বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
ঢাকা শহরে ঘুঘুর ডাক শোনার কথা না।
কেউ কোনোদিন শুনেছে বলেও শুনি নি।ঘুঘু শহর পছন্দ করে না, লোকজন পছন্দ করে না।তাদের পছন্দ গ্রামের শান্ত দুপুর।তারপরেও কী যে হয়েছে—আমি ঘুঘুর ডাক শুনছি।বাংলাবাজার যাচ্ছিলাম, গুলিস্তানে ট্রাফিক জ্যামে পড়লাম।রিকশা, টেম্পো, বাস, ঠেলাগাড়ি সবকিছু মিলিয়ে দেখতে দেখতে জট পাকিয়ে গেলে।এক্কেবারে কঠিন গিট্টু। হতাশ হয়ে রিকশায় বসে আছি আর ভাবছি—আধুনিক মানুষের একজোড়া পাখা থাকলে ভালো হতো।জটিল ট্রাফিক জ্যামের সময় তারা উড়ে যেতে পারত।ঠিক এই রকম হতাশা-জর্জরিত সময়ে ঘুঘু পাখির ডাক শুনলাম। সেই অতি পরিচিত শান্ত বিলম্বিত টানা-টানা সুর, যা শুনলে মুহূর্তের মধ্যে বুকের মধ্যে মোচড় দিয়ে ওঠে।মানুষের শরীরের ভেতরে যে আরেকটি শরীর আছে তার মধ্যে কাঁপন ধরে।
আমি হতচকিত ভঙ্গিতে এদিক-ওদিক তাকালাম।এমন কি হতে পারে যে কেউ খাঁচায় করে পাখি নিয়ে যাচ্ছে, সেই পাখি ডেকে উঠল? ইদানিং ঢাকার লোকদের পাখি-পোষা অভ্যাসে ধরেছে।নীলক্ষতে বিরাট পাখি বাজার।
ট্রাফিক জট কমছে না।জট কমানোর চেষ্টাও কেউ করছে না।রোগা ধরনের এক ট্রাফিক পুলিশ দাঁড়িয়ে বাদামওয়ালার সঙ্গে কথাবার্তা বলছে।এখানে যে কঠিন অবস্থা তা সে জানে বলেও মনে হচ্ছে না।এই তো দেখি সে বাদাম কিনছে।এক ঠোঙা বাদাম, একটু ঝাল লবণ।
যতই সময় যাচ্ছে অবস্থা জটিল হয়ে আসছে।সবাই কিন্তু নির্বিকার –‘যা হবার হোক’ এমন এক ভঙ্গি। কারো মধ্যেই কোনো অস্থিরতা নেই। আমার রিকশা ঘেঁসে একটা মাইক্রোবাস দাঁড়িয়ে।মাইক্রোবাসের পর্দা টেনে দেয়া।ভেতরের যাত্রীদের কাউকে দেখা যাচ্ছে না।মাইক্রোবাসের ড্রাইভারকে শুধু দেখছি।মনে হলো সে খুব মজা পাচ্ছে।একবার সে উঁচু গলায় বলল, লাগছে।
গিট্টু।
চড়চড় করে রোদ বাড়ছে। আশ্বিন মাসে খুব ঝাঁজালো রোদ ওঠে।বাতাস থাকে মধুর।আজ বাতাস নেই, শুধুই রোদ।রোদের সঙ্গে ঘামের গন্ধের সঙ্গে পেট্রোলের গন্ধ, পেট্রোলের গন্ধের সঙ্গে ঘুঘুর ডাক ঘু-ঘু-ঘু। মিলছে না একেবারেই মিলছে না।Something is wrong. আমি রিকশাওয়ালাকে বললাম, পাখি ডাকছে নাকি?
আমার রিকশাওয়ালা বিরক্তমুখে আমার দিকে তাকাল।অর্থাৎ ঘুঘু ডাকছে করে আমাকে দেখছেন।ভদ্রমহিলার সিঁথির চুল পাকা।এছাড়া তাঁর মুখে বয়সের কোনো চিহ্ন নেই।চুল পাকা না থাকলে অনায়াসে তাঁকে ৩০/৩২ বছরের তরুণী বলে চালানো যেত।তিনি জানালার পর্দা সরিয়েছেন পানের পিক ফেলার জন্যে।অনেকখানি মাথা বের করে একগাদা পানের পিক ফেলে হাসিমুখে আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, তুই হিমু না?
আমি জবাব দিলাম না, কারণ ভদ্রমহিলাকে আমি চিনতে পারছি না।আমার অতি দূরের কোনো আত্মীয় হবেন।মেয়েরা অতি দূরের আত্মীয়কে কাছের মানুষ প্রমাণ করার জন্যে চট করে তুই বলে।
কী রে, কথা বলছিস না কেন? তুই কি হিমু?
হ্যাঁ।
আমাকে চিনতে পারছিস?
না।
আমি আলেয়া খালা।এখন চিনেছিস?
আলেয়া নামে কাউকে চিনি বলে মনে পড়ল না।একজন আলেয়াকেই চিনতাম, সে সিরাজউদ্দৌলা নাটকের নর্তকী।সিরাজউদ্দৌলা পলাশীর আম্রকাননে তাঁর বিখ্যাত যু্দ্ধ যাত্রার আগে আলোয়ার কাছ থেকে বিদায় নিতে গেলেন, আলেয়া তখন গান ধরল—‘পথহার পাখি, কেঁদে ফিরে একা’।
হিমু,তুই এখানে কী করছিস?
রিকশার উপরে বসে আছি ।
সে তো দেখতে পাচ্ছি । যাচ্ছিস কোথায় ?
যখন রিকশায় উঠেছিলাম, তখন একটা গন্তব্য ছিল ।এখন নিজেও ভুলে গেছি ।আমার সঙ্গে ফাজলামি করছিস না ? আমি তোর খালা না ? আয়, উঠে আয় ।
কোথায় উঠে আসবো?
বাসে উঠে আয়। গরমে সিদ্ধ হবি না কি? তুই যেখানে যাবি, নামিয়ে দেব।রিকশা ভাড়া মিটিয়ে উঠে আয়।
আমি কথা বাড়ালাম না।রিকশাওয়ালাকে ভাড়া মিটিয়ে মাইক্রোবাসে উঠে পড়লাম।রিকশাওয়ালাকে দেখে মনে হলো, সে অত্যন্ত অপমানিত বোধ করছে।অপমানিত বোধ করারই কথা,তার রিকশাকে ছোট করা হয়েছে।
মাইক্রোবাসে ঢুকে মনে হলো—ছোটখাটো একটা চলন্ত বেহেশতে ঢুকে পড়েছি।এয়ারকন্ডিশান্ড গাড়ি, এয়ারকন্ডিশনার চালু আছে।শীত-শীত ভাব। মাইক্রোবাসটার ছাদে একটা অংশ কাচের।ভেতরে বসে আকাশ দেখা যাচ্ছে।ছয়জনের বসার জায়গা। প্রতিটি সিট আলাদা।সিটগুলো ঘূর্ণায়মান।যেদিকে ইচ্ছা সেদিকে ঘুরানো যায়।ভদ্রমহিলা একা যাচ্ছে না, গাঢ় সানগ্লাসে মুখের পুরোটাই প্রায় ঢাকা। মেয়েটির কোলের উপর একটা বই।সানগ্লাস পরে এর আগে আমি কাউকে পড়তে দেখি নি।ভদ্রমহিলা তাঁর মেয়ের দিকে তাকিয়ে আগ্রহ নিয়ে বললেন, ও খুকি, এ হচ্ছে হিমু।খুব ভালো হাত দেখতে পারে।হাত দেখাবি ?
খুকি কোনোরকম উৎসাহ দেখানো দূরে থাকুক, বই থেকে চোখ পর্যন্ত তুলল না।এটা বড় ধরনের অভদ্রতা।তবে রূপবতীদের সব অভদ্রতা ক্ষমা করা যায়।এরা অভদ্র হবে এটাই স্বাভাবিক। এরা ভদ্র হলে অস্বস্তি লাগে।
কী রে খুকি, হাত দেখাবি? বসেই তো আছিস। দেখা না। হিমু চট করে দেখে ফেলবে।
খুকি বরফশীতল গলায় বলল, কেন বিরক্ত করছ?
আলেয়া খালা নিজের হাত বাড়িয়ে বললেন, হিমু, আমার হাতটা দেখে দে তো।মনে দিয়ে দেখবি।
খুকি চোখ তুলে এক পলকের জন্যে মার মুখ দেখে আবার বই পড়তে শুরু করল।এই এক পলকের দৃষ্টিতেই তার মার ভম্ম হয়ে যাবার কথা।কালো চশমার কারণে হয়তো ভস্ম হলেন না।
আমি বললাম, খালা, আমি হাত দেখা ছেড়ে দিয়েছি।
সে কী!
মিথ্যা বানিয়ে বলতাম।মিথ্যা বলতে বলতে এক সময় নিজের উপর ঘেন্না ধরে গেল।তারপর ঠিক করলাম, আর না, যথেষ্ট হয়েছে।
বাজে কথা রেখে হাতটা দেখ তো।
আমি সঙ্গে সঙ্গে তাঁর দুই হাতের দিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে গম্ভীর গলায় বললাম, আপনার সামনে একটা ভয়াবহ দুর্যোগ।পারিবারিক সমস্যা।অসম বিবাহঘটিত সমস্যা।
ভদ্রমহিলা তাঁর মেয়ের দিকে তাকালেন।ভদ্রমহিলার চোখের দৃষ্টি বলে দিচ্ছে, এই তো হয়েছে।মেয়ের দিকে তাকানোর অর্থ হচ্ছে, মেয়েকে ইশারায় বলা—কী, বলেছিলাম না ভালো হাত দেখে। দেখলি তো? হাতেনাতে প্রমাণ।
আমি বললাম, দুর্যোগ হঠাৎ উপস্থিত হয়েছে।
ভদ্রমহিলা বললেন, হঠাৎ মানে কবে?
ধরুন এক মাস।তবে দুর্যোগ আপনারা সামলাতে পারছেন না।আরো জটিল করে ফেলছেন।
ভদ্রমহিলা আবারো মেয়ের দিকের তাকালেন।চোখের ইশারায় আবারো বললেন, দেখলি কত বড় পামিস্ট?
মেয়েটি হাতের বেই মুড়ে রাখল।চোখ থেকে চশমা খুলে ফেলে পূর্ণ দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকাল ।আমি নিঃসন্দেহে হলাম,এই মেয়ে, মানুষ না।এ হলো হুর।এদের শুধু বেহেশতেই পাওয়া যায়।এরা বেহেশতের সঙ্গিনী।
And there will companios
With beautiful, big
And lustrous eyes.
এই মেয়েটির চোখ- big, beautiful And lustrous. আমি ভাবলাম, মেয়েটা কিছু বলবে বোধহয়—ভঙ্গিটা সে রকম। সে শেষ মুহূর্তে নিজেকে সামলে নিল।আবার কালো চশমা পরল, বই পড়তে শুরু করল।এটা কি বিশেষ কোনো বই যা সানগ্লাস ছাড়া পড়া যায় না?
আলেয়া খালা বললেন, এই সমস্যাটা কখন মিটাবে?
মিটবে না।
তিনি হাহাকার করে উঠলেন, কী বলছিস তুই! মিটবে না মানে?
আমি নির্বিকার ভঙ্গিতে বললাম, এই সমস্যা মেটার নয়।সমস্যা বাড়তে বাড়তে এক্সপ্লেশান লিমিটে চলে আসবে।এই সমস্যায় একটি বাচ্চা মেয়ে জড়িত।মেয়েটির মৃত্যুযোগ আছে।সে মারা গেলে হয়তোবা সমস্যা মিটে যাবে।
আলেয়া খালা হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে রইলেন।
সানগ্লাস পরা বেহেশতের পরী এতক্ষণে আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, এইসব তথ্য আপনি আমার মার হাতে লেখা দেখতে পেলেন?
জি না।আমি বলেছি ইনটুশন থেকে।আমার ইনটুশন প্রবল।যে মেয়েটির কথা বললাম সে বোধহয় আপনার মেয়ে?
খুকি জবাব দিল না।
মাইক্রোবাস নড়ে উঠেল।জ্যাম কমেছে।গাড়ি চলতে শুরু করেছে।গাড়ির সামনে একটা ঠেলাগাড়ি আছে বলে গাড়িটাকে শম্বুক গতিতে এগুতে হচ্ছে।আমি উঠে দাঁড়িয়ে বললাম, যাই।
ভদ্রমহিলা তখনো নিজেকে সামলাতে পারেন নি।আমি যে চলে যাবার জন্যে উঠে দাঁড়িয়েছি তাও বোধহয় বুঝতে পারেন নি।মাইক্রোবাসের স্লাইডিং দরজা খোলার পর তিনি সংবিতে ফিরে পেলেন।তীক্ষ্ণ গলায় বললেন, না না, তুমি যেতে পারবে না।
এতক্ষণ আমাকে তুই বলছিলেন, শেষ সময়ে তুমি।ততক্ষণে আমি নেমে গেছি।মাইক্রোবাসের জানালার কাচ সরিয়ে ভদ্রমহিলা ব্যাকুল হয়ে ডাকছেন, এই হিমু! এই , এই! এই ছেলে! আমি তাঁর দিকে তাকিয়ে অভয়দানের হাসি হাসলাম—অর্থাৎ আসব।আবার দেখা হবে।
ভদ্রমহিলাকে আমি চিনতে পারছি না।এই সমস্যাটা আমার ইদানীংকালে হচ্ছে।মানুষ না-চেনা রোগ।মস্তিষ্কের যে অংশে স্মৃতি জমা থাকে সেই অংশে কিছু বোধহয় হেয়েছে।স্মৃতির ফাইল গায়েব হয়ে গেছে।এক সময়কার চেনা লোকজনদের সঙ্গে দেখা হয়। যেহেতু ব্রেইন সেলে জমা রাখা তাদের ফাইল গায়েব হয়ে গেছে, সেহেতু তাদের চিনতে পারি না।একজন নিওরোলজিস্টের সঙ্গে দেখা করা দরকার।রোগ আরো বাড়বার আগেই চিকিৎসা দরকার,নয়তো দেখা যাবে কাউকেই চিনতে পারছি না।সবাই অপরিচিত।অবশ্যি আমার ধারণা, সেই অভিজ্ঞতাও মজার অভিজ্ঞতা হবে।৬০০ কোটি মানুষের বিশাল পৃথিবী, আমি কাউকেই চিনতে পারছি না।
মাইক্রোবাস থেকে বেকায়দা জায়গায় নেমেছি।সামনে পেছনে কোনো দিকেই যেতে পারছি না।দুদিকেই গাড়ির স্রোত।পথচারীকে রাস্তা পার হবার সুযোগ করে দেবার জন্যে এদের কোনো মাথাব্যথা নেই।নিজে পৌঁছতে পারলেই হলো। আমাকে অপেক্ষা করতে হবে আরেকটা ট্রাফিক জ্যামের জন্যে।দেখা যাচ্ছে, ট্রাফিক জ্যামেরও একটা ভালো দিক আছে।এই সময়ে রাস্তা পারপার করতে পারা যায়।
To every cloud there is a silver lining.
আমি অপেক্ষা করছি।অপেক্ষা করতে খুব যে খারাপ লাগছে তা না।কারণ তেমন কোনো পরিকল্পনা নিয়ে বের হই নি।যাচ্ছি গেণ্ডারিয়ার দিকে।মোহাম্মদ ইয়াকুব আলি নামের এক ভদ্রলোক জরুরি তলব পাঠিয়েছেন।ভদ্রলোককে আমি চিনি না।তিনিও সম্ভবত আমাকে চেনেন না।তবে শুনেছি হুলস্থুল ধরনের বড় লোক।হেন ব্যবসা নেই যা তাঁর নেই।ইন্ডাস্ট্রি ফিন্ডাস্ট্রি দিয়ে যাকে বলে—‘ছেড়াবেড়া’। এমন একজন আমাকে জরুরি তলব পাঠাবেন কেন তাও বুঝতে পারছি না।জরুরি তলব পাঠালে ধীরে-সুস্থে যাবার নিয়ম।আমিও তাই করেছি।দু ঘণ্টা দেরি করেছি।
আবার ট্রাফিক জ্যাম লেগে গেছে।দুটা রিকশার পেছনের চাকা একটার সঙ্গে আরেকটা লেগে গেছে।দুজন রিকশাওয়ালাই দোষ করা তা নিয়ে তর্ক করছে, চাকা ছাড়াবার চেষ্টা করছে।জনতাও দুই ভাগ হয়ে গেছে।একদল খালি গা রিকশাওয়ালার পক্ষে অন্যদল দাড়িওয়ালা রিকশাওয়ালার পক্ষে।কাজেই জ্যাম।গাড়ি-টাড়ি বন্ধ করে ড্রাইভাররা সব গালে হাত দিয়ে বসে আছে।
আশ্বিন মাসের ঝাঁজালো রোদ ক্রমেই বাড়ছে।ঘুঘু পাখির ডাক আর শুনছি না।
আজকের দিনটা রহস্য দিয়ে শুরু হলো।পাখি রহস্য।
এ দেশের বিত্তবান সম্প্রদায় বাস করেন গুলশান, বনানী এবং বারিধারায়।এই প্রচলিত ধারণা ঠিক নয়।পুরনো ঢাকার গলি তস্য-গলি করতে করতে যেখানে এসে দাঁড়ালাম সেখানে দু-তিন বিঘার মতো জায়গা নিয়ে এক দুর্গ দাঁড়িয়ে আছে।চারদিকে জেলখানার মতো উঁচু এবং ভারি দেয়াল।দেয়ালের মাথায় কাঁটাতার।নিরেট লোহার গেট।সেই গেটে অনেকক্ষণ ধাক্কাধাক্কি করেও লাভ হলো না।শব্দ ভেতরে যাচ্ছে না বলেই আমার ধারণা।কিংবা এ-ও হতে পারে যে, এ বাড়ির নিয়ম হচ্ছে ভেতর থেকে লোকজন বেরুতে পারে, বাইরের কেউ ঢুকতে পারে না।ওয়ান ওয়ে ট্রাফিক।
আমি চলে যাবার জন্যে মানসিক প্রস্তুতি নিয়ে নেবার পরই ঘটাং ঘটাং শব্দ হতে লাগল।যেন কয়লার ইনজিনের শান্টিং হচ্ছে।তারপরেই ঘরঘর শব্দ।গেট খুলে গেল—সুতার মতো সরু একজন লুঙ্গিপরা, খালি গায়ের লোকের মাথা বের হয়ে এলো।
কাহারে চান?
এ রকম দুর্বল স্বাস্থের একজন লোককে দারোয়ানের চাকরি কেন দেয়া হলো তাই ভাবছি।আমি কাকে চাই সেটা বলার এখন তেমন জরুরি বলে মনে হচ্ছে না।তাছাড়া আমি কাউকেই চাই না।এ বাড়ির প্রধান ব্যক্তিটি আমাকে চান।লোকটা কারে চান না বলে কাহারে চান বলছে কেন?
আফনে কাহারে চান?
আমি হাসিমুখে বললাম, আমি কাহারেও চাই না।ইয়াকুব আলি সাহেব আমাকে চান।
আপনের নাম হিমু?
হুঁ।
আপনি আসতে দেরি করছেন।আপনের আসার কথা দশটার সময়।
চলে যাব?
আহেন, ভিতরে আহেন।
আমি ভেতরে ঢুকলাম।সঙ্গে সঙ্গে গেট বন্ধ হয়ে গেল। ঘটঘট শব্দে ভেতর থেকে দুটা তালা মেরে দেয়া হল।তালার চাবি দারোয়ানের কোমরে বাঁধা।মানে হল এই গেট আর খুলবে না। দারোয়ান বলল, ভিতরে চলে যান—বলেই সে খুপরিতে ঢুকে গেল।সেখানে একটা দড়ির ক্যাম্পাখাটে তার বিছানা।সে অতি দ্রুত দড়ির খাটিয়ায় শুয়ে পড়ল।এত দুর থেকে পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে না কিন্তূ আমি নিশ্চিত সে ঘুমিয়ে পড়েছে।
আমি বিস্কয় নিয়ে দুর্গ প্রাচীরের ভেতর-বাড়ির দিকে তাকালাম। ইংল্যান্ড হলে এই বাড়িকে অনায়াসে ক্যাসেল বলে চালিয়ে দেয়া যেত। হুলস্থুল ব্যাপার।গ্রিক স্থাপত্যের বড় বড় কলামওয়ালা বাড়ি। টানা বারান্দায় পুরোটাই মার্বেলের।বাড়ির সামনে ফোয়ারা আছে।ফোয়ারায় অবশ্যি পানি ঝরছে না তবে দেখে মনে হচ্ছে সচল ফোয়ারা। সময়ে সময়ে চালু করা হয়।গাড়ি-বারান্দায় চার-পাঁচজন মানুষ। এঁরা দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে চা খাচ্ছেন।সবাইকে চিন্তিত মনে হচ্ছে।আমি খানিকটা এগুতেই ঝকঝকে চেহারার এক যুবক আমার দিকে আসতে শুরু করল।আমি থমকে দাঁড়ালাম।যুবকটির চেহারা সুন্দর, হাঁটার ভঙ্গি সুন্দর, হালকা ছাই-রঙা প্যান্টের উপর সে পরেছে আসমানি রঙের হাফ শার্ট।শার্টেও তাকে সুন্দর মানিয়েছে।মনে হচ্ছে অন্য কোনো রঙের শার্ট পরলে তাকে মানাত না।যার সব সুন্দর তার কথাবার্তা সাধারণথ র্ককশ হয়। দেখা গেল, তার কথাবার্তাও সুন্দর।রেডিওতে অডিশন দিলে প্রথম সুযোগেই খবর পাঠের কাজ পেয়ে যেত।
আপনি কি হিমু সাহেব?
জি।
আপনার না দশটার দিকে আসার কথা?
গাড়ির জ্যামে আটকা পড়েছিলাম।
ও আচ্ছা।আপনি স্যারের কাছে চলে যান।উনি আপনার জন্যে অস্থির হয়েছেন।
ব্যাপারটা কী বলুন তো?
ভদ্রলোক বিস্মিত হয়ে বললেন, ব্যাপার আপনি জানেন না?
জি না।
বলেন কী! আমার ধারণা ছিল জানেন।যাই হোক, স্যারই আপনাকে বলবেন।দয়া করে স্যারের সঙ্গে কোনোরকম তর্ক বা আর্গুমেন্টে যাবেন না। উনি যা বলবেন, তাতেই হুঁ হুঁ বলে মাথা নাড়বেন।Be a yes-man.আসুন আপনাকে দেখিয়ে দি।
যাঁরা অপেক্ষা করছেন তাঁরা সবাই তাকিয়ে আছেন আমার দিকে।বুঝতে পারছি, এখানে আমি একজন গুরুত্বর্পর্ণ ব্যক্তি। শুধু ইয়াকুব আলি সাহেব একা না, এরা সবাই অপেক্ষা করছে আমার জন্যে।
ইয়াকুব আলি সাহেব অসুস্থ—এ খবরও জানা ছিল না।যে ভদ্রলোক আমাকে খবর দিয়েছেন তিনি ইয়াকুব আলি সাহেবের অসুস্থতার খবর আমাকে দেননি।অসুখ তেমন গুরুতর বলেও মনে হচ্ছে না।বিত্তবানরা গুরুত্বর অসুস্থ অবস্থায় দেশে থাকেন না।সিঙ্গাপুর, ব্যাংককে থাকেন।তাঁদের কপালে দেশের মাটিতে মৃত্যু লেখা থাকে না।তাঁদের মৃত্যু অবধারিতভাবে হবে দেশের বাইরে।
হিমু সাহেব!
জি।
আপনি সিঁড়ি বেয়ে দোতলায় উঠে যান।সিঁড়ির সামনের প্রথম ঘরটাই স্যারের।দরজায় নক করলেই নার্স দরজা খুলে দেবে।আরেকটা কথা, কাঠের সিঁড়ি তো, আস্তে পা ফেলবেন।শব্দ হয় না যেন।সিঁড়িতে শব্দ হলে স্যার খুব বিরক্ত হন।
আমি ভদ্রলোকের দিকে তাকিয়ে স্বাভাবিক ভঙ্গিতে বললাম, আপনি এক কাজ করুন ভাই।আমাকে বরং কোলে করে দোতলায় দিয়ে আসুন।শব্দটব্দ একেবারেই যেন না হয় সেদিকে আপনি আমার চেয়ে ভালো লক্ষ রাখতে পারবেন।
ভদ্রলোক আমার কথায় আহত হলেন কি না বুঝতে পারলাম না। তাঁর মুখভঙ্গিতে কোনোরকম পরিবর্ত এলো না।আগে যেমন ছিল, এখনো সে রকম আছে।আমি তাঁর নির্বিকার ভঙ্গিতে মুগ্ধ হয়ে বললাম, ব্রাদার,আপনার নাম?
আমার নাম মইন।মইন খান।আমাকে ব্রাদার বলবেন না।যান, আপনি দোতলায় যান।শব্দ করেই যান।
কাঠের সিঁড়ি হলেও সিঁড়িতে কার্পেট দেয়া।চেষ্টা করেও শব্দ করা গেল না।
দরাজায় টোকা দেবার আগেই নার্স দরজা খুলে দিয়ে বলল, আসুন।স্যার জেগেই আছেন।সোজা চলে যান।জুতা খুলে এখানে রেখে যান।আপনার পা দেখি ধুলোভর্তি।এক কাজ করুন, বাথরুমে ঢুকে পা ধুয়ে ফেলুন।
শধু পা ধোব, না ওযু করে ফেলব?
নার্স কঠিন চোখে আমার দিকে তাকাচ্ছে। এ বোধহয় মইন খানের মতো রসিকতায় স্থির থাকতে পারে না।তবে নার্সের চেহারা সুন্দর।কঠির চোখে তাকালেও তাকে খারাপ লাগছে না।বরং মনে হচ্ছে কঠিন চোখে না তাকালেই তাকে খারাপ লাগত।আমি উৎসাহের সঙ্গে বললাম, সিস্টার, আপনার নাম জানতে পারি?
আমার নাম দিয়ে কি আপনার প্রয়োজন আছে?
জি আছে।আমি যখন অসুস্থ হব তখন সেবা করার জন্যে আপনাকে রাখব।কল দিলে আসবেন না?
যান, বাথরুমে যান, কার্বলিক সাবান আছে।ভালোমতো হাতমুখ ধোবেন।
আমি বাথরুমে ঢুকে পড়লাম।
অনেকদিন আগে একটা ছবি দেখেছিলাম।২০০১ স্পেস অডিসি। ছবির একটি দৃশ্যে বিশাল খাটে একজন বুড়ো মানুষ শুয়ে আছেন।বুড়োর চেহারা অনেকটা সম্রাট শাহজাহানের মতো।ঘরটা প্রকাণ্ড।প্রকাণ্ড ঘরের প্রকাণ্ড খাটে একজন রুগ্ন কৃশকায় মানুষ—দৃশ্যটা দেখামাত্র মনে চাপ সৃষ্টি হয়।ইয়াকুব আলি সাহেবের ঘরে ঢুকে স্পেস অডিসি ছবির কথা মনে পড়ল।ইয়াকুব আলি সাহেব শুয়ে ছিলেন।আমাকে দেখে উঠে বসলেন।হাত ইশারায় কাছে ডাকলেন।তারপর দীর্ঘ সময় দুইজন চুপচাপ।উনি কিছু বলছেন না।আমিও না।আমি খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে ঘরের সাজসজ্জা দেখছি।খাটের পাশে বুক সেলফ।বুক সেলফের বইগুলোর নাম পড়ার চেষ্টা করছি।এত দূর থেকে পড়া যাচ্ছে না।ন্যাপথেলিন এবং অডিকোলনের মিশ্র গন্ধ নাকে আসছে।মোটেই ভালো লাগছে না।তাছাড়া বুড়ো ইয়াকুব সাহেবের চোখ দুটিতে পাখি পাখি ভাব।মানুষের পাখির মতো চোখ এই প্রথম দেখলাম।
হিমু!
জি।
বোস।
বসার জন্যে একটি মাত্র চেয়ার, সেটা ঘরের শেষপ্রান্তে।আমি কি সেখানে বসব না চেয়ার টেনে কাছে নিয়ে আসব তা বুঝতে পারছি না।
চেয়ার টেনে কাছে নিয়ে এসো।শব্দ হয় না যেন।ক্যাঁচ ক্যাঁচ শব্দ সহ্য হয় না।এমন কি নিঃশ্বাস ফেলার শব্দও না।
চেয়ার পর্বতের মতো ভারি, আনতে গিয়ে আমার ঘাম বের হয়ে গেল।এরচে’ মেঝেতে বসে পড়া ভালো ছিল।
হিমু!
জি স্যার।
তোমার সঙ্গে আমার আগে পরিচয় হয় নি।তবে তোমার কথা অনেক শুনেছি।তুমি নাকি সাধু-সন্ত টাইপের মানুষ।তোমার পেশা রাস্তায় ঘোরা।তোমার কিছু সাহায্য আমার দরকার।
স্যার বলুন কী করতে পারি।
ইয়াকুব আলি সাহেব খানিকক্ষণ চোখ বন্ধ করে বসে রইলেন।নার্স ঢুকল।মনে হয় কোনো একটা ওষুধ খাওয়াবার সময় হয়েছে।ইয়াকুব সাহেব চোখ না তুলেই হাতের ইশারায় নার্সকে চলে যেতে বললেন।
হিমু!
জি স্যার!
আমি কী চাই সেটা বললে তুমি আমাকে পাগল-টাগল ভাবতে পারো।
আপনি বলুন।আমি সহজে কাউকে পাগল ভাবি না।
তুমি সহজে পাগল ভাবো আর না ভাবো—আমাকে সাবধান হয়েই কথা বলতে হবে।আমি তোমার কাছে কী চাই সেটা বলার আগে তুমি আমার স্ত্রীর কথা শুনে নাও।আমার স্ত্রীর কথা শুনলে আমাকে আর পাগল ভাববে না।
বলুন।
মন দিয়ে শুনবে।
জি স্যার, মন দিয়ে শুনব।
ইয়াকুব আলি সাহেব আমার দিকে ঝুঁকে এলেন।তাঁর চোখের মণি জ্বলজ্বল করছে।মণির সাইজও ছোট।ভদ্রলোকের অসুখটা কী? যক্ষা? যক্ষা রোগীর চোখ জ্বলজ্বল করে বলে শুনেছি।যক্ষ্মা হলে ঘনঘন কাশার কথা।তিনি এখনো কাশছেন না।
আমার প্রথম স্ত্রী বিয়ের দু’বছরের মাথায় মারা যান।পরে আমি আবার বিবাহ করি।আমার প্রথম স্ত্রী গর্ভে সন্তানদি হয় নি।আমার দ্বিতীয় স্ত্রীও প্রথম সন্তানের জন্ম দিতে গিয়ে মারা যান।আমি আবারো বিবাহ করি।সেই স্ত্রী জীবিত আছেন।আমার সঙ্গে বনিবনা হচ্ছে না বলে তিনি এখন আলাদা থাকেন।তুমি কি আমার কথা মন দিয়ে শুনছ?
জি স্যার,শুনছি।
বলো দেখি, আমার প্রথম স্ত্রী বিয়ের কতদিন পর মারা যান?
বিয়ের দু’বছরের মাথায়।বিষ খেয়ে আত্মহত্যা করেন।
ইয়াকুব আলি সাহেব পাখির মতো চোখে আমার দিকে তাকিয়ে আছেন।তাঁর মুখ হাঁ হয়ে গেছে।বিষ খাওয়ার ব্যাপারটি তিনি বলেন নি।এটা বানিয়ে বললাম।মনে হচ্ছে লেগে গেছে।আমার দু-একটা বানানো কথা খুব লেগে যায়। ইয়াকুব আলি সাহেব গলা পরিষ্কার করতে করতে বললেন, আমার স্ত্রী আত্মহত্যা করেন এই কথা তোমাকে বলি নি।
তোমার জানার কথা না।কোত্থেকে জানলে?
অনুমান করে বললাম। আমার অনুমান খুব ভালো।
তাই দেখছি।তোমার সম্পর্কে যা শুনেছি তা তাহলে মিথ্যা না।যাই হোক, আমার স্ত্রী কথা বলি—তার নাম জয়নব।সে আমার উপর মিথ্যা সন্দেহ করে আত্মহত্যা করে।মৃত্যুর পর সে তার ভুল বুঝতে পারে বলে আমার ধারণা।কারণ তারপরই সে নানানভাবে আমাকে নানানভাবে সাহায্য করতে থাকে।
আমি বললাম, কীভাবে সাহায্য করেন? বিপদ-আপদে স্বপ্নে দেখা দিয়ে বলেন কী করতে হবে বা না করতে হবে?
হ্যাঁ।ঠিক ধরেছ।ব্যবসার আয়-উন্নতিও তার জন্যেই হয়েছে।তার উপদেশেই আমি ব্যবসা শুরু করি।
ব্যাপারটা অন্য ব্যাখ্যাও তো থাকতে পারে…
তুমি কী বলতে চাচ্ছ আমি বুঝতে পারছি।অন্য ব্যাখ্যাও আমি জানি।অন্য ব্যাখ্যা হলো—আমার অবচেতন মন আমাকে সাহায্য করছে।আমার মৃতা স্ত্রী আমার অবচেতন মনের কল্পনা।
আপনি এই ব্যাখ্যা বিশ্বাস করেন না?
না।
অনেকক্ষণ কথা বলার জন্যেই সম্ভবত ইয়াকুব আলি সাহেব ক্লান্ত হয়ে পড়েছেন।তিনি টেবিলের উপর রাখা রিমোট কনট্রোল নবে হাত রাখলেন।নার্স ছুটে এলো।তিনি বোধহয় সাইন ল্যাংগুয়েজে কিছু বললেন—নার্স মেজারিং গ্লাসের চেয়ে একটু বড় সাইজের গ্লাসে করে কী যেন নিয়ে এলো।তিনি এক চুমুক খেয়ে চোখ বন্ধ করে থাকলেন।যতক্ষণ তিনি চোখ বন্ধ করে থাকলেন ততক্ষণ নার্স কড়া চোখে আমার দিকে তাকিয়ে রইল।চোখের ইশারায় বলল, তুমি এই অসুস্থ মানুষটাকে কেন বিরক্ত করছ? বের হয়ে যাও।
ইয়াকুব আলি সাহেব চোখ খুলে নার্সকে আবার ইশারা করলেন।নার্স চলে গেল। তিনি চাপা গলায় বললেন, হিমু!
জি।
আমি অসুস্থ। ভয়াবহভাবেই অসুস্থ। মৃত্যুর ঘণ্টা ঢং ঢং করে বাজছে।তেমার তো অনুমান ভালো।বলো দেখি অসুখটা কী?
বলতে পারছি না।আমার অনুমান সব সময় কাজ করে না।
কতদিন বাঁচব সেটা বলতে পারবে?
জি না।
ইয়াকুব আলি সাহেব গলার স্বর আরো নামিয়ে ফেললেন।তাঁর কথা অস্পষ্ট হয়ে এলো। কথা বোঝার জন্যে আমাকে তাঁর দিকে এগিয়ে যেতে হলো।
আমি শিশুদের একটা অসুখ বাধিয়ে বসেছি।এগুলো সাধারণত শিশুদের হয়।তখন তাদের বাঁচিয়ে রাখতে রক্ত বদলে দিতে হয়।কিছুদিন পর পর নতুন রক্ত।এখন কি অসুখটা বুঝতে পারছ?
লিউকোমিয়া?
হ্যাঁ লিউকোমিয়া।আমি প্রতি দশদিন পর পর শরীরে চার ব্যাগ করে রক্ত নিই।ডাক্তারার বলেছেন এই অসুখ থেকে উদ্ধারের কোনো আশা নেই।কিন্তু আমার স্ত্রী বলেছে উদ্ধারের আশা আছে।সে পথ দেখিয়ে দিয়েছে।
আপনার মৃত স্ত্রী দিখেয়ে দিয়েছেন?
হুঁ।
পথটা কী?
খুবই সহজ পথ, আবার এক অর্থে খুবই জটিল। তবে তুমি আমাকে সাহায্য করতে পারবে।এই জন্যেই তোমাকে খবর দিয়ে আনানো।
পথটা কী বলুন।
আমার স্ত্রী স্বপ্নে দেখা দিয়ে বলেছে, সম্পৃর্ণ নিষ্পাপ পূর্ণবয়স্ক মানুষের রক্ত যদি আমি শরীরে নিতে পারি তাহলে রোগ সেরে যাবে।ব্যাপরটা সহজ না?
জি সহজ।
জটিল অংশটা কী জানো? জটিল অংশ হলো—নিষ্পাপ মানুষ পাওয়া।
আপনাকে এখন নিষ্পাপ মানুষ ধরে ধরে তাদের শরীরের সব রক্ত বের করে নিতে হবে?
তুমি রসিকতা করার চেষ্টা করবে না হিমু।Don’t try to be funny. আমি মরতে বসেছি। যে মরতে বসে সে রসিকতা করে না।তুমি আমাকে নিষ্পাপ মানুষ যোগাড় করে দেবে।
নিষ্পাপ মানুষ বুঝব কী করে?
সেটা তুমি জানো, আমি জানি না। আমি খরচ দেব। টাকা যা লাগে আমি দেব।Is it clear?
স্যার,আপনার বয়স কত হয়েছে?
নিশ্চিতভাবে বলতে পারছি না। আমার বাবা-মা জন্মের দিনক্ষণ লিখে রাখেন নি। আমাকে বলেও যান নি। তবে ৫৮/৫৯ হবে।
অনেকদিন তো বাঁচলেন।
তা না।
স্পষ্ট করে বলো কী বলতে চাও।
আজ থাক। পরে বলব। আপনি ক্লান্ত। বিশ্রাম করুন।
আমি কি আশা করতে পারি তুমি নিষ্পাপ লোক খুঁজে বেড়াবে?
জি। আমার কাছে ব্যাপারটা ইন্টারেস্টিং লাগছে। কাজেই খুঁজব।
তোমাকেও আমি খুশি করে দেব।will make. You happy. এমন খুশি করব যা তুমি চিন্তাও করতে পারবে না।
আমি স্যার এমনিতেই খুশি।
তোমাকে মোট বারদিন সময় দেয়া হলো।দুদিন পর আমি রক্ত নেব।যা পাওয়া যায় তাই নেব।তার দশদিন পর তোমার এনে দেয়া রক্ত নেব।
স্যার এখন উঠি?
যাবার পথে আমার ম্যানেজারের সঙ্গে কথা বলবে। টাকা-পয়সার ব্যাপার আমি সরাসরি ডিল করি না।সে ডিল করে। ওর নাম মইন।মইন খান।ভালো ছেলে।খুব ভালো ছেলে।
নিষ্পাপ?
ইয়াকুব আলি সাহেব আমার দিকে তাকিয়ে রইলেন।মনে হলো খানিকটা ধাঁধায় পড়ে গেলেন।আমি বের হয়ে এলাম।ম্যানেজার মইন সাহেবকে আমার খুঁজে বের করতে হলো না।তিনি সিঁড়ির গোড়াতেই দাঁড়িয়ে ছিলেন।আমাকে সরাসরি অন্য একটা কামরায় নিয়ে গেলেন। এই কামরাটা মনে হচ্ছে ম্যানেজারের অফিসঘর। টেবিলে ফাইলপত্র সাজানো।মইন খান বসেছেন রিভলভিং চেয়ারে।
হিমু সাহেব,বসুন।
আমি বসলাম।মইন কৌতূহলী হয়ে কিছুক্ষণ আমার দিকে তাকিয়ে রইলেন।
হিমু সাহেব।
জি।
আপনাকে স্যার কী দায়িত্ব দিয়েছেন, তা আমি জানি।স্যারের সঙ্গে আমার কথা হয়েছে।যদিও কোন ক্ষমতায় আপনি নিষ্পাপ লোক খুঁজে বের করবেন তা বুঝতে পারছি না।
আমি হাসলাম।আমার স্টকে অনেক ধরনের হাসি আছে।এর মধ্যে একটা ধরন হলো—মানুষকে পুরোপুরি বিভ্রান্ত করে দেয়া হাসি।মইন খান পুরোপুরি বিভ্রান্ত হলেন।তাঁর চোখমুখ শক্ত হয়ে গেল। তিনি শুকনো গলায় বললেন, আপনি কী করেন জানতে পারি কি?
হাঁটাহাঁটি করি। আর কিছু না।আমি নগর পরিব্রাজক।
আমি কি হেঁয়ালি ছাড়া সহজভাবে কথা বলতে পারেন না?
সহজভাবেই বলছি।
ভদ্রলোক রেগে গেছেন।রাগ সামলে নিয়ে সহজভাবেই বললেন, এইখানে যে এসেছেন এতে আপনার সময় নষ্ট হয়েছে।আসা-যাওয়ার একটা খরচ আছে।খরচটা দিতে চাচ্ছি।কত দেব?
আমি চুপ করে আছি। খরচ বলতে ছয় টাকা রিকশা ভাড়া দিয়েছি।ফিরব হেঁটে হেঁটে।
পাঁচ শ’টাকা দিলে কি আপনার চলবে?
আমি হাসলাম।মইন খান একটা ভাউচার বের করে দিলেন।স্ট্যাম্প লাগানো ভাউচার।আমি সই করলাম।তিনি পাঁচ শ’ টাকার একটা নোট বের করে দিলেন।ঝকঝকে নোট।মনে হচ্ছে এইমাত্র টাকশাল থেকে ছাপা হয়ে এসেছে।
এছাড়াও আপনার খরচ-পত্তর যা লাগে দেয়া হবে। কোন খাতে কত খরচ হলো—এটা জানিয়ে বিল করলেই খরচ দিয়ে দেয়া হবে। বুঝতে পারছেন?
জি পারছি।
মইন সাহেবের টেবিলের উপর রাখা দুটি টেলিফোনে একটি বাজছে।তিনি তড়াক করে উঠে দাঁড়িয়ে টেলিফোন ধরলেন।বোঝাই যাচ্ছে এটা বিশেষ টলিফোন।বিশেষ বিশেষ লোকজনের জন্য।হযতো ইয়াকুব সাহেব করেছে।আমি শুধু শুনছি মইন খান জি জি করছে।অল্প খানিকক্ষণ জি জি করেই তাঁর ঘাম বেরিয়ে গেল বলে মনে হয়।তিনি টেলিফোন নামিয়ে সত্যি সত্যি রুমাল বের করে কপালের ঘাম মুছলেন।আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, আপনি দয়া করে আপার সঙ্গে দেখা করে যাবেন।
কার সঙ্গে?
আপার সঙ্গে।স্যারের মেয়ে।
উনার কি একটাই মেয়ে?
হ্যাঁ এক মেয়ে।বাবার অবর্তমানে এই মেয়েই সব পাবে।
এইজন্যেই বুঝি তাঁর ভয়ে আপনি এত অস্থির?
ম্যানেজার সাহেব অপমান গায়ে মাখলেন না।সব অপমান গায়ে মাখলে ম্যানেজারি করা যায় না।তিনি আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, চলুন, উনার কাছে নিয়ে যাই।
উনার সঙ্গে কীভাবে কথা বলব না বলব সেই বিষয়ে কি আপনার কোনো ব্রিফিং আছে?
না।যেভাবে ইচ্ছা কথা বলবেন।উনি থাকেন মিনেসোটায়।আর্কিটেকচারের ছাত্রী।বাবার অসুখের খবর শুনে এসেছেন।
বিয়ে করেছেন?
বিয়ে করেছেন কি করেন নি সেটা জানার আপনার দরকার কী?
দরকার আছে।বিবাহিত মেয়ের সাথে একভাবে কথা বলতে হয়, অবিবাহিত মেয়ের সাথে অন্যভাবে।
না, বিয়ে করেন নি।চলুন।
সূর্যের চেয়ে বালির উত্তাপ সব সময় বেশি।এই আপ্তবাক্য ইয়াকুব সাহেবের মেয়ের বেলায় খাটবে কি না বুঝতে পারছি না।মেয়েটি বাবার মতোই লম্বা। ধারালো চেহারা।সবেমাত্র গোসল করে এসেছে।বড় গোলাপি রঙের টাওয়েলে মাথা ঢাকা।কালো রঙের রোব পরেছে।বাঙালি মেয়েদর রোবে মানায় না।এই মেয়েটিকে মানিয়ে গেছে।অনেক দিন বিদেশে আছে বলেই হয়তো।
বসুন।
আমি বসলাম।তিনতলার বারান্দায় বেতের চেয়ার—টেবিল সাজানো।মেয়েটি বসল না।দাঁড়িয়ে রইল।চুল ভেজা নিয়ে মেয়েরা বোধহয় বসতে পারে না।রূপাকেও দেখেছি যতক্ষণ চুল ভেজা ততক্ষণই সে দাঁড়িয়ে।
শুনেছি, বাবা আপনার উপর একটা কঠিন দায়িত্ব দিয়েছেন।
একটা দায়িত্ব পেয়েছি। কঠিন কি না এখনো জানি না।
বাবা যে খুবই হাস্যকর একটা ব্যাপার করতে যাচ্ছেন সেটা কি আপনার মনে হচ্ছে না?
মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়ালে আমাদের মাথার ঠিক থাকে না। সেই সময় কোনো কিছুই হাস্যকর থাকে না।
খুবই সত্যি কথা। মৃত্যু ভয়াবহ ব্যাপার। এর মুখোমুখি হলে মাথা এলোমেলো হয়ে যাবারই কথা। কিন্তু অন্যদের কি উচিত সেই এলোমোলো মাথার সুযোগ গ্রহণ করা?
আপনি আমার কথা বলছেন?
জি, আপনার কথাই বলছি। সরি, আপনাকে সরাসরি কথাটা বললাম। আমি সরাসরি কথা বলি এবং আমি আশা করি আপনিও যা বলার সরাসরি বলবেন।
আমি হাসলাম। আমার সেই বিখ্যাত বিভ্রান্ত করা হাসি। তবে এই মেয়ে শক্ত মেয়ে। সে বিভ্রান্ত হলো না। শুধু তার চোখের দৃষ্টি তীক্ষ্ণ হলো।
বাবা আপনার খোঁজ কোথায় পেয়েছেন বলুন তো?
আমি জানি না।
জানার ইচ্ছাও হয় নি?
জি না। আমার কৌতুহল কম।
আপনাকে নিষ্পাপ লোক খুঁজতে বলা হলো, আপনি সঙ্গে সঙ্গে রাজি হয়ে গেলেন?
আমি কাউকে না বলতে পারি না। আপনি যদি আমাকে কিছু করতে বলেন তাও হাসিমুখে করে দেব।
আপনাকে দিয়ে কোনো কিছু করানোর আগ্রহই আমার নেই। তবে ছোট্ট একটা বক্ততা দেয়ার আগ্রহ আছে। মন দিয়ে শুনুন।
জি, আমি মন দিয়েই শুনছি।
বড় রকমের বিপদে পড়লে মানুষ আধ্যাত্মিকতার দিকে ঝুঁকে যায়। তখন শুরু হয় তন্ত্র, মন্ত্র, তাবিজ, ঝাড়ফুঁক। অর্থহীন সব ব্যাপার।
আপনি এইসব বিশ্বাস করেন না?
কোনো বুদ্ধিমান মানুষই এইসব বিশ্বাস করে না। আমি নিজেকে একজন বুদ্ধিমতী মেয়ে মনে করি।
কিছু কিছু ব্যাপার কিন্তু আছে। আমি অনেককেই দেখেছি ভবিষ্যৎ বলতে পারে।
ভবিষ্যৎ বলতে পারে এমন কাউকে আপনি দেখেন নি। আপনি হয়তো শুনেছেন। ভবিষ্যৎ এখনো ঘটে নি। যা ঘটে নি তা আপনি দেখবেন কী করে?
করিম বলে একটা লোক আছে। সে হারানো মানুষ খুঁজে বেড়ায়। চোখ বন্ধ করে কিছুক্ষণ বসে থাকে। তারপর চোখ মেলে বলে দেয় হারানো মানুষটা কোথায় আছে। আমার নিজের চোখে দেখা। আপনি চাইলে আপনাকেও নিয়ে দেখাতে পারি।
প্লিজ, বাজে কথা বলবেন না।
আমি নিজেও মাঝে মাঝে ভবিষ্যৎ বলি।
I see. আমিও সে রকম ধারণা করেছিলাম। কী ধরনের ভবিষ্যৎ আপনি বলেন?
আমি কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললাম, এক্ষুণি একটা ভবিষ্যতদ্বাণী করে যাই। আগামী এক-দুদিনের ভেতর ঢাকা শহরে একটা ভূমিকম্প হবে।
ভূমিকম্প?
জি ভূমিকম্প। বড় কিছু না, ছোটখাটো। সামান্য ঝাঁকুনি।
মেয়েটির মুখে একটা ধারালো হাসি তৈরি হতে হতে হলো না। আমি মেয়েটির সংযমের প্রশংসা করলাম। অন্য যে কেউ আমাকে কঠিন কথা শুনিয়ে দিত।
আজ উঠি, না আরো কিছু বলবেন?
না, আর কিছু বলব না।
আমি উঠে দাঁড়ালাম। মেয়েটি আমাকে অবাক করে দিয়ে বলল, আসুন আপনাকে গেট পর্যন্ত এগিয়ে দেই। গাড়ি আছে—গাড়ি আপনাকে পৌঁছে দেবে।
জি আচ্ছা। আপনার অনেক মেহেরবানি।
এসি বসানো স্টেশন ওয়াগন। ভেলভেটের নরম সিট কভার। এয়ারফ্রেশার আছে। গাড়ির ভেতরে মিষ্টি বকুল ফুলের গন্ধ। জানালায় কী সুন্দর পর্দা! গাড়ি যে চলছে তাও বোঝা যাচ্ছে না। আরামে ঘুম এসে যাচ্ছে। এক কাপ চা পাওয়া গেলে হতো। চা খেতে যাওয়া যেত। চা এবং চায়ের সঙ্গে সিগারেট। চা গাড়িতে নেই, তবে পাঞ্জাবির পকেটে সিগারেট আছে। আমি সিগারেটের জন্যে পকেটে হাত দিতেই গাড়ির ড্রাইভার বিরক্ত স্বরে বলল, গাড়ির মইধ্যে সিগ্রেট ধরাইবেন না। গাড়ি গন্ধ হইব।
আমি ড্রাইভারের কথা অগ্রাহ্য করলাম। পৃথিবীর সব কথা শুনতে নেই। কিছু কিছু কথা অগ্রাহ্য করতে হয়।
সিগ্রেট ফেলেন।
এ তো দেখি রীতিমতো ধমক। আর্শ্চয! গাড়ির ড্রাইভার আমাকে দেখেই বুঝে ফেলেছে আমি গাড়ি-চড়া মানুষ নই। রাস্তার মানুষ। আমাকে ধমকালে ক্ষতি নেই।
কী হইল, কথা কানে যায় না? সিগ্রেট ফেলতে কইলাম না?
আমি শান্তস্বরে বললাম, তুমি সাবধানে গাড়ি চালাও। বারবার পেছনে তাকিও না। অ্যাকসিডেন্ট হবে।
সিগ্রেট ফেলেন।
আমি সিগারেট ফেলে দিলে তোমার আরো ক্ষতি হবে। তখন তুমি আফসোস করবে। বলবে, হায় হায়, কেন সিগারেট ফেলতে বললাম!
ফেলেন সিগ্রেট।
আচ্ছা যাও, ফেলছি।
আমি সিগারেট ফেলে দিলাম। তবে ফেললাম আমার পাশের টকটকে লাল রঙের ভেলভেটের সিট কভারে। দেখতে দেখতে ভেলভেট পুড়তে শুরু করল।
বিকট গন্ধ বেরুল।
হতভম্ব ড্রাইভার গাড়ি থামাল। সে দরজা খুলে বেরুতে বেরুতে সিটের অর্ধেকটা পুড়ে ছাই। ড্রাইভার বিস্মিত হয়ে তাকাচ্ছে। আমি তার দিকে তাকাচ্ছি হাসিমুখে। ড্রাইভার ক্লান্ত গলায় বলল, এইটা কী করলেন?
আমি সহজ গলায় বললাম, মন খারাপ করবে না। এই পৃথিবীর সবই নশ্বর। একমাত্র পরম প্রকৃতিই অবিনশ্বর। তিনি ছাড়া সবই ধব্বংস হবে। ভেলভেটের সিট কভার অতি তুচ্ছ বিষয়। গাড়িটা এক সাইডে পার্ক করো। এসো, চা খাও। চা খেলে তোমার হতভম্ব ভাবটা দূর হবে।
ড্রাইভার আমার সঙ্গে চা খেতে এলো। তাকে এখন আর মানুষ বলে মনে হচ্ছে না। বোধশক্তিহীন ‘জম্বির’ মতো দেখাচ্ছে।
ন-দশ বছরের একটা রোগা ছেলে ফ্লাস্কে চা নিয়ে বসে আছে। ছেলেটির পাশে তার ছোট দুই বোন। চা চাইতেই ছোট মেয়েটি হাসিমুখে দুটা কাপ ধুতে শরু করল। বড় বোন সেই ধোয়া কাপ আবার নতুন করে ধুল। ভাই চা ঢালল। তিনজনের টি-স্টল।
ড্রাইভার চুকচুক করে চা খাচ্ছে। আড়ে আড়ে তাকাচ্ছে আমার দিকে। আমাকে বুঝতে চেষ্টা করছে। নিজেকে বোঝা নিয়ে আমাদের কোনো মাথাব্যথা নেই। আমাদের প্রধান চেষ্টা অন্যকে বোঝা।
চা কত হয়েছে রে?
ছোট মেয়েটি হাসিমুখে বলল, দুই টেকা। আমি সদ্য পাওয়া চকচকে পাঁচ শ টাকার নোটটা তার হাতে দিলাম। সে আতঙ্কিত গলায় বলল, ভাংতি নাই।
আমি সহজস্বরে বললাম, ভাংতি দিতে হবে না, রেখে দাও। মেয়েটা যতটা না বিস্মিত হয়েছে ড্রাইভার তারচেয়েও বিস্মিত। তার মুখ হাঁ হয়েছে। চোখে পলক পড়েছে না। আমি বললাম, ড্রাইভার, তুমি গাড়ি নিয়ে চলে যাও। আমি হেঁটে হেঁটে বাসায় ফিরব। সিট কভার পোড়া নিয়ে কেউ যদি কিছু বলে—আমার কথা বলবে।
ড্রাইভার কোনো কথা বলছে না। এখনো পলকহীন চোখে তাকিয়ে আছে। পলকহীন চোখে মানুষের তাকানো উচিত নয়। পলকহীন চোখে তাকায় সাপ আর মাছ। তাদের চোখের পাতা নেই। মানুষ সাপ নয়, মাছও নয়। তাকে পলক ফেলতে হয়।
আমি এগোচ্ছি। মনে মনে ভাবছি, এমন যদি হতো—ড্রাইভার তার গাড়ির কাছে ফিরে গিয়ে দেখে ভেলভেটের সিট কভার আগের মতোই আছে। সেখানে কোনো পোড়া দাগ নেই, তাহলে ড্রাইভারের মনোজগতে কী প্রচণ্ড পরিবর্তনই না হতো! কিন্তু তা সম্ভব নয়। আমি কোনো মহাপরুষ নই। আমার কোনো অলৌকিক ক্ষমতা নেই। আমি হিমু। অতি সাধারণ হিমু।
তবে অতি সাধারণ হিমু হলেও মাঝে মাঝে আমার কিছু কথা লেগে যায়। অন্যদেরও নিশ্চয়ই লাগে। অন্যরা লক্ষ করে না, আমি করি। ভূমিকম্পের কথা বলাটা অবশ্যি বাড়াবাড়ি হয়ে গেছে। মনে এসেছে, বলে ফেলেছি।
দুপুরের খাওয়া হয় নি। খিদে জানান দিচ্ছে। আমি নিয়ম মেনে চলি না। কিন্তু আমার শরীর নিয়মের শৃঙ্খলে বাঁধা। যথাসময়ে তার ক্ষুধা-তৃষ্ণা হয়। ক্ষুধা-তৃষ্ণা জয় করার নিয়মকানুন জানা থাকলে হতো। বিজ্ঞান এই দুটি জিনিস জয় করার চেষ্টা কেন করছে না? আমার চেনা একজন আছে যে তৃষ্ণা জয় করেছে। গত তিন বছরে সে এক ফোঁটা পানি খায় নি। তার নাম একলেমুর মিয়া। সে ফার্ম গেটে তার মেয়েকে নিয়ে ভিক্ষা করে। আমার সঙ্গে ভালো খাতির আছে। আজ দুপুরে খাওয়া তার সঙ্গে খাওয়া যায়। বড় খালার বাড়িতেও যেতে পারি। কিংবা রূপাদের বাড়ি। তবে রূপার বাড়িতে থাকার সম্ভাবনা খুব কম। সে কী একটা বই লিখেছে। সকালে উঠে জয়দেবপুরের বাড়িতে চলে যায়। রাতে ফেরে। সেখানে টেলিফোন নেই। ঢাকার বাসায় খোঁজ নিয়ে দেখা যেতে পারে।
চট করে কোনো দোকান থেকে টেলিফোন করা এখন আর আগের মতো সহজ নয়। টেলিফোন করতে টাকা লাগে। আগে যে-কোনো দোকানে ঢুকে করুণ মুখে বললেই হতো—ভাই, একটা টেলিফোন করব।
এখন টেলিফোনের কথা বলার আগে কাউন্টারে পাঁচটা টাকা রাখতে হয়।
বিনা টাকায় টেলিফোন করা যায় কিনা না সেই চেষ্টা করা যেতে পারে। নতুন কোনো টেকনিক বের করতে হবে। এমন টেকনিক যা আগে ব্যবহার করা হয় নি। ভিক্ষার জন্যে যেমন প্রতিনিয়ত নতুন নতুন টেকনিক বের করতে হয়—ফ্রি টেলিফোনের জন্যেও হয়। আমি এক টুকরো কাগজ নিয়ে লিখলাম—
ভাই,
আমার বান্ধবীকে খুব জরুরি একটা টেলিফোন করা
দরকার। সঙ্গে টাকা-পয়সা নেই বলে লজ্জায় মুখ ফুটে বলতে
পারছি না।
বিনীত
হিমু
কাগজের টুকরো হাতে নিয়ে একটা ডিপার্টমেন্টাল স্টোরে ঢুকে পড়লাম। সেলসম্যানকে কাগজটা পড়তে দিলাম। সে পড়ল, খানিকক্ষণ বিস্মিত চোখে আমাকে দেখে টেলিফোন সেট আমার দিকে এগিয়ে দিল।
হ্যালো, আমি হিমু।
চিনতে পারছি।
কেমন আছ রূপা?
ভালো।
আজ জয়দেবপুর যাও নি?
না, কিছুক্ষণের মধ্যে রওণা হব!
আচ্ছা, তোমাদের জয়দেবপুরের বাড়িটা কেমন?
খুব সুন্দর বাড়ি।
কী রকম সুন্দর বল তো?
কেন?
আহা বলো না।
বললে তুমি কি যাবে আমার সঙ্গে?
যেতে পারি।
সাত একর জমি নিয়ে গ্রামের ভেতর খামারবাড়ি কিংবা বলতে পারো খামার হাউস। বাড়ির পেছনে পুকুর আছে। পুকুর বড় না, ছোট্ট পুকুর। কিন্তু মার্বেল পাথরে বাঁধানো ঘাট। সেই ঘাটে নৌকা বাঁধা আছে। বাড়িটা চারদিক দিয়ে গাছপালায় ঘেরা।
বাড়ির ছাদ আছে? ছাদে বসে জোছনা দেখা যায়?
ছাদে বসে জোছনা দেখার ব্যবস্থা নেই। টালির ছাদ।
বাংলো বাড়ি?
হ্যাঁ, বাংলো বাড়ি। যাবে আমার সঙ্গে?
ভাবছি।
তুমি কোথায় আছ বলো, আমি তোমাকে তুলে নিয়ে যাব।
আমি দ্রুত চিন্তা করছি। রূপার সঙ্গে নির্জন বাংলো বাড়িতে পুরো একটা দিন থাকার লোভ জয় করতে হবে। যে করেই হোক করতে হবে। শরীরের উপর আমাদের কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই, কিন্তু মনের উপর তো আছে…
হ্যালো—বলো তুমি কোথায় আছ?
শোন রূপা। জরুরি কিছু খবর আমাকে এখন লোকজনদের দিয়ে বেড়াতে হবে। নয়তো যেতাম।
কী জরুরি খবর?
কাল-পরশুর মধ্যে ভূমিকম্প হবে—এই খবর। যদিও তা হবে ছোট সাইজের, তবুও তো ভূমিকম্প।
তুমি আমার সঙ্গে কোথাও যাবে না সেটা বলো—ভূমিকম্পের অজুহাত তৈরি করলে কেন?
অজুহাত না, সত্যি।
তুমি বলতে চাচ্ছ ভূমিকম্পের ব্যাপারে তুমি আগে জেনে ফেলেছে?
হুঁ।
তোমার এই এই…
রূপা কথা পাচ্ছে না। রাগে তার চিন্তা এলোমেলো হয়ে গেছে।
আমি বললাম, টেলিফোন রাখি রূপা? এখন তোমাদের বাংলো বাড়িতে গিয়ে লাভ হবে না। দিন-তারিখ দেখে যেতে হবে—পূর্ণিমা দেখে। নেক্সট পূর্ণিমায় যাব। অবশ্যেই যাব, রাখি কেমন?
আমি টেলিফোন নামিয়ে বের হয়ে এলাম। পাশের একটা দোকানে ঢুকলাম। কাগজের টুকরোটা কতটুকু কাজ করে দেখা দরকার। মনে হচ্ছে ভালো ব্যবস্থা।
এই দোকানটার সেলসম্যান কিংবা মালিক আগের দোকানটার মতো চট করে রিসিভার এগিয়ে দিলেন। ভূরু কুঁচকে কাগজটা দেখতে দেখতে বললেন, আপনি কথা বলতে পারেন না?
আমি হ্যাঁ-সূচক মাথা নাড়লাম।
কথা বলতে পারেন তাহলে কাগজে লিখে এনেছেন কেন? এই ঢং করার দরকার কী?
আমি হাসলাম। মধুর ভঙ্গির হাসি। ভদ্রলোকের ভূরু আরো কুচঁকে গেল।
বুঝলেন হিমু, যা করবেন স্ট্রেইট করবেন। বাঁকা পথে করবেন না। ‘ছিরাতুল মুস্তাকিম’—সরল পথ। কোথায় আছে বলেন দেখি?
সূরা ফাতেহা।
গুড। নিন টেলিফোন,যত ইচ্ছা বান্ধবীর সঙ্গে গল্প করুন।আবার যখন দরকার হবে চলে আসবেন। স্লিপ ছিঁড়ে ফেলে দিন। আমার সামনেই ছিঁড়ুন।
আমি স্লিপ ছিঁড়লাম। ভদ্রলোক গম্ভীর গলায় বললেন,গুড। নিন, কথা বলুন।যা ইচ্ছা বলতে পারেন।আমি শুনব না।আমি একটু দূরে যাচ্ছি।ভদ্রলোক সরে গেলেন। রূপাকে দ্বিতীয়বার টেলিফোন করার কোনো অর্থ হয় না। আমার আর কোনোও বান্ধবীও নেই। টেলিফোন করলাম বড়খালার বাসায়। খালু ধরলেন, মিহি গলায় বললেন, কে হিমু?
খালু, আপনি অফিসে যান নি?
আর অফিসে যাওয়া-যাওয়ি, যে যন্ত্রণা বাসায়!
কী হয়েছে?
তোমার খালা যা শুরু করেছে এতে আমার পালিয়ে যাওয়া ছাড়া পথ নেই।
খালা এখন কী করছেন?
জিনিসপত্র ভাঙছে।আর কী করবে! আমাকে যে সব কুৎসিত ভাষায় গালাগালি দিচ্ছে তা শুনলে বস্তির মেয়েরাও কানে হাত দিবে।
অবস্থা মনে হয় সিরিয়াস।
আর অবস্থা! তুমি টেলিফোন করেছ কেন?
জরুরি একটা খবর দেবার জন্যে টেলিফোন করেছিলাম।এখন আপনার কথাবার্তা শুনে ভুলে গেছি।
বাসায় আসো না কেন?
চলে আসব। এখন কয়েকদিন একটু ব্যস্ত।ব্যস্ততা কমলেই চলে আস।
তোমার আবার কিসের ব্যস্ততা?
নিষ্পাপ মানুষ খুঁজে বেড়াচ্ছি খালুজান।
কী খুঁজে বেড়াচ্ছ?
নিষ্পাপ মানুষ।
টেলিফোনেই শুনলাম ঝনঝন শব্দে কী যেন ভাঙল। খালুজান খট করে টেলিফোন নামিয়ে রাখলেন।আমার মনে হয় পালিয়ে গেলেন।
দুপুরে খাবার খাচ্ছি ছাপড়া হোটেলে। রুটি ডাল গোশত। গরম গরম রুটি ভেজে দিচ্ছে। ডাল গোশত ভয়াবহ ধরনের ঝাল।জিহবা পুড়ে যাচ্ছে। কিন্তু খেতে হয়েছে চমৎকার। আমাকে খাওয়াচ্ছে একলেমুর মিয়া।সে আজ বড়ই চুপচাপ। অন্য সময় নিচু গলায় সারাক্ষণ কথা বলত। উচ্চশ্রেণীর কথাবার্তা। আজ কিছুই বলছে না। কারণ তার মেয়েটাকে সে দুদিন ধরে খুঁজে পাচ্ছে না। এটা কোনো ব্যাপার না। মেয়েটা পাগলা টাইপের।প্রায়ই উধাও হয়ে যায়।আবার ফিরে আসে।
একলেমুর মিয়া আতিথেয়তার কোনো ত্রুটি করল না।খাওয়ার শেষে মিষ্টি পান এনে দিল, সিগ্রেট এনে নিজেই ধরিয়ে দিল।
একলেমুর মিয়া।
জি।
ভিক্ষা করতে কেমন লাগে বলো দেখি?
ভালো লাগে। কত নতুন নতুন মাইনষের সাথে পরিচয় হয়। এক এক মানুষ এক এক কিসিমের। বড় ভালো লাগে।
একলেমুর মিয়া খিকখিক করে হাসছে।আমি বললাম, হাসছ কেন?
একবার কী হইছে হুনেন ভাইসাব, গাড়ির মইধ্যে এক ভদ্রলোক বহা আছে।আমি হাতটা বাড়াইয়া বললাম, ভিক্ষা দেন আল্লাহর নামে। সাথে সাথে হেই লোক হাত বাড়াইয়া দিছে আমার গালে এক চড়।
কেন?
এইটাই তো কথা।কী কইলাম আফনেরে—নানান কিসিমের মানুষ এই দুনিয়ায়।এরার সাথে পরিচয় একটা ভাগ্যের কথা। ঠিক কইলাম না?
ঠিক না বেঠিক বুঝতে পারছি না।
এই এক সারকথা বলেছেন ভাইজান। ঠিক-বেঠিক বুঝা দায়।ক্ষণে মনে লয় এইটা ঠিক।ক্ষণে মনে লয় উঁহুঁ এইটা ঠিক না।
চড় দেয়ার পর ঐ লোক কী করল? গাড়ি করে চলে গেলে?
সাথে সাথে যায় নাই। লাল বাত্তি জ্বলতেছিল। যাইব ক্যামনে? সবুজ বাত্তির জন্যে অপেক্ষা করতেছিল।
তোমাকে কিছু বলে নি?
জে না।অনেকক্ষণ তাকাইয়াছিল।কিছু বলে নাই।
তুমি কি করলে?
আমি হাসছি।
সিগারেট শেষ টান দিতে দিতে আমি বললাম, ঐ লোকের সঙ্গে তোমার তো আবার দেখা হয়েছিল, তাই না?
বুঝলেন ক্যামনে?
আমার সেই রকমই মনে হচ্ছে।
ধরছেন ঠিক। উনার সঙ্গে দেখা হইছে।ঠিক আগের জায়গাতেই দেখা হইছে।আমি বললাম, স্যার আমারে চিনছেন? ঐ যে চড় মারছিলেন।
লোকটা কী বলল?
কিছু বলে নাই, তাকাইয়াছিল।তবে আমারে চিনতে পারছে।বড়ই মজার এই দুনিয়া ভাইসাব! লোকে দুনিয়ার মজাটা বুঝে না।মজা বুঝলে—দুঃখ কম পাইত।
উঠি একলেমুর মিয়া।
আমি উঠলাম।একলেমুর ফার্মগেটের ওভারব্রিজে গামছা বিছিয়ে বসে পড়ল। প্রায় সঙ্গে সঙ্গে একজন ময়লা এক টাকার নোট ছুড়ে ফেলল গামছায়।
একলেমুর নিচু গলায় বলল, অচল নোট।টেপ মারা,ছিঁড়া।কেউ নেয় না।ফকিরের দিয়া দেয়।এক কামে দুই কাম হয়—সোয়াব হয়, আবার অচল নোট বিদায় হয়।মানুষ খালি সোয়াব চায়, সোয়াব।অত সোয়াব দিয়া হইব কী?
দুপুরে আমার ঘুমের জন্যে নির্দিষ্ট জায়গা আছে—পার্ক।কখনো সোহরাওয়ার্দী উদ্যান, কখনো চন্দ্রিমা উদ্যান, কখনো সস্তাদরের কোনো মিউনিসিপ্যালটি পার্ক।যখন যেটা হাতের কাছে পাই।
ফার্মগেট থেকে চন্দ্রিমা উদ্যান এবং সোহরাওয়ার্দী উদ্যান দুটাই সমান দূরত্বে।তবে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান আমার প্রিয়।সেখানকার বেঞ্চগুলো ঘুমানোর জন্যে ভালো।তাছাড়া সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে ড্রামা অনেক বেশি।দুপুরে ঘুমিয়ে পড়ার আগে মজার মজার সব দৃশ্য দেখা যায়।ক’দিন ধরেই দেখছি স্কুলের ড্রেসপরা একমেয়ে মাঝবয়সী এক লোকের সঙ্গে পার্কে ঘোরাঘুরি করছে।লোকটার হাবভাবেই বোঝা যায় মতলব ভালো না।সুযোগমতো লোকটাকে একটা শিক্ষা দিতে হবে।
আরাম করে শুয়ে আছি। গাছের পাতার ফাঁক দিয়ে ফিল্টার হয়ে রোদ এসে গায়ে পড়েছে।আরাম লাগছে—স্কুলের ওই মেয়েটিকে দেখা যাচ্ছে।আচার খাচ্ছে।সঙ্গে মিচকা শয়তানটা আছে।মিচকা শয়তানটা বসার জায়গা পাচ্ছে না।ভালো ভালো সব জায়গা দখল হয়ে আছে। মিচকাটা হতাশ গলায় বলল, পলিন, কোথায় বসি বলো তো?
পলিন মেয়েটা মুখভর্তি আচার নিয়ে বলল, বসব না।হাঁটব।
লোকটা মেয়েটার বগলের কাছে মুখ দিয়ে কী যেন বলল।পলিন মাথা ঝাঁকিয়ে বলল, কেন শুধু অসভ্য কথা বলেন?
লোকটা হে-হে করে হাসছে।লোকটার কথা শুধু যে অসভ্য তাই নয়—হাসিটাও অসভ্য।ঠাস করে এর গালে একটা চড় বসিয়ে দিয়ে আবার নির্বিকার ভঙ্গিতে শুয়ে ঘুমিয়ে পড়লে কেমন হয়?
সভ্য সমাজে আজগুবি কিছু করা যায় না।আমি চোখ বন্ধ করে ঘুমিয়ে পড়লাম।
কাল সারারাত ঘুম হয় নি।
ঘুম না হবার কোনো কারণ ছিল না। কারণ ছাড়াই এই পৃথিবীতে অনেক কিছু ঘটে। দিনের আলো ফোটা পর্যন্ত অপেক্ষা করে ঘুমোতে গেলাম। সঙ্গে সঙ্গে চোখভর্তি ঘুম। কতক্ষণ ঘুমিয়েছি জানি না। ঘুম ভাঙল স্বপ্ন দেখে। আমার বাবাকে স্বপ্নে দেখলাম। তিনি আমার গা ঝাঁকাতে ঝাঁকাতে বললেন, এই হিমু, হিমু, ওঠ। তাড়াতাড়ি ওঠ। ভূমিকম্প হচ্ছে। ধরণী কাঁপছে।
আমি ঘুমের মধ্যেই বললাম, আহ, কেন বিরক্ত করছ?
বাবা ভরাট গলায় বললেন, প্রাকৃতিক দুর্যোগের মতো মজার ব্যাপার আর হয় না। ভেরি ইন্টারেস্টিং। এই সময় চোখকান খোলা রাখতে হয়। তুই বেকুবের মতো শুয়ে আছিস।
ঘুমোতে দাও বাবা।
তোর ঘুমোলে চলবে ন। মহাপুরুষদের সবকিছু জয় করতে হয়। ক্ষুধা, তৃষ্ণা, ঘুম। ঘুম হচ্ছে দ্বিতীয় মৃত্যু। সাধারণ মানুষ ঘুমায়—অসাধারণরা জেগে থাকে।…
দয়া করে ঝাঁকুনি বন্ধ করো,প্লিজ।
আমার ঘুম ভাঙল। আমি বিছানায় উঠে বসলাম। চৌকি কাঁপছে। দেয়ালে রবীন্দ্রনাথের ছবিওয়ালা এক ক্যালেন্ডার। সেই রবীন্দ্রনাথও কাঁপছেন। আমি বুঝতে পারছি এটাও স্বপ্নের কোনো অংশ কি না। মানুষের স্বপ্ন অসম্ভব জটিল হতে পারে।
না, এটা বোধহয় স্বপ্ন না। বোধহয় সত্যি। কটকট, কটকট শব্দ হচ্ছে। অনেকদিন পর ভূমিকম্প অনুভব করছি। আমি বালিশের নিচে থেকে সিগারেট বের করলাম।
স্বপ্ন সম্পর্কে পুরোপুরি নিশ্চিত হবার জন্যে সিগারেট ধরানো। স্বপ্ন শুধু যে বর্ণহীন তাই না—গন্ধহীনও। সিগারেট ধরাবার পর তার উৎকট গন্ধ যদি নাকে আসে তাহলে বুঝতে হবে এটা স্বপ্ন নয়—সত্য। কেউ একজন আযান দিচ্ছে। এই সময় আযানের অর্থ হলো—বিপদ। মহাবিপদ। হে আল্লাহ, রক্ষা করো।
বিপদ থেকে বাঁচাও।
সিগারেট ধরাতে পরছি না। হাত কাঁপছে—শরীরের প্রতিটি জীবিত কোষের ডিএনএ অণু সুদূর অতীত থেকে ভয়ের স্মৃতি নিয়ে এসেছে। সে ভূমিকম্পের মতো অস্বাভাবিক অবস্থায় ভয় পাওয়াবেই। ভয় পাইতে না চাইলেও ভয় পাওয়াবে।
আগুন দেখলে আমরা তেমন ভয় পাই না। ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের সময় ছুটে পালিয়ে যাই না। একটু দূরে দাঁড়িয়ে থাকি। দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখি কিন্তু ভূমিকম্পের সামান্য তীব্র ইচ্ছা করে ছুটে কোথাও চলে যেতে।
না, ভয় পেলে চলবে না। মনকে শান্ত করতে হবে। স্থির করতে হবে। সিগারেট ধরালাম। তামাকের উৎকট গন্ধ।
এটা স্বপ্ন নয়। এটা সত্যি। ভূমিকম্প হচ্ছে। পরপর দুটা ঝাঁকুনি। ভয় কমছে। মন শান্ত হয়ে আসছে। চারপাশের পৃথিবীকে এখন আর অবাস্তব মনে হচ্ছে না।
ছোট্ট একটা ভূমিকম্প হয়েছে।
রিখটার স্কেলে এর মাপ দু-তিনের বেশি হবে না। পরপর দুবার সামান্য ঝাঁকুনি। এতেই হইচই, ছোটাছুটি। আমার পাশের ঘরে তাসখেলা হচ্ছিল। গতকাল রাত এগারটায় শুরু হয়েছিল, এখান সকাল আটটা। এখনো চলছে। ছুটির দিনে পয়সা দিয়ে খেলা হয়। ম্যারাথন চলে। তাসুড়েরা তাস ফেলে প্রথম হইচই করে বারান্দায় এলো, তারপর সবাই একসঙ্গে ছুটল সিঁড়ির দিকে। মনে হচ্ছে,এরা সিঁড়ি ভেঙে ফেলবে।
আমি সিগারেট টানছি। ছুটে নিচে যাবার তেমন কোনো পরিকল্পনা নেই। তবে অবহেলার ভঙ্গি করে বিছানায় শুয়ে থাকারও অর্থ হয় না। প্রকৃতি ভয় দেখাতে চাচ্ছে—আমার উচিত ভয় পাওয়া। বাঁচাও বাঁচাও বলে রাস্তায় ছুটে যাওয়া। ভয়ে পেয়ে দল বেঁধে ছোটাছুটিরও আনন্দ আছে। আমি দরজার বাইরে এসে দেখি, বারান্দায় দবির খাঁ বসে নামাযের ওযু করছেন। সকাল নটা কোনো নামাযের সময় না। দবির খাঁ প্রায় সারারাত জেগে থেকে শেষরাতে ঘুমিয়ে পড়েন বলে ফজরের নামায পড়তে বেলা হয়। দবির খাঁ আমার দিকে তাকিয়ে ভীত গলায় বললেন, হেমু,ভূমিকম্প।
আমার নাম হেমু নয়, হিমু। দবির খাঁ কখনো হিমু বলেন না। মনে হয় তিনি ই-কারান্ত শব্দ বলতে পারেন না।
হেমু সাহেব, ভূমিকম্প। নামেন নামেন, রাস্তায় যান।
আপনি বসে আছেন কেন? আপনিও যান।
দবির খাঁ হতাশ চোখে তাকাল। তখন মনে পড়ল—এই লোকের পায়ে সমস্যা আছে। হাঁটতে পারে না। মাটিতে বসে ছেঁচড়ে ছেঁচড়ে এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় যায়। তাঁর পক্ষে দোতলা থেকে একতলায় একা নামা সম্ভব নয়।
নিচে নামতে চাইলে আমি ধরাধরি করে নামাতে পারি। নামবেন? নাকি বসে বসে নামায পড়বেন? আপনার ওযু কি শেষ হয়েছে?
দবির খাঁ মনস্থির করতে পারছেন না। আমি বললাম, ধরুন শক্ত করে আমার হাত, নামিয়ে দিচ্ছি।
দবির খাঁ ক্ষীণ গলায় বললেন, যা হবার হয়ে গেছে। আর বোধহয় হবে না।
হবে। ভূমিকম্পের নিয়ম হলো—প্রথম একটা ছোট, ওয়ার্নিঙের মতো। সবাই যাতে সাবধান হয়ে যায়। তারপরেটা বড়। যাকে বলে হেভি ঝাঁকুনি।
বলেন কী?
নামবেন নিচে?
জি নামব, অবশ্যই নামব।
দবির খাঁ গন্ধমাদন পর্বতের কাছাকাছি। আমার পক্ষে একা তাঁকে নামানো প্রায় অসম্ভব কাজের একটি। ডুবস্ত মানুষ যেভাবে অন্যের গলা জড়িয়ে ধরে তিনিও সেভাবে দু’হাতে আমার গলা চেপে ধরেছেন। আমার দুজন প্রায় ফুটবলের মতো গড়িয়ে সিঁড়ি দিয়ে নামছি।
কলঘরে মেসের ঝি ময়নার মা বাসন ধুতে বসেছে। ভূমিকম্পের বিষয়ে সে নির্বিকার। একমনে বাসন ধুয়ে যাচ্ছে। আমাদের দৃশ্যে সে খানিকটা আলোড়িত হলো। মুখে আচঁল চাপা দিয়ে হাসছে। দবির খাঁ চাপা গলায় বললেন—মাগির কারবার দেখেন। দেখছেন কাপড়চোপড়ের অবস্থা? এইরকম কাপড় পরার দরকার কী? নেংটা থাকলেই হয়।
ময়নার মার স্বাস্থ্য ভালো, সে দেখতেও ভালো। মায়া-মায়া চোখমুখ। কাজকর্মেও অত্যন্ত ভালো। শুধু একটাই দোষ তার—কাপড়চোপড় ঠিক থাকে না, কিংবা সে নিজেই ঠিক রাখে না। মুখে আঁচল চাপা দিয়ে সে হাসছে। তার ব্লাউজের সব কটি বোতাম খোলা। এদিকে তার ভ্রূক্ষেপও নেই।
দবির খাঁ চাপা গলায় বললেন,হেমু সাহেব! দেখলেন মাগির অবস্থা! ইচ্ছা করে বোর্ডারদের বুক দেখিয়ে বেড়ায়। শেষ জামানা চলে এসেছে। একেবারে শেষ জামানা। লজ্জা-শরম সব উঠে গেছে। আইয়েমে জাহেলিয়াতের সময় যেমন ছিল—এখনো তেমন।
আমার রাস্তায় দাঁড়িয়ে ভূমির দ্বিতীয় কম্পনের জন্যে অনেকক্ষণ অপেক্ষা করলাম। কিছুই হলো না। দবির খাঁকে রাস্তার একপাশে বসিয়ে দিয়েছি। তিনি সিগারেট টানছেন। তাঁকে ঘিরে ছোটখাটো একটা জটলা। কেউ বোধহয় মজার কোনো গল্প করছে। আমি দূরে আছি বলে গল্পের কথক কে বুঝতে পারছি না। আমি ইচ্ছা করেই দবির খাঁর কাছ থেকে দূরে সরে আছি। এই পর্বতকে আবার দোতলায় টেনে তোলা আমার কর্ম নয়। এই পবিত্র দায়িত্ব অন্য কেউ পালন করুক।
হিমু না? এদিকে শুনে যান তো?
আমাদের মেসের মালিক বিরক্তমুখে আমাকে ডাকলেন। এই লোকটা আমাকে দেখলেই বিরক্ত হন। যদিও মেসের ভাড়া আমি খুব নিয়মিত দেই, এবং কখনো কোনোরকম ঝামেলা করি না। আমি হাসিমুখে ভদ্রলোকের কাছে গেলাম। আন্তরিক ভঙ্গিতে হাসার চেষ্টা করতে করতে বললাম, কী ব্যাপার, সিরাজ ভাই? আমার হাসিতে তিনি আরো রেগে গেলেন বলে মনে হয়। চোখমুখ কুঁচকে বললেন, আপনি কোথায় থাকেন কী করেন কে জানে—আমি কোনো সময় আপনাকে খুঁজে পাই না।
এই তো পেলেন।
এর আগে আমি চারবার আপনার খোঁজ করেছি। যতবার খোঁজ নেই শুনি ঘর তালাবদ্ধ। থাকেন কোথায়?
রাস্তায় রাস্তায় থাকি।
রাস্তায় রাস্তায় থাকলে খামাখা মেসে ঘর ভাড়া করে আছেন কেন? ঘর ছেড়ে দেবেন। সামনের মাসের এক তারিখে ছেড়ে দেবেন।
এটা বলার জন্যেই খোঁজ করছিলেন?
হুঁ।
রাখতে চাচ্ছেন না কেন? আমি কি কোনো অপরাধ-টপরাধ করেছি?
সিরাজ মিয়া রাগী গলায় বললেন, কাকে মেসে রাখব, কাকে রাখব না—এটা আমার ব্যাপার। আপনাকে আমার পছন্দ না।
ও আচ্ছা।
মাসের এক তারিখ ঘর ছেড়ে দেবেন। মনে থাকবে?
হুঁ।
কোনোরকম তেড়িবেড়ি করার চেষ্টা করবেন না। সোজা আঙুলে ঘি না উঠলে আঙুল কী করে বাঁকা করতে হয় আমি জানি।
সিরাজ মিয়া তর্জনী বাঁকা করে আমাকে বাঁকা আঙুল দেখিয়ে দিলেন। আমি সহজ গলাতেই বললাম—এটাই আপনার কথা, না আরো কথা আছে?
এইটাই কথা।
আমি বললাম, কঠিন কথাটা তো বলা হয়ে গেল।এখন সহজ হন। সহজ হয়ে একটু হাসুন দেখি।
সিরাজ মিয়া হাসলেন না। তবে দবির মিয়াকে ঘিরে যে দলটা জটলা পাকাচ্ছিল সে দলটার ভেতর থেকে হো-হো হাসির শব্দ উঠল।
হাসির অনেক ক্ষমতার ভেতর একটা ক্ষমতা হলো—হাসি ভয় কাটিয়ে দেয়। এদের ভয় কেটে গেছে। এরা কিছুক্ষণের মধ্যে মেসবাড়িতে ফিরে যাবে। তাসখেলা আবার শুরু হবে। দবির খাঁ ওযু করে তার ফজরের কাজা নামায শেষ করবেন।
ছুটির দিনের ভোরবেলায় একটা ছোটখাটো ভূমিকম্প হওয়াটা মন্দ না। চারদিকে উৎসব উৎসব ভাব এসে গেছে। বড় একটা বিপদ হওয়ার কথা ছিল, হয় নি। সেই আনন্দের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সহমর্মিতার আনন্দ। বড় ধরনের বিপদের সামনেই একজন মানুষ অন্য একজনের কাছে আশ্রয় খোঁজে। পৃথিবীতে ভয়াবহ ধরনের বিপদ-আপদেরও প্রয়োজন আছে।
মেসে আজ ইমপ্রুভড ডায়েটের ব্যবস্থা হচ্ছে। মাসের প্রথম সপ্তাহের বৃহস্পতিবার ইমপ্রুভড ডায়েট হয়। আজ তৃতীয় সপ্তাহ চলছে,
ইমপ্রুভড ডায়েটের কথা না—ভূমিকম্পের কারণেই এই বিশেষ আয়োজন।
আমি ইমপ্রুভড ডায়েটের ঝামেলা এড়াবার জন্যে দরজা বন্ধ করে শুয়ে আছি। হাতে দশটা টাকাও নেই। ইমপ্রুভড ডায়েটের ফেরে পড়লে কুড়ি-পঁচিশ টাকা চাঁদা দিতে হবে। কোত্থেকে দেব?
এরচে’ শুয়ে শুয়ে নিষ্পাপ মানুষের প্রাথমিক তালিকাটা করে ফেলা যাক। একলেমুর মিয়ার নাম লেখা যেতে পারে। ভিক্ষা করা ছাড়া আর কোনো পাপ তার আছে বলে মনে হয় না। ভিক্ষা নিশ্চয়ই পাপের পর্যায়ে পড়ে না। এই পৃথিবীর অনেক মহাপুরুষই ভিক্ষাবৃত্তি করতেন। তাছাড়া একলেমুর মিয়ার কিছু সুন্দর নিয়মকানুনও আছে। যেমন—সে ভিক্ষার টাকা জমা রাখে না। সন্ধ্যার পর যা পায় তার পুরোটাই খরচ করে ফেলে। অন্য ভিক্ষুকদের রাতের খাওয়া খাইয়ে দেয়।
খাতায় লিখলাম—
১। একলেমুর মিয়া, পেশায় ভিক্ষুক।
বয়স ৪৫ থেকে ৫৫
ঠিকানা : জোনাকী সিনেমাহলের গাড়ি বারান্দা।
শিক্ষা : ক্লাস থ্রি পর্যন্ত।
২। মনোয়ার উদ্দিন।
পেশায় ব্যাংকের জুনিয়র অফিসার।
শিক্ষা : বিএ অর্নাস।
এই পর্যন্ত লিখেই থমকে যেতে হলো। মনোয়ার উদ্দিন আমার পাশের ঘরে থাকেন। তার সম্পর্কে বিশেষ কিছুই জানি না। শুধু মনে হয় লোকটা ভালো। তাঁকে একদিন দেখেছি আমার কলঘরে একটা ছ’সাত বছরের বাচ্চার মাথায় পানি ঢালছেন। জিজ্ঞেস করলাম, কী হয়েছে? তিনি জানালেন, ছেলেটা নর্দমায় পড়ে গিয়ে কাঁদছিল। তিনি তুলে নিয়ে এসে গা ধোয়াচ্ছেন।
বুঝলেন হিমু সাহেব একটা আস্তা লাক্স সাবান হারামজাদার গায়ে ডলেছি তারপরেও গন্ধ যায় না।
মনোয়ার উদ্দিন সাহেবের নামটা লিস্টে রাখা যেতে পারে। ফাইন্যান্স স্ক্রুটিনিতে বাদ দিলেই হবে।
আরো দুইটা নাম ঝটপট লিখে ফেললাম। প্রসেস অব এলিনেশনের মাধ্যমে বাদ দেয়া হবে। এর মধ্যে আছে মোহাম্মদ রজব খন্দকার, সেকেন্ড অফিসার লালবাগ থানা। তিনি একবার আমাকে বলেছিলেন—পুলিশ হয়ে জন্মেছি ঘুস খাব না তা তো হয় না। গোয়ালাকে যেমন দুধে পানি মেশাতেই হয় পুলিশকে তেমনি ঘুস খেতে হয়। আমিও খাব। শিগগির খাওয়া ধরব। তবে ঠিক করে রেখেছি প্রথম ঘুস খাবার আগে তরকারির চামচে এক চামচ মানুষের ‘গু’ খেয়ে নেব। তারপর শুরু করব জোরেশোরে। ‘গু’টা খেতে পারছি না বলে ঘুস খাওয়া ধরতে পারছি না। তবে ঘুস তো খেতেই হবে। একদিন দেখবেন আঙুল দিয়ে নাক চেপে চোখ বন্ধ করে এক চামচ মানুষের গু খেয়ে ফেলব। জিনিসটা খেতে হয়তো বা খারাপ হবে না। কুকুরকে দেখেন না—কত আগ্রহ করে খায়। কুকুরের সঙ্গে মানুষের অনেক মিল আছে।
এখন নাম চারটা—
(১) একলেমুর মিয়া
(২) মনোয়ার উদ্দিন
(৩) মোহাম্মদ রজব খোন্দকার
(৪) রুপা
মনোয়ার উদ্দিনের নাম রাখাটা বোধহয় ঠিক হবে না। বড়ই তরল স্বভাবের মানুষ। তরল স্বভাবের মানুষের পক্ষে পব্ত্রি থাকাটা কঠিন কাজ। তাঁকে প্রায়ই দেখা যায় ময়নার মার সামনে উবু হয়ে বসে গল্প করছেন। ময়নার মা মুখ ঝামটা দিয়ে বলছে—একটু সইরা বসেন না—এক্কেবারে শইল্যের উপরে উইঠ্যা বসছেন। হি-হি-হি।
সেই হাসি প্রশ্রয়ের হাসি। আহবানের হাসি। তরল স্বভাবের মানুষ যত পবিত্রই হোক এই হাসির আহবান অগ্রাহ্য করতে পারবে না।
আমি লাল কালি দিয়ে মনোয়ার উদ্দিনের নাম কেটে দিলাম।
দরজায় টোকা পড়ছে। আমি খাতা বন্ধ করে দরজা খুলে দিলাম।
মনোয়ার সাহেব দাঁড়িয়ে আছেন। তিনি অত্যন্ত ব্যস্তভঙ্গিতে বললেন, কুড়িটা টাকা ছাড়ুন তো হিমু সাহেব। স্পেশাল খানা হবে—রহমত বাবুর্চিকে নিয়ে এসে খাসির রেজালা আর পোলাও।
আমি শুকনো মুখে বললাম, আমার কাছে টাকা পয়সা নেই।
সামান্য কুড়ি টাকাও নেই? কী বলছেন আপনি! দেখি আপনার মানিব্যাগ?
মনোয়ার সাহেব নাছোড়বান্দা প্রকৃতির মানুষ।মানিব্যাগ দিয়ে দিলাম। শূন্য মানিব্যাগ তিনি খুবই বিস্ময়ের সঙ্গে দেখলেন।
এত সুন্দর একটা মানিব্যাগ খালি করে ঘুরে বেড়ান কী করে?
ঘুরে বেড়াই আর কোথায়, সারাদিনই তো বিছানায় শোয়া।
আচ্ছা থাক, টাকা দিতে হবে না। আপনি আমার গেস্ট। আপনার খরচ আমি দেব। নো বিগ ডিল। তবে আপনাকে কাজ করতে হবে। বসিয়ে রেখে খাওয়াব না।
কী কাজ?
আমার সঙ্গে বাজার-সদাই করবেন। খাসির গোশত দেখেশুনে কিনতে হবে। চট করে প্যান্ট পরে নিন।
আমি প্যান্ট পরলাম। মনোয়ার সাহেব এলেন পিছু পিছু।
খাসির গোশত কেনা কোনো ইজি ব্যাপার না, বুঝল্নে ভাই। ইট ইজ এ ডিফিকাল্ট জব। খাসির ওজন হতে হয় সাত সের। এর’চে কম ওজনের হলে মাংস গলে যায়। বেশি হলে চর্বি হয়ে যায়। বুঝলেন?
জি বুঝলাম।
খাসির গোশত রান্না করাও খুব ডিফিকাল্ট। একটু এদিক-ওদিক হলে all gone. গোশত নষ্ট হয় কিসে বলুন তো?
বলতে পারছি না।
আলু। আলু দিয়েছেন কি কর্ম কাবার। আলু গলে যায়, সরুয়া থিক হয়ে যায়…
ভদ্রলোকের হাত থেকে যে করেই হোক উদ্ধার পেতে হবে। কোনো বুদ্ধি মাথায় আসছে না।
মনোয়ার ভাই।
বলুন।
একটু বসুন তো আমার ঘরে। এক দৌড় দিয়ে নিচ থেকে আসছি—একটা পান খেয়ে আসি। বমি-বমি লাগছে।
যাওয়ার পথে পান কিনে নিলেই হবে।
না না—এক্ষুণি পান লাগবে।
আমি ছুটে বের হয়ে এলাম। আর ফিরে না গেলেই হবে। মনোয়ার সাহেব অনেকক্ষণ আমার জন্য অপেক্ষা করবেন। নিজের ঘর থেকে তালা এনে আমার ঘর বন্ধ করবেন। নিচে খানিকটা খোঁজখবরও করবেন—তারপর সব পরিষ্কার হবে। তিনি সাত সের ওজনের খাসি কিনতে বের হবেন।
মোড়ের পানের দোকান থেকে একটা পান কিনলাম। পান খাওয়ার কথা বলে বের হয়েছি, না খাওয়াটা ঠিক হবে না। মিথ্যার সঙ্গে খানিকটা সত্য মিশে থাকুক। যদিও ভোরবেলা আমি কখনো পান খেতে পারি না। ঘাস খেয়ে একটা দিন শুরু করার মানে হয় না। ঘাস যদি খেতেই হয় দিনের শেষভাগে খাওয়াই ভালো।
কোথায় যাব ঠিক করতে পারছি না। ইয়াকুব সাহেবকে কি বলে আসব—চিন্তা করবেন না—কাজ এগোচ্ছে। নাম লিস্ট করা শুরু হয়েছে। গোটা বিশেক নাম পাওয়া গেছে। সেখান থেকে নাম কাটতে কাটতে একটা নামে আসব। সময় লাগবে। ধৈর্য ধরতে হবে। মানুষের ধৈর্য নেই। মানুষের বড়ই তাড়াহুড়া। পবিত্র গ্রন্থ কোরান শরিফেও বলা হয়েছে—‘হে মানব সন্তান, তোমাদের বড়ই তাড়াহুড়া।’
বেশ কয়েকটা খালি রিকশা আমার সামনে দিয়ে যাচ্ছে। রিকশাওয়ালারা আশা-আশা চোখে তাকাচ্ছে আমার দিকে। খালি রিকশা দেখলেই চড়তে ইচ্ছা করে। ভুল বললাম, খালি রিকশা চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকতে দেখলে চড়তে ইচ্ছা করে না। চলন্ত খালি রিকশা দেখলে চড়তে ইচ্ছা করে। আমি এ রকম চলন্ত একটা রিকশায় প্রায় লাফিয়ে উঠে পড়লাম। রিকশাওয়ালা হাসিমুখে ঘাড় ঘুরিয়ে আমাকে দেখল। কোথায় যেতে চাই কিছু জানতে চাইল না। মনে হচ্ছে এ বিপজ্জনক ধরণের রিকশাওয়ালা—যেখানে সে রওনা হয়েছে সেখানেই যাবে। মাঝপথে লাফ দিয়ে রিকশা থেকে নেমে পড়লেও কিছু বলবে না, ভাড়া দেন, ভাড়া দেন বলে চেঁচাবে না।
ঢাকা শহরে রিকশাওয়ালাদের সাইকোলজি নিয়ে কেউ এখনো গবেষণা করেন নি। গবেষণা করলে মজার মজার জিনিস বের হয়ে আসত।
মতিঝিলের কাছে আমি লাফ দিয়ে রিকশা থেকে নামলাম। রিকশাওয়ালা আবার হাসিমুখে তাকাল। সে রিকশার গতি কমাল না। যে গতিতে চালাচ্ছিল সেই গতিতেই চালাতে লাগল। আর তখনি বুঝতে পারলাম, এই রিকশাওয়ালা আমার পূর্বপরিচিত। এর নাম হাসান। হাসানের কী যেন একটা ইন্টারেস্টিং গল্প আছে। গল্পটা মনে পড়ছে না। আচ্ছা, হাসানের নামটা কি লিস্টিতে তুলব?
আপাতত থাক, পরে কেটে দিলেই হবে। প্রসেস অব এলিমিনেশন। হারাধনের দশটি ছেলে দিয়ে শুরু হবে—শেষ হবে এক ছেলেতে।
বড় খালুর অফিস মতিঝিলে।
অনেকদিন পর তাঁর অফিস ঘরে উঁকি দিলাম। ভুরভুর করে এলকোহলের গন্ধ আসছে। খালু সাহেব মনে হয় এলকোহলের মাত্রা বাড়িয়েই দিচ্ছেন। আগে অফিসে এলে গন্ধ পাওয়া যেত না। এখন যায়।
আসব খালু সাহেব?
আয়।
বোঝাই যাচ্ছে তিনি প্রচুর পান করেছেন। এমনিতে তিনি আমাকে তুমি করে বলেন। মাতাল হলেই—তুই। মাতালরা অন্তরঙ্গ ভঙ্গিতে কথা বলতে ভালোবাসে।
আমি ঘরে ঢুকতে ঢুকতে বললাম, গরমের মধ্যে স্যূট পরে আছেন কেন?
খালু সাহেব ভুরু কুঁচকে তাকিয়ে রইলেন। মনে হচ্ছে আমাকে চিনতে পারছেন না।
বসতে পারি খালু সাহেব? নাকি জরুরি কিছু করছেন?
বোস।
আমি বসলাম। খালু সাহেবকে বুড়োটে দেখাচ্ছে। চকচকে টাইও তাঁর বুড়োটে ভাব ঢাকতে পারছে না। আমি পরিস্থিতি স্বাভাবিক করার জন্যে বললাম, ভূমিকম্প টের পেয়েছিলেন? বড় খালু ভূমিকম্পের ধার দিয়ে গেলেন না। নিচু গলায় বললেন, চা খাবি?
হুঁ।
তিনি যন্ত্রের মতো বেল টিপে চায়ের কথা বললেন। আমি হাসিমুখে বললাম, এলকোহলের গন্ধ পাচ্ছি।
বড়খালু রোবটের মতো গলায় বললেন, টেবিলে বার্নিশ লাগানো হয়েছে। বার্নিশের গন্ধ পাচ্ছিস।
ও আচ্ছা। আমি ভেবেছিলাম আপনি বোধহয় আজকাল অফিসেও চালাচ্ছেন।
ঠিকই ভেবেছিস। ভালোমতোই চালাচ্ছি। কেউ এলে বলি—টেবিলে বার্নিশ দিয়েছি। সন্দেহ বাতিকগ্রস্ত লোকজন লজ্জা পেয়ে যায়। তুই যেমন পেয়েছিস।
কিন্তু আপনার সঙ্গে খানিকক্ষণ কথা বলার পরই তো সবাই বুঝে যায় যে বার্নিশ টেবিলে না , আপনি বার্নিশ লাগিয়েছেন আপনার স্টমাকে।
কেউ কিচ্ছু বোঝে না। মানুষের ইন্টেলিজেন্সকে ইনফ্লুয়েন্স করা যায়। হিউম্যান ইন্টেলিজেন্স এইটাই হলো বড় ত্রুটি। বুঝতে পারছিস?
হুঁ।
নে চা খা। চা খেয়ে বিদেয় হয়ে যা। টাকা-পয়সা লাগবে?
হুঁ।
পাওয়া গেছে?
গোটা বিশেক নাম পাওয়া গেছে। এদের মাঝখান থেকে বের করতে হবে।
গোটা বিশেক নাম পেয়েছিস? বলিস কী! সারা পৃথিবীতে তো ২০টা নিষ্পাপ লোক নেই। স্ট্রেজ! নামগুলো পড় তো শুনি।
পড়া যাবে না। গোপন।
এই কুড়িটা নাম পেলি কোথায়?
পরিচিতদের মাঝখান থেকে যোগাড় করেছি।
ছেলে কটা, মেয়ে কটা?
ফিফটি, ফিফটি। দশটা ছেলে, দশটা মেয়ে।
বড় খালুকে উত্তেজিত মনে হচ্ছে। চোখ বড় বড় করে তাকাচ্ছেন। মাতাল মানুষ সহজেই উত্তেজিত হয়।
বাই এনি চান্স—তোর খালার নাম নেই তো?
আমি হাসলাম। সেই হাসার যে-কোনো অর্থ হতে পারে। বড় খালু সেই হাসি না-সূচক ধরে নিলেন।
গুড। অতি পাপিষ্ঠা মহিলা। সাতটা দোজখের মধ্যে সবচে’ খারাপটায় তার স্থান হবে বলে আমার বিশ্বাস।
তাই নাকি?
অবশ্যই তাই। সাতটা দোজখের নাম জানিস?
না।
সাতটা দোজখ হলো—
(১) জাহান্নাম
(২) হাবিয়া
(৩) সাকার
(৪) হুতামাহ
(৫) সায়ির
(৬) জাহিম
(৭) লাজা।
দোজখের নাম মুখস্থ করে রেখেছেন, ব্যাপার কী?
যেতে হবে তো ওইখানেই। কাজেই মুখস্থ করেছি।
আপনি নিশ্চিত যে দোজখে যাবেন?
অবশ্যই নিশ্চিত। তবে আমার স্থান সম্ভবত সাত নম্বর দোজখে হবে। সাত নম্বর দোজখ হলো ‘লাজা’। এখানে শাস্তি কম। আমার শাস্তি কমই হবে। বড় ধরনের পাপ বলতে গেলে কিছুই করি নি। যেমন ধর, মানুষ খুন করি নি।
মানুষ খুন করেনি নি?
না।
মানুষ খুন করার ইচ্ছা হয়েছে কি না বলুন।
তা হয়েছে। অনেকবার ইচ্ছা হয়েছে।
খুন করা এবং খুন করার ইচ্ছা প্রকাশ করা তো প্রায় কাছাকাছি।
তা ঠিক। এই জন্যেই তো আমার স্থান হবে লাজায় কিংবা জাহিমে।
আমি পকেট থেকে খাতাটা বের করতে করতে বললাম, মজার ব্যাপার কী জানেন বড় খালু—আপনার নাম কিন্তু নিষ্পাপ মানুষেদের তালিকায় আছে।
বলিস কী?
বড়খালু হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে রইলেন। মনে হচ্ছে তার মদের নেশাটা কেটে যাচ্ছে।
দেখেতে চান?
তুই ঠাট্টা করছিস নাকি?
না, ঠাট্টা করব কেন?
আমি খাতা খুলে বড় খালুর নাম দেখিয়ে দিলাম। তিনি থ হয়ে বসে আছেন। টেবিলের উপর রাখা পানির গ্লাসের পানি এক চুমুকে শেষ করে দিলেন।
বড় খালু যাই?
তিনি হ্যাঁ না কিছুই বললেন না। খকখক করে কাশতে লাগলেন। ভয়াবহ কাশি। মনে হচ্ছে কাশির সঙ্গে ফুসফুসের অংশবিশেষ উঠে আসবে। আমি তাঁর কাশি থামার জন্যে অপেক্ষা করছি। একটা লোক প্রাণপণে কাশছে, এই অবস্থায় তাঁকে ফেলে চলে যাওয়া যায় না।
হিমু!
জি।
তুই সত্যি তাহলে আমার নাম তোর লিস্টে তুলেছিস?
হুঁ।
নামটা খচ করে কেটে ফেল। তুই একটা কাজ কর। পাপীদের একটা লিস্ট কর। সেই লিস্টের প্রথম দিকে আমার নাম লিখে রাখ—In block letters.
আপনি চাইলে করব।
করব না—Do it. এক্ষুণি কর, এই নে কাগজ।
পরে এক সময় লিখে নেব।
নো, এক্ষুণি করতে হবে। রাইট নাউ।
বড় খালু হুঙ্কার দিলেন, হুঙ্কারের শব্দে সচকিত হয়ে তাঁর খাস বেয়ারা পর্দার আড়াল থেকে মাথা বের করল। বড় খালু বললেন—ভাগো। মারেগা থাপ্পড়….।
বাঙালি মাতাল যখন হিন্দি বলতে থাকে তখন বুঝতে হবে অবস্থা শোচনীয়। এদের ঘাঁটাতে নেই। আমি দ্রুত পাপীদের একটা তালিকা তৈরি করলাম। এক দুই তিন করে দশটা নম্বর বসিয়ে চার নম্বরে বড় খালুর নাম লিখে কাগজটা তাঁর দিকে বাড়িয়ে ধরলাম।
চার নম্বর কী মনে করে লিখলি? কেটে এক নম্বরে দে। আমার কথা তুই কি আমার চেয়ে বেশি জানিস…গাধা কোথাকার! গিদ্ধর কি বাচ্চা, son of গিদ্ধর।
আমি দেরি করলাম না—তৎক্ষাণ তাঁর নাম কেটে এক নম্বরে নিয়ে গেলাম।
এখন আরেকটা নাম লেখ—মুনশি বদরুদ্দিন।
ক নম্বরে লিখব?
এই লিস্টে না—পুণ্যবানদের লিস্টে।
মুনশি বদরুদ্দিন একজন পুণ্যবান ব্যক্তি?
হ্যাঁ, এই লোক হলো পূর্ত মন্ত্রণালয়ের একজন ক্লার্ক। এক পয়সা ঘুস খায় না। পূর্ত মন্ত্রণালয়ের র্ক্লাক কিন্তু ঘুস খায় না—চিন্তা করেছিস কত বড় ব্যাপার?
পূর্ত মন্ত্রণালয়ের র্ক্লাকদের কি ঘুস খেতেই হয়?
অবশ্যই খেতে হয়। দৈনিক খাদ্য গ্রহণের মতো খেতে হয়। তুই ওই লোকের কাছে যাবি। তার পা ছুঁয়ে সালাম করবি। পুণ্যবানদের স্পর্শ করলে মন পবিত্র হয়।
মুনশি বদরুদ্দিন?
মুনশি বদরুদ্দিন তালুকদার। সিনিয়র অ্যাসিস্ট্যান্ট। বেঁটেখাটো লোক। খুব পান খায়।
আমি তাহলে উঠি বড় খালু?
আরেকটু বোস। তোর সঙ্গে কথা বলতে ভালো লাগছে।
মুনশি বদরুদ্দিন সাহেবের কাছে একটু যাব বলে ভেবেছি…।
যাব বললেই তো যেতে পারবি না। সেক্রেটারিয়েটে ঢুকবি কী করে?
পাসের ব্যবস্থা করতে হবে। টেলিফোনে তোর পাসের ব্যবস্থা করে দি—চা খাবি আরেক কাপ?
না।
মাতালরা অন্যে কী বলছে তা শোনে না। তার কাছে শুধু নিজের কথাই সত্য। বড় খালু হুঙ্কার দিয়ে বললেন, ঐ, চা দিতে বললাম না। তিনি টেবিলের কাবার্ড খুলে—সাদা রঙের চ্যাপ্টা বোতল খুলে এক ঢোঁক তরল পদার্থ মুখে ঢেলে নিলেন। সঙ্গে সঙ্গে গিলে ফেললেন না। কুলকোচার মতো শব্দ করতে লাগলেন। ভালো জিনিস চট করে গিলে ফেলতে তাঁর মনে হয় মায়া লাগছে। মুখে যতক্ষণ রাখা যায় ততক্ষণই আরাম।
হিমু।
জি বড় খালু।
তুই কেমন আছিস?
খুব ভালো আছি। আপনার অবস্থা তো মনে হয় কাহিল।
আমিও ভালো আছি। সুখে আছি, আনন্দে আছি। তবে চারপাশের এখন যে অবস্থা, এই অবস্থায় আপনাআপনি আনন্দে থাকা যায় না। তরল পদার্থের কিছু সাহায্য লাগে। বুঝতে পারছিস রে গাধা? গিদ্ধর কি ছানা, বুঝলি কিছু?
বোঝার চেষ্টা করছি।
পারবি। তুই বুঝতে পারবি। তোর বুদ্ধিশুদ্ধি আছে। তুই যে পুণ্যবান আর পাপীদের লিস্টে করছিস—খুব ভালো করছিস। পত্রিকায় এই লিস্ট ছাপিয়ে দিতে হবে। একদিন ছাপা হবে পুণ্যবানদের তালিকা, আরেকদিন ছাপা হবে পাপীদের তালিকা।
উঠি বড় খালু?
এসেই উঠি উঠি করছিস কেন? সেক্রেটারিয়েটে ঢোকার পাসের ব্যবস্থা করে দি।
বড় খালু টেলিফোন টেনে নিলেন…তাঁর কপাল খুব ঘামছে। মুখ হাঁ হয়ে আছে। টেলিফোনের ডায়ালও ঠিকমতো ঘোরাতে পারছেন না। তিনি ডায়াল ঘোরাচ্ছেন আর মুখে বলছেন—হ্যালো। হ্যালো।
মুনশি বদরুদ্দিন তালুকদারকে পাওয়া গেল না। তিনি দুদিন ধরে আসছেন না। আমি তাঁর বাসার ঠিকানা চাইলাম। অফিসের একজন মধুর গলায় বললেন, ঠিকানা দিয়ে কী করবেন?
একটু কাজ ছিল।
কী কাজ বলুন। দেখি আমরা করতে পারি কি না।
উনার সঙ্গেই আমার কাজ ছিল।
উনার সঙ্গে কাজ থাকলে তো উনার কাছে যাবেন। বসুন না, দাঁড়িয়ে আছেন কেন?
আমি বসলাম। ভদ্রলোক নিচু গলায় বললেন, সিগারেটের বদঅভ্যাস আছে?
খাই মাঝেমধ্যে।
মাঝেমধ্য খাওয়াই ভালো। বিরাট খরচের ব্যাপার। স্বাস্থ্য নষ্ট। পরিবেশ নষ্ট। নেন সিগ্রেট নেন।
তিনি শার্টের পকেট থেকে সিগারেটের প্যাকেট বের করলেন। বেনসন এড হেজেস। সত্তর টাকা করে প্যাকেট। এই কেরানি ভদ্রলোক বেতন কত পান? হাজার তিনকে? তিনি খান বেনসন। ভদ্রলোজ নিজেই লাইটার দিয়ে সিগারেট ধরিয়ে দিলেন। সেই লাইটারও কায়দার লাইটার। যতক্ষণ জ্বলে ততক্ষণ বাজনা বাজে। ভদ্রলোক বললেন, কাজটা কি মিউটেশন? বড়ই জটিল কাজ। এই দপ্তরের সব কাজই জটিল। জমিজমা বিষয়-সম্পত্তির কাজ। মানুষের কোনো মূল্য নাই—জমির মূল্য আছে—বুঝলেন কিছু?
আমি বুঝদারের মতো মাথা নাড়লাম।
এক একটা নামজারির কাজ দেড় বছর-দুবছর ঝুলে থাকে।
নামজারি ব্যাপারটা কী?
নামজারি বুঝলেন না? মনে করুন, আপনি কিছু জমি কিনলেন। যার কাছ থেকে কিনলেন সরকারি রেকর্ডে আছে তার নাম। এখন তার নাম খারিজ করে আপনার নাম লিখতে হবে। এইটাই নামজারি।
একজনের নাম কেটে আরেকজনের নাম লিখতে দেড় বছর লাগে?
দেড় বছর তো কম বললাম। মাঝে মাঝে দুই-তিন বছরও লাগে। নাম খারিজ করা তো সহজ ব্যাপার না।
এটাকে সহজ করা যায়?
কীভাবে সহজ করবেন?
সবার নাম খারিজ করে দিন। এক্কেবারে লাল কালি দিয়ে খারিজ করে জমির মূল মালিকের নাম লিখে দিন।
ভদ্রলোক হতভম্ব গলায় বললেন, জমির মূল মালিক কে?
যিনি জমি সৃষ্টি করেছেন তিনিই মূল মালিক।
সবার নাম কেটে আল্লাহর নাম লিখতে বলছেন?
জি।
আপনার কি ব্রেইন ডিফেক্ট?
কিছুটা ডিফেক্ট। দেখুন ভাই সাহেব, পৃথিবীর জমি আমরা ভাগাভাগি করে নিয়ে নিয়েছি, নামজারি করছি! জোছনা কিন্তু ভাগাভাগি করে নেই নি। এমন কোনো সরকারি অফিস নেই যেখানে জোছনার নামজারি করা হয়, একজনের জোছনা আরেকজন কিনে নেয়।
ভদ্রলোক আমার কথায় তেমন অভিভূত হলেন না। পাগলদের মজার মজার কথায় কেউ অভিভূত হয় না, বিরক্ত হয়। তিনি একটা ফাইল খুলতে খুলতে বললেন, আপনি এখন যান। কাজ করতে দিন। অফিস কাজের জায়গা। আড্ডা দেয়ার জায়গা না।
একটা সিগারেট দিন। সিগারেট খেয়ে তারপর যাই।
তিনি এমনভাবে তাকালেন যেন অদ্ভুত কথা তিনি এই জীবনে শোনেন নি। আমি হাই তুলতে তুলতে বললাম, সিগারেট না খেয়ে আমি উঠব না। সিগারেট খাব। চা খাব। আর ভাই শুনুন, আমার হাতে কোনো পয়সাকড়ি নেই, আমি যে মুনশি বদরুদ্দিন তালুকদারের বাসায় যাব তার জন্যে আপ এন্ড ডাউন রিকশা ভাড়াও দেবেন।
ভদ্রলোক চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে আছেন। আমি গুনগুন করছি—বিধি ডাগর আঁখি যদি দিয়েছিল তবে আমার পানে কেন পড়িল না…
কই ভাই, দিন। সিগারেট দিন।
ভদ্রলোক সিগারেট প্যাকেট বের করলেন।
মুনশি সাহেবের বাসায় ঠিকানা সুন্দর করে একটা কাগজে লিখে দিন।
উনার ঠিকানা জানি না।
না জানলে যোগাড় করুন। আপনি না জানলেও কেউ না কেউ নিশ্চয়েই জানে। সেই সঙ্গে আপনার নিজের ঠিকানাটাও এক সাইডে লিখে দেবেন। সময় পেলে এক ফাঁকে চলে যাব। ভাই, আপনার নাম তো এখনো জানলাম না।
চুপ থাকেন।
ধমক দেবেন না ভাই। পাগল মানুষ। ধমক দিলে মাথা আউল হয়ে যাবে। কয়েকটা শিঙ্গাড়া আনতে বলুন তো। খিদে লেগেছে—
কেউ কিছু বলছে না। আমার দিকে তাকিয়ে আছে। আমি আনন্দিত গলায় বললাম, ভূমিকম্পের সময় আপনারা কে কোথায় ছিলেন?
কথা বলবেন না চা খান।
শিঙ্গাড়া আনতে বলুন। ঘুসের পয়সার শিঙ্গাড়া খেয়ে দেখি কেমন লাগে?
আমি চেয়ারে বসে পা দোলাচ্ছি। অফিসের সবাই মোটামুটি হতভম্ব দৃষ্টিতে আমাকে দেখছে।
মুনশি বদরুদ্দিনের যে ঠিকানা তারা লিখে দিল সেই ঠিকানায় এই নামে কেউ থাকে না। কোনোদিন ছিলও না। ওরা ইচ্ছা করে একটা বদমায়েশি করেছে। তবে ওরা এখনো বোঝে নি—আমিও কচ্ছপ প্রকৃতির। কচ্ছপের মতো যা একবার কামড়ে ধরি তা আর ছাড়ি না। পূর্ত মন্ত্রণালয়ে আমি একবার না, প্রয়োজনে লক্ষবার যাব। দরকার হলে পূর্ত মন্ত্রণালয়ের বারান্দায় মশারি খাটিয়ে রাতে ঘুমাব।
সারাদুপুর রোদে রোদে ঘুরলাম। ক্লান্ত পরিশ্রম হয়ে ঘুমোতে গেলাম সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে। ভরদুপুরে ঘুমানোর জন্যে বাংলাদেশ সরকার ভালো ব্যবস্থা করেছেন। ধন্যবাদ গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার। পার্কগুলো কোন মন্ত্রণালয়ের অধীনে জানা নেই। জানা থাকলে ওদের একটা থ্যাংকস দেয়া যেত। গাছের নিচে বেঞ্চ পাতা। পাখি ডাকছে। এখানে-ওখানে প্রেমিক-প্রেমিকারা গল্প করছে। এরা এখন কিছুটা বেপরোয়া। ভরদুপুর হলো বেপরোয়া সময়। কেউ তাদের দেখছে কি দেখছে না তা নিয়ে মাথাব্যাথা নেই। স্কুল ড্রেসপরা বাচ্চা বাচ্চা মেয়েদেরও দেখা যায়। এরা স্কুল ফাঁকি দিয়ে আসে। একটা আইন কি থাকা উচিত না—আঠার বছর বয়স না হলে ছেলেবন্ধুর সঙ্গে পার্কে আসতে পারবে না। আইন যাঁরা করেন তাঁদের ডেকে এনে এক দুপুরে পার্কটা দেখাতে পারলে হতো।
সেই লোক মেয়েটির গায়ের নানান জায়গায় হাত দিচ্ছে। মেয়েটি খিলখিল করে হাসছে । চাপা গলায় বলছে—এ রকম করেন কেন? সুড়সুড়ি লাগে তো।
লোকটা ঠোঁট সরু করে বলল, আদর করি। আদর করি।
বলতে বলতে মেয়েটাকে সে টেনে কোলে বসিয়ে ফেলল। আমি কঠিন গলায় লোকটাকে বললাম, তুই কে রে?
কোনো ভদ্রলোককে তুই বললে তার আক্কেল গুড়ুম হয়ে যায়। কী বলবে ভাবেত ভাবতে মিনিটখানিক লেগে যায়। আমি তাকে কিছু ভাবার সুযোগ দিলাম না। হুঙ্কার দিয়ে বললাম, এই মেয়ে কে? তুই একে চটকাচ্ছিস ক্যান রে শুয়োরের বাচ্চা? তুই চল আমার সঙ্গে থানায়। আমি ইন্টেলিজেন্স ব্রাঞ্চের লোক। তোদের মতো বদমায়েশ ধরার জন্যে ঘুমের ভান করে শুয়ে থাকি। মেয়েটাকে কোল থেকে নামা। নামিয়ে উঠে দাঁড়া। কানে ধর উঠ-বোস কর।
মেয়েটাকে কোল থেকে নামাতে হলো না। সে নিজেই নেমে পড়ল এবং কাঁদার উপক্রম করল। লোকটি কী যেন বলতে গিয়ে থেমে গেল। তারপর আমার কিছু বুঝবার আগেই ছুটে পালিয়ে গেল।
আমি হাই তুলতে তুলতে বললাম, এই লোক কে খুকি?
আমার মামা।
আপন মামা?
উঁহুঁ।
দূরের মামা?
হুঁ।
পলিন, ঐ লোকটার নাম কী?
পলিন ফ্যাকাসে হয়ে গিয়ে বলল, আপনি আমার নাম জানেন?
আমি তোমার নাড়ি-নক্ষত্র জান। ওই লোকটা যে বদ তা কি বুঝতে পারছ?
পলিন ঘাড় বাঁকিয়ে রাখল। সে লোকটাকে বদ বলতে রাজি নয়।
বুঝলে পলিন, লোকটা মহা বদ। বদ না হলে তোমাকে ফেলে পালিয়ে যেত না। বদরাই বিপদের সময় বন্ধুকে ফেলে পালিয়ে যায়।
উনি বদ না।
কোন ক্লাসে পড়?
ক্লাস এইট।
এরকম কারোর সঙ্গে যদি আর কোনোদিন দেখি তাহলে কী করব জান?
না।
না জানাই ভালো। যাও, এখন স্কুলে যাও—এখন থেকে তোমার উপর আমি লক্ষ রাখব। একদিন তোমাদের বাসায় চা খেতে যাব।
আপনি কি চেনেন আমার বাসা?
চিনি না কিন্তু তারপরেও যাব।
আপনি কি আমার মাকে সব বলে দেবেন?
তুমি নিষেধ করলে বলব না।
আপনি কি আমার মাকে চেনেন?
না।
পলিন স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল। তার মুখ থেকে কালো ছায়া সরে যাচ্ছে। সে খানিকক্ষণ ইতস্তত করে বলল, আমার মামাকে আপনি খারাপ ভাবছেন। উনি কিন্তু খারাপ না।
তাই নাকি?
উনি খুব অসাধারণ।
বলো কী? আমার তো অসাধারণ মানুষই দরকার। ঠিক অসাধারণ নয়—পবিত্র মানুষ। আমি পবিত্র মানুষদের একটা লিস্ট করছি। তুমি কি মনে করো ঐ লিস্টে তাঁর নাম রাখা যায়?
অবশ্যই যায়।
তাঁর কী নাম?
রেজা মামা। রেজাউল করিম।
আমি পকেট থেকে লিস্ট বের করে লিখলাম—রেজাউল করিম।এখন এই পলিন মেয়েটাকে চেনা চেনা লাগছে। কোথায় যেন তাকে দেখেছি। তার ভুরু কুঁচকানোর ভঙ্গি খুব পরিচিত। পলিন চরে যাবার পর বুঝলাম, এই মেয়ে আলেয়া খালার নাতনি। মেয়েটার মার নাম খুকি।
পলিন যেখানে বসেছিল সেখানে সে তার পেন্সিল বক্স ফেলে গেছে। বক্সটা ফিরিয়ে দিয়ে আসতে একদিন যেতে হবে ওদের বাসায়। পবিত্র মানুষ জনাব রেজাউল করিম সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করতে হবে।
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now