বাংলা গল্প পড়ার অন্যতম ওয়েবসাইট - গল্প পড়ুন এবং গল্প বলুন
বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ

পাত্তানীর সবুজ অরন্যে চ্যাপ্টার- ৩ বাকি অংশ

"সাইমুম সিরিজ" বিভাগে গল্পটি দিয়েছেন গল্পের ঝুরিয়ান রিয়েন সরকার (০ পয়েন্ট)

X পাত্তানীর সবুজ অরন্যে চ্যাপ্টার- ৩ বাকি অংশ ‘কারণ?’ ভ্রু কুঞ্চিত হলো আহমদ মুসার। ‘কারণ এই যে, আমি আইন রক্ষা ও আইন প্রয়োগে বিন্দুমাত্র কনসেশন দেই না। বিশ পঁচিশ ভাগ আইনের ভুল ব্যবহারও হয়। এই ভুল ব্যবহারকে উদ্দেশ্যমূলক, বৈষম্যমূলক বলে অভিহিত করা হয়। মুসলমানরা অনেক ক্ষেত্রে এর শিকার হয়েছে। এ সব থেকেই একটা ধারণা সৃষ্টি হয়ে গেছে। চলমান পরিস্থিতিতে মুসলমানদের ক্ষেত্রে আমি বিশেষ সতর্ক, তারা বিশেষ পর্যবেক্ষণের অধীন। কিন্তু তাদের ব্যাপারে বিদ্বেষ বা বৈষম্যমূলক দৃষ্টি আমার নেই।’ বলল সহকারী গোয়েন্দা প্রধান পুরসাত প্রজাদীপক। ‘ধন্যবাদ স্যার।’ বলল আহমদ মুসা। ‘ওয়েলকাম ইয়্যম্যান।’ বলে পুরসাত প্রজাদীপক তার হাত ঘড়ির দিকে তাকাল। আবার সোফায় গা এলিয়ে দিল। বলল, ‘বিভেন বার্গম্যান, তুমি আমাদের ব্যক্তিগত সাহায্য পাবে। প্রয়োজন হলে, চাইলে যে কোন সময় পুলিশের সাহায্য তোমার জন্য ব্যবস্থা করা হবে। সরকার যাই ভাবুন, তোমার ‘তৃতীয় পক্ষ তত্ব’ আমার কাছে গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়েছে। আজকের জটিল বিশ্ব-রাজনীতিতে অনেক দেশেই কোন স্বার্থের পক্ষে ষড়যন্ত্রকারী ও সাবোটিয়ার হিসাবে তৃতীয় পক্ষ সক্রিয় রয়েছে। আমি আন্তরিকভাবেই চাচ্ছি, তোমার এই তত্ব সত্য হোক এবং থাই মুসলমানদের উপর আরোপিত ইলজাম মিথ্যা প্রমাণ হোক।’ ‘সহযোগিতার এ প্রতিশ্রুতির জন্যে ধন্যবাদ স্যার।’ আহমদ মুসা বলল। ‘তোমার ঐ ‘তৃতীয় পক্ষটি’কে, এ সম্পর্কে তুমি সুনির্দিষ্ট কোন চিন্তা করেছ?’ জিজ্ঞেস করল পুরসাত প্রজাদীপক। প্রশ্নটির সংগে সংগেই জবাব দিল না আহমদ মুসা। তৃতীয় পক্ষ সম্পর্কে তার সুষ্পষ্ট একটি ধারণা আছে। তার উপর সেদিন তৃতীয় পক্ষের সন্ত্রাসীদের হাতে ইসরাইলী অস্ত্র এবং সন্ত্রাসীদের মাথায় ‘হিব্রু’ বর্ণমালা খচিত ক্যাপ দেখে তার ধারণা নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পরিণত হয়েছে। কিন্তু তৃতীয় পক্ষের এই পরিচয়ের কথা আহমদ মুসা ওদের এখনও জানায়নি। আহমদ মুসা আশংকা করছে থাই গোয়েন্দারা এটা জানতে পারলে ইসরাইলী গোয়েন্দারাও কোনওভাবে তা জেনে ফেলতে পারে। আহমদ মুসা চায় না, তৃতীয় পক্ষের অস্তিত্ব ও তাদের পরিচয় মুসলমানদের কাছে ধরা পড়ে গেছে, এটা তারা না জানুক। অপ্রস্তুত অবস্থায় ওদের মুখোশ খুয়ে যাওয়া সবদিক থেকে সুবিধাজনক হবে। এসব চিন্তা করে আহমদ মুসা বলল, ‘আমরা ওদের ব্যাপারে এখনও শূন্য অবস্থানেই আছি। সামনে এগুলেই সবকিছু পরিষ্কার হয়ে যাবে বলে আমি মনে করি।’ ‘অবশ্যই বিভেন বার্গম্যান। তবে তারা যারাই হোক, তারা থাই বৌদ্ধ এবং থাই মুসলিম কারোরই বন্ধু নয়।’ কথা শেষ করেই উঠে দাঁড়াল পুরসাত প্রজাদীপক। বলল, ‘বিভেন বার্গম্যান। তুমি একটু বস। আমি একটু ঘুরে আসি। আর হ্যাঁ, আমরা ঠিক একটাতেই লাঞ্চ করব।’ পুরসাত প্রজাদীপক হাঁটতে শুরু করল ভেতরে যাবার দরজার দিকে। দরজা পর্যন্ত পৌছতেই সিরিত থানারতা বাইরে থেকে দৌড়ে ড্রইংরুমে প্রবেশ করল। উত্তেজনা ও কৌতুহল মিশ্রিত তার মুখ। দৌড়রত অবস্থায়ই বলল, ‘স্যার আপনি তো ড্রাইভার আনেন না। আজ কি ড্রাইভার এনেছেন?’ ‘না আনিনি। এ কথা কেন বলছ?’ ‘একজন প্রফেশনাল ড্রাইভারের ইউনিফরম পরা একজন লোক আপনার গাড়ির পাশ থেকে উঠে যেতে দেখলাম। তার হাঁটার মধ্যে পলাতক চোরের মত আচরণ ছিল। আমার দেখে ভাল মনে হয়নি। আহমদ মুসা লাফ দিয়ে উঠে দাঁড়াল। বলল, ‘ড্রাইভার আসবে কোত্থেকে?’ ওদিকে পুরসাত প্রজাদীপকও ঘুরে দাঁড়িয়েছে। তার মুখেও একই কথা, এ সময় এখানে ড্রাইভার আসবে কোত্থেকে!’ বলে সে ড্রইংরুমের ভেতরে এসে আহমদ মুসার পাশে দাঁড়াল। ‘চলুন দেখে আসি। সন্দেহের শেষ রাখতে নেই। সেল্ফ ড্রাইফের চুক্তিতে আমি গাড়ি ভাড়া নিয়েছি। কোন ড্রাইভার আসার কথা নয়।’ বলে আহমদ মুসা বাইরের দরজার দিকে দ্রুত হাঁটতে শুরু করল। তার পেছনে পুরসাত প্রজাদীপক ও সিরিত থানারতা হাঁটতে শুরু করল। গাড়ির কাছে পৌছে আহমদ মুসা পকেট থেকে পেন্সিল আকৃতির একটা ডেটোনেটরও বের করল। অত্যন্ত পাওয়ারফুল এ ডেটোনেটর। মেটাল, বিস্ফোরক, এমনকি প্লাষ্টিক কভার উইপনস পর্যন্ত সে ডিটেক্ট করতে পারে। গাড়ির কাছাকাছি পৌছতেই ডেটোনেটর বিপ বিপ করা শুরু করল। আর লাল সিগনালও ভীষণ নাঁচতে শুরু করেছে। সবাইকে দাঁড় করিয়ে আহমদ মুসা বলল, ‘গাড়িতে নিশ্চিত বোম পেতে রেখেছে। আপনারা দাঁড়ান, আমি দেখি বোমাটা কোথায় পেতেছে।’ আহমদ মুসা হাঁটতে শুরু করেছে। পুরসাত প্রজাদীপক খপ করে আহমদ মুসার হাত ধরে ফেলল। বলল, ‘তোমার গিয়ে কাজ নেই। বোম ডিফিউজ করা বিস্ফোরক এক্সপার্টদের কাজ। আমি ওদের ডাকছি।’ কথা শেষ করেই পুরসাত প্রজাদীপক পুলিশ হেডকোয়ার্টারে টেলিফোন করল। দ্রুত একটি বোম স্কোয়াড পাঠানোর নির্দেশ দিল। ‘বোম ডিফিউজ করা নয়, আমি যাচ্ছিলাম বোমটা কোথায় থাকতে পারে দেখতে।’ বলল আহমদ মুসা। ‘এ গাড়িতে হাত দেওয়াও ঠিক হবে না। পুলিশের বাড়িতে এসেছ, পুলিশের সাথে আছ। অতএব পুলিশী বিধান তোমার মানতে হবে।’ বলল পুরসাত প্রজাদীপক। পুলিশের বোম স্কোয়াড এল। গাড়ি দাঁড়িয়ে পড়তেই গাড়ির চার দরজা এক সাথে খুলে গেল। চারজন পুলিশ নেমে এল গাড়ি থেকে। স্কোয়াডের ইন্সপেক্টর মংগুত এসে স্যালুট করল পুরসাত প্রজাদীপককে। ‘গুড ডে ইন্সপেক্টর। ঐ গাড়িটায় বোম পাতা আছে। তোমরা দেখ।’ আহমদ মুসার গাড়ির দিকে ইংগিত করে বলল পুরসাত প্রজাদীপক। ইন্সপেক্টর তার বোম স্কোয়াডের তিন জনসহ এগোলো গাড়িটার দিকে। তারা প্রথমে ডিটেক্টর দিয়ে গাড়ির চারদিক থেকে গাড়িটা পরীক্ষা করল। তারপর তারা নিজেদের মধ্যে পরামর্শ করল। ইন্সপেক্টর মংগুত কয়েক ধাপ হেঁটে সহকারী গোয়েন্দা প্রধান পুরসাত প্রজাদীপকের কাছে এল। বলল, ‘স্যার ড্রাইভিং দরজার ভেতরের অংশে বোম ফিট করা আছে। গাড়ি স্ক্যান না করে গাড়ির দরজা খোলা নিরাপদ নয়। স্ক্যান করলে তবেই বুঝা যাবে ডিফিউজের কি ব্যবস্থা নেয়া যাবে।’ ‘ওকে, গো অন।’ বোম স্কোয়াড ব্যাগ থেকে যন্ত্রপাতি বের করে ১ বর্গফুট আয়তন স্ক্রিন বিশিষ্ট একটা স্ক্যানার দাঁড় করিয়ে ফেলল। গাড়ির চারদিক ঘুরে স্ক্যানিং সম্পূর্ণ করল বোম স্কোয়াড। স্ক্যানিং স্ক্রীনে গাড়ির ভেতরের প্রতি ইঞ্চির বিস্তারিত অবস্থা তারা দেখল এবং এসব দৃশ্যের ফটোও তৈরি হলো। বোম স্কোয়াডের ইন্সপেক্টর মংগুত এবং সহযোগী তিন জন এল সহকারী গোয়েন্দা প্রধান পুরসাত প্রজাদীপকের কাছে। বলল, ‘স্যার ড্রাইভিং দরজার ভেতরের পাশে বোম পাতা রয়েছে এবং প্রত্যেক দরজার লকের সাথে ডেটোনেটর লাগানো রয়েছে। যে কোন দরজা খুলতে গেলেই বিস্ফোরণ ঘটবে। সুতরাং গাড়ি বাঁচিয়ে বোম ডিফিউজ করা অসম্ভব। এমনকি গাড়িটি ঠেলে স্থানান্তর করতে গেলে যে ঝাঁকুনি লাগবে ডোর লকে, তাতেও বোমের বিস্ফোরণ ঘটতে পারে।’ ‘ডোর লকে কোন ঝাঁকুনি লাগলেই বিস্ফোরণ! একেবারে আট-ঘাট বাধা পরিকল্পনা। মৃত্যু অবধারিত করেছিল গাড়ির মালিকের। ঈশ্বরকে ধন্যবাদ যে তা হয়নি। কিন্তু গাড়ি তো বাঁচছে না! বলে সহকারী গোয়েন্দা পুরসাত প্রজাদীপক তাকাল আহমদ মুসার দিকে। ‘গাড়ি না বাঁচলে যে ক্ষতি হবে তা পূরণ করা যাবে স্যার। কিন্তু তার আগে ওদের সাথে একটু কথা বলে দেখি স্যার আরও কি করা যায়।’ আহমদ মুসা বলল। ‘ওয়েলকাম বিভেন বার্গম্যান। দেখ কি করা যায়।’ বলল পুরসাত প্রজাদীপক। ‘তোমাদের কাছে গ্লাস-কার্টার আছে?’ ইন্সপেক্টর মংগুতকে লক্ষ্য করে বলল আহমদ মুসা। ‘আছে স্যার।’ বলল ইন্সপেক্টর মংগুত। ‘গ্লাস ষ্টিকার হুক আছে?’ ‘আছে স্যার।’ ‘ওগুলো বের কর।’ ‘ইন্সপেক্টর নির্দেশ দেবার আগেই তার একজন সাথী ব্যাগে সার্চ করা শুরু করে দিয়েছে। দু’টি জিনিস বের করে সে ইন্সপেক্টরের হাতে দিল। আহমদ মুসা হাত বাড়িয়ে গ্লাস কাটার ও গ্লাস ষ্টিকার হুক নিয়ে নিল এবং ইন্সপেক্টরকে লক্ষ্য করে বলল, ‘ড্রাইভিং সিটের জানালার গোটা কাঁচ যদি সরিয়ে নেয়া যায়, তাহলে বোম ডিফিউজের কাজ করতে পারবেন না?’ ইন্সপেক্টর মংগুত এতক্ষণে হাসল। বলল, ‘পারব স্যার খুব সহজেই। কিন্তু গ্লাস কাটা ঝুঁকিপূর্ণ হবে স্যার।’ ‘তা অবশ্যই। কিন্তু আমি সেটা দেখব।’ বলে আহমদ মুসা গাড়ির দিকে যাবার জন্যে পা বাড়াল। ‘আপনি কেন স্যার? কাজটা ওঁদের করতে দিন।’ বলল সিরিত থানারতা। তার কণ্ঠে উদ্বেগ। ‘না বিভেন বার্গম্যান তোমার দরকার নেই। ইন্সপেক্টররাই ওটা করবেন।’ পুরসাত প্রজাদীপক কতকটা নির্দেশের সুরে কথাগুলো বলে উঠল। আহমদ মুসা মুখ ফিরাল পুরসতা প্রজাদীপকের দিকে। বলল, ‘স্যার ওরা কাজটাকে ঝুঁকিপূর্ণ মনে করছে। কিন্তু আমি ঝুঁকিপূর্ণ মনে করছি না। সুতরাং কাজটা আমারই করা উচিত।’ বলে হাঁটা শুরু করল আহমদ মুসা। সিরিত থানারতা উপরের দিকে চেয়ে ভীতকণ্ঠে বলল, ‘গড ব্লেস হিম।’ পুরসাত প্রজাদীপক বলল, ‘সাবধান বিভেন, গড ইজ উইথ ইউ।’ আহমদ মুসা গিয়ে গাড়ির দরজার সামনে দাঁড়াল। আহমদ মুসার পেছনে পেছনে বোম স্কোয়াডের লোকরাও গিয়ে তার পাশে দাঁড়াল। আহমদ মুসা ইন্সপেক্টরকে বলল, ‘আপার স্ক্যানার সেট করুন। আমি বোম ও ডেটোনেটরের অবস্থা দেখতে চাই।’ সংগে সংগেই দরজার সামনে স্ক্যানার তারা সেট করল। আহমদ মুসা দেখল বোমাটা ড্রাইভিং সিট ও দরজার মাঝখানের ফ্লোরে আঠালো টেপ দিয়ে সেটে রাখা আছে। বোমের একটি গ্রন্থি থেকে বেরিয়ে আসা চারটি তার গাড়ির চারটি দরজার ডোর লকের দিকে ঢুকে গেছে। আহমদ মুসা দরজার কন্ডিশন ভালো করে দেখল। গাড়িটা নতুন না হলেও দরজার সেটিং নিখুঁত দেখতে পেল। সুতরাং গাড়ির দরজা যেহেতু নড়বড়ে নয়, তাই জানালার গ্লাস কাটার চাপ দরজার কিছু অংশের উপর একটু বেশি পড়লেও ডোর লকের উপর বিন্দুমাত্রও পড়বে না। নিশ্চিত হয়ে আহমদ মুসা জানালার গ্লাসের ঠিক মধ্যখানে গ্লাস ষ্টিকার বসিয়ে দিল। গ্লাস কাটার হাতে নিল আহমদ মুসা। বোম স্কোয়াডের ইন্সপেক্টর মংগুত বলে উঠল, ‘স্যার খুব সাবধান! খুব সেনসেটিভ ডেটোনেটরও আছে। যা সামান্য কম্পন তাড়িত হয়েও বিস্ফোরণ ঘটায়।’ সহকারী গোয়েন্দা প্রধান পুরসাত প্রজাদীপক ও সিরিত থানারতাও আহমদ মুসার অনেকটা কাছে এসে দাঁড়িয়েছিল। পুরসাত প্রজাদীপক অনুরোধের স্বরে বলল, ‘গাড়ির দাম বেশি নয়, বোম সমেত কার ধ্বংস করা হোক। তুমি এসব করতে যেয়ো না।’ পুরসাত প্রজাদীপক থামতেই সিরিত থানারতাও বলল, ‘প্লিজ স্যার, বোম স্কোয়াড যাকে ঝুঁকিপূর্ণ বলছে, সে কাজ আপনি করবেন না।’ আহমদ মুসা পেছন ফিরে তাকাল। বলল, ‘স্যার আমার লক্ষ্য বোমটা আস্ত পাওয়া। তাতে জানা যাবে এটা কোথা থেকে সাপ্লাই হয়েছে।’ সহকারী গোয়েন্দা প্রধান বিস্ময়ের সাথে তাকাল আহমদ মুসার দিকে। তার মনে একটা আকস্মিক তোলপাড়ঃ যে ভাবনা পুলিশের ভাবার কথা ছিল, সেটা বিভেন বার্গম্যান ভাবছে! কিছু বলতে যাচ্ছিল পুরসাত প্রজাদীপক। কিন্তু আহমদ মুসা তার আগেই হেসে উঠে বলল, ‘গাড়ির দরজার যে কন্ডিশন, তাতে কাঁচ কাটতে যে প্রেশার পড়বে সেটা ডোর-লক পর্যন্ত পৌছাবে না। শুধু ডোর লকের কাছাকাছি বাম প্রান্তটা কাটা একটু ঝুঁকিপূর্ণ। তবু আমি মনে করি কাটারকে যদি কৌশলে ব্যবহার করা যায়, তাহলে ডোর লকে বিন্দুমাত্র চাপও পড়বে না।’ ‘যদি কৌশলে ব্যবহার করা না যায়?’ শুকনো মুখে উদ্বিগ্ন কণ্ঠে জিজ্ঞাসা করল সিরিত থানারতা। ‘সেভাবে ব্যবহার করা যাবে বলেই তো কাটতে যাচ্ছি।’ বলল আহমদ মুসা। আহমদ মুসা ঘুরে গাড়ির দরজার সামনে গিয়ে দাঁড়াল। আহমদ মুসা বিসমিল্লাহ বলে স্থির হাতে কাটার ধরে কাটারের শীর্ষ কৌণিক পয়েন্টকে বাঁ প্রান্তের মাথায় গ্লাসের বুকে সেট করল। আহমদ মুসা ঝুঁকিপূর্ণ প্রান্তকেই প্রথমে কাটার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। গ্লাসের উপর কাটারের শীর্ষ কৌণিক এমনভাবে সেট করেছে যাতে সর্বনিমণ পরিমাণ স্থানের উপর কাটারের চাপ লম্বভাবে পড়ে। কাটার সেট করেই আহমদ মুসা তা এক টানে জানালার বটম পর্যন্ত নিয়ে এল। না কিছুই ঘটল না। আলহামদুলিল্লাহ বলে আহমদ মুসা এরপর টপ ও বটম প্রান্ত কেটে ফেলল। সবশেষে গ্লাস ষ্টিকারের হুক ধরে রেখে ডান প্রান্ত কেটে ফেলল। বাঁ হাত দিয়ে জানালার গ্লাসটি টেনে নিয়ে ছুঁড়ে ফেলে দিল। আহমদ মুসা ঘুরে দাঁড়াবার আগেই পেছন থেকে সিরিত থানারতা বলে উঠল, ‘থ্যাংক গড, ওয়েল কাম স্যার, কনগ্রাচুলেশন।’ ‘ওয়েলকাম সিরিত।’ বলে আহমদ মুসা বোম স্কোয়াডকে উদ্দেশ্য করে বলল, ‘ইন্সপেক্টর আপনারা কাজ শুরু করতে পারেন।’ ‘থ্যাংক ইউ স্যার।’ বলে ওরা কাজে লেগে গেল। সহকারী গোয়েন্দা প্রধান পুরসাত প্রজাদীপক তৎক্ষণাত কিছু বলেনি। চোখ ভরা বিস্ময় নিয়ে সে তাকিয়েছিল আহমদ মুসার দি। বোম স্কোয়াড কাজ শুরু করলে পুরসাত প্রজাদীপক আলতোভাবে আহমদ মুসার পিঠে হাত রেখে বলল, ‘তুমি নিশ্চয় বোমটাও ডিফিউজ করতে পারতে?’ ‘স্যার, এটুকু জানি বিভিন্ন ধরনের বোম কিভাবে ডিফিউজ করতে হয়।’ বলল আহমদ মুসা। ‘কি জান না বলতো? তোমার ব্যাপারে বিস্ময় বাড়ছেই বিভেন বার্গম্যান।’ ‘জানার বিষয় যে দুনিয়াতে কত, তা আমরা কেউ জানি না। জানা গেলে সবচেয়ে জ্ঞানী যে ব্যক্তি সে হয়ত বলতো আমি যা জানি, তা কিছু না জানার কাছাকাছি।’ বলল আহমদ মুসা। ‘কঠিন কথাও তুমি সুন্দর করে বলতে পার বিভেন বার্গম্যান।’ পুরসাত প্রজাদীপক বলল। কিছু বলতে যাচ্ছিল সিরিত থানারতা। কিন্তু তার আগেই গাড়ির ওখান থেকে ইন্সপেক্টর মংগুত বলে উঠল, ‘থ্যাংক গড, বোমকে ডিফিউজ করা গেছে।’ বলে সে ছুটে এল আহমদ মুসার কাছে। বলল, ‘স্যার আপনার কাছ থেকে আমরা একটা পুরনো শিক্ষা নতুন করে পেলাম যে, সংকট সমাধানের একটা না একটা পথ অবশ্যই থাকে, তাকে খুঁজে বের করতে হয়। আপনাকে ধন্যবাদ স্যার।’ ‘বোম ডিফিউজ করার জন্যে তোমাদের ধন্যবাদ ইন্সপেক্টর।’ ‘সেই সাথে ধন্যবাদ ঈশ্বরকে যে, তিনি বিভেন বার্গম্যানের জীবন বাঁচিয়েছেন।’ কথা শেষ করেই ইন্সপেক্টর মংগুতকে লক্ষ্য করে বলল, ‘তুমি পুলিশ ষ্টেশনে খবর দাও। তারা আসুক কেসটা রেকর্ড করুক। ড্রাইভারের ছদ্মবেশে একজন এসে গাড়িতে বোম পেতে যায়। আমাদের গেটের দারোয়ানের ষ্টেটমেন্ট নিতে হবে। গেটের টিভি ক্যামেরার রেকর্ড থেকে ড্রাইভার লোকটার ফটো নিতে হবে। সে মনে হয় আশে-পাশে কোথাও ওঁৎ পেতে আছে গাড়িতে বিস্ফোরণ ঘটেছে তা নিজ চোখে দেখে যাওয়ার জন্যে। তদন্তের কাজ এখনই শুরু করতে হবে।’ একটু থামল পুরসাত প্রজাদীপক। বলল, ‘ইন্সপেক্টর, আমরা ভেতরে আছি।’ ঘুরে দাঁড়াল পুরসাত প্রজাদীপক আহমদ মুসার দিকে। বলল, ‘চলো বিভেন বার্গম্যান, চলো মা সিরিত।’ হাঁটতে লাগল পুরসাত প্রজাদীপক। তার পিছনে আহমদ মুসা ও সিরিত থানারতাও হাঁটতে শুরু করল। আহমদ মুসা চলা শুরু করেই সিরিত থানারতাকে বলল, ‘আমি কৃতজ্ঞ মিস সিরিত। তুমি আমার জীবন বাঁচাতে সতর্ক করেছ।’ সিরিত থানারতা বিস্মিত চোখে তাকাল আহমদ মুসার দিকে। বলল, ‘কিভাবে স্যার?’ ‘গাড়ি থেকে নকল ড্রাইভারকে পালাতে তুমিই দেখেছ এবং তাকে তুমি সন্দেহ করেছ। এই সন্দেহ থেকেই এই বোম উদ্ধার হলো।’ বলল আহমদ মুসা। ‘কিন্তু আমার এখনও বিস্ময় লাগছে স্যার তাকে আমার সন্দেহ হলো কেন? কেনই বা মনে হলো যে, ছুটে গিয়ে কথাটা আমার বলা দরকার। মনে হচ্ছে ভেতর থেকে কেউ একজন এসব করিয়েছে। স্যার এটা ঈশ্বরেরই কাজ।’ সিরিত থানারতা বলল। ‘ঠিক বলেছ সিরিত। এমনটা ঘটে। তবে ভাগ্যিস তুমি ওখানে ছিলে। কিন্তু বুঝতে পারছি না, তুমি তো ভেতরে চলে গিয়েছিলে, ওখানে গেলে কখন?’ বলল আহমদ মুসা। সিরিত থানারতা তাকাল আহমদ মুসার দিকে। নিজের আঙুলে চাপ দিয়ে সামনে তার পিতার দিকে ইংগিত করে একটু দাঁড়াতে বলল। আহমদ মুসা দাঁড়াল। সিরিত থানারতা তার কণ্ঠ নামিয়ে বলল, ‘স্যার আমি আড়ি পেতে আপনাদের কথা শুনছিলাম। জাবের জহীর উদ্দিনের ব্যাপারে সরকার কি ভাবছে তা জানার জন্যে অপেক্ষা করতে পারছিলাম না। তবে দুঃখ পেয়েছি, সরকারের সিদ্ধান্তের শুনে। কিন্তু অন্য একটা লাভ হয়েছে। আমি জানতে পেরেছি যে, আপনি মুসলমান। আমি খুশি হয়েছি।’ ‘কেন?’ জিজ্ঞাসা আহমদ মুসার। ‘কারণ, জাবের বাংগসা জহীর উদ্দিনও মুসলমান। আমি এখন নিশ্চিত যে, সরকারের কথা যাই হোক জাবের জহীর উদ্দিনরা আপনার মত মিরাকল লোকের সাহায্য পাবে।’ সিরিত থানারতার শেষের কথাগুলো ভারী হয়ে উঠেছিল। সেই সাথে তার চোখ দু’টিও সজল হয়ে উঠেছিল। ‘ভেব না সিরিত, সব ঠিক হয়ে যাবে ইনশাআল্লাহ।’ সান্তনার কণ্ঠ আহমদ মুসার। ‘স্যার, আজ আপনার কথা শোনার পর ভাবনা অনেক কমেছে। কিছুক্ষণ আগে আপনার ও আববার আলোচনায় আরও আশান্বিত হয়েছি। তবু স্যার, কষ্ট মন থেকে যাচ্ছে না। স্যরি।’ কাঁপা কণ্ঠ সিরিত থানারতার। ‘ধৈর্য্য ধরতেই হবে সিরিত। আজ আল্লাহ যেমন তোমার মধ্যে কথা বলে উঠেছেন, যেভাবে তিনি আজ আমাদের সাহায্য করেছেন, সেভাবেই তিনি আমাদের সাহায্য করবেন।’ আহমদ মুসা বলল। সিরিত থানারতা রুমাল দিয়ে চোখ ভাল করে মুছে নিয়ে বলল, ‘ধন্যবাদ স্যার। চলুন আমরা পিছিয়ে পড়েছি।’ ড্রইং রুমে ঢোকার মুখেই ভুজ বাহাদুরকে পাওয়া গেল। তাকে বলল পুরসাত প্রজাদীপক, ‘টেবিলে খাবার লাগিয়েছ?’ ‘স্যার খাবার লাগিয়েও সরিয়ে নেয়া হয়েছিল, আবার লাগানো হচ্ছে। মাত্র পাঁচ মিনিট লাগবে। স্যার।’ ‘আচ্ছা। তুমি ওদিকে দেখ।’ ভুজ বাহাদুরকে এ কথাগুলো বলে সোফায় বসে পড়ল পুরসাত প্রজাদীপক। বলল সে আহমদ মুসাকে, ‘এসো আমরা একটু বসি।’ ‘স্যার, এই ফাঁকে আমি নামাযটা পড়ে নিতে চাই।’ বলল আহমদ মুসা। ‘ও, তোমাদের মধ্যাহ্নের একটা নামায তো আছে। তা নামাযের জায়গাটা কোথায় হলে চলবে?’ পুরসাত প্রজাদীপক বলল। ‘যে কোন জায়গায়। একটু খালি মেঝে হলেই ভাল হয়।’ বলল আহমদ মুসা। ‘মা সিরিত, ওকে ওপাশের রুমটায় নিয়ে যাও। রুমটা খালি আছে, মেঝেও পরিষ্কার।’ ‘ধন্যবাদ স্যার।’ বলে আহমদ মুসা উঠে দাঁড়াল। সিরিত থানারতাও উঠেছে। বলল, ‘স্যার আপনাদের নামায দিনে পাঁচবার হয়, ঠিক না?’ আহমদ মুসা সিরিত থানারতার পেছনে হাঁটতে হাঁটতে বলল, ‘হ্যাঁ।’ ‘স্যার আপনাদের ধর্মে নিয়মিত অনেক ধর্মীয় আচার পালন করতে হয়, কিন্তু তা সহজ। কিন্তু আমাদের ধর্মে কোন ধর্মীয় কাজ নেই, দায়িত্বের ভার নেই, কর্তব্যের তাড়া নেই।’ সিরিত থানারতা বলল। ‘সেটাই তো ভাল।’ আহমদ মুসা বলল। ‘ভাল কোথায় স্যার। মাঝে মাঝেই মনে হয়, ধর্মের কাজ যখন নেই, তখন ধর্মটা কেন! বিশ্বাসকে যৌক্তিক ও জীবন্ত রাখার জন্যে যদি কোন কাজ বা দায়িত্ব-কর্তব্য না থাকে, তাহলে বিশ্বাসও এক সময় হারিয়ে যায়। তাই হচ্ছে স্যার। আমরা আর নিজেকে বৌদ্ধ বলে গৌরব বোধ করি না।’ ‘নো-কমেন্ট।’ ‘কমেন্ট আপনি করবেন কেন, আমিই তো করলাম।’ বলে একটা দরজার সামনে থমকে দাঁড়াল। বলল, ‘স্যার খালি রুম এটাই।’ ‘আমার তো খালি রুম দরকার নেই, দরকার কয়েক ফুট মেঝের। ধন্যবাদ সিরিত।’ আহমদ মুসা ঘরে ঢুকে গেল। সিরিত ফিরে এল ড্রইং রুমে। বসল পিতার পাশে। বলল, ‘আববা, তোমার বোম স্কোয়াড কিন্তু গাড়ি সমেত বিস্ফোরণ ঘটানো ছাড়া বোম ডিফিউজের উপায় বের করতে পারেনি। মি. বিভেন সেটা পেরেছে।’ ‘সেটাই ভাবছি সিরিত। যতই বিভেনকে দেখছি, বিস্ময় বাড়ছে। জানালার কাঁচ সরিযে বোম ডিফিউজ করার বুদ্ধিই শুধু সে বের করেনি, যে জানালার গ্লাস কাটার ঝুঁকি নিতে সাহস করেনি আমাদের বোম স্কোয়াড, সেই কাজ সে অদ্ভুত দক্ষতার সাথে করেছে।’ বলল পুরসাত প্রজাদীপক। ‘কিন্তু আববা আমার কাছে এর চেয়েও বড় বিস্ময়ের হলো, একজন আমেরিকান মুসলমান পাত্তানীর একটি চিঠি পেয়ে তাদের সাহায্য করতে ছুটে এল একা!’ সিরিত থানারতা বলল। ‘বিস্ময়ের তো বটেই, কিন্তু মা, সে যে এ ধরনের দায়িত্ব নেয়ার উপযুক্ত তা সে ইতিমধ্যেই প্রমাণ করেছে।’ এ সময় গেটের সিকিউরিটি গার্ডম্যান ড্রইংরুমের দরজায় এসে ভেতরে আসার অনুমতি চাইল। সে অনুমতি নিয়ে ভেতরে এসে একটি চিঠি পুরসাত প্রজাদীপকের হাতে দিয়ে বলল, ‘স্যার এটা মেহমান বিভেন বার্গম্যানের জন্যে চিঠি।’ পুরসাত প্রজাদীপক চিঠিটি হাতে নিয়ে বলল, ‘ঠিক আছে ওঁকে দিয়ে দেব।’ সিকিউরিটি চলে গেল। চিঠিটি একটি চিরকুট। চিরকুটটি হাতে পেয়েই ভ্রু’কুঞ্চিত হয়ে উঠেছে সহকারী গোয়েন্দা প্রধান পুরসাত প্রজাদীপকের। অপরাধের বিভিন্ন ধারার সাথে পরিচিত পুরসাত প্রজাদীপক ভালো করেই জানে, এমন অবস্থায় এ ধরনের চিরকুট কোন ভাল খবর নিয়ে আসে অথবা বহন করে খারাপ কোন সংবাদ। চিরকুটটির ভাঁজ খুলে চোখের সামনে তুলে ধরল। এই সময় নামায শেষে ড্রইং রুমে প্রবেশ করল আহমদ মুসা। পুরসাত প্রজাদীপক তাকে স্বাগত জানিয়ে বলল, ‘এসো বিভেন বার্গম্যান। তোমার কাছে একটা চিরকুট এসেছে। তুমিই পড়।’ ‘আহমদ মুসা পুরসাত প্রজাদীপকের পাশের সোফায় বসতে বসতে বলল, ‘আমার নামে চিরকুট?’ আহমদ মুসার কণ্ঠে বিস্ময়। পুরসাত প্রজাদীপক আহমদ মুসার হাতে চিরকুট তুলে দিয়ে বলল, ‘গেট থেকে আমাদের সিকুরিটির লোক দিয়ে গেছে। তাকে এইমাত্র কে একজন লোক এটি দিয়ে গেছে।’ আহমদ মুসা চিরকুটটি হাতে নিয়ে দ্রুত তার ওপর চোখ বুলাল। আহমদ মুসার ঠোঁটে একটা হাসি ফুটে উঠল। বলল, ‘স্যার যারা বোম পেতেছিল আমাকে মারার জন্যে, তারাই এই চিরকুটটি পাঠিয়েছে।’ পড়ছি শুনুনঃ ‘‘বিভেন বার্গম্যান, বোমের হাত থেকে বেঁচে গেছ, আনন্দ করে নাও। জেনে রাখ, আমাদের ‘ব্ল্যাক ঈগল’’ যার উপর নজর ফেলে, সে আর বাঁচে না। তোমাকে বোমায় মারার সিদ্ধান্ত আমরা পাল্টেছি। তুমি আমাদের ১১ জনকে হত্যা করেছ। তোমার দেহকে আমরা এগার টুকরো করব। তবে মার্কিন নাগরিক হিসেবে তোমাকে একটা সুযোগ দিচ্ছি। তুমি কাল সকালের আগে যদি থাইল্যান্ড ত্যাগ করো, তাহলে তোমার মৃত্যুদন্ডাদেশ রহিত হয়ে যাবে।’ চিঠি পড়া শেষ করে আহমদ মুসা বলল, ‘চিঠিতে কারও দস্তখত নেই। দস্তখতের স্থানে একটা ‘ব্ল্যাক ঈগল’ আঁকা। ঈগলটি সোজা উর্ধমুখী হয়ে ক্রিসেন্টের পেটে বসে আছে। ক্রিসেন্টের দু’টি বাহু ঈগলটির দু’পাশ দিয়ে উঠে দু’বাহুর দু’প্রান্ত যেখানে কাছাকাছি পৌছেছে, সেখানে একটি তারকা। তারকার ছয়টি বাহু। আর......।’ ‘থাক বিভেন বার্গম্যান। চিঠির মনোগ্রাম নয়, চিঠির বক্তব্যের দিকে এসো।’ আহমদ মুসার কথার মাঝখানে বলে উঠল পুরসাত প্রজাদীপক। ‘সাংঘাতিক-সর্বনাশা চিঠি এটা। কিছু করতে হবে।’ বলল সিরিত থানারতা। তার মুখ ভয়ে-উদ্বেগে ফ্যকাশে হয়ে গেছে। ‘ঠিক তাই মা। মারাত্মক চিঠি। সাংঘাতিক দুঃসাহস ওদের। পুলিশ কর্মকর্তার বাড়িতেও ওরা এভাবে চিঠি পাঠাতে পারে! কিন্তু বিভেন বার্গম্যান তুমি এ নিয়ে ভাবছ বলে তো মনে হচ্ছে না?’ বলল পুরসাত প্রজাদীপক। ‘স্যার আমার তো চিন্তার কিছু নেই। ওরা কিভাবে কোথায় আমাকে আক্রমণ করবে, এটা ওদের চিন্তার বিষয়। ওদের পরিকল্পনা আমার জানা থাকলে তা নিয়ে চিন্তা করতাম। কিন্তু সেটা তো জানি না।’ আহমদ মুসার কণ্ঠ গম্ভীর। ‘কিন্তু সাবধান তো হতে হবে। এজন্যে চিন্তা করা দরকার।’ বলল পুরসাত প্রজাদীপক। ‘স্যার ওরা সর্বোচ্চ পর্যায়ের পুলিশ কর্মকর্তার বাসায় এসে গাড়িতে বোম পেতেছে, চিরকুট পাঠিয়ে থ্রেট করে গেছে। সাবধান হওয়ার আর জায়গা কোথায় থাকল স্যার?’ আহমদ মুসা বলল। যদি তাই তোমার বিশ্বাস হয়, তাহলে কাল সকালের আগেই থাইল্যান্ড থেকে চলে যাও বিভেন বার্গম্যান। তুমি খুব ভাল ছেলে, আমাদের অশেষ উপকার করেছ। তোমার কোন ক্ষতি আমরা সহ্য করতে পারবো না। ওদের শত্রুতা আমাদের সাথে। আমরা ওদের দেখে নেব।’ পুরসাত প্রজাদীপক থামতেই সিরিত থানারতা বলে উঠল, ‘উনি যাবেন কেন আর যেতে বলছই বা কেন? তাঁকে নিরাপত্তা দেয়া তো তোমাদের কাজ।’ ‘আমি পালাব না মিস সিরিত। আমাকে এগার টুকরো করতে হলে তো তাদের আমার কাছে আসতে হবে, গায়ে হাত দিতে হবে। আমারও ওদের কাছে যাওয়া প্রয়োজন, জানা প্রয়োজন। না হলে জাবের জহীর উদ্দিনকে আমি উদ্ধার করব কি করে?’ বলল আহমদ মুসা নিশ্চিন্ত, নিরুদ্বিগ্ন কণ্ঠে। সিরিত থানারতার বিস্ময়-বিস্ফোরিত চোখ আহমদ মুসার উপর নিবদ্ধ। তার ভাবনা, বিভেন বার্গম্যানের মনটা কি পাথরের তৈরি? সেখানে কোন ভয় প্রবেশ করে না? এই সাংঘাতিক অবস্থায় এভাবে এমন কথা সে বলতে পারে কি করে! পুরসাত প্রজাদীপকও তাকিয়েছে আহমদ মুসার দিকে। তার চোখে মুগ্ধ দৃষ্টি। বলল, ‘ধন্যবাদ, বিভেন বার্গম্যান, তুমি ঠিক তোমার মতই কথা বলেছ। তুমি নিশ্চিত থাক, আমার সবরকম সহযোগিতা তোমার সাথে আছে। কিন্তু বিভেন বার্গম্যান, অবশেষে চিঠির ‘ব্ল্যাক ঈগল’ এবং জাবের জহীর উদ্দিন যদি এক হয়ে যায়, তাহলে কেমন হবে?’ আহমদ মুসা হাসল। বলল, ‘এটা হওয়া অসম্ভব স্যার। ‘ব্ল্যাক ঈগল’ এর আজকের চিঠিও প্রমাণ করছে, ‘ব্ল্যাক ঈগল’ এবং জাবের জহীর উদ্দিনরা আলাদা।’ ‘কিভাবে?’ উৎসুক কণ্ঠে বলল পুরসাত প্রজাদীপক। ‘চিঠির মনোগ্রামে ব্ল্যাক ঈগলের চারপাশে ক্রিসেন্টের বেষ্টন থাকলেও মনোগ্রামের শীর্ষে ক্রিসেন্টের দু’বাহুর মুখোমুখি হওয়ার জায়গায় দেখুন ছয় কোণের একটি তারকা। ছয় কোণের এই তারকা ইহুদীদের প্রতীক। এই তারকা মনোগ্রামটির শীর্ষে রয়েছে এবং এই তারকাই মনোগ্রামের মৌল পরিচয়। ‘ব্ল্যাক ঈগল’ মুসলিম সংগঠন হলে মনোগ্রামে এই চিহ্ন অবশ্যই ব্যবহৃত হতো না।’ আহমদ মুসা বলল। ঠিকই বলেছ বিভেন বার্গম্যান। ইহুদীদের তারকার ছয়টি কোণ মুসলমানদেরর তারকায় পাঁচটি কোণ। মুসলিম সংগঠনের মনোগ্রামে ছয় কোণের তারকা ব্যবহৃত হতে পারে না। কিন্তু বিভেন বার্গম্যান এতে তো দুঃশ্চিন্তা আরও বেড়ে গেল। সিআইএ এবং পশ্চিমা গোয়েন্দা সংস্থা সমূহের সাহায্য এখনও তারা পায়। সে কারণে এখনও তারা অদম্য। তারা করতে পারে না এমন কিছু নেই। আজকের ঘটনা এবং এই চিঠিও তার একটা প্রমাণ। সুতরাং আমি মনে করছি বিভেন বার্গম্যান। এটাই ভাল যে, তুমি কাল সকালের মধ্যে চলে যাও। যুদ্ধে কৌশলগত পশ্চাৎ অপসরণ দোষের নয়।’ বলল পুরসাত প্রজাদীপক গম্ভীর কণ্ঠে। ‘ধন্যবাদ স্যার, আপনি আমার নিরাপত্তার কথা আন্তরিকভাবে ভাবছেন। কিন্তু স্যার আগেই বলেছি, আমি আমার মিশন শেষ না করে চলে যাবো না। আমি আপনাদের ঝুঁকির মধ্যে ফেলবো না স্যার। আমি আমার মত করে চলতে বাধা পাব না, এটুকু নিশ্চয়তা শুধু আপনার কাছ থেকে চাই।’ আহমদ মুসা বলল। ‘তুমি আমাকে ভুল বুঝো না বিভেন বার্গম্যান। তোমাকে সাহায্য করার নীতিগত সিদ্ধান্ত সরকার নিয়েছে। আমি ওদের আলটিমেটাম এড়াবার জন্যেই তোমাকে ঐ পরামর্শ দিচ্ছিলাম। এরপরও তুমি এগোতে চাইলে আমাদের সাহায্য তুমি পাবে। দেশের সব পুলিশ অফিস, পুলিশ ষ্টেশনে অবস্থানের সুযোগ তুমি পাবে, তুমি চাইলে পুলিশ শক্তিকেও তোমার পাশে পাবে।’ বলল পুরসাত প্রজাদীপক। ‘আপনাদের সাহায্য আমার দরকার হবে, কিন্তু পুলিশের আশ্রয় কিংবা পুলিশের যানবাহন আমি ব্যবহার করবো না।’ আহমদ মুসা বলল। ‘কেন?’ জিজ্ঞাসা সিরিত থানারতার। ‘পুলিশ ও পুলিশের অবস্থান সকলের চোখের সামনে থাকে। সুতরাং আমাকে খুঁজে পাওয়া ও আমার উপর চোখ রাখা সহজ হবে। এতে করে তারা তাদেরকে আমার চোখের আড়ালে রাখতে পারবে।’ আহমদ মুসা বলল। ‘তোমার এ কথা ঠিক বিভেন বার্গম্যান। কিন্তু তুমি হোটেল-রেষ্টহাউজে থাকতে গেলেও তো তাদের নজরে পড়ে যাবে।’ বলল পুরসাত প্রজাদীপক। ‘তবু এটা নিরাপদ, এ ঠিকানা তাদের অনেক খুঁজে বের করতে হবে, কিন্তু পুলিশ ষ্টেশন তাদের খুঁজতে হবে না।’ পুরসাত প্রজাদীপকের মুখে একটা সহজ হাসি ফুটে উঠল। চোখে তার প্রশংসার দৃষ্টি। কিছু বলার জন্যে মুখ খুলতে যাচ্ছিল। তার কথায় বাধা দিয়ে সিরিত থানারতা বলল, ‘আর কোন কথা নয় এখন। খেতে খেতেও বাকি কথা বলতে পারবেন। উঠুন খেতে চলুন।’ ‘ঠিক বলে মা’ বলে পুরসাত প্রজাদীপক উঠে দাঁড়াল। আহমদ মুসাও। গাড়ি করে হোটেলে ফিরছিল আহমদ মুসা। জানালার কাঁচ কাটা সেই গাড়িটা নিয়ে। আহমদ মুসা তখন গাড়িটা নিয়ে ভাবছিল। গাড়িটা হোটেলের একটি পর্যটন সংস্থার। বিরাট ক্ষতি হয়েছে গাড়ির। বেশ অর্থ দন্ড দিতে হবে তাকে। অবশ্য পুরসাত প্রজাদীপক ইতিমধ্যেই টেলিফোনে সংস্থাটিকে জানিয়ে দিয়েছে দুর্ঘটনার কথা। পুলিশ বিভাগই যে গাড়ির ক্ষতিপূরণ দেবে জানিয়ে দিয়েছে সেটাও। কিন্তু আহমদ মুসা পুলিশের এ অফার গ্রহণ করতে রাজি হয়নি। হাউজিং পেরিয়ে বড় রাস্তায় এসে পড়ল আহমদ মুসার গাড়ি। এ রাস্তার ওধারেই আহমদ মুসার হোটেল। কিন্তু অনেকটা পথ ঘুরে সেখানে পৌছতে হবে। রাস্তায় তখন গাড়ির প্রচন্ড ভিড়। দাঁড়িয়ে পড়ল আহমদ মুসার গাড়ি। রাস্তায় গাড়ির স্রোতে প্রবেশ করতে হলে উপযুক্ত স্পেসের জন্য অপেক্ষা করতে হবে। আহমদ মুসার দৃষ্টি ছিল সামনে। একটা ভাঁজ করা কাগজ এসে পড়ল আহমদ মুসার কোলের উপর। টের পেল আহমদ মুসা। ভাঁজ করা কাগজটির দিকে একবার তাকিয়েই আহমদ মুসা খোলা জানালা দিয়ে পেছন ফিরে তাকাল। এই মাত্র হ্যাট মাথায় পরা একজন লোক তার গাড়ি অতিক্রম করে গেছে। নিশ্চয় সেই কাগজটা ফেলে গেছে। পেছন দিকে তাকিয়ে সেই হ্যাটওয়ালাকে দেখতে পেল আহমদ মুসা। হ্যাঁ, দেখেই বুঝল একজন মেয়ে সে। কালো ফুল প্যান্ট, লাল হাফ হাতার শর্ট সার্ট, মাথায় বাদামী কালারের হ্যাট। মেয়েটি খুব নিশ্চিন্তে হাঁটছে। বুঝল মেয়েটি শত্রু নয়। বিস্মিত আহমদ মুসা তার চোখ ফিরিয়ে নিল। কোল থেকে কাগজটি তুলে নিল। ভাঁজ খুলে কাগজটি মেলে ধরল চোখের সামনে। কাগজটি একটা চিঠি। পরিষ্কার ইংরেজিতে লেখা। পড়ল আহমদ মুসাঃ ‘আপনার একাধিক প্যান্ট ও সার্টের সাথে সুচাগ্র সাইজের ট্রান্সমিটার লাগানো আছে। আপনার লাগেজ ব্যাগেও তা লাগানো থাকতে পারে। আপনি যেখানেই থাকেন, যেখানেই যান, শত্রুরা ট্রান্সমিটারের সিগন্যাল অনুসরণ করে আপনাকে লোকেট করতে পারবে। প্রতি পদে তাদের পক্ষে আপনাকে অনুসরণ করা সম্ভব।’ আপনার একজন শুভাকাঙক্ষী স্বাভাবিক বিস্ময়ের এক অক্টোপাস এসে আহমদ মুসাকে ঘিরে ধরল। শত্রুপক্ষের নজরে সে আছে, কিন্তু এতটাই ঘেরাও সে তাদের দ্বারা! কি করে এটা সম্ভব হয়েছে! আহমদ মুসা হোটেলের রেন্ট-এ-কার কর্নারে নেমে গাড়িটা সংশিস্নষ্ট কোম্পানিকে জমা দিয়ে ক্ষতিপূরণ পরিশোধ করে প্রবেশ করল পাশের একটি পেশাকের দোকানে। দোকানটি শুধু পোশাকের নয়, হোটেলের একজন অতিথি তার নিত্য প্রয়োজনীয় ব্যবহারের যা চাইতে পারে তার প্রায় সবই আছে। আহমদ মুসা দুই সেট পোশাকসহ আন্ডারওয়্যার থেকে শুরু করে গেঞ্জি, মোজা, জুতা সবই কিনল। দোকান থেকে বেরিয়ে উঠে এল হোটেলের লবীতে। গিয়ে দাঁড়াল রিসেপশনের পাশে বুকিং কাউন্টারে। বলল কাউন্টারের লোকটিকে, ‘আমার হিসাবটা দিন। এখনই পাওনা মিটিয়ে দেব। আমি চারটার মধ্যেই চলে যাব।’ ‘ওকে স্যার’ বলে লোকটি কম্পিউটারের হিসাব কষে হিসাবের কাগজ আহমদ মুসার হাতে দিল। আহমদ মুসা টাকা পরিশোধ করে লিফটের দিকে চলল। পেছন থেকে একজন বেয়ারা পাশে এসে বলল, ‘স্যার আপনি যাচ্ছেন, আমি আসব?’ আহমদ মুসা তার দিকে একবার তাকিয়ে বলল, ‘এসো।’ দশতলার নিজের কক্ষে চলে এল আহমদ মুসা। কয়েক মিনিটের মধ্যে বয়ও এসে পৌছল ঘরে। ঢুকেই বলল, ‘স্যার আপনার তো লাগেজ রেডি হয়নি। এইমাত্র বাইরে থেকে আসলেন। আমি কি সাহায্য করব?’ তাকাল আহমদ মুসা বেল বয়ের দিকে। বলল, ‘ঠিক আছে। একটু কষ্ট কর।’ পরে থাকা গায়ের সবকটা পোশাক খুলে নতুন কেনা সেটের একটি পরে নিয়েছিল আহমদ মুসা। নতুন ব্যাগ গুছিয়ে নিচ্ছিল আহমদ মুসা। পুরনো কিছুই এ ব্যাগে তুলল না। চিরুনী, টুথ ব্রাশের মত জিনিসও নয়। এসব কিছুই আহমদ মুসা নতুন কিনে নিয়ে এসেছে। বেল বয়টি পুরনো ব্যাগে কাপড়-চোপড়সহ সবকিছু গুছিয়ে তুলেছিল। বলল আহমদ মুসাকে লক্ষ্য করে, ‘এত তাড়াতাড়ি টিকিট পেয়ে গেলেন স্যার, কোন এয়ার লাইন্সের টিকিট?’ বিদ্যুৎ স্পৃষ্টের মত উঠে দাঁড়াল আহমদ মুসা। তীব্র দৃষ্টিতে তাকাল বেল বয়ের দিকে। প্রথমেই যে বিষয়টি তার কাছে বড় হয়ে উঠল সেটা হলো ছেলেটি তার সম্পর্কে অনেক কিছুই জানে। সে আজ যাচ্ছে, এটা সে জানে এবং তাড়াহুড়া করে তার চলে যাওয়া প্রয়োজন, এ বিষয়টাও তার জানা। এর এই অর্থ যে, ব্ল্যাক ঈগলের সাথে এর কোন রকম সম্পর্ক আছেই। তার পোশাক পরিচ্ছদ ও লাগেজে এমন ব্যাপক ‘ট্রান্সমিটার’ স্থাপন করা হোটেলের একাধিক লোকের সাথে ‘ব্লাক ঈগলের’-এর যোগসাজস ছাড়া সম্ভব হয়নি। এই বেল বয় কি তাদের মধ্যে একজন? আহমদ মুসার হাত প্যান্টের পকেটে চলে গেছে। বেরিয়ে এল রিভলবার নিয়ে। রিভলবার সোজা বেল বয়টির দিকে তাক করল। এগিয়ে গেল তার দিকে। বেল বয়টি ভূত দেখার মত উঠে দাঁড়িয়েছে। তার দু’চোখ ভয়ে বিস্ফোরিত। ‘তোমার নাম কি?’ জিজ্ঞাসা করল আহমদ মুসা। কঠোর কণ্ঠ তার। ‘এ্যারন।’ শুকনো কণ্ঠে আটকা গলায় বলল বেল বয়। নাম শুনে আহমদ মুসার চোখে আনন্দের এক নতুন ঝিলিক দেখা গেল। ‘এই হোটেলে ‘ব্ল্যাক ঈগলে’র কয়জন আছ তোমরা?’ আহমদ মুসা এ্যারনের কপালে রিভলবার ঠেকিয়ে বলল, ‘বলবে, না মরবে?’ মুখ তুলল বেল বয় এ্যারন। বলল সে, ‘বলছি স্যার। আমরা দু’জন আছি। একজন লন্ড্রীতে, আমি বেল বয়।’ মরার মত ফ্যাকাশে হয়ে গেছে তার মুখ। ‘আমার পোশাক-লাগেজে ‘ট্রান্সমিটার’ বসিয়েছে কে?’ ‘আমরা দু’জনেই। লন্ড্রীতে এবং রুমে।’ ‘কেন?’ ‘আমরা করতে বাধ্য হয়েছিলাম।’ ‘কে বাধ্য করেছিল?’ ‘ব্ল্যাক ঈগল’-এর মি. আইজ্যাক।’ ‘কে এই আইজ্যাক?’ ‘চিনতাম না। ব্যাংকক সেন্ট্রাল সিনাগগে তার সাথে আমাদের পরিচয় হয়।’ ‘তিনি কি থাইল্যান্ডের মানুষ?’ ‘না। তিনি ইংরেজি ও হিব্রু ভাষায় কথা বলেন।’ ‘বললে তোমাদের বাধ্য করা হয়েছিল। কেন বাধ্য হয়েছিলে?’ বলল আহমদ মুসা। ‘বলেছিল যে তাদের পরিচয় আমরা জেনে গেছি। এখন হয় তাদের সাথে থাকতে হবে, নয়তো মরতে হবে আমাদের রাজি হওয়া ছাড়া উপায় ছিল না।’ বলল বেল বয় এ্যারন। ‘তিনি বা তারা কোথায় থাকেন? কিভাবে তোমাদের যোগাযোগ হতো তাদের সাথে?’ ‘তারাই যোগাযোগ করতেন। কোথায় থাকেন জানি না। সিনাগগে কোন কোন শনিবারে তাদের দেখা যায়।’ ‘তারা কেমন লোক বলে তোমাদের মনে হয়?’ ‘ভালো মনে হয়নি স্যার।’ ‘কিন্তু তারা তোমার জাতি ভাই।’ ‘এখানে জাতির প্রশ্ন নয় স্যার। প্রশ্ন ন্যায়-অন্যায়ের। তাদের কথা না শুনলে তারা আমাদের হত্যা করতে চেয়েছিল?’ ‘ঠিক আছে, লাগেজ বাধা শেষ কর। আমার তাড়া আছে।’ রিভলবার পকেটে রেখে বলল আহমদ মুসা। বেল বয় এ্যারনের চোখে-মুখে আশার আলো ফুটে উঠল। বলল, ‘স্যার আমাকে মাফ করে দিয়েছেন?’ ‘কি করব, তোমার দোষ খুঁজে পেলাম না।’ ‘কিন্তু স্যার, তারা আমার সামনে একজনকে গুলী করে মেরেছিল। তার অপরাধ ছিল সে ঐ দিন আপনার গাড়িতে বোমা ফিট করতে পারেনি আপনি আগাম এসে পড়ায়।’ ‘তুমি এ খবরও জান?’ ‘হোটেলের পাশের পার্কে এ ঘটনা ঘটেছে। ডিউটি টাইমের বাইরে সময় পেলে আমরা ওখানে গিয়ে আড্ডা দিয়ে থাকি। ইদানিং কখনো কখনো তিনিও ওখানে যেতেন।’ ‘ঠিক আছে, শেষ কর কাজ।’ বলে আহমদ মুসা নতুন ব্যাগটা গোছানো শেষ করে তালা লাগিয়ে ব্যাগটি পাশে নিয়ে সোফায় বসল। বেল বয় এ্যারন তার ব্যাগ গোছানোর কাজ শেষ করে উঠে দাঁড়িয়ে বলল, ‘স্যার একটা কথা বলব?’ ‘বল।’ ‘স্যার আপনি তাদের মত নন। তারা আপনার জানের দুশমন কেন?’ ‘তারা আমার সামনে থেকে একজনকে কিডন্যাপ করেছে। আমি তাকে মুক্ত করার চেষ্টা করতে গিয়ে ঘটনাক্রমে তাদের কয়েকজন লোক আমার হাতে মারা গেছে। এরপরও লোকটিকে মুক্ত করা যায়নি।’ ‘স্যার ওদের গল্পে আমি একজনকে ধরে রাখার কথা শুনেছি।’ ‘কিভাবে কি বলেছিল তারা?’ ‘মোবাইলে কারও সাথে কথা বলার সময় বলেছিল, বন্দীকে আমরা ব্ল্যাক ফরেষ্টের ঘাটি থেকে পাত্তানী জংগলের কাতান টেপাংগোর ঘাটিতে নিয়ে গেছি। কাজের অনেক সুবিধা হবে।’ ব্ল্যাক ফরেষ্টের নাম শুনে মনে মনে চমকে উঠল আহমদ মুসা। ব্যাংককের পশ্চিমে সীমান্ত ঘেষে শতাধিক মাইলের বিশাল এই ফরেষ্ট। ব্ল্যাঙ্ক টংকু পর্বতমালার অংশ এটা। যে তথ্য পাওয়া গেছে তাতে জাবের জহীর উদ্দিনকে ঐ ফরেষ্টের কোন ঘাঁটিতে রাখা হয়েছিল। এই ঘাঁটির সন্ধানেই বের হতে যাচ্ছিল আহমদ মুসা। ভীষণ খুশি হলো আহমদ মুসা এ্যারনের কাছে এই তথ্য পেয়ে। আহমদ মুসা বলল, ‘ধন্যবাদ এ্যারন, তুমি একটা ভালো তথ্য দিয়েছো। চলো আমরা বের হই। নতুন এ ব্যাগটা আমি হাতে রাখছি। ওটা তুমি নাও।’ আহমদ মুসা হোটেলের গাড়ি বারান্দায় এসে দেখল, প্রথম দিনের ক্যাব ড্রাইভার ভূমিবল দাঁড়িয়ে আছে। খুশি হলো আহমদ মুসা। বলল, ‘কেমন আছ ভূমিবল? সেই যে তোমার বাড়ি থেকে এসেছি, আর দেখা নেই। এ গাড়িটাই বুঝি নতুন কিনলে।’ আহত আহমদ মুসা পুলিশ হাসপাতাল থেকে চিকিৎসা নিয়ে সুস্থ হবার পর প্রথম কাজ হিসেবে গিয়েছিল ভূমিবলের বাড়িতে। ধ্বংস হওয়া গাড়ির যে ব্যাংক ঋণ বাকি ছিল, সেটা পরিশোধ করে আরেকটা নতুন গাড়ি কেনার টাকা সে গিফট করেছিল। ভূমিবলের মা ও বোন সাকোনার সাথেও তার পরিচয় হয়েছিল। ‘জি স্যার’ বলে ভূমিবল কৃতজ্ঞতা সূচক কিছু বলতে যাচ্ছিল। আহমদ মুসা তাকে বাধা দিয়ে বলল, ‘আমার তাড়া আছে। তুমি কি এয়ারপোর্টে যাবে?’ ‘অবশ্যই স্যার।’ আহমদ মুসা পাশে দাঁড়ানো ‘এ্যারন’কে বলল, ‘তোমার হাতের ব্যাগটা ভূমিবলের পাশের সিটে দিয়ে দাও।’ বলে আহমদ মুসা এ্যারনের হাতে একশ ডলারের নোট গুজে দিয়ে হাতের ব্যাগটা নিয়ে ভূমিবলের পেছনের সিটে উঠল। ষ্টার্ট নিল গাড়ি। হোটেল থেকে বেরিয়ে চলতে শুরু করেছে গাড়ি। ভূমিবল বলল, ‘স্যার ম্যাডাম সিরিত ও সাকোনা অপেক্ষা করছে। ওদিক দিয়ে যাব কি?’ ‘কোথায় ওরা? কি করে জানল আমি এয়ারপোর্টে যাচ্ছি?’ ‘সাকোনা ম্যাডাম সিরিতের কাছ থেকে শুনে আমাকে টেলিফোন করেছে।’ ‘বুঝেছি, গোয়েন্দারা পুরসাত প্রজাদীপককে জানিয়েছে। ঠিক ওদের বলে দাও ওরা সিরিতের বাড়িতে অপেক্ষা করুক। আমি এয়ারপোর্ট থেকে ওখানে ফিরব।’ ‘তার মানে আপনি বিমানে কোথাও যাচ্ছেন না। তাহলে এয়ারপোর্টে কেন?’ ‘কিছু লোককে বুঝাবার জন্যে যে, আমি বিমানে দেশ ছেড়েছি। আমি এয়ারপোর্ট থেকে ফিরে আসব। আমাকে ডিপারচার পার্কিংএ নামিয়ে তুমি এ্যারাইভাল পার্কিং-এ চলে যাবে। আমি ডিপারচার লাউঞ্জ থেকে এ্যারাইভাল লাউঞ্জে যাবো। এ্যারাইভাল লাউঞ্জে যাবার সময় তুমি তোমার পাশের ব্যাগটা আবর্জনার কন্টেইনারে ফেলে দিয়ে যাবে।’ ব্যগাটার দিকে একবার তাকিয়ে সে তার দুচোখ কপালে তুলে বলল, ‘বুঝলাম না স্যার।’ ‘ওটা তুমি পরে জানবে। এখন তুমি বল, পাত্তানী অঞ্চলে তুমি কখনও গেছ কিনা।’ ‘জি গিয়েছি স্যার। এ বছরও একবার গিয়েছি।’ ‘এখন কি ব্যাংককের বাইরে যাবার জন্যে প্রস্তুত আছ তুমি? যাবে কি আমার সাথে পাত্তানী অঞ্চলে?’ ‘পাত্তানী কেন আপনার সাথে কোথাও যেতে আমার আপত্তি নেই স্যার।’ ‘ধন্যবাদ ভূমিবল। এবার স্পীড বাড়াও। তাড়াতাড়ি এয়ারপোর্ট থেকে ফিরে পাত্তানী যাত্রা করব।’ গাড়ির স্পিড বেড়ে গেল। এয়ারপোর্ট রোড ধরে ছুটে চলল গাড়ি। ‘মাফ করবেন স্যার, ব্যাগটার ব্যাপারে কৌতুহল আমার যাচ্ছে না।’ বলল ভূমিবল দ্বিধাজড়িত কণ্ঠে। হাসল আহমদ মুসা। বলল, ‘গায়ের নতুন পোশাক ও নতুন ব্যাগের জিনিসপত্র ছাড়া যে সব কাপড়-চোপড় আমি পড়েছি, সব আছে ঐ ব্যাগে। ওগুলো অপয়া হয়ে গেছে ভূমিবল।’ ‘বুঝলাম না স্যার। পোশাকের কি দোষ হলো?’ ‘শুধু পোশাক নয়, ঐসব কাপড়-চোপড়সহ ব্যাগ এবং হয়ত ব্যবহার্য সব কিছুতেই শত্রু পক্ষ সিগনালিং ট্রান্সমিটার সেট করেছে। এসব নিয়ে আমি যেখানেই যাব ট্রান্সমিটারের সিগন্যাল অনুসরণ করে ওরা আমাকে খুঁজে বের করতে পারবে। সেই জন্যে পুরনো সবকিছুই ফেলে দেয়া দরকার।’ আহমদ মুসার কথা শেষ হতেই ভূমিবল দ্রুতকণ্ঠে বলল, ‘এই কথা আমি সাকোনার কাছেও শুনেছি স্যার।’ এই মাত্র সে আমাকে বলল, ‘স্যার বিরাট ষড়যন্ত্রের মধ্যে পড়েছেন। তাঁর কাপড়-চোপড়, জিনিসপত্রে শয়তানরা অটোমেটিক সিগন্যাল-চিপস সেট করেছে। যখন ইচ্ছা তার কাছে পৌছতে তাদের কোন অসুবিধা নেই। এই বিষয়টা নাকি সে আজ আপনাকে জানিয়েছে।’ ‘কি বললে, সাকোনা আমাকে জানিয়েছে? আজ!’ বিস্ময় আহমদ মুসার চোখে-মুখে। ‘জি, স্যার।’ আহমদ মুসা মুহূর্তকাল চিন্তা করল। বলল, ‘আচ্ছা আমার গাড়ির জানালা দিয়ে একটা চিরকুট ফেলে দিয়ে উল্টো দিকে চলে গিয়েছিল একজন মেয়ে। পেছনে তাকিয়ে দেখেছিলাম, কালোপ্যান্ট, হাফ হাতা লাল সার্ট এবং বাদামী কালারের হ্যাট। তাহলে সে সাকোনা ছিল।’ ‘ঠিক স্যার। সে এখনও ঐ পোশাকেই আছে।’ ‘ভূমিবল, সে আমার অসীম উপকার করেছে। কিন্তু সে জানল কি করে? আর ঐ সময় সে যাচ্ছিল কোত্থেকে?’ ‘সে এই হোটেলে চাকরি করে স্যার। ভোরে ডিউটিতে এসেছিল।’ বলল ভূমিবল। ‘বুঝেছি। দাও ওর মোবাইল নাম্বারটা। ওকে একটা ধন্যবাদ দেই।’ ভূমিবল তার মোবাইলে ‘সাকোনা’কে কল করে মোবাইলটা আহমদ মুসাকে দিয়ে বলল, ‘স্যার কথা বলুন।’ আহমদ মুসা মোবাইলটি হাতে তুলে নিল। কথা বলল সাকোনার সাথে।


এডিট ডিলিট প্রিন্ট করুন  অভিযোগ করুন     

গল্পটি পড়েছেন ২১০৯০ জন


এ জাতীয় গল্প

→ পাত্তানীর সবুজ অরন্যে চ্যাপ্টার- ৪ বাকি অংশ
→ পাত্তানীর সবুজ অরন্যে চ্যাপ্টার- ২ বাকি অংশ
→ পাত্তানীর সবুজ অরন্যে চ্যাপ্টার- ১ বাকি অংশ
→ পাত্তানীর সবুজ অরন্যে চ্যাপ্টার- ৫ এর বাকি অংশ

গল্পটির রেটিং দিনঃ-

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now