বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
ডুবো পাহাড়
চ্যাপ্টার- ২
২
পোর্ট ব্লেয়র জুড়ে নিñিদ্র নজরদারী চলছে, নগরে যারা প্রবেশ করছে এবং যারা বের হচ্ছে তাদের প্রত্যেককেই খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তাছাড়া নগরীর প্রতিটি বাড়ির বাসিন্দাদের পরিচয় যাচাই করা হচ্ছে। নগরীর উপকূল, সবগুলোর সব এন্ট্রি পয়েন্ট, বিমান বন্দরকে সার্বক্ষণিক নজরদারীর আওতায় আনা হয়েছে।
এই ব্যবস্থা প্রশাসনিক নির্দেশে করা হয়েছে। জনগণের অবগতির জন্যে বলা হয়েছে, এটা রুটিন সতর্কতা ও চেকআপের মহড়া। জনগণের উদ্বেগের কোন কারণ নেই। তারা সব সময়ের স্বাভাবিক চলাফেরা, কাজ-কর্ম করে যাবেন।
নজরদারী ও চেকআপের কাজে পুলিশের পাশাপাশি রয়েছে ব্যাজ পরা রাষ্ট্রীয় স্বেচ্ছাসেবক। আসলে এরা স্বেচ্ছাসেবক নয়, এরা সকলে ‘মহাসংঘ’ ও শিবাজী সন্তান সেনা (সেসশি) এর সদস্য। নজরদারী ও চেকআপে এরাই আসল, পুলিশ সাইনবোর্ড মাত্র।
মহাসংঘ ও ‘সেসশি’ আহমদ মুসা আন্দামানে এসেছে এটা জেনে ফেরার পর মহাআলোড়ন সৃষ্টি হয়েছে পর্দার অন্তরালে। মূল ভূখ-ের মুম্বাই ও উত্তর প্রদেশে যথাক্রমে ‘সেসশি’ ও মহাসংঘ-এর হেডকোয়ার্টার এক পায়ে দাঁড়িয়ে গেছে আন্দামানে আহমদ মুসার আসার কথা শুনে। ভারতে বাবরী মসজিদ ভাঙা, আসামের নেলী, বোম্বাই; গুজরাটে সংখ্যালঘু নিধনের মত সংখ্যালঘু নির্মূলের রাজনীতি যারা করে, তারা ক্রোধে ফেটে পড়েছে। সেই সাথে মজলুম উদ্ধারে, অন্যায়ের প্রতিকারে আহমদ মুসার অনন্য রেকর্ডের কথা তারা জানে বলে তারা আতংকও বোধ করছে। মনে করছে, আইসবার্গের নিচে জাতিগত হিংসা, বিদ্বেষ ও সাম্প্রদায়িকতার যে ডুবো পাহাড় তারা লুকিয়ে রেখেছে, সেটাকে আহমদ মুসা দিনের আলোতে এনে ফেলতে পারে। এই ভয়, আতংক, ক্রোধ থেকে এবং মহাগুরু শংকরাচার্য ও স্বামী স্বরূপানন্দের মত লোকদের মহাজ্বালা সামনে রেখে তারা আন্দামানের গোপন সাম্প্রদায়িক আন্দোলনের নেতা মহামুনি শিবদাস সংঘমিত্রের উদ্দেশ্যে নির্দেশ জারি করেছে, আহমদ মুসা আর একদিনও যাতে জীবিত থাকতে না পারে। আন্দামানে এটাই তাদের এখন একমাত্র কাজ।
পোর্ট ব্লেয়ার ছাড়াও উত্তরে ‘নর্থ প্যাসেজ আইল্যান্ড’ থেকে পোর্ট ব্লেয়ারের দক্ষিণে ডান কান প্যাসেজ পর্যন্ত মধ্য ও দক্ষিণ আন্দামানের দুই উপকূলকেও সার্বক্ষণিক সতর্ক পাহারার মধ্যে রাখা হয়েছে।
ভাইপার দ্বীপের সামরিক অবজারভেটরি।
একটা নাইট ভিশন দূরবিনে চোখ রেখে বসেছিল জয়রাম রাঠোর। তার দুরবিনের চোখ ঘুরছে নর্থ প্যাসেজ দ্বীপের দক্ষিণে ‘কী’ আইল্যান্ড ও রিসেজ দ্বীপপুঞ্জের মধ্যবর্তী গোটা উপকূল রেখায়।
জয়রাম রাঠোর ‘মহাসংঘ’-এর একজন অপারেশন প্রধান। গভর্নরের বিশেষ নির্দেশে বিশেষ জুরী অবস্থায় সামরিক অবজারভেটরিতে সামরিক লোকদের সাথে সেও কাজ করছে। সামরিক লোকরা ধরে নিয়েছে জয়রাম রাঠোর কেন্দ্রীয় বিভাগের কেউ হবেন।
তার সহযোগী হিসেবে তার পাশেই বসেছিল এখানকার সেনা ইউনিটের একজন ক্যাপ্টেন। সে এক সময় জয়রাম রাঠোরকে লক্ষ্য করে বলল, ‘স্যার, আমরা যান সন্ধান করছি, সে অনুপ্রবেশকারী লোকটি কে?’
‘একজন ইন্টারন্যাশনাল টেররিষ্ট।’ বলল জয়রাম রাঠোর।
‘নাম জানা গেছে?’
সঙ্গে সঙ্গে উত্তর দিল না জয়রাম রাঠোর। দ্বিধাগ্রস্ত ভাব ফুটে উঠেছে তার চোখে-মুখে। অবশেষে নাম সে বলল না। বলল, ‘টেররিষ্টদের নামের ঠিক নেই। যেখানে যেমন ইচ্ছা তেমন নাম নেয়। যেই হোক, সে একজন মুসলিম টেররিষ্ট।’
‘একটা কথা স্যার, মুসলমানরা হঠাৎ এমন টেররিষ্ট হয়ে উঠল কেন?’
‘তার মানে মুসলমানরা আগে টেররিষ্ট ছিল না বলতে চাও?’
‘আমি বলতে চাই না স্যার। ইতিহাস বলে। সে কথাই আমি বলছি।’
‘ইতিহাস কি বলে, শুনি।’
‘স্যার গত বিশ শতকের দ্বিতীয় দশকের পর দু’টি আন্দোলনকে আমরা খুব বেগবান হতে দেখি। একটা হল কম্যুনিজমের বিস্তার, অন্যটি মুসলমানদের স্বাধীনতা সংগ্রাম। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ অর্থাৎ ১৯৪৫ সালের পর মুসলমানদের স্বাধীনতা সংগ্রাম যেমন চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌছে, তেমনি কম্যুনিজমের বিস্তারও এ সময় সর্বোচ্চ পর্যায়ে উন্নীত হয়। ১৯৭০ সালের মধ্যে প্রায় সবগুলো মুসলিম দেশ স্বাধীন হয়ে পড়ে। এই দুই সমান্তরাল আন্দোলনের মধ্যে কম্যুনিজমের রাজ্য গঠন ও রাজ্য বিস্তার ছিল হিংসা, সন্ত্রাস ও ষড়যন্ত্র নির্ভর। আর মুসলমানদের স্বাধীনতা সংগ্রাম ছিল জনগণের শক্তি, সুবিচার ও যুক্তিনির্ভর। স্বাধীনতা সংগ্রামে মুসলমানরা সীমাহীন নির্যাতনের শিকার হয়েছে, কিন্তু এরপরও তারা কম্যুনিষ্টদের মত ষড়যন্ত্র ও সন্ত্রাসের পথ বেছে নেয়নি। ভারতের কথাই ধরুন স্যার। এখানে মুসলমানদের আযাদী আন্দোলনের নেতা মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ এতটাই নিয়মতান্ত্রিক ছিলেন যে, জীবনে একবারও তাঁকে জেলে যেতে হয়নি। তারপর দেখুন স্যার, বঙ্গভঙ্গ রহিত করার জন্য আমরা হিন্দুরা বিক্ষুব্ধ হয়ে আবেগের বশে সন্ত্রাসবাদী আন্দোলন করেছি, বোমা মেরেছি, কিন্তু মুসলমানরা বঙ্গভঙ্গের পক্ষে এবং বঙ্গভঙ্গ রহিত করার বিপক্ষে কোন সন্ত্রাসবাদী আন্দোলন করেনি, বোমাও হাতে তুলে নেয়নি।’
দীর্ঘ বক্তব্য দিয়ে থামল ক্যাপ্টেন শশাংক সিংঘাল।
জয়রাম রাঠোরের মুখে-চোখে একটা বিরক্তি ভাব ফুটে উঠেছিল। ক্যাপ্টেন শশাংক সিংঘাল থামতেই জয়রাম রাঠোর বলল, ‘তুমি বোধ হয় ইতিহাসের ছাত্র ছিলে?’
‘জি স্যার।’
‘কোথায় তুমি লেখাপড়া করেছ, আলীগড়ে?’
‘না স্যার। অনার্স, মাষ্টার্স দু’টোই আমি বেনারস হিন্দু বিশ্ববিদ্যালয় থেকে করেছি।’
‘ভালো করেছ। তবে তুমি সামরিক বাহিনীতে না এসে বিনোদাভাবে কিংবা রামমোহনের মত কোন সর্বোদয় নেতা হওয়া উচিত ছিল তোমার। থাক, তুমি তোমার প্রশ্নের উত্তর চাও?’
‘জি স্যার।’
‘তত্ব কথা শুনতে নাকি নগ্ন সত্যটা জানতে চাও?’
‘সত্য জানতে চাই স্যার।’
‘মুসলমানরা সীমাহীন সম্পদের মালিক এক বদ্ধ বোকার মত। ওদের কাছে এমন এক পরশ পাথর আছে যা গোটা দুনিয়াকে ওদের জন্যে সোনায় পরিণত করে দিতে পারে। কিন্তু এ কথাটা ঐ বোকারা জানে না। ওরা এটা জানা এবং ব্যবহার করার আগেই ওদের হাত-পা ভেঙে ওদের চলৎশক্তি রহিত করা প্রয়োজন। এই কাজই এখন চলছে।’ বলল জয়রাম রাঠোর।
‘বুঝলাম না স্যার। মুসলমানদের টেররিষ্ট হওয়া এবং তাদের হাত-পা ভেঙে চলৎশক্তিহীন করা- এ দুয়ের মধ্যে কি সম্পর্ক?’
‘কল্পনা করো ভোটের কোন এক প্রার্থীর কথা। ভীষণ জনপ্রিয়। মানুষ তাকে দারুণ ভালোবাসে। সে সকলের ভোট পেয়ে যাচ্ছে। কিন্তু এই সময় যদি প্রমাণ হয়ে যায় যে, সে কোটি টাকা আত্মসাতকারী, কোটি টাকার কালোবাজারী। তখন তার অবস্থা কি দাঁড়ায়? হাত-পা ভাঙ্গা চলৎশক্তিহীন মানুষের মত হয়ে যায় না? প্রকৃত অর্থে মানুষের কাছে তার মৃত্যু ঘটে যায় কি না? মুসলমানরা টেররিষ্ট বলে চিহ্নিত হবার পর তাদের এই অবস্থাই হয়ে গেছে।’
‘কিন্তু আমার প্রশ্ন ছিল, মুসলমানরা হঠাৎ এভাবে টেররিষ্ট হল কি করে?’
‘কারণটা তো বলেছি। উদাহরণও দিয়েছি। এ থেকেই বুঝে নেয়া উচিত ছিল। আরও খোলাসা শুনতে চাও?’
‘জি স্যার।’
‘মুসলমানদের টেররিষ্ট বানানো হয়েছে। পুঁজি করা হয়েছে তাদের অসন্তোষকে। এ লক্ষ্যেই তাদের অসন্তোষকে বাড়ানো হয়েছে, কমানোর বা তাদের সমস্যা সমাধানের কোন চেষ্টা করা হয়নি। মুসলমানদের দু’টি সমস্যা ছিল খুব বড়। একটা ফিলিস্তিন, অন্যটা কাশ্মীর। জাতিসংঘের মাধ্যমে বহু আগেই এ সমস্যার সমাধান হয়ে যেত। কিন্তু তা করতে দেয়া হয়নি। মার্কিন যুক্তরাষ্ট ও রাশিয়া দুই পরাশক্তি দুই পক্ষ নিয়ে সমস্যা দুটিকে ঝুলিয়ে রাখে প্রায় ৪০ বছর। ফিলিস্তিন সমস্যা নিয়ে ইসরাইল ও আরবদের মধ্যে এবং কাশ্মীর সমস্যা নিয়ে পাকিস্তান ও ভারতের মধ্যে তিনটি করে বড় বড় যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছে। জীবন ও সম্পদের সীমাহীন ক্ষতি হয়েছে। কিন্তু সমস্যার সমাধান হয়নি। এই অবস্থায় জাতিসংঘের ব্যর্থতার পটভুমিতেই নব্বই দশকের আগে ও এর শুরু থেকে ফিলিস্তিন ও কাশ্মীরের বাসিন্দারা স্বাধীনতার জন্যে গেরিলা লড়াই শুরু করে। গোটা নব্বই এর দশক ধরে এ লড়াই চলে। পরাশক্তি হিসেবে রাশিয়ার পতন ঘটার পর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্র পশ্চিমী শক্তির একক নেতৃত্বে এই সমস্যার সমাধান হলো না। এই অব্যাহত অবিচার, মুসলিম দেশসমূহে নিজেদের আদর্শ ও অধিকারের চেতনা অবলম্বন করে মুসলিম যুব শক্তির উত্থান, ইসলামের নামে ইরানে বিপ্লব এবং আফগানিস্তানে মুসলিম সমর শক্তির বিজয় শুধু মুসলিম বিশ্বে নয়, গোটা দুনিয়ায় মুসলমানদের মধ্যে নতুন জাগরণের জোয়ার সৃষ্টি করে। এই জাগরণের মধ্যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট ও তার মিত্ররা এক নতুন শক্তির উত্থান প্রত্যক্ষ করল। নতুন শক্তির এই উত্থানকে অংকুরেই শেষ করে দেবার জন্যে একটা বড় অজুহাত বা উপলক্ষের প্রয়োজন ছিল। ‘সন্ত্রাস’কে তারা এই উপলক্ষ হিসেবে বাছাই করল। আফগানিস্তানে গেরিলা যুদ্ধে বিজয়ী, কাশ্মীর ও ফিলিস্তিনে গেরিলাযুদ্ধরত এবং যুগ-যুগান্তের অবিচার পীড়িত মারমুখী হয়ে ওঠা মুসলমানদের উপর ‘সন্ত্রাসী’ হওয়ার দোষ চাপানো খুব সহজ ছিল। মুসলমানদের উপর সন্ত্রাসের দায় চাপানোর জন্যেই নিউইয়র্কে টুইন টাওয়ার ধ্বংসের সন্ত্রাসী কর্মকা- অভিনীত হল। যেহেতু তাকফিরুল হিজরা, আল-জিহাদ ও হিজবুল্লাহর মত ক্ষুদ্র কয়েকটা গোষ্ঠী ছাড়া মুসলিম বিশ্বের সব ইসলামী দলই গণতান্ত্রিক। তারা সন্ত্রাস-ষড়যন্ত্র পছন্দ করে না। তাই আল-কায়েদা নামে একটা ইসলামী দল ও লাদেন নামে একটা ইসলামী ব্যক্তিত্বকে খাড়া করা হয় এবং টুইন টাওয়ার ধ্বংসের দায় এদের ঘাড়ে চাপানো হল। তাদের আশ্রয় দেয়ার অপরাধে আফগানিস্তান ধ্বংস করা হল। শুরু হয়ে গেল সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ। মুসলমানদের বানানো হল এই যুদ্ধের প্রতিপক্ষ, অন্য কথায় সন্ত্রাসী।
দীর্ঘ বক্তব্য দিয়ে থামল জয়রাম রাঠোর।
‘ধন্যবাদ স্যার। বুঝতে পেরেছি সব। কিন্তু স্যার আমরা যার সন্ধান করছি, সে কি সত্যিই টেররিষ্ট, না বানিয়ে বলা হচ্ছে?’ বলল ক্যাপ্টেন শশাংক সিংঘাল।
সঙ্গে সঙ্গে জবাব দিল না জয়রাম রাঠোর। তার মুখে একটা অস্পষ্ট হাসি ফুটে উঠল। বলল, ‘তুমি সত্য জানতে চাও, না যা বলা উচিত তা জানতে চাও?’
‘সত্য জানতে চাই স্যার।’
‘সত্য জানতে চাইলে এখন উত্তর পাবে না। এখন আমরা যুদ্ধক্ষেত্রে আছি। যাকে আমরা বধ করব, তার সম্পর্কে ভালো চিন্তা বা ভালো কথার এখন সময় নয়।’
‘তাহলে অর্থ দাঁড়ায় স্যার, সে ভালো কেউ?’
জয়রাম রাঠোর চোখ পাকিয়ে ক্যাপ্টেন শশাংকের কথার উত্তর দিতে যাচ্ছিল, সে সময় তার মোবাইল বেজে উঠল।
মোবাইল তুলে নিয়ে স্ক্রীনের দিকে চেয়েই এ্যাটেনশনের ভঙ্গিতে সোজা হয়ে চেয়ারে বসল। বলল, ‘স্যার, স্যার........।’
ওপারের কথা শুনল। শুনে শশব্যস্তে বলল, ‘স্যার, নিশ্চিন্ত থাকুন স্যার। আমাদের চোখ এড়িয়ে সে পোর্ট ব্লেয়ারে প্রবেশ করতে পারবে না। পশ্চিম উপকূলের স্পাইক আইল্যান্ড থেকে আমাদের লোক চোখ রেখেছে নর্থ প্যাসেজ সাউথ প্যাসেজসহ পশ্চিম উপকূলের দিকে। স্যার, পশ্চিম উপকূলে বাড়তি ব্যবস্থা হিসেবে আছে হারতাবাদের পশ্চিম উপকূলে আমাদের আরেকজন লোক। নেইল আইল্যান্ডে আমরা আরেকজনকে রেখেছি পূর্ব উপকূলে বাড়তি সতর্কতার জন্য। সাউথ আন্দামানের দু’পাশের গোটা উপকূলই আমাদের নজরে স্যার।’
থামল জয়রাম রাঠোর। ওপারের কথা শুনল। উত্তরে বলল, ‘না স্যার ভুল হবে না। তার চেহারা আমাদের মুখস্থ। চিনতে পারলেই গুলী, কোন কথা নয় স্যার।’
কথা শেষ করে ওপারের কথা শুনে ধন্যবাদ দিয়ে মোবাইল রেখে দিল জয়রাম রাঠোর।
‘কার টেলিফোন ছিল স্যার?’ উৎফুল্ল কণ্ঠে জিজ্ঞেস করল ক্যাপ্টেন শশাংক সিংঘাল।
‘কার আবার...।’ কথা শেষ না করেই থেমে গেল জয়রাম রাঠোর। নিজেকে সামলে নিয়েই বলে উঠল, ‘উনি ছিলেন গভর্নর বিবি মাধব।’
বলেই দূরবিনের দিকে আবার মনোযোগ দিল। বলল ক্যাপ্টেন শশাংককে লক্ষ্য করে, ‘দেখ দুরবিনে ভালোভাবে চোখ রাখ।’
তার কথা শেষ হবার আগেই তার মোবাইল বেজে উঠল।
মোবাইল তুলে নিয়ে তাকাল স্ক্রীনের দিকে। দেখল স্ক্রীনে বিপিন বাজওয়ার নাম ভেসে উঠেছে।
বিপিন বাজওয়া নেইল আইল্যান্ডের পর্যবেক্ষণ টাওয়ার থেকে নজর রাখছে উপকূলসহ পোর্ট ব্লেয়ারের সামনের আন্দামান সাগরের উপর।
জয়রাম খুশি হল মোবাইল স্ক্রীনে বাজওয়ার নাম দেখে। বলল, ‘কি খবর বাজওয়া?’
‘বড় ঘটনা ঘটে গেছে।’ বলল বাজওয়া। উত্তেজিত তার কণ্ঠস্বর।
‘কি ঘটনা?’
‘এক বিস্ফোরণে আহমদ মুসার বোট ধ্বংস হয়েছে। আহমদ মুসাও।’
‘কোথায়? কি ঘটনা?’
‘আমাদের নেইল আইল্যান্ড থেকে প্রায় ৬০ কিলোমিটার দক্ষিণে। বলা যায় ৯৩ ডিগ্রী অক্ষাংশের উপর আমাদের বোট দ্বারা ঘেরাও অবস্থায় আহমদ মুসার বোটে বিস্ফোরণ ঘটেছে।’
‘ঘটনাটা কি?’
‘আহমদ মুসার বোটটি যখন পশ্চিম উপকূলের স্পাইক আইল্যান্ডের উত্তর দিয়ে ‘নর্থ প্যাসেজে’ প্রবেশ করেছিল পূর্ব উপকূলে আসার জন্যে তখন স্পাইক আইল্যান্ডের আমাদের পর্যবেক্ষণ কেন্দ্র তা দেখতে পায। বোটের আলো নিভানো ছিল, ইঞ্জিন ছিল সাইলেন্সার যুক্ত। বোটের চালক ছিল একমাত্র আরোহী। একটা কৌণিক অবস্থানের কারণে ‘নাইট ভিশন’ দুরবিনেও তাকে চেনা সম্ভব হয়নি। সন্দেহ হওয়ায় স্পাকি দ্বীপ থেকে একটা বোট তার পিছু নেয়। সন্দেহযুক্ত বোটটি ‘নর্থ প্যাসেজ’ পার হয়ে রিসেজ দ্বীপপুঞ্জ ঘুরে বারেন দ্বীপকে বাঁয়ে রেখে দক্ষিণ দিকে চলতে শুরু করে। দক্ষিণগামী কোন বোট পাগলের মত এতটা পথ কখনও ঘোরে না। এতে সন্দেহ আরও বাড়ে। রিসেজ দ্বীপপুঞ্জের ‘আউট রাম’ দ্বীপের পর্যবেক্ষণ নৌকেন্দ্র থেকে আরও দুটি বোট তার পিছু নেয়। পোর্ট ব্লেয়ার বরাবর এসে রহস্যজনক বোটটি তার গতি পরিবর্তন করে সোজা পশ্চিম দিকে চলতে শুরু করে। সন্দেহ আরও ঘনীভূত হয়। নিশ্চিত বোঝা যায় বোটটির লক্ষ্য পোর্ট ব্লেয়ার। সঙ্গে সঙ্গে ব্যাপারটা ওরা আমাদেরও জানায়। আমরা ‘নেইল আইল্যান্ড’ থেকে আরও তিনটি বোট নিয়ে সামনে থেকে এগোলাম। আমাদের তিনটি এবং পেছন থেকে তিনটি মোট ৬টি বোট রহস্যজনক বোটটিকে ঘেরাও করে ফেললাম। তখনও বোটের চালক লোকটিকে সরাসরি দেখা যায়নি। আমাদের লক্ষ্য ছিল রহস্যজনক বোটটিকে আটকানো। আমরা বোটের আলো নিভিয়ে তার দিকে অগ্রসর হচ্ছিলাম। আমাদের নাইট ভিশন দূরবিনেই সে প্রথম ধরা পড়ল। আমরা চিনতে পারলাম সে আহমদ মুসা। সঙ্গে সঙ্গেই আমাদের বোট থেকে সব বোটকে এলার্ট করা হল। ঘিরে ফেলা হল বোটটিকে। সেও আমাদের দেখে ফেলেছে। তার বোটের স্পীড সাংঘাতিক বেড়ে গেল। তীর বেগে সে এগোল পোর্ট ব্লেয়ারের দিকে। একদম বেপরোয়া। মনে হল সামনে অন্য বোট পড়ে গেলে তার উপর দিয়েই সে সামনে এগোবে। উপায় না দেখে তাকে থামাবার জন্য চারদিক থেকে মেশিনগানের গোলা বর্ষণ শুরু করলাম। আমাদের ব্যারিকেড ভাঙতে পারলেও শেষ রক্ষা করতে সে পারল না। সম্ভবত ফুয়েল ট্যাংকারে বিস্ফোরণ ঘটে টুকরো টুকরো হয়ে গেল বোটটি। তার সাথে সাথে ছাই হয়ে গেছে আহমদ মুসাও।’
বিপিন বাজওয়ার দীর্ঘ বিবৃতি শেষ হল।
আনন্দ-বিস্ময়ে জয়রাম কিছুক্ষণ কথা বলতে পারল না। তারপর বলল চিৎকার করে, ‘ধন্যবাদ বাজওয়া তোমাদের সকলকে। আমাদের মহামুনি মানে স্যার কি জেনেছেন?’
‘এইমাত্র তো ঘটনা ঘটেছে। তাঁর সবগুলো ফোন ব্যস্ত পেয়ে আপনাকেই প্রথম টেলিফোন করলাম।’
‘ঠিক আছে, আমি জানিয়ে দিচ্ছি। তোমরা এখন কোথায়?’
‘আমরা এখন বিস্ফোরণ ক্ষেত্রেই। আপনাদের হুকুমের অপেক্ষা করছি।’
‘ঠিক আছে। আমি তাহলে মহামুনি স্যারের সাথে কথা বলে নেই। তারপর জানাচ্ছি।’
কথা শেষ করেই ‘বাই’ বলে দ্রুত লাইনটা কেটে দিল।
জয়রাম রাঠোর দ্রুত টেলিফোন করল মহামুনি শিবদাস সংঘমিত্র ওরফে গভর্নর বিবি মাধবকে।
গভর্নর বিবি মাধব টেলিফোন ধরেই বলল, ‘তোমাদের ধন্যবাদ জয়রাম। খবর আমরা পেয়েছি। খবর শুধু এটা নয় জয়রাম, এটা মহাখবর। পৃথিবীর অধিশ্বররা যা পারেনি, তোমরা তাই করে দেখালে। সুতরাং আমরাই পৃথিবীর অধিশ্বর হব, এটা প্রমাণ হল।’
‘অবশ্যই মহামুনি গুরুদেব। আমাদের ‘মহাসংঘ’ অবশ্যই দুনিয়াতে মহাকীর্তি রেখে যাবে।’
‘আগে বিশ্বের কথা নয় জয়রাম। নর-দেবতা শিবাজী মহাপ্রভুর আমৃত্যু সংগ্রামের যে স্বপ্ন, যা মহাকবি রবীন্দ্রনাথ তার ‘এক ধর্মরাজ্য পাশে খ- ছিন্ন বিক্ষিপ্ত ভারত বেঁধে দিব আমি’ কবিতাংশে অপরূপভাবে প্রকাশ করেছেন, তার আশু বাস্তবায়ন আমাদের কাজ।
‘তথাস্তু মহামুনি মহাগুরু। আমার জন্যে আর কিছু নির্দেশ?’
‘কাল সকালে পুলিশ যাওয়া পর্যন্ত ওদের সেখানে অপেক্ষা করতে বল। কিছু আলামত পেলে তা ওরা সংগ্রহ করতে পারবে।’
‘তথাস্তু মহামুনি মহাগুরু!’
ওপার থেকে লাইন কেটে দেয়া হয়েছে।
জয়রাম রাঠোর মোবাইল রেখে দিল।
ক্যাপ্টেন শশাংক বোবা দৃষ্টি নিয়ে তাকিয়েছিল জয়রাম রাঠোরের দিকে।
জয়রাম টেলিফোন রাখতেই ক্যাপ্টেন শশাংক বলল, ‘কার সাথে কথা বললেন স্যার? আমরা যার সন্ধান করছি, বোটসহ তার ধ্বংস হওয়ার খবর দেয়ার কথা বলে টেলিফোন করলেন। কিন্তু খবর তো দিলেন না।’
হাসল জয়রাম রাঠোর। বলল, ‘উনি আগেই খবর পেয়েছেন। তার খবর পাওয়ার লাইন বহু।’
‘কে তিনি স্যার? ‘মহাসংঘ’, ‘মহাকীর্তি’, ‘মহামুনি’, ‘মহাগুরু’ এসব কথার কিছুই বুঝলাম না স্যার।
‘এসব শব্দ থেকেই বুঝেছ, যার সাথে আমি কথা বলেছি, তিনি একজন অসাধারণ ব্যক্তি। সাধারণ্যে তার কথা বলা যায় না।’
‘স্যার দেশ আমাদের গণতন্ত্রের। এখানে আইনের দৃষ্টিতে সাধারণ-অসাধারণ নেই, এখানে অস্বচ্ছতার কোন দেয়াল নেই।’
‘কেতাবের কথা রাখ। কেতাবের কথা দিয়ে শাসন চলে, দেশ চলে, কিন্তু জাতি বাঁচে না।’
‘দেশ ও জাতিকে আপনি আলাদা করে দেখছেন?’
‘দেশের নাম, সীমার পরিবর্তন হতে পারে, কিন্তু জাতির জীবন পথ অপরিবর্তনশীল। সুতরাং একটু পার্থক্য তো হতেই পারে।’
‘একটি গনতান্ত্রিক দেশে ‘জাতীয় জীবন পথ’ বা ‘জাতীয় স্বার্থ’, যদি মেজরিটির স্বার্থ হয়, তাহলে সেটাও গণতন্ত্রের অধীন। গণতন্ত্রের অধীন হলে সেটা আইনানুগ হবে এবং তাতে স্বচ্ছতা থাকবে। সুতরাং ‘জাতীয় জীবন পথ’ বা ‘জাতীয় স্বার্থ’ তো আলাদা হচ্ছে না।’
‘আলাদা হলেই তা আইনানুগ হবে না, তাতে স্বচ্ছতা থাকবে না সেটা নয়। কিন্তু জাতীয় অধিকার প্রতিষ্ঠার অন্তবর্তীকালীন একটা সময়ে প্রতিষ্ঠিত আইন ভাঙতে হয়, স্বচ্ছতাও রাখা যায় না। যেমন স্বাধীনতা সংগ্রাম। জাতীয় অধিকার প্রতিষ্ঠার কাজও জাতির স্বাধীনতা সংগ্রাম। সেই সংগ্রাম চলছে। সে সংগ্রামে নেই বলে তুমি অনেক কিছু বুঝতে পারছো না।’
‘কিন্তু দেশ তো আমাদের স্বাধীন। আইন ও সংবিধানের বাইরে তো কোন সংগ্রাম চলতে পারে না। এ সংগ্রাম আসলে কি চায় স্যার।’ ক্যাপ্টেন শশাংকের চোখে সন্দেহ ও গভীর অনুসন্ধিৎসা।
‘ঐ তো বললাম শিবাজী যে জন্যে সংগ্রাম করেছেন, রবীন্দ্রনাথ যে কথা কবিতায় প্রকাশ করেছেন খ- ছিন্ন বিক্ষিপ্ত ভারতকে এক সাথে বেঁধে ‘এক ধর্মরাজ্য প্রতিষ্ঠা’।
‘কিন্তু এই ধরনের সংগ্রাম তো ভারত রাষ্ট্রের স্বাধীনতা চেতনা ও সংবিধান দু’য়েরই বিরোধী। তাছাড়া আমাদের হিন্দু ধর্ম তো কিছু পুরা কাহিনীর সমষ্টি মাত্র। এ দিয়ে আজ কোন ধর্মরাজ্য প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়। হলে সেটা হবে ধর্মের নামে স্বৈরতন্ত্র, ঠিক যেমন ছিল মধ্যযুগে ইউরোপের যাজক-রাষ্ট্র-তন্ত্র।’
চরম বিরক্তিভাব ফুটে উঠেছিল জয়রাম রাঠোরের চোখে-মুখে। বলল, ‘এই কিছুক্ষণ আগে তুমি মুসলিম রাষ্ট্রের কথা বলেছ, তাহলে ‘হিন্দু রাষ্ট্র’ হবে না কেন?’
‘আমি মুসলিম রাষ্ট্রের কথা বলিনি। মুসলমানদের স্বাধীনতা সংগ্রামের কথা বলেছি। তবে যদি ধরে নেই মুসলমানদের স্বাধীনতা সংগ্রাম মুসলিম রাষ্ট্রের জন্যে, যেমন ভারত ভাগ হয়েছে পৃথক ‘মুসলিম রাষ্ট্রের’ দাবীতে। তবু এখানে কথা আছে, মুসলমানদের ধর্মগ্রন্থে তাদের রাষ্ট্রনীতি আছে যা সাংঘাতিকভাবে আধুনিক। সুতরাং মুসলিম রাষ্ট্র হতে পারে। কিন্তু আমাদের সে সুযোগ নেই। মাফ করবেন রাজা দশরথ (রামচন্দ্রের পিতা) ও রামচন্দ্র যে রাজ্য পরিচালনা করেছেন তা নিজস্ব ধর্মচিন্তার ভিত্তিতে, ধর্মগ্রন্থের সুনির্দিষ্ট বিধানবলীর ভিত্তিতে নয়। সুতরাং মানব রচিত নয় এমন ‘সোর্স অব ল’ আমাদের নেই, যা মুসলমানদের আছে বলে তারা দাবী করে।’
‘তোমার এসব তত্ত্ব কথা রাখ ক্যাপ্টেন। তত্ত্বের চেয়ে বাস্তবতা বড়। বাস্তবতা বহুদূর এগিয়ে গেছে। তোমার চোখ নেই তাই দেখতে পাচ্ছ না। ডুবো পাহাড় দেখেছ? নিশ্চয় দেখার কথা। ‘মহাসংঘ’ আজ ডুবো পাহাড়ের রুপ নিয়েছে। কিছুই দেখছো না তুমি। কিন্তু দেশ নামক সমুদ্রের সবটা জুড়ে রয়েছে ডুবো পাহাড়।’
‘কিছুই বুঝতে পারছি না স্যার। যা বলছেন তা কি ঠিক?’
‘অবশ্যই।’
‘কিন্তু স্যার আমার মনে হচ্ছে আমাদের পুরা কাহিনীর মতই এ এক কল্প কথা।’
‘অল্প বুদ্ধি ভয়ংকর ক্যাপ্টেন। জেনারেল হও তারপর বুঝবে আমি যা বলছি তার অর্থ।’ বলল জয়রাম রাঠোর অনেকটা বিদ্রুপের কণ্ঠে।
কথা শেষ করেই মুহূর্তকাল থেমে আবার বলা শুরু করল, ‘থাক এসব কথা। এস এখনকার করণীয় বিষয়ে আলাপ করি।’
‘করণীয় আর কি স্যার। মিশন আমাদের সফল। এখন ব্যারাক এবাউট টার্ন।’
‘না। কাল পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌছা পর্যন্ত যার যে জায়গা সেখানে থাকতে হবে।’
‘তথাস্তু স্যার।’
‘শব্দটি শেখার জন্যে ধন্যবাদ।’
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now