বাংলা গল্প পড়ার অন্যতম ওয়েবসাইট - গল্প পড়ুন এবং গল্প বলুন
বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ

কারাগার

"জীবনের গল্প" বিভাগে গল্পটি দিয়েছেন গল্পের ঝুরিয়ান রিয়েন সরকার (০ পয়েন্ট)

X কারাগার -মোঃ শাহিন আলম রাজশাহীগামী বাসে উঠে মাঝ বরাবর একটি সিটে বসে জানালা দিয়ে আনমনে বাহিরের দৃশ্য দেখছিলাম।নাটোর হরিশপুর বাইপাস যেতেই লক্ষ্য করলাম কাপড়ের বোচকা হাতে একটি ছেলে উঠল। সামনের দিকে একটি সিট ফাঁকা থাকলেও পাশের সিটে বসা ভদ্রোগোছের লোকটি ওকে বসতে দিলনা। হয়ত ওর জির্ণ শার্ট, রূক্ষ এলো চুল আর নবীন বয়স দেখে পকেটমার ভেবে বসতে নেয়নি। বাদ্ধ হয়ে ওকে পিছনে সিট খুঁজতে হল। এক সময় আমার পাশের সিটের লোকটি নেমে গেলে ছেলেটি আমার পাশের এসে বসে। কিছুক্ষণ চুপ চাপ বসে থাকার পর আমি জিজ্ঞেস করলাম, - কোথায় যাবেন? -রাজশাহী গোদাগাড়ি। -কোথায় থেকে আসছেন ? -জেল থ্যাইক্কা। আমার বিশ্বাস হচ্ছিলনা এই তের-চোদ্দ বছরের ছেলেটি জেল খেটে আসতে পারে তাও আবার একা, সাথে কোন স্বজন নেই! ভুল শুনেছি কি না তা নিশ্চিত হবার জন্য আবার জিজ্ঞেস করলে বলে,“তিন বছর জেল খাইট্টা বাড়ি যাইতাছি”। আমি একটু ভয় পেয়ে গেলাম, কি না কি আপরাধ করে জেল খেটে আসছে, পাছে আমার না আবার কোন ক্ষতি করে ফেলে। তবুও ওর সাথে কথা বলতে উৎসাহ জাগছিল। -আচ্ছা আপনি তো নাটোর থেকে উঠলেন, তবে কি নাটোর জেল খানায় ছিলেন? -“না, বহরমপুর জেল খানায়”। -আমি ভাবলাম কাছেই হয়ত কোথাও হবে। আপনার সাথে কাউকে দেখছি না, আপনাকে কেউ নিতে আসেনি ? -“না আসে নাই”। -বাড়িতে জানে যে আজ আপনাকে ছাড়া হবে? -জানে। -তবে এল না যে! -“হয়ত রাস্তায় আপেক্ষা করতাছে”! ওর কথা শুনে ভয়ের মাত্রাটা আরো বেড়ে গেল, এ ভেবে যে হয়ত ছেলেটা কোন জঘন্য অপরাধ করেছে, তাই ঘৃণায় তাকে কেউ নিতে আসেনি। কিছুক্ষণ চুপ চাপ বসে থেকে জিজ্ঞেস করলাম বাসায় জানে কিন্তু নিতে আসেনি কেমন কথা হল! ও উত্তরে বলল .. -“আসলে আমারে কোন দিক দিয়া ছাড়া হইবো ওরা জানে না, আর তাছাড়া সবার কপালে সব থ্যাহে না”। -কোন দিক দিয়ে ছাড়া হবে মানে বুঝতে পারছিনা, আসলে আপনি আসছেন কোথা থেকে? -কৃষ্ণনগর বর্ডার থ্যাইক্কা। -বর্ডার থেকে কেন ? -“আমি ভারতের জেল খানায় তিন বছর আটক আছিলাম”। ওর কথা শুনে স্তম্ভিত হয়ে গেলাম, এতটুকু একটি ছেলে বলে কি! আচ্ছা আপনি ওখানে গেলেন কি করে? -“তাহলে শুনেন ছয় ভাইবোনের মইদ্দে আমি সবার ছোড। আমার সব ভাইয়েরা বিয়া কইরা বউ লইয়া আলাদা থাহে, আর বোনেগো বিয়া দিয়া দিছি। গরে বুড়া মা-বাপ। মা ডায়াবেটিক্স এর রোগী আর বাবায় পঙ্গু মুক্তিযোদ্ধা। ভাইয়েরা ভিন্ন হওনের পর খরচের অভাবে আমার লেখা-পড়া বন্ধ হইয়া যায়। আমি মাডে কাম কইরা মা-বাপেরে লইয়া সংসার চালাইতাম। সংসার ঠিক মত চলতো না, অনেক দিন মা-বাপ লইয়া না খাইয়া থাকছি। তাই রাজমিস্ত্রিরির জোগালদারের কাজ শুরু করছিলাম। একবার ওস্তাদ কইলো ভারত গিয়া এই কাম করলে অনেক বেশি ট্যাকা পাওন যায়। ওস্তাদ আমারে ভারত নিয়া যাইবো কইল। আমিও সংসারের কতা বিবেচনা কইরা রাজি হইয়া গেলাম। ওস্তাদের লগে ভারত গিয়া দিনে তিনশ ট্যেকা কইরা কাম করলাম। তিন মাস পর মা আর বাবার লাইগা শাড়ি আর পাঞ্জাবী কিনা আনলাম। মা-বাপে যে কি খুশি হইছিল আপনেরে বোঝাইতে পারমুনা। ওগো খুশি দেইখা আমার বুকটা ভইরা গেছিল সেইদিন। এর পর আবার যাওনের সময় ভবন গোলা নামে এক জাগায় ধরা পইরা গেলাম”। -আচ্ছা এই তিন বছরে মধ্যে কেউ আপনাকে দেখতে গিয়েছিল? -“ভাই কোন মানুষ তো দূরের কতা, দেশের কোন কুত্তারেও যদি দেখতাম তাও ভালা লাগতো”। বলতেই ওর দু’চোখ আষাঢ়ের বন্যার মত প্লাবিত হয়ে অশ্রু বর্ষণ করতে লাগল। কিছুক্ষণ পর ও শান্ত হলে আমি জিজ্ঞেস করলাম, -বহরমপুর ভারতের কোথায়? -মুর্শিদাবাদ। তখন ও নিজেই বলতে লাগলো, -“ভাই জেল খানার কষ্টের কতা আর কি কমু, সকালে পঞ্চাশ গ্রাম মুড়ি খাইতে দিতো। কোন দিন চিড়া আবার কোন দিন ছোলা খাইতে দেয়, তয় মুড়ির মইদ্দে মরিচের বোটা পাওন যায় মরিচ পাওন যায় না। এগারটায় এক ডাবুক ভাত দেয়”। ও পাঁচ আঙ্গুল ছড়িয়ে ভাতের পরিমাণ বোঝানোর চেষ্টা করে। -“প্রথম যহন গেলাম তহন সারা দিন খিদা লাইগাই থাকতো, খাইলেও পেট ভরতো না। প্যেটে গামছা বাইন্দা রাকতাম। ক্ষুদার জ্বালায় ছটফট করতাম। এর পর অবশ্য অভ্যাস হইয়া যায়। আমাগো যে ভাত খাইতে দিত ঐ ভাতের মইদ্দে এক ধরনের পোকা পাওন যাইতো। ঐ পোকা গুলান দাঁতের নীচে পরলে কি যে বিচ্ছিরি গন্ধ বাইর হইতো, তা বইলা বোঝানো যাইবনা। দুপুর দুইটায় তিন খান রূটি দিত যা আমাগো দেশের একটার সমান।২৫০ গ্রাম চাইলের কতা লেহা থালেও আমাগো দিত ১৫০গ্রাম চাইলের ভাত। আমাগো যে তরকারি দিতো তা আমাগো দ্যেশের গরুও খায় না”। আমি এর কারণ জিজ্ঞেস করলে ও বলল -“ভেন্ডির(ঢেড়শ) গাছ সহ রান্না কইরা আমাগো খাইতে দিত যা খাইতে না চাইলেও ক্ষুধার জ্বালায় খাইতে হইতো। আমাগো গোসল করতে যে পানি দিত, সেই পানিতে ময়লা ভাসত, গোসল করলে গতরে চুলকানি হইতো, ডাক্তারের কাছে গেলে ভালা হইতো কিছুদিন পর আবার হইতো। ছেড়া একটা পাতলা কম্বলে শীত যাইত না থর থর কইরা কাঁপতাম, কি যে কষ্ট”। -আচ্ছা ঈদের দিন আপনার কেমন লাগতো? -“ঈদের দিন পরিচিত হগ্গলের মুখ চোখের সামনে ভাসত, আর বইসা বইসা কাঁদতাম”। -ঈদের দিন আপনাদের জন্যে কোন বিশেষ কিছুর আয়োজন করা হত? -“তেমন কিছু না একপিছ মাংশ আর একপিচ হাড় পাইতাম। তয় পূজার সময় চার দিন ধইরা ভালা খাওন দাওন হইত”। -ভারতীয়রা আপনাদের সাথে থাকত না? -“হ্যাঁ থাকত তয় ওরা আমাগো দেওয়া খাবার খাইতো না বাহির থ্যাইকা খাবার-পানি আইনা খাইত”। কথা বলতে বলতে ওর কাছে থাকা ব্যাগ থেকে একটি রঙ্গিন কৃত্তিম চিংড়ি বের করে দেখিয়ে বলল, “এগুলা জেল খানায় বইসা বানানো শিখছি”। আমি হাতে নিয়ে দেখলাম রঙ্গিন রগসুতা দিয়ে তৈরী আশ্চর্য্য সুন্দর একটি চিংড়ি। ওর নাম জিজ্ঞেস করলে বলে, “বাবর হোসেন”। আমি ঠাট্টা করে বললাম ওরে বাবা, সম্রাট বাবর! আর সম্রাট। এতদিন পর বাড়ি যাচ্ছেন কেমন লাগছে ? -“অনেক আনন্দ লাগতাছে তয় বাড়ি গিয়া দেকমু বৃদ্ধ মা-বাবা শুধু আমার পথের দিকে চাইয়া রইছে, শুনছি মা নাকি কাঁদতে কাঁদতে প্রায় পাগল হইয়া গ্যেছে”। অন্য ভাই-বোনেরা আপনাকে দেখতে আসবে না ? -“ওরা আমারে দেখতে আইব কেন! আপনি জানেন না, ভাই বিয়া করলে ভাবির আর বোন দুলাভাইয়ের হইয়া যায়, নিজের বইলা কেউ থাহে না। আপনি ভাড়ার টাকা পেলেন কি করে ? -“বাংলাদ্যেশে আইসা বাবারে ফোন দিলে বাবা টাকার ব্যবস্থা কইরা মোবাইলে পাঠাইছে”। ও বলল, “ভাইজান জেল খানায় যে কি কষ্ট তা বলার ভাষা আমার নাই, আর যদি হয় দ্যেশের বাইরে তয় তা কাউকে বিশ্বাস করান যাইবো না। রাজশাহী বাসটারমিনালে এসে ওকে বিদায় জানিয়ে বাস থেকে নেমে গেলাম আর ভাবছিলাম এতটুকু একটা ছেলে যার যাবার কথা ছিল স্কুলে, যার হেসে খেলে বেড়ানোর বয়স, সে কিনা সংসার নামক কঠিন বোঝা মাথায় নিয়ে জেল খেটে আসছে। হায়রে জীবন।


এডিট ডিলিট প্রিন্ট করুন  অভিযোগ করুন     

গল্পটি পড়েছেন ২১০৮২ জন


এ জাতীয় গল্প

→ ​গল্প ::অদৃশ্য ভালোবাসার কারাগার
→ শঙ্খনীল কারাগার
→ :::জালেমের কারাগারে ইমাম আবু হানিফা (র.):::
→ মেঘের কারাগার
→ অদৃশ্য কারাগার

গল্পটির রেটিং দিনঃ-

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now