বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
পৃথার বাবাই
-আইভান আমিন
১.
'বাবাই তুমি আসবে না? তুমি কি তোমার পৃথা মামুনিকে ভূলে গিয়েছো? তুমি ফোন ও করোনা। মামুনি বলেছে, 'তোমার বাবাই অন্য একটা দেশে গিয়ে বাসার নাম্বার হারিয়ে ফেলেছে। তাই ফোন দেয় না।' এই নাও আমাদের বাসার নাম্বার - :০১******** । তুমি এই চিঠি পেয়ে সাথে সাথে ফোন দিবে। ফোন মামুনি ধরবে। কিন্তু আমি ফোন কেড়ে নিয়ে কথা বলব তোমার সাথে। আচ্ছা বাবাই আজ তাহলে ফোন দিও, কেমন?'
মেস থেকে সকাল বেলা বেরিয়েছি। একটা চাকুরীর জন্য ইন্টারভিউ দিতে হবে। কোনো রিক্সা না পেয়ে রাস্তার পাশের ফুটপাত ধরে হাটছিলাম। ঠিক তখনই আমার -১.০০ পাওয়ার সমৃদ্ধ চশমার কাঁচের উপর একটা কাগজের বিমান ক্র্যাশ করল।
'কেউ সম্ভবত খেলার ছলে উড়িয়ে দিয়েছে এটা,' ভাবলাম আমি। এর উৎস খুঁজে সময় ক্ষেপণ করার কোনো মানেই হয়না। তবুও কি যেন ভেবে কাগজটা হাতে নিলাম। যেখানে কথাগুলো লেখা ছিল।
হয়ত পৃথা নামের কোনো মেয়ে তার বাবাকে লিখেছে চিঠিটা, এরপর উড়িয়ে দিয়েছে অজানার ঊদ্দেশ্যে। হাতের লেখা দেখে বুঝলাম নিতান্তই বাচ্চা মেয়ে, বড় বড় অক্ষরে দুটো পৃষ্টা জুড়ে ছড়িয়ে রয়েছে লেখাগুলো।
যদিও চিঠির মর্মোদ্ধারে ব্যার্থ হয়েছিলাম, তবুও কাগজের এরোপ্লেন কিংবা চিঠিটা ভাঁজ করে পকেটে রাখলাম। এরপর ফুটপাত ধরে আবারও হাটতে শুরু করলাম। হঠাৎ করেই অরনীর ফোন এলো,
-'অভি... ইন্টারভিউ এর জন্য বেরিয়েছো?'
-'হ্যা, রাস্তায় এখন।'
-'আচ্ছা তাহলে এখন রাখি। আর হ্যা, চাকুরী না পেলে আর আমার সামনেও আসবা না।'
-'হা হা,'
বিশ্রী শব্দে হাসলাম আমি। অরনী ফোন রেখে দিল।
'আজ চাকুরিটা হলে ওর হাসিমাখা মুখটা দেখতে পাবো।' ভাবতেও ভালো লাগল। ওর বাসায় নাকি ওর বিয়ের কথা চলছে। কিন্তু বেকার হওয়ায় আমায় নিয়ে ও সবার সামনে দাড়াতে পারছে না। এরপর এইত ছোট একটা চাকুরীর ইন্টারভিউ এর জন্য চলেছি আমি।
২.
ভাগ্যটা বেশ ভালোই বলতে হবে। চাকুরিটা হয়ে গেল আমার। যদিও বেতন খুব বেশি না, কিন্তু চলার মত। মা, আমি আর ছোট বোন ঊষা। তিনজনের পরিবার সহজেই চলে যাবে। সেখানে অরনীকেও যোগ করা যায়। চার জনের পরিবার চালানোর জন্য যথেষ্ট বেতন।
'চাকুরিটা হয়ে গেছে...' এটা শোনার পর অরনীর মুখটা কেমন হবে ভাবতেও ভালো লাগল আমার। কিন্তু এটা সারপ্রাইজ হিসেবেই রাখব ভাবলাম। তাই ফোনটা অফ করে রাখলাম।
রুমে ফিরেই একটা ঘুম দিলাম। রাত ৮টার সময় ঘুম ভাঙল। ফ্রেশ হয়ে সামান্য নাস্তা করলাম। এরপর মা'কে ফোন দিলাম।
-'মা,'
উৎফুল্ল কন্ঠে বললাম আমি,
-'ছোট একটা চাকুরী পেয়েছি।'
-'ভালো,'
মায়ের কন্ঠ কেমন যেন ঠেকল আমার নিজের কাছেই। কেমন অপরিচিত, কিংবা অন্য কিছু। আমি কেন জানিনা ভয় পেলাম। অস্ফুটে বলে উঠলাম,
-'কি হয়েছে মা?'
-'জানিনা,'
আগের মতই বলে উঠল মা, 'ঊষার সাথে কথা বল।' বলেই ফোনটা ঊষাকে দিয়ে দিল মা। এরপর ঊষা সম্ভবত বাইরে চলে এল, ওর হাটার শব্দ পেলাম।
-'ভাইয়া,'
উদ্বিগ্ন কন্ঠে বলল আমার বোনটি,
-'অরনী আপুর সাথে কি হইছে তোর? আপু তো আম্মুর কাছে ফোন দিয়ে অনেক কাঁদল, সন্ধ্যার একটু পরেই। তোর ফোন অফ ছিল কেনো? কি হয়েছে তোদের?'
-'মানে?'
প্রায় চিৎকার করে উঠলাম আমি। বুঝতে পারলাম না অরনী মা'কে কেনো ফোন দিয়েছে। ও মায়ের সাথে কথা বলতে খুব ভয় পাই। মাঝে মাঝে যদিও ঊষার সাথে কথা বলে। আমার বন্ধু বলতে 'মা'-ই । তাই আমার আর অরনীর কথাটা মা'কে বলেছিলাম। মা'ও মেনে নিয়েছিল।
-'কি হয়েছে একটু পরিষ্কার করে বলবি?'
ভীত কন্ঠে প্রশ্ন করলাম আমি। ওপাশে ঊষা চুপ করে থাকল কিছুক্ষন। এরপর বলল,
-'আমি কিছু জানিনা। প্লিজ তুই অরনী আপুকে ফোন দে।'
ফোনটা কেটে দিলাম। এবং সাথে সাথেই অরনীর নাম্বার ডায়াল করলাম। ২-৩ বার রিং হওয়ার পরে ওদিক থেকে অরনী ফোন ধরল। এরপর রাগত স্বরে বলল,
-'ফোন দিছ কেন? আর কোনোদিন ফোন দিবানা...'
-'আমার পাগলীটা রাগ করেছে, তাইনা?'
-'হা হা হা,'
তাচ্ছিল্য এবং সম্ভবত বেদনার্ত কন্ঠে বলে উঠল সে,
-'আমি আর তোমার নেই। আজ বিকেলে আমায় দেখতে এসেছিল কয়েকজন। পছন্দ হইছে, তাই সন্ধ্যার সময় বিয়েটাও হয়ে গেল।'
-'ধুরর,'
অবাক হলাম আমি। বললাম,
-'মজা করছো, না? এভাবে বিয়ে হয় নাকি? বাদ দাও, কি হয়েছে জানো...'
-'জানার সময় শেষ,'
উচ্চস্বরে বলে উঠল অরনী,
-'তুমি এমন ভাব করছ যেন কিছুই বুঝতে পারছ না! বিকেল থেকে ম্যাসেজের পর ম্যাসেজ, ফোনের ওপর ফোন করেছি। আর তুমি... ছিহ!'
-'মানে?'
প্রচণ্ড অবাক হলাম আমি।
-'আর কোনোদিন ফোন দিবানা।'
ওদিক থেকে কেটে দিল অরনী। আমিও কিছুই বুঝলাম না। হঠাৎ ম্যাসেজ আসতে শুরু করল, অরনীর ম্যাসেজ। বিকেলে যে ম্যাসেজ গুলো পাঠিয়েছিল, সেগুলো। ম্যাসেজ গুলা এমন ছিল,
'তোমার ফোন অফ। আর এদিকে আমায় দেখতে এসেছে।'
'এই! কি হইছে তোমার? প্লিজ আমায় হারাতে দিওনা! এই দয়া টুকু করো প্লিজ।'
'প্লিজ ফোন অন করো। তোমার চাকুরী লাগবে না, তোমার বুকে মাথা রেখে বেঁচে থাকব আমি।'
আরও এমন অনেকগুলো ম্যাসেজে ইনবক্স ভর্তি। সবগুলো পড়তে পারলাম না। চোখ ঝাপসা হয়ে এলো। শেষের ম্যাসেজটা পড়লাম, 'আই হেইট ইউ...'
আর সহ্য হচ্ছিল না। একটু ব্রেক দরকার ছিল। টেবিলের ড্রয়ারে কয়েকটা স্লিপিং পিল ছিল। সেগুলোর কয়েকটা মুখে ঢুকিয়ে দিয়েই বিছানায় । এরপর সম্ভবত ঘুমে তলিয়ে গেলাম। সাময়িক অবসান হল সব কষ্টের।
৩.
ফোনের শব্দে ঘুমটা ভাঙল। স্ক্রিনে তাকিয়ে দেখলাম একটা অজানা নাম্বার। সকাল ১১টার সময় ঘুম ভাঙার কারনে মেজাজটা বেশ খারাপ হল। কিন্তু ফোন ধরতেই ওদিক থেকে ভেসে আসল একটা পিচ্চি মেয়ের কন্ঠ, 'হ্যালো বাবাই...'। বেশ অবাক হলাম! এটা কে? আমাকে বাবাই ডাকছে কেন? এসব ভাবতে ভাবতেই বললাম,
-জ্বী!'
-'লক্ষী বাবাই,'
হাসতে হাসতে বলল পিচ্চি মেয়েটি,
-'নাস্তা করেছো?'
-'নাহ্,'
প্রচণ্ড অবাক হয়ে বললাম আমি,
-'মাত্রই ঘুম থেকে উঠলাম। কিন্তু তুমি কে?'
-'আমি পৃথা,'
অভিমানী কন্ঠে বলল মেয়েটি,
-'আমায় চিনতে পারলে না! যাও কথা নেই। অনেক রাগ করলাম। হু!'
ফোনটা কেটে গেল।
আমার মনে পড়ল কালকের চিরকুট এর কথা। 'কিন্তু মেয়েটি আমার নাম্বার পেল কিভাবে?'- ভাবছি, এমন সময় রুমে ঢুকল আমার রুমমেট বন্ধু রাফাত। চিৎকার করে বলল,
-'হারামী! বিয়া করলা, বাচ্চা পয়দা করলা! আর আমাদের জানালে না! তোর আজ খবর আছে অভির বাচ্চা! খুন করে ফেলব আজ...'
-'মানে কি এসবের?'
প্রচন্ড অবাক হয়ে বললাম আমি,
-'আমি বাচ্চা পেলাম কোথায়? বিয়ে করলাম কবে?'
-'ও। কিছুই মনে নাই,'
মুখ বাকিয়ে বলল রাফাত,
-'এখন ট্রিট দেয়ার ভয়ে কিছু জানোনা? লাভ নাই চান্দু! তোমার টেবিলে ঐ চিরকুট দেখে ফেলছি মামা! তোমার ফোনের টাকা খরচ করেই ভাবী আর পৃথা মামুনির সাথেও কথা বলেছি! হাহা। এখন কও ট্রিট কখন দিবা?'
আমার কাছে অনেকগুলো বিষয় যেন পরিষ্কার হল। রাফাতকে পরে ট্রিট দিব বলে কোনোমতে বিদায় করলাম। কিন্তু এটা বুঝতে পারলাম না, পৃথার মা কেন এসব লুকালো রাফাতের কাছে। তাই ফোন দিলাম ঐ অপরিচিত নাম্বারে। কল রিসিভ করেই ওদিক থেকে কেউ একজন বলে উঠল,
-'সরি সরি! আসলে পৃথা খুব অভিমানী। আপনি রাগ করেন নি তো?'
-'রাগ করব কেন?'
আবারও আমার অবাক হবার পালা। বোকা বনে গেলাম আমি। বললাম, 'আপনি কে? আর রাফাতের কাছে কেন বলেছেন যে পৃথা আমার মেয়ে!'
-'আসলে এগুলো করেছি পৃথার জন্য।'
শান্ত কন্ঠে বলে উঠলেন ওপারের মহিলা,
-''পৃথা 'বাবাই বাবাই' করে পাগল করছিল আমায়। আর কাল রাতে যখন আপনার বন্ধুটি ফোন দিয়ে বলল যে উনি পৃথার আঙ্কেল বলছেন, তখন...'
-'হুম,' বললাম আমি, 'কিন্তু পৃথার বাবা কোথায়?'
-'নেই,' একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে উনি বললেন, "একটা বাস এক্সিডেন্টে... পৃথাকে বলিনি আমি এসব। শুধু বলতাম, 'অন্য একটা দেশে গিয়ে বাসার ফোন নাম্বার হারিয়ে ফেলেছে।"
আমি যেন কিছু বলার ভাষা হারিয়ে ফেললাম।
-'একটা পিচ্চি মেয়ে তার বাবার জন্য অপেক্ষা করছে, আর আমি তাকে কাঁদালাম!' এই ভাবনাটা বুকে শিহরন জাগালো। আস্তে করে বললাম,
-'পৃথাকে একটু দিন তো।' ওদিক থেকে বলল,
-'প্লিজ একটু বাবা হওয়ার অভিনয় করুন! আসলে ও কাঁদছে খুব।' এরপরেই পৃথার হাতে ফোনটা দেয়া হল।
-'আমার পৃথা মামুনিটা রাগ করেছে?' আদর মাখা কন্ঠে জিজ্ঞেস করলাম আমি।
-'যাও তো বাবাই! কথা বলব না,' অভিমানী কন্ঠে বলে উঠল পৃথা,
-'আমি রাগ করেছি খুব। তুমি একটা পঁচা।'
-'আচ্ছা সরি লক্ষী মামুনিটা,' আদুরে স্বরে বললাম, 'এই যে আমি কান ধরলাম। আর কখনও ভুল হবেনা। এবারের মত মাফ করা যায়না মামুনি?'
-'আচ্ছা ঠিক আছে। কিন্তু এক শর্তে।'
একটু হাসল যেন মেয়েটা।
-'আমি আমার মামুনির সব শর্ত রাখব তো! বলো আম্মু, কি শর্ত!'
-'খুব তাড়াতাড়ি আমাকে আর আম্মুকে নিয়ে যাও এখান থেকে, তোমার কাছে। এখানে আমার ভালো লাগেনা বাবাই। আমি তোমার কাছে যাবো বাবাই! আমায় নিয়ে যাওনা বাবাই। ও বাবাই, নিয়ে যাবে তো?' কাঁদতে লাগল পৃথা। আমারও কেন জানিনা চোখটা ভিজে উঠল।
আস্তে করে বললাম,
-'হু, নিয়ে আসব মামুনি! তোমার বাবাই খুব জলদিই আসবে তোমার কাছে। এবার একটু হাসো!'
ওপাশ থেকে পৃথার হাসির শব্দটা শুনতে পেলাম। আমারও কেমন যেন প্রশান্তি আসল বুকে। 'এই পিচ্চিটা আমার জন্যই হেসেছে,'- ভাবতেও ভালো লাগল আমার।
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now