বাংলা গল্প পড়ার অন্যতম ওয়েবসাইট - গল্প পড়ুন এবং গল্প বলুন
বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ

পিশাচের রাত-০৩

"ভৌতিক গল্প " বিভাগে গল্পটি দিয়েছেন গল্পের ঝুরিয়ান রিয়েন সরকার (০ পয়েন্ট)

X "পিশাচের রাত" লেখক : অনীশ দেব ------------------ ৩ য় পর্ব নাটোর মোড়ের কাছে মিস্টার ফক্স খেলা দেখাচ্ছিলেন। পরনে একটা শতচ্ছিন্ন কালো রঙের কোট। জায়গায় জায়গায় রঙিন কাপড়ের তালি মারা। কোটের ওপর ময়লার আস্তরণ। ফলে ঝকঝকে রোদে কোটটা চকচক করছে। মিস্টার ফক্সের বয়স কত কেউ জানে না। চিকু ছোটবেলা থেকেই দেখছে, মিস্টার ফক্স রাস্তায় রাস্তায় ভানুমতীর খেলা দেখান। মিস্টার ফক্সের মাথায় কালো হ্যাট। বয়সের ভাঁজ পড়া মুখে পাউডার মাখা, চোখে সুর্মার টান, ঠোঁটে লিপস্টিক। মিস্টার ফক্স একটা ছোট মাপের পিয়ানো একর্ডিয়ান বাজাচ্ছেন, আর সেই তালে তালে মাথা নাড়ছেন। তাঁর সামনে একটা বিশাল ঢোলা হাফ প্যান্ট পড়া একটা ছেলে অনবরত ডিগবাজির কসরত দেখাচ্ছে। ছেলেটির নাম মাস্টার পটল। একর্ডিয়ান বাজাতে বাজাতে মিস্টার ফক্স হাঁক পেড়ে ডাকছিলেন, " ওয়েলকাম লেডিজ এন্ড জেন্টলম্যান, দেখে যান, মিস্টার ফক্সের শো। মিস্টার ফক্স....দ্য গ্রেট ম্যাজিশিয়ান। জাদুসম্রাট পি সি সরকারের ছাত্র মিস্টার ফক্স। এখন আপনাদের সামনে ডিগবাজিরর খেলা দেখাচ্ছে মাস্টার পটল। চলে আসুন.... দেখে যান...দ্য গ্রেট শো অব মাস্টার ফক্স।" অনেকে বলে, মিস্টার ফক্সের মাথায় ছিট আছে। আর মাস্টার পটল তো হাবাগোবা আধপাগল। কথাটা সত্যি বলে মনে হয় চিকুর। নইলে দোলের দিন সকালে কেউ ভানুমতীর খেলা দেখাতে বেরোয়? আজ দোল। পথে, ঘাটে, অলিতে গলিতে চলছে রঙ খেলা। বন্ধুদের সঙ্গে চিকুও বেরিয়েছে রঙ খেলতে। নাটোর মোড়ের কাছে এসে দেখে, দোলের দিনও মিস্টার ফক্সের 'শো' চলছে। মাস্টার পটল প্রাণপনে ডিগবাজি খেয়ে চলেছে। মাস্টার পটলের বয়স আঠারো কি ঊনিশ। গোলগাল মুখে বোঁচা নাক, চোখজোড়া চিনেম্যানদের মতো। আর সবচেয়ে আশ্চর্য, ওর মাথার চুলের ছাঁট। ন্যাড়া মাথায় এক এক জায়গায় উলের বলের মতো থোকা থোকা চুল। মিস্টার ফক্স আর মাস্টার পটলের গায়ে অনেকে রঙ দিচ্ছে, রঙভরা বেলুন ছুঁড়ে মারছে কিন্তু ওঁদের কোনওদিকে ভ্রুক্ষেপ নেই। " আসুন লেডিজ এন্ড জেন্টলম্যান, দ্য ইউনিক শো-ম্যান মিস্টার ফক্স, আর তার ব্রিলিয়ান্ট স্টুডেন্ট মাস্টার পটল, ওঁদের ইউনিক শো দেখে যান। হোলির স্পেশাল এট্রাকশান....আসুন, আসুন।" আশেপাশে লেডিজ খুব একটা ছিল না। বারো থেকে চোদ্দ বছর বয়সের রংমাখা ন্যাড়া মাথা বালক বালিকারা মাস্টার পটলের ডিগবাজি খাওয়া দেখছিল। আর থেকে থেকে হেসে উঠছিল, এ ওর গায়ে ঢলে পড়ছিল। মাস্টার পটলের ডিগবাজি খাওয়া শেষ হলেই মিস্টার ফক্স তাঁর বিচিত্র খেলা দেখান শুরু করেন। তাসের হাতসাফাই, চার পাঁচটা পিংপং বল লোফালুফি, পকেট থেকে অনন্ত রুমালের চেন বের করা, জ্যান্ত সাপ জল দিয়ে গিলে নিয়ে আবার উগরে দেওয়া....এরকম কত কি! পালা করে মিস্টার ফক্স আর মাস্টার পটলের খেলা চলতে থাকে। ফাঁকে ফাঁকে মিস্টার ফক্স ভীড় করে দাঁড়ান মানুষজনের উদ্দেশ্যে বলতে থাকেন, " আমার খেলা দেখে খুশী হয়ে যদি কেউ কিছু বখশিশ দিতে ইচ্ছে করেন তো দিন। পুওর ম্যান। প্লিজ হেল্প।" বাড়ির জানলায়, বারান্দায় কিংবা ছাদে মেয়েদের ভিড়। সেদিকে হাত দেখিয়ে মিস্টার ফক্স বলে ওঠেন, " মা জননীরা, একজন আর্টিস্টকে হেল্প করুন। আমি যাদুসম্রাট পি সি সরকারের ছাত্র মিস্টার ফক্স। আপনারা আমার মাদার এবং সিস্টার। প্লিজ হেল্প।" মিস্টার ফক্সের সামনে টুং টাং করে পয়সা পড়ছিল। আর মাস্টার পটল " থ্যাঙ্ক ইউ, থ্যাঙ্ক ইউ" বলে সেগুলো কুড়িয়ে নিচ্ছিল। আর মিস্টার ফক্স টুপি খুলে খুলে সাহেবি কায়দায় সবাইকে অভিবাদন জানাচ্ছিলেন। দোলের দিন মিস্টার ফক্সের এই খেলা সবাই উপভোগ করছিল। মিস্টার ফক্সের ভোজবাজির খেল এতই আকর্ষণীয় যে আগে অনেকবার দেখা হলেও বারবার দেখতে ইচ্ছে করে। মাস দুয়েক আগেও মিস্টার ফক্সের সাথে একটা বাদামি রঙের কুকুর থাকত। তার নাম ভুলু। তার গলায় থাকত গাঁদা ফুলের মালা, কপালে তিলক। মিস্টার ফক্সের একর্ডিয়ান বাজানোর সাথে সাথে দু পায়ে ভর দিয়ে মিউজিকের তালে তালে নাচত। সেই ভুলু আর নেই। লরি চাপা পড়ে মারা গেছে। দুপুর একটা বেজে গেলে মিস্টার ফক্স নিজের ঘরে ফিরে যান। স্নান খাওয়া দাওয়া করে আবার বেরোন খেলা দেখাতে। সন্ধ্যার আঁধার নামার আগে পর্যন্ত চলে তাদের খেলা। বর্ষাকাল ছাড়া বছরের সবদিনই তাঁর একই রুটিন। অসুখ বিসুখ না হলে একটি দিনও কামাই নেই। দোলের দিনও বিকেলেও চলল তাঁর খেলা। সঙ্গে মাস্টার পটলের ডিগবাজি। মাস্টার পটলের মাথায় মুখে গোলাপি আবীর। যখন সে দর্শকদের দিকে তাকিয়ে হাসছে, তখন কেমন অদ্ভুত লাগছে। মনে হচ্ছে ভিনগ্রহের কোনও প্রাণী। সকালে যারা রাস্তায় বেরোয়নি, তারাও এখন হাজির। মিস্টার ফক্সের ভানুমতীর খেলা সবাইকে মাতিয়ে রেখেছে। খেলার পালা শেষ হতে হতে সন্ধ্যা নামল। তারপর অন্ধকার। তল্পিতল্পা গুটিয়ে মিস্টার ফক্স আর মাস্টার পটল আমবাগানের পথ ধরল। মিস্টার ফক্সের একটু আধটু নেশা করার অভ্যাস আছে। তাই আমবাগানের ভেতর ঢুকে তিনি একটা বড়সড় গাছের তলায় গুছিয়ে বসলেন। তারপর ম্যাজিকের সরঞ্জামের কালো ঝোলাটা মাস্টার পটলের হাতে দিয়ে বললেন, " তুই যা। রান্নাবান্নার ব্যবস্থা কর গিয়ে। আমি ঘন্টাখানেক পর যাচ্ছি। ও.কে?" অনুগতের মতো ঘাড় নাড়ল মাস্টার পটল। তারপর ম্যাজিকের ঝোলাটা কাঁধে তুলে নিয়ে মাথায় দু'বার হাত বুলিয়ে রওনা দিল আস্তানার দিকে। আস্তানা বলতে রেললাইনের ওপাড়ে একটা ঝুপড়ি। হঠাৎই দোল পূর্ণিমার গোল চাঁদটাকে দেখা গেল ছোট ছোট বাড়ির মাথা ছাড়িয়ে, গাছপালার আড়াল সরিয়ে হাজির হয়ে গেছে আকাশে। দূর থেকে ভেসে আসছে হোলির ঢাক ঢোল করতালের শব্দ। দোলের উৎসব পালন করতে কীর্তনীয়ার দল পথে পথে বেরিয়ে পড়েছে। মিস্টার ফক্স কোটের পকেট থেকে একটা ছোট মাপের বোতল বের করলেন। আমবাগানের চারপাশে চোখ বুলিয়ে দেখলেন, কেউ কোথাও নেই। শুধু দুজন ম্যাজিশিয়ান হাজির এখানে: তিনি আর আকাশে চাঁদ। চাঁদকে মিস্টার ফক্স ম্যাজিশিয়ান বলে মানেন। ছোটবেলায় যখন বাবার কাছে হাতসাফাইয়ের ম্যাজিক শিখতেন, তখন বাবা বলতেন, " চাঁদ হচ্ছে এ ক্লাস ম্যাজিশিয়ান।। সারা মাস ধরে কেমন ছোট বড় হওয়ার খেলা দেখায়। তারপর একদিন কেমন ভ্যানিশ হয়ে যায়। শুধু তাই নয়, এ খেলা সে দেখিয়ে যাচ্ছে লক্ষ লক্ষ বছর ধরে। ভাবা যায়! বোতলের ছিপি খুলতে খুলতে মিস্টার ফক্স চাঁদের দিকে তাকালেন। কিন্তু দেখলেন, চাঁদটা আর নেই! একটা কালো ছায়া চাঁদকে আড়াল করে দিয়েছে। " মিস্টার ফক্স, ভালো আছেন?", কেমন যেন ভাঙা গলায় কালো ছায়াটি জিজ্ঞেস করল। মিস্টার ফক্স একটু অবাক হয়ে গেলেন। বহুদিন ধরে এ এলাকায় তিনি ম্যাজিক দেখান। তাই এলাকার মানুষজনদের মধ্যে অনেককেই চেনেন। কিন্তু কারোর সঙ্গেই খুব একটা আলাপ করেন না। বরং বলা যায়, একটা দূরত্ব রেখে এড়িয়ে চলেন। এখন এই জ্যোৎস্না রাতে এই নির্জন আম বাগানে কেউ একজন এসে তার কুশল জিজ্ঞেস করবে, এটা বেশ অস্বাভাবিক। একটু সময় নিয়ে মিস্টার ফক্স বললেন, " হ্যাঁ, ভালই আছি। কিন্তু আপনি কে?" উত্তরে ছায়াটা চাঁদের দিক থেকে একটু সরে গেল। তখনিই ওটা ছায়া থেকে কায়া হয়ে গেল। জ্যোৎস্নার আলো মানুষটার চোখেমুখে এসে পড়ায় মিস্টার ফক্স তাকে চিনতে পারলেন। এই এলাকারই পরিচিত একজন মানুষ। মিস্টার ফক্স অবাক হয়ে বললেন, " আপনি!" মানুষটা কেমন ধরা গলায় বলল, " আপনাকে একটা ম্যাজিক দেখাতে এসেছি। এ ম্যাজিকের কৌশল আপনিও জানেন না।" মিস্টার ফক্স অবাক চোখে মানুষটাকে দেখতে লাগলেন। তাঁর কেমন যেন ঘোর লেগে গিয়েছিল। তিনি কোনও কথা বলতে পাররছিলেন না। শুধু ভাবছিলেন, ' এই লোকটা কি সত্যিই ম্যাজিশিয়ান? কই, কখনো তো এরকম শোনেননি! তাহলে নিশ্চয় মজা করছে।' " এবার ভাল করে দেখুন..... আমার ম্যাজিক শুরু হচ্ছে।" লোকটি বলল। এবার সত্যি সত্যিই যেন ম্যাজিক শুরু হল! মানুষটা চওড়ায় বাড়তে লাগল। ফলে ওর জামাপ্যান্টের সেলাইগুলো সেই চাপে ফড়ফড় করে ছিঁড়ে যেতে লাগল। জামার বোতামগুলো খই ফোটার মতো ছিটকে গেল এদিকওদিক। সেই সঙ্গে মানুষটার মুখ দিয়ে একটা ভয়ঙ্কর পাশবিক গর্জন বেরিয়ে এল। ম্যাজিক তখনো চলছিল। লোকটা লম্বায় কিছুটা বেড়ে কুঁজো হয়ে ঝুঁকে পড়ল সামনের দিকে....যেন ওর শিরদাঁড়াটা বেঁকে গেল। মুখটা কুকুরের মুখের মতো লম্বাটে হয়ে এগিয়ে এল। চোখ দুটো এতক্ষণ দেখা যায়নি....এবার দেখা গেল....হালকা সবুজ রঙের যেন দুটো মার্বেল....অন্ধকার কোটরে ধ্বক ধ্বক করে জ্বলছে। মানুষটা চোখের সামনে একটা লোমশ জন্তুতে পরিণত হয়ে গেল। তার হাত-পায়ের আঙুলের ডগা থেকে বেরিয়ে এল হিংস্র বাঁকান নখ। কান দুটো ছুঁচাল হয়ে মাথাচাড়া দিল। মুখ হাঁ করতেই দেখা গেল হিংস্র শানিত দাঁতের সারি। তার মধ্যে শ্বদন্ত দুটো মিস্টার ফক্সের হতভম্ব চোখের সামনেই মাপে বড় হতে লাগল। ফুটফুটে জ্যোৎস্নায় এ যেন সত্যিই এক অলৌকিক ম্যাজিক। মানুষটা....অর্থাৎ অমানুষটা শূন্যে একটা হিংস্র কামড় দিয়ে হাঁ বন্ধ করল। ' খটাস ' শব্দ হল। নির্জন রাত সেই শব্দে কেঁপে উঠল। ভয়ঙ্কর নেকড়ে-মানুষটা যখন এক থাবার ঘায়ে মিস্টার ফক্সের চোয়ালের আর্ধেকটা উড়িয়ে দিল তখনো তাঁর দু চোখ অবাক বিস্ময়ে এই নতুন ম্যাজিকটা দেখে চলেছে। একটু পরে মিস্টার ফক্সের ছিন্নভিন্ন মৃতদেহ ফেলে রেখে অমানুষটা যখন অন্ধকারে মিলিয়ে গেল, তখনো মিস্টার ফক্সের ঠেলে বেরিয়ে আসা চোখ জোড়া বিস্ময়ে হতবাক হয়ে তাকিয়ে আছে পূর্ণিমার চাঁদের দিকে। এক ম্যাজিশিয়ান আর এক ম্যাজিশিয়ানকে নিষ্প্রাণ চোখে প্রাণভরে দেখছে। ( ক্রমশ) ------------------


এডিট ডিলিট প্রিন্ট করুন  অভিযোগ করুন     

গল্পটি পড়েছেন ২১১৩৩ জন


এ জাতীয় গল্প

গল্পটির রেটিং দিনঃ-

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now