বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
---------------------
প্রতিদিনের রুটিনের ব্যতিক্রম ঘটিয়ে দুপুর পর্যন্ত
দোতলার খাস কামড়াতে বসে থাকেন মন্ত্রী।
এর মধ্যে মোবাইল ফোনে কয়েক জায়গায়
ফোন করেন। বেশ অস্থির হয়ে পড়েছেন।
একটু পর পর চেয়ার ছেড়ে মেঝেতে পাইচারি
করছেন। কামড়ার বাইরে কাচুমাচু হয়ে দাঁড়িয়ে
আছে খান মজলিশ। চলে যাবে, নাকি এখানেই
দাঁড়িয়ে থাকবে সিদ্ধান্ত নিতে পারছে না সে। এই
সিদ্ধান্তহীনতা তার টেনশনকে আরো বাড়িয়ে
দিচ্ছে।
বাশার..অ্যাই বাশার।
জ্বী স্যার। মন্ত্রীর বাজখাই গলার ডাক শুনে
আবুল বাশার খান মজলিশ দ্রুত কামড়ার ভেতরে যান।
নীচে যাও। আমার কাছে দুজন লোক আসবে।
দরজা থেকে সরাসরি তাদের আমার কামড়ায় নিয়ে
আসবে। ক্লিয়ার?
ওকে স্যার।
মন্ত্রীর সামনে থেকে পালাবার সুযোগ
পেয়ে দ্রুত সিড়ি ভেঙ্গে নেমে যায় খান
মজলিশ। কিছুক্ষণের মধ্যেই একটা সাদা প্রাইভেট
কার এসে মন্ত্রীর বাড়ির সামনে থামে। গাড়ি
থেকে নেমে আসা দুজন অপরিচিত নয়। বিশেষ
বিশেষ সময়ে বিশেষ প্রয়োজনে এদের
কাজে লাগান মন্ত্রী, খান মজলিশ সেটা জানে।
এখন তাদের কী কাজ? এখনতো বিরোধী
দলের আন্দোলন চলছে না, আবার সামনে
কোনো ইলেকশনও নেই। কিংবা কোথাও বড়
ধরণের কোনো গ্যাঞ্জাম লেগেছে
বলেওতো জানা নেই। তাহলে? শামসু আর
মবিনকে কেন ডেকে পাঠিয়েছেন মন্ত্রী
মহোদয়?
শামসু আর মবিন কামড়ায় ঢুকতেই দরজাটা বন্ধ করে
দেন মন্ত্রী।
বসো।
দুটো সিঙ্গেল সোফায় গা এলিয়ে বসে দুজন।
সেদিনের একটা ছোকরা, তাকেও বাগে আনতে
পারলেনা তোমরা? এতো টাকা দিয়ে
তোমাদেরকে তাহলে পুষছি কেন?
স্যার, কাজটাতো হঠাৎ নাজিল হলো। আগে
থেকে কোনো হোমওয়ার্ক করতে পারি নাই।
আর তাছাড়া ওই সাংবাদিককে আমরা চিনিও না। শুধু ছবি
সম্বল করে একজন লোককে হাসপাতালের
মতো একটা বড় জায়গায় খুঁজে পাওয়া সহজ কথা না।
একটু উদ্ধতস্বরেই কথাগুলো বলে দুজনের
মধ্যে অপেক্ষাকৃত খাটো শমসের। মন্ত্রীর
সঙ্গে সাধারণ এ গলায় কেউ কখনো কথা বলে
না। তবে শমসেরের জন্য হিসাব আলাদা।
ঠিক আছে, আজ রাতের মধ্যেই তার পাত্তা বের
করো। আর হ্যা, ধরার পর পুলিশে দেওয়ার আগে
ওর কাছে কী কী ডকুমেন্টস আছে তার খবর
বের করবে। ওই কাগজগুালোও আমার চাই।
ক্লিয়ার?
কোনো কথা না বলে সোফা ছেড়ে উঠে
দাঁড়ায় দুজন। সাধারণত পার্টির সঙ্গে আলাপ যা করার
শমসেরই করে। মবিন কথা বলে কম। কারণ কথার
চেয়ে কাজেই বেশি বিশ্বাসী সে। ঘর ছেড়ে
যাওয়ার আগে মন্ত্রীর কাছ থেকে টাকার
বান্ডেলটা পকেটে গুজে নেয় শমসের।
সামনে অনেক কাজ। মাথার ভেতর ঝড়ের
বেগে চিন্তা চলছে, কিন্তু দুজনের চোখে
এর কোনো ছাপ নেই। ট্রাফিক আইন মেনে
নিখুঁতভাবে গাড়ি চালিয়ে ঢাকা শহরের ব্যস্ত ট্রাফিকে
মিশে যায় সাদা গাড়িটি।
প্রচন্ড আত্মবিশ্বাসী এই দুজন পেশাদার একটু
নজর করলে বুঝতে পারতো নিরাপদ দূরত্ব বজায়
রেখে একটি কালো রঙ্গের বাজাজ পালসার
তাদের গাড়িটি ফলো করছে।
উত্তেজনায় দু হাতের তালু ঘামতে থাকে
আমিনুলের। হেয়ার রোডে গাড়িটিকে ঢুকতে
দেখেই খটকা লাগে। পরে দুই মুর্তিকে
মন্ত্রীর বাড়িতে ঢুকতে দেখে রীতিমতো
বোকা হয়ে যায় সে। ঘটনার শিকড় যে এতোটা
গভীরে তা কল্পনাও করতে পারেনি আমিনুল।
ষড়যন্ত্রের শিকড় যে কতোটা গভীরে সেটা
টের পেয়ে বুকের ভেতরটা কাঁপতে থাকে।
হাসপাতালের অ্যাম্বুলেন্সে চড়ে রোগী
সেজে পালানোর আগে এ দুজনের উপর নজর
রাখার নির্দেশ দিয়েছিল তন্ময় ভাই। তখন থেকেই
চিনা জোঁকের মতো এদের পেছনে লেগে
আছে আমিনুল। কাজের কী শেষ আছে! এর
পর আবার অফিসে যেতে হবে, তন্ময় ভাইয়ের
বাসায়ও যেতে হবে এক চক্কর।
*********************
স্কুল জীবনের বন্ধু ওহিদুলের মেসে ছোট্ট
চৌকিতে শুয়ে ঘটনা গুলো সাজানোর চেষ্টা
করছে তন্ময়। কিন্তু পুরো চিত্রটা কিছুতেই
মেলাতে পারছে না। গতকাল রাতেও এখানেই ছিল
তন্ময়। আর সে জন্যই গ্রেপ্তরের হাত
থেকে বেঁচে গেছে।
বিভিন্ন স্থানে ফোন করেও যেটুকু খবর
জোগার করা গেছে, তা হচ্ছে মাদক ব্যবসায়ী
চক্রের সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে
তন্ময়ের নামে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি
হয়েছে। মৃত্যু শয্যায় ইয়াবা সম্রাট আবু সাঈদের
দেওয়া তথ্যের উপর ভিত্তি করে তার অ্যারেস্ট
ওয়ারেন্ট ইস্যু হয়েছে। আর আবু সাঈদকে
হত্যার অভিযোগে গ্রেপ্তার করা হয়েছে ডিবির
কর্মকর্তা হাফিজুর রহিমকে। দশ বছরের সাংবাদিকতার
অভিজ্ঞতায় হাফিজুর রহিমের মতো সৎ ও নিষ্ঠাবান
পুলিশ কর্মকর্তা একটিও চোখে পড়েনি। সাঈদ
হত্যার দায়ে তাকে ফাঁসানো হয়েছে। অন্যদিকে
সাঈদ নাকি ইয়াবা চক্রের সঙ্গে জড়িত হিসেবে
পুলিশের কাছে তন্ময়ের নাম বলেছে। কী
হাস্যকর কথা। আর সেই বক্তব্যের জের ধরে
পুরো ঢাকা শহরের পুলিশ হন্যে হয়ে ঘুরছে
তন্ময়কে গ্রেপ্তারের জন্য।
এর পেছনে বড় কারো হাত আছে। এ ব্যপারে
এখন আর কোনো সন্দেহ নেই। নইলে কী
আর পুলিশ বিভাগ সহজে একজন পুলিশ কর্মকর্তার
বিরুদ্ধে অ্যাকশন নেয়। বোঝাই যাচ্ছে বিষয়টি
খুবই সিরিয়াস। রোগী সেজে হাসপাতালের
অ্যাম্বলেন্সে চড়ে পুলিশের চোখ এড়ানো
গেছে ঠিকই। কিন্তু কতোক্ষণ পুলিশের নজর
থেকে নিজেকে রক্ষা করতে পারবে সে
বিষয়ে যথেষ্ট সন্দেহ আছে। সাদেক
সরকারের সাহায্য না পেলে এতোক্ষণে তন্ময়
পুলিশের লকআপে থাকতো- এ কথা নিশ্চিত
হয়েই বলা যায়। বাংলাদেশের পুলিশ যতোই নিষ্কর্মা
হোক, পুলিশ প্রশাসন আন্তরিকভাবে চাইলে যে
কোনো অসাধ্য সাধন করতে পারে । অভিজ্ঞতা
থেকেই এ সত্যটা জানে তন্ময়। সেখানে তার
মতো একজন চুনোপুি কে গ্রেপ্তার করাতো
পুলিশের বাঁ হাতের খেল।
সাদেকের পারমর্শ মেনে সকাল থেকে এ
পর্যন্ত একবারও নিজের মোবাইল ফোনটা ব্যবহার
করেনি তন্ময়। আমিনুলের দেওয়া অন্য একটি সিম
ব্যবহার করে প্রয়োজনীয় কলগুলো করছে।
আচ্ছা, পুলিশ কীভাবে জানলো যে ওই মুহুর্তে
তন্ময় ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে থাকবে।
তার অফিসের অ্যাসাইনমেন্ট খাতায় অবশ্য এটা লেখা
আছে। তাহলে কী অফিস থেকে এই তথ্য
পেয়েছে পুলিশ? একটি প্রথম সারির দৈনিকের
নিউজ রুমে গিয়ে পুলিশের লোকজন
অ্যাসাইনমেন্ট খাতা ঘাটছে-দৃশ্যটা এতোটাই
বেমানান যে এই সম্ভাবনাটা তক্ষুনি বাদ দিয়ে দেয়
তন্ময়। তাহলে, পুলিশকে এ তথ্য কে দিল?
হাসপাতালে খুনে চেহারার (সাদেক সরকারের
ভাষায়) দুজন লোক কেন ছবি হাতে নিয়ে তাকে
খুঁজে বেড়াচ্ছিলো। মন্ত্রীর সঙ্গে তাদের
কী সম্পর্ক? এই মন্ত্রীর বিরুদ্ধে কখনো
কোনো রিপোর্ট করেছে বলেওতো
মনে পড়ছে না। তাহলে কেনো মন্ত্রীর
পাঠানো লোক তাকে খুঁজছে?
সবচেয়ে গুরুতর প্রশ্নটি হচ্ছে, আবু সাঈদ মৃত্যুর
আগে ইয়াবা ব্যবসার সঙ্গে জড়িত হিসেবে তার
নাম বলে গেল কেন? আদৌ কী আবু সাঈদ এ
কথা বলেছে? আর যদি সে এ কথা না-ই বলে
থাকে তাহলে পুলিশ কেন তান নামে এ অপবাদ
ছড়াচ্ছে? এতে পুলিশেরইবা কী লাভ?
মাথার ভেতর প্রশ্নগুলো জট পাকিয়ে যায়।
তন্ময়ের অস্বিত্ব রক্ষার জন্য এসব প্রশ্নের
উত্তর পাওয়া একান্ত প্রয়োজন। সকাল থেকে
একবারের জন্যও অফিসের কারো সঙ্গে
যোগাযোগ করেনি তন্ময়। কেন যেন তার
মনে হচ্ছে, অফিসে ফোন করলে সেই সূত্র
ধরে পুলিশ তার অবস্থান জেনে যাবে। অতিরিক্ত
সাবধানতা হিসেবে তাই অফিসের সঙ্গে কোনো
ধরণের যোগাযোগ বন্ধ রেখেছে তন্ময়।
আমিনুলের কাছ থেকে পাওয়া খবরে আরো
বেশি অস্থির হয়ে পড়ে তন্ময়। আসলে বিষ্মিত
হতে হতে একেবারে সহ্যের শেষ সীমায়
পৌছে গেছে তন্ময়। হাসপাতালে তার সন্ধানে আসা
দুই ব্যক্তি যে মন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করেছে
এ তথ্যও তাকে জানিয়েছে আমিনুল।
কতদিন পুলিশের কাছ থেকে গা ঢাকা দিয়ে থাকতে
হবে তার কোনো ঠিক ঠিকানা নেই। সে জন্য
টাকা দরকার। আমিনুলকে তাই বাসায় পাঠিয়েছিল তন্ময়
চেক বইটা নিয়ে আসার জন্য। আমিনুল ঘরে
ঢুকতেই পারেনি। পুলিশের একজন কন্সটেবল
দরজার সামনে বসা। এ দৃশ্য দেখে মানে মানে
সেখান থেকে কেটে পড়েছে আমিনুল। শুধু
জানালা দিয়ে এক ঝলক উঁকি দিয়ে দেখেছে;
তন্ময়কে না পেয়ে পুরো ঘরটি তছনছ
করেছে পুলিশ। তার সব বই, জরুরি কাগজপত্র,
জামাকাপড়, বিছানার চাদর, বালিশ এমনকী সাধের
ল্যাপটপটাও মাটিকে গড়াগড়ি খাচ্ছে। বিছানার তোষক
গুলোও উল্টেপাল্টে রেখেছে।
এদিকে আমিনুলকে সামনে পেয়ে বেশ দু কথা
শুনিয়ে দিয়েছে কেয়ারটেকার শামসু মিয়া। এ
জীবনে নাকি কখনো পুলিশি ঝামেলায় পড়েনি
সে। তন্ময়ের কারণে আজকে এ বাড়িতে পুলিশ
এসেছে। অন্য ভাড়াটেরা সবাই ভয় পাচ্ছে।
সামনের মাস থেকে তন্ময়কে আর এ বাড়িতে
ভাড়াটে হিসেবে রাখা হবে না বলেও শাসিয়ে
দিয়েছে সে। হাতি যখন ফাঁদে পড়ে চামচিকাও লাথি
মারে- মনে মনে ভাবে আমিনুল। আজকে
বিপদে পড়েছে বলে তন্ময় সম্পর্কে এ
কথাগুলো বলার সাহস পেলো এই চামচিকা।
ডাকসাইটে সাংবাদিক তন্ময় চৌধুরীকে সামনাসামনি এ
কথা বলার সাহস ওই শামসুর বাপেরও নাই।
অফিসের অবস্থাও ভয়াবহ। তাকে নিয়ে ইতিমধ্যেই
এডিটর নিউজ ম্যানেজমেন্ট টিমের সঙ্গে দু-দফা
মিটিং করেছে। সিনিয়রদের ওই মিটিংয়ে কি
আলোচনা হয়েছে তা অবশ্য বলতে পারেনি
আমিনুল। সবচেয়ে আশ্চর্যজনক খবর হচ্ছে,
অফিসে কেউ একজন তন্ময়ের ডেস্কের তালা
ভেঙ্গে কে যেন তন্ন তন্ন করে কিছু
খুঁজেছে। সব কাগজ উল্টা-পাল্টা হয়ে
মেঝেতে ছড়িয়ে আছে। নিউজ এডিটর তারেক
ভাইয়ের ধারণা কোনো এক ফাঁকে তন্ময় নিজেই
অফিসে এসে জরুরি কিছু কাগজ নিয়ে গেছে।
কী হাস্যকর কথা। নিজের ড্রয়ার থেকে কাগজ
নিতে হলে তন্ময়কে ড্রয়ার ভাংতে হবে কেন।
সে তো চাবি দিয়ে ড্রয়ার খুলেই
প্রয়োজনীয় কাগজ নিতে পারে। এখন প্রশ্ন
হচ্ছে, কে তন্ময়ের অফিসের ড্রয়ারের তালা
ভাংলো? তার ঘরের ভেতর কেন তল্লাশি চালানো
হয়েছে? দরজাতেই বা কেন পুলিশকে পাহারা
দিতে হচ্ছে? সে তো আর বাংলা ভাই কিংবা শীর্ষ
সন্ত্রাসী কালা জাহাঙ্গীরের মতো বড় কেউ
না। তাহলে? তাকে ঘিরে এসব ঘটনা কেন ঘটছে?
মাথার মধ্যে ঘুরতে থাকা প্রশ্নগুলোর জবাব
পাওয়ার জন্য ঠান্ডা মাথায় গত কয়েক মাসের
ঘটনাগুলো পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে বিশ্লেষণ করতে
থাকে তন্ময়।
মাস ছয়েক আগে সারা দেশে ইয়াবা নিয়ে
তোলপাড় শুরু হয়। বিত্তশালী তরুণ-তরুণীর
পছন্দের এই ভয়াবহ মাদকটি দ্রুতই ছড়িয়ে পড়ে
অভিজাত সমাজে। ইয়াবা নিয়ে প্রথম ব্রেকিং
স্টোরিটা করে তন্ময়। এর পরের কয়েক মাস
ইয়াবা ব্যবসা নিয়ে একের পর এক অনুসন্ধানী
প্রতিবেদন করতে থাকে সে।
ইয়াবা নিয়ে অনুসন্ধানের জন্য চট্টগ্রাম, কক্সবাজার,
টেকনাফের আনাচে কানাচে দিনের পর দিন চষে
বেড়ায় তন্ময়। ইয়াবা ব্যবসা নিয়ে চাঞ্চল্যকর সব
তথ্য জোগার করে সে। ইয়াবা চোরাচালানের
পুরো চক্রটির হদিস বের করে তন্ময়। কিন্তু
পালের গোদাদের পরিচয় অজানাই থেকে যায়।
ঢাকা এসে দ্বিতীয় দফা কাজ শুরুর আগেই অন্য
অ্যাসাইনমেন্টে ব্যস্ত হয়ে পড়ে, ফলে ইয়াবা
ইস্যুটি আপাতত চাপা পড়ে থাকে।
আর দশটি ঘটনার মতোই ইয়াবা নিয়ে মিডিয়ার হৈচৈও
এক সময় থেমে যায়। পত্রিকাগুলোর কাছে বিষয়টি
পুরোনো হয়ে যায় বলে তারা এ নিয়ে নিউজ
করার উৎসাহ হারিয়ে ফেলে। নতুন নতুন মশলাদার
খবরের পেছনে ছুটতে থাকে সাংবাদিকেরা। এ
অবস্থায় গ্রেপ্তার হয় আবু সাঈদ। আসলে সব
সময়ই কিছু লোক থাকে যারা প্রচলিত সিস্টেমের
বাইরে চলতে পছন্দ করে। হাফিজুর রহিমও এমনই
একজন। আর এ জন্য তার সঙ্গে দারুন সখ্যতা
গড়ে উঠে তন্ময়ের। অন্য রিপোর্টারেরা যখন
ইয়াবা ইস্যু থেকে সরে পড়েছে, তন্ময়
তখনো নিয়মিত এ দিকটিতে খেয়াল রাখতো। আবু
সাঈদেও গ্রেপ্তারের ঘটনাটি তাই অন্য মিডিয়াগুলো
মিস করলেও তন্ময় করেনি। যদিও এ নিয়ে লেখা
তার রিপোর্টটি পত্রিকায় চোখে না পড়ার মতো
করে ছাপা হয়েছিল।
বিদ্যুৎ চমকের মতো মনে পড়ে যায়, আবু সাঈদ
গ্রেপ্তারের সময় তার উত্তরার বাসা থেকে কিছু
কাগজ সরিয়ে নিয়েছিল তন্ময়। হাফিজুর রহিমের
অপার প্রশ্রয়ের জন্যই এ কান্ডটা করতে
পেরেছিল তন্ময়। তার উপর রহিমের ছিলো অগাধ
ভরসা। সে জন্যই পুলিশের এই গোপন অভিযানে
সঙ্গেী হতে পেরেছিল সে। এই চাঞ্চল্যকর
গ্রেপ্তার অভিযানে মিডিয়ার একমাত্র প্রতিনিধি
হিসেবে তন্ময়ই সেখানে উপস্থিত ছিলো। এটি
ছিল তার জন্য এক্সক্লুসিভ নিউজ। কিন্তু সাঈদের
গ্রেপ্তারের খবরটি ভেতরের পাতায় এক কলাম
ছাপা হওয়ার পর বুঝতে পারে, এ ব্যপারে পত্রিকার
আর কোনো উৎসাহ নেই। সে কারণে তন্ময়ও
ইয়াবা নিয়ে আর কোন স্পেশাল স্টোরি করেনি।
সে জন্য আবু সাঈদের বাড়ি থেকে নিয়ে আসা
ডকুমেন্টগুলো খুলে দেখা হয়নি। আচ্ছা, এ
তথ্যগুলোর খোঁজেই তার বাড়ির সামনে পুলিশের
পাহারা এবং অফিসে ড্রয়ার ভেঙ্গে তছনছ করা
হয়নিতো!
ব্রাউন কাগজের প্যাকেটে মোড়ানো
ডকুমন্টেসগুলো পাশের ডেস্কে শরীফের
ড্রয়ারে রেখেছে তন্ময়। নানা ধরণের
কাগজের চাপে তার ড্রয়ারে একটা আলপিন রাখারও
জায়গা নেই। সে জন্যই শরীফের ড্রয়ারে এ
কাগজগুলো রেখেছে তন্ময়। সময়-সুযোগ
মতো ইয়াবা নিয়ে আরো বিস্তারিত প্রতিবেদন
করার ইচ্ছে ছিল তার। পরে কাজে লাগবে
ভেবে মাদক ব্যবসার মূল্যবান তথ্যগুলো সাবধানে
গুছিয়ে রেখেছিল সে।
তন্ময়ের ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় বলছে, ওই কাগজগুলোর
মধ্যেই তার সকল প্রশ্নের উত্তর রয়েছে।
বাদামি প্যাকেটটা হাতে পাওয়ার জন্য অস্থিও হয়ে
উঠে তন্ময়। এখন একে একে নানা ঘটনা মনে
পড়ছে। আপাত দৃষ্টিতে ঘটনাগুলো বিচ্ছিন্ন মনে
হলেও এখন সবগুলোর মধ্যে যোগসূত্র খুঁজে
পায় তন্ময়। সন্ধ্যা হয়ে এসেছে। মেসের
কামড়ার বাতি জ্বালতে ইচ্ছে করছে না তন্ময়ের।
বুকের ভেতরটা জ্বালা করছে। নিজেকে সাংঘাতিক
প্রতারিত মনে হচ্ছে। স্বার্থ সিদ্ধির জন্য এতোটা
নীচে নামতে পারে মানুষ!
সাত
টকটকে লাল মেহেদির আলপনা আঁকা একটি হাত।
একটু রোগাটে, ফর্সা। হাতে দুগাছি সোনার চুড়ি।
সামান্য নাড়াচারাতেই টুংটাং সেতারের সুর বাজে। যেন
কোনো উস্তাদ বাজানোর আগে তার ঘসে
মহড়া দিয়ে নিচ্ছেন। হাতের চুড়ির শব্দ এতো
মধুর, কই আগেতো সেভাবে বুঝতে পারেনি।
শিল্পীর তুলিতে আঁকা আঙ্গুলগুলো ধওে আগে
ঝকঝকে কাচের গ্লাস, গায়ে বিন্দু বিন্দু পানি
জমে আছে। কাজ শেষে ফেরার পর এই এক
গ্লাস ঠান্ডা পানি সারা দিনের ক্লান্তি ভুলিয়ে দেয়।
আজন্ম তৃষ্ণার্তেও মতো এক চুমুকে শেষ
করে পুরো গ্লাস। আজ এতো দেরি হচ্ছে
কেন? বুক শুকিয়ে মরুভূমি, তৃষ্ণায় ছাতি ফেটে
যাচ্ছে, গলাটা শুকিয়ে শিরিষ কাগজের মতো
খসখসে হয়ে আছে। এক ফোটা পানির জন্য
হাহাকার করছে বুকের ভেতর। কেন এতো
দেরি হচ্ছে?
কালশিটে পড়া, ফুলে উঠা চোখদুটো অনেক
কষ্টে মেলে তাকায় হাফিজুর রহিম। ঝাপসা চোখে
এদিক-সেদিক তাকিয়ে বাস্তবে ফিওে আসে।
মুনমুন আর ফিরবে না, তৃষ্ণার্ত রহিমের বুক আজন্ম
শুষ্ক কওে দিয়ে চলে গেছে সে। কয়েক মু
র্তেও জন্য চেতনা ফিওে এসেছিল। বুকের
উপর মাথাটি আবার ঝুকে পড়ে। খালি গা, প্যান্ট
পরনে। সেটা থেকে বিকট গন্ধ বেরুচ্ছে।
নির্যাতনের এক পর্যায়ে প্যান্টের মধ্যেই
পেশাব কওে দিয়েছে রহিম। এ গন্ধ ঢাকার জন্য
সেখানে একবালতি পানি ঢালা হযেছে। শরীরটা
শুকনা হলেও কোমর থেকে শুরু কওে পা
দুটো চুপচুপে ভেজা।
এ অবস্থাতেই আচ্ছন্নের মতো পড়ে আছে
হাফিজুর রহিম। সকাল থেকে একটি দানাও পেটে
পড়েনি। সারা দিনে খাদ্য বলতে পাওয়া গেছে দু
বোতল দুর্গন্ধযুক্ত পানি। পেশাদার লোকগুলো
মারধোর শুরুও পর থেকেই চেষ্টা হাফিজুর রহিম
জ্ঞান হারিয়ে ফেলার চেষ্টা করছিলো। এক মাত্র
সংজ্ঞাহীনতাই পাওে তাকে এই নরক যন্ত্রণা
থেকে মুক্তি দিতে।
চার-পাঁচজন লোক মোটা গজারির লাঠি দিয়ে টানা
প্রায় ২০ মিনিট পিটিয়েছে হাফিজুর রহিমকে। এ সময়
নির্যাতনকারীরা মুখ দিয়ে একটি শব্দও করেনি।
কোনো প্রশ্নও নয়। শুধু পিটিয়ে গেছে।
হাফিজুর রহিম বুঝতে পারে, এভাবেই নরকের
কীটগুলো তার মনোবল ভেঙ্গে দিতে
চাইছে। আচ্ছন্ন অবস্থায় হাফিজুর রহিম মনে মনে
এ লোকগুলোর প্রতি কৃতজ্ঞ বোধ করে।
অসহ্য শারীরিক যন্ত্রণার সবচেয়ে ভালো দিকটি
হচ্ছে, সাময়িকভাবে এটি তার মানষিক অবসাদে
ভুলিয়ে দিচ্ছে। পিয়তম স্ত্রী বিয়োগের
তীব্র শোককেও দূওে ঠেলে রেখেছে
শরীরের প্রতিটি রোমকূপের অসহ্য যন্ত্রণা।
ভিতু এবং নির্বোধরা সৎ হলে বুঝি এভাবেই দাম
চুকাতে হয়। প্রচলিত সিস্টেমটা মেনে চলাই
তাদেও জন্য মঙ্গল। হাফিজুর রহিম কখনোই
ডাকাবুকো ছিলো না। বিশ্ববিদ্যালয়ে মুখচোরা
হিসেবেই ছিল তার পরিচিতি। জীবনে একটা মাত্র
সাহসের কাজ করেছে সে। সেটি হচ্ছে,
মুনমুনকে প্রেমের প্রস্তাব দেওয়া। এর বাইওে
সাহসী হিসেবে পরিচয় দেওয়ার মতো আর
কোনো উল্লেখযোগ্য ঘটনা হাফিজুর রহিমের
জীবনে ঘটেনি। কখনো কখনো মানুষ নিজের
চরিত্রের সম্পূর্ণ বিপরিত আচরণ কওে বসে না?
মাদক ব্যবসায়ী চক্রটিকে নিয়ে সেরকমই একটা
নির্বোধ অভিযানে মেতে উঠেছিল রহিম। এই
চক্রের শেকড় কতোটা গভীরে; নিজের বুদ্ধি
দিয়ে সে সম্পর্কে একটা ধারণা কওে নিয়েছিল
রহিম। বাস্তবের সঙ্গে যে তার ধারণার দূরত্ব
কতোটা সেটা বোঝার দাম চুকাতে হলো
মুনমুনের জীবনের বিনিময়ে।
ঘরটির দরজা-জানালা সব বন্ধ। দিন নাকি রাত কিছুই
বোঝা যাচ্ছে না। সময়ের কোনো হিসেব
নেই। কতোক্ষণ পরে জানা নেই, তিনজন
লোক এসে সামনে দাঁড়ায়। মাথা তুলে তাদেও
দেখার চেষ্টা কওে রহিম। আবছা অন্ধকাওে
চেহারা বোঝা যায় না। জ্বলন্ত সিগারেটটি একজন
রহিমের ঘাড়ে ঘসে ঘসে নেভায়। তার
ভাবলেশহীন অভিব্যক্তি দেখে মনে হবে
যেন অ্যাশট্রেতে চেপে সিগারেটের
গোড়ানি নিভিয়েছে। সারা শরীর অসহ্য যন্ত্রণায়
কুঁকড়ে উঠে। গলা চীওে তীব্র চিৎকার বের
হয়ে আসতে চায়; কিন্তু গোঙ্গানীর মতো
একটু শব্দ বের হয় রহিমের গলা দিয়ে। মুখ দিয়ে
লালা গড়াতে থাকে। কয়েকটা নীল ডুমে মাছি তার
মুখের সামনে উড়তে থাকে। অতি সাহসি দু-একটা
ফেটে যাওয়া ঠোটে এসে বসে। গাটা শিরশির
কওে উঠে। দু হাত বাঁধা থাকায় মাছিগুলোকে বাধা
দেওয়ার উপায় নেই।
শান্ত ভঙ্গীতে সামনে রাখা চেয়ারগুলোর দখল
নেয় তিনজন। তাদের মধ্যে একজন একটু
কেশে গলাটা পরিষ্কার করে বলতে শুরু করে,
আবু সাঈদেও বাড়ি থেকে আনা কাগজগুলোর
কোনো কপি কী তোমার কাছে আছে?
অপ্রত্যাশিত এই প্রশ্নে অবাক হয় রহিম। প্রথমে
সে বুঝতেই করতে পাওে না, কিসের কথা
বলছে তারা। একটু পর মনে পড়ে যায়, মাদক
ব্যবসায়ী আবু সাঈদকে গ্রেপ্তারের সময় কিছু
কাগজ জব্দ করেছিল পুলিশ। সেগুলোতে সব
অফিসের ফাইলেই আছে। প্রশ্নকারীদের জানায়
রহিম। কথাগুলো বলতে অবর্ননীয় কষ্ট হয়।
জোওে জোওে হাঁফাতে থাকে। মাথার
ভেতরটা দপদপ কওে উঠে।
পুলিশের তালিকায় যেগুলো দেখানো হয়েছে
সেগুলোতো বাজার ফর্দেও মতো নির্দোষ
কাগজপত্র। আসল মালগুলো কোথায়? যে
গুরুত্বপূর্ণ ডক্যুমেন্টস তোমরা এনেছে
সাঈদের বাড়ি থেকে সেগুলোর কোনো
হদিস ফাইলে নেই। জব্দ তালিকাতেও উল্লেখ
নেই সেই কাগজগুলোর। জনাব হাফিজুর রহিম, ওই
কাগজগুলো আপনার হেফাজতেই আছে বলে
আমাদেও বিশ্বাস। এখন দয়া করিয়া আপনি কী
আমাদেও বলিবেন, কোথায় ওই গুরুত্বপূর্ণ
দস্তাবেজ রক্ষিত রহিয়াছে?
যেন বিরাট একটা রসিকতা করা হয়েছে; এমন
দৃষ্টিতে রহিমের চোখে চোখ রাখে
প্রশ্নকর্তা। শূণ্য দৃষ্টিতে দিকে তাকিয়ে থাকে
রহিম। কী জিজ্ঞাস করা হচ্ছে, এর কিছুই মাথায়
ঢোকে না। ধৈর্য্য ধরে উত্তরের জন্য কিছুক্ষণ
অপেক্ষা করে প্রশ্নকর্তা। একটি সিগারেট ধরিয়ে
নি:শব্দে টানতে থাকে। বদ্ধ ঘরে পাক খেয়ে
ঘুরতে থাকে সিগারেটের নীল ধোঁয়া। হাফিজুর
রহিমের গা গুলিয়ে উঠে। হড়হড় কওে বমি কওে
দেয়। খালি পেট থেকে পানি ছাড়া আর কিছুই বের
হয় না। প্যান্ট নষ্ট হওয়ার ভয়ে তিনজনই একটু
দূওে সওে বসেন।
মাথায় এক বালতি পানি ঢেলে হুস ফিরিয়ে আনা হয়
হাফিজুর রহিমের। আবারও একই প্রশ্ন করা হয়। বার
বার, বার বার। এক পর্যায়ে আবছা মনে পড়ে,
সাঈদের আস্তানা থেকে তন্ময় কিছু কাগজ সরিয়ে
নিয়েছিলো। এই বর্বরগুলো সম্ভবত
সেগুলোই খুঁজছে। এ কথাই জানায় সে
তিনজনের দলটিকে। এবার সাফল্যেও হাসি হাসে
দলের সবচেয়ে মোটা লোকটি, সম্ভবত সেই
দলনেতা। হাফিজুর রহিমের বাড়ি এবং অফিসের আলমারি
তন্ন তন্ন কওে খুঁজেও কাঙ্খিত কাগজগুলোর
কোনো হদিস মেলেনি। সাংবাদিক তন্ময় চৌধুরির
কাছে আছে এগুলো; এ তথ্য তাদেও কাছেও
ছিল। তথ্যটি সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়ার জন্য এবং
যতোটুকু জানা গেছে, এর বাইরে হাফিজুর
রহিমের কাছে আর কোনো তথ্য প্রমাণ আছে
কী না সেবিষয়ে নিশ্চিত হওয়ার জন্যই দিনভর
তাকে এ নির্যাতন করা হয়েছে।
চোখের ইঙ্গিতে বাকি দুজনকে কিছু একটা ইশারা
করে বাইওে চলে যায় দলের নেতা। গুন গুন
করে একটা বাজার চলতি হন্দী গানের কলি ভাজতে
ভাজতে কমড়া ছেড়ে তার চলে যাওয়া দেখে
বোঝার কোনো উপায় নেই; এই মাত্র হাফিজুর
রশিদেও মৃত্যু পরোয়ানার সই কওে এসছে ।
রহিমকে কাগজে-কলমে গ্রেপ্তার দেখানো
হয়নি। ‘দুর্ঘটনায়’ স্ত্রীর মৃত্যুতে শোকাভিভূত
পুলিশ কর্মকর্তার সুইসাইডাল নোটটি কাল সকালে
বেডরুমে তার মৃতদেহের সঙ্গেই পাওয়া যাবে।
মুনমুনকে যে রহিম পাগলের মতো
ভালোবাসতো এ কথা কে না যানে! এক যুগের
প্রেম বলে কথা। ইউনিভার্সিটিতে তাদের
প্রেমকাহিনীতো মুখে মুখে ফিরতো। এরকম
একজন প্রেমিক তো প্রেমিকার মৃত্যুতে
আত্মহত্যা করতেই পারে; এ নিয়ে কোনো
সন্দেহের অবকাশ আছে?
আট
বাড়ি ফিরে প্রথম কাজ হচ্ছে হট শাওয়ার নেওয়া।
এরপর ভাত খেয়ে সঙ্গে আনা পত্রিকার ন্যাশনাল
এডিশনটি খুটিয়ে পড়া। কোনো ভুল থাকলে
ফোন করে সেটা নাইট ডিউটিতে কর্মরত
ডেস্কের কাউকে জানিয়ে দিতে হয়। সিটি এডিশন
বা নগর সংস্করণে সেই ভুলগুলো শুধওে নেওয়া
হয়। এই দৈনন্দিন রুটিনে ছেদ পড়েছে আজ।
অফিস থেকে ফিরে শাওয়ারে যাওয়ার সময় পাননি
তারেক আহমেদ। তার সামনে বসে আছে তন্ময়।
তন্ময় সারা শহরে এসব কী ঘটছে? সকাল
থেকে কোথায় ছিলে তুমি? একবারো আমার
সঙ্গে যোগাযোগ করোনি। তোমার সেল
ফোনটাও বন্ধ পাচ্ছি। কী হচ্ছে এসব? তোমার
নামে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি হয়েছে কেন?
কালকের সবগুলো কাগজে এ খবর ছাপা হচ্ছে
সেটা জানো তুমি?
একদমে কথাগুলো বলে একটু থামেন তারেক।
উঠে টয়লেটে যান। ফেরার পথে ডাইনিং রুমের
ফ্রিজ খুলে দুটো বিয়ারের ক্যান বের করেন।
একটি তন্ময়ের দিকে এগিয়ে ছুড়ে দিয়ে অন্যটি
খুলে ক্যান থেকেই চুমুক দিয়ে খেতে শুরু
করেন। চুপচাপ কিছুক্ষণ বিয়ার পান করে দুজন।
সেন্টার টেবিলে রাখা তারেকের প্যাকেট
থেকে একটা সিগারেট ধরায় তন্ময়। পাশের
বেডরুমে মিনা ভাবি আর ছেলে রুদ্র ঘুমাচ্ছে।
স্কুল শিক্ষিকা মিনা ভাবিকে খুব ভোরে উঠতে হয়।
রুদ্রকে স্কুলে পাঠিয়ে তারপর ছুটতে হয়
নিজের কর্মস্থলের দিকে। এ কারণে রাতে
একটু তাড়াতাড়ি শুয়ে পড়েন। এ বাড়ির নারী নক্ষত্র
সবকিছু তন্ময়ের জানা। মোহাম্মদপুরের দিকে
কোনো অ্যাসাইনমেন্ট বা কাজ থাকলে মিনা ভাবির
হাতে দুপুরের খাবারটি খেয়ে যায় তন্ময়। এ ছাড়াও
পালা-পার্বনে এ বাড়িতে তন্ময়সহ আরো
কয়েকজন সহকর্মী দাওয়াত বাঁধা। মিনা ভাবির হাতের
রান্না যেন অমৃত। সুযোগ পেলে সেই অমৃতরস
থেকে নিজেকে বঞ্চিত করে না তন্ময়।
কি ভাবছো তন্ময়?
তারেক ভাইয়ের ডাকে বর্তমানে ফিরে আসে।
ঘাড় ঘুরিয়ে তাকায় তার দিকে। কোথা থেকে শুরু
করবে বুঝতে পারে না। মাথার চুলগুলো মুঠো
করে ধরে রাখে কিছুক্ষণ। মাথাটা তুলে সরাসরি
তাকায় তারেকের দিকে।
কেন এমন করলেন তারেক ভাই?
এ কথার মানে? তুমি কী বলতে চাচ্ছো?
তন্ময়ের প্রশ্নে অবাক হন তারেক আহমেদ।
স্থির দৃষ্টিতে তার দিকে তাকিয়ে থাকে তন্ময়।
আজ সারা দিন পুরো ব্যপারটি নিয়ে ভেবেছে
তন্ময়। ভেবে ভেবে নিজের মতো করে
পুরো ঘটনাটি সাজিয়েছে। এরপর বার বার
উল্টেপাল্টে পুরো বিষয়টিকে নানা দিক থেকে
বিশ্লেষণ করেছে। এভাবেই ছোটখাট
ফাঁকফোকর গুলো ভরাট করেছে। এক একটি
বিচ্ছিন্ন ঘটনাকে জোড়া লাগিয়ে পুরো ছবিটা তৈরি
করেছে। কি নিখুঁত পরিকল্পনা!
তারেকের দিকে তাকিয়ে বলতে থাকে তন্ময়,
আপনি ছিলেন আমার কাছে নেক্সট টু গড। আপনার
হাতে বড় হয়েছি আমি। হাতে কলমে রিপোর্টিং
শিখিয়েছেন আপনি। বিভিন্ন সময় ঠেকা-বেঠেকায়
টাকা দিয়েও সাহায্য করেছেন। মফস্বল শহর
থেকে আসা একটি ছেলে, ঢাকা শহরে যার পরিচিত
কেউ নেই, সেই আমি ঢাকা শহরে আজকে এ
অবস্থানে পৌছেছি আপনারই বদৌলতে। এ জন্য
আপনার প্রতি আমার কৃতজ্ঞতার শেষ নেই। আপনি
যখন যেটা করতে বলেছেন, কোনো প্রশ্ন
না করে হুকুম তামিল করে গেছি। আপনি চাইলে সারা
জীবন আমাকে কৃতদাস করে রাখতে পারতেন।
কিন্তু এটা কী করলেন আপনি?
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now