বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
১
কিছুতেই কিন্তু এখানকার এই
জীবনের সঙ্গে নিজেকে আমি খাপ
খাওয়াইতে পারিতেছি না।
বাংলা দেশ হইতে সদ্য আসিয়াছি,
চিরকাল কলিকাতায় কাটাইয়াছি,
এই অরণ্যভূমির নির্জনতা যেন
পাথরের মতো বুকে চাপিয়া আছে
বলিয়া মনে হয়।
এক-একদিন বৈকালে বেড়াইতে
বাহির হইয়া অনেক দূর পর্যন্ত যাই।
কাছারির কাছে তবুও লোকজনের
গলা শুনিতে পাওয়া যায়, রশি দুই-
তিন গেলেই কাছারিঘরগুলা যেমন
দীর্ঘ বনঝাউ ও কাশ জঙ্গলের
আড়ালে পড়ে, তখন মনে হয় সমস্ত
পৃথিবীতে আমি একাকী। তারপর
যতদূর যাওয়া যায়, চওড়া মাঠের দু-
ধারে ঘন বনের সারি বহুদূর পর্যন্ত
চলিয়াছে, শুধু বন আর ঝোপ, গজারি
গাছ, বাবলা, বন্য কাঁটাবাঁশ, বেত
ঝোপ। গাছের ও ঝোপের মাথায়
মাথায় অস্তোন্মুখ সূর্য সিঁদুর
ছড়াইয়া দিয়াছে-সন্ধ্যার বাতাসে
বন্যপুষ্প ও তৃণগুল্মের সুঘ্রাণ, প্রতি
ঝোপ পাখির কাকলিতে মুখর, তার
মধ্যে হিমালয়ের বনটিয়াও আছে।
মুক্ত দূরপ্রসারী তৃণাবৃত প্রান্তর ও
শ্যামল বনভূমির মেলা।
এই সময় মাঝে মাঝে মনে হইত যে,
এখানে প্রকৃতির যে-রূপ দেখিতেছি,
এমনটি আর কোথাও দেখি নাই।
যতদূর চোখ যায়, এসব যেন আমার,
আমি এখানে একমাত্র মানুষ, আমার
নির্জনতা ভঙ্গ করিতে আসিবে না
কেউ-মুক্ত আকাশতলে নিস্তব্ধ
সন্ধ্যায় দূর দিগন্তের সীমারেখা
পর্যন্ত মনকে ও কল্পনাকে প্রসারিত
করিয়া দিই।
কাছারি হইতে প্রায় এক ক্রোশ দূরে
একটা নাবাল জায়গা আছে,
সেখানে ক্ষুদ্র কয়েকটি পাহাড়ি
ঝরনা ঝির্ ঝির্ করিয়া বহিয়া
যাইতেছে, তাহার দু-পারে জলজ
লিলির বন, কলিকাতার বাগানে
যাহাকে বলে স্পাইডার লিলি। বন্য
স্পাইডার লিলি কখনো দেখি নাই,
জানিতামও না যে, এমন নিভৃত
ঝরনার উপল-বিছানো তীরে ফুটন্ত
লিলি ফুলের এত শোভা হয় বা
বাতাসে তাহারা এত মৃদু কোমল
সুবাস বিস্তার করে। কতবার গিয়া
এখানটিতে চুপ করিয়া বসিয়া
আকাশ, সন্ধ্যা ও নির্জনতা উপভোগ
করিয়াছি।
মাঝে মাঝে ঘোড়ায় চড়িয়া
বেড়াই। প্রথম প্রথম ভালো চড়িতে
পারিতাম না, ক্রমে ভালোই
শিখিলাম। শিখিয়াই বুঝিলাম
জীবনে এত আনন্দ আর কিছুতেই নাই।
যে কখনো এমন নির্জন আকাশতলে
দিগন্তব্যাপী বনপ্রান্তরে
ইচ্ছামতো ঘোড়া ছুটাইয়া না
বেড়াইয়াছে, তাহাকে বোঝানো
যাইবে না সে কি আনন্দ! কাছারি
হইতে দশ-পনের মাইল দূরবর্তী
স্থানে সার্ভে পার্টি কাজ
করিতেছে, প্রায়ই আজকাল সকালে
এক পেয়ালা চা খাইয়া ঘোড়ার
পিঠে জিন কষিয়া সেই যে ঘোড়ায়
উঠি, কোনোদিন ফিরি বৈকালে,
কোনোদিন বা ফিরিবার পথে
জঙ্গলের মাথার উপর নক্ষত্র ওঠে,
বৃহস্পতি জ্বলজ্বল করে;
জ্যোৎস্নারাতে বনপুষ্পের সুবাস
জ্যোৎস্নার সহিত মেশে, শৃগালের
রব প্রহর ঘোষণা করে, জঙ্গলের ঝিঁ
ঝিঁ পোকা দল বাঁধিয়া ডাকিতে
থাকে।
২
যে কাজে এখানে আসা তার জন্য
অনেক চেষ্টা করা যাইতেছে। এত
হাজার বিঘা জমি, হঠাৎ বন্দোবস্ত
হওয়াও সোজা কথা নয় অবশ্য। আর
একটা ব্যাপার এখানে আসিয়া
জানিয়াছি, এই জমি আজ ত্রিশ বছর
পূর্বে নদীগর্ভে সিকস্তি হইয়া
গিয়াছিল-বিশ বছর হইল বাহির
হইয়াছে-কিন্তু যাহারা
পিতৃপিতামহের জমি গঙ্গায়
ভাঙ্গিয়া যাওয়ার পরে অন্যত্র
উঠিয়া গিয়া বাস করিয়াছিল, সেই
পুরাতন প্রজাদিগকে জমিদার এইসব
জমিতে দখল দিতে চাহিতেছেন
না। মোটা সেলামি ও বর্ধিত হারে
খাজনার লোভে নূতন প্রজাদের
সঙ্গেই বন্দোবস্ত করিতে চান। অথচ
যে-সব গৃহহীন, আশ্রয়হীন অতিদরিদ্র
পুরাতন প্রজাকে তাহাদের ন্যায্য
অধিকার হইতে বঞ্চিত করা হইয়াছে
তাহারা বারবার অনুরোধ-উপরোধ
কান্নাকাটি করিয়াও জমি
পাইতেছে না।
আমার কাছেও অনেকে
আসিয়াছিল। তাহাদের অবস্থা
দেখিলে কষ্ট হয়, কিন্তু জমিদারের
হুকুম, কোনো পুরাতন প্রজাকে জমি
দেওয়া হইবে না। কারণ একবার
চাপিয়া বসিলে তাহাদের পুরাতন
স্বত্ব তাহারা আইনত দাবি করিতে
পারে। জমিদারের লাঠির জোর
বেশি, প্রজারা আজ বিশ বৎসর
ভূমিহীন ও গৃহহীন অবস্থায় দেশে
দেশে মজুরি করিয়া খায়, কেহ
সামান্য চাষবাস করে, অনেকে
মরিয়া গিয়াছে, তাহাদের
ছেলেপিলেরা নাবালক বা অসহায়-
প্রবল জমিদারের বিরুদ্ধে স্রোতের
মুখে কুটার মতো ভাসিয়া যাইবে।
এদিকে নূতন প্রজা সংগ্রহ করা যায়
কোথা হইতে? মুঙ্গের, পূর্ণিয়া,
ভাগলপুর, ছাপরা প্রভৃতি নিকটবর্তী
জেলা হইতে লোক যাহারা আসে, দর
শুনিয়া পিছাইয়া যায়। দু-পাঁচজন
কিছু কিছু লইতেছেও। এইরূপ মৃদু
গতিতে অগ্রসর হইলে দশহাজার
বিঘা জঙ্গলী জমি প্রজাবিলি
হইতে বিশ-পঁচিশ বৎসর লাগিয়া
যাইবে।
আমাদের এক ডিহি কাছারি আছে-
সেও ঘোর জঙ্গলময় মহাল-এখান
থেকে উনিশ মাইল দূরে। জায়গাটার
নাম লবটুলিয়া, কিন্তু এখানেও যেমন
জঙ্গল, সেখানেও তেমনি, কেবল
সেখানে কাছারি রাখার উদ্দেশ্য
এই যে, সেই জঙ্গলটা প্রতিবছর
গোয়ালাদের গোরু-মহিষ চরাইবার
জন্য খাজনা করিয়া দেওয়া হয়। এ
বাদে সেখানে প্রায় দু’তিনশ বিঘা
জমিতে বন্যকুলের জঙ্গল আছে,
লাক্ষা-কীট পুষিবার জন্য লোকে এই
কুল-বন জমা লইয়া থাকে। এই
টাকাটা আদায় করিবার জন্য
সেখানে দশ টাকা মাহিনার একজন
পাটোয়ারী ও তাহার একটা ছোট
কাছারি আছে।
কুল-বন ইজারা দিবার সময়
আসিতেছে, একদিন ঘোড়া করিয়া
লবটুলিয়াতে রওনা হইলাম। আমার
কাছারি ও লবটুলিয়ার মাঝখানে
একটা উঁচু রাঙামাটির ডাঙা প্রায়
সাত-আট মাইল লম্বা, এর নাম
‘ফুলকিয়া বইহার’-কত ধরনের
গাছপালা ও ঝোপজঙ্গলে পরিপূর্ণ।
জায়গায় জায়গায় বন এত ঘন যে,
ঘোড়ার গায়ে ডালপালা ঠেকে।
ফুলকিয়া বইহার যেখানে নামিয়া
গিয়া সমতল ভূমির সহিত মিশিল,
চানন্ বলিয়া একটি পাহাড়ি নদী
সেখানে উপলখণ্ডের উপর দিয়া
ঝিরঝির করিয়া বহিতেছে,
বর্ষাকালে সেখানে জল খুব গভীর-
শীতকালে এখন তত জল নাই।
লবটুলিয়ায় এই প্রথম আসিলাম। অতি
ক্ষুদ্র এক খড়ের ঘর, তার মেজে জমির
সঙ্গে সমতল, ঘরের বেড়া পর্যন্ত
শুকনো কাশের, বনঝাউয়ের ডালের
পাতা দিয়া বাঁধা। সন্ধ্যার কিছু
পূর্বে সেখানে পৌঁছিলাম-এত শীত
যেখানে থাকি সেখানে নাই,
শীতে জমিয়া যাইবার উপক্রম
হইলাম বেলা না পড়িতেই।
সিপাহীরা বনের ডালপাতা
জ্বালাইয়া আগুন করিল, সেই
আগুনের ধারে ক্যাম্প-চেয়ারে
বসিলাম, অন্য সবাই গোল হইয়া
আগুনের চারিধারে বসিল।
কোথা হইতে সের পাঁচেক একটা রুই
মাছ পাটোয়ারী আনিয়াছিল, এখন
কথা উঠিল, রান্না করিবে কে?
আমি সঙ্গে পাচক আনি নাই।
নিজেও রান্না করিতে জানি না।
আমার সঙ্গে সাক্ষাৎ করিবার জন্য
সাত-আটজন লবটুলিয়াতে অপেক্ষা
করিতেছিল-তাহাদের মধ্যে
কণ্টুমিশ্র নামে এক মৈথিল
ব্রাহ্মণকে পাটোয়ারী রান্নার
জন্য নিযুক্ত করিল।
পাটোয়ারীকে বলিলাম-এ-সব
লোকেই কি ইজারা ডাকবে?
পাটোয়ারী বলিল-না হুজুর। ওরা
খাবার লোভে এসেছে। আপনার
আসবার নাম শুনে আজ দু-দিন ধরে
কাছারিতে এসে বসে আছে।
এদেশের লোকের ওই রকম অভ্যেস।
আরো অনেকে বোধ হয় কাল আসবে।
এমন কথা কখনো শুনি নাই। বলিলাম-
সে কি! আমি তো নিমন্ত্রণ করি নি
এদের?
-হুজুর, এরা বড় গরিব; ভাত জিনিসটা
খেতে পায় না। কলাইয়ের ছাতু,
মকাইয়ের ছাতু, এই এরা বারোমাস
খায়। ভাত খেতে পাওয়াটা এরা
ভোজের সমান বিবেচনা করে।
আপনি আসছেন, ভাত খেতে পাবে
এখানে, সেই লোভে সব এসেছে।
দেখুন না আরো কত আসে।
বাংলা দেশের লোকে বড় বেশি
সভ্য হইয়া গিয়াছে ইহাদের তুলনায়,
মনে হইল। কেন জানি না, এই
অন্নভোজনলোলুপ সরল ব্যক্তিগুলিকে
আমার সে-রাত্রে এত ভালো
লাগিল! আগুনের চারিধারে বসিয়া
তাহারা নিজেদের মধ্যে গল্প
করিতেছিল, আমি শুনিতেছিলাম।
প্রথমে তাহারা আমার আগুনে
বসিতে চাহে নাই আমার প্রতি
সম্মানসূচক দূরত্ব বজায় রাখিবার
জন্য-আমি তাহাদের ডাকিয়া
আনিলাম। কণ্টুমিশ্র কাছে বসিয়াই
আসান কাঠের ডালপালা
জ্বালাইয়া মাছ রাঁধিতেছে-ধুনা
পুড়াইবার মতো সুগন্ধ বাহির
হইতেছে ধোঁয়া হইতে-আগুনের
কুণ্ডের বাহিরে গেলে মনে হয়, যেন
আকাশ হইতে বরফ পড়িতেছে-এত
শীত!
খাওয়াদাওয়া হইতে রাত হইয়া গেল
অনেক; কাছারিতে যত লোক ছিল,
সকলেই খাইল। তারপর আবার আগুনের
ধারে গোল হইয়া বসা গেল। শীতে
মনে হইতেছে শরীরের রক্ত পর্যন্ত
জমিয়া যাইবে। ফাঁকা বলিয়াই
শীত বোধ হয় এত বেশি, কিংবা
বোধ হয় হিমালয় বেশি দূর নয়
বলিয়া।
আগুনের ধারে আমরা সাত-আটজন
লোক, সামনে ছোট ছোট দুখানি
খড়ের ঘর। একখানিতে থাকিব আমি,
আর একখানিতে বাকি এতগুলি
লোক। আমাদের চারিদিকে
ঘিরিয়া অন্ধকার বন ও প্রান্তর,
মাথার উপরে নক্ষত্র-ছড়ানো
দূরপ্রসারী অন্ধকার আকাশ। আমার
বড় অদ্ভুত লাগিল, যেন চিরপরিচিত
পৃথিবী হইতে নির্বাসিত হইয়া
মহাশূন্যে এক গ্রহে অন্য এক অজ্ঞাত
রহস্যময় জীবনধারার সহিত জড়িত
হইয়া পড়িয়াছি।
একজন ত্রিশ-বত্রিশ বছরের লোক এ-
দলের মধ্যে আমার মনোযোগকে
বিশেষভাবে আকৃষ্ট করিয়াছিল।
লোকটির নাম গনোরী তেওয়ারী;
শ্যামবর্ণ দোহারা চেহারা, মাথায়
বড় চুল, কপালে দুটি লম্বা ফোঁটা
কাটা, এই শীতে গায়ে একখানা
মোটা চাদর ছাড়া আর কিছু নাই, এ-
দেশের রীতি অনুযায়ী গায়ে একটা
মেরজাই থাকা উচিত ছিল, তা
পর্যন্ত নাই। অনেকক্ষণ হইতে আমি
লক্ষ্য করিতেছিলাম, সে সকলের
দিকে কেমন কুণ্ঠিতভাবে
চাহিতেছিল, কারো কথায় কোনো
প্রতিবাদ করিতেছিল না, অথচ কথা
যে সে কম বলিতেছিল তা নয়।
আমার প্রতি কথার উত্তরে কেবল
সে বলে-হুজুর।
এদেশের লোকে যখন কোনো মান্য ও
উচ্চপদস্থ ব্যক্তির কথা মানিয়া লয়,
তখন কেবল মাথা সামনের দিকে
অল্প ঝাঁকাইয়া সসম্ভ্রমে বলে-হুজুর।
গনোরীকে বলিলাম-তুমি থাকো
কোথায়, তেওয়ারীজি?
আমি যে তাহাকে সরাসরি প্রশ্ন
করিব, এতটা সম্মান যেন তাহার
পক্ষে সম্পূর্ণ অপ্রত্যাশিত, এভাবে
সে আমার দিকে চাহিল। বলিল-
ভীমদাসটোলা, হুজুর।
তারপর সে তাহার জীবনের ইতিহাস
বর্ণনা করিয়া গেল, একটানা নয়,
আমার প্রশ্নের উত্তরে টুকরা টুকরা
ভাবে।
গনোরী তেওয়ারীর বয়স যখন বারো
বছর, তার বাপ তখন মারা যায়। এক
বৃদ্ধা পিসিমা তাহাকে মানুষ করে,
সে পিসিমাও বাপের মৃত্যুর বছর-
পাঁচ পরে যখন মারা গেলেন, গনোরী
তখন জগতে ভাগ্য অন্বেষণে বাহির
হইল। কিন্তু তাহার জগৎ পূর্বে
পূর্ণিয়া শহর, পশ্চিমে ভাগলপুর
জেলার সীমানা, দক্ষিণে এই
নির্জন অরণ্যময় ফুলকিয়া বইহার,
উত্তরে কুশী নদী-ইহারই মধ্যে
সীমাবদ্ধ। ইহারই মধ্যে গ্রামে
গ্রামে গৃহস্থের দুয়ারে ফিরিয়া
কখনো ঠাকুরপূজা করিয়া, কখনো
গ্রাম্য পাঠশালায় পণ্ডিতি করিয়া
কায়ক্লেশে নিজের আহারের জন্য
কলাইয়ের ছাতু ও চীনা ঘাসের
দানার রুটির সংস্থান করিয়া
আসিয়াছে। সম্প্রতি মাস দুই চাকুরি
নাই, পর্বতা গ্রামের পাঠশালা
উঠিয়া গিয়াছে, ফুলকিয়া বইহারের
দশ হাজার বিঘা অরণ্যময় অঞ্চলে
লোকের বস্তি নাই-এখানে যে
মহিষপালকের দল মহিষ চরাইতে
আনে জঙ্গলে, তাহাদের বাথানে
বাথানে ঘুরিয়া খাদ্যভিক্ষা
করিয়া বেড়াইতেছিল-আজ আমার
আসিবার খবর পাইয়া অনেকের
সঙ্গে এখানে আসিয়াছে।
আসিয়াছে কেন, সে কথা আরো
চমৎকার।
-এখানে এত লোক এসেছে কেন
তেওয়ারীজি?
-হুজুর, সবাই বললে ফুলকিয়ার
কাছারিতে ম্যানেজার এসেছেন,
সেখানে গেলে ভাত খেতে পাওয়া
যাবে, তাই ওরা এল, ওদের সঙ্গে
আমিও এলাম।
-ভাত এখানকার লোকে কি খেতে
পায় না?
-কোথায় পাবে হুজুর। নউগচ্ছিয়ায়
মাড়োয়ারীরা রোজ ভাত খায়,
আমি নিজে আজ ভাত খেলাম বোধ
হয় তিন মাস পরে। গত ভাদ্রমাসের
সংক্রান্তিতে রাসবিহারী সিং
রাজপুতের বাড়ি নেমন্তন্ন ছিল, সে
বড়লোক, ভাত খাইয়েছিল। তারপর
আর খাই নি।
যতগুলি লোক আসিয়াছিল, এই
ভয়ানক শীতে কাহারো গাত্রবস্ত্র
নাই, রাত্রে আগুন পোহাইয়া রাত
কাটায়। শেষ-রাত্রে শীত যখন
বেশি পড়ে, আর ঘুম হয় না শীতের
চোটে-আগুনের খুব কাছে ঘেঁষিয়া
বসিয়া থাকে ভোর পর্যন্ত।
কেন জানি না, ইহাদের হঠাৎ এত
ভালো লাগিল! ইহাদের দারিদ্র্য,
ইহাদের সারল্য, কঠোর জীবন
সংগ্রামে ইহাদের যুঝিবার ক্ষমতা-
এই অন্ধকার আরণ্যভূমি ও হিমবর্ষী
মুক্ত আকাশ বিলাসিতার কোমল
পুষ্পাস্তৃত পথে ইহাদের যাইতে দেয়
নাই, কিন্তু ইহাদিগকে সত্যকার
পুরুষমানুষ করিয়া গড়িয়াছে। দুটি
ভাত খাইতে পাওয়ার আনন্দে যারা
ভীমদাসটোলা ও পর্বতা হইতে
ন’মাইল পথ হাঁটিয়া আসিয়াছে
বিনা নিমন্ত্রণে-তাহাদের মনের
আনন্দ গ্রহণ করিবার শক্তি কত
সতেজ ভাবিয়া বিস্মিত হইলাম।
অনেক রাত্রে কিসের শব্দে ঘুম
ভাঙ্গিয়া গেল-শীতে মুখ বাহির
করাও যেন কষ্টকর, এমন যে শীত
এখানে তা না-জানার দরুন উপযুক্ত
গরম কাপড় ও লেপ-তোশক আনি নাই।
কলিকাতায় যে-কম্বল গায়ে দিতাম
সেখানাই আনিয়াছিলাম-
শেষরাত্রে সে যেন ঠাণ্ডা জল
হইয়া যায় প্রতিদিন। যে-পাশে
শুইয়া থাকি, শরীরের গরমে সে-
দিকটা তবুও থাকে এক রকম, অন্য
কাতে পাশ ফিরিতে গিয়া দেখি
বিছানা কন্কন্ করিতেছে সে-
পাশে-মনে হয় যেন ঠাণ্ডা পুকুরের
জলে পৌষ মাসের রাত্রে ডুব
দিলাম। পাশেই জঙ্গলের মধ্যে
কিসের যেন সম্মিলিত পদশব্দ-
কাহারা যেন দৌড়িতেছে-
গাছপালা, শুকনো বনঝাউয়ের গাছ
মট্মট্ শব্দে ভাঙিয়া ঊর্ধ্বশ্বাসে
দৌড়িতেছে।
কি ব্যাপারখানা, কিছু বুঝিতে না
পারিয়া সিপাহী বিষ্ণুরাম পাঁড়ে
ও স্কুলমাস্টার গনোরী তেওয়ারীকে
ডাক দিলাম। তাহারা নিদ্রাজড়িত
চোখে উঠিয়া বসিল-কাছারির
মেঝেতে যে-আগুন জ্বালা
হইয়াছিল, তাহারই শেষ
দীপ্তিটুকুতে ওদের মুখে
আলস্যসম্ভ্রম ও নিদ্রালুতার ভাব
ফুটিয়া উঠিল। গনোরী তেওয়ারী
কান পাতিয়া একটু শুনিয়াই বলিল-
কিছু না হুজুর, নীলগাইয়ের জেরা
দৌড়চ্ছে জঙ্গলে-
কথা শেষ করিয়াই সে নিশ্চিন্ত
মনে পাশ ফিরিয়া শুইতে
যাইতেছিল, জিজ্ঞাসা করিলাম-
নীলগাইয়ের দল হঠাৎ এত রাত্রে
অমন দৌড়ুবার কারণ কি?
বিষ্ণুরাম পাঁড়ে আশ্বাস দিবার
সুরে বলিল-হয়তো কোনো
জানোয়ারে তাড়া করে থাকবে
হুজুর-এ ছাড়া আর কি।
-কি জানোয়ার?
-কি আর জানোয়ার হুজুর, জঙ্গলের
জানোয়ার। শের হতে পারে-নয় তো
ভালু-
যে-ঘরে শুইয়া আছি, নিজের
অজ্ঞাতসারে তাহার কাশডাঁটায়
বাঁধা আগড়ের দিকে নজর পড়িল। সে
আগড়ও এত হালকা যে, বাহির হইতে
একটি কুকুরে ঠেলা মারিলেও তাহা
ঘরের মধ্যে উল্টাইয়া পড়ে-এমন
অবস্থায় ঘরের সামনেই জঙ্গলে
নিস্তব্ধ নিশীথরাত্রের বাঘ বা
ভালুকে বন্য নীলগাইয়ের দল তাড়া
করিয়া লইয়া চলিয়াছে-এ
সংবাদটিতে যে বিশেষ আশ্বস্ত
হইলাম না তাহা বলাই বাহুল্য।
একটু পরেই ভোর হইয়া গেল।
৩
দিন যতই যাইতে লাগিল, জঙ্গলের
মোহ ততই আমাকে ক্রমে পাইয়া
বসিল। এর নির্জনতা ও অপরাহ্নের
সিদুঁর-ছড়ানো বনঝাউয়ের জঙ্গলের
কি আকর্ষণ আছে বলিতে পারি না-
আজকাল ক্রমশ মনে হয় এই
দিগন্তব্যাপী বিশাল বনপ্রান্তর
ছাড়িয়া, ইহার রোদপোড়া মাটির
তাজা সুগন্ধ, এই স্বাধীনতা, এই
মুক্তি ছাড়িয়া কলিকাতার
গোলমালের মধ্যে আর ফিরিতে
পারিব না!
এ মনের ভাব একদিনে হয় নাই। কত
রূপে কত সাজেই যে বন্যপ্রকৃতি
আমার মুগ্ধ অনভ্যস্ত দৃষ্টির সম্মুখে
আসিয়া আমায় ভুলাইল!-কত সন্ধ্যা
আসিল অপূর্ব রক্তমেঘের মুকুট
মাথায়, দুপুরের খরতর রৌদ্র আসিল
উন্মাদিনী ভৈরবীর বেশে, গভীর
নিশীথে জ্যোৎস্নাবরণী সুরসুন্দরীর
সাজে হিমস্নিগ্ধ বনকুসুমের সুবাস
মাখিয়া, আকাশভরা তারার মালা
গলায়-অন্ধকার রজনীতে কালপুরুষের
আগুনের খড়গ হাতে দিগ্বিদিক
ব্যাপিয়া বিরাট কালীমূর্তিতে।
৪
একদিনের কথা জীবনে কখনো ভুলিব
না। মনে আছে সেদিন
দোলপূর্ণিমা। কাছারির
সিপাহীরা ছুটি চাহিয়া লইয়া
সারাদিন ঢোল বাজাইয়া হোলি
খেলিয়াছে। সন্ধ্যার সময়েও
নাচগানের বিরাম নাই দেখিয়া
আমি নিজের ঘরে টেবিলে আলো
জ্বালাইয়া অনেক রাত পর্যন্ত হেড
আপিসের জন্য চিঠিপত্র লিখিলাম।
কাজ শেষ হইতেই ঘড়ির দিকে
চাহিয়া দেখি, রাত প্রায় একটা
বাজে। শীতে জমিয়া যাইবার
উপক্রম হইয়াছি। একটা সিগারেট
ধরাইয়া জানালা দিয়া বাহিরের
দিকে উঁকি মারিয়া মুগ্ধ ও বিস্মিত
হইয়া দাঁড়াইয়া রহিলাম। যে-
জিনিসটা আমাকে মুগ্ধ করিল
তাহা পূর্ণিমা-নিশীথিনীর
অবর্ণনীয় জ্যোৎস্না।
হয়তো যতদিন আসিয়াছি, শীতকাল
বলিয়া গভীর রাত্রে কখনো
বাহিরে আসি নাই কিংবা অন্য যে
কোনো কারণেই হউক, ফুলকিয়া
বইহারের পরিপূর্ণ
জ্যোৎস্নারাত্রির রূপ এই আমি
প্রথম দেখিলাম।
দরজা খুলিয়া বাহিরে আসিয়া
দাঁড়াইলাম। কেহ কোথাও নাই,
সিপাহীরা সারাদিন আমোদ
প্রমোদের পরে ক্লান্ত দেহে
ঘুমাইয়া পড়িয়াছে। নিঃশব্দ
অরণ্যভূমি, নিস্তব্ধ জনহীন
নিশীথরাত্রি। সে
জ্যোৎস্নারাত্রির বর্ণনা নাই।
কখনো সে-রকম ছায়াবিহীন
জ্যোৎস্না জীবনে দেখি নাই।
এখানে খুব বড় বড় গাছ নাই,
ছোটখাটো বনঝাউ ও কাশবন-
তাহাতে তেমন ছায়া হয় না।
চক্চকে সাদা বালি মিশানো জমি
ও শীতের রৌদ্রে অর্ধশুষ্ক কাশবনে
জ্যোৎস্না পড়িয়া এমন এক
অপার্থিব সৌন্দর্যের সৃষ্টি
করিয়াছে, যাহা দেখিলে মনে
কেমন ভয় হয়। মনে কেমন যেন একটা
উদাস বাঁধনহীন মুক্তভাব-মন হু-হু
করিয়া ওঠে, চারিধারে চাহিয়া
সেই নীরব নিশীথরাত্রে
জ্যোৎস্নাভরা আকাশতলে
দাঁড়াইয়া মনে হইল এক অজানা
পরীরাজ্যে আসিয়া পড়িয়াছি-
মানুষের কোনো নিয়ম এখানে
খাটিবে না। এইসব জনহীন স্থান
গভীর রাত্রে জ্যোৎস্নালোকে
পরীদের বিচরণভূমিতে পরিণত হয়,
আমি অনধিকার প্রবেশ করিয়া
ভালো করি নাই।
তাহার পর ফুলকিয়া বইহারের
জ্যোৎস্নারাত্রি কতবার
দেখিয়াছি-ফাল্গুনের মাঝামাঝি
যখন দুধ্লি ফুল ফুটিয়া সমস্ত
প্রান্তরে যেন রঙিন ফুলের গালিচা
বিছাইয়া দেয়, তখন কত
জ্যোৎস্নাশুভ্র রাত্রে বাতাসে
দুধ্লি ফুলের মিষ্ট সুবাস প্রাণ
ভরিয়া আঘ্রাণ করিয়াছি-প্রত্যেক
বারেই মনে হইয়াছে জ্যোৎস্না যে
এত অপরূপ হইতে পারে, মনে এমন
ভয়মিশ্রিত উদাস ভাব আনিতে
পারে, বাংলা দেশে থাকিতে
তাহা তো কোনোদিন ভাবিও নাই!
ফুলকিয়ার সে জ্যোৎস্নারাত্রির
বর্ণনা দিবার চেষ্টা করিব না,
সেরূপ সৌন্দর্যালোকের সহিত
প্রত্যক্ষ পরিচয় যতদিন না হয় ততদিন
শুধু কানে শুনিয়া বা লেখা পড়িয়া
তাহা উপলব্ধি করা যাইবে না-করা
সম্ভব নয়। অমন মুক্ত আকাশ, অমন
নিস্তব্ধতা, অমন নির্জনতা, অমন
দিগ্দিগন্ত-বিসর্পিত বনানীর
মধ্যেই শুধু অমনতর রূপলোক ফুটিয়া
ওঠে। জীবনে একবারও সে
জ্যোৎস্নারাত্রি দেখা উচিত; যে
না দেখিয়াছে, ভগবানের সৃষ্টির
একটি অপূর্ব রূপ তাহার নিকট চির-
অপরিচিত রহিয়া গেল।
৫
একদিন ডিহি আজমাবাদের সার্ভে-
ক্যাম্প হইতে ফিরিবার সময় সন্ধ্যার
মুখে বনের মধ্যে পথ হারাইয়া
ফেলিলাম। বনের ভূমি সর্বত্র সমতল
নয়, কোথাও উঁচু জঙ্গলাবৃত
বালিয়াড়ি টিলা, তার পরই দুটি
টিলার মধ্যবর্তী ছোটখাটো
উপত্যকা। জঙ্গলের কিন্তু কোথাও
কোনো বিরাম নাই-টিলার মাথায়
উঠিয়া চারিদিকে চাহিয়া
দেখিলাম যদি কোনো দিকে
কাছারির মহাবীরের ধ্বজার আলো
দেখা যায়-কোনো দিকে আলোর
চিহ্নও নাই-শুধু উঁচুনিচু টিলা ও
ঝাউবন আর কাশবন-মাঝে মাঝে
শাল ও আসান গাছের বনও আছে। দুই
ঘণ্টা ঘুরিয়াও যখন জঙ্গলের
কূলকিনারা পাইলাম না, তখন হঠাৎ
মনে পড়িল নক্ষত্র দেখিয়া দিক
ঠিক করি না কেন। গ্রীষ্মকাল,
কালপুরুষ দেখি প্রায় মাথার উপর
রহিয়াছে। বুঝিতে পারিলাম না
কোন্দিক হইতে আসিয়া কালপুরুষ
মাথার উপর উঠিয়াছে-সপ্তর্ষিমণ্ডল
খুঁজিয়া পাইলাম না। সুতরাং
নক্ষত্রের সাহায্যে দিক্-নিরূপণের
আশা পরিত্যাগ করিয়া ঘোড়াকে
ইচ্ছামতো ছাড়িয়া দিলাম। মাইল
দুই গিয়া জঙ্গলের মধ্যে একটা আলো
দেখা গেল। আলো লক্ষ্য করিয়া
সেখানে উপস্থিত হইয়া দেখিলাম,
জঙ্গলের মধ্যে কুড়ি বর্গহাত
আন্দাজ পরিষ্কার স্থানে একটা খুব
নিচু ঘাসের খুপরি। কুঁড়ের সামনে
গ্রীষ্মের দিনেও আগুন জ্বালানো।
আগুনের নিকট হইতে একটু দূরে একটা
লোক বসিয়া কি করিতেছে। আমার
ঘোড়ার পায়ের শব্দ শুনিয়া লোকটি
চমকিয়া উঠিয়া দাঁড়াইয়া বলিল-
কে? তার পরেই আমায় চিনিতে
পারিয়া তাড়াতাড়ি কাছে আসিল
ও আমাকে খুব খাতির করিয়া ঘোড়া
হইতে নামাইল।
পরিশ্রান্ত হইয়াছিলাম, প্রায় ছ-
ঘণ্টা আছি ঘোড়ার উপর, কারণ
সার্ভে ক্যাম্পেও আমিনের পিছু
পিছু ঘোড়ায় টো টো করিয়া
জঙ্গলের মধ্যে ঘুরিয়াছি। লোকটার
প্রদত্ত একটা ঘাসের চেটাইয়ে
বসিলাম। জিজ্ঞাসা করিলাম-
তোমার নাম কি? লোকটা বলিল-গনু
মাহাতো, জাতি গাঙ্গোতা। এ
অঞ্চলে গাঙ্গোতা জাতির
উপজীবিকা চাষবাস ও পশুপালন,
তাহা আমি এতদিনে
জানিয়াছিলাম-কিন্তু এ লোকটা এই
জনহীন গভীর বনের মধ্যে একা কি
করে?
বলিলাম-তুমি এখানে কি কর?
তোমার বাড়ি কোথায়?
- হুজুর, মহিষ চরাই। আমার ঘর এখান
থেকে দশ ক্রোশ উত্তরে ধরমপুর,
লছমনিয়াটোলা।
- নিজের মহিষ? কতগুলো আছে?
লোকটা গর্বের সুরে বলিল- পাঁচটা
মহিষ আছে হুজুর।
পাঁচটা মহিষ। দস্তুরমতো অবাক
হইলাম। দশ ক্রোশ দূরের গ্রাম হইতে
পাঁচটা মাত্র মহিষ সম্বল করিয়া
লোকটি এই বিজন বনের মধ্যে
মহিষচরির খাজনা দিয়া একা খুপরি
বাঁধিয়া মহিষ চরায়-দিনের পর দিন,
মাসের পর মাস, এই ছোট্ট
খুপরিটাতে কি করিয়া সময় কাটায়-
কলিকাতা হইতে নূতন আসিয়াছি,
শহরের থিয়েটার-বায়োস্কোপে
লালিত যুবক আমি- বুঝিতে
পারিলাম না।
কিন্তু এদেশের অভিজ্ঞতা আরো
বেশি হইলে বুঝিয়াছিলাম কেন গনু
মাহাতো ওভাবে থাকে। তাহার
অন্য কোনো কারণ নাই ইহা ছাড়া
যে, গনু মাহাতোর জীবনের ধারণাই
এইরূপ। যখন তাহার পাঁচটি মহিষ তখন
তাহাদের চরাইতে হইবে, এবং যখন
চরাইতে হইবে, তখন জঙ্গলে আছে,
কুঁড়ে বাঁধিয়া একা থাকিতেই হইবে।
এ অত্যন্ত সাধারণ কথা, ইহার মধ্যে
আশ্চর্য হইবার কি আছে!
গনু কাঁচা শালপাতায় একটা লম্বা
পিকা বা চুরুট তৈরি করিয়া আমার
হাতে সসম্ভ্রমে দিয়া আমায়
অভ্যর্থনা করিল। আগুনের আলোতে
উহার মুখ দেখিলাম-বেশ চওড়া
কপাল, উঁচু নাক, রং কালো- মুখশ্রী
সরল, শান্ত চোখের দৃষ্টি। বয়স
ষাটের উপর হইবে, মাথার চুল একটিও
কালো নাই। কিন্তু শরীর এমন
সুগঠিত যে, এই বয়সেও প্রত্যেকটি
মাংসপেশী আলাদা করিয়া গুনিয়া
লওয়া যায়।
গনু আগুনে আরো বেশি কাঠ
ফেলিয়া দিয়া নিজেও একটি
শালপাতার পিকা ধরাইল। আগুনের
আভায় খুপরির মধ্যে এক-আধখানা
পিতলের বাসন চক্চক্ করিতেছে।
আগুনের কুণ্ডের মণ্ডলীর বাহিরে
ঘোরতর অন্ধকার ও ঘন বন। বলিলাম-
গনু, একা এখানে থাক, জন্তু-
জানোয়ারের ভয় করে না? গনু বলিল-
ভয় ডর করলে আমাদের কি চলে হুজুর?
আমাদের যখন এই ব্যবসা! সেদিন
তো রাত্রে আমার খুপরির পেছনে
বাঘ এসেছিল। মহিষের দুটো বাচ্চা
আছে, ওদের ওপর তাক্। শব্দ শুনে
রাত্রে উঠে টিন বাজাই; মশাল
জ্বালি, চিৎকার করি! রাত্রে আর
ঘুম হোলো না হুজুর; শীতকালে তো
সারারাত এই বনে ফেউ ডাকে।
-খাও কি এখানে? দোকানটোকান
তো নেই, জিনিসপত্র পাও কোথায়?
চালডাল-
-হুজুর, দোকানে জিনিস কেনবার
মতো পয়সা কি আমাদের আছে, না
আমরা বাঙালি বাবুদের মতো ভাত
খেতে পাই? এই জঙ্গলের পেছনে
আমার দু-বিঘে খেড়ী ক্ষেত আছে।
খেড়ীর দানা সিদ্ধ, আর জঙ্গলে
বাথুয়া শাক হয়, তাই সিদ্ধ, আর একটু
লুন, এই খাই। ফাগুন মাসে জঙ্গলে
গুড়মী ফল ফলে, লুন দিয়ে কাঁচা
খেতে বেশ লাগে- লতানে গাছ,
ছোট ছোট কাঁকুড়ের মতো ফল হয়; সে
সময় এক মাস এ-অঞ্চলের যত গরিব
লোক গুড়মী ফল খেয়ে কাটিয়ে দেয়।
দলে দলে ছেলেমেয়ে আসবে
জঙ্গলের গুড়মী তুলতে।
জিজ্ঞাসা করিলাম-রোজ রোজ
খেড়ীর দানা সিদ্ধ আর বাথুয়া শাক
ভালো লাগে?
- কি করব হুজুর, আমরা গরিব লোক,
বাঙালি বাবুদের মতো ভাত খেতে
পাব কোথায়? ভাত এ অঞ্চলের মধ্যে
কেবল রাসবিহারী সিং আর
নন্দলাল পাঁড়ে খায় দুবেলা।
সারাদিন মহিষের পেছনে ভূতের
মতন খাটি হুজুর, সন্ধের সময় ফিরি
যখন, তখন এত ক্ষিদে পায় যে, যা
পাই খেতে তাই ভালো লাগে।
গনুকে বলিলাম-কলকাতা শহর
দেখেছ গনু?
- না হুজুর। কানে শুনেছি। ভাগলপুর
শহরে একবার গিয়েছি, বড় ভারি
শহর। ওখানে হাওয়ার গাড়ি
দেখেছি, বড় তাজ্জব চিজ হুজুর।
ঘোড়া নেই, কিছু নেই, আপনা-আপনি
রাস্তা দিয়া চলছে।
এই বয়সে উহার স্বাস্থ্য দেখিয়া
অবাক হইলাম। সাহসও যে আছে ইহা
মনে মনে স্বীকার করিতে হইল।
গনুর জীবিকানির্বাহের একমাত্র
অবলম্বন মহিষ কয়টি। তাদের দুধ
অবশ্য এ-জঙ্গলে কে কিনিবে, দুধ
হইতে মাখন তুলিয়া ঘি করে ও দু-
তিন মাসের ঘি একত্রে জমাইয়া ন-
মাইল দূরবর্তী ধরমপুরের বাজারে
মাড়োয়ারীদের নিকট বিক্রয়
করিয়া আসে। আর থাকিবার মধ্যে
ওই দু-বিঘা খেড়ী অর্থাৎ
শ্যামাঘাসের ক্ষেত, যার দানা
সিদ্ধ এ-অঞ্চলের প্রায় সকল গরিব
লোকেরই একটা প্রধান খাদ্য। গনু
সে-রাত্রে আমাকে কাছারিতে
পৌঁছাইয়া দিল, কিন্তু গনুকে আমার
এত ভালো লাগিল যে, কতবার শান্ত
বৈকালে তাহার খুপরির সামনে
আগুন পোহাইতে পোহাইতে গল্প
করিয়া কাটাইয়াছি। ওদেশের
নানারূপ তথ্য গনুর কাছে যেরূপ
শুনিয়াছিলাম, অত কেউ দিতে
পারে নাই। গনুর মুখে কত অদ্ভুত কথা
শুনিতাম। উড়ুক্কু সাপের কথা,
জীবন্ত পাথর ও আঁতুড়ে ছেলের
হাঁটিয়া বেড়াইবার কথা, ইত্যাদি।
ওই নির্জন জঙ্গলের পারিপার্শ্বিক
অবস্থার সঙ্গে গনুর সে-সব গল্প অতি
উপাদেয় ও অতি রহস্যময় লাগিত-
আমি জানি কলকাতা শহরে বসিয়া
সে-সব গল্প শুনিলে তাহা আজগুবী ও
মিথ্যা মনে হইতে বাধ্য। যেখানে-
সেখানে যে-কোনো গল্প শোনা
চলে না, গল্প শুনিবার পটভূমি ও
পারিপার্শ্বিক অবস্থার উপর উহার
মাধুর্য যে কতখানি নির্ভর করে,
তাহা গল্পপ্রিয় ব্যক্তি মাত্রেই
জানেন। গনুর সকল অভিজ্ঞতার মধ্যে
আমার আশ্চর্য বলিয়া মনে
হইয়াছিল বন্যমহিষের দেবতা
টাঁড়বারোর কথা।
কিন্তু, যেহেতু এই গল্পের একটি
অদ্ভুত উপসংহার আছে-সেজন্য সে-
কথা এখন না বলিয়া যথাস্থানে
বলিব। এখানে বলিয়া রাখি, গনু
আমাকে যে-সব গল্প বলিত-তাহা
রূপকথা নহে, তাহার ব্যক্তিগত
অভিজ্ঞতার বিষয়। গনু জীবনকে
দেখিয়াছে তবে অন্যভাবে। অরণ্য-
প্রকৃতির ঘনিষ্ঠ সংস্পর্শে আজীবন
কাটাইয়া সে অরণ্য-প্রকৃতির
সম্বন্ধে একজন রীতিমতো
বিশেষজ্ঞ ব্যক্তি। তাহার কথা
হঠাৎ উড়াইয়া দেওয়া চলে না।
মিথ্যা বানাইয়া বলিবার মতো
কল্পনাশক্তিও গনুর আছে বলিয়া
আমার মনে হয় নাই।
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now