বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
১
এবার আমার একটি বিচিত্র
অভিজ্ঞতা হইল।
মোহনপুরা রিজার্ভ ফরেস্টের
দক্ষিণে মাইল পনের-কুড়ি দূরে একটা
বিস্তৃত শাল ও বিড়ির পাতার জঙ্গল
সেবার কালেক্টরির নিলামে ডাক
হইবে খবর পাওয়া গেল। আমাদের
হেড আপিসে তাড়াতাড়ি একটা খবর
দিতে, তারযোগে আদেশ পাইলাম,
বিড়ির পাতার জঙ্গল যেন আমি
ডাকিয়া লই।
কিন্তু তাহার পূর্বে জঙ্গলটা একবার
আমার নিজের চোখে দেখা
আবশ্যক। কি আছে না-আছে না
জানিয়া নিলাম ডাকিতে আমি
প্রস্তুত নই। এদিকে নিলামের দিনও
নিকটবর্তী, ‘তার’ পাওয়ার পরদিনই
সকালে রওনা হইলাম।
আমার সঙ্গের লোকজন খুব ভোরে
বাক্স-বিছানা ও জিনিসপত্র
মাথায় রওনা হইয়াছিল, মোহনপুরা
ফরেস্টের সীমানায় কারো নদী
পার হইবার সময় তাহাদের সহিত
দেখা হইল। সঙ্গে ছিল আমাদের
পাটোয়ারী বনোয়ারীলাল।
কারো ক্ষীণকায়া পার্বত্য
স্রোতস্বিনী-হাঁটুখানেক জল
ঝিরঝির করিয়া উপলরাশির মধ্য
দিয়া প্রবাহিত। আমরা দুজনে
ঘোড়া হইতে নামিলাম, নয়তো
পিছল পাথরের নুড়িতে ঘোড়া পা
হড়কাইয়া পড়িয়া যাইতে পারে। দু-
পারে কটা বালির চড়া। সেখানেও
ঘোড়ায় চাপা যায় না, হাঁটু পর্যন্ত
বালিতে এমনিই ডুবিয়া যায়। অপর
পারের কড়ারী জমিতে যখন
পৌঁছিলাম, তখন বেলা এগারটা।
বনোয়ারী পাটোয়ারী বলিল-
এখানে রান্নাবান্না করে নিলে হয়
হুজুর, এর পরে জল পাওয়া যায় কি না
ঠিক নেই!
নদীর দু-পারেই জনহীন আরণ্যভূমি,
তবে বড় জঙ্গল নয়, ছোটখাটো কেঁদ
পলাশ ও শালের জঙ্গল-খুব ঘন ও
প্রস্তরাকীর্ণ, লোকজনের চিহ্ন
কোনো দিকে নাই।
আহারাদির কাজ খুব সংক্ষেপে
সারিলেও সেখান হইতে রওনা হইতে
একটা বাজিয়া গেল।
বেলা যখন যায়-যায়, তখনো জঙ্গলের
কূলকিনারা নাই। আমার মনে হইল
আর বেশি দূর অগ্রসর না হইয়া একটা
বড় গাছের তলায় আশ্রয় লওয়া
ভালো। অবশ্য বনের মধ্যে ইহার
পূর্বে দুইটি বন্য গ্রাম ছাড়াইয়া
আসিয়াছি-একটার নাম কুলপাল,
একটার নাম বুরুডি, কিন্তু সে প্রায়
বেলা তিনটার সময়। তখন যদি
জানা থাকিত যে, সন্ধ্যার সময়ও
জঙ্গল শেষ হইবে না, তাহা হইলে
সেখানেই রাত্রি কাটাইবার
ব্যবস্থা করা যাইত।
বিশেষ করিয়া সন্ধ্যার পূর্বে জঙ্গল
বড় ঘন হইয়া আসিল। আগে ছিল
ফাঁকা জঙ্গল, এখন যেন ক্রমেই
চারিদিক হইতে বড় বড় বনস্পতির দল
ভিড় করিয়া সরু সুঁড়িপথটা চাপিয়া
ধরিতেছে-এখন যেখানে দাঁড়াইয়া
আছি, সেখানটাতে তো
চারিদিকেই বড় বড় গাছ, আকাশ
দেখা যায় না, নৈশ অন্ধকার
ইতিমধ্যেই ঘনাইয়া আসিয়াছে।
এক এক জায়গায় ফাঁকা জঙ্গলের
দিকে বনের কি অনুপম শোভা! কি
এক ধরনের থোকা থোকা সাদা ফুল
সারা বনের মাথা আলো করিয়া
ফুটিয়া আছে ছায়াগহন অপরাহ্নের
নীল আকাশের তলে। মানুষের
চোখের আড়ালে সভ্য জগতের সীমা
হইতে বহু দূরে এত সৌন্দর্য কার জন্য
যে সাজানো! বনোয়ারী বলিল-ও
বুনো তেউড়ির ফুল, এই সময় জঙ্গলে
ফোটে, হুজুর। এক রকমের লতা।
যেদিকে চোখ যায়, সেদিকেই
গাছের মাথা, ঝোপের মাথা, ঈষৎ
নীলাভ শুভ্র বুনো তেউড়ির ফুল
ফুটিয়া আলো করিয়া রহিয়াছে-
ঠিক যেন রাশি রাশি পেঁজা
নীলাভ কাপাস তুলা কে ছড়াইয়া
রাখিয়াছে বনের গাছের মাথায়
সর্বত্র। ঘোড়া থামাইয়া মাঝে
মাঝে কতক্ষণ ধরিয়া দাঁড়াইয়াছি-
এক এক জায়গায় শোভা এমনই অদ্ভুত
যে, সেদিকে চাহিয়া যেন একটা
ছন্নছাড়া মনের ভাব হইয়া যায়-যেন
মনে হয়, কত দূরে কোথায় আছি, সভ্য
জগৎ হইতে বহু দূরে এক জনহীন
অজ্ঞাত জগতের উদাস, অপরূপ বন্য
সৌন্দর্যের মধ্যে-যে জগতের সঙ্গে
মানুষের কোনো সম্পর্ক নাই,
প্রবেশের অধিকারও নাই, শুধু বন্য
জীবজন্তু, বৃক্ষলতার জগৎ।
বোধ হয় আরো দেরি হইয়া
গিয়াছিল আমার এই বারবার
জঙ্গলের দৃশ্য হাঁ করিয়া থমকিয়া
দাঁড়াইয়া দেখিবার ফলে। বেচারি
বনোয়ারী পাটোয়ারী আমার
তাঁবে কাজ করে, সে জোর করিয়া
আমায় কিছু বলিতে না পারিলেও
মনে মনে নিশ্চয় ভাবিতেছে-এ
বাঙালি বাবুটির মাথার নিশ্চয়
দোষ আছে। এঁকে দিয়া জমিদারির
কাজ আর কত দিনে চলিবে? একট বড়
আসান-গাছের তলায় সবাই মিলিয়া
আশ্রয় লওয়া গেল। আমরা আছি
সবসুদ্ধ আট-দশজন লোক। বনোয়ারী
বলিল-বড় একটা আগুন কর, আর সবাই
কাছাকাছি ঘেঁষে থাকো। ছড়িয়ে
থেকো না, নানা রকম বিপদ এ
জঙ্গলে রাত্রিকালে।
গাছের নিচে ক্যাম্প-চেয়ার
পাতিয়া বসিয়াছি, মাথার উপর
অনেক দূর পর্যন্ত ফাঁকা আকাশ,
এখনো অন্ধকার নামে নাই, দূরে
নিকটে জঙ্গলের মাথায় বুনো
তেউড়ির সাদা ফুল ফুটিয়া আছে
রাশি রাশি, অজস্র! আমার ক্যাম্প-
চেয়ারের পাশেই দীর্ঘ দীর্ঘ ঘাস
আধ-শুকনো, সোনালি রঙের। রোদ-
পোড়া মাটির সোঁদা গন্ধ, শুকনো
ঘাসের গন্ধ, কি একটা বন-ফুলের গন্ধ,
যেন দুর্গাপ্রতিমার রাংতার
ডাকের সাজের গন্ধের মতো। মনের
মধ্যে এই উন্মুক্ত, বন্য জীবন আনিয়া
দিয়াছে একটা মুক্তি ও আনন্দের
অনুভূতি-যাহা কোথাও কখনো আসে
না এই রকম বিরাট নির্জন প্রান্তর ও
জনহীন অঞ্চল ছাড়া। অভিজ্ঞতা না
থাকিলে বলিয়া বোঝানো বড়ই
কঠিন সে মুক্ত জীবনের উল্লাস।
এমন সময় আমাদের এক কুলি আসিয়া
পাটোয়ারীর কাছে বলিল একটু দূরে
জঙ্গলের শুষ্ক ডালপালা কুড়াইতে
গিয়া সে একটা জিনিস
দেখিয়াছে। জায়গাটা ভালো নয়,
ভূত বা পরীর আড্ডা, এখানে না
তাঁবু ফেলিলেই হইত।
পাটোয়ারী বলিল-চলুন হুজুর, দেখে
আসি কি জিনিসটা।
কিছুদূরে জঙ্গলের মধ্যে একটা
জায়গা দেখাইয়া কুলিটা বলিল-
ঐখানে নিকটে গিয়ে দেখুন হুজুর।
আর কাছে যাব না।
বনের মধ্যে কাঁটা-লতা ঝোপ হইতে
মাথা উঁচু স্তম্ভের মাথায় একটা
বিকট মুখ খোদাই করা, সন্ধ্যাবেলা
দেখিলে ভয় পাইবার কথা বটে।
মানুষের হাতের তৈরি এ-বিষয়ে ভুল
নাই, কিন্তু এ জনহীন জঙ্গলের মধ্যে
এ স্তম্ভ কোথা হইতে আসিল বুঝিতে
পারিলাম না। জিনিসটা কত
দিনের প্রাচীন তাহাও বুঝিতে
পারিলাম না।
সে রাত্রি কাটিয়া গেল। সকালে
উঠিয়া বেলা ন-টার মধ্যে আমরা
গন্তব্যস্থানে পৌঁছিয়া গেলাম।
সেখানে পৌঁছিয়া জঙ্গলের
বর্তমান মালিকের জনৈক
কর্মচারীর সঙ্গে দেখা হইল। সে
আমায় জঙ্গল দেখাইয়া
বেড়াইতেছে-হঠাৎ জঙ্গলের মধ্যে
একটা শুষ্ক নালার ওপারে ঘন বনের
মধ্যে দেখি একটা প্রস্তরস্তম্ভের
শীর্ষ জাগিয়া আছে-ঠিক কাল
সন্ধ্যাবেলার সেই স্তম্ভটার মতো।
সেই রকমের বিকট মুখ খোদাই করা।
আমার সঙ্গে বনোয়ারী পাটোয়ারী
ছিল, তাহাকেও দেখাইলাম।
মালিকের কর্মচারী স্থানীয় লোক,
সে বলিল-ও আরো তিন-চারটা আছে
এ-অঞ্চলে জঙ্গলের মধ্যে মধ্যে। এ
দেশে আগে অসভ্য বুনো জাতির
রাজ্য ছিল, ও তাদেরই হাতের
তৈরি। ওগুলো সীমানার
নিশানদিহি খাম্বা।
বলিলাম-খাম্বা কি করে জানলে?
সে বলিল-চিরকাল শুনে আসছি
বাবুজী, তা ছাড়া সেই রাজার
বংশধর এখনো বর্তমান।
বড় কৌতূহল হইল।
-কোথায়?
লোকটা আঙ্গুল দিয়া দেখাইয়া
বলিল-এই জঙ্গলের উত্তর সীমানায়
একটা ছোট বস্তি আছে-সেখানে
থাকেন। এ-অঞ্চলে তাঁর বড় খাতির।
আমরা শুনেছি উত্তরে হিমালয়
পাহাড়, আর দক্ষিণে ছোটনাগপুরের
সীমানা, পূর্বে কুশী নদী, পশ্চিমে
মুঙ্গের-এই সীমানার মধ্যে সমস্ত
পাহাড়-জঙ্গলের রাজা ছিল ওঁর
পূর্বপুরুষ।
মনে পড়িল, পূর্বেও আমার
কাছারিতে একবার গনোরী
তেওয়ারী স্কুলমাস্টার গল্প
করিয়াছিল বটে যে, এ-অঞ্চলের
আদিম-জাতীয় রাজার বংশধর
এখনো আছে। এ-দিকের যত পাহাড়ি
জাতি-তাহাকে এখনো রাজা
বলিয়া মানে। এখন সে কথা মনে
পড়িল। জঙ্গলের মালিকের সেই
কর্মচারীর নাম বুদ্ধু সিং, বেশ
বুদ্ধিমান, এখানে অনেক কাল
চাকুরি করিতেছে, এইসব বনপাহাড়
অঞ্চলের অনেক ইতিহাস সে জানে
দেখিলাম।
বুদ্ধু সিং বলিল-মুঘল বাদশাহের
আমলে এরা মুঘল সৈন্যদের সঙ্গে
লড়েছে-এই জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে
তারা যখন বাংলা দেশে যেত-এরা
উপদ্রব করত তীর-ধনুক নিয়ে। শেষে
রাজমহলে যখন মুঘল সুবাদারেরা
থাকতেন, তখন এদের রাজ্য যায়।
ভারি বীরের বংশ এরা, এখন আর
কিছুই নেই। যা কিছু বাকি ছিল,
১৮৬২ সালের সাঁওতাল-বিদ্রোহের
পর সব যায়। সাঁওতাল-বিদ্রোহের
নেতা এখনো বেঁচে আছেন। তিনি
বর্তমান রাজা। নাম দোবরু পান্না
বীরবর্দী। খুব বৃদ্ধ আর খুব গরিব।
কিন্তু এ দেশের সকল আদিম জাতি
এখনো তাঁকে রাজার সম্মান দেয়।
রাজ্য না থাকলেও রাজা বলেই
মানে।
রাজার সঙ্গে দেখা করিবার বড়ই
ইচ্ছা হইল।
রাজসন্দর্শনে যাইতে হইলে কিছু
নজর লইয়া যাওয়া উচিত। যার যা
প্রাপ্য সম্মান, তাকে তা না-দিলে
কর্তব্যের হানি ঘটে। কিছু ফলমূল,
গোটা দুই বড় মুরগি-বেলা একটার
মধ্যে নিকটবর্তী বস্তি হইতে
কিনিয়া আনিলাম। এ-দিকের কাজ
শেষ করিয়া বেলা দুইটার পরে বুদ্ধু
সিংকে বলিলাম-চল, রাজার সঙ্গে
দেখা করে আসি।
বুদ্ধু সিং তেমন উৎসাহ দেখাইল না।
বলিল-আপনি সেখানে কী যাবেন!
আপনাদের সঙ্গে দেখা করবার
উপযুক্ত নয়। পাহাড়ি অসভ্য জাতের
রাজা, তাই বলে কি আর আপনাদের
সমান সমান কথা বলবার যোগ্য
বাবুজী? সে তেমন কিছু নয়।
তাহার কথা না শুনিয়াই আমি ও
বনোয়ারীলাল রাজধানীর দিকে
গেলাম। তাহাকেও সঙ্গে লইলাম।
রাজধানীটা খুব ছোট, কুড়ি-পঁচিশ ঘর
লোকের বাস।
ছোট ছোট মাটির ঘর, খাপরার চাল।
পরিষ্কার করিয়া লেপা-পোঁছা।
দেওয়ালের গায়ে মাটির সাপ, পদ্ম,
লতা প্রভৃতি গড়া। ছোট ছোট
ছেলেরা খেলা করিয়া
বেড়াইতেছে, স্ত্রীলোকেরা গৃহকর্ম
করিতেছে। কিশোরী ও যুবতী
মেয়েদের সুঠাম গড়ন ও নিটোল
স্বাস্থ্য, মুখে কেমন সুন্দর একটা
লাবণ্য প্রত্যেকেরই। সকলেই
আমাদের দিকে অবাক হইয়া
চাহিয়া রহিল।
বুদ্ধু সিং একজন স্ত্রীলোককে বলিল-
রাজা ছে রে?
স্ত্রীলোকটি বলিল, সে দেখে নাই।
তবে কোথায় আর যাইবে, বাড়িতেই
আছে।
২
আমরা গ্রামে যেখানে আসিয়া
দাঁড়াইলাম, বুদ্ধু সিং-এর ভাবে মনে
হইল এইবার রাজপ্রাসাদের সম্মুখে
নীত হইয়াছি। অন্য ঘরগুলির সঙ্গে
রাজপ্রাসাদের পার্থক্য এইমাত্র
লক্ষ্য করিলাম যে, ইহার চারিপাশ
পাথরের পাঁচিলে ঘেরা-বস্তির
পিছনেই অনুচ্চ পাহাড়, সেখান
হইতেই পাথর আনা হইয়াছে।
রাজবাড়িতে ছেলেমেয়ে
অনেকগুলি-কতকগুলি খুব ছোট।
তাদের গলায় পুঁতির মালা ও নীল
ফলের বীজের মালা। দু-একটি
ছেলেমেয়ে দেখিতে বেশ সুশ্রী!
ষোল-সতের বছরের একটি মেয়ে বুদ্ধু
সিং-এর ডাকে ছুটিয়া বাহিরে
আসিয়াই আমাদের দেখিয়া অবাক
হইয়া গেল, তাহার চোখের চাহনি
দেখিয়া মনে হইল কিছু ভয়ও
পাইয়াছে।
বুদ্ধু সিং বলিল-রাজা কোথায়?
মেয়েটি কে?-বুদ্ধু সিংকে
জিজ্ঞাসা করিলাম। বুদ্ধু সিং
বলিল-রাজার নাতির মেয়ে।
রাজা বহুদিন জীবিত থাকিয়া
নিশ্চয়ই বহু যুবক ও প্রৌঢ়কে
রাজসিংহাসনে বসিবার সৌভাগ্য
হইতে বঞ্চিত করিয়া রাখিয়াছেন।
মেয়েটি বলিল-আমার সঙ্গে এস।
জ্যাঠামশায় পাহাড়ের নিচে
পাথরে বসে আছেন।
মানি বা না-ই মানি, মনে মনে
ভাবিলাম যে-মেয়েটি আমাদের পথ
দেখাইয়া লইয়া চলিয়াছে, সে সত্যই
রাজকন্যা-তাহার পূর্বপুরুষেরা এই
আরণ্য-ভূভাগ বহুদিন ধরিয়া শাসন
করিয়াছিল-সেই বংশের সে মেয়ে।
বলিলাম-মেয়েটির নাম জিজ্ঞেস
কর।
বুদ্ধু সিং বলিল-ওর নাম ভানুমতী।
বাঃ বেশ সুন্দর- ভানুমতী!
রাজকন্যা ভানুমতী!
ভানুমতী নিটোল স্বাস্থ্যবতী,
সুঠাম মেয়ে। লাবণ্যমাখা মুখশ্রী-
তবে পরনের কাপড়, সভ্যসমাজের
শোভনতা রক্ষা করিবার উপযুক্ত
প্রমাণ মাপের নয়। মাথার চুল রুক্ষ,
গলায় কড়ি ও পুঁতির দানা। দূর হইতে
একটা বড় বকাইন্ গাছ দেখাইয়া
দিয়া ভানুমতী বলিল-তোমরা যাও,
জ্যাঠামশায় ওই গাছতলায় বসে
গোরু চরাচ্ছেন।
গোরু চরাইতেছেন কি রকম! প্রায়
চমকিয়া উঠিয়াছিলাম বোধ হয়। এই
সমগ্র অঞ্চলের রাজা সাঁওতাল-
বিদ্রোহের নেতা দোবরু পান্না
বীরবর্দী গোরু চরাইতেছেন!
কিছু জিজ্ঞাসা করিবার পূর্বে
মেয়েটি চলিয়া গেল এবং আমরা
আর কিছু অগ্রসর হইয়া বকাইন্
গাছের তলায় এক বৃদ্ধকে কাঁচা
শালপাতায় তামাক জড়াইয়া
ধূমপানরত দেখিলাম।
বুদ্ধু সিং বলিল-সেলাম,
রাজাসাহেব।
রাজা দোবরু পান্না কানে শুনিতে
পাইলেও চোখে খুব ভালো দেখিতে
পান বলিয়া মনে হইল না।
বলিল-কে? বুদ্ধু সিং? সঙ্গে কে?
বুদ্ধু বলিল-একজন বাঙালি বাবু
আপনার সঙ্গে দেখা করতে
এসেছেন। উনি কিছু নজর এনেছেন-
আপনাকে নিতে হবে।
আমি নিজে গিয়া বৃদ্ধের সামনে
মুরগি ও জিনিস কয়টি নামাইয়া
রাখিলাম।
বলিলাম-আপনি দেশের রাজা,
আপনার সঙ্গে দেখা করবার জন্য
বহুৎ দূর থেকে এসেছি।
বৃদ্ধের দীর্ঘায়ত চেহারার দিকে
চাহিয়া আমার মনে হইল যৌবনে
রাজা দোবরু পান্না খুব সুপুরুষ
ছিলেন সন্দেহ নাই। মুখশ্রীতে
বুদ্ধির ছাপ সুস্পষ্ট। বৃদ্ধ খুব খুশি
হইলেন। আমার দিকে ভালো করিয়া
চাহিয়া দেখিয়া বলিলেন-কোথায়
ঘর?
বলিলাম-কলকাতা।
-উঃ অনেক দূর। বড় ভারি জায়গা
শুনেছি কলকাতা।
-আপনি কখনো যান নি?
-না, আমরা কি শহরে যেতে পারি?
এই জঙ্গলেই আমরা থাকি ভালো।
বোসো। ভান্মতী কোথায় গেল, ও
ভান্মতী?
মেয়েটি ছুটিতে ছুটিতে আসিয়া
বলিল-কি জ্যাঠামশায়?
-এই বাঙালি বাবু ও তাঁর সঙ্গের
লোকজন আজ আমার এখানে
থাকবেন ও খাওয়াদাওয়া করবেন।
আমি প্রতিবাদ করিয়া বলিলাম-না,
না, সে কি! আমরা এখুনি চলে যাব,
আপনার সঙ্গে দেখা করেই-আমাদের
থাকার বিষয়ে- কিন্তু দোবরু পান্না
বলিলেন-না, তা হতে পারে না।
ভান্মতী, এই জিনিসগুলো নিয়ে যা
এখান থেকে।
আমার ইঙ্গিতে বনোয়ারীলাল
পাটোয়ারী নিজে জিনিসগুলি
বহিয়া অদূরবর্তী রাজার বাড়িতে
লইয়া গেল ভানুমতীর পিছুপিছু।
বৃদ্ধের কথা অমান্য করিতে
পারিলাম না, বৃদ্ধের দিকে
চাহিয়াই আমার সম্ভ্রমে মন পূর্ণ
হইয়া গিয়াছিল। সাঁওতাল-
বিদ্রোহের নেতা, প্রাচীন
অভিজাত-বংশীয় বীর দোবরু
পান্না (হইলই বা আদিম জাতি)
আমাকে থাকিতে অনুরোধ
করিতেছেন-এ অনুরোধ আদেশেরই
শামিল। রাজা দোবরু পান্না
অত্যন্ত দরিদ্র, দেখিয়াই
বুঝিয়াছিলাম। তাঁহাকে গোরু
চরাইতে দেখিয়া প্রথমটা আশ্চর্য
হইয়াছিলাম বটে, কিন্তু পরে মনে
ভাবিয়া দেখিলাম ভারতবর্ষের
ইতিহাসে রাজা দোবরু পান্নার
অপেক্ষা অনেক বড় রাজা
অবস্থাবৈগুণ্যে গোচারণ অপেক্ষাও
হীনতর বৃত্তি অবলম্বন
করিয়াছিলেন।
রাজা নিজের হাতে শালপাতার
একটা চুরুট গড়িয়া আমার হাতে
দিলেন। দেশলাই নাই-গাছের তলায়
আগুন করাই আছে-তাহা হইতে একটা
পাতা জ্বালাইয়া সম্মুখে ধরিলেন।
বলিলাম-আপনারা এ-দেশের
প্রাচীন রাজবংশ, আপনাদের
দর্শনে পুণ্য আছে।
দোবরু পান্না বলিলেন-এখন আর কি
আছে? আমাদের বংশ সূর্যবংশ। এই
পাহাড়-জঙ্গল, সারা পৃথিবী
আমাদের রাজ্য ছিল। আমি যৌবন
বয়সে কোম্পানির সঙ্গে লড়েছি।
এখন আমার বয়স অনেক। যুদ্ধে হেরে
গেলাম। তারপর আর কিছু নেই।
এই আরণ্য ভূভাগের বহিঃস্থিত অন্য
কোনো পৃথিবীর খবর দোবরু পান্না
রাখেন বলিয়া মনে হইল না। তাঁহার
কথার উত্তরে কি একটা বলিতে
যাইতেছি, এমন সময় একজন যুবক
আসিয়া সেখানে দাঁড়াইল।
রাজা দোবরু বলিলেন-আমার ছোট
নাতি, জগরু পান্না। ওর বাবা
এখানে নেই, লছমীপুরের রানী-
সাহেবের সঙ্গে দেখা করতে
গিয়েছে। ওরে জগরু, বাবুজীর জন্যে
খাওয়ার যোগাড় কর্।
যুবক যেন নবীন শালতরু, পেশীবহুল
সবল নধর দেহ। সে বলিল-বাবুজী,
শজারুর মাংস খান?
পরে তাহার পিতামহের দিকে
চাহিয়া বলিল-পাহাড়ের ওপারের
বনে ফাঁদ পেতে রেখেছিলাম, কাল
রাত্রে দুটো সজারু পড়েছে।
শুনিলাম রাজার তিনটি ছেলে,
তাহাদের আট-দশটি ছেলেমেয়ে। এই
বৃহৎ রাজপরিবারের সকলেই এই
গ্রামে একত্র থাকে। শিকার ও
গোচারণ প্রধান উপজীবিকা। এ
বাদে বনের পাহাড়ি জাতিদের
বিবাদ-বিসংবাদে রাজার কাছে
বিচারপ্রার্থী হইয়া আসিলে কিছু
কিছু ভেট্ ও নজরানা দিতে হয়-দুধ,
মুরগি, ছাগল, পাখির মাংস বা
ফলমূল।
বলিলাম-আপনার চাষবাস আছে?
দোবরু পান্না গর্বের সুরে বলিলেন-
ওসব আমাদের বংশে নিয়ম নেই।
শিকার করার মান সকলের চেয়ে বড়,
তাও একসময়ে ছিল বর্শা নিয়ে
শিকার সবচেয়ে গৌরবের। তীর
ধনুকের শিকার দেবতার কাজে
লাগে না, ও বীরের কাজ নয়। তবে
এখন সবই চলে। আমার বড় ছেলে
মুঙ্গের থেকে একটা বন্দুক কিনে
এনেছে; আমি কখনো ছুঁই নি। বর্শা
ধরে শিকার আসল শিকার।
ভানুমতী আবার আসিয়া একটা
পাথরের ভাঁড় আমাদের কাছে
রাখিয়া গেল।
রাজা বলিলেন-তেল মাখুন। কাছেই
চমৎকার ঝরনা-স্নান করে আসুন
সকলে।
আমরা স্নান করিয়া আসিলে রাজা
আমাদের রাজবাড়ির একটা ঘরে
লইয়া যাইতে বলিলেন।
ভানুমতী একটা ধামায় চাল ও মেটে
আলু আনিয়া দিল। জগরু সজারু
ছাড়াইয়া মাংস আনিয়া রাখিল
কাঁচা শালপাতার পাত্রে।
ভানুমতী আর একবার গিয়া দুধ ও মধু
আনিল। আমার সঙ্গে ঠাকুর ছিল না,
বনোয়ারী মেটে আলু ছাড়াইতে
বসিল, আমি রাঁধিবার চেষ্টায় উনুন
ধরাইতে গেলাম। কিন্তু শুধু বড় বড়
কাঠের সাহায্যে উনুন ধরানো
কষ্টকর। দু-একবার চেষ্টা করিয়া
পারিলাম না, তখন ভানুমতী
তাড়াতাড়ি একটা পাখির শুকনো
বাসা আনিয়া উনুনের মধ্যে পুরিয়া
দিতে আগুন বেশ জ্বলিয়া উঠিল।
দিয়াই দূরে সরিয়া গিয়া দাঁড়াইল।
ভানুমতী রাজকন্যা বটে, কিন্তু বেশ
অমায়িক স্বভাবের রাজকন্যা। অথচ
দিব্য সহজ, সরল মর্যাদাজ্ঞান।
রাজা দোবরু পান্না সবসময়
রান্নাঘরের দুয়ারটির কাছে বসিয়া
রহিলেন। আতিথ্যের এতটুকু ত্রুটি না
ঘটে। আহারাদির পর বলিলেন-
আমার তেমন বেশি ঘরদোরও নেই,
আপনাদের বড় কষ্ট হোলো। এই বনের
মধ্যে পাহাড়ের উপরে আমার
বংশের রাজাদের প্রকাণ্ড বাড়ির
চিহ্ন এখনো আছে। আমি বাপ-
ঠাকুর্দার কাছে শুনেছি বহু
প্রাচীনকালে ওখানে আমার
পূর্বপুরুষেরা বাস করতেন। সে দিন
কি আর এখন আছে! আমাদের
পূর্বপুরুষের প্রতিষ্ঠিত দেবতা এখনো
সেখানে আছেন।
আমার বড় কৌতূহল হইল, বলিলাম-
যদি আমরা একবার দেখতে যাই
তাতে কি কোনো আপত্তি আছে,
রাজাসাহেব?
-এর আবার আপত্তি কি। তবে
দেখবার এখন বিশেষ কিছু নেই।
আচ্ছা, চলুন আমি যাব। জগরু
আমাদের সঙ্গে এস।
আমি আপত্তি করিলাম-বিরানব্বই
বছরের বৃদ্ধকে আর পাহাড়ে
উঠাইবার কষ্ট দিতে মন সরিল না।
সে আপত্তি টিকিল না,
রাজাসাহেব হাসিয়া বলিলেন-ও
পাহাড়ে আমায় তো প্রায়ই উঠতে
হয়, ওর গায়েই আমার বংশের
সমাধিস্থান। প্রত্যেক পূর্ণিমায়
আমায় সেখানে যেতে হয়। চলুন, সে-
জায়গাও দেখাব।
উত্তর-পূর্ব কোণ হইতে অনুচ্চ
শৈলমালা (স্থানীয় নাম ধন্ঝরি)
এক স্থানে আসিয়া যেন হঠাৎ
ঘুরিয়া পূর্বমুখী হওয়ার দরুন একটা
খাঁজের সৃষ্টি করিয়াছে, এই খাঁজের
নিচে একটা উপত্যকা, শৈলসানুর
অরণ্য সারা উপত্যকা ব্যাপিয়া যেন
সবুজের ঢেউয়ের মতো নামিয়া
আসিয়াছে, যেমন ঝরনা নামে
পাহাড়ের গা বাহিয়া। অরণ্য
এখানে ঘন নয়, ফাঁকা ফাঁকা-বনের
গাছের মাথায় মাথায় সুদূর
চক্রবালরেখায় নীল শৈলমালা,
বোধ হয় গয়া কি রামগড়ের দিকের-
যতদূর দৃষ্টি চলে শুধুই বনের শীর্ষ,
কোথাও উঁচু, বড় বড় বনস্পতিসঙ্কুল,
কোথাও নিচু, চারা শাল ও চারা
পলাশ। জঙ্গলের মধ্যে সরু পথ
বাহিয়া পাহাড়ের উপর উঠিলাম।
এক জায়গায় খুব বড় পাথরের চাঁই
আড়ভাবে পোঁতা, ঠিক যেন একখানা
পাথরের কড়ি বা ঢেঁকির আকারের।
তার নিচে কুম্ভকারদের হাঁড়ি-
কলসি পোড়ানো পণ-এর গর্তের মতো
কিংবা মাঠের মধ্যে খেঁকশিয়ালী
যেমন গর্ত কাটে-এই ধরনের প্রকাণ্ড
একটা বড় গর্তের মুখ। গর্তের মুখে
চারা শালের বন।
রাজা দোবরু বলিলেন-এই গর্তের
মধ্যে ঢুকতে হবে। আসুন আমার
সঙ্গে। কোনো ভয় নেই। জগরু আগে
যাও।
প্রাণ হাতে করিয়া গর্তের মধ্যে
ঢুকিলাম। বাঘ ভালুক তো থাকিতেই
পারে, না থাকে সাপ তো আছেই।
গর্তের মধ্যে হামাগুড়ি দিয়া
খানিকদূর গিয়া তবে সোজা হইয়া
দাঁড়ানো যায়। ভয়ানক অন্ধকার
ভিতরে প্রথমটা মনে হয়, কিন্তু চোখ
অন্ধকারে কিছুক্ষণ অভ্যস্ত হইয়া
গেলে আর তত অসুবিধা হয় না;
জায়গাটা প্রকাণ্ড একটা গুহা, কুড়ি-
বাইশ হাত লম্বা, হাত পনের চওড়া-
উত্তর দিকের দেওয়ালের গায়ে
আবার একটা খেঁকশিয়ালীর মতো
গর্ত দিয়া খানিক দূর গেলে
দেওয়ালের ওপারে ঠিক এই রকম
নাকি আর একটা গুহা আছে-কিন্তু
সেটাতে আমরা ঢুকিবার আগ্রহ
দেখাইলাম না। গুহার ছাদ বেশি উঁচু
নয়, একটা মানুষ সোজা হইয়া
দাঁড়াইয়া হাত উঁচু করিলে ছাদ
ছুঁইতে পারে। চাম্সে ধরনের গন্ধ
গুহার মধ্যে-বাদুড়ের আড্ডা-এ ছাড়া
ভাম, শৃগাল, বনবিড়াল প্রভৃতি
থাকে শোনা গেল। বনোয়ারী
পাটোয়ারী চুপি চুপি বলিল-হুজুর,
চলুন বাইরে, এখানে আর বেশি দেরি
করবেন না।
ইহাই নাকি দোবরু পান্নার
পূর্বপুরুষদের দুর্গপ্রাসাদ।
আসলে ইহা একটি বড় প্রাকৃতিক
গুহা-প্রাচীন কালে পাহাড়ের উপর
দিকের মুখওয়ালা এ গুহায় আশ্রয়
লইলে শত্রুর আক্রমণ হইতে সহজে
আত্মরক্ষা করা যাইত।
রাজা বলিলেন-এর আর একটা গুপ্ত
মুখ আছে-সে কাউকে বলা নিয়ম নয়।
সে কেবল আমার বংশের লোক
ছাড়া কেউ জানে না। যদিও এখন
এখানে কেউ বাস করে না, তবুও এই
নিয়ম চলে আসছে বংশে।
গুহাটা হইতে বাহির হইয়া ধড়ে
প্রাণ আসিল।
তারপর আরো খানিকটা উঠিয়া এক
জায়গায় প্রায় এক বিঘা জমি
জুড়িয়া বড় বড় সরু মোটা ঝুরি
নামাইয়া, পাহাড়ের মাথার
অনেকখানি ব্যাপিয়া এক বিশাল
বটগাছ।
রাজা দোবরু পান্না বলিলেন-জুতো
খুলে চলুন মেহেরবানি করে।
বটগাছতলায় যেন চারিধারে বড় বড়
বাটনাবাটা শিলের আকারের পাথর
ছড়ানো।
রাজা বলিলেন- ইহাই তাহার
বংশের সমাধিস্থান। এক-একখানা
পাথরের তলায় এক-একটা
রাজবংশীয় লোকের সমাধি!
বিশাল বটতলার সমস্ত স্থান
জুড়িয়া সেই রকম বড় বড় শিলাখণ্ড
ছড়ানো-কোনো কোনো সমাধি খুবই
প্রাচীন, দু’দিক হইতে ঝুরি নামিয়া
যেন সেগুলিকে সাঁড়াশির মতো
আটকাইয়া ধরিয়াছে, সে সব ঝুরি
আবার গাছের গুঁড়ির মতো মোটা
হইয়া গিয়াছে-কোনো কোনো
শিলাখণ্ড ঝুরির তলায় একেবারে
অদৃশ্য হইয়া গিয়াছে। ইহা হইতে
সেইগুলির প্রাচীনত্ব অনুমান করা
যায়।
রাজা দোবরু বলিলেন-এই বটগাছ
আগে এখানে ছিল না। অন্য অন্য
গাছের বন ছিল। একটি ছোট বট চারা
ক্রমে বেড়ে অন্য অন্য গাছ মেরে
ফেলে দিয়েছে। এই বটগাছটা এত
প্রাচীন যে, এর আসল গুঁড়ি নেই। ঝুরি
নেমে যে গুঁড়ি হয়েছে, তারাই এখন
রয়েছে। গুঁড়ি কেটে উপড়ে ফেললে
দেখবেন ওর তলায় কত পাথর চাপা
পড়ে আছে। এইবার বুঝুন কত প্রাচীন
সমাধিস্থান এটা।
সত্যই বটগাছতলায় দাঁড়াইয়া আমার
মনে এমন একটা ভাব হইল, যাহা
এতক্ষণ কোথাও হয় নাই, রাজাকে
দেখিয়াও না (রাজাকে তো মনে
হইয়াছে জনৈক বৃদ্ধ সাঁওতাল কুলির
মতো), রাজকন্যাকে দেখিয়াও নয়
(একজন স্বাস্থ্যবতী হো কিংবা
মুণ্ডা তরুণীর সহিত রাজকন্যার
কোনো প্রভেদ দেখি নাই),
রাজপ্রাসাদ দেখিয়া তো নয়ই
(সেটাকে একটা সাপখোপের ও
ভূতের আড্ডা বলিয়া মনে হইয়াছে)।
কিন্তু পাহাড়ের উপরে এই সুবিশাল,
প্রাচীন বটতরুতলে কতকালের এই
সমাধিস্থল আমার মনে এক অননুভূত,
অপরূপ অনুভূতি জাগাইল।
স্থানটির গাম্ভীর্য, রহস্য ও
প্রাচীনত্বের ভাব অবর্ণনীয়। তখন
বেলা প্রায় হেলিয়া পড়িয়াছে,
হলদে রোদ পত্ররাশির গায়ে, ডাল ও
ঝুরির অরণ্যে ধন্ঝরির অন্য চূড়ায়, দূর
বনের মাথায়। অপরাহে¦র সেই
ঘনায়মান ছায়া এই সুপ্রাচীন
রাজসমাধিকে যেন আরো গম্ভীর,
রহস্যময় সৌন্দর্য দান করিল।
মিশরের প্রাচীন সম্রাটের
সমাধিস্থল থিব্স্নগরের অদূরবর্তী
‘ভ্যালি অব্ দি কিংস’ আজ পৃথিবীর
টুরিস্টদের লীলাভূমি, পাবলিসিটি
ও ঢাক পিটানোর অনুগ্রহে
সেখানকার বড় বড় হোটেলগুলি
মরশুমের সময় লোকে গিজ গিজ
করে-’ভ্যালি অব্ দি কিংস’
অতীতকালের কুয়াশায় যত না
অন্ধকার হইয়াছিল, তার অপেক্ষাও
অন্ধকার হইয়া যায় দামী সিগারেট
ও চুরুটের ধোঁয়ায়…কিন্তু তার চেয়ে
কোনো অংশে রহস্যে ও স্বপ্রতিষ্ঠ
মহিমায় কম নয় সুদূর অতীতের এই
অনার্য নৃপতিদের সমাধিস্থল, ঘন
অরণ্যভূমির ছায়ায় শৈলশ্রেণীর
অন্তরালে যা চিরকাল আত্মগোপন
করিয়া আছে ও থাকিবে। এদের
সমাধিস্থলে আড়ম্বর নাই, পালিশ
নাই, ঐশ্বর্য নাই, মিশরীয় ধনী
ফ্যারাওদের কীর্তির মতো-কারণ
এরা ছিল দরিদ্র, এদের সভ্যতা ও
সংস্কৃতি ছিল মানুষের আদিম যুগের
অশিক্ষিতপটু সভ্যতা ও সংস্কৃতি,
নিতান্ত শিশু-মানবের মন লইয়া
ইহারা রচনা করিয়াছে ইহাদের
গুহানিহিত রাজপ্রাসাদ,
রাজসমাধি, সীমানাজ্ঞাপক খুঁটি।
সেই অপরাহে¦র ছায়ায় পাহাড়ের
উপর সে বিশাল তরুতলে দাঁড়াইয়া
যেন সর্বব্যাপী শাশ্বত কালের
পিছন দিকে বহুদূরে অন্য এক
অভিজ্ঞতার জগৎ দেখিতে পাইলাম-
পৌরাণিক ও বৈদিক যুগও যার
তুলনায় বর্তমানের পর্যায়ে পড়িয়া
যায়।
দেখিতে পাইলাম যাযাবর আর্যগণ
উত্তর-পশ্চিম গিরিবর্ত্ম অতিক্রম
করিয়া স্রোতের মতো অনার্য-
আদিমজাতি-শাসিত প্রাচীন
ভারতে প্রবেশ করিতেছেন…
ভারতের পরবর্তী যা কিছু ইতিহাস-
এই আর্যসভ্যতার ইতিহাস-বিজিত
অনার্য জাতিদের ইতিহাস কোথাও
লেখা নাই-কিংবা সে লেখা আছে
এই সব গুপ্ত গিরিগুহায়, অরণ্যানীর
অন্ধকারে, চূর্ণায়মান অস্থি-
কঙ্কালের রেখায়। সে লিপির
পাঠোদ্ধার করিতে বিজয়ী
আর্যজাতি কখনো ব্যস্ত হয় নাই।
আজও বিজিত হতভাগ্য আদিম
জাতিগণ তেমনই অবহেলিত,
অবমানিত, উপেক্ষিত। সভ্যতাদর্পী
আর্যগণ তাহাদের দিকে কখনো
ফিরিয়া চাহে নাই, তাহাদের
সভ্যতা বুঝিবার চেষ্টা করে নাই,
আজও করে না। আমি, বনোয়ারী
সেই বিজয়ী জাতির প্রতিনিধি;
বৃদ্ধ দোবরু পান্না, তরুণ যুবক জগরু,
তরুণী কুমারী ভানুমতী সেই বিজিত,
পদদলিত জাতির প্রতিনিধি-উভয়
জাতি আমরা এই সন্ধ্যার অন্ধকারে
মুখোমুখি দাঁড়াইয়াছি-সভ্যতার
গর্বে উন্নতনাসিক আর্যকান্তির
গর্বে আমি প্রাচীন
অভিজাতবংশীয় দোবরু পান্নাকে
বৃদ্ধ সাঁওতাল ভাবিতেছি, রাজকন্যা
ভানুমতীকে মুণ্ডা কুলী-রমণী
ভাবিতেছি-তাদের কত আগ্রহের ও
গর্বের সহিত প্রদর্শিত
রাজপ্রাসাদকে অনার্যসুলভ আলো-
বাতাসহীন গুহাবাস, সাপ ও ভূতের
আড্ডা বলিয়া ভাবিতেছি।
ইতিহাসের এই বিরাট ট্রাজেডি
যেন আমার চোখের সম্মুখে সেই
সন্ধ্যায় অভিনীত হইল-সে নাটকের
কুশীলবগণ একদিকে বিজিত
উপেক্ষিত দরিদ্র অনার্য নৃপতি
দোবরু পান্না, তরুণী অনার্য
রাজকন্যা ভানুমতী, তরুণ রাজপুত্র
জগরু পান্না-একদিকে আমি, আর
পাটোয়ারী বনোয়ারীলাল ও আমার
পথপ্রদর্শক বুদ্ধু সিং।
ঘনায়মান সন্ধ্যার অন্ধকারে
রাজসমাধি ও বটতরুতল আবৃত হইবার
পূর্বেই আমরা সেদিন পাহাড় হইতে
নামিয়া আসিলাম।
নামিবার পথে একস্থানে জঙ্গলের
মধ্যে একখানা খাড়া সিঁদুরমাখা
পাথর। আশপাশে মানুষের
হস্তরোপিত গাঁদাফুলের ও
সন্ধ্যামণি-ফুলের গাছ। সামনে আর
একখানা বড় পাথর, তাতেও সিঁদুর
মাখা। বহুকাল হইতে নাকি এই
দেবস্থান এখানে প্রতিষ্ঠিত।
রাজবংশের ইনি কুলদেবতা। পূর্বে
এখানে নরবলি হইত-সম্মুখের বড়
পাথরখানিই যূপ-রূপে ব্যবহৃত হইত।
এখন পায়রা ও মুরগি বলি প্রদত্ত হয়।
জিজ্ঞাসা করিলাম-কি ঠাকুর ইনি?
রাজা দোবরু বলিলেন-টাঁড়বারো,
বুনো মহিষের দেবতা।
মনে পড়িল গত শীতকালে গনু
মাহাতোর মুখে শোনা সেই গল্প।
রাজা দোবরু বলিলেন-টাঁড়বারো বড়
জাগ্রত দেবতা। তিনি না থাকলে
শিকারিরা চামড়া আর শিঙের
লোভে বুনো মহিষের বংশ নির্বংশ
করে ছেড়ে দিত। উনি রক্ষা করেন।
ফাঁদে পড়বার মুখে তিনি মহিষের
দলের সামনে দাঁড়িয়ে হাত তুলে
বাধা দেন-কত লোক দেখেছে। এই
অরণ্যচারী আদিম সমাজের
দেবতাকে সভ্য জগতে কেউই মানে
না, জানেও না- কিন্তু ইহা যে
কল্পনা নয়, এবং এই দেবতা যে সত্যই
আছেন-তাহা স্বতঃই মনে উদয়
হইয়াছিল সেই বিজন বন্যজন্তু-
অধ্যুষিত অরণ্য ও পর্বত অঞ্চলের
নিবিড় সৌন্দর্য ও রহস্যের মধ্যে
বসিয়া।
অনেক দিন পরে কলিকাতায়
ফিরিয়া একবার দেখিয়াছিলাম
বড়বাজারে, জ্যৈষ্ঠ মাসের ভীষণ
গরমের দিনে, এক পশ্চিমা
গাড়োয়ান বিপুল বোঝাই গাড়ির
মহিষ দুটাকে প্রাণপণে চামড়ার
পাঁচন দিয়া নির্মমভাবে
মারিতেছে-সেইদিন মনে হইয়াছিল,
হায় দেব টাঁড়বারো, এ তো
ছোটনাগপুর কি মধ্যপ্রদেশের
অরণ্যভূমি নয়, এখানে তোমার দয়ালু
হস্ত এই নির্যাতিত পশুকে কি
করিয়া রক্ষা করিবে? এ বিংশ
শতাব্দীর আর্যসভ্যতাদৃপ্ত
কলিকাতা। এখানে বিজিত আদিম
রাজা দোবরু পান্নার মতোই তুমি
অসহায়।
আমি নওয়াদা হইতে মোটরবাস
ধরিয়া গয়ায় আসিব বলিয়া সন্ধ্যার
পরেই রওনা হইলাম। বনোয়ারী
আমাদের ঘোড়া লইয়া তাঁবুতে
ফিরিল। আসিবার সময় আর একবার
রাজকুমারী ভানুমতীর সহিত দেখা
হইয়াছিল। সে একবাটি মহিষের দুধ
লইয়া আমাদের জন্য দাঁড়াইয়া ছিল
রাজবাড়ির দ্বারে।
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now