বাংলা গল্প পড়ার অন্যতম ওয়েবসাইট - গল্প পড়ুন এবং গল্প বলুন
বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ

কালাপানির আন্দামানে চ্যাপ্টার- ৬

"সাইমুম সিরিজ" বিভাগে গল্পটি দিয়েছেন গল্পের ঝুরিয়ান রিয়েন সরকার (০ পয়েন্ট)

X কালাপানির আন্দামানে চ্যাপ্টার- ৬ ৬ আহমদ মুসা ও হাজী আবদুল্লাহ ভাইপার দ্বীপের জনমানবহীন এলাকায় এসেছে। আন্দামানের অন্যান্য দ্বীপের মত ভাইপার দ্বীপের জনবসতি ও বন্দর এবং উপকূলের উর্বর উপত্যকা কেন্দ্রীক এক সময় পাহাড়-জঙ্গল এলাকায় উপজাতিরা বাস করতো। বহিরাগত বসতির পর তারা আরও দুর্গম দ্বীপাঞ্চলে চলে গেছে। দুপাশে ঝোপ-ঝাপ, আর মধ্য দিয়ে পুরানো পাথুরে রাস্তা। এই রাস্তা ধরেই এগুচ্ছে আহমদ মুসারা। আহমদ মুসারা তখন একটা পাহাড়ের গা বেয়ে উঠতে শুরু করেছে। হাঁটার সাথে কথা চলছিল। বক্তা হাজী আবদুল্লাহ এবং শ্রোতা আহমদ মুসা। হাজী আবদুল্লাহ বলছিল দ্বীপের কথা, দ্বীপের মানুষের কথা। আর আহমদ মুসা কথাগুলেঅ গিলে যাচ্ছিল গো-গ্রাসে। সামনে একটু উপরে একটা ভাঙা প্রাচীরের দিকে আঙুল তুলে হাজী আবদুল্লাহ বলল, ‘ওটাই ভাইপার দ্বীপের জেলখানার প্রাচীর। জেলখানার মতই প্রাচীরটা পাহাড়ের তিনদিকে ঘেরা। পূর্ব দিকটায় পাহাড় খাড়া সাগরে নেমে গেছে বলে ওদিকে কোন প্রাচীর নেই।’ হাজী আবদুল্লাহ একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলল, ‘আর একটু উত্তরে সাগরে দাঁড়ানো ‘রশ’ দ্বীপ যেমন বৃটিশ ও এলিটদের বাসস্থান ও প্রশাসন কেন্দ্র হিসাবে বিখ্যাত ছিল, তেমনি এই ‘ভাইপার’ অপরাধীদের দ্বীপ হিসাবে বিখ্যাত ছিল। বৃটিশ ভারত থেকে যেসব দ্বীপান্তরিত কয়েদীদের জাহাজ বোঝাই করে আনা হতো, তাদের এ দ্বীপে নামানো হতো। আর তাদের ঢুকানো হতো ঐ প্রাচীর পার করে জেলখানায়। জেলখানার ডান্ডাধারী দারোগারা ছাড়া তথাকথিত ‘ভদ্রজন’রা ভুল করেও এ দ্বীপে পা রাখত না।’ প্রাচীরের গেটে এসে গেছে আহমদ মুসারা। গেট নেই, গেটের কংকাল এখনও মাথা তুলে দাঁড়িয়ে আছে। কংকালে লেগেছে সংস্কারের প্রলেপ। এ প্রলেপ দিয়েছে পুরাতত্ব বিভাগ। প্রাচীন কংকালের উপর আধুনিক প্রলেপ বীভৎস এক শিল্পে পরিণত হয়েছে। দমকা একটা বাতাসের সাথে সিগারেটের গন্ধ নাকে প্রবেশ করায় চমকে উঠল আহমদ মুসা। হাজী আবদুল্লাহর কাঁধে চাপ দিয়ে রাস্তার উপরেই বসে পড়ল আহমদ মুসা। ‘কি ব্যাপার বেভান? কি হল? কোন কিছু দেখেছ? সন্দেহ করছ কিছু?’ বিস্মিত কণ্ঠে একরাশ প্রশ্ন করল হাজী আবদুল্লাহ। ‘কোন গন্ধ পাচ্ছেন না?’ বলল আহমদ মুসা। হাজী আবদুল্লাহ কিছু একটা বোঝার চেষ্টা করে বলল, ‘হ্যাঁ। মনে হচ্ছে তামাকের গন্ধ। তাই না?’ ‘হ্যাঁ।’ এতক্ষণে সচেতন হয়ে উঠল হাজী আবদুল্লাহ। স্বর আরও নিচু করে বলল, ‘তাহলে নিশ্চয় আশে-পাশে কেউ আছে। ধন্যবাদ বেভান যে, তুমি আগেই সাবধান হয়েছ।’ ‘গন্ধ হালকা। বাতাস পূর্ব দিকের। অতএব যিনি সিগারেট খেয়েছেন, তিনি প্রাচীরের ভেতরে ছিলেন।’ ‘পাহারা বসিয়েছে তাহলে?’ বলল হাজী আবদুল্লাহ। ‘অবশ্যই।’ বলেই আহমদ মুসা হাতের রিভলবারটা পকেটে রেখে শোল্ডার হোলষ্টার থেকে উজি টাইপের ছোট্ট সাবমেশিনগান বের করে নিল। আহমদ মুসার দেখাদেখি হাজী আবদুল্লাহও রিভলবার বের করে হাতে নিল। ‘আমাদের রাস্তা এড়িয়ে অন্য পথে সামনে এগুতে হবে’ বলে আহমদ মুসা হামাগুড়ি দিয়ে রাস্তার পশ্চিম পাশে নেমে পড়ল। আহমদ মুসারা এগুতে লাগল গেটের পশ্চিম পাশে প্রাচীরে একটা ভাঙা জায়গার দিকে। আহমদ মুসা ভাবল, আমাদের আরও সতর্ক হওয়া উচিত ছিল। আমরা ওদের সিগারেটের গন্ধ পেলে ওরা আমাদের কথার শব্দ পেয়েও থাকতে পারে। তাহলে ওরাও নিশ্চয় সতর্ক হয়েছে। পেছন থেকে একটা শুকনো ডাল ভেঙে পড়ার শব্দ আহমদ মুসার কানে এসে প্রবেশ করল। রুদ্ধশ্বাসে আরও কিছু শুনতে চেষ্টা করল আহমদ মুসা। হ্যাঁ, অখ- নিঃশব্দতার মধ্যে বাতাসে শব্দের অস্পষ্ট গুঞ্জন সম্বলিন ভারী একটা ঢেউ আসছে। আহমদ মুসা নিশ্চিত যে কয়েক জোড়া পা এগিয়ে আসছে। আহমদ মুসা তার দুহাত মাটি ঘেঁষে সামনে বাড়িয়ে উজি সাবমেশিনগানের ট্রিগারে তর্জনি রেখে বুকে হেঁটে সামনে অগ্রসর হওয়া অব্যাহত রাখল। ক্রলিং করে সামনে এগুচ্ছিল হাজী আবদুল্লাহ। আহমদম মুসা ভাবছিল তারা আক্রমণে আসার আগে সে আক্রমণে যাবে কিনা। কিন্তু ওরা আক্রমণে আসছে না কেন? তারা কি কারও জন্য অপেক্ষা করছে? না তাদেরকে কোন ফাঁদে নিয়ে ওরা আটকাতে চায়। চরম বিপদের সময় চুড়ান্ত সিদ্ধান্তের মুহূর্তে তার চিন্তা কখনও তাকে প্রতারিত করেনি। সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছে আহমদ মুসা। ট্রিগারে ডান হাতের তর্জনি চেপে বাঁ হাতের বজ্র মুঠিতে উজিগানটা আঁকড়ে ধরে দেহটাকে উল্টে নিয়েছে পেছনের অদেখা শত্রুর উদ্দেশ্যে ট্রিগার টেপার জন্যে। কিন্তু তার আগেই একটা কণ্ঠ হো হো করে হেসে উঠল। বলল, ‘বন্দুক ফে...........।’ আহমদ মুসা প্রস্তুত হয়েই নিজেকে উল্টে নিয়েছিল। আর ওরা হেসে উঠেছিল শত্রুকে পেছন থেকে আক্রমণ করার সুযোগ নিয়ে। ওদের লক্ষ্য ছিল শত্রু দুজনকে নিরস্ত্র করা। পেছন ফিরে থাকা শত্রু আকস্মিক আক্রমণে আসবে এমনটা ভাবতে পারেনি বলে প্রথমে ট্রিগার টেপার সুযোগ তারা পেল না। এই সুযোগ পেল আহমদ মুসা। আহমদ মুসা নিজেকে উল্টিয়ে নিয়ে ট্রিগার টিপতে একটু দেরি করেনি। শত্রুর হেসে উঠাকে সে আল্লাহর রহমত হিসাবে গ্রহন করেছিল। একটা সাধারন মানসিকতা হলো, আক্রমণে আসা যে শত্রু প্রথমে কথা বলে, সে কথার সাথে সাথে গুলী করে না। কারণ সে শত্রুকে কথা শোনাতে চায়। এ কারণেই ও পক্ষের রিভলবারও ষ্টেনগান টার্গেট লক্ষ্যে গুলী করার জন্যে প্রস্তুত ছিল না। তাই তারা আহমদ মুসাকে গুলী করতে উদ্যত দেখতে পেয়েও আগে গুলী করার সুযোগ নিতে পারেনি। এর ফলেই ওরা ব্রাস ফায়ারের মুখে পড়ে যায় এবং মুহূর্তে ওরা তিনজন লাশে পরিণত হয়ে যায়। ব্রাস ফায়ার সম্পূর্ণ করেই আহমদ মুসা বলল, ‘আসুন জনাব, আমরা পশ্চিম দিকের ঢিবি’র আড়ালে চলে যাই।’ ঢিবিটার দিকে ক্রলিং করে যাওয়া শুরু করেই বলেছে কথাগুলো আহমদ মুসা। হাজী আবদুল্লাহও ক্রলিং করে চলতে শুরু করেছে আহমদ মুসার সাথে। ঢিবি’র আড়ালে পৌছেই হাজী আবদুল্লাহ বলল, ‘ধন্যবাদ বেভান। কিন্তু তুমি তার আগে গুলী করলে কেমন করে? আগেই ওদের টের পেয়েছিলে?’ ‘হ্যাঁ জনাব।’ ‘আমি তো তোমার সাথেই ছিলাম, কিন্তু কিছুই তো টের পেলাম না।’ ‘আপনার সব নজর সামনে ছিল। পেছনে কোন নজর ছিল না আপনার।’ আহমদ মুসা বলল। ‘চোখ সামনে দেখার জন্যে, পেছনে নজর রাখা যাবে কি করে?’ ‘পেছনের চোখ হলো কান।’ ‘বুঝেছি। ধন্যবাদ।’ বলল হাজী আবদুল্লাহ। ‘এবার সামনে নজর দিন।’ আহমদ মুসা বলল। ‘কিন্তু এতটা সরে এসে এখানে লুকালাম কেন? পেছনে তো শত্রু নেই। সামনেও কাউকে দেখা যাচ্ছে না। আমরা সামনে এগুতে পারি।’ ‘যাদের সিগারেটের গন্ধ পেয়েছি, তারা সামনে কোথাও লুকিয়ে আছে। এই গুলীর শব্দ শোনার পর তারা যাই মনে করুক যে কোন এ্যাকশনে তারা যাবে। হতে পারে সাথীদের সন্ধানে তারা প্রকাশ্যেই এগিয়ে আসবে। এই এগিয়ে আসার জায়গা করে দেবার জন্যেই আমরা তাদের পথ থেকে সরে এসেছি। আবার হতে পারে তারা এগুবে না। আমরা যেমন তাদের অপেক্ষায় ওঁৎ পেতে আছি। তারাও তেমনি আমাদের জন্যে ওঁৎ পেতে থাকবে।’ ‘বুঝলাম। এসব শিখতেই আমার জীবন শেষ হয়ে যাবে। আমি তো মনে করেছিলাম, গোপনে আসব, গোপনে হানা দেব ওদের আস্তানায়। ফলে আমরা জিতে যাব। কিন্তু এখন দেখছি, সাপে-নেউলের মত লড়াই।’ বলল হাজী আবদুল্লাহ। ‘তাহলে আপনি এখানে অপেক্ষা করুন, আমি যাই।’ ‘না বেভান, তুমি পাশে থাকলে আমার কোন ভয় নেই। আমি এ সুযোগ হাতছাড়া করব না।’ আহমদ মুসা কোন জবাব দিল না। তার অখ- মনোযোগ তখন সামনের দিকে। ঢিবি’র আড়ালে বসে তারা দশ মিনিট পার করে দিল, কিন্তু ঐ পক্ষের সাড়া-শব্দ নেই। হাজী আবদুল্লাহ অধৈর্য্য কণ্ঠে বলল, ‘ওরা থাকলেও নিশ্চয় পিছু হটে গেছে।’ ‘জনাব, এটা ওদের এলাকা। কি ঘটেছে তা না দেখে না জেনে ওরা পিছু হটতে পারে না। আর ওদের এ ঘাঁটির নিকটবর্তী একটা অবস্থান থেকে এতটুকুতেই ওদের পিছু হঁটা স্বাভাবিক নয়।’ ‘কিন্তু ওদের চুপ-চাপ বসে থাকা কি স্বাভাবিক?’ বলল হাজী আবদুল্লাহ। আহমদ মুসার মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল। সে চোখ থেকে নাইট ভিশন গগলসটি খুলে হাজী আবদুল্লাহর চোখে পরিয়ে দিয়ে তারা যেখান থেকে সরে এসেছে সে দিকে অঙুলি সংকেত করে ফিসফিসিয়ে বলল, ‘দেখুন।’ হাজী আবদুল্লাহ সেদিকে তাকিয়ে সোৎসাহে কিছু বলার জন্যে মুখ হা করেছিল। আহমদ মুসা তাড়াতাড়ি তার মুখে হাত চাপা দিয়ে বলল, ‘একটু শব্দ নয়।’ ‘স্যরি। তোমার কথাই ঠিক বেভান। তুমি দেখছি পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে সামনের অবস্থাকে অংকের রেজাল্ট-এর মত নিখুঁত বলে দিতে পারে। ধন্যবাদ তোমাকে।’ বলল হাজী আবদুল্লাহ ফিসফিসে কণ্ঠে। আহমদ মুসার মনোযোগ তখন অন্যদিকে। ওরা চারজন এগিয়ে আসছে। ওরা নিশ্চয় তাদের সাথীদের লাশ পর্যন্ত এগুবে। এর মধ্যে তাদের কাবু করতে হবে। ‘আসুন জনাব।’ হাজী আবদুল্লাহকে লক্ষ্য করে কথাটা বলে ক্রলিং করে এগুতে লাগল আহমদ মুসা। হাজী আবদুল্লাহ তাকে অনুসরণ করল। আহমদ মুসা ডান হাতের তর্জনী ষ্টেনগানের ট্রিগারে রেখে ষ্টেনগানটা বাগিয়ে ধরে একহাতে ক্রলিং করে আগাছার মধ্যে জিনেকে যথাসম্ভব গোপন রেখে বিড়ালের মত নিঃশব্দে এগুতে লাগল। এক সময় হাজী আবদুল্লাহ ফিসফিস করে বলে উঠল, ‘বেভান, ওরা কিন্তু গুলীর রেঞ্জে আছে। তাহলে আর এগুনো কেন?’ কোন জবাব না দিয়ে ‘আসুন’ বলে আহমদ মুসা এগিয়ে যাওয়া অব্যাহত রাখল। আহমদ মুসা তার নাইট ভিশন গগলস-এর মাধ্যমে দেখল সামনে এগুনো চারজনের একজন হঠাৎ থমকে গেল। পকেট থেকে মোবাইল বের করে কথা বলেই চমকে উঠে তাকাল পশ্চিমে মানে আহমদ মুসাদের দিকে। পেছন দিকে তাকিয়ে কি বলার পর সকলেই থমকে দাঁড়াল। চমকে উঠল আহমদ মুসাও। টেলিফোন পেয়েই এদিকে তাকানো এবং সকলকে থামিয়ে দেয়ার অর্থ একটাই যে তারা নতুন কোন ইনফরমেশন পেয়েছে। সেই ইনফরমেশন নিশ্চিত এই হতে পারে যে, আহমদ মুসাদের অবস্থান ও এগুনো সম্পর্কে ওদের জানানো হয়েছে। কে জানাতে পারে, কে তাদের অবস্থান জানতে পারে? দূর থেকে তাদের দেখা সম্ভব নয়, তাহলে কি কাছে থেকে কেউ তাদের ফলো করছে? তা হয়ে থাকলে সে বা তারা আক্রমণে আসছে না কেন? সে কি আক্রমণের অবস্থানে নেই, দূরে কোন জায়গায় অবস্থান করছে? কোন উঁচু স্থান বা পাহাড়ের উপরের উপযুক্ত কোন স্থান থেকে তাদের আলোতে দূরবীনের মাধ্যমে তাদের দেখা যেতেও পারে। চারদিকে তাকাল আহমদ মুসা। তার চোখ ভাঙা গেটের উপর দিয়ে যাবার সময় ভাঙা গেটের উঁচু একাংশের মাথায় তারকার মত একটা আলো নিভে যেতে দেখল। আলোটা ছোট টর্চের অথবা মোবাইলের লাইভ স্ক্রীনেরও হতে পারে। উঁচু গেটের দুপাশে এক সময় পর্যবেক্ষণ টাওয়ার ছিল। তারই একটা এখনও টিকে আছে, যা এখন সংস্কার করা হয়েছে। হতে পারে ওপাশে টাওয়ারে উঠার সিঁড়িও রয়েছে। পর্যবেক্ষণ টাওয়ারে কেউ অবস্থান করছে না, এখন কেউ উঠেছে চারিদিক দেখার জন্যে যদি এটাই হয়ে থাকে, তাহলে তার ব্যবস্থাই আগে করতে হবে। তা না হলে সেই তো সব দিকে খবর দিয়ে দেবে, ভাবল আহমদ মুসা। ‘জনাব, আপনি এখানে বসে সামনের দিকে চোখ রাখুন। ওরা যদি এদিকে আগায়, তাহলে আপনি পিছু হটবেন। এর মধ্যে আমি এসে যাব ইনশাআল্লাহ।’ আহমদ মুসা বলল হাজী আবদুল্লাহকে। ‘তুমি কোথায় যাচ্ছ?’ বলল হাজী আবদুল্লাহ। তার কণ্ঠে উদ্বেগ। ‘বেশি দূরে নয়। গেটের ঐ টাওয়ারে যাব। সম্ভবত টাওয়ার থেকে কেউ আমাদের দেখতে পেয়েছে এবং সে সবাইকে জানিয়ে দিয়েছে। ওর ব্যবস্থাটা এখনই করতে হবে।’ বলে আহমদ মুসা ক্রলিং করেই পিছু হটতে লাগল। চলে গেল একদম ঢিবিটার আড়ালে। ঢিবির আড়ালে গিয়ে সে বাঁক নিল উত্তর দিকে। ফাঁকা জায়গা এড়িয়ে ঝোপ-ঝাড়, আগাছা, ইত্যাদির আড়াল নিয়ে দ্রুত এগুলো সে। ভাঙা প্রাচীর পেরিয়ে আরও উত্তরে এগিয়ে একদম টাওয়ারের পেছনে চলে গেল। তারপর মাটি কামড়ে ক্রলিং করে টাওয়ারের দিকে এগুলো আহমদ মুসা। টাওয়ারের গোড়ায় গিয়ে পৌছল সে। টাওয়ারের পশ্চিম পাশে প্রাচীরের গায়ের সাথে লাগানো সিঁড়ি উঠে গেছে টাওয়ার বক্সে। সিঁড়িটা বেশ খাড়া। খুশি হলো আহমদ মুসা। সিঁড়ি যত ফ্ল্যাট হবে, টাওয়ার বক্স থেকে সিঁড়িটা ততো বেশি দেখা যাবে। আর এই খাড়া সিঁড়ি দিয়ে কেউ উঠলে তার মাথা বক্সের ফ্লোর লেভেলে না ওঠা পর্যন্ত বক্সের ভেতর থেকে দেখা যাবে না। ডান হাতে রিভলবার বাগিয়ে সিঁড়ি দিয়ে নিঃশব্দে উঠতে লাগল আহমদ মুসা। আর চার ধাপ বাকি। মাথাটা ইতিমধ্যেই ফ্লোর লেবেলে চলে গেছে। আহমদ মুসা রিভলবারের ট্রিগারে হাত চেপে টাওয়ার বক্সের উপর অনড় দৃষ্টি রেখে আর এক ধাপ উপরে উঠল। উঠার সঙ্গে সঙ্গেই আহমদ মুসা মুখোমুখি হলো এক যুবকের। সে সিঁড়ি মুখের দিকেই আসছিল। তারও হাতে রিভলবার, তবে হাতে ঝুলানো। তার মানে সে আহমদ মুসাকে আগে দেখতে পায়নি তাই দেখতে পেয়েই বিস্ময়ের এক ধাক্কা তাকে মুহূর্তের জন্যে বিমূঢ় করে তুলেছিল। পরমুহূর্তেই যুবকটির মধ্যে একটা বেপরোয়া ভাব ফুটে উঠল এবং রিভলবার ধরা তার ডান হাতটি বিদ্যুত বেগে উপরে উঠে এল। আর আহমদ মুসা এই সাক্ষাতের জন্যে প্রস্তুত ছিল। তার তর্জনি রিভলবারের ট্রিগারে ছিল প্রস্তুত হয়ে। সুতরাং বেপরোয়া যুবকটি যখন তার রিভলবার আহমদ মুসার দিকে তুলে আনছিল, তখন আহমদ মুসার তর্জনি ট্রিগারে চেপে বসল। গুলী গিয়ে বিদ্ধ করল যুবকটির বুক। গুলী খেয়েও যুবকটি তার রিভলবারের ট্রিগার টিপেছিল আহমদ মুসাকে লক্ষ্য করে। কিন্তু শিথিল হয়ে পড়া কম্পিত হাতের গুলী লক্ষ্যভ্রষ্ট হলো। আহমদ মুসা দ্রুত তার পকেট সার্চ করে কাগজপত্র ধরনের কিছুই পেলো না। মানি ব্যাগে টাকা ছাড়া আর কিছুই ছিল না। আহমদ মুসা মানিব্যাগ যুবকের পকেটে রেখে মোবাইল ও তার রিভলবার নিয়ে দ্রুত নিচে নেমে এল। আহমদ মুসা যথাসম্ভব নিঃশব্দে দ্রুত চলল সেই চারজনের দিকে। ওরা চারজন তাদের পেছনে টাওয়ারে গুলীর শব্দ শুনে বিমূঢ় হয়ে পড়েছিল। তারা তাদের খবর নেবার জন্যে সামনে এগুবে, না ওঁৎ পেতে শত্রুর দিকে এগুবে, না টাওয়ারের খোঁজ নেবে বুঝতে পারছিল না। চারদিকেই তারা সতর্ক দৃষ্টি রাখছিল। আহমদ মুসার এগিয়ে আসাটা তাদের নজরে পড়ে গেল। তাদের একজন চিৎকার করে উঠল, ‘কে, জিম?’ কোন উত্তর এল না। টাওয়ারে অবস্থান নেয়া লোকটিরই নাম সম্ভবত ছিল জিম। উত্তর না পেয়েই তারা ঐ দিক লক্ষ্য করে গুলীবর্ষণ শুরু করে দিল। ওরা চারজন আহমদ মুসার নজরে সব সময়ই ছিল। তার নাইট ভিশন গগলস থাকায় তাদের প্রতিটি কার্যকলাপ সে লক্ষ্য করছিল। ওরা ‘কে, জিম?’ বলে ডাকার সাথে সাথেই আহমদ মুসা বুঝতে পেরেছিল যে, সে তাদের নজরে পড়ে গেছে। সংগে সংগেই আহমদ মুসা দ্রুত বাঁ দিকে গড়াতে লাগল। সুতরাং ওদের গুলীবর্ষণ বৃথাই গেল। তার উপর গুলীবর্ষণের শব্দ এবং ওদের মনোযোগ একদিকে স্থির হবার সুযোগে আহমদ মুসা গড়িয়ে ওদের বাম পাশে চলে এল। আহমদ মুসা আরও গড়িয়ে ওদের চারজনের পেছনে চলে গেল। এখন হাজী আবদুল্লাহকেও ভাল দেখা যাচ্ছে। সে রিভলবার বাগিয়ে স্থির বসে আছে। মনে মনে তার সাহসের প্রশংসা করল আহমদ মুসা। মনে মনে ভাবল, নিশ্চয় হাজী সাহেবের উজ্জ্বলতর একটা অতীত আছে। ওরা চারজন এখন বিমূঢ়। কোন দিকে যাবে স্থির করতে পারছে না। আসলে টাওয়ারে গুলী এবং ওদিক থেকে কারো এদিকে আসার আলামত তাদের ধাঁধায় ফেলেছে। এবার আহমদ মুসা পেছন থেকে ওদের ক্লোজ হবার জন্যে বিড়ালের মত নিঃশব্দে সামনে এগুতে লাগল। আহমদ মুসা ওদের একেবারে কাছাকাছি পৌছতে চায়। সে ধীরে সন্তর্পনে এগিয়ে একেবারে ওদের পেছনে গিয়ে পৌছল। ষ্টেনগানের ট্রিগারে তর্জনি রেখে ওদের দিকে তাক করে উঠে দাঁড়াল আহমদ মুসা। আহমদ মুসা সবে ওদের অস্ত্র ফেলে হাত তুলে দাঁড়াবার নির্দেশ দিতে যাচ্ছিল। কিন্তু তার আগেই এদিকে হঠাৎ ফিরে দাঁড়ানো ওদের একজনের নজরে পড়ে গেল আহমদ মুসা। অদ্ভুত ক্ষীপ্র গতির লোকটি। আহমদ মুাস তার নজরে পড়ার সাথে সাথেই বিদ্যুত গতিতে সে রিভলবার তুলল আহমদ মুসার দিকে। বিস্মিত আহমদ মুসার কোন উপায় ছিল না তার ষ্টেনগানের ট্রিগার টেপা ছাড়া। যুবকটির রিভলবার তোলা দেখে অন্যেরাও চোখের পলকে ঘুরে দাঁড়িয়েছে। তর্জনি দিয়ে ট্রিগার চেপে ধরল আহমদ মুসা। ঘুরিয়ে নিল ষ্টেনগান ওদের উপর দিয়ে। মুহূর্তেই ওরা লাশ হয়ে পড়ে গেল। মন খারাপ হয়ে গেল আহমদ মুসার। আহমদ মুসা চেয়েছিল ওদের বন্দী করে কিছু কথা আদায় করার। হাজী আবদুল্লাহ এসে দাঁড়াল আহমদ মুসার পাশে। বলল, ‘এখানে বেভান নয়, শোন আহমদ মুসা, আমার অবস্থা দাঁড়িয়েছে খোয়াজ-খিজিরের সাথে সফরে বের হওয়া মুসা (আ)-এর মত। তবে পার্থক্য এই যে, প্রশ্ন করলেই সফর শেষ করার শর্ত করেছিলেন খোয়াজ-খিজির, কিন্তু তুমি সে রকম কোন শর্ত দাওনি। অতএব প্রশ্ন আমি করতে পারি।’ ‘প্রশ্ন করার সময় আপনি পাবেন জনাব, তবে এখন নয়। এত গোলাগুলীর পর ভেতরে যারা আছে, খোঁজ নিতে অবশ্যই আসবে। অতএব চলুন আমরা আড়াল নিয়ে একটু একটু করে সামনে আগাই। তার আগে আসুন মৃত সকলের পকেট সার্চ করে দেখি কোন দরকারী কাগজপত্র পাওয়া যায় কিনা।’ সব পকেট খালি। কাগজপত্র কিছুই পেল না। রাস্তার পাশ দিয়ে ঝোপ-জংগলের আড়াল নিয়ে আবার সামনে এগুতে লাগল আহমদ মুসারা। আহমদ মুসার বাম পকেটের মোবাইলটি বেজে উঠল। মোবাইলটি সেই টাওয়ারে নিহত যুবকের কাছ থেকে নিয়ে এসেছিল। আহমদ মুসা মোবাইলটি বের করে তাকাল স্ক্রীনের দিকে। স্ক্রীনে ‘ঝঝঝ’ এই তিন বর্ণ ভেসে উঠেছে। নিশ্চয় এটা কোন নামের সংকেত। কিছুই বুঝল না আহমদ মুসা। আহমদ মুসা ‘কল অন’ করে মোবাইলটিকে কানের কাছে নিল। ওপার থেকে কোন ভারী কণ্ঠ ‘জিম’ ‘জিম’ বলে চিৎকার করছে। কয়েকবার ডেকে সেই কণ্ঠ চিৎকার করে বলল, ‘তুমি কোথায় জিম? কি হয়েছে ওদিকে? এত গোলা-গুলী কেন?’ আহমদ মুসা শুধু শুনছিল, জবাব দিচ্ছিল না। জবাব না পেয়ে সম্ভবত পাশের একজনকে বলল, ‘কিছু বুঝতে পারছি না। এ দিকে হোটেলের ভেতর থেকে সোমনাথ শম্ভুজী তার বডিগার্ডসহ নিখোঁজ এবং আহমদ আলমগীরের মা-বোনকে হোটেলে পাওয়া যায়নি। এদিকে আবার সেই একই সন্ধ্যায় আমাদের দোর গোড়ায় গোলাগুলীর ঘটনা ঘটল। আমি নিশ্চিত, জিমসহ আমাদের লোকরা অসুবিধায় না পড়লে মোবাইল নিরব হতো না এবং কি ঘটেছে তার খবর আমাদের কাছে পৌছে যেত। এটাই ভাববার বিষয় কি ঘটেছে।’ ভারী কণ্ঠটি থামতেই আরেকটি কণ্ঠ বলল,‘ওখানে আমাদের নয়জন লোক পাহারায় আছে। সকলের একসাথে কিছু হবে এটা স্বাভাবিক নয়। ঠিক আছে, আমি ও নটবর ওদিকটা দেখে আসছি।’ কণ্ঠটি থামতেই সে ভারীকণ্ঠ আবার কথা বলে উঠল, ‘না দেবানন্দ আমিও যাব। কি ঘটেছে আমি দেখতে চাই। তোমরা ফিরে আসা পর্যন্ত অপেক্ষা করতে পারবো না।’ থামল ভারীকণ্ঠটি। কণ্ঠটি থামতেই সেই দেবানন্দের কণ্ঠ আবার বলল, ‘কিন্তু গংগারাম একা থাকবে এখানে?’ মোবাইল মুহূর্তের জন্যে থামল। তারপর সেই ভারীকণ্ঠ আবার বলল, ‘তাহলে.............।’ হঠাৎ তার কণ্ঠ থামিয়ে দিয়ে আর একটি নতুন কণ্ঠ, হয়তো নটবরের, বলল, ‘স্বামীজী, আপনার মোবাইল খোলা আছে। বন্ধ করে দিন।’ ‘ও, তাইতো’- স্বামীজীর এই কণ্ঠের সাথে সাথেই মোবাইল সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেল। তবু খুশি হলো আহমদ মুসা। জানা গেল, ওরা এদিকে আসছে খোঁজ-খবর নেবার জন্যে এবং গংগারাম ওখানে বন্দী অবস্থায় আছে। কিন্তু উদ্বিগ্ন হয়ে উঠল, ‘তাহলে’-র পর স্বামীজী কি বলেছেন তা নিয়ে? সেটা নিশ্চয় গংগারাম সম্পর্কে কথা। কি কথা? খুব খারাপ সিদ্ধান্ত নয় তো! মনের উদ্বিগ্নতা আহমদ মুসার আরও বাড়ল। হাজী আবদুল্লাহ জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে আহমদ মুসার দিকে তাকিয়ে অপেক্ষা করছিল। আহমদ মুসা মোবাইলে যা শুনেছিল তা তাকে জানিয়ে বলল, ‘চলুন, ওদের আসা পর্যন্ত আমরা অপেক্ষা করব না।’ কথা শেষ করেই চলতে শুরু করল। হাজী আবদুল্লাহও। রাস্তা থেকে কিছু দূরে এগিয়ে ঝোপ ঝাড় আগাছার মধ্যে দিয়ে নিজেদের যতটা সম্ভব আড়াল করে সামনে এগুতে লাগল। বাউন্ডারী প্রাচীরের মতই কারাগারটিও পাহাড়ের তিন দিক ঘিরে। কিন্তু কারাগারটি এখন সে অবস্থায় না থাকলেও কংকালটাকে বলা যায় যতেœর সাথেই দাঁড় করিয়ে রাখা হয়েছে। কিছু কিছু অংশ ব্যবহারযোগ্যও হয়েছে। আহমদ মুসারা যেদিকে এগুচ্ছিল, তার সামনে কারাগারের যে অংশ দেখা যাচ্ছে তা কয়েদীদের জেনারেল ব্যারাকের মত নয়। এ অংশটি যেমন ব্যারাকের লেভেল থেকে বেশ উঁচু, তেমনি দরজা জানালার সাইজও ভিন্ন রকমের এবং বড়। আহমদ মুসা দেখেই বুঝল, এটা কারাগারের অফিস-অংশ। প্রধান রাস্তাটা তাই ওদিকেই গেছে।’ আহমদ মুসারা কারাগারের অনেকটা কাছে পৌছে গেছে। কিন্তু ওরা দুজন স্বামীজীসহ এখনও তো বের হলো না। ওরা কি মত পাল্টেছে? মোবাইল খোলা দেখার পর ওরা কি কোন কিছু সন্দেহ করেছে? ওরা কি ভিন্ন কৌশল নিয়েছে? ইত্যাদি প্রশ্ন আহমদ মুসাদের কি করণীয় এ ব্যাপারে আহমদ মুসাকে চিন্তায় ফেলে দিল। একটা ঘর আগাছার মধ্যে দিয়ে আহমদ মুসারা তখন যাচ্ছে। গাছগুলো একফুট দেড়ফুটের বড় নয়, কিন্তু ঘন হওয়া এবং ক্রলিং করা অবস্থার কারণে চারদিকের কিছুই দেখা যাচ্ছে না। ওরা রাস্তা বাদ দিয়ে অন্যভাবেও তো আসতে পারে। আহমদ মুসা উঠে দাঁড়াল। সোজা উত্তরে কারাগারের সম্মুখ ও সামনের রাস্তার দিকেই তার দৃষ্টি গেল প্রথম।


এডিট ডিলিট প্রিন্ট করুন  অভিযোগ করুন     

গল্পটি পড়েছেন ২১১৫৯ জন


এ জাতীয় গল্প

→ কালাপানির আন্দামানে চ্যাপ্টার- ১
→ কালাপানির আন্দামানে চ্যাপ্টার- ১ বাকি অংশ
→ কালাপানির আন্দামানে চ্যাপ্টার- ২
→ কালাপানির আন্দামানে চ্যাপ্টার- ২ বাকি অংশ
→ কালাপানির আন্দামানে চ্যাপ্টার- ৩ বাকি অংশ
→ কালাপানির আন্দামানে চ্যাপ্টার- ৩
→ কালাপানির আন্দামানে চ্যাপ্টার- ৪
→ কালাপানির আন্দামানে চ্যাপ্টার- ৪ বাকি অংশ
→ কালাপানির আন্দামানে চ্যাপ্টার- ৫
→ কালাপানির আন্দামানে চ্যাপ্টার- ৫ বাকি অংশ
→ কালাপানির আন্দামানে চ্যাপ্টার- ৬ বাকি অংশ
→ কালাপানির আন্দামানে চ্যাপ্টার- ৭

গল্পটির রেটিং দিনঃ-

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now