বাংলা গল্প পড়ার অন্যতম ওয়েবসাইট - গল্প পড়ুন এবং গল্প বলুন
বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ

২৮.আমেরিকারর এক অন্ধকারে (২)

"সাইমুম সিরিজ" বিভাগে গল্পটি দিয়েছেন গল্পের ঝুরিয়ান আরাফাত হোসেন (০ পয়েন্ট)

X রাগবি মাঠের গ্যালারী। রাগবি খেলা এই মাত্র শেষ হলো। জয় পরাজয়ের প্রতিক্রিয়া তখন গ্যালারীতে। খেলা হচ্ছিল লস আলামোস ব্লু ও লস আলামোস স্টারের মধ্যে। ‘ফ্রান্সিসকো ভাস্কোডি করোনাডো’র স্মৃতি টুর্নামেন্টের ফাইনাল খেলা ছিল আজ। ফ্রান্সিসকো প্রথম ইউরোপীয় যিনি নিউ মেক্সিকোতে পা রাখেন ১৫৪০ খৃষ্টাব্দে। তার স্মৃতির উদ্দেশ্যে নিবেদিত টুর্নামেন্টটি নিউ মেক্সিকোর সর্ববৃহৎ রাগবি টুর্নামেন্ট। দেশের শীর্ষ ৩২টি দলের খেলা ১৬টি স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত হয়। ফাইনাল খেলাটি বিভিন্ন বছর বিভিন্ন শহরে হয়ে থাকে। এ বছর হলো ‘সান জেরিনিমো’ স্টেডিয়ামে। খেলা শেষের শেষ বাঁশিটি বাজার সাথে সাথে স্ট্যানলি নামের এক শ্বেতাংগ ছেলে লাফিয়ে উঠে চিৎকার করে বলল ‘শয়তান জেরিনিমোকে যেভাবে পাছায় শুল ঢোকানো হয়েছিল, সেভাবে আজ জেরিনিমো স্টেডিয়ামেই লস আলামোস স্টারকেও সিকি ডজন গোল ঢুকানো হলো। হুর-রে’। ‘লস আলামোস স্টার রেড ইন্ডিয়ান অধ্যুষিত একটা দল। লস আলামোসের উত্তর, পশ্চিম ও দক্ষিণ অঞ্চলে তাদের রিজার্ভ এলাকায় বাস করে আপাকি, জনি ও পাবলো ইন্ডিয়ানরা। লস আলামোস স্টারকে এদেরই দল ধরা হয়। আর লস আলামোস ব্লুকে মনে করা হয় শ্বেতাংগদের দল। স্ট্যানলির কথা শেষ হতেই জন নামের একজন আপাকি ইন্ডিয়ান ছাত্র ঝাঁপিয়ে পড়ল স্ট্যানলির উপর এবং বলতে লাগল, ‘জেরিনিমো তোমার বাবা, জেরিনিমোর দেশ এটা। জেরিনিমোকে শয়তান বললি কেন? ফ্রান্সিসকোই তো শয়তান সন্ত্রাসী, অনুপ্রবেশকারী’। জেরিনিমো ছিল আপাকি ইন্ডিয়ান এবং নিউ মেক্সিকোর সব ইন্ডিয়ানদেরই তিনি জাতীয় বীর। ইউরোপীয় শ্বেতাংগরা তাকে নিউ মেক্সিকোর ‘টেরর’ হিসেবে অভিহিত করত এবং বেশ কিছু লড়াইয়ের পর তাকে গ্রেপ্তার করে ১৮৮০ সালে। স্ট্যানলি ও বিলির মধ্যে ভীষন মারামারি শুরু হয়ে গেল। দেখতে দেখতে দুই পক্ষেরই আরও কয়েকজন করে মারামারিতে যোগ দিল। যারা মারামারিতে যোগ দিতে চায় না, তারা দ্রুত সরে গেল মারামারির জায়গা থেকে। শেষ পর্যন্ত মারামারিটা শ্বেতাংগ ও ইন্ডিয়ানদের মধ্যে জাতিগত মারামারিতে পরিণত হলো। মারামারির মধ্যেই তখনও গ্যালারিতে বসে ছিল সান ঘানেম নাবালুসি। সে মারামারিতে যোগ দেয়নি, আবার উঠে পালায়নি। সান ঘানেম ইন্ডিয়ান নয়, কিন্তু আবার পুরোপুরি শ্বেতাংগও নয়। গায়ের রং সাদাও নয়, সোনালীও নয়। তার নীল চোখটা শ্বেতাংগদের থেকে একেবারে ভিন্ন। কিন্তু চুল আবার সোনালী। মারামারির মধ্যে দিয়েই ছুটে এল সান্তা আনা পাবলো সান ঘানেমের কাছে। সে সান ঘানেমের হাত ধরে টানতে টানতে বলল, ‘এভাবে বসে কেন? এস পালাই’। সান্তা আনা পাবলো ইন্ডিয়ান মেয়ে এবং পাবলো ইন্ডিয়ান গোষ্ঠীর। কিন্তু তার মুখ হ্যাটে অনেকটা ঢাকা থাকায় ইন্ডিয়ান বলে চেনা যাচ্ছে না। বোঝা যাচ্ছে হ্যাটে মুখ ঢেকে সান ঘানেমকে নিয়ে যাবার জন্যে সে এসেছে। সান ঘানেম উঠে দাঁড়িয়েছিল। এমন সময় তার সামনেই সে দেখল একজন শ্বেতাংগ তরুণ আরেকজন রেড ইন্ডিয়ানের বুকের উপর ছুরি বসাচ্ছে। সান ঘানেম সান্তা আনা পাবলোর হাত থেকে নিজের হাত ছাড়িয়ে নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়লো শ্বেতাংগ তরুনটির উপর এবং ছুরি সমেত তার হাত ধরে ফেলল। তারপর ছুরি কেড়ে নিয়ে জোরে ছুঁড়ে মারল দূরে। শ্বেতাংগ তরুনকে জাপটে ধরে রেখে কোন দিকে না তাকিয়েই ছুরিটা ছুঁড়ে ফেলে দিয়েছিল সান ঘানেম। কিন্তু ছুরিটা ছুটে গিয়ে একটু দূরে ফাঁকা জায়াগায় দাঁড়িয়ে থাকা একজন রেড ইন্ডিয়ান তরুনের বুকে আমূল বিদ্ধ হলো। তরুনটি সংগে সংগে চিৎকার করে ঢলে পড়ল গ্যালারির উপর। সান্তা আনা পাবলো সেদিকে তাকিয়ে চিৎকার করে উঠল, ভাইয়া!’ চিৎকার করেই সে ছুটল রেড ইন্ডিয়ান তরুনটির দিকে। সান্তা আনা পাবলোর চিৎকারে মাথা ঘুরিয়ে তাকাল সান ঘানেম। ছুরিবিদ্ধ রেড ইন্ডিয়ান তরুনটির উপর চোখ পড়তেই ‘একি করলাম’ বলে আর্তনাদ করে উঠল সান ঘানেম। শ্বেতাংগ তরুনকে ছেড়ে দিয়ে সেও ছুটল সান্তা আনা পাবলোর মত। এ সময় চারদিক থেকে পুলিশের বাঁশি বেজে উঠল। পুলিশ ছুটে এল মারামারির জায়গায়। সান্তা আনা পাবলো ছুরিবিদ্ধ রেড ইন্ডিয়ান তরুনের কাছে পৌঁছে দু’হাত দিয়ে তার বুক থেকে ছুরিটা বের করে ‘ভাইয়া’ বলে ঝাঁপিয়ে পড়ল রেড ইন্ডিয়ান তরুনটির উপর। রেড ইন্ডিয়ান তরুনটির নাম জিমি পাবলো। সান্তা আনা পাবলোর বড় ভাই। সান ঘানেমও এসে পৌঁছল জিমি পাবলোর পাশে। তারপর বসে তার মুখের উপর ঝুঁকে পড়ে সান ঘানেম আবার আর্তনাদ করে বলল, ‘একি করলাম জিমি’। ছুরিটা ঠিক হৃদপিন্ডে বিদ্ধ হয়েছিল। মুহূর্ত কয়েকের মধ্যেই মারা গেল জিমি পাবলো। কয়েকজন পুলিশ এসে দাঁড়াল সেখানে। তাদের সাথে কিছু রেড ইন্ডিয়ান যুবক। রেড ইন্ডিয়ান যুবকরা সবাই এক বাক্যে বলে উঠল সান ঘানেম খুন করেছে জিমি পাবলোকে। সব পুলিশের প্রশ্নবোধক চোখ গিয়ে পড়ল সান ঘানেমের উপর। সান ঘানেমের বেদনা পীড়িত মুখ অসম্ভব রকম গম্ভীর হয়ে উঠেছে। সে জিমি পাবলোর পাশ থেকে ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়াল। পুলিশের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘হ্যাঁ আমিই খুন করেছি জিমি পাবলোকে’। সান্তা আনা পাবলো তখনও কাঁদছিল জিমি পাবলোর বুকের উপর পড়ে। সান ঘানেমের কথা কানে যেতেই চমকে উঠে মুখ তুলল সান্তা আনা। ধীরে ধীরে সোজা হয়ে বসল। হঠাৎ তার ঠোঁট দু’টি প্রবলভাবে কেঁপে উঠল। চোখ ফেটে নামল অশ্রু প্রবাহ। যখন পুলিশ সান ঘানেমের হাতে হাতকড়া পরাচ্ছিল, তখন সান্তা আনা কিছু বলার চেষ্টা করল, কিন্তু কাঁপা ঠোঁট দু’টি ডিঙ্গিয়ে কোন শব্দ বেরুতে পারল না। জিমি পাবলো ও সান ঘানেম দু’জনে সহপাঠি, তারা দু’জনেই রাজধানী সান্তাফে’র সান্তাফে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। জিমি পাবলোর ছোট বোন সান্তা আনাও একই বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী। জিমি পাবলো ও সান ঘানেম শুধু সহপাঠি নয়, দু’জন দু’জনের ঘনিষ্টতম বন্ধুও। পুলিশ অফিসার দু’জন পুলিশকে নির্দেশ দিল সান ঘানেমকে গাড়িতে তুলবার জন্য। দু’জন পুলিশ দু’দিক থেকে এসে সান ঘানেমের দু’বাহু চেপে ধরল নিয়ে যাবার জন্যে। পা বাড়াবার আগে সান ঘানেম অশ্রুতে ভেসে যাওয়া সান্তা আনার দিকে চোখ তুলে বলল, ‘জিমিকে আমি হত্যা করেছি, সান্তা আনা তুমি আমাকে ক্ষমা করো না’। শেষের কথাগুলো সান ঘানেমের আবেগে অবরুদ্ধ গলা থেকে ভেঙে ভেঙে বেরুল। বোবা দৃষ্টিতে চেয়েছিল সান্তা আনা সান ঘানেমেরে দিকে। সান ঘানেমের কথায় তার গোটা শরীর যেন থরথর করে কেঁপে উঠল। কি কথা যেন ঠোঁট ফুঁড়ে বেরুতে চাচ্ছে, পারছে না। পুলিশ সান ঘানেমকে নিয়ে চলতে শুরু করলে সঙগা হারিয়ে সান্তা আনার দেহ গড়িয়ে পড়ল স্টেডিয়ামের সিঁড়িতে। নিউ মেক্সিকোর রাজধানী সান্তাফে’র উপকন্ঠে এক্সপ্রেস ওয়ের কাছাকাছি বাগান ঘেরা বিশাল এক বাড়ি। বাড়িতে মৃত্যুর নিরবতা। বাড়িতে একজন শুভ্রকেশ বৃদ্ধা, একজন মাঝবয়সী মহিলা এবং একজন তরুনী। কান্নায় মূহ্যমান সবাই। চোখে মুখে তাদের আতংক ও উদ্বেগ। একটা গাড়ি বাড়ির খোলা গেট দিয়ে প্রবেশ করে গাড়ি বারান্দায় এসে থামল। গাড়ি থেকে একজন লোক ও একজন মহিলা নামল। বাড়ির বাইরের দরজায় ঠেস দিয়ে দাঁড়িয়েছিল সেই মাঝ বয়সী মহিলাটি। চোখ তার অশ্রুতে ভাসছিল। সে তাকিয়েছিল বাইরে। অপেক্ষা করছিল কারও। গাড়িটি এসে থামতেই মহিলাটির চোখে মুখে আশার স্ফুরণ জাগল। সোজা হয়ে দাঁড়াল সেই মাঝবয়সী মহিলাটি। গায়ের চাদরটা মাথার উপর তুলে দিয়ে বারান্দা ধরে কয়েক ধাপ এগিয়ে এল গাড়ি বারান্দার দিকে। গাড়ি থেকে নেমেই মহিলাটি ছুটে এসে জড়িয়ে ধরল মাঝবয়সী মহিলাকে। বলল, ‘আপা ভেব না, সব ঠিক হয়ে যাবে’। লোকটিও এসে দাঁড়াল তাদের পাশে। সালাম দিল কান্নারত মহিলাকে। বলল, ‘চিন্তা করো না ভাবি, সান ঘানেম কোন অনুচিত কাজে জড়াতে পারে না, খুনতো নয়ই। কোন ব্যাপার আছে। ঠিক হয়ে যাবে সব’। মহিলা চোখ মুছে বলল, ‘এস তোমরা’। বলে অন্য মহিলাটির হাত ধরে ড্রইং রুমের দিকে হাটতে শুরু করল। ড্রইং রুমে বসে ছিল বৃদ্ধা ও তরুনীটি, ওরা সবাই ড্রইং রুমে প্রবেশ করল। লোকটি সালাম দিয়ে সোজা গিয়ে বসল বৃদ্ধার পাশে। বলল, ‘আম্মা তোমরা দেখছি খুবই ভেঙে পড়েছ। আল্লাহ আছেন’। বৃদ্ধাটি তাকাল তার দিকে। বলল, ‘অবশ্যই আল্লাহ আমাদের সহায় বেটা। কিন্তু আমরা মাত্র তিনজন বাসায়। সান ঘানেম কি অবস্থায় আছে, কে খোঁজ নেবে? ‘ভেব না, ওদিকটা আমি দেখছি। ভাইয়া কবে গেছেন?’ বলল যুবক ছেলেটি। ‘ভাইয়া’ মানে ছেলেটির বড় ভাই। এই বাড়ির মালিক। নাম কারসেন ঘানেম নাবালুসি। থাকে সান্তাফের উত্তরে সান্তা ক্লারা শহরে। কারসেন ও সারাসিন সহোদর ভাই। বৃদ্ধা তাদের মা। মাঝবয়সী মহিলাটি মরিয়ম মইনি, কারসেন ঘানেমের স্ত্রী। আর তরুণীটি কারসেন ঘানেমের মেয়ে ফাতিমা ঘানেম। ‘কারসেন কাল গেছে ওয়াশিংটন’। বলল বৃদ্ধা। কারসেন ঘানেম নাবালুসি ‘মুসলিম এসোসিয়েশন অব নিউ মেক্সিকো’র (MANEM) ডাইরেক্টর। ওয়াশিংটনের গ্রীন ভ্যলিতে আমেরিকান মুসলিম এসোসিয়েশনগুলোর সাত দিনব্যাপী যে সম্মেলন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে, কারসেন সেখানেই গেছে গতকাল। ‘আপনারা কিভাবে খবর পেলেন ভাবী?’ মরিয়ম মইনিকে লক্ষ্য করে জিজ্ঞেস করল সারাসিন ঘানেম। ‘আপনারা কিভাবে খবর পেলেন ভাবি?’ মরিয়ম মইনিকে লক্ষ্য কর জিজ্ঞেস করল সারাসিন ঘানেম। ‘আমাদের পাড়ার একটা মেয়ে সেখানে ছিল। সেই খবর দিয়েছে’। বলল মরিয়ম মইনি। ‘প্রকৃতই কি ঘটেছিল, বলেছে কিছু?’ ‘মারামারির মধ্যে সে এটা খেয়াল করেনি। জিমি পাবলো ছুরিবিদ্ধ হয়ে আর্তনাদ করে উঠলে ওদিকে সকলের চোখ যায়। রেড ইন্ডিয়ানরা সবাই দোষ দিচ্ছে সান ঘানেম খুন….’। কথা শেষ করতে পারলো না মরিয়ম মইনি কেঁদে উঠল। রুমাল দিয়ে চোখ মুছে মায়ের বদলে কথা বলে উঠল ফাতিমা ঘানেম। বলল, ‘রেড ইন্ডিয়ানরা সবাই এক কথাই বলছে। শ্বেতাংগরা কিছুই বলতে পারছে না। তারা নাকি খেয়াল করেনি। আমাদের পাড়ার মেয়েটা বলল, জিমি পাবলোর বোন নাকি ভাইয়ার পাশেই ছিল, সেই নাকি সব জানে। কিন্তু কোন কথা বলেনি সে’। ‘তার কাছ থেকে জানার কিছু উপায় আছে? সেই তো আসল সাক্ষী’। বলল সারাসিন ঘানেম। ‘আমাদের কারও ওদের বাড়িতে যাওয়া মুস্কিল। বিশ্ববিদ্যালয়ে জানা যাবে। তবে…..’। কি কথা বলতে গিয়ে থেমে গেল ফাতিমা ঘানেম। ‘কি বলছিলে বল’ বলল সারাসিন ঘানেম। চোখ মুখ লাল হয়ে উঠেছে ফাতিমা ঘানেমের। একটু দ্বিধা করে সে মুখ একটু নিচু করে বলল, ‘সান্তা আনা ভালবাসে ভাইয়াকে’। ‘কে সান্তা আনা? জিমি পাবলোর বোন?’ ‘জি আংকেল। ‘তাহলে তো তার কাছ থেকে সাহায্য পাওয়া যাবে!’ বলল সারাসিন ঘানেম। তার চোখে আশার আলো। ‘পাওয়া যাবে। আমার বিশ্বাস, ভাইয়া জিমি পাবলোকে খুন করতে পারে না। ভাইয়া এবং সে দুজন খুবই অন্তরংগ বন্ধু’। ‘কেন, বোনকে নিয়ে সান ঘানেমের সাথে তার যদি কিছু ঘটে থাকে?’ ‘এমন কিছু ঘটার সম্ভাবনা নেই আংকল। জিমি পাবলো সব জানতো এবং তার সম্মতি ছিল’। ‘তাহলে?’ ‘আমি জানি না, কোন ষড়যন্ত্রও হতে পারে’। ‘কি ষড়যন্ত্র?সান ঘানেম ও সান্তা আনার মধ্যে বৈরিতা সৃষ্টি?’ ‘হতে পারে’। ‘কিন্তু প্রমাণ করা যাবে কিভাবে?’ একটু ভাবল সারাসিন ঘানেম। তারপর বলল, ‘ভা্ইয়াকে কি খবর দেয়া হয়েছে?’ ‘না খবর দেয়া হয়নি’। বলল মরিয়ম মইনি। ‘খবর তাঁকে জানানো দরকার নয়?’ ‘হ্যাঁ’। ‘যদিও অতি গুরুত্বপূর্ণ মিটিং এ উনি, তবু তাঁকে জানানো দরকার আমিও মনে করি’। সারাসিন ঘানেম বলল। ‘সারাসিন তুমিই তাহলে টেলিফোন কর’। ‘ঠিক আছে’। বলে মোবাইল তুলে নিয়ে ডায়াল করল সারাসিন ঘানেম। ওপারে রিং হচ্ছে। কিন্তু কোন উত্তর নেই। কেউ ধরছে না টেলিফোন। ‘হয়তো টয়লেট কিংবা আশে পাশে কোথাও গেছে’। ভাবল সারাসিন ঘানেম। মিনিট দশেক পর আবার টেলিফোন করল। কিন্তু ঐ একই অবস্থা। ওপার থেকে কোন সাড়া পাওয়া যাচ্ছে না। ভ্রু কুঁচকে তাকাল সারাসিন ঘানেম ভাবি মরিয়ম মইনির দিকে। বলল, ‘ভাইয়া টেলিফোন অফ না করে টেলিফোন তো এইভাবে কোথাও ফেলে রাখেন না’। ‘না, সব কিছুরই তো ব্যতিক্রম আছে। তুমি কনফারেন্স অফিসে টেলিফোন কর’। মরিয়ম মইনি টেলিফোন নাম্বার তার আংকলকে দেয়ার জন্যে বলল ফাতিমা ঘানেমকে। সারাসিন ঘানেম গ্রীন ভ্যালির কনফারেন্স অফিসে টেলিফোন করে চাইল কারসেন ঘানেম নাবালুসিকে। একটু দেরী হলো। সম্ভবত কারসেনকে ডাকতে গেছে। ‘মিঃ কারসেন এসে ধরেছে টেলিফোন’। ওপার থেকে জানাল। কারসেনের সাথে সম্ভাষণ বিনিময়ের পর সব কথা জানালো সারাসিন ঘানেম। কিন্তু কথা বলতে বলতে মুখটা গম্ভীর হয়ে উঠল সারাসিনের। টেলিফোন রাখার পরেও চিন্তিত দেখাল সারাসিন ঘানেমকে। ‘কি হলো সারাসিন, তোমাকে চিন্তিত দেখাচ্ছে? কিছু বলেছে কারসেন?’ জিজ্ঞেস করল মরিয়ম মইনি। ‘ভাইয়া হু, হ্যাঁ ছাড়া কোন কথা বলেনি। এত বড় ঘটনা শোনার পর তাঁর যে প্রতিক্রিয়া হওয়ার দরকার তা তার মধ্যে দেখলাম না’। বলল সারাসিন ঘানেম। ‘হয়তো খুব ব্যস্ততার মধ্যে আছে’। চিন্তিত কন্ঠে বলল মরিয়ম। ‘কিন্তু কন্ঠ? কন্ঠও তো ভাইয়ার মত মনে হলো না’। সারাসিনের চোখে মুখে বিষ্ময়। ‘এটা তুমি কি বলছ? সর্দি লাগলে গলা ভাংলে স্বরটা একটু ভিন্ন রকমের হয়, সে রকম একটা কিছু হবে’। মরিয়ম বলল। ‘শুধু কন্ঠ নয় ভাবি, ভাইয়া আমার সাথে যেভাবে কথা বলেছে, তাতে মনে হয়েছে যেন তিনি রাতারাতি সব ভূলে গিয়ে নতুন মানুষ হয়েছেন। সম্পূর্ণ অপরিচিতের মত কথা বলেছেন’। সারাসিন ঘানেম থামতেই মরিয়ম বলে উঠল, ‘একই নামের ভিন্ন কারও সাথে কথা বলনি তো তাহলে? কারসেন নাম তো অনেকেরই থাকতে পারে’। ‘সেটা কি করে সম্ভব? আমি চেয়েছি নিউ মেক্সিকোর প্রতিনিধি কারসেন ঘানেম নাবালুসিকে। তাছাড়া ভিন্ন লোক হলে কথার শুরুতেই তো তার কাছেও ধরা পড়ে যেত। কিন্তু উনি তো আমার সাথে কারসেন ঘানেম নাবালুসি হিসেবেই কথা বলেছেন’। সঙ্গে সঙ্গে উত্তর দিতে পারল না মরিয়ম মইনি। ভাবছিল সে। কথা বলে উঠল ফাতিমা ঘানেম, ‘আংকল আবার টেলিফোন করে কনফারেন্স অফিস থেকে বিষয়টা কনফার্ম করে নিলে হয় না?’ ‘ঠিক বলেছ ফাতিমা, সেটাই করা যাক’। বলে সারাসিন ঘানেম আবার টেলিফোন তুলে নিল হাতে। আবার টেলিফোন করল ওয়াশিংটনের গ্রীন ভ্যালিতে অনুষ্ঠানরত ‘আমেরিকান কাউন্সিল অব মুসলিম এসোসিয়েশন’(ACOMA) এর কনফারেন্স অফিসে। ওখানে টেলিফোন ধরল রিসিপশনিস্ট। সারাসিন ঘানেম বলল, ‘কিছুক্ষণ আগে আমি টেলিফোন করেছিলাম। আমি কনফারেন্স এর কোন কর্তাব্যক্তির সাথে কথা বলতে চাই’। রিসিপশনিস্ট জানাল, ‘তাঁরা সবাই ভীষণ ব্যস্ত। ঘন্টা দুই পরে টেলিফোন করলে সবাইকে পেয়ে যাবেন। আর আপনার প্রয়োজন কি সেটা জানালে আমিও তাদের জানাতে পারি’। ‘ধন্যবাদ। নিউ মেক্সিকোর প্রতিনিধি কারসেন ঘানেম নাবালুসি আমার ভাই। তাঁর সাথেই আমার কথা ছিল’। ‘সুবহানাল্লাহ, তাঁর ব্যাপার নিয়েই তো ওরা ব্যস্ত। তাঁকে নিয়ে রুদ্ধদ্বার কক্ষে কি আলোচনা হচ্ছে’। ‘কেন? কি আলোচনা?’ ‘আমি বলতে পারবোনা’। ‘যিনি বলতে পারবেন তাকে দিন। আমি কারসেনের ভাই। আমার জরুরী প্রয়োজন’। শান্ত, কিন্তু শক্ত কন্ঠে বলল সারাসিন ঘানেম। একটু ধরুন স্যার, চেষ্টা করে দেখি কাউকে পাই কিনা। অল্প কয়েক সেকেন্ড পরেই সে বলল, ‘আমি লাইন দিচ্ছি, কনফারেন্সের ডাইরেক্টরের সাথে কথা বলুন। সালাম দিল সারাসিন ঘানেম। সালাম গ্রহণ করে ওপার থেকে বলল, ‘আপনি কি কারসেন ঘানেমের ভাই?’ ‘জি। আমি তার সম্পর্কে কিছু জানতে চাই। কারসেন ঘানেম, যার সাথে অল্পক্ষণ আগে কথা বললাম, তাঁকে আমার ভাই কারসেন ঘানেম বলে মনে হয়নি’। ‘আপনাকে ধন্যবাদ। আমাদেরও সেই রকম সন্দেহ। আপনার ধারণা আমাদেরকে নিশ্চিত করল’। ‘তাহলে ছদ্মবেশী কেউ কি কারসেনের ভূমিকায় অভিনয় করছে?’ ‘তাইতো এখন মনে হচ্ছে’। ‘তাহলে কারসেন ঘানেম কোথায়?’ ‘সেটা আমাদেরও প্রশ্ন’।‘ আতংকিত হয়ে উঠেছে সারাসিন ঘানেম। উদ্বেগ-উত্তেজনায় কাঁপছে তার দেহ। কম্পিত গলায় সে বলল, ‘এখন কি করণীয়?’ ‘তাকে জিজ্ঞাসাবাদ শুরু হয়েছে। কি অবস্থা দাঁড়ায় আপনাদের জানাব। কারসেন ঘানেমের প্রতি আমাদেরও দায়িত্ব রয়েছে। এখনকার মত রাখি?’ সারাসিন ঘানেম টেলিফোন রাখতেই মরিয়ম মইনি আর্তকন্ঠে বলে উঠল, ‘ওখানে কি ঘটেছে সারাসিন, কারসেনের কি হয়েছে?’ সারাসিন তখন নিজেই বিমূঢ় হয়ে পড়েছে। বজ্রপাতের মতই ভয়াবহ মনে হচ্ছে তার কাছে খবরটা্। কথা বলার শক্তিও যেন তার ফুরিয়ে গেছে। কিন্তু তাকে এভাবে ভেঙে পড়লে চলবে কেন? কারসেন ঘানেম উপস্থিত নেই, সান ঘানেম নেই। তাকেই তো এখন সব কিছু করতে হবে। একটু নড়ে-চড়ে বসল সারাসিন ঘানেম। বলল, ‘ভাবি, এখন আমাদেরকে আল্লাহর প্রতি খুব বেশী ভরসা করতে হবে। ওখান থেকে স্পষ্ট কিছু জানা গেল না। তবে কারসেন ঘানেমের পরিচয় দেয়া লোকটি কারসেন ঘানেম নয়।….’ সারাসিন ঘানেম এতটুকু বলতেই মরিয়ম কেঁদে উঠল। থেমে গিয়েছিল সারাসিন ঘানেম। তাকাল সে তার ভাবি মরিয়ম মইনির দিকে। বলল, ‘ধৈর্য্য ধরতে হবে ভাবি আমাদের। লোকটিকে জিজ্ঞাসাবাদ চলছে। তার কাছ থেকেই ভাইয়ার খবর জানা যাবে। কনফারেন্স কর্তৃপক্ষ বলেছেন তারাও ব্যাপারটা সিরিয়াসলি দেখছেন’। ‘চারদিক থেকে আল্লাহ আমাদের একি বিপদ দিলেন! কি হবে এখন!’ আর্তকন্ঠে বলে উঠল বৃদ্ধা, কারসেন ঘানেম এবং সারাসিন ঘানেমের মা। বলেই সে সারাসিন ঘানেমকে উদ্দেশ্য করে বলল, ‘এখন তো ওয়াশিংটন যেতে হবে তোর, কিন্তু সান ঘানেমের ব্যাপারটা দেখবে কে?’ কান্নারুদ্ধ কন্ঠ তার। ‘কনফারেন্স কর্তৃপক্ষ টেলিফোন করে জানাবে। ওদিকের পরিস্থিতি দেখে সিদ্ধান্ত নেয়া যাবে আমাদের’। বলল সারাসিন ঘানেম। মরিয়ম মইনি কিছু বলতে যাচ্ছিল, ‘টেলিফোন বেজে উঠল এ সময়। টেলিফোন ধরল সারাসিন ঘানেম। টেলিফোন ধরেই মরিয়ম মইনির দিকে চেয়ে বলল, ‘ভাবি আপনার টেলিফোন। সান্তা আনা নামে একটি মেয়ে করেছে’। ‘সান্তা আনা’ বলে ছু্টে এসে টেলিফোন হাতে নিল মরিয়ম মইনি। টেলিফোন নিয়ে নিজের সিটে ফিরে যেতে ভূলে গেল। সে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়েই কথা বলতে শুরু করল। মরিয়ম মইনি বলছিল টেলিফোনে, ‘কেঁদো না মা বল কি ঘটেছিল। আমার সান ঘানেম তো খুন করতে…….’। কথা শেষ করতে পারলো না মরিয়ম মইনি। কান্নায় রুদ্ধ হয়ে গেল তার কন্ঠ। ‘না, আন্টি, সান খুন করেনি। ও কাউকে খুন করতে পারে না’। কান্না জড়িত কন্ঠে বলল সান্তা আনা। ‘বল মা কি দেখেছ তুমি। তুমি নাকি ছিলে ঘানেমের কাছে’। ‘আমি মারামারির ভেতর থেকে সানকে আনতে গিয়েছিলাম আন্টি। আমি যখন ওকে টেনে আনছিলাম সে সময় পাশেই একজন শ্বেতাঙ্গ একজন ইন্ডিয়ান ছেলের বুকে ছুরি বসাতে যাচ্ছিল। ইন্ডিয়ানকে বাঁচাবার জন্যে সান ঝাঁপিয়ে পড়ে এবং ছুরিটা কেড়ে নিয়ে ছুঁড়ে ফেলে দেয়। কিন্তু ছুরি গিয়ে লাগে দূরে দাঁড়ানো ভাইয়ার বুকে। সান……’। কথা শেষ করতে পারলো না সান্তা আনা। কান্নায় জড়িয়ে গেল তার কথা। ‘সান কি তোমার ভাই জিমিকে দেখেছিল?’ জিজ্ঞেস বরল মরিয়ম মইনি। সান্তা আনা বলল, ‘না আন্টি, সান সে সময় শ্বেতাঙ্গ ছেলেটিকে জাপটে ধরেছিল, কোন দিকে তাকিয়ে সে ছুরি ফেলে দেয়নি’। ‘সত্য এই ঘটানাটা আর কেউ দেখেনি মা?’ ‘যে ইন্ডিয়ান ছেলেকে সান বাঁচিয়েছে, সেই জনি লেভেনও এটা দেখেছে। কিন্তু এখন সে উল্টো কথা বলছে’। ‘কি বলছে?’ ‘সান ঘানেম দেখেই ছুরি মেরেছে জিমি পাবলোকে’। ‘তার প্রাণ বাঁচাবার পরেও এই মিথ্যা কথা?’ ‘ইন্ডিয়ানরা এখন এক জোট হয়েছে আন্টি। একজন ইন্ডিয়ান নিহত হয়েছে শ্বেতাঙ্গের হাতে, এই সেন্টিমেন্টটাকেই বড় করে তোলা হচ্ছে। তাছাড়া জনি লেভেন হিংসা করে সান ঘানেমকে’। ‘কেন?’কোন উত্তর দিল না সান্তা আনা। ‘জান না তুমি কেন ঈর্ষা করে? ‘জানি আন্টি’। ‘কি সেটা?’ ‘কারণটা আমি আন্টি। আমি সান ঘানেমকে ভালবাসি, এটা সে দেখতে পারে না’। কান্নাজড়িতে কন্ঠে বলল সান্তা আনা। ‘এখন কি হবে মা? ওদিকে সানের আব্বাও……’। কান্নায় ভেঙে পড়ল মরিয়ম মইনি। ‘আপনি কাঁদবেন না আন্টি। ঈশ্বর আছেন। সানের জন্যে আমি সবকিছু…….’। কথা শেষ করতে পারলো না। টেলিফোন নিচে পড়ে যাওয়ার শব্দ ভেসে এল। তার সাথে শোনা গেল একটা ভারি গলা, ‘বলা হচ্ছে না তুমি সানদের পরিবারের সাথে কোন যোগাযোগ করবে না, তাদের কিছুই জানাতে পারবে না। ওরা আমাদের ইন্ডিয়ানদের শত্রু। তুমি সেই খুনি সানকে বাঁচাবার অঙ্গীকার করছ’। ‘আব্বা, আপনাকে বলেছি সানের কোন দোষ নেই। সে একজন ইন্ডিয়ানকে বাঁচাতে গিয়ে এই ঘটনা ঘটেছে’। কাঁদতে কাঁদতে বলল সান্তা আনা। ‘এই কথা তুমি কয়জন ইন্ডিয়ানকে বলবে? আর তোমার কথা কে বিশ্বাস করবে, তুমি সানের পক্ষে তো বলবেই। আমার ছেলে তার ছুরিতে নিহত হয়েছে, এটাই আজ বড় সত্য। তারা এখন আমাদের শত্রু’। ‘কিন্তু আব্বা, তারা তো শত্রু নয়, সত্যকে তো মিথ্যা দিয়ে …..’। কথা সমাপ্ত হওয়ার আগেই ওপার থেকে সান্তা আনার কান্না ভেজা কন্ঠ বন্ধ হয়ে গেল। নিশ্চয় টেলিফোন তার আব্বা মেঝে থেকে তুলে নিয়ে অফ করে দিয়েছে। টেলিফোনটা সোফায় ছুঁড়ে দিয়ে ধপ্ করে বসে পড়ল মরিয়ম মইনি। তার চোখের কোণে যে আশার আলো জ্বলে উঠেছিল তা দপ করে নিভে গেল। ঘরের সবাই তার দিকে তাকিয়ে। সারাসিন ঘানেম উদগ্রীব কন্ঠে বলল, ‘কি ঘটেছে, কি শুনলেন ভাবি?’ ‘সান্তা আনা ও তার আব্বার মধ্যে তর্ক। তার আব্বা সান্তা আনাকে জিমি পাবলোর খুনি-পরিবারের সাথে কথা বলতে দেবে না। তাই তিনি টেলিফোন সান্তা আনার হাত থেকে ফেলে দিয়েছিলেন’। থেমে একটা দম নিয়ে মরিয়ম মইনি সান্তা আনা ও তার আব্বার মধ্যে তর্কের গোটা বিবরণ দিয়ে বলল, এর পর সান্তা আনা শত ইচ্ছা করলেও আমাদের সান ঘানেমের পক্ষে সাক্ষী দিতে পারছে না। আর জনি লেভেন তো সাক্ষী বিরুদ্ধেই দিবে’। ‘জনি লেভেন কে ভাবি?’ ‘জনি লেভেন একজন ইন্ডিয়ান ছেলে’। এই জনি লেভেনকেই এক শ্বেতাঙ্গ ছেলে ছুরি দিয়ে হত্যা করতে যাচ্ছিল। সান ঘানেম লেভেনকে বাঁচাবার জন্যে শ্বেতাঙ্গ ছেলেটিকে জাপটে ধরে তার হাত থেকে ছুরি ছিনিয়ে নিয়ে ছুড়ে ফেলে দিয়েছিল। এই ছুড়ে দেয়া ছুরিই ঘটনাক্রমে লাগে জিমি পাবলোর বুকে। এই ঘটনা সান্তা আনার মত জনি লেভেনও দেখে’। ‘লেভেনকে বাঁচাতে গিয়েই তো ঘটনা ঘটেছে, তাহলে লেভেন সান ঘানেমের বিরুদ্ধে মিথ্যা সাক্ষী দেবে কেন?’ বলল সারাসিন ঘানেম। উত্তরে মরিয়ম মইনি সান্তা আনা যা বলেছিল সব জানিয়ে বলল, ‘আমার সান ঘানেম নিরপরাধী হলেও গোটা অবস্থা তার বিরুদ্ধে গেছে’। মুখে রুমাল চেপে আবার কাঁদতে লাগল মরিয়ম মইনি। সারাসিন ঘানেম বলল, ‘ভাবি। আল্লাহ একটা উপায় নিশ্চয় বের করে দেবেন। কোনভাবে যদি সান্তা আনাকে দিয়ে কোর্টে ঘটনাটা বলানো যায়, তাহলে লেভেন বিপক্ষে সাক্ষী দিলেও জেরায় সে ধরা পড়ে যাবে’। ‘কিন্তু সান্তা আনাকে হয়তো ওরা সাক্ষীই বানাবে না’। বলল বৃদ্ধা, সারাসিন ঘানেমের মা। ‘না আম্মা, তাকে সাক্ষী বানাতেই হবে, কারণ সেই প্রথম জিমি পাবলোকে ছুরিবিদ্ধ হতে দেখে এবং তার কাছে ছুটে যায়’। বলল সারাসিন ঘানেম। ‘কিভাবে সান্তা আনাকে দিয়ে সত্য কথা বলাবে! শুনলেই তো বৌমার কাছে সান্তা আনার বাপের আচরণের কথা। আর শুধু তো তার বাপ নয়, সব ইন্ডিয়ানরাই একজোট হয়েছে’। ‘বলেছি তো আম্মা। আল্লাহ একটা পথ অবশ্যই বের করে দেবেন’। সারাসিন ঘানেম বলল। ‘আংকেল, সান্তা আনাকে আমি জানি। সে মরে গেলেও ভাইয়ার বিরুদ্ধে সাক্ষী দেবে না। আমার মনে হচ্ছে, তাকে তারা সাক্ষী হিসেবে না নেবার সব রকম ব্যবস্থা করবে। এর প্রতিকার আমরা কিভাবে করব, সেটা আমাদের চিন্তা করা উচিত’। ‘ঠিক বলেছ মা। কিভাবে করা যাবে সেটা একটা বড় বিষয় হওয়া উচিত’। বলল সারাসিন ঘানেম। কিছু বলার জন্যে মুখ খুলেছিল মরিয়ম মইনি। টেলিফোন বেজে উঠল। থমকে গিয়ে মরিয়ম মইনি টেলিফোন তুলে নিল হাতে। টেলিফোন ধরে সালাম নিয়েই শুনল, ‘সারাসিন ঘানেম কে?’ উত্তরে বলল ‘ধরুন, দিচ্ছি’। বলে মরিয়ম এস্তে উঠে দাঁড়িয়ে টেলিফোন সারাসিনের দিকে এগিয়ে ধরে বলল, ‘নাও তোমার টেলিফোন, বোধ হয় ওয়াশিংটন থেকে’। কন্ঠস্বর কাঁপছে মরিয়ম মইনির। ‘আসসালামু আলাইকুম। সারাসিন ঘানেম বলছি’। টেলিফোন ধরে বলল সারাসিন ঘানেম। ‘ওয়া আলাইকুমুস সালাম। দুঃখিত মিঃ সারাসিন, আপনার ও আমাদের সন্দেহই সত্য হয়েছে। সে একজন ইহুদী গোয়েন্দা। কারসেন ঘানেমের পরিচয় নিয়ে আমাদের সম্মেলনে যোগদান করেছিল’। ‘কারসেন ঘানেম কোথায়?’ ‘তাঁর সম্পর্কে সে একেকবার একেক কথা বলছে, তবে আমাদের ধারণা তাঁকে কোথাও বন্দী করে রেখে তার পরিচয় নিয়ে সে সম্মেলনে এসেছে’। ‘কিন্তু যদি……..’। বুকটা থরথর করে কেঁপে উঠল সারাসিন ঘানেমের এক অশুভ আশংকায়। কথাটা মুখেও আনতে পারলো না সে। ‘বুঝেছি মিঃ সারাসিন ঘানেম। তার মুখ দেখে আমরা সে রকম কোন আশংকা করছি না’। ‘আমি কি আসব ওয়াশিংটনে?’ ‘আমরা আপনাকে জানাব, যদি দরকার হয়। মিসেস ঘানেমকে আমাদের সালাম দেবেন এবং বলবেন কারসেন ঘানেমের ব্যাপারে যা যা করার সবই আমরা করব’। ‘কিন্তু ইহুদীরা যদি সত্যিই এ যুদ্ধে নেমে থাকে, তাহলে ব্যাপারটাতো সাংঘাতিক। ওরা তো এদেশে অপ্রতিদ্বন্ধী’। সারাসিন ঘানেমের কন্ঠে উদ্বেগের সুর। ‘ওরা অপ্রতিদ্বন্ধী ছিল। সব সময় থাকবে তা নয়। অন্তত এই যুদ্ধে ওরা অপ্রতিদ্বন্ধী নয়। বিশ্ব-ইহুদীরা প্রতিদ্বন্ধীতায় যাঁর কাছে বারবার হেরেছেন, সেই ব্যক্তিত্ব আল্লাহর রহমতে এখানে, আমাদের মাঝে উপস্থিত। তিনিই কারসেন ঘানেমের ব্যাপারটা দেখছেন’। ‘কে তিনি?’ ‘দুঃখিত মিঃ সারাসিন, এটা টেলিফোন। নাম বলা বোধ হয় ঠিক হবে না। ঐটুকু আপনাকে বললাম আপনাদের সান্ত্বনার জন্যে। দোয়া করবেন। রাখি’। বলে সালাম দিয়ে ওপ্রান্ত থেকে টেলিফোন রেখে দিল। টেলিফোন রেখে সারাসিন ঘানেম ওয়াশিংটন থেকে শোনা সব কথাই ধীরে ধীরে জানাল সবাইকে। কারসেন ঘানেমের স্ত্রী মরিয়ম মইনি দু’হাতে মুখ ঢেকে কান্না চাপতে চেষ্টা করল, মেয়ে ফাতিমা ঘানেম ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল। রুমালে চোখ মুছতে লাগল ঘানেমদের বৃদ্ধা মা ও মিসেস সারাসিন। ঘর জুড়ে নিঃশব্দ এক কান্নার বৃষ্টি। ইহুদী খুনীরা জার্মানির নাজীদের চেয়েও ভয়ঙ্কর বুদ্ধিতে এবং নৃশংসতায়। সকলের বুকই দুরুদুরু করে কাঁপছে। নিরবতার মাঝে সারাসিন ঘানেম ধীর কন্ঠে বলে উঠল, ‘উদ্বেগ আতংকের পাশে আল্লাহর সাহায্যের দিকটাকেই এখন অমাদের বড় করে দেখতে হবে। নাম ওরা বলেনি বটে, একটা বড় আশার কথা তো ওঁরা জানিয়েছে। ঐ পথেই হয়তো আল্লাহর সাহায্য আসবে’। ‘অল পাওয়ারফুল বলে কথিত আমেরিকান ইহুদী চক্রের মোকাবিলায় আমাদের কে আছে? যার কথা তাঁরা বললেন?’ চোখ মুছতে মুছতে বলল ফাতিমা ঘানেম। ‘তোমার মতই আমি এ বিষয়ে অজ্ঞ মা’। বলল সারাসিন ঘানেম। ‘কিন্তু কে সেই আন্তর্জাতিক ব্যক্তিত্ব, যাঁর কাছে বিশ্ব-ইহুদী প্রতিদ্বন্দ্বিতায় হেরেছে বারবার?’ আবার জিজ্ঞাসা ফাতিমা ঘানেমের। ‘থাকতে পারেন মা, সবার খবর আমরা জানি না’। বলল সারাসিন। ‘আপনি ওয়াশিংটনে গেলে আমরা আরও কিছু জানতে পারতাম’। ফাতিমা বলল। ‘ওঁরা জানাবেন। ওঁদের টেলিফোনের অপেক্ষা করতে হবে মা’। বলে উঠে পড়ল সারাসিন ঘানেম। বলল, ‘আম্মা, ভাবি, আমি পুলিশ অফিস থেকে আসি। একজন এডভোকেটের সাথেও আলোচনা করে আসি’। ‘সান ঘানেমকে বলো, তার কোন চিন্তা নেই। আমরা সব রকম চেষ্টা করব। আল্লাহ আছেন’। বলল সান ঘানেমের দাদী, বৃদ্ধা মহিলাটি। ‘সারাসিন, সানকে তার আব্বা সম্পর্কে কিছু বলো না’। বলল সান ঘানেমের মা মরিয়ম মইনি। ‘আচ্ছা, ঠিক আছে। সালাম’। বলে বেরিয়ে গেল সারাসিন ঘানেম।


এডিট ডিলিট প্রিন্ট করুন  অভিযোগ করুন     

গল্পটি পড়েছেন ২১১২৯ জন


এ জাতীয় গল্প

গল্পটির রেটিং দিনঃ-

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now