বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
---------------------
রাত অনেক হলো।
অভিজাত পাড়া গুলশান ঘুমিয়ে। তবে ঢাকাতো চব্বিশ
ঘন্টার শহর। এখানে চব্বিশ ঘন্টা সব কিছু পাওয়া যায়।
ঢাকার মেট্রোপলিটন পরিচয় রক্ষার জন্যই হয়তো
রাতের নিস্তব্ধতা চীরে রাস্তা দিয়ে হুস-হাস
শব্দে দ্রুত গতির গাড়ি ছুটে যাচ্ছে। শব্দনিরোধক
কামড়ায় বসেও দ্রুত গতির যানের শব্দ পাচ্ছেন
ডিআইজি মাসুদ ইব্রাহিম। চিন্তাকিষ্ট মুখে একটু পর পর
হুইস্কির গ্লাসে চুমুক দিচ্ছেন। সাধারণত তিন
পেগেই নেশা হয় মাসুদের।
কিন্তু আজ যে কী হলো!
এটা চতুর্থ পেগ চলছে।
হুইস্কির কোনো আছর টের পাচ্ছেন না।
মুখোমুখি বসা মন্ত্রীর হাতের জ্বলন্ত
সিগারটিতে দু-একটা টান পড়েছে পড়েনি। এর পর
বোধ হয় আঙ্গুলের ফাকে ধরা বস্তুটির কথা
ভুলেই গেছেন তিনি। পুড়ে পুড়ে লম্বা ছাই
জমেছে সিগারের মাথায়। কিছুটা বেঁকে গেছে।
এই বুঝি কার্পেটে ছাই পড়লো! একটু টেনশন
নিয়ে মন্ত্রীর হাতের দিকে তাকিয়ে থাকেন
ডিআইজি।
পদমর্যাদার বিচারে গভীর রাতে মন্ত্রীর সঙ্গে
বসে সুরা পান করার কথা নয় পুলিশের একজন
ডিআইজির। মাসুদ মন্ত্রীর সঙ্গে বসে আছেন
পুলিশ কর্মকর্তা হিসেবে নয়, বিশ্ববিদ্যালয়ের বন্ধু
হিসেবে। এর বাইরেও মন্ত্রীর সঙ্গে
আরেকটি বিষয়ে সম্পর্ক আছে ডিআইজির। সেটি
অবশ্য বৈষয়িক সম্পর্ক। এরা দুজনই অলিখিতভাবে
একটি গোপন ব্যবসার অংশীদার। অন্য সব সম্পর্ক
ছাপিয়ে এই সম্পর্কটিই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ
হয়ে উঠেছে।
একটা ছোট্ট ঝামেলা নিয়ে চিন্তিত দুজন। না, একটু
ভুল হলো বোধ হয়। প্রথমে ঝামেলাটি ছোট্ট
ছিল। সমাধানও ছিলো হাতের নাগালে। কিন্তু
আস্তে আস্তে কেমন করে যেন পুরো
ব্যপারটি তালগোল পাকিয়ে গেছে। যেটিকে
কোনো ঝামেলাই মনে হয়নি, সেটিই এখন
সবচেয়ে বেশি ভোগাচ্ছে। প্রায় চব্বিশ ঘন্টা
হয়ে গেল পুরো পুলিশ প্রশাসন সর্বোচ্চ শক্তি
নিয়োগ করে এবং পুলিশের বাইরে
আন্ডারগ্রাউন্ডের শীর্ষস্থানীয় সন্ত্রাসীদের
কাজে লাগিয়েও বাগে আনা যায়নি তন্ময়
চৌধুরীকে। এই দুই টাকার এক সাংবাদিক যে এতোটা
ভোগাবে কে জানতো! অথচ এই মুহুর্তে
তাদের অস্তিত্বের জন্য সবচেয়ে বড় হুমকি
হয়ে দাঁড়িয়েছে ওই ছোকরা। যথেষ্ট পরিমাণ
নিকোটিন এবং অ্যালকোহল এই দুই অংশীদারের
দুশ্চিন্তাকে সাময়িকভাবেও দূর করতে পারছে না।
নি:শব্দে মুখোমুখি কিছুক্ষণ বসে থাকে দুজন।
কামড়ায় তৃতীয় ব্যক্তি প্রবেশ করেন। ডিআইজির
অভ্যর্থনায় বোঝা যায় ইনিও এদের ব্যবসার
আরেকজন পার্টনার। অবশ্য ঘনিষ্ট কেউ না হলে
গুলশানের এই অভিজাত গেস্ট হাউজে মন্ত্রীর
গোপন বৈঠক সম্পর্কে জানার কথা না। সম্ভবত
মন্ত্রীর স্ত্রীও জানেন না তিনি এখন কোথায়
কী করছেন। কাজের ফাঁকে মাঝে মধ্যেই
এখানে এসে একান্তে কিছুটা সময় কাটিয়ে যান।
বেনামে করা নিজের এই গেস্ট হাউজটিতে
মন্ত্রীর মনোরঞ্জনের জন্য সকল ব্যবস্থাই
করা থাকে।
এই মাত্র যোগ দেওয়া তৃতীয় ব্যক্তিটি
সংক্ষেপে একটু আগে ঘটে যাওয়া নিউজ
এডিটরের বাড়ির ঘটনাটি জানায়। সদ্য পাওয়া তথ্য
গুলো মন্ত্রী এবং ডিআইজির কপালে আরো
কয়েকটা ভাঁজ যুক্ত করে। আজকের দিনটাই কী
দু:সংবাদের। আবু সাঈদকে সরিয়ে দেওয়া এবং সে
ঘটনায় হাফিজুর রহিমকে ফাসিয়ে দিয়ে
আত্মতৃপ্তীতে ছিলো সবাই। তন্ময়কে কব্জা
করাটাকে ভেবেছিলো দুই মিনিটের মামলা। রাতে
তাকে ঘরে না পেলেও কোনো চিন্তা হয়নি;
সকালে কোথায় পাওয়া যাবে এটাতো জানাই
ছিলো। কিন্তু হাসপাতাল থেকে যেন একেবারে
হাওয়ায় মিলিয়ে গেছে তন্ময়। এর পর সারা দিনেও
তার টিকির নাগাল পাওয়া যায়নি। সব শেষে রাত একটায়
তাকে দেখা গেছে তারেক আহমেদের
বাড়িতে।
মন্ত্রীর মোবাইল ফোনটি কেঁপে উঠে।
স্ক্রিনে শমসেরের নাম দেখে দ্রুত রিসিভ
করেন।
বলো শমসের।
পাখি উড়ে গেছে বস্।
মানে, তোমরা সেখানে কি.. .. ছিড়তে
গিয়েছো?
সকল শিষ্ঠাচার ভুলে খিস্তি করে উঠেন মন্ত্রী।
তার এই ভাষাজ্ঞানলুপ্ততা ঘটনার গুরুত্বেও বার্তা
বয়ে আনে ডিআইজির কাছে।
একটা কাজও যদি তোমরা ঠিক মতো করতে
পারতে। তোমাদের মতো দুজন স্কিল্ড
লোককে একটা আনাড়ি এভাবে একের পর এক
ঘোল খাওয়াচ্ছে, এটা আমাকে বিশ্বাস করতে
বলো?
ওই প্রান্ত থেকে একটা কিছু বলে শমসের।
বাহ্যজ্ঞান হারিয়ে মোবইল ফোনটা দেয়ালে
আছড়ে মারেন মন্ত্রী। দরজার বাইরে খান
মজলিশ তৈরিই ছিলো। দ্রুত ঘরে ঢুকে মন্ত্রীর
ভাঙ্গা মোবাইলটি কুড়িয়ে নিয়ে নিজের
মোবাইলে মন্ত্রীর সিম কার্ডটা ভরে দেয়।
বোঝা যায়, আগেও বেশ কয়েকবার তাকে এই
কাজ করতে হয়েছে। মন্ত্রীর চোখের
ইশারায় কামড়ার বাইরে চলে যান খান মজলিশ।
সুরাপাত্রে বড় একটি চুমুক দিয়ে মেজাজ বশে
আনার প্রয়াস চালান মন্ত্রী। কামড়ার নতুন সদস্যের
দিকে ফিরে বলেন,
ঘটনাটা কোথায় গড়ােচ্ছ বুঝতে পারছেন? আপনার
ওই রিপোর্টার যদি কোনোভাবে তথ্যগুলো
ফাঁস করে দেয় তাহলে শুধু আমি নই, আপনি এবং
এই ডিআইজিসহ কমপক্ষে দুজন সেক্রেটারি এবং
আরো ডজনখানেক পুলিশের বড় কর্মকর্তা
ফেসে যাবে। আপনার সঙ্গেতো সে আছে
প্রায় দশ বছর। আপনি কোনো ধারণ দিতে
পারেন, কোন গর্তে লুকাতে পারে বদমাশটা।
একটু কেশে গলা পরিষ্কার করে নেন সম্পাদক
আব্দুস সালাম। একটু বিব্রত বোধ করেন তিনি।
তন্ময়ের কাছে যে নাকানিচোবানি খেতে
হচ্ছে, তার জন্য যেন তিনি নিজেও দায়ী।
পত্রিকায় যখন একের পর এক ইয়াবা নিয়ে স্টোরি
ছাপা হতে শুরু করলো, তখন উপায় অন্তর না
দেখে সম্পাদককে চক্রে টেনে নেন
মন্ত্রী। এ জন্য সম্পাদকের প্রাবাসী শালার
অ্যাকাউন্টে আট অঙ্কের টাকা জমা রাখতে
হয়েছে। এর পরই হঠাৎ করে মাদক নিয়ে নিউজ
করার উৎসাহ কমে যায় প্রথম সারির এই জাতীয়
দৈনিকটির। নারী নির্যাতন, চিকিৎসা সেবা, নারী ও শিশু
পাচারের মতো চালু ইস্যুগুলোকে হাইলাইট
করতে থাকে সুকৌশলে। এর আড়ালে সারা দেশে
ভয়াবহ থাবা বিস্তার করে নীল নেশা। মন্ত্রী,
পুলিশ, আমলা আর মিডিয়ার আশীর্বাদে মাদক
ব্যবসায়ীরা হয়ে উঠে বেপরোয়া।
চক্রবৃদ্ধিহারে বাড়তে থাকে এর সঙ্গে জড়িত
রুই-কাতলাদের ব্যাংক ব্যালেন্স।
হাতের গ্লাসটিতে ছোট্ট একটা চুমুক দিয়ে
আব্দুস সালাম বলেন, সকাল থেকে তন্ময়ের
সঙ্গে ছিল ফটোগ্রাফার আমিনুল। সারা দিনেও তার
পাত্তা পাওয়া যায়নি। আমার মনে হয় এটাকে ধরলে
আসলটির খোঁজও পাওয়া যাবে। কান টানলেই মাথাটা
কব্জায় চলে আসবে।
আমিনুল সম্পর্কে যাবতীয় তথ্য তিনি সঙ্গে
করেই নিয়ে এসেছেন।
এই তথ্য এতোক্ষণে দিচ্ছেন? সারা দিন ঘোড়ার
ঘাস কেটেছেন? খেকিয়ে উঠেন মন্ত্রী।
দ্রুত মোবাইল ফোনটা তুলে নেন। বোতাম
টিপে ডায়াল করেন। আমিনুলের বাড়ির ঠিকানা জানিয়ে
দেন তার পোষা মবিন আর শমসেরকে আর
ফোন নম্বরটি পুলিশ বিভাগকে জানিয়ে দেন
ডিআইজি।
সুসংবাদ বয়ে আনা ফোন কলের অপেক্ষায়
নি:শব্দে পান করতে থাকে তিনজন। সামনে রাখা
কাজু বাদামের প্লেট টি অবহেলায় পড়ে থাকে।
**********************
রাত দেড়টা।
পত্রিকার নগর সংস্করণ এই মাত্র ছাড়া হয়েছে। বহুল
প্রচারিত দৈনিকগুলো প্রতিদিন দুটি সংস্করণ প্রকাশ
করে। প্রথমটি সারা দেশের জন্য, আর দ্বিতীয়টি
আরো নিউজ আপডেটসহ নগর সংস্করণ। ন্যাশনাল
এডিশন, অর্থাৎ প্রথম সংস্করণটিতে কোনো
ভুল-ভ্রান্তি থাকলে তা দ্বিতীয় সংস্করণ বা নগর
সংস্করণে শুধরে নেওয়া হয়। তাই নগর সংস্করণটির
ট্রেসিং ছাপাখানায় পাঠানোর আগ পর্যন্ত নাইট ডিউটির
দায়িত্বরতদের ছুটি নেই।
নগর সংস্করণটি ছেড়ে দিয়ে নাইট ডিউটির
রিপোর্টার আর ডেস্কের সাব এডিটরেরা ব্যাগ
গুছিয়ে বাড়ি যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে। কিছুই হয়নি এমন
একটা চেহারা করে নিউজ রুমে ঢোকে আমিনুল।
একটি কম্পিউটারের সামনে বসে ইন্টারনেটে
চ্যাট করতে থাকে। ফটোগ্রাফারেরাও পালা করে
রাতের ডিউটি করে। তাই এতো রাতে আমিনুলের
উপস্থিতি কারো কাছে অস্বাভাবিক মনে হয় না।
লোক দেখানো চ্যাটিংয়ে ব্যস্ত থাকলেও একটি
হাত দিয়ে শরীফের ডেস্কের ড্রয়ারটি খোলার
চেষ্টা চালাতে থাকে আমিনুল। প্রায় বিশ মিনিট
চেষ্টার পর সফল হয়। অফিসের ড্রয়ারের এই
তালাগুলো আসলে খুব পলকা। নিম্নমানের এ
তালাগুলোকে মনে মনে ধন্যবাদ জানায় আমিনুল।
ড্রয়ার খুলেই উত্তেজনায় কাঁপতে থাকে। তন্ময়
তাকে বলেছে, এ ড্রয়ারে কতোটা অমূল্য
বিস্ফোরক রাখা আছে। এ তথ্যগুলো সামনে
এলে সারা দেশে উলটপালট হয়ে যাবে।
দাবানলের মতো মুহুর্তেই ছড়িয়ে পড়বে তা
সাধারণ মানুষের মাঝে।
বাদামি কাগজের প্যাকেটটা বের করে দ্রুত
ক্যামেরার ব্যাগে ভরে ফেলে আমিনুল। গলাটা বার
বার শুকিয়ে আসে। চকিতে এদিক সেদিক তাকিয়ে
তরতর করে সিড়ি বেয়ে নেমে যায়।
নীচে রমিজের দোকানে বসে আয়েশ করে
এক কাপ চা'র সঙ্গে সিগারেট জ্বালায়। হাতে
কিছুক্ষণ সময় আছে। তনু ভাই এখনো
একরামুলের খোঁজ পান নাই। ওই শালাকে
পেটানোর পর শাহজাহানপুর থেকে তনুভাইকে
তুলে নিতে হবে। আজ রাতটা পুরান ঢাকায় একটা
ডেরায় কাটাতে হবে। কাধের ব্যাগটা নামিয়ে
রমিজের পাশের টুলে রেখে একটু আড়মোড়া
ভেঙ্গে নেয়। সারা দিন যে ধকলটা গেল! ওহ।
পুরো শরীর ব্যথা হয়ে গেছে।
মালটা হাতে এসেছে। তনু ভাইয়ের ধারণা এই
প্যাকেটের ভেতরের কাগজগুলোর জন্যই
সারাদিন এতো জলঘোলা হয়েছে। কী আছে
এর ভেতর? খুলে দেখারও সাহস হয়না আমিনুলের।
দোকানের কাউন্টারের ভেতর রাখা ব্যাগটার দিকে
তাকিয়ে থাকে কিছুক্ষণ । যাক, বিরাট একটা কাজ
হয়েছে। সুখবরটা তন্ময়কে জানানোর জন্য
মোবাইল ফোনের বোতাম টেপে আমিনুল।
চারজনের দলটিকে এগিয়ে আসতে দেখে
মুহুর্তে একটা কিছু সন্দেহ হয়। সেকেন্ডে
ভগ্নাংশে করণীয় সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নিয়ে নেয়
আমিনুল। গত কয়েক ঘন্টায় তার বয়স এবং বুদ্ধি যেন
দশগুণ বেড়ে গেছে।
এদিকে মোবাইল ফোনটি ততোক্ষণে
তন্ময়কে ফোন করা শুরু করেছে। প্রথম
রিংয়েই রিসিভ তন্ময়। মুহুর্ত নষ্ট না করে আমিনুল
বলে উঠে, বস্ আপনের সিমটা ভরেন।
চারজন ততোক্ষণে আমিনুলের খুব কাছে চলে
এসেছে। প্রথমেই তারা হাত থেকে মোবাইল
ফোনটি কেড়ে নেয়। দুপাশ থেকে দুজন
আমিনুলের দুহাত শক্ত করে ধরে ফেলে। ফ্যাল
ফ্যাল করে তাকিয়ে থাকা রমিজের দিকে ফিরে
আমিনুল বলে, তনুভাইকে ফোন করে বলে দিস,
আমার ফিরতে দেরি হবে। তন্ময়ের সংক্ষিপ্ত নামটি
এদের যেন জানা না থাকে, মনে মনে খোদার
কাছে প্রার্থনা করতে থাকে আমিনুল।
প্রতিদিনের চায়ের আড্ডা বসে রমিজের
দোকানে। সাইড বিজনেস হিসেবে মোবাইল
ফোনের ফ্যাক্সি লোড করে রমিজ। সে
সূত্রে এ অফিসের সবার মোবাইল নম্বর তার জানা।
চারজন লোক আমিনুলকে ধরে সাদা
মাইক্রোবাসে তুলে নেওয়ার দৃশ্যটির দিকে
হতবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে রমিজ। অফিসের
সামনে থেকে এভাবে একজন সাংবাদিককে তুলে
নেওয়া সোজা কথা না!
আমিনুলের শেষ কথাটি মনে পড়তেই ব্যস্ত হয়ে
উঠে রমিজ। তন্ময়ের নম্বরে ডায়াল করে।
আমিনুলকে ধরে নিয়ে যাওয়ার কথা জানায়।
আমিনুল কি তোমার দোকানে কোনো প্যাকেট
রেখে গেছে?
তন্ময়ের এই প্রশ্নের পর আমিনুলের রেখে
যাওয়া ব্যাগটার দিকে দৃষ্টি পড়ে রমিজের। হ,
তনুবাই, আমিনুলবাই ক্যামরার ব্যাগ রাইখা গেছে।
তাকে সিম ভরতে বলার রহস্য এবার পরিষ্কার হয়।
আমিনুলকে যারা ধরেছে তারা হয় ডিবির দুর্নীতিবাজ
চক্রটি অথবা মন্ত্রীর ভাড়াটে গুন্ডা। ধরা পড়ার
মুহুর্তে আমিনুল ফোন করে তন্ময়কে নিজের
সিমটা ভরতে বলেছিলো যাতেকরে রমিজ
সহজেই তার সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারে।
কারণ চায়ের দোকানে রেখে যাওয়া মূল্যবান
কাগজগুলোর তথ্য জানাতে রমিজকেই ব্যবহার
করতে হয়েছে আমিনুলকে। আর এ খবর
জানাতে তন্ময়ের মোবাইল ফোনেই কল
করবে রমিজ।
গাড়ির ভেতর ড্রাইভার ছাড়াও আরো দুজন ছিল।
ড্রাইভারও এদেরই লোক। সে হিসেবে
আমিনুলকে ধরতে মোট সাতজনের দল
এসেছে। নিজেকে কেউকেটা মনে হয়।
রাতের ফাঁকা রাস্তায় দ্রুত গতিতে গাড়ি চলছে।
কালো কাচের বাইরে কিছুই দেখা যাচ্ছে না।
তবে গাড়িটা মিরপুরের দিকে যাচ্ছে বলেই
আমিনুলের ধারণা। ফার্মগেট এসে বাঁ দিকে বাঁক
নিয়েছে, এরপর রোকায়ে সরণী ধরে
সোজা ছুটে চলছে। গন্তব্য মিরপুর, কোনো
সন্দেহ নেই। গন্তব্য জেনেই বা লাভ কী!
প্রথম চোটেই মোবাইল ফোনটি হাতছাড়া
হয়েছে। এখন কোথায়, কোন গর্তে নিয়ে
আটকে রাখবে কে জানে!
আশ্চর্য হয়ে আমিনুল আবিষ্কার করে, এই অনিশ্চিত
পরিস্থিতিতেও তার ততোটা ভয় করছে না। অবশ্য
এখন পর্যন্ত ভয়ের কোনো কারণ ঘটেনি।
কিন্তু রাত প্রায় দুটোর সময় অচেনা একদল
লোক যদি জোর করে ধরে মাইক্রোবাসে
করে অজানা গন্তব্যের উদ্দেশ্যে রওনা দেয়,
তাহলেতো সেটা চিন্তারই কথা। কই, সেরকম চিন্তা
ওতো হচ্ছে না! মনে হয় সারা দিনের ধকলে
নার্ভগুলো ভোতা হয়ে গেছে, ভয়, দুশ্চিন্তা বা
উদ্বেগের কোনো অনুভুতিই কাজ করছে না।
রমিজের দোকান থেকে তন্ময় ক্যামেরার ব্যাগটা
সংগ্রহ করে নেবে এতে কোনো সন্দেহ
নেই। রমিজের দোকানে যদি আরেকটা দল
তন্ময়ের জন্য ফাঁদ পেতে থাকে? সে
ক্ষেত্রে কী হবে? চিন্তায় পড়ে যায় আমিনুল।
অবশ্য আমিনুলকে যেভাবে ধরে আনা হয়েছে,
সে ঘটনার বিবরণ পেলে নিশ্চই সাবধান হয়ে যাবে
তন্ময়। অনুসন্ধানী সাংবাদিক তন্ময় চৌধুরীর উপস্থিত
বুদ্ধিও উপর আমিনুলের ব্যপক আস্থা। এর আগেও
বিভিন্ন অ্যাসাইনমেন্টে তন্ময় ক্ষুরধার বুদ্ধির ছাপ
রেখেছে। আর সেজন্যইতো এতো অল্প
বয়সে দেশের সবচেয়ে বেশি প্রচারিত
দৈনিকের সবচেয়ে নামকরা ইনভেস্টিগেটিভ
রিপোর্টার হিসেবে দেশজোড়া খ্যাতি
পেয়েছে।
সারা দিনে এই প্রথম ঠান্ডা মাথায় চিন্তা করার ফুরসত
মিলেছে। বসে বসে ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলো
নিয়ে ভাবতে শুরু করে আমিনুল। নিউজ এডিটর মাদক
ব্যবসায়ী চক্রের সঙ্গে জড়িত এ কথা কিছুতেই
বিশ্বাস করেনি আমিনুল। তারেক ভাইয়ের সঙ্গে
প্রায় ১৫ বছর ধরে কাজ করছে। কই কখনো
তো মনে হয়নি তিনি কোনো ধরণের
দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত। তন্ময় চোখে আঙ্গুল
দিয়ে একের পর এক যুক্তি সাজিয়ে পুরো
ব্যপারটা ব্যাখ্যা দেওয়ার পরও বিশ্বাস করেনি। পরে
তারেক ভাইয়ের বাড়িতে মবিন আর শমসেরের
উপস্থিতি তারেক আহমেদেও প্রতি আমিনুলের
বিশ্বাসের ভিতটা পুরোপুরি ধ্বসিয়ে দিয়েছে। এ
চক্রের সঙ্গে আর কারা জড়িত, সেটা ভারতে
থাকে আমিনুল। তবে ভাবনা-চিন্তার ব্যাপারটা তার খুব
একটা আসে না। বরাবরই সেটা তন্ময়ের উপর
ছেড়ে দেয়। মাইক্রোবাসের সিটে বসে
ঘুমে ঢলে পড়ে আমিনুল।
( আগামী পর্বে সমাপ্ত )
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now