বাংলা গল্প পড়ার অন্যতম ওয়েবসাইট - গল্প পড়ুন এবং গল্প বলুন
বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ

পিশাচের রাত-০৫

"ভৌতিক গল্প " বিভাগে গল্পটি দিয়েছেন গল্পের ঝুরিয়ান রিয়েন সরকার (০ পয়েন্ট)

X "পিশাচের রাত" লেখক : অনীশ দেব ------------------ পর্ব ৫ জলাপুকুর, দেশপ্রিয় সুইটস, বিশুদার চায়ের দোকান পেরিয়ে রোহণরা মিনিটখানেকের মধ্যে পৌঁছে গেল শিবতলার হর পার্বতী মন্দিরের কাছে। এদিক থেকেই তো গর্জনটা এসেছে বলে মনে হল! অথচ চারদিক সুনসান, চুপচাপ। শুধু আশপাশের দু একটা বাড়ির বারান্দায় কৌতূহলী মুখ দেখা গেল। প্রত্যেকটা মুখই ভয়ে ফ্যাকাসে। মন্দিরের দিকে চোখ পড়ল রোহণের। শান বাঁধানো চত্বরে ঢোকার গ্রিলের দরজাটা হুড়কো দিয়ে আটকানো। তবে মূল মন্দিরটা খানিকটা উঁচুতে হওয়ায় রাস্তা থেকেই ভেতরটা দেখা যায়। দরজা হাট করে খোলা। ঝকঝকে আলোয় দেবতার মূর্তি প্রাণবন্ত, উজ্জ্বল। অথচ পুরুতমশাইকে দেখা যাচ্ছে না। গোটা মন্দিরটা কেমন যেন নিঝুম। কোথা থেকে ঠিক ভেসে এল গর্জনটা? কিছু এলোমেলো খোঁজাখুঁজির পর রোহণের কেমন যেন সন্দেহ হল। পুরুতমশাইকে দেখা যাচ্ছে না কেন? অথচ ঘন্টাখানেক আগে এ পথ দিয়ে টহল দেওয়ার সময় রোহণরা তাকে দেখেছে। তাঁকে জিজ্ঞেস করলে হয়ত গর্জনটার কোনও হদিশ জানা যেতে পারে। রোহণ রিভলভার উঁচিয়ে ধরল। ওর সঙ্গে যে আরও চারজন শাগরেদ ছিল, তারাও নিরস্ত্র নয়। কারও হাতে রড, কারও হাতে ভোজালি। ওরা সবাই তৈরি। খুনীকে হাতের কাছে পেলে ওরা কিছুতেই ছাড় দেবে না। ওরা মন্দিরের গ্রিলের দরজার কাছে পৌঁছে গেল। গ্রিলের গেটের দরজা খুলে ওরা মন্দিরের শান বাঁধানো চত্বরে ঢুকে পড়ল। একই সঙ্গে পুরুতমশাইকেও খুঁজে পেল। মন্দিরের চত্বরে বেশ কয়েকটা কৃষ্ণচূড়া, রাধাচূড়া আর শিমুল গাছ রয়েছে। তাদের গোড়াগুলো সিমেন্ট দিয়ে বাঁধিয়ে বেদির মতো করা। বেশীরভাগ সময় ভক্তরা এখানে এসে নামকীর্তন করে। সেইরকমই একটা বেদির ওপর পুরুতমশায়ের ছিন্নভিন্ন দেহটা শোয়ানো। মাথাটা বেদি ছাড়িয়ে নিচের দিকে নেমে গেছে। হাঁ করা মুখ দিয়ে ফোঁটা ফোঁটা রক্ত গড়িয়ে পড়ছে। গোটা বেদিটা রক্তে মাখামাখি। রক্তের দাগ গড়িয়ে নেমে এসেছে নীচে। শান বাঁধানো চত্বরে রক্তের ধারা তৈরি হয়ে গেছে। রক্তের ছাপ মন্দিরের নানা জায়গায়, সিঁড়িতে এমনকি ভেতরেও। রোহণের শিরদাঁড়া বেয়ে ঠাণ্ডা স্রোত নেমে গেল। এরকম দুঃসাহসী খুনী! দেবতার সামনে খুন করতেও ভয় পায় না! খুনী আশেপাশে কোথাও লুকিয়ে নেই তো! রোহণরা মন্দিরের প্রতিটি জায়গা তন্নতন্ন করে খুঁজে দেখল। ওদের বুকের ভেতরটা ঢিবঢিব করছিল, একইসঙ্গে রোহণের প্রচণ্ড রাগও হচ্ছিল। এত চেষ্টা করেও খুনটাকে ওরা ঠেকাতে পারল না! মন্দিরের ভেতর অবহেলায় পড়ে থাকা পঞ্চ প্রদীপটা রোহণদের নজরে পড়েছিল। সেটা হাতে নিয়ে ভাল করে দেখল রোহণ। প্রদীপের তেলের গায়ে কয়েক গোছা লোম আটকে রয়েছে। ভাল করে খুঁটিয়ে দেখে বুঝল, কয়েকটা লোম আধপোড়া। তবে কি পঞ্চপ্রদীপের আগুনে খুনীর গায়ের লোম পুড়ে গেছে! পুরুতমশায়ের সাথে খুনীর কি ধস্তাধস্তি হয়েছে? ঠিক তখনিই রোহণের এক শাগরেদ নান্টু ঝুঁকে পড়ে মেঝে থেকে কি কুড়িয়ে নিল। রোহণকে ডেকে বলল, " এগুলো কি দেখো তো রোহণদা?" রোহণ কাছে এসে ভাল করে দেখল। মটরদানার মতো গোল গোল তিনটে বিচি। সেগুলোয় আবার ফুটো করা....বোধহয় মালা গাঁথা ছিল। খুলে পড়ে গেছে। রোহণ বিচিগুলো নিয়ে পকেটে রাখল। ওর কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়ল। মন্দিরের ভেতরেও অল্পবিস্তর রক্তের ছাপ ছিল। তবে সেগুলো কোনটাই হাত বা পায়ের ছাপ বলে স্পষ্ট চেনা যায় না। অনেক খুঁজেও রোহণরা খুনীর কোনও চিহ্ন পেল না। কেউ কোথাও নেই। মন্দিরের পেছনে খানিকটা পোড়ো জমি। ঝোপঝাড় আর কাঁটাঝোপে ভরা। খুনী হয়ত সেদিক দিয়ে সরে পড়েছে। হতাশ হয়ে রোহণরা মন্দিরের বাইরে বেরিয়ে এল। দেখল কয়েকজন কৌতূহলী মানুষ সাহস করে বাইরে বেরিয়ে এসেছে। তাদেরই একজন রোহণের কাছে এগিয়ে এসে জিজ্ঞেস করল, " কি হয়েছে রোহণ? গর্জনটা কিসের, কিছু বুঝতে পারলে?" রোহণ ক্লান্তভাবে মাথা নেড়ে " না" বলল। তারপর বলল, " পুরুতমশাই খুন হয়েছেন ।আমরা ফাঁড়িতে খবর দিতে যাচ্ছি।" রোহণের বাড়ি থেকে সাইকেল নিয়ে রোহণ আর ছোটকু থানার দিকে রওনা দিল। যেতে যেতে ছোটকু বলল, " বস, আজ হেভি প্রেস্টিজে লাগল মাইরি। আমাদের এরিয়ায় নাকের ডগা দিয়ে খুন করে মার্ডারার হাওয়া হয়ে গেল! রোহণ ধীরে ধীরে মাথা নাড়ল। ওর ভেতরেও অপমানটা টগবগ করে ফুটছিল। স্কুলের লাগোয়া এক অপরূপ বাগানে হরিহরবাবু দাঁড়িয়ে ছিলেন। বাগানে ঝকঝকে সবুজ সব ফুলের গাছ। তাতে ফুটে রয়েছে নানা রঙিন ফুল। সেই রঙিন ফুলের মেলার মাঝে আরও এক ঝাঁক রঙিন ফুল ছোটাছুটি করে খেলছিল....একঝাঁক ছেলেমেয়ে। ওরা এলোমেলো ভাবে ছোটাছুটি করছে। হৈ চৈ কলরবে বাগানটা একেবারে মাতিয়ে রেখেছে। বাগানের একটা বেদিতে বসে মুগ্ধ চোখে ওদের দেখছিলেন হরিহরবাবু। তাঁর নিজের কোনও ছেলেমেয়ে নেই। কিন্তু সেজন্য তাঁর কোনও দু:খ নেই। এই ছাত্রছাত্রীরাই তাঁর ছেলেমেয়ে। বিকেলের রোদ মরে এসেছিল; কিন্তু সন্ধ্যা তখনও গাঢ় হয়নি। হরিহরবাবু দেখলেন, দূরে, পশ্চিম দিগন্তে তালগাছের সারির ফাঁক দিয়ে চাঁদ উঁকি দিচ্ছে। পূর্ণিমার চাঁদ। ছোটাছুটি করা ছেলেমেয়ের দলও সেই চাঁদ দেখতে পেল। কি যে হল, হঠাৎই ওরা খেলাধুলো ছেড়ে শান্ত হয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল। সবাই একসঙ্গে তাকাল পূর্ণিমার চাঁদের দিকে। হরিহরবাবু বেদি ছেড়ে উঠে পড়লেন। ওরা কেন অমন হাঁ করে চাঁদ দেখছে, সেটা বুঝতে চেষ্টা করলেন। হরিহরবাবু ওদের নিষ্পাপ মুখগুলো দেখছিলেন। না, এরা ফুল নয়....ফুলের চেয়েও বেশী কিছু। ছোটবেলার মতো দারুণ জিনিস আর হয় না! আর ঠিক তখনিই একটা ভয়ঙ্কর ঘটতে লাগল। ছেলেমেয়েগুলোর মুখ বদলে যেতে শুরু করল। নিষ্পাপ মুখগুলো পালটে জন্তুর চেহারা নিল। চোয়াল লম্বাটে হয়ে ঝুলে পড়ল। সারি সারি ধারাল দাঁত তৈরি হয়ে গেল সেখানে। হাতে-পায়ে-ঘাড়ে লোম গজিয়ে উঠল। কানের ওপর দিকটা ছুঁচালো হয়ে উঠল। তারপর ওরা সমস্বরে এক দীর্ঘ গর্জন তুলে আকাশ বাতাস কাঁপিয়ে দিল। হরিহরবাবু ভয়ে কাঁপছিলেন আর কুলকুল করে ঘামছিলেন। চিৎকার শেষ করে ছেলেমেয়েগুলো হরিহরবাবুর দিকে ঘুরে দাঁড়াল। এক বিচিত্র পাশবিক গর্জন তুলে ওরা এগিয়ে আসতে লাগল হরিহরবাবুর দিকে। হরিহরবাবু বাঁশপাতার মতো কাঁপছেন আর মৃত্যুর প্রহর গুনছেন। ......ঠিক এইসময় তাঁর মুখটা ভেঙে গেল। উফ! কি বিশ্রী স্বপ্ন! সারা শরীর ঘামে ভেজা। বিছানার চাদরটাও ভিজে গেছে। অবসন্ন চোখে দেওয়াল ঘড়ির দিকে তাকালেন। সন্ধ্যে ছটা। ঠিক তখনিই তিনি তাঁর স্ত্রীকে দেখতে পেলেন। তাঁর মাথার কাছটিতে দাঁড়িয়ে। মুখে কৌতুকের হাসি। স্ত্রী বললেন, " সেই তখন থেকে ডাকছি।।ওরা সব পড়তে এসে গেছে।" ধড়মড় করে উঠে বসলেন হরিহরবাবু। দেওয়ালে ঝোলান মা কালীর ফটোটার দিকে তাকিয়ে হাতজোড় করে বিড়বিড় করলেন, " মা, মা গো!" " ঘুমের মধ্যে অমন গোঙাচ্ছিলে কেন? তোমায় কি বোবায় ধরেছিল?" "কে জানে!" বিছানা থেকে নেমে পড়লেন হরিহরবাবু, " আসলে একটা খুব বাজে স্বপ্ন দেখছিলাম। ভয়ঙ্কর দুঃস্বপ্ন। " " তোমার তো আবার অল্পেতেই ভয়", হরিহরবাবুর স্ত্রী হাসলেন, " শরীর ভাল না লাগলে আজ আর পড়াতে হবে না।" প্রস্তাবটাকে আমলই দিলেন না হরিহরবাবু। কোচিং ক্লাস কামাই করা তিনি একেবারেই পছন্দ করেন না। পোশাক পালটে তিনি বাইরের ঘরে এলেন। চিকু, প্রিয়াঙ্কা, কৌশিকের দল হাজির হয়ে গেছে। ওদের দিকে তাকাতেই কিছুক্ষণ আগে দেখা দুঃস্বপ্নটার কথা মনে পড়ে গেল হরিহরবাবুর। সসঙ্কোচে হেসে বললেন, " দুপুরের ঘুমটা একটু লম্বা হয়ে গেছে...." চিকু হাঁ করে স্যারকে দেখছিল। ওর শরীরের ভেতর দিয়ে বরফকুঁচির স্রোত বইতে শুরু করেছে। ওর মাথা ঝিমঝিম করছিল। চোখের দৃষ্টি ঝাপসা হয়ে আসছিল। চিকু টলে পড়ে যাচ্ছিল। কোনওরকমে পাশে বসা প্রিয়াঙ্কাকে ধরে নিজেকে সামলে নিল। প্রিয়াঙ্কা টের পেল, চিকুর হাত বরফের মতো ঠাণ্ডা। ও অবাক চোখে চিকুর দিকে তাকাল। ঈশারায় জানতে চাইল, "কি হয়েছে?" চিকু চাপা গলায় বলল, " আমি সব বুঝতে পেরে গেছি।" " কি বুঝতে পেরেছ?" চিকু চোখের ঈশারায় হরিহরবাবুকে দেখাল। চিকু ডানহাতের দুটো আঙুল ভাঁজ করে আর দুটো আঙুল টানটান করে রিভলবারের আদল তৈরি করল। তারপর সেই ' রিভলভার' টা স্যারের দিকে তাক করে স্যারকে মিছিমিছি ' গুলি' করল। প্রিয়াঙ্কা কিছু না বুঝতে পেরে ঠোঁট উলটে প্রশ্নের ভঙ্গি করল। চিকু হেসে ফিসফিস করে বলল, " এখন না....পরে। আগে পড়া শেষ হোক। তুমি আমার সঙ্গে থেকো। কাউকে এখন কিচ্ছু বলবে না।।" চিকুর উসখুস ভাবটা হরিহরবাবু লক্ষ্য করছিলেন। তাই বললেন, " চিকু! কিছু বলবি?" চিকু হেসে বলল, " না স্যার!" হরিহরবাবুর কৌতূহলটা চিকুর কাছে বড্ড বাড়াবাড়ি রকম ঠেকল। তাই বলল, " পুরুতমশায়ের মার্ডারটা নিয়ে আলোচনা করছিলাম, স্যার।" বুদ্ধপূর্ণিমার পর মাত্র তিনটে দিন পার হয়েছে। পুরুতমশায়ের হত্যাকান্ড জাঙ্গিকুলের ছোট থেকে বড় সবার ভিত পর্যন্ত নাড়িয়ে দিয়েছে। লোকজনের আলোচনা থেকে স্পষ্ট যে পরের পূর্ণিমায় সবাই দরজা বন্ধ করে যে যার ঘরে ঢুকে বসে থাকবে। কেউ আর অপঘাতে মরতে চাইবে না। চিকুর কথায় কোচিং সরগরম হয়ে উঠল। সবাই পূর্ণিমার খুনগুলো নিয়ে নানা মন্তব্য করতে লাগল। হরিহরবাবু হাত তুলে সবাইকে থামতে নির্দেশ দিলেন। তারপর একটু কেশে নিয়ে বললেন, " শোন, এই খুনগুলো নিয়ে আমিও অনেক ভেবেছি। তোদের তো আগেই বলেছি, এ যেন ভগবান শ্রীকৃষ্ণের নৃসিংহ অবতার। তাছাড়া, যারা মারা গেছে, তাদের সবার নিয়তি ছিল মৃত্যু। তবে জানবি, তাদের আত্মার মৃত্যু হয়নি। আমাদের গীতায় লেখা আছে, আত্মা অবিনাশী, নিত্য, অজ ও অব্যয়। আত্মার জন্মও নেই, মৃত্যুও নেই। আত্মা....." চিকু স্যারের কথাগুলো শুনছিল কিন্তু প্রতিমূহুর্তে ওর হাসি পাচ্ছিল। কারণ ওর রোহনদার কথাগুলো মনে পড়ছিল। বুদ্ধপূর্ণিমারর পরদিন বিকেলে চিকু রোহণের সঙ্গে দেখা করেছিল। অবশ্য দেখা করার জন্য রোহণই ওকে খবর পাঠিয়েছিল। বিশুদার চায়ের দোকানে বসে রোহণ চিকুর সাথে বুদ্ধপূর্ণিমার মার্ডারটা নিয়ে আলোচনা করছিল। তারপর মন্দির থেকে পাওয়া মটরদানার মতো দেখতে সেই তিনটে বিচি রোহণ চিকুকে দেখিয়েছিল। " এগুলো কি বল তো? সকাল থেকে অনেককে দেখিয়েছি। ওরা বলছে....." বিচিগুলো দেখামাত্রই চিনতে পারল চিকু। রুদ্রাক্ষ। রোহণ কথা বলে যাচ্ছিল, " মনে হয় খুনীর সঙ্গে ধস্তাধস্তির সময় পুরুতমশায়ের গলার রুদ্রাক্ষের মালাটা ছিঁড়ে পড়ে গেছে।" চমকে উঠল চিকু। কখখোন না। মন্দিরে ও প্রায়ই যায়। পরীক্ষার আগে তো বেশ ঘনঘন যায়। পুরুতমশাইকে ও বেশ ভাল করে খুঁটিয়ে লক্ষ্য করেছে। তাঁর গলায় কোনও রুদ্রাক্ষের মালা থাকত না। তাঁর গলায় একটা লকেটওয়ালা সোনার চেন পরা থাকত। মৃত্যুর পরেও ওটা ওঁর গলায় ছিল। তা হলে? বিধবা ভদ্রমহিলা খুন হবার পর সবার ধারণা হয়েছিল, খুনী আসলে কোনও মানুষ। আবার তার বাইরের চেহারাটা পশুর মতো হওয়ায় সবার ধারনা হয়েছিল, খুনী আসলে মানুষ এবং পশুর মাঝামাঝি কোনও প্রাণী। তার সঙ্গে পূর্ণিমার সম্পর্কটা জুড়ে দিয়ে কে যেন প্রথম ওয়্যারউলফ বা নেকড়ে- মানুষের কথা বলেছিল। পুরুতমশাই খুনের পর সেই ধারণাটা জোরাল চেহারা পেয়ে গেছে। ওয়্যারউলফ বা নেকড়ে-মানুষ, যে মানুষ প্রতি পূর্ণিমার রাতে হিংস্র অমানুষে বদলে যায়, সে হয়ে যায় আর্ধেক পশু, আর্ধেক মানুষ। পূর্ণিমা কেটে গেলে সে আবার সুস্থ স্বাভাবিক হয়ে যায়। চিকু মনে মনে এরকম একজন অসুস্থ মানুষকে খুঁজে বেড়াচ্ছিল। রুদ্রাক্ষের মালা....রুদ্রাক্ষের মালা....রুদ্রাক্ষের মালা....। একটা সন্দেহের ছায়া তার মনের কোণে উঁকি দিতে শুরু করল। এরপর রোহণ পঞ্চ প্রদীপের কথা তুলল। কারণ, পঞ্চ প্রদীপের গায়ে লোম পাওয়া গেছে। তার মধ্যে কয়েকটা আধপোড়া লোমও ছিল। হয়ত ধস্তাধস্তির সময় খুনীর গায়ের লোম পুড়ে গিয়েছিল। রোহণ আর চিকু খুব উত্তেজিত ভাবে ঘন্টাখানেক আলোচনা চালিয়ে গিয়েছিল নিজেদের মধ্যে। রোহণদা বলছিল, " থানার বড়বাবু বলছিলেন, " এবার কলকাতা থেকে গোয়েন্দাদল আসবে। সঙ্গে ফরেন্সিক এক্সপার্টও আসবে। সে ওরা যা পারে করুক। কিন্তু ওদের আগে আমি যদি অপরাধীকে ধরতে পারতাম তো আমার মনটা ঠান্ডা হোত। " " রোহণদা.... তুমি আমায় দু-চারদিন সময় দাও", চিকু বলল। " কেন রে?" রোহণ জানতে চাইল। " আমার একটা সন্দেহ হচ্ছে।" চিকু বলল। রোহণ অবাক হয়ে চিকুর মুখের দিকে তাকাচ্ছিল। কোচিংয়ে হরিহরবাবুর জ্ঞানগর্ভ ব্যাখ্যা তখনও চলছিল। আর চিকু অবাক হয়ে স্যারকে দেখছিল। হরিহরবাবুর গলায় রুদ্রাক্ষের মালাটা নেই! তাঁর বাঁ গালে, চোখের নীচে, নাকের পাশে তুলো আর স্টিকিং প্লাস্টার লাগানো। হরিহরবাবু পড়াতে আসামাত্রই তাঁর মুখের ব্যান্ডেজ সকলের নজরে পড়েছে। তিতুন, সুকান্ত, প্রদীপ্তরা জিজ্ঞেসও করেছে, " স্যার, গালে কি হয়েছে?" " ওই সামান্য একটু পুড়ে গেছে", উত্তরে হেসে বলেছিলেন হরিহরবাবু। চিকু কোনও কথা বলতে পারেনি। ওর শরীরের ভেতর দিয়ে বরফকুঁচির স্রোত বইতে শুরু করেছে। হরিহরবাবুই কি তাহলে পূর্ণিমার নরপিশাচ? ( ক্রমশ) ------------------


এডিট ডিলিট প্রিন্ট করুন  অভিযোগ করুন     

গল্পটি পড়েছেন ২১১২১ জন


এ জাতীয় গল্প

গল্পটির রেটিং দিনঃ-

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now