঞেস করি?’ বলল শাহ বানু।
‘অবশ্যই।’ আহমদ মুসা বলল।
‘আপনার নার্ভ কি পাথরের?’
‘কেন?’
‘আহত স্থান দুটো পরিষ্কার করা ও ব্যন্ডেজ বাঁধার সময় আপনার মধ্যে কোন প্রতিক্রিয়া দেখিনি। মনে হয়েছে হাত যেন আপনার দেহের অংশই নয়।’ বলল শাহ বানু।
গম্ভীর হলো আহমদ মুসা। বলল, ‘হযরত আলী (রা) এর ঘটনা নিশ্চয় তোমার জানা। এক যুদ্ধে তার পায়ের গোড়ালিতে তীর বিদ্ধ হয়। তীর খুলতে গেলে কষ্ট হবে ভেবে তার তীর খোলা হলো না। তিনি যখন নামাজে দাঁড়ালেন, তখন তীর সহজেই খুলে নেয়া হলো। তিনি টেরই পেলেন না। এটা কেন জান? নামাজের সময় তিনি তার সমস্ত মনোযোগ আল্লাহমুখী করেন এবং ভুলে যান তিনি চারপাশের জগতকে। তার পায়ে তীর বিদ্ধ থাকা এবং তীর খোলার যন্ত্রণার যে শক্তি তার চেয়ে অনেক বেশি শক্তি ছিল নামাজে আল্লাহর সাথে তার সম্পর্কের শক্তি।’
‘ধন্যবাদ জনাব। এ ঘটনা আমার জানা ছিল না। কিন্তু সেই ঘটনা থেকে আপনার ঘটনার মধ্যে পার্থক্য আছে। হযরত আলী (রা) নামাজে ছিলেন, আপনি নামাজে ছিলেন না।’
‘নামাজে ছিলাম না, কিন্তু আল্লাহমুখী হয়ে আল্লাহর ওয়াস্তে বাইরের সবকিছু থেকে বিচ্ছিন্ন থাকার চেষ্টা করেছিলাম।’
‘হযরত আলী (রা) তা করেননি কেন? তাহলে নামাজের আগেই তার তীর খুলে নেয়া যেত।’
গাম্ভীর্য নামল আহমদ মুসার মুখে আবার। বলল, ‘হযরত আলী (রা)-এর মত মহান সাহাবায়ে কেরামগণ তাদের উপর আপতিত দুঃখ-মুসিবত ও বিপদ-আপদকে স্বাভাবিকভাবে গ্রহণ করতেন এবং মনে করতেন আল্লাহই এসব দূর করে দেবেন। তাঁরা দুঃখ-মুসিবত নিয়ে ব্যতিব্যস্ত হয়ে উঠতেন না। সুতরাং তীর বিদ্ধ হওয়াও তাকে ব্যতিব্যস্ত করে তোলেনি, উদ্বিগ্ন-উৎকণ্ঠিত এতে হননি তিনি। এ কারণৈ আহতের বেদনা থেকে বাঁচার জন্যে আমি যা করেছিলাম, তিনি তা করেননি। এটা তাঁদের আকাশচুম্বী ঈমানী শক্তিমত্তার প্রমাণ। এই শক্তি আমাদের নেই শাহ বানু।’ আবেগ জড়িত কণ্ঠস্বর আহমদ মুসার।
আহমদ মুসার দৃষ্টি সেই একইভাবে সামনে নিবদ্ধ।
শাহ বানুর দৃষ্টি আহমদ মুসার মুখে। তার স্বপ্নের আহমদ মুসার সব রূপই সে তার চোখের সামনে দেখতে পাচ্ছে। শত্রুর বিরুদ্ধে তার অংগার রূপ সে দেখল। দু’ডজনের মত লাশ ফেলেছে সে এ পর্যন্ত। পরার্থে তার যে জীবন তারও রূপ সে দেখছে। সুন্দর আন্দামানে এই যে জীবন-মৃত্যুর লড়াই এতে তাঁর কোন জাগতিক স্বার্থ জড়িত নেই। আবার এই কঠোর সংগ্রামীর মধ্যেই সংবেদনশীল ও আবেগপ্রবণ এক অপরূপ মনও রয়েছে। তার চোখে অন্যায়ের বিরুদ্ধে আগুন জ্বলে উঠতেও সময় লাগছে না, আবার আবেগে অশ্রু সজল হতেও দেরি হচ্ছে না। এই স্বপ্নের মানুষরা যারা একদিন দুনিয়া জয় করেছিল ইসলামের জন্যে, তারা হারিয়ে গিয়েছিল। অন্তত মুঘল সম্রাট বাবরের মত মানুষ যারা মদের পাত্র ভেঙে তওবা করে যুদ্ধ যাত্রা করতে পারেন, তারাও এক সময় নিখোঁজ হয়েছিলেন। এসেছিল সম্রাট আকবরের মত আত্মপরিচয়হারা এবং সম্রাট শাহজাহানের মত বিলাসী মানুষ। তারা যে ক্ষতি করেছিল মুসলিম জাতির সে ক্ষতি থেকে পতনের প্রান্তে দাঁড়িয়ে থাকা আলমগীর আওরঙ্গজেবের মত দরবেশ সম্রাটের বিচ্ছিন্ন প্রচেষ্টা পারেনি জাতিকে রক্ষা করতে। আবার সেই স্বপ্নের মানুষকে চোখের সামনে দেখছে, যে শুধুই আদর্শবাদ, নীতিবোধ ও জাতিবোধের টানে ছুটে এসেছে আমেরিকা থেকে এবং জীবন-ভোগের অপ্রতিরোধ্য বাসনার গলায় ছুরি চালিয়ে নিজেকে জড়িয়ে ফেলেছে জীবন-মৃত্যুর ভয়াবহ সংগ্রামে!
আবেগের এক সয়লাব এসে ভাসিয়ে নিল শাহ বানুর হৃদয়কে। অশ্রুসিক্ত হয়ে উঠল তার দুচোখের কোণ। বলল সে ধীরে ধীরে আহমদ মুসাকে লক্ষ্য করে, ‘জনাব, সেই ঈমানী শক্তি নেই, আপনিও যদি একথা বলেন, তাহলে হতাশা যে কাটবে না! কার দিকে তাকাব আমরা আশা নিয়ে?’
‘কোন মানুষের দিকে নয়, আশা নিয়ে তাকাতে হবে আল্লাহর দিকে। সাহায্য করার শক্তি ও অধিকার এককভাবে আল্লাহর। আদর্শের বদলে ব্যক্তিনির্ভর সিষ্টেম ও ব্যক্তিনির্ভর ব্যবস্থা একের পর এক মুসলিম সম্রাজ্যকে ধ্বংস করেছে।’ বলল আহমদ মুসা।
‘আপনার কথা ঠিক জনাব। কিন্তু আদর্শ তো ব্যক্তিকে কেন্দ্র করে উঠে দাঁড়ায় এবং পথও চলে।’
‘ঠিক শাহ বানু। কিন্তু এখানে ব্যক্তি মুখ্য নয়। আদর্শ ব্যক্তিকে দাঁড় করায় এবং তাকে পথ চলায়, এটাই সত্য। এটাই যদি আমাদের কাছে সত্য হয়, তাহলে ব্যক্তির ব্যর্থতা বা তিরোধান আমাদের ক্ষতি করবে না, হতাশ করবে না। বরং আদর্শের শক্তি আমাদের ‘গণতন্ত্র’কে কাজে লাগিয়ে নতুন নেতা, নতুন ব্যক্তিকে দাঁড় করাবে, পথ চালাবে।’
শাহ বানুর অপলক চোখ আহমদ মুসার মুখে। কিছু বলতে যাচ্ছিল সে।
কিন্তু তার আগেই আহমদ মুসা বলে উঠল, ‘ঐতো দেখছি গংগারামের পিকআপটা দাঁড়িয়ে।’
আহমদ মুসা পিকআপটার পাশে তার মাইক্রো দাঁড় করাল এমনভাবে, যেন পিকআপের ড্রাইভার তাদের দেখতে না পায়।
গলার স্বরটাকে কিঞ্চিত আলাদা করে ডাকল গংগারামকে।
সঙ্গে সঙ্গেই গংগারাম গাড়ি থেকে নেমে ছুটে এল। মাইক্রোতে আহমদ মুসাদের দেখে তার চোখে-মুখে বিস্ময়। কিছু বলার জন্যে সে মুখ খুলেছিল।
আহমদ মুসা ঠোঁটে আঙুল চাপা দিয়ে নিষেধ করল কথা বলতে। আহমদ মুসাই দ্রুত বলে উঠল, ‘সব ঘটনা পরে জানবে। আমরা চলে যাবার পাঁচ মিনিট পর ড্রাইভারকে বলবে যে, পেছনের গাড়ির জন্যে আর অপেক্ষা করা যায় না। তারপর গাড়ি নিয়ে চলে এস।’
গংগারামের চোখভরা বিস্ময় আর প্রশ্ন। বিশেষ করে আহমদ মুসার ব্যান্ডেজ বাঁধা হাত দেখে অস্থির হয়েছে বেশি। কিন্তু কোন প্রশ্ন না করে ‘ঠিক আছে স্যার’ বলে পিকআপের দিকে ফিরতে শুরু করল সে।
আহমদ মুসা তাকে লক্ষ্য করে উচ্চস্বরে বলল, ‘ঠিক আছে গংগারাম, তোমরা অপেক্ষা করা আমি যাই।’
বলে আহমদ মুসা গাড়ি ষ্টার্ট দিল।
গাড়ি চলতে শুরু করলে শাহ বানু বলল আহমদ মুসাকে লক্ষ্য করে, ‘দুঃখিত জনাব, গংগারাম গাড়ি নিয়ে পরে আসবে কেন বুঝতে পারলাম না। ড্রাইভার তো আমাদের দেখেছে, আমরা এখানে নিজেদের গোপন করলাম কেন?’
‘পেছনে যা ঘটেছে তা ড্রাইভারের জানা ঠিক হবে না। আমাদের দেখলে তার মনে প্রশ্ন জাগত ক্যাব ছেড়ে আমরা মাইক্রোতে কেন? তারপর কাল যখন সে গুলীতে ক্যাব ঝাঁঝরা হওয়া এবং জন দশেক লোক নিহত হওয়ার কথা জানবে, তখন সে আমাদের বিষয়টা পুলিশকে বলেও দিতে পারে। গংগারামকে পরে আসতে বললামও এই কারণে যেন ক্যাব, আমরা ও গংগারামের মধ্যে কোন যোগসূত্র গড়ার সুযোগ ড্রাইভার না পায়।’
‘বুঝলাম। অনেক দূরের কথা আপনি চিন্তা করেছেন। কিন্তু ক্যাব এর সাথে গংগারামের সম্পর্কের কথা প্রকাশ হয়েই পড়বে।’ বলল শাহ বানু।
‘তাতে ক্ষতি নেই। গংগারাম পোর্ট ব্লেয়ারে পৌছেই থানায় মামলা দায়ের করবে যে, তার গাড়ি চুরি গেছে।’ আহমদ মুসা বলল।
হেসে ফেলল শাহ বানু। বলল, ‘চমৎকার পরিকল্পনা। কিন্তু এত কথা আপনি ভাবলেন কখন?’
একইভাবে সামনে তাকিয়ে ছিল আহমদ মুসা।
মুখ না ফিরিয়েই আহমদ মুসা বলল, ‘দায়িত্ব নিয়ে ভাবলে তুমি এমন কি গংগারামও এটাই করতো।’
‘ধন্যবাদ’ শাহ বানু সামনের সিট থেকে উঠে পেছনের সিটে মায়ের পাশে গিয়ে বসল।
‘অনেক ধন্যবাদ।’ আহমদ মুসাও বলল।
তারপর নামল একটা নীরবতা।
ছুটে চলছে গাড়ি।
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now