বাংলা গল্প পড়ার অন্যতম ওয়েবসাইট - গল্প পড়ুন এবং গল্প বলুন
বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ

পিশাচের রাত-০১

"ভৌতিক গল্প " বিভাগে গল্পটি দিয়েছেন গল্পের ঝুরিয়ান রিয়েন সরকার (০ পয়েন্ট)

X "পিশাচের রাত" লেখক : অনীশ দেব ------------------- ১ ম পর্ব শীত চলে যাচ্ছিল। তাই বসন্তও এসে হাজির হয়েছিল দরজায়। কিন্তু প্রকৃতিরর খেয়াল, শীত ফের ঘুরে দাঁড়াল, সঙ্গে নিয়ে এল বর্ষা। ফলে বসন্ত দরজায় দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করতে লাগল। গতকাল সকাল থেকে ঝিরঝিরে বৃষ্টি শুরু হয়েছে। আর তার সঙ্গে তাল মিলিয়ে ফিকে হয়ে আসা শীত একটু একটু করে ফের বাড়তে শুরু করেছে। রাতে শোওয়ার সময় আপনমনে গজগজ করতে করতে চিকুর মা আলমারি খুলে আবার লেপ-কম্বল বের করে ফেলেছেন। " এভাবে শীত চলে গিয়ে আবার ফিরে আসার কোনও মানে হয়?" চিকুর বাবা একটা চেয়ারে হেলান দিয়ে বসে খবরের কাগজ পড়ছিলেন। চিকুর মায়ের কথায় হেসে ফেললেন। বললেন, " হ্যাঁ, ব্যাপারটা খুব বিচ্ছিরি। ওই যে সেদিন আমি অফিস বেরিয়ে গেলাম--তারপর চশমাটা ভুলে ফেলে এসেছি বলে ফিরে এলাম....তাতে চিকুর খুব অসুবিধে হয়ে গিয়েছিল..." চিকু ওয়াকম্যানের হেডফোন কানে লাগিয়ে সবে হিন্দি গান শোনার তোড়জোড় করছিল, বাবার কথায় অনুযোগ করে উঠল, " কি হচ্ছে বাবা!" ব্যাপারটা গত সপ্তাহের। বাবা সকাল দশটা নাগাদ অফিস রওনা হতেই চিকু রবারের বল নিয়ে ঘরের মধ্যে ফুটবল খেলতে শুরু করেছিল। আর মিনিট পাঁচেকের মধ্যেই বাবা আচমকা ফিরে আসায় সে কি কেলেঙ্কারি! কারণ সামান্য জ্বর মতো হওয়ায় ও স্কুলে যাবে না ঠিক করেছিল। বাবা ওর কথায় সায় দেওয়ায় ওর মা শত জেদ করেও ওকে স্কুলে পাঠাতে পারেন নি। এখন মায়ের চেঁচামেচি অগ্রাহ্য করে ও ঘরের মধ্যে ফুটবল প্রাকটিস করছিল। আগামী রবিবার জামতলার তরুণ সঙ্ঘের সঙ্গে ম্যাচ। ম্যাচ তো নয়....একেবারে প্রেস্টিজ ফাইট! তাই...... বাবা কোনওসময় চিকুকে বকাবকি করেন না। চশমা নিতে এসে ওকে ফুটবল খেলতে দেখে বলেছিলেন, " বল খেললেই দেখবি তোর জ্বর সেরে গেছে।" তারপর হেসে চলে গিয়েছিলেন। চিকু তাতে ভীষণ লজ্জা পেয়ে তিনদিন ধরে এমন পড়াশোনা করেছিল, মনে হচ্ছিল যেন ওর মাধ্যমিক পরীক্ষা একেবারে কাছে চলে এসেছে। অথচ ও এখন সবে ক্লাস নাইনে পড়ে। আজ সকালের খবরে চিকু শুনেছে, উষ্ণতা এক ধাক্কায় চার ডিগ্রী নেমে গেছে। সুতরাং ওর হাতকাটা সোয়েটার আর মাফলার আবার আলমারির তাক থেকে বেরিয়ে পড়েছে। সন্ধ্যে ছটার সময় হরিহরবাবুর কোচিংয়ে চিকু বাংলা পড়তে যায়। হরিহরবাবু চিকুদের হাই স্কুলের বাংলার স্যার ছিলেন। বছর দুয়েক হল রিটায়ার করেছেন। বাংলা দারুণ পড়ান, তাই ওঁর কোচিংয়ে ভিড়ও হয় খুব। তাছাড়া, উনি খুব পণ্ডিত মানুষ, নানান বিষয়ে অনেক জানেন। চিকু যখন সাইকেল নিয়ে বেরল, তখন বৃষ্টি পড়ছে কি পড়ছে না। তবে আকাশের এখানে ওখানে বেশ মেঘ জমে রয়েছে। ওর মা চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতে কেবল টিভিতে সিনেমা দেখছিলেন। চিকুকে বেরোতে দেখে বললেন, " এই, ছাতা নিয়ে বেরোবি...." চিকু আবদারের মতো করে বলল, " বৃষ্টি তো পড়ছে না।" " একটু পরেই পড়বে।" বিরক্তভাবে মায়ের ফোল্ডিং ছাতাটা ব্যাগে ভরে নিল চিকু। তারপর সিঁড়ির নীচ থেকে সাইকেলটা বের করে রাস্তায় নেমে পড়ল ও। হরিহরবাবুর কোচিং চিকুদের বাড়ি থেকে সাইকেলে বড়জোর পাঁচ মিনিট। ঘন্টি বাজিয়ে জোরে প্যাডেল করতে শুরু করল চিকু। বৃষ্টি শুরু হবার আগেই ওকে হরিহরবাবুর কোচিংয়ে পৌঁছতে হবে। ছাতা মাথায় দিয়ে সাইকেল চালানো এক ঝকমারি। সরু পিচের রাস্তা ভাঙাচোরা কয়েক বছর ধরেই। তায় দুদিনের বৃষ্টি রাস্তাটাকে আরও বেহাল করে দিয়েছে। রাস্তায় লোকজনও কম। যে কজন চোখে পড়ল, সকলেই মাফলার, সোয়েটার গায়ে বা চাদরমুড়ি দিয়ে হাঁটছে। নাটোর মোড়ের কাছে শ্যমাপদদার তেলেভাজার দোকান পেরিয়ে গেল চিকু। সেখানে বেশ ভিড়। সাইকেলরিকশাগুলো প্যাঁক প্যাঁক করে হর্ন বাজিয়ে রাস্তা পার হচ্ছে। ডানদিকে ঘুরে শিবতলার হর-পার্বতীর মন্দির পেরোতেই চিকু দেখতে পেল, দেশপ্রিয় সুইটসের পাশে বেঞ্চি পেতে রোহনদারা বসে আছে। এ এলাকা রোহনদাদের কথায় চলে। কোথাও কোনও গোলমাল হলে রোহনরা সবার আগে সেখানে ছুটে যায়। পাড়ায় কারোর বিপদ আপদ হলে রোহনরা এক ডাকে হাজির। গত বছর পুজোর সময় সমীর মিত্রদের বাড়িতে ডাকাত পড়েছিল, ওদের বাড়ির কাজের লোক কোনওরকমে পালিয়ে এসে রোহনের বাড়িতে খবর দিয়েছিল। রোহন সঙ্গে সঙ্গে দলবল জুটিয়ে মিত্রদের বাড়িতে হাজির। গুলি-বোমা নিয়ে দু পক্ষে হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের পর দুজন ডাকাত ধরা পড়েছিল, আর তিনজন ডাকাত পালিয়ে গিয়েছিল। আচ্ছা করে গণধোলাই দেওয়ার পর আধমরা ডাকাতদুটোকে পুলিশের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছিল। চিকুকে দেখে রোহণ হাত নাড়ল। চেঁচিয়ে বলল- " কোচিং যাচ্ছিস?" সাইকেল না থামিয়ে চিকু ঘাড় ঘুরিয়ে জবাব দিল, " হ্যাঁ....বাংলা পড়তে।" রোহণ হায়ার সেকেন্ডারি পরীক্ষায় একবার ফেল করার পর আর লেখাপড়া করেনি। ওর বাবার সিমেন্ট -বালি-ইঁটের দোকান আছে, সেখানে মাঝেমাঝে গিয়ে বসে। চিকুর সঙ্গে যখনি কথা হয়, তখনিই লেখাপড়া করতে পারেনি বলে দু:খ করে। চিকুর পিঠ চাপড়ে বলে, " তুই লেখাপড়ায় ফার্স্ট ক্লাস। চালিয়ে যা।" জলাপুকুরের পাড় দিয়ে সাইকেল চালিয়ে যেতে যেতে চিকুর এসব কথা মনে পড়ছিল। পুকুরের অন্ধকার জলে রাস্তার দু চারটে টিমটিমে বালবের আলো পড়ছিল। ব্যাঙের দল ঘ্যাঙর ঘ্যাঙ শব্দে ব্রিগেডের মিটিং শুরু করে দিয়েছে। কোথায় যেন ঘাপটি মেরে লুকিয়ে ছিল তারা। বৃষ্টি শুরু হতেই গোপন আস্তানা ছেড়ে বেরিয়ে চারদিকে শোরগোল ফেলে দিয়েছে। জলাপুকুরের নামটা কেন যে এমন অদ্ভুত তা কেউ জানে না। মাপে প্রকাণ্ড হলে কি হবে, শ্যাওলা আর কচুরিপানায় প্রায় পুরোটাই ঢাকা। পুকুরের দু-কোণে ইঁট-পাথর পেতে লোকে ঘাটের মতো করে নিয়েছে। সেখানেই বাসন মাজা আর অন্যান্য কাজ চলে। জায়গাটা বেশ নির্জন, আর শীতও যেন বেশী। চিকুর হয়ত ভয় ভয় করত কিন্তু ব্যাঙের দল ওকে সাহস যোগাল। ও তাড়াতাড়ি প্যাডেল করতে লাগল। জলাপুকুর পেরিয়েই বিশাল এক আমবাগান। চিকু শুনেছে এককালে এখানে শুধুই আমগাছ ছিল। কিন্তু এখন তারই মাঝে শিমুল, কাঁঠাল, তেঁতুল গাছ গজিয়ে জায়গাটা প্রায় ঝুপসি হয়ে গেছে। তবে জায়গাটার নাম এখনো সেই আমবাগান। গাছ গাছড়ার মধ্য দিয়ে চলে গেছে সরু পায়েচলা পথ। এখন বৃষ্টিতে কাদা কাদা হয়ে আছে। চিকু সাবধানে সাইকেল চালাতে লাগল। সাইকেলের হেডলাইট ওকে পথ দেখিয়ে নিয়ে চলল। আমবাগান পেরিয়ে একটা রাজবাড়ি। তবে বাড়ির যা অবস্থা তাতে এটাকে ভাঙাবাড়ি বলতেও আপত্তি নেই। ভাঙাচোরা দোতলা বাড়িটা প্রকাণ্ড একটা কচ্ছপের মতো মাঠের মাঝখানে মুখ থুবড়ে পড়ে আছে। তবে এখনো রাজার কোনও নাতি বা পুতি বাড়ির কোণের একটেরে একতলার ঘরে বাস করে তাদের পরিবার নিয়ে। তাই একতলার কোণের দিকের ঘরগুলোতে শুধু আলো জ্বলতে দেখা যায়। বাড়িটার নানা জায়গা থেকে বট আর অশ্বত্থের চারা গজিয়ে রয়েছে। সেগুলোর মধ্যে কয়েকটা তো রীতিমতো গাছের চেহারা নিয়েছে। এখন অন্ধকারে সেটা ঠিকমতো বোঝা যাচ্ছে না। তবে মেঘ সরে গিয়ে আকাশে একটা ছোট্ট জানলা তৈরি হয়ে গিয়েছিল। আর সেই জানলা দিয়ে থালার মতো চাঁদটা উঁকি দিতেই চিকুর মনে পড়ে গেল, আজ পূর্ণিমা।। পূর্ণিমার চাঁদের আলোয় রাজবাড়ির ছাদটা অস্পষ্টভাবে চোখে পড়ছিল আর সেইসঙ্গে ছাদ ফুঁড়ে বেরিয়ে আসা গোটা তিন-চারেক বট আর অশ্বত্থ গাছগুলোকেও চেনা যাচ্ছিল। রাজবাড়ির চৌহদ্দি পেরিয়েই বাঁ দিকে একটা সরু গলি ঢুকে গেছে। সেই গলিতেই হরিহরবাবুর ছোট দোতলা বাড়ি । একতলাটা থাকবার মতো হলেও দোতলাটা এখনও ইঁট কাঠ বের করা। বোধহয় টাকার অভাবে সম্পূর্ণ করা যায় নি। বাড়ির লাগোয়া জমিতে দুটো সুপুরি গাছ আর একটা চাঁপা গাছ। সুপুরি গাছ দুটো দেখলেই চিকুর, হরিহরবাবুর পান খাওয়ার নেশার কথাটা মনে পড়ে। বারান্দায় একটা বালব জ্বলছিল। তার আলোয় চিকু দেখল, গ্রিলের গেটের ওপাশে আরও চার পাঁচটা সাইকেল দেওয়ালে ঠেস দিয়ে দাঁড় করানো। সেগুলোর পাশে নিজের সাইকেলটা রেখে বাড়ির ভেতর ঢুকে পড়ল চিকু। কিন্তু পড়ার ঘরটায় ঢুকেই ও বেশ অবাক হয়ে গেল। কৌশিক, প্রিয়াঙ্কা, তিতুন, সুকান্ত আর প্রদীপ্তরা গোল হয়ে বসে তেল মুড়ি খাচ্ছে। সঙ্গে কাঁচা পেঁয়াজের টুকরো আর চানাচুর। ঘরে স্যার নেই। চিকুরা আটজন মিলে স্যারের কাছে বাংলা পড়ে। তবে আজ বোধহয় বৃষ্টি আর শীতের জন্য শ্রাবণী আর উত্তম আসেনি। চিকু ঘরে ঢুকতেই সুকান্ত আর তিতুন সরে গিয়ে ওকে শতরঞ্চিতে বসার জায়গা করে দিল। সুকান্ত বলল, " নে, মুড়ি-চানাচুর খা। আজ স্যারের শরীর ভাল নেই....পড়াবেন না। " প্রদীপ্ত চাপা গলায় বলল, " কাকিমা মুড়ি মেখে খেতে দিলেন।" কাকিমা মানে হরিহরবাবুর স্ত্রী। ওদের সবাইকে খুব ভালোবাসেন। গোলগাল হাসিখুশী চেহারা। প্রায়ই ওদের এটা ওটা খাওয়ান। শতরঞ্চির মাঝখানটায় একটা খবরের কাগজ পাতা--তার ওপর মুড়ির পাহাড়। চিকু শতরঞ্চিতে বসেই মুড়ির দিকে হাত বাড়াল। পরপর দু মুঠো মুড়ি মুখে গুঁজে দিয়ে জড়ানো গলায় বলল, " আমরা কি তাহলে সামনের বুধবার আসব?" প্রিয়াঙ্কা কপাল থেকে চুল সরিয়ে বলল, " কাকিমা তো তাই বললেন।" এমন সময় হরিহরবাবুর স্ত্রী ঘরে এসে ঢুকলেন। চিকুকে দেখে আপনজনের মতো একগাল হেসে বললেন, " চিকু, শুনেছ তো, আজ পড়া হবে না? তোমাদের স্যারের শরীরটা আজ ভাল নেই। জ্বর জ্বর মতো হয়েছে। আগে থাকতে তোমাদের খবরটা দিতে পারলে ভাল হতো। এই বিচ্ছিরি ওয়েদারের মধ্যে এসে শুধু শুধু তোমাদের ফিরে যেতে হল?" " তাতে কি হয়েছে কাকিমা? আমরা পরের বুধবার আসব।" " নাও, এখন মুড়ি চানাচুর খাও। তোমাদের মধ্যে কেউ চা খাবে?" ওরা সবাই মাথা নাড়ল। না খাবে না। হরিহরবাবু বলতেন, " নেশার বশ হবি না কখখোন। পোষ যদি মানতে হয় তো সে শুধু ভগবান আর মহাজনের কাছে। দ্যাখ না, শত চেষ্টা করেও আমি আমার পানের নেশাটা ছাড়তে পারছি না।" সুতরাং ওরা কেউ কেউ ভেতরে ভেতরে চা খাওয়ার ইচ্ছা পোষণ করলেও মুখে 'না' বলল। মুড়ি চানাচুর শেষ করে ওরা কাকিমাকে বলে বেরিয়ে পড়ল। প্রিয়াঙ্কা চিকুকে বলল, " তোমায় 'মোহাব্বতে'র ক্যাসেটটা দেব বলেছিলাম, ওটা আমার সঙ্গে গিয়ে এখন নিয়ে আসতে পারো। আর আমাদের ডিজিটাল সাউন্ড সিস্টেমে একবার শুনেও নিতে পারো....যা দারুণ আওয়াজ না! ফ্যান্টাসটিক! " " চলো। কিন্তু আমাদের টেপ রেকর্ডারটা অর্ডিনারি টু ইন ওয়ান। ওতে খুব একটা ভাল শোনাবে না মনে হয়"। এ ও-কে টাটা করে সাইকেল নিয়ে যে যার পথে ছড়িয়ে গেল। শুধু প্রিয়াঙ্কা আর চিকুর সাইকেল দুটো একই পথ ধরে সমান্তরাল ভাবে চলতে লাগল। প্রিয়াঙ্কাদের বাড়িটা চিকুদের বাড়ির উলটোপথে অনেকটা দূরে। ওদের বাড়ি থেকে রেলস্টেশনটা কাছে। সেখানে আরও বেশ কয়েকটা সুন্দর সুন্দর বাড়ি আছে। ঠিক জলরঙে আঁকা ছবির মতো। চিকু এর আগেও কয়েকবার প্রিয়াঙ্কাদের বাড়ি গেছে। ওদের বাড়ি গেলে কোথা দিয়ে যে সময় কেটে যায়, বোঝাই যায় না। আজ অবশ্য দেরী হলেও চিন্তার কিছু নেই। মা-বাবাও চিন্তা করবেন না। ওঁরা জানেন চিকু এখন বাংলা কোচিংয়ে পড়ছে। অন্ধকার পথ ধরে সাইকেল চালাতে চালাতে চিকু জিজ্ঞেস করল, " এই পথ ধরে একা একা বাড়ি ফিরতে তোমার ভয় করে না?" প্রিয়াঙ্কা শব্দ করে হাসল। বলল, " অন্য দিন করে, আজ করছে না।" ওদের সাইকেলের চাকা ঘুরতে লাগল। বাড়ির দিকে ফেরার সময় রাজবাড়ির কাছাকাছি এসে চিকু প্রথম বিপদের গন্ধ পেল। পরিবেশ আর পরিস্থিতি কেমন যেন অন্যরকম মনে হল ওর কাছে। আর সেইজন্যেই একটা আশঙ্কাও তৈরি হল ওর মনে। সবকিছুই ঠিক আছে, অথচ মনে হচ্ছে যেন কিছু ঠিক নেই। কিন্তু গণ্ডগোলটা যে ঠিক কোথায় সেটাই ও ধরতে পারছিল না। যতটা জোরে পারা যায়, ততটা জোরেই সাইকেল চালাচ্ছিল ও। সেই সঙ্গে ওর ভেতরে উথালপাতাল চলছিল, মনের মধ্যে শুধু একটাই প্রশ্ন হাতড়ে বেড়াচ্ছিল, ' গণ্ডগোলটা ঠিক কোথায়!' চিকুর হাতে ঘড়ি নেই। তবুও আন্দাজ লাগাল, রাত বোধহয় সোয়া নটা কি সাড়ে নয়টা। ইস, এতটা রাত না করলেই হত। বৃষ্টি এখন নেই, আকাশ বেশ পরিষ্কার হয়ে গেছে। পূর্ণিমার চাঁদ উজ্জ্বল চোখে পৃথিবীর দিকে তাকিয়ে রয়েছে। বাতাস বেশ ঠান্ডা। চিকুর সোয়েটার ভেদ করে শীত ঢুকে পড়ছে ভেতরে। আজ রাতে মনে হয় লেপ গায়ে দিতে হবে। রাজবাড়ি পেরিয়ে আমবাগানের কাছাকাছি আসতে গণ্ডগোলটা প্রথম খেয়াল করল চিকু। এই পথ দিয়ে যাওয়ার সময় দু চারটে ব্যাঙের ডাক ওর কানে এসেছিল। বোধহয় বৃষ্টির জমে থাকা জলে বা রাস্তার পাশের নালায় কয়েকটা ব্যাঙ আশ্রয় নিয়েছিল। কিন্তু এখন ওরা আর কেউ ডাকছে না। কেউ যেন ভয় দেখিয়ে ওদের মুখ বন্ধ করে দিয়েছে। ঠিক তখনিই ও খেয়াল করল, জলাপুকুরের দিক থেকেও কোনও আর ব্যাঙের কোরাস শোনা যাচ্ছে না। চারপাশটা কেমন যেন থমথম করছে। শুধু গাছের পাতার সরসর শব্দ। জোরে প্যাডেল করে আমবাগানটা পেরিয়ে যেতে চাইল চিকু। ওর কেমন যেন ভয় ভয় করতে লাগল। আমবাগান শেষ হওয়ার মুখে একটা চাপা গর্জন ওর কানে এল। কোনও পশু যেন প্রচণ্ড রাগে গর্জন করছে। তার চাপা গোঙানির মধ্যেই হিংস্র ভাব টের পাওয়া যাচ্ছে। একইসঙ্গে জান্তব একটা গন্ধও নাকে এল। আতঙ্কে বেপরোয়া গতিতে সাইকেল ছোটাল চিকু। আর প্রায় একইসঙ্গে একটা পাথর বা ইঁটের টুকরোয় হোঁচট খেয়ে ওর সাইকেল শূন্যে লাট খেয়ে পথের ওপর ছিটকে পড়ল। চিকু একদিকে, ওর ব্যাগ একদিকে, আর ওর সাইকেল আর একদিকে। সাইকেলের একটা চাকা তখনো ঘুরছে। হেডলাইটটা কাত হয়ে তেরছাভাবে আলোর বর্শা ছুঁড়ে দিয়েছে। আলোটা ক্রমেই নিভে আসছে। চিকুর সারা শরীরে কাদা মাখামাখি। কনুইয়ে একটু চোট লেগেছে। কিন্তু ভয় বড় আশ্চর্য জিনিস। পঙ্গুকে দিয়ে গিরিলঙ্ঘন করিয়ে নেয়। ফলে তখন ভয় আর ভগবানে কোনও তফাত থাকে না। চিকু চটপট নিজেকে সামলে উঠে পড়ল। দু পা ফেলে এগিয়ে গেল ব্যাগের কাছে। ব্যাগটা এক ঝটকায় তুলে নিয়ে সাইকেলের দিকে এগোতেই জিনিসটা ওর চোখে পড়ল। সাইকেলের হেডলাইটের আলো ততক্ষণে ক্ষয়ে এসেছে। কিন্তু পূর্ণিমার আলোয় ক্ষয় ধরেনি। তাই চিকুর দেখতে খুব একটা অসুবিধে হল না। পায়ে পায়ে ও জিনিসটার কাছে এগিয়ে গেল। জিনিসটাকে চিনতে পারা মাত্রই একটা আতঙ্কের চিৎকার ওর গলার কাছে এসে দলা পাকিয়ে গেল। কিছুতেই গলা দিয়ে বের হল না। ( ক্রমশ) ------------------


এডিট ডিলিট প্রিন্ট করুন  অভিযোগ করুন     

গল্পটি পড়েছেন ২১১২৭ জন


এ জাতীয় গল্প

গল্পটির রেটিং দিনঃ-

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now