বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
।। অলৌকিক জল্লাদ - ৫ম পর্ব ।।
কাহিনীঃ মানবেন্দ্র পাল
।। গভীর রাতে পায়ের শব্দ ।।
নোটন আর আমার স্ত্রী 'কে নিয়ে আমার শালা চলে গেছে বেলা বারোটার সময়। যাবার আগে আমার স্ত্রী দু'বেলার মতো রেঁধে দিয়ে গেছে। কাজেই আজকের দিনটা চলে যাবে। কাল থেকে আমাকেই যা হোক কিছু রাঁধতে হবে।
ওরা চলে যাবার পর আমি সারা দুপুর ঘরে বসে রইলাম। আর লক্ষ্য রাখলাম সুব্বার দিকে। বাঁচোয়া সে এখনও একবারও আমার সামনে আসেনি। যদিও জানি সে বাড়িতেই আছে।
কেমন করে জানলাম ও বাড়িতে আছে? ঠিক বলতে পারব না। তবে ইদানীং টের পাই ও বাড়িতে থাকলে বাড়ির মধ্যে বাতাসটা কিরকম ভারী হয়ে থাকে। নিশ্বাস নিতে কষ্ট হয়। ও বাড়িতে থাকলে পরিষ্কার বুঝতে পারি এ বাড়ির প্রত্যেকটা ইঁট, কড়ি-বরগা এমনকি কুয়োর জল পর্যন্ত থিরথির করে কাঁপে। আজ এখনও কাঁপছে। তাই বুঝতে পারছি ও বাড়িতেই আছে। কিন্তু কোথায় আছে, কি করছে জানি না।
হঠাৎ আমার দম বন্ধ হয়ে এল। মাথাটা কিরকম ঝিমঝিম করতে লাগল। আমি সচকিত হলাম.....পায়ের শব্দ পাচ্ছি....সে শব্দ কখনওই তেরো বছরের ছেলের পায়ের শব্দ নয়....যেন একটা ভারী বোঝা টেনে নিয়ে যাবার শব্দ। বুঝলাম, রাজু সিঁড়ি দিয়ে ওপরে উঠে আসছে। বারান্দা দিয়ে যেতে যেতে ও একবার দাঁড়াল। আমার ঘরের দিকে তাকাল। আমার সঙ্গে চোখাচোখি হল। আমার বুকের মধ্যে রক্ত চলকে উঠল।
ও কি আমায় দেখে হাসল? ও কি হাসতে জানে? ওকে তো কখনো হাসতে দেখিনি। ওটা কি হাসি? দাঁতের মতো কতগুলো কি যেন ওর ঝুলে পড়া ঠোঁটের ওপর ঝিকঝিক করে উঠল। আমি ছুটে গিয়ে দরজা বন্ধ করে দিলাম।
তারপরেই শুনলাম ধুপধাপ শব্দ করে ও ছাদে চলে গেল। ছাদটা ওর বড় প্রিয় জায়গা।
বিকেলে জোর করে একটু বেরোলাম। কতক্ষণ আর ঘরে চুপটি করে বসে থাকা যায়।
কোথায় যাব? কিছুক্ষণ এদিকওদিক ঘুরে কি খেয়াল হলো বাড়ির পেছনের বাগানের দিকে যে সরু রাস্তাটা গেছে, সেই রাস্তায় হাঁটতে আরম্ভ করলাম।
কাজটা ভাল করিনি। কেননা তখন সন্ধের মুখ। অন্য কিছুর ভয় না পেলেও সাপের ভয় তো আছে। টর্চটাও আনিনি।
কিন্তু কেন এই অসময় এই পথে এলাম? বোধহয় মনের মধ্যে গতকালের বিকেলের ঘটনাটা কৌতূহলী করে তুলেছিল। ঐ যে সুব্বা ঐ পথে যাচ্ছিল আর পাখির ঝাঁক ভয়ে চিৎকার করে ওকে তাড়া করছিল! বোধহয় ভেবেছিলাম ঐ পথে কি আছে তা দেখতে হবে।
বেশ কিছুদূর এগিয়েছি, হঠাৎ দেখলাম একটা মূর্তি....হ্যাঁ, একটা ছেলের মূর্তি....আমার সামনে সামনে হেঁটে চলেছে। থমকে দাঁড়িয়ে পড়লাম। এই সন্ধেবেলা কে ওদিকে যাচ্ছে? একটু ঠাওর করতেই স্পষ্ট বুঝতে পারলাম মূর্তিটা আর কেউ নয়... রাজু। হ্যাঁ, কোনও সন্দেহ নেই। ও রাজু সুব্বাই। ঐ যে ওর নারকেলের মতো মাথা, রোঁয়া রোঁয়া চুল।
কিন্তু রাজু হঠাৎ এত লম্বা হয়ে গেল কি করে? তবে কি আমি ভুল দেখছি? চোখ রগড়ে স্পষ্ট করে তাকালাম। হ্যাঁ, রাজুই।
আমি ওকে ডাকতে যাচ্ছিলাম, কিন্তু না ডেকে ওর কাছে যাবার জন্য জোরে হাঁটতে লাগলাম। অবাক কান্ড....যতই জোরে এগোচ্ছি ততই ও দ্রুত সরে যাচ্ছে।
একটা কুকুর আসছিল সামনে দিয়ে। বললে কেউ বিশ্বাস করবে না, কুকুরটা রাজুকে দেখেই কেঁউ কেঁউ শব্দ করে ভয়ার্ত চিৎকার দিয়ে ছুটে পালিয়ে গেল।
কুকুরটা অকারণে ভয় পেল কেন? রাজু তো ওর দিকে ফিরেও তাকায়নি। তাড়াতাড়ি বাড়ি ফিরে এলাম।
সন্ধে সাতটা বাজতে না বাজতেই রাজুর ঘরে ওর খাবার ঢাকা দিয়ে রেখে নিজের ঘরে ঢুকে খিল বন্ধ করে দিলাম।
রাজু তখন বাড়ি ছিল না। ও আজকাল কখন কোথায় যায় কিছুই জানায় না। ও আমায় কেয়ারই করে না।
অনেক রাত পর্যন্ত ঘুম আসেনি। রাত ন'টা নাগাদ বাইরের দরজায় খিল দেবার শব্দ পেলাম। বুঝলাম শ্রীমান রাজু ফিরলেন। অমনি আমার বুকের মধ্যে কেমন করতে লাগল। এই রহস্যময় ছেলেটার সঙ্গে আমায় একা সারারাত কাটাতে হবে! আগে মনে হতো ও আমার কোনও ক্ষতিই করতে পারবে না। এখন মনে হচ্ছে ও সবই পারে। ওর ঐ হাড় বের করা শরীরে অমিত শক্তি। যদি চোখের ভুল না হয়ে থাকে তাহলে আজই সন্ধ্যেবেলায় আমবাগানের দিকে যেতে গিয়ে দেখেছি ওর অস্বাভাবিক লম্বা দেহটা। অস্বাভাবিক মানে.....ওর বয়সী ছেলে অত লম্বা হতে পারে না। আর ও মোটেও লম্বা নয়। অথচ ও যে রাজুই তাতে সন্দেহ মাত্র ছিল না আমার। এখন বুঝতে পারছি রাজু বলে যে ছেলেটাকে বিশ্বাস করে বাড়িতে এনেছিলাম সে অন্য ছেলেদের মতো নিতান্ত রক্তমাংসে গড়া বালকমাত্র নয়। ওর ভেতর লুকিয়ে আছে একটা পিশাচ। এখন আমার স্থির বিশ্বাস....প্রথম দিন সন্ধেবেলা আমি যখন লিখছিলাম তখন রাজুই নিঃশব্দে পেছন থেকে এসে আলো নিভিয়ে দিয়েছিল আমায় গলা টিপে মারবার জন্য। এমনিতে সে স্বাভাবিক। কিন্তু যখন হিংস্র হয়ে ওঠে তখন ওর চোখের দৃষ্টি বদলে যায়। চোখে আগুন জ্বলে ওঠে। সেদিন নোটন যে জ্বলন্ত চোখ দেখে ভয়ে চিৎকার করে উঠেছিল সম্ভবত সে চোখ রাজুরই।
এরপরই ছোট বৌমা রাজুকে দেখেছিল আমার ঘরের মধ্যে দু হাত বাড়িয়ে ঢুকতে। রাজু যে আমায় মারতেই ঢুকেছিল ছোট বৌমা সে সন্মন্ধে নিঃসন্দেহ।
কিন্তু কেন? কেন আমায় মারতে চায়? ও যদি সত্যিই কোনও অশুভ আত্মার দেহ হয় তাহলে ও কেন নিজে থেকেই এল আমার সঙ্গে সুদূর নেপাল থেকে এই গ্রামে? আমাকে মেরে ফেলার জন্য? আবার সেই একই প্রশ্ন থেকে যায়....কেন? কার কাছে আমি কি অপরাধ করেছি?
ভাবতে ভাবতে কখন ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। হঠাৎ ঘুমটা ভেঙে গেল। মনে হল কেউ যেন দরজা ঠেলছে। আমি কান খাড়া করে রইলাম। তারপর পরিষ্কার শুনলাম কেউ যেন ভারী ভারী পায়ের শব্দ করে আমার ঘরের সামনে চলাফেরা করছে। ভয়ে আমার গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠল। একটু পরে শুনলাম পায়ের শব্দটা নিচে নেমে যাচ্ছে।
তারও কিছুক্ষণ পর শুনলাম নিচের খিড়কির দরজাটা কেউ খুলল।
দরজা কে খুলতে পারে রাজু ছাড়া? এত রাত্রে ও কোথায় যাচ্ছে?
এবার আমি এক লাফে উঠে পড়লাম। সাহস সঞ্চয় করলাম। মনকে বোঝালাম - এটা বিজ্ঞানের যুগ। আর আমি একজন নামকরা পুলিশ অফিসার। আমি ভয় করব অলৌকিক ব্যাপারকে? রাজু আর যাই হোক তবু তো সে একজন রক্তমাংসে গড়া বালক মাত্র! সে খায়দায়, কাজ করে, আমার ছেলের সঙ্গে খেলা করে। তাহলে তাকে এত ভয় কিসের?
রিভলভারটা বালিশের তলা থেকে তুলে নিয়ে আমি দরজা খুলে বেরোলাম। লাইট জ্বাললাম না।
সিঁড়ির ঘরের সামনে এসে দেখি রাজুর ঘরের দরজা ঠেসানো। আস্তে আস্তে ঠেললাম। ক্যাঁচ করে একটা শব্দ হল। সেই সামান্য শব্দেই বুকটা কেঁপে উঠল। দরজা খুলে গেল। টর্চের আলো ফেললাম। কেউ নেই।
নিচে নেমে এসে দেখি খিড়কির দরজাটা হাট করে খোলা। কিছুক্ষণ চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইলাম। ভাবলাম কি করি? ঠিক করলাম রাস্তায় বেরিয়ে পড়ে দেখি। এই তো সোজা রাস্তা.....কোথায় কতদূর যেতে পারে ও?
বেরোচ্ছিলাম....তখনিই মনে হল ও যদি বাগানের রাস্তায় গিয়ে থাকে?
না, ও রাস্তায় আমি এত রাতে যাব না। ঐভাবে দরজাটা ঠেসিয়ে রেখেই ওপরে উঠে এলাম। ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করে শুয়ে পড়লাম।
ভেবেছিলাম যতক্ষণ না ও ফেরে ততক্ষণ জেগে থাকব। কিন্তু কখন একসময় ঘুমিয়ে পড়েছিলাম খেয়াল ছিল না।
সকালে উঠে দেখি রাজু অন্য দিনের মতোই ঘরদোর ঝাঁট দিচ্ছে। ও আমার দিকে ফিরেও তাকাল না। ভাবলাম ওকে জিজ্ঞেস করি কাল রাত্রে ও কোথায় গিয়েছিল? কিন্তু ওর সঙ্গে কথা বলতেও সাহস হল না। ক'টা দিন যত দূরে দূরে থাকা যায় ততই মঙ্গল।
কিন্তু নিচে নেমে আসতেই চমকে উঠলাম। উঠোনের ঠিক মাঝখানে ওটা কি?
অবাক কান্ড! কে একটা বলিদানের হাঁড়িকাঠ পুঁতে রেখেছে।
এর মানে কি? বাড়িতে হাঁড়িকাঠ কেন? কার এত বড় সাহস এটা এখানে পুঁতল?
তখনই হাঁকলাম, " রাজু!"
রাজু এসে দাঁড়াল। ভাবলেশহীন মুখ। ওর চোখের সাদা অংশটা ড্যাবড্যাব করে নড়ছে।
" তুই ওটা এখানে পুঁতেছিস? "
..... " নেহি", বলে সে তখনই চলে গেল।
ওর এত স্পর্ধা যে আমার সামনে আর দাঁড়াল না! অনুমতি না নিয়েই চলে গেল!
আমি তখনই হাঁড়িকাঠটা উপড়ে বাইরে ফেলে দিলাম।
-চলবে।।
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now