বাংলা গল্প পড়ার অন্যতম ওয়েবসাইট - গল্প পড়ুন এবং গল্প বলুন
বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ

পিশাচের রাত-০৪

"ভৌতিক গল্প " বিভাগে গল্পটি দিয়েছেন গল্পের ঝুরিয়ান রিয়েন সরকার (০ পয়েন্ট)

X "পিশাচের রাত" লেখক : অনীশ দেব ----------------- পর্ব ৪ এবারের হৈ চৈ টা বেশ বড়সড় চেহারা নিল। গত পূর্ণিমায় খুন হওয়া মানুষটাকে কেউ চিনত না। এমনকি পুলিশ শত চেষ্টা করেও খুন হওয়া লোকটির আত্মীয় স্বজন কাউকেই খুঁজে পায়নি। কিন্তু মিস্টার ফক্সের ব্যাপারটা একেবারেই আলাদা। তাঁকে সবাই চিনত। সাহেবি পোশাক পরা নিরীহ চেহারার এই মানুষটিকে সবাই পছন্দ করত। আর ছোট বড় সকলের কাছেই ওঁর ম্যাজিকের আকর্ষণ ছিল চুম্বকের চেয়েও বেশী। খুব অল্প সময়ের মধ্যেই সবাই একমত হল যে দু-দুটো খুনই একই লোকের কাজ....অবশ্য খুনীকে যদি আদৌ 'লোক' বলা যায়। জাঙ্গিকুল ফাঁড়ি থেকে বড়বাবু অবিনাশ মাইতি একজন সেপাইকে সঙ্গে নিয়ে একদিন চলে এলেন চিকুদের বাড়ি। প্রথম খুনের ফাইলটা তিনি বন্ধ করে দিয়েছিলেন। কিন্তু দ্বিতীয় খুনটা হবার পর সেই বন্ধ হয়ে যাওয়া ফাইলটা আবার খুলতে হয়েছে তাঁকে। একই সঙ্গে তাঁর কানে এ খবরও পৌঁছেছে যে প্রথম খুনটা চিকু নামের একটা ছেলে নিজের চোখে দেখেছে। তার দু চারদিনের মধ্যেই তিনি হাজির হয়েছেন চিকুদের বাড়িতে। কিন্তু চিকুকে নানান প্রশ্ন করেও তাঁর সমস্যার সমাধান হয় নি। শুধু তিনি চিকুর জবানবন্দী নিজের ফাইলে গেঁথে রেখেছেন। খুনীর পরিচয় নিয়েও নানান জল্পনা কল্পনা আবার নতুন করে শুরু হল। কেউ বলল, খুনী কোনও ক্ষুধার্ত হিংস্র পশু। সঙ্গে সঙ্গে প্রশ্ন উঠল, তাহলে সে মৃতদেহটা ফেলে রেখে চলে গেল কেন? কেউ বলল, খুনী পশুর মতো নৃশংস কোনও মানুষ। তখন কেউ প্রশ্ন করল, তাহলে খুনের মোটিভটা কি? কেউ বলল, খুনি ভিনগ্রহের কোনও হিংস্র প্রাণী। তখন কে যেন জিজ্ঞেস করল, ওর মহাকাশযানটা তাহলে কোথায় নেমেছিল? একটা মহাকাশযান কি সকলের চোখের আড়ালে নামা সম্ভব? হরিহরবাবুর বাংলা কোচিংয়ে গিয়ে চিকুরা এই নিয়ে জোর আলোচনায় মেতে ওঠে। আর এই আলোচনায় চিকুই হচ্ছে মধ্যমণি। কারণ প্রথম খুনটা দেখার সুবাদে ও এখন বিখ্যাত হয়ে উঠেছে। হরিহরবাবু ঘরে এসে ঢুকতেই ওদের চাপা গুঞ্জনটা পলকে থেমে গেল। হরিহরবাবুর বয়স প্রায় ষাটের কাছাকাছি। মাথার চুল সব ধবধবে সাদা, তবে গোঁফ কাঁচাপাকা, লম্বা রোগা চেহারা, গাল সামান্য ভাঙা। টানা টানা দুটো চোখ শান্ত। চোখে সরু মেটাল ফ্রেমের চশমা। ভাঁজ পড়া কপালে চন্দনের ছোট্ট টিপ, গলায় গোলমরিচের দানার মাপের রুদ্রাক্ষের মালা। পাঞ্জাবীর গলার কাছে রুদ্রাক্ষের খানিকটা উঁকি দিচ্ছে। হরিহরবাবু ধার্মিক মানুষ। নিয়মিত ধর্মগ্রন্থ চর্চা তাঁর নেশা। বাংলা পড়াতে পড়াতে প্রায়ই সংস্কৃত সাহিত্যের উদাহরণে চলে যান। তবে চিকুদের কখনোইই একঘেয়ে লাগে না। স্যারের পড়ানোটা এত সুন্দর যে ভীষণ কাছে টানে। হরিহরবাবু মেঝেতে গুছিয়ে বসলেন। তারপর কৌশিককে লক্ষ্য করে বললেন, " কৌশিক, পাখার রেগুলেটরটা এক পয়েন্ট কমিয়ে দে তো, আমার কেমন যেন শীত শীত করছে।" বারকয়েক কাশলেন হরিহরবাবু। ওঁর একটু কাশির ধাত আছে। কৌশিক রেগুলেটর এক পয়েন্ট কমিয়ে জায়গামতো বসে পড়তেই হরিহরবাবু পড়াতে শুরু করলেন। " এবার কিন্তু তোদের গা ঝাড়া দিয়ে বসতে হবে। সামনের বছরটা পেরোলেই বলতে গেলে মাধ্যমিক। রেজাল্ট যেন সবার ভালো হয়। নইলে আমার বদনাম হয়ে যাবে। নে, খাতাপেন নিয়ে সব রেডি হ। আজ আমরা পড়ব ভারতচন্দ্রের ' অন্নপূর্ণা ও ঈশ্বরী পাটনী।' মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্রের সভাকবি ছিলেন ভারতচন্দ্র। তাঁরই অনুরোধে তিনি লিখেছিলেন ' অন্নদামঙ্গল ' কাব্য। এজন্য তিনি মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্রের কাছ থেকে ' রায়গুণাকর' উপাধি পেয়েছিলেন। এই অন্নদামঙ্গল কাব্যেরই একটা অংশ হল ' অন্নপূর্ণা ও ঈশ্বরী পাটনী'। বুঝলি?" চিকুরা সবাই ঘাড় নাড়ল। পড়ানো চলতে লাগল। পড়ানোর ফাঁকে একসময় কাকিমা এসে স্যারকে চা-বিস্কুট দিয়ে গেলেন। আর ওদের জন্য রেখে গেলেন একটা প্লেটে আটটা সিঙাড়া। যাবার সময় বলে গেলেন, " তোমরা পড়ার ফাঁকে ফাঁকে খেয়ে নিয়ো কিন্তু। " পড়ানোর সময় যখন প্রায় শেষ হয়ে এসেছে তখন হঠাৎ করেই তিতুন আর প্রদীপ্ত মিস্টার ফক্সের খুন হওয়ার কথাটা তুলল। হরিহরবাবু নমস্কারের ভঙ্গিতে কপালে আঙুল ছোঁয়ালেন; তারপর মন দিয়ে ওদের কাছ থেকে দোলপূর্ণিমার খুনের ঘটনাটার কথা শুনতে লাগলেন। শোনা শেষ হলে তিনি একটু কেশে নিয়ে বললেন, " হ্যাঁ, ব্যাপারটা আমি শুনেছি। তোরা ওসবে মাথা ঘামাস না, বোধহয় কুকুর টুকুরের কাজ।" চিকু আর থাকতে পারল না। প্রতিবাদের গলায় বলল, " না স্যার, কুকুরের কাজ নয়। ঐ হিংস্র জানোয়ারটাকে আমি নিজের চোখে দেখেছি।" হরিহরবাবু আগ্রহ নিয়ে চিকুর অভিজ্ঞতার কথা শুনতে চাইলেন। তারপর বললেন, " আগেই কিছু কিছু কথা আমার কানে এসেছিল। এখন সেটা স্পষ্ট হল। কিন্তু জানোয়ারটা যে কি, তা ঠিক বোঝা যাচ্ছে না।" " অনেকটা মানুষের মতো স্যার।" চিকু উত্তেজিত ভাবে বলল। " মানুষের মতো! " " হ্যাঁ স্যার। তবে মাপে অনেক বড়....গায়েও নিশ্চয় অনেক জোর হবে। হাতের নখগুলো লম্বা লম্বা, বাঁকান। " হরিহরবাবু কেমন যেন বিব্রত হয়ে গেলেন। কিছুক্ষণ কি যেন ভাবলেন। তারপর বললেন, " এ যেন ভগবান শ্রীকৃষ্ণের নৃসিংহ অবতার। ভক্ত প্রহ্লাদকে রক্ষা করতে নৃসিংহ অবতার সেজে ভগবান হিরন্যকশিপুকে নিধন করেছিলেন। যদা যদা হি ধর্মস্য গ্লানি ভবতি ভারত......" সংস্কৃত শ্লোকটা আউড়ে হরিহরবাবু বললেন, " বলা তো যায় না, যে দুজন মারা গেছে তারা হয়ত ভাল লোক ছিল না। তাই ঈশ্বর পশুর রূপ ধরে তাদের নিধন করেছেন।" কথাটা বলে হরিহরবাবু কপালে আঙুল ছোঁয়ালেন। বোধহয় ভগবানকে প্রণাম জানালেন। চিকুর মুখ দেখে স্পষ্টই বোঝা যাচ্ছিল, স্যারের ব্যাখ্যা ওর পছন্দ হয়নি। ওরা চাপা গলায় নিজেদের মধ্যে আলোচনা করতে লাগল। তারপর বাইরে বেরিয়ে গেল। পরের পূর্ণিমায় আর একটা খুন হতেই ত্রাসের ভয়ঙ্কর ছায়া নেমে এল জাঙ্গিকুলে। নানা গুঞ্জন, আলোচনা আর বিশ্লেষণ থেকে পূর্ণিমার সঙ্গে খুনের সম্পর্কের ছবিটা পরিষ্কার হয়ে গেল। সবাই বলল, পূর্ণিমার রাতেই খুনীর মাথায় খুনের পাগলামি দেখা দেয়। এবারে খুন হলেন একজন বিধবা ভদ্রমহিলা। রাত সাড়ে নয়টার সময় তিনি সাইকেল রিক্সা করে ফিরছিলেন। জাঙ্গিকুলের একমাত্র নার্সিংহোম ' আরোগ্য নিকেতনের' কাছাকাছি এসে রিক্সাওয়ালা দেখতে পায়, পথের ওপর একটা মাঝারি সাইজের গাছের গুঁড়ি আড়াআড়িভাবে পড়ে আছে। রিক্সাওয়ালা বেশ অবাক হয়ে যায়। কাঁচা রাস্তায় গাছের গুঁড়ি ফেলে কে আর ডাকাতির চেষ্টা করবে? সাইকেল রিক্সা থামিয়ে ক'পয়সাই বা পাওয়া যাবে! এইসব কথা আপনমনে বিড়বিড় করতে করতে সে রিক্সা থেকে নেমে পড়ে। তারপর গাছের গুঁড়িটা সরাতে এগিয়ে যায়। ঠিক তখনিই পাশের পোড়ো জমির আগাছার জঙ্গল থেকে একটা পাশবিক গর্জন ভেসে আসে। রিক্সাওয়ালা আর দেরী করেনি। আগের দু-দুটো খুনের কথা তার বেশ মনে আছে। একমাত্র আরোহীকে ফেলে রেখে সে প্রাণপনে ছুট লাগায়। তখনিই গর্জনটা কাছে এগিয়ে আসতে থাকে। আরোহী ভদ্রমহিলার তখন আর কিছু করার ছিল না। পরদিন ভদ্রমহিলার ছিন্নভিন্ন দেহটা বীভৎস অবস্থায় পাওয়া গেল। সেই সঙ্গে পাওয়া গেল সাইকেল রিক্সাটার ধ্বংসাবশেষ। প্রায় পঞ্চাশ তলা একটা বাড়ির ছাদ থেকে সাইকেল রিক্সাটাকে আছড়ে ফেললে সেটার যেরকম অবস্থা হতো, কেউ স্রেফ গায়ের জোরে সাইকেল রিক্সাটার সেই হাল করেছে। যেন রাগে আক্রোশে অন্ধ হয়ে কোনও ক্ষিপ্ত জানোয়ার সাইকেলরিকশাটাকে চূর্ণবিচূর্ণ করার চেষ্টা করেছে। এই খুনটার পর খুনীর পরিচয় নিয়ে নতুন একটা সমস্যা দেখা দিল। খুনী কি কোনও পশু না কি মানুষ? এতদিন পর্যন্ত অনেকেরই ধারণা ছিল খুনী কোনও শক্তিশালী পশু। কিন্তু পশু কি বুদ্ধি খাটিয়ে পথের মাঝে গাছের গুঁড়ি ফেলে রাখতে পারে? তাহলে খুনী নিশ্চয় পশুর আড়ালে কোনও মানুষ। সুতরাং পূর্ণিমার সঙ্গে খুনের সম্পর্কটা সকলে মেনে নিলেও খুনীর পরিচয় নিয়ে তর্ক বিতর্ক চলতেই লাগল। থানার বড়বাবু বেশ ফাঁপরে পড়লেন। মৃতদেহ নিয়ে নিয়মমাফিক দায় দায়িত্ব পালন করার পর আর কিছু করার আছে কিনা সেটাই ভাবছিলেন। তিনি বেশ বুঝতে পারছেন এই খুনের তদন্তের ফলাফল হবে ঠিক আগের খুন দুটোর মতোই। রোহণরা প্রায় খেপে উঠল। কিছু একটা করার জন্য ওরা অস্থির ভাবে ছটফট করতে লাগল। এলাকার লোককে সতর্ক করার প্রথম ধাপ হিসেবে ওরা মাইক নিয়ে প্রচার শুরু করল। সাইকেল রিকশায় ব্যাটারি আর মাইক লাগিয়ে রোহণদের দলের দু চারজন পাড়ায় ঘুরতে লাগল। রোহণদের ঘোষণা শুনতে শুনতে চিকুর মনে হল, ভোট এসে গেছে। তবে মাইকে ঘোষণা কে করছে কে জানে। সবগুলোই ইংরেজি 'এস' অক্ষরের মতো শুনতে লাগছে। তবে রোহণদের দলের বেশীরভাগই ' স্যামবাজারের সসীবাবু'। মাইকে তখন ঘোষণা চলছে: " পূর্ণিমার রাতে সন্ধ্যের পর সবাই সাবধানে থাকবেন। একা একা রাস্তায় বেরোবেন না। বিপদ হতে পারে। .... পল্লিবাসীগন, আপনারা জানেন গত তিন-তিনটে পূর্ণিমায় আমাদের এলাকায় তিন-তিনটে খুন হয়ে গেছে। তাই আপনাদের সাবধান করে বলছি, আগামী পূর্ণিমায় সবাই সাবধানে থাকবেন। রাস্তায় কেউ বেরোবেন না। তাহলে বিপদ হতে পারে। ......পল্লীবাসীগন, আপনারা জানেন......" শুধু যে মাইকে প্রচার তাই নয়, রোহণরা ঠিক করল, আগামী পূর্ণিমায় ওরা রীতিমতো আর্মস নিয়ে রাস্তায় টহল দেবে। সে কথা চিকু জানতে পারল ছোটকুর কাছে। ছোটকু তখন যথারীতি বিশুদার চায়ের দোকানে বসে আড্ডা দিচ্ছে। চিকুর সাথে কথা বলতে বলতে ছোটকু হঠাৎ বিশুদার দিকে তাকিয়ে মন্তব্য করল, " বিশুদা, পরের পূর্ণিমায় তুমি আর দোকানে একা থেকো না। কারোর পাকা বাড়িতে শেল্টার নিয়ো। এ খুনীকে বিশ্বাস নেই।" উত্তরে বিশুদা একগাল হেসে বলল, " আমার কি আছে যে আমায় কেউ খুন করবে? আমাকে যমেও নেবে না।" কিন্তু পূর্ণিমা যতই এগিয়ে আসতে লাগল, ততই বিশুদার সাহস কমতে লাগল। শুধু বিশুদা কেন, জাঙ্গিকুলের প্রায় সকলেই ভাবতে লাগল, এবার কার পালা?" সুতরাং পূর্ণিমার দিন সন্ধ্যে হতে না হতেই রাস্তায় লোকজন কমে গেল। সময়টা গ্রীষ্মকাল হলেও সন্ধে সাতটা-সাড়ে সাতটা বাজতে না বাজতেই দোকানপাটের ঝাঁপ পড়েছিল ঝটাপট। ফলে রাত আটটার সময়তেই মনে হল যেন রাত বারোটা বেজে গেছে। ব্যতিক্রম ছিল শুধু শিবতলার হর-পার্বতীর মন্দিরটা। আজ বুদ্ধপূর্ণিমা। আকাশের চাঁদ বুদ্ধের মতোই যেন শান্ত, ধ্যানে মগ্ন। তবুও মনে হল, সে যেন ভয়ঙ্কর কোনও কিছুর জন্য অপেক্ষা করছে। হরপার্বতীর মন্দিরে ঘন্টা বাজছিল। চারপাশে বহুদূর পর্যন্ত আর কোনও শব্দ না থাকায় সেই ঘন্টার শব্দের রেশ অনেকক্ষণ পর্যন্ত কানে লেগে রইল। মন্দিরের ভেতর পুরুতমশাই বসে পূজো করছিলেন। অথচ পূজো দেখার জন্য আজ আর কেউ বসে নেই। ভয় এমনই জিনিস। দেবতার চেয়েও ভয়কে বেশী সমীহ করে মানুষ। আজ তাহলে কে-ই বা প্রসাদ নেবে, কে-ই বা নেবে শান্তির জল! পুরুতমশাই ঠিক খেয়াল করেন নি। তিনি দেবতার আরতিতে ব্যস্ত ছিলেন। একজন ভক্ত মন্দিরের মসৃণ শ্বেতপাথরের ওপর বসে আছে। দু-চোখে তার মুগ্ধ দৃষ্টি। ভক্তির আবেগে চোখের কোল বেয়ে নেমেছে জলের ধারা। দেবতার দিকে তাকিয়ে আপনমনে বিড়বিড় করে কি যেন বলছিল সে! পুজো শেষ করে পুরুতমশাই পেছন ফিরতেই তাকে দেখতে পেলেন। অবাক হয়ে গেলেন তিনি। আজ মন্দিরের বারান্দা, শান বাঁধানো চাতাল সব খাঁ খাঁ করছে। অথচ অন্যান্য দিন কত ভক্ত সেখানে ভিড় করে থাকে। পঞ্চ প্রদীপ নিয়ে এই সাহসী ভক্তের কাছে এলেন পুরুতমশাই। ভক্তটি উঠে দাঁড়িয়ে প্রদীপশিখার তাপ মাথায় নিল। পুরুত মশাই বললেন, " এ কি আপনি! আজ কেউ আসেনি....অথচ আপনি এসেছেন!...হাসলেন পুরুতমশাই, " আপনার কি ভয়ডর নেই?" উত্তরে ভক্ত স্মিত হেসে বলল, " আমার কাছে ভয়ের চেয়ে ভগবানের টান বেশী। মুক্তির আশায় আমি ক্ষ্যাপা কুকুরের মতো এক মন্দির থেকে আর এক মন্দিরে ছুটে বেড়াই....কিন্তু মুক্তি কি সহজে পাওয়া যায়! আমরা সবাই তো মুক্তির আশাতেই বসে আছি।" পুরুতমশাইকে পাশ কাটিয়ে ভক্ত দেবতার মূর্তির দিকে দু'পা এগিয়ে গেল। মেঝেয় হাঁটু মুড়ে বসে পড়ল। তারপর গড় হয়ে প্রণাম করে আবেগভরা গলায় বলে উঠল, " আমায় মুক্তি দাও ভগবান। এই অভিশপ্ত জীবন থেকে আমায় মুক্তি দাও।" পুরুতমশাই খানিকটা করুণার চোখে এই কষ্ট পাওয়া ভক্তকে দেখছিলেন। ভাবছিলেন, এর জীবন অভিশপ্ত কেন! আর প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই তাঁর প্রশ্নের উত্তর পেয়ে গেলেন। ভক্ত মানুষটি তখনো গড় হয়ে প্রণামের ভঙ্গিতে ঝুঁকে ভগবানকে ডাকছিল। সেই অবস্থাতেই তার শরীরটা ফুলতে শুরু করল। আর তার মুখ দিয়ে বেরিয়ে আসতে লাগল পশুর গোঙানি। কয়েক সেকেন্ড পর সেই মানুষটা....অথবা অমানুষটা সোজা হয়ে দাঁড়াল....ঘুরে তাকাল পুরুতমশাইয়ের দিকে। পঞ্চ প্রদীপ হাতে নিয়ে হতভম্ব পুরুতমশাই এই বদলে যাওয়া ভক্তকে দেখছিলেন। কি ভয়ঙ্কর বীভৎস চেহারা। ঘন কালো লোমে ঢাকা কোনও আদিম মানুষ যেন! হিংস্র চোয়াল পশুর মতো লম্বাটে। দু-পাটি ধারাল দাঁত আলো পড়ে ঝকঝক করছে। দাঁত থেকে সুতোর মতো সরু হয়ে লালা ঝরে পড়ছে। অমানুষটা সামান্য কুঁজো হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। হাঁটু দুটো সামান্য ভাঁজ হয়ে থাকায় পা দুটো টানটান সোজা হতে পারছে না। দুটো লোমশ হাত দুদিকে ছড়ানো। হাতের আঙুল বাঁকান, নখও একইরকম। প্রাণীটা পুরুতমশাইয়ের দিকে তাকিয়ে ছিল। দুটো হলদে-সবুজ চোখ। নিশাচর পশুর মতো জ্বলজ্বল করছে। অথচ তাতে মানুষের মতো দৃষ্টি। পুরুতমশাই বেশ বুঝতে পারছেন, মৃত্যু সামনে এসে দাঁড়িয়েছে। অপেক্ষা করছে। তাই তিনি আর অপেক্ষা করতে চাইলেন না। অমানুষটাকে অবাক করে দিয়ে তার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়লেন দুঃসাহসী পুরুতমশাই। জ্বলন্ত পঞ্চপ্রদীপটা ওটার মুখে চেপে ধরে গর্জে উঠলেন, " শয়তান!" বীভৎস রক্ত হিম করা গর্জন করে উঠল অমানুষটা। নাকে এল লোম পোড়া আর চামড়া পোড়া কটু গন্ধ। পুরুতমশাই তখন পাগলের মতো ধ্বস্তাধস্তি করছিলেন আর চিৎকার করে বলছিলেন, " তুই পাপী! তুই ছদ্মবেশী পাপী! ভগবান তোর বিনাশ করবে!" অমানুষটা বোধহয় কথা বলতে চাইল; কিন্তু তার মুখ দিয়ে শুধুই পাশবিক গর্জন বেরিয়ে এল। এক ঝটকায় পুরুতমশাইয়ের দেহটা ছিটকে ফেলল সে শ্বেতপাথরের দেওয়ালে। পিতলের পঞ্চপ্রদীপ দেওয়ালে ঠোক্কর খেয়ে আছড়ে পড়ল মেঝেয়। ঠংঠং করে ধাতব শব্দ হল। সঙ্গে সঙ্গে শোনা গেল একটা ধাতব শব্দ। পুরুতমশায়ের ভারী দেহটা আছড়ে পড়েছে মেঝেয়। যন্ত্রণায় গজরাতে গজরাতে অমানুষটা পুরুতমশায়ের দেহটার কাছে এগিয়ে এল। একটু ঝুঁকে পড়ে অবলীলায় তুলে নিল নিথর দেহটা। তারপর পশুর মতো ক্ষিপ্রতায় সিঁড়ি টপকে মন্দিরের শান বাঁধানো চত্বরে লাফিয়ে পড়ল। অমানুষটা একবার তাকাল রাতের আকাশের দিকে। তাকাল পূর্ণিমার চাঁদের দিকে। তারপর এক আকুল দীর্ঘ গর্জনে আকাশ বাতাস কাঁপিয়ে দিল। জাঙ্গিকুলের অনেকেই শুনতে পেল সেই গর্জন। রোহণরাও শুনতে পেল। ওরা তখন রাজবাড়ির কাছাকাছি ছিল। গর্জনটা শুনতে পেয়েই তারা শব্দ লক্ষ্য করে ছুটতে লাগল। ছুটতে ছুটতেই রোহণ কোমর থেকে পিস্তল বের করে নিল। ( ক্রমশ) -----------------


এডিট ডিলিট প্রিন্ট করুন  অভিযোগ করুন     

গল্পটি পড়েছেন ২১১১৭ জন


এ জাতীয় গল্প

গল্পটির রেটিং দিনঃ-

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now