বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
পাত্তানীর সবুজ অরন্যে
চ্যাপ্টার- ৫
বাকি অংশ
ঘরে ঢুকেই আহমদ মুসা দাদীকে লক্ষ্য করে বলল, ‘দাদী লাশগুলোকে কোথায় লূকাতে পারি? অহেতুক পুলিশের ঝামেলায় পড়া ঠিক হবে না।’
‘আমাদের বাড়ির পেছনে একটা অন্ধ কূপ আছে। এ কূপই এর উপযুক্ত জায়গা। কূপের মুখে পাথর আছে। ওটা সরালেই কুপ ওপেন হয়ে যাবে।’
‘ধন্যবাদ দাদীমা। বলেই আহমদ মুসা পরিচারিকা নূরীকে অনুরোধ করল, ‘চলো, তুমি কষ্ট করে কূপটা আমাকে দেখিয়ে দেবে।’
একটা লাশ কাঁধে তুলতে যেয়ে হঠাৎ থেমে গেল আহমদ মুসা। নূরীর দিকে তাকিয়ে বলল, ‘স্যরি নূরী, একটু অপেক্ষা কর। আমি এদের সার্চ করি।’
ঘরের ৪টি লাশের পকেটে ৪টি মানিব্যাগ, বাড়তি গুলী ব্যারেল এবং সবশেষের শিকার ছয়ফুট লম্বা লোকের কাছ থেকে পাওয়া গেল একটা মোবাইলও। তিনটি মানিব্যাগই টাকায় ভর্তি। একটি মানিব্যাগ থেকেই শুধু বেরুল একটি ইনভেলাপ। ইনভেলাপে পোষ্টাল ছাপ নেই। ইনভেলাপটি এখনও পোষ্ট করা হয়নি বুঝল আহমদ মুসা।
টান দিয়ে ছিঁড়ে ফেলল ইনভেলাপের কভার। পেল ইনভেলাপের ভেতর একখন্ড কাগজ। কাগজে দেড় লাইন হিব্রু ভাষায় লেখা। তা হলো: ‘জুদাহ, নিচের রোডম্যাপ তোমাকে ডেষ্টিনেশনে নিয়ে আসবে।’ এই দেড় লাইন লেখার নিচে একটা রোডম্যাপ আঁকা। রোডম্যাপের স্থানিক ইনডিকেশনগুলোও হিব্রুতে লেখা। রোড শুরু হয়েছে পাত্তানী সিটি থেকে। কয়েকটি স্থান টাচ করে ডেষ্টিনেশন লাল ডট ‘কাতান টেপাংগো’ গিয়ে শেষ হয়েছে। মাঝের ডট চিহ্নিত স্থানগুলোর নাম তার পরিচিত নয়। মানচিত্রে এসব নাম নেই। ‘কাতান টেপাংগো’ নামও মানচিত্রে নেই। কিন্তু নামটি শুনেছে ব্যাংককের হোটেল বেয়ারার কাছে। এখানে জাবের জহীর উদ্দিনকে এনে রাখার কথা। রোডম্যাপের কাগজটির এক কোণে দিক নির্দেশের ইনডিকশেন রয়েছে।
আনন্দে মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল আহমদ মুসার। সে মুখ তুলল উপরে। স্বগতই তার কণ্ঠ থেকে বেরিয়ে এল, ‘আলহামদুলিল্লাহ। আল্লাহুম্মা ইন্নাকা আলা কুল্লি শাইয়্যিন কাদির।’
আহমদ মুসা কাগজটি হাতে নিয়ে উঠে দাঁড়াতে দাঁড়াতে বলল, ‘মিস যয়নব যোবায়দা, আপনি কি ‘কাতান টেপাংগো’ চেনেন?’
সংগে সংগে জবাব দিল না যয়নব যোবায়দা। সম্ভবত মনে করার চেষ্টা করছিল।
উত্তর দিল দাদী। বলল, ‘হ্যাঁ চিনি ভাই। কিন্তু হঠাৎ এ নামের কথা বলছ কেন?’
‘পরে বলব দাদীমা’ বলে নূরীকে নির্দেশ দিল টাকার মানিব্যাগগুলো ওদের পকেটে রেখে দাও।
আহমদ মুসা ইনভেলাপ এবং মোবাইলটা পকেটে ফেলে বাইরের ৪ জনকে সার্চ করার জন্যে বেরিয়ে গেল।
ওদের পকেটে টাকার মানিব্যাগ ছাড়া কিছুই পেল না।
আহমদ মুসা ঘরের ভেতরে ফিরে এল। বলল দাদীকে, ‘দাদীমা আপনারা ঐ ঘরে আহতের কাছে যান। নূরী আমাকে কূপটি দেখিয়ে দিয়ে ওখানে যাবে।’
আহমদ মুসা একটি লাশ তুলে নিল কাঁধে। চলতে লাগল। নূরী আগে আগে চলছে।
‘কি কাগজ পেয়ে সে আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করল দাদীমা? হঠাৎ ‘কাতান টেপাংগো’র কথা জিজ্ঞেস করল কেন? ‘কাতান টেপাংগো’কি, কোথায় দাদীমা?’ বলল যয়নব যোবায়দা।
‘তোদের সম্মানিত পূর্ব পুরুষ সুলতান আবদুল কাদের কামালুদ্দিন রাজ্যহারা হয়ে ওখানে গিয়ে বিদ্রোহী ঘাঁটি তৈরি করেছিলেন। পরে অস্ত্র ত্যাগ করার পর ওখান থেকে সরে আসেন। এখন ওটা সমাজ বিরোধীদের ঘাঁটি।’ দাদী বলল।
‘এমন স্থানের সাথে ওঁর সম্পর্ক কি?’
‘সেই জানে।’
বলে একটু থেমেই আবার বলা শুরু করল, ‘দেখছিস যোবায়দা, এমনভাবে সে কাজ করছে যেন সেই বাড়ির মালিক আর আমরা মেহমান। মনে হচ্ছে কতদিনের পরিচিত সে। তার সবটাই অদ্ভুত।’
‘এখনও তার পরিচয় জানা হলো না দাদীমা?’
‘ধীরে সুস্থে কথা বলার সময় তো এখনো হয়নি।’
‘চলো দাদীমা। উনি এসে যেন না দেখেন যে আমরা ওঘরে যাইনি। তাছাড়া ও একা পড়ে আছে। আমাদের কারো বরং আগেই যাওয়া উচিত ছিল।’
বলে যয়নব যোবায়দা দাদীকে হাত ধরে তুলে নিয়ে তাকে সাথে করে হাঁটতে শুরু করল।
আহমদ মুসা লাশগুলো সব সরিয়ে ফেলল। ইতিমধ্যে নূরী রক্তের সব চিহ্ন মুছে ফেলল।
‘ধন্যবাদ নূরী, অনেক পরিশ্রম করেছ।’ আহমদ মুসা বলল নূরীকে।
‘কিন্তু স্যার, ব্যাপারটা উল্টো হলো, ধন্যবাদ তো আমরাই আপনাকে দেব।’ বলল নূরী।
‘ঠিক আছে, তোমরা ধন্যবাদ দিও। এখন চলো ওঁদের কাছে।’
আহমদ মুসাদের যেতে হলো না। দাদী ও যয়নব যোবায়দারাই এসে গেল।
‘এসো ভাই বস। তুমি ক্লান্ত। এখন পর্যন্ত বসারও সুযোগ পাওনি।’
দাদী আহমদ মুসাকে নিয়ে এসে বসাল তিন তলার বিশাল ড্রইং রুমটিতে।
বসেই আহমদ মুসা ঘড়ির দিকে তাকাল। বলল, ‘দাদীমা, এখন রাত ৪টা। একটা জরুরী কথা আপনাদের বলতে চাই। বলতে পারি কি না?’
‘আমাদের লজ্জা দিও না, বল।’ বলল দাদী।
‘এ বাড়িতে আপনাদের থাকা চলবে না। এমন কোন বাড়ি আপনাদের থাকার মত আছে কি না যার অবস্থান গোপন রাখা যায়?’ আহমদ মুসা বলল। তার কণ্ঠ গম্ভীর।
‘এ প্রশ্ন পরে। আগে আপনার পরিচয় বলুন প্লিজ। আমাদের জন্যে এতটা করছেন, এতটা ভাবছেন কেন?’ বলল যয়নব যোবায়দা। তার কণ্ঠ গম্ভীর।
‘আপনি আমাকে ডেকেছেন।’ আহমদ মুসা বলল।
‘আমি আপনাকে ডেকেছি!’ বিস্ময় বিজড়িত কণ্ঠ যয়নব যোবায়দার।
‘হ্যাঁ, বলে আহমদ মুসা জ্যাকেটের ভেতরের পকেট থেকে একটা চিঠি বের করে যয়নব যোবায়দার দিকে তুলে ধরল। ছুটে এসে নূরী আহমদ মুসার হাত থেকে চিঠিটা নিয়ে যয়নব যোবায়দার হাতে দিল।
যয়নব যোবায়দা চিঠির দিকে তাকাতেই তার চেহারা পাল্টে গেল। বিস্ময়, আবেগ, উত্তেজনায় সে মুষড়ে পড়ল, কণ্ঠ চিরেই যেন তার একটা আর্তস্বর বেরিয়ে এল, ‘এটা আপনি কোথায় পেয়েছেন?’
‘আন্দামানে।’
চোখ দু’টি ছানাবড়া হয়ে উঠল যয়নব যোবায়দার। মুহূর্ত কয়েক পাগলের মত তাকিয়ে থাকল আহমদ মুসার দিকে। মনে পড়ল ম্যাডাম আয়েশার কথা যে, আহমদ মুসা এখন আন্দামানে।
বলল যয়নব যোবায়দা কম্পিত ও কান্নাজড়িত কণ্ঠে, ‘আপনি কি আহমদ মুসা?’
‘হ্যাঁ, আমি আহমদ মুসা।’
আহমদ মুসার কণ্ঠ শেষ হবার আগেই যয়নব যোবায়দা সোফা থেকে কার্পেটের উপর সিজদায় ঢলে পড়ল। সিজদায় পড়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে লাগল সে। আবেগ রুদ্ধ কান্নায় তার গোটা দেহ কাঁপছে।
কারো মুখে কোন কথা নেই।
বিমূঢ় আহমদ মুসা।
কান্না থামছে না যয়নব যোবায়দার।
দাদী ধীরে ধীরে উঠে যয়নব যোবায়দার গায়ে হাত বুলিয়ে বলল, ‘উঠ বোন। কান্না নয়, এখন তো হাসা দরকার।’
যয়নব যোবায়দা উঠে জড়িয়ে ধরল দাদীকে। বলল, ‘দাদী আল্লাহর এত দয়া করেছেন আমাদর! এত ভালবাসেন তিনি তাঁর অসহায় বান্দাদের। আবেদনটা একেবারে পৌছে দিয়েছেন তাঁর খাস সৈনিকের হাতে।’
দাদী যয়নব যোবায়দার মুখটা তুলে ধরে নিজের ওড়না দিয়ে তার চোখ-মুখ মুছে দিয়ে বলল, ‘তাঁকে ডাকার মত ডাকলে তিনি এভাবেই সাড়া দেন বোন। তুই তাঁকে সেভাবেই ডাকতে পেরেছিস।’
দাদী যয়নব যোবায়দাকে তুলে এনে নিজের পাশে বসাল। তাকাল আহমদ মুসার দিকে। বলল, ‘সবার স্বপ্ন, সবার আশা, সবার মাথার মণি আহমদ মুসাকে কিভাবে সম্বোধন করব?’
আহমদ মুসা ম্লান হাসল। বলল, ‘দাদী তার নাতিকে যেভাবে সম্বোধন করে, সেভাবেই সম্বোধন করবেন। দাদীমা আমি কারও স্বপ্ন, আশা বা মাথার মণি কিছুই নই, আমি সবার পাশের লোক। আমাকে এভাবে না দেখলে আমি দুঃখ পাব।’
বলে আহমদ মুসা মুহূর্তকাল থেমেই আবার বলল, ‘দাদীমা আমি আপনাদের থাকার ব্যাপারে একটা কথা বলেছিলাম, সেটা ঠিক হওয়া দরকার।’
যয়নব যোবায়দা আহমদ মুসার দিকে তাকাল। বলল, ‘স্যার, আপনি যা বলবেন, আমরা সেটাই করব। সুলতান গড়ে থাকার আমাদের বিকল্প জায়গা নেই। তবে পাত্তানী সিটি এবং ব্যাংককে সে ধরনের বাড়ি আছে।’
‘মিস যোবায়দা’ পাত্তানী সিটির বাড়ি কি আপনাদের জন্যে নিরাপদ?’ বলল আহমদ মুসা।
‘ঐ বাড়িটা আমাদের সেটা কেউ জানে না। এমন কি কাগজপত্রও আমাদের নামে নেই। ইদানিং মাঝে মাঝে আমি ওখানে গিয়ে থাকছি।’ যয়নব যোবায়দা বলল।
‘ওখানে আপনারা কে কে থাকবেন?’
‘আমি দাদী এবং কয়েকজন পরিচারিকা।’ বলল যয়নব যোবায়দা।
‘এলাকাটা কেমন?’
‘শতভাগ মুসলিম এলাকা। পাত্তানী সিটির পুরনো অঞ্চল। আমাদের বাসাটা যেখানে, সেখানে রিকশা জাতীয় গাড়ি ছাড়া অন্য কোন গাড়ি যাবার সুযোগ নেই। আর সেখানে একটা ডাক দিলে মুহূর্তেই শত শত লোক হাজির হতে পারে।’
খুশি হলো আহমদ মুসা। বলল, ‘ঠিক আছে। ভালো জায়গা। আজ ভোরেই আপনাদের এ বাড়ি ছাড়তে হবে।’
‘ঠিক আছে স্যার।’ বলল যয়নব যোবায়দা।
কথা শেষ করেই আবার বলে উঠল, ‘বর্তমান পরিস্থিতি সম্পর্কে কি আমি কিছু জিজ্ঞাসা করতে পারি?’
‘অবশ্যই।’ আহমদ মুসা বলল।
‘ষড়যন্ত্রকারী দলের নাম আপনি ‘ব্ল্যাক ঈগল’ বলেছেন। এদের সম্পর্কে, ভাইয়া সম্পর্কে নিশ্চয় আরও কিছু জানেন।’ বলল যয়নব যোবায়দা।
‘ব্ল্যাক ঈগল’ সংগঠণ আসলে আন্তর্জাতিক একটি জায়োনিষ্ট সংগঠনের তৈরি। সন্ত্রাসী কর্মকান্ড ঘটাচ্ছে মুসলিম পরিচয়ে। পুলিশের কাষ্টডি থেকে জাবের জহীর উদ্দিনকে এরাই ছিনিয়ে নিয়ে গেছে সন্ত্রাসের নেতা হিসেবে দেখাবার জন্যে। কিন্তু এই বিষয়টা থাই সরকারকে বিশ্বাস করানো যাচ্ছে না প্রমাণের অভাবে। সেদিন পাত্তানী শহরের উপকণ্ঠে সেনা ফাঁড়ির যে সন্ত্রাসী ঘটনা ঘটল তা জাবের জহীর উদ্দিনের নেতৃত্বে হয়েছে বলে দেখানো হচ্ছে। তার রক্তমাখা সার্টকে এর প্রমাণ হিসেবে তুলে ধরা হচ্ছে। সার্ট ও রক্ত জাবেরের তা পরীক্ষায় প্রমাণিত হয়েছে। আসলে এটা একটা ষড়যন্ত্র। আমি থাই গোয়েন্দা কর্মকর্তাকে অনুরোধ করেছি জামায় যে রক্তের দাগ আর তার শরীর থেকে বের হওয়ার সময় এবং সন্ত্রাসী ঘটনার সময় এক কিনা তা পরীক্ষা করে দেখার জন্যে। সময় এক না হলে সে নির্দোষ প্রমাণিত হবে। আর সময় এক হলে প্রমাণ হবে সন্ত্রাসী ঘটনার সময় জাবের জহীর উদ্দিন ঘটনাস্থলে হাজির ছিল। হাজির থাকলেও সে নির্দোষ হতে পারে, কারণ জোর করে এনে হাজির রাখা কঠিন কিছু নয়। কিন্তু এটা প্রমাণ করা কঠিন।’
থামল আহমদ মুসা।
কিন্তু তৎক্ষণাৎ কেউ কথা বলল না।
দাদী ও যয়নব দু’জনেরই মুখ বেদনায় মুষড়ে গেছে।
একটু পর যয়নব যোবায়দাই নিরবতা ভাঙল। বলল, ‘এখন কি করণীয়?’
‘ওদের একজনকে জীবন্ত ধরতে পারলে তার কাছ থেকে তথ্য নিয়ে এগোনো যেত। কিন্তু এ পর্যন্ত ওদের দু’ডজনের মত লোক মারা গেলেও কাউকে জীবন্ত ধরা যায়নি। তবে আমি ব্যাংকক আর পাত্তানীতে এসেছি জাবের জহীর উদ্দিনকে সন্ধান করার জন্যেই। আমি ধারণা করছি, ‘কাতান টেপাংগো’র মত কোন জায়গাতেই তাকে বন্দী করে রাখা হয়েছে।’
‘একটি মানিব্যাগ থেকে একটা কাগজ পেয়ে আপনি খুশি হলেন, তাতে কি আছে?’ বলল যয়নব যোবায়দা।
‘কাতান টেপাংগো যাবার একটা রোডম্যাপ আঁকা আছে।’ আহমদ মুসা বলল।
খুশি হয়ে উঠল যয়নব যোবায়দার মুখ। বলল, ‘আমরা এখন পুলিশের আশ্রয় নিতে পারি না?’
‘সমস্যা আছে। পুলিশের আয়োজন দেখে ওরা পালিয়ে যেতে পারে। আবার পুলিশেরই কেউ আগাম ওদের জানিয়ে দিতে পারে যে, পুলিশ ওদের অবস্থান সবই টের পেয়ে গেছে। সুতরাং পুলিশকে দিয়ে সমস্যার সমাধান হবে না।’ আহমদ মুসা বলল।
‘তাহলে?’ বলল যয়নব যোবায়দা। তার মুখে অন্ধকার নেমে এসেছে।
‘সব ঠিক হয়ে যাবে। হঠাৎ কাতান টেপাংগো যাবার রোড ম্যাপও পাওয়া গেল। এভাবেই আল্লাহ সাহায্য করবেন।’
আহমদ মুসা থামল। থেমেই আবার বলল, ‘ভোর হচ্ছে। আপনারা তৈরি হোন। পরে কথা হবে।’
‘আপনি কোথায় থাকবেন?’ জিজ্ঞাসা যয়নব যোবায়দার।
‘যেখানেই থাকি, আপনাদের ওপর চোখ থাকবে আমার।
মোবাইল বেজে উঠল আহমদ মুসার।
মোবাইল হাতে তুলল সে। মোবাইলের স্ক্রীনের দিকে তাকিয়ে প্রসন্ন হলো আহমদ মুসার মুখ।
মোবাইল অন করেই আহমদ মুসা বলল, ‘গুড মর্নিং স্যার। কেমন আছেন?’
‘ভাল আছি। তুমি ভোরে নামায পড়তে ওঠো, তাই টেলিফোন করলাম এ সময়। তোমার জন্যে সুখবর আছে।’ ওপার থেকে বলল পুরসাত প্রজাদীপক।
‘সুখবর? কি সেটা?’
‘তোমার কথাই ঠিক। পরীক্ষায় প্রমাণিত হয়েছে জামার রক্তের ও সন্ত্রাসী ঘটনার সময়ের মধ্যে ৩ ঘণ্টার পার্থক্য রয়েছে।’
‘আলহামদুলিল্লাহ। আপনাকে ধন্যবাদ স্যার। আপনি পরীক্ষার উদ্যোগ না নিলে এটা সম্ভব ছিল না।’
‘আরও সুখবর আছে। সিক্যুরিটি কমিটি তাদের আগের সিদ্ধান্ত রিভিউ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তোমার কথাকেই এখন তারা গুরুত্ব দিচ্ছে। আই হোপ, তুমি জিতে যাচ্ছ বিভেন বার্গম্যান।’
‘এর পেছনেও আপনারই অবদান স্যার। সিরিত থানারতা কি এটা শুনেছে?’
‘শুনবে না মানে? সে আমার পেছনে লেগেই আছে। সে তোমার একজন যোগ্য লবিষ্ট।’
‘সে খুব ভাল মেয়ে। সে আমার লবিষ্ট নয় স্যার, সে সত্যের পক্ষে লবীং করছে।’
‘অল রাইট, ইয়ংম্যান, আমি রাখি তাহলে।’
‘স্যার আজ রাতে একটা ঘটনা ঘটে গেছে। ‘ব্ল্যাক ঈগল’রা যয়নব যোবায়দাকে কিডন্যাপ করতে এসেছিল।’
‘ও গড! নিশ্চয় ওরা ব্যর্থ হয়েছে?’
‘জি স্যার।’
‘ধন্যবাদ বিভেন বার্গম্যান। কিন্তু ওরা হঠাৎ যোবায়দাকে কিডন্যাপের সিদ্ধান্ত নিল কেন?’
‘স্যার আমার মনে হয় জাবের জহীর উদ্দিনকে তাদের পক্ষে কাজ করাতে ব্ল্যাক ঈগল ব্যর্থ হয়েছে। তাই যোবায়দাকে ধরে নিয়ে তাকে গিনিপিগ বানিয়ে জাবের জহীর উদ্দিনকে রাজি হতে বাধ্য করতে চেয়েছিল। স্যার ওরা মরিয়া হয়ে উঠেছে। ওরা এখন জাবের জহীর উদ্দিনের দাদীকেও কিডন্যাপ করার সিদ্ধান্ত নিতে পারে।’
‘তুমি ওদের নিরাপদ করার ব্যবস্থা করেছ নিশ্চয়। আমি কি পুলিশ পাহারার ব্যবস্থা করব?’
‘না স্যার। পুলিশ পাহারা বসালেই জানাজানি হয়ে যাবে তারা কোথায়।’
‘ঠিক বলেছ বিভেন বার্গম্যান। আর কিছু?’
‘না স্যার। ধন্যবাদ।’
দু’জনেই টেলিফোন রেখে দিল।
মোবাইলের স্পিকার অনক করে আহমদ মুসা কথা বলেছে। যয়নব যোবায়দা, দাদী সবাই শুনতে পেয়েছে দু’জনের কথোপকথন।
আহমদ মুসা টেলিফোন রাখতেই যয়নব যোবায়দা বলল, ‘সেদিনের পাত্তানী শহরে সংঘটিত সন্ত্রাসী ঘটনার দায় থেকে ভাইয়া মুক্ত হয়েছেন, এটা পরিস্থিতি পাল্টে যাবার টার্নিং পয়েন্ট হবে ইনশাআল্লাহ। এই কৃতিত্ব আপনার স্যার। আপনার হাত ধরে আল্লাহ এটা করিয়েছেন।’ শেষের কথাগুলো কান্নায় রুদ্ধ হয়ে গেল।
পরিচারিকা নূরী দাঁড়িয়ে ছিল যয়নব যোবায়দার সোফার পেছনে। যয়নব যোবায়দা থামতেই সে বলে উঠল, ‘শাহজাদী আপা ও দাদী বেগমের আরও বিপদ হতে পারে স্যার?’ উদ্বেগ ভরা কণ্ঠ তার।
আহমদ মুসা হাসল। বলল, ‘আমি সম্ভাবনার কথা বলেছি। খারাপ, ভাল সব সম্ভাবনাই সামনে রাখতে হয়।’
‘ধন্যবাদ স্যার। উনি কোন এক সিদ্ধান্ত রিভিউ করার কথা বললেন, সেটা কি স্যার।’ চোখ মুছে বলল যয়নব যোবায়দা।
‘থাইল্যান্ডে মুসলমানদের ওপর সন্ত্রাসী ব্লেম দেবার জন্য আবার তৃতীয় পক্ষ কাজ করছে, তারাই সব সন্ত্রাসী ঘটনার জন্যে দায়ী এবং তারাই জাবের জহীর উদ্দিনকে কিডন্যাপ করেছে- যা আগে থাই ন্যাশনাল সিক্যুরিটি কমিটি মেনে নেয়নি। তারা এখন সিদ্ধান্ত রিভিউ করতে রাজি হয়েছে রক্তমাখা জামার ষড়যন্ত্র প্রকাশ হবার পর।’ আহমদ মুসা বলল।
‘আলহামদুলিল্লাহ।’ বলল যয়নব যোবায়দা।
‘কার সাথে কথা বললে তুমি ভাই।’ জিজ্ঞেস করল দাদী।
‘ইনি থাই গোয়েন্দা বিভাগের সহকারী প্রধান পুরসাত প্রজাদীপক। তার আরও একটা পরিচয় আছে, তিনি জাবের জহীর উদ্দিনের খুব ঘনিষ্ঠ সিরিত থানারতার পিতা।’
যয়নব যোবায়দা ও দাদী দু’জনেই চমকে উঠে তাকাল আহমদ মুসার দিকে। যয়নব যোবায়দা জিজ্ঞাসা করল, ‘সিরিত থানারতা কি করেন? লেখা পড়া করেন? কোথায় পড়েন?’
‘জাবের জহীর উদ্দিন ও সিরিত থানারতা একই বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ে। খুব ভাল মেয়ে সে। জাবের জহীর উদ্দিনের ব্যাপারে সে খুবই আন্তরিক। অনেক সাহায্য করেছে সে আমাকে। গতকাল বিকেলেও টেলিফোন করেছিল এদিকের অবস্থা জানার জন্যে। আমি যদি আপনাদের দেখা পাই, তাহলে তার সমবেদনা ও শুভেচ্ছা আপনাদের দু’জনকে জানাতে বলেছে।’ আহমদ মুসা বলল।
‘আমাদের শুভেচ্ছা-সমবেদনা তার প্রতি।’ বলল যয়নব যোবায়দা।
‘তাকে না দেখেই গ্রহণ করলেন?’ আহমদ মুসা বলল।
‘জনাব আহমদ মুসা যার পক্ষে বলেন, সে কত বড়, তার কত সৌভাগ্য! তার সম্পর্কে জানা আর কিছু থাকে না স্যার।’ যয়নব যোবায়দা বলল।
‘বোনকে এখনি দেখতে ইচ্ছা করছে আমার।’ বলল দাদী।
‘সে ব্যবস্থাও হয়ে যাবে দাদীমা। এখন দয়া করে আপনারা উঠুন। আপনাদের পৌছে দিয়ে আমাকে সুলতান গড়ে আবার ফিরে আসতে হবে।’ আহমদ মুসা বলল।
‘সংগে সংগেই কেন?’ জিজ্ঞাসা যয়নব যোবায়দার।
‘ব্ল্যাক ঈগলের লোকরা সকাল থেকে দিনের কোন এক সময় এই বাড়িতে আসবে তাদের লোকদের খোঁজ নিতে, আপনাদের খোঁজ নিতে। আমি ফিরে এসে তাদের জন্যে অপেক্ষা করতে চাই।
‘স্যার, আপনি নিজের কথা ভাবেন না? আপনার এখন রেষ্ট অপরিহার্য।’ বলল যয়নব যোবায়দা। কণ্ঠ তার খুব নরম।
‘কিন্তু মিস যোবায়দা, ঐ কাজটা বেশি প্রয়োজন।’
বলেই আহমদ মুসা উঠে দাঁড়াল।
উঠে দাঁড়াল অন্য সবাই।
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now