বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
ঈমাম সাহেব কেঁশে পরিস্থিতি হালকা করার চেষ্টা করলেন, “আপনে জিজ্ঞাস করছিলেন জুবায়ের আলীর কোনো বোইন আছিল নাকি?”
“আমি?” অবাক হয়ে তাকাল, “কখন?”
“না মানে আপনে না, আপনের আগের জন।”
“কি বলেছিলেন জবাবে?”
“কেউ ছিল না। জুবায়ের এতিম ছেলে। মা, বাপ, ভাই-বোইন কেউ আছিল না। তিন বৎসর বয়স যখন তখন থেইকা এই মাদ্রাসায় ছিল। বলতে পারেন এই মাদ্রাসার ছেলে।” একটু বিষাদ মেশানো কন্ঠে বললেন।
আমি কিছু বললাম না। চুপ হয়ে বসে আছি।
ইদ্রীস সাহেব আপন মনেই বলতে লাগলেন, “জুবায়ের খুবই শান্ত কিসিমের ছেলে আছিল। একদম কথা বার্তা বলত না। এই পাঁচ বছর বয়সেই পুরা অর্ধেক কুরান মুখস্ত করে ফেলছিল!”
আনমনেই বললাম, “তাই নাকি?”
“হ্যা ভাই। খুবই ভাল স্বরণ শক্তি আছিল ছেলেটার। একটা আজব খেয়াল আছিল ওর। সারা দিন রাত গোরস্থানের ভিতর গিয়া নতুন কবরের নাম, তারিখ, সাল- মুখস্ত করত।”
আমি অন্য মনষ্ক হয়ে পড়েছিলাম। কথাটা কানে যেতেই ঝট করে সোজা হয়ে বসলাম। শিরদাঁড়া পুরো টান টান, “কি বললেন?”
“ইয়ে- কবরের নাম, তারিখ, সাল মুখস্ত করত।” একটু অবাক হয়ে তাকালেন আমার দিকে।
আমি বেশ বিষ্মিত মুখে জিজ্ঞেস করলাম, “ মানে? মুখস্ত করত?”
“জী ভাই। আরো একটা কাজ করতো- কবরের পাশে বসে কান পাইতা থাকত, যেন কিছু শুনবার চেষ্টা করতেছে।”
আমি স্থির দৃষ্টিতে তাঁর মুখের দিকে তাকিয়ে রইলাম। মূর্তির মত দীর্ঘ একটা মুহূর্ত নড়লাম না।
“ভাই? কী ভাবতেছেন?” অবাক গলায় বললেন ইদ্রীস সাহেব।
আমি জবাব দিলাম না। আমার মাথায় বিচিত্র একটা সম্ভাবনা উঁকি দিচ্ছে তখন। আমি ঠিক জানি না আমি যেটা ভাবছি- সেটা ঠিক কিনা। কিন্তু আমার যুক্তিতে সব খাঁপে খাঁপে মিলে যাচ্ছে......
আমি সে রাতটা মসজিদের বারান্দায় শুয়ে কাটিয়ে দিলাম। এক মুহূর্তের জন্য দু চোখের পাতা এক করলাম না। কারণ ঘুমালেই আমি স্বপ্ন দেখা শুরু করবো। আমার জেগে থাকা এখন ভীষণ দরকার। ভীষণ। জ্বরের ঘোরে কাঁপতে কাঁপতে অন্ধকার গোরস্থানটার দিকে তাকিয়ে রইলাম সারা রাত। অপেক্ষা করতে লাগলাম সূর্যের জন্য। অজানা আশংকায় বুকের ভেতর হৃদপিন্ডটা পাগল হয়ে গেছে।
আমি পরদিন খুব ভোরে চলে আসি রেল স্টেশনে। আসার আগে ফযরের নামাজ শেষে বিদায় নেই ঈমাম সাহেবের কাছ থেকে। আমাকে এগিয়ে দিতে তিনি রেল স্টেশন পর্যন্ত এলেন। ভদ্রলোক বুকে জড়িয়ে ধরে আমাকে বিদায় জানালেন। বহুকাল মানুষের এমন গভীর ভালবাসা পাইনি। খারাপ লাগল কেন জানি। আসার আগে তাঁকে বললাম, “ ভাই, একটা কথা বলি?”
“অবশ্যি বলেন ভাই।”
“আমাকে পাগল ভাববেন না। কথাটা শুনলে পাগল মনে হতে পারে আমাকে।” স্টেশনের প্লাটফর্ম দিয়ে হাটতে হাটতে বললাম। ট্রেন ছাড়বে ছাড়বে করছে।
“কি কথা?” বেশ অবাক হলেন।
“জুবায়ের আলী নামের সেই ছেলেটার ছবি আর বর্ণনা দিয়ে পত্রিকায় একটা হারানো বিজ্ঞপ্তি দেন। ছেলেটাকে খুঁজে পাবেন আমার মনে হয়।”
ঈমাম সাহেব এমন ভাবে তাকালেন যেন আমার মাথা পুরোপুরি খারাপ হয়ে গেছে। আমি একটা নিঃশ্বাস ফেলে তাঁর কাঁধে হাত রেখে মৃদু চাপ দিলাম, “আপনি আমার কথা বিশ্বাস করতে পারেন ভাই, আমি বুঝে শুনে কথাটা বলেছি আপনাকে।”
ট্রেনের বাঁশি দিল। আমি দরজার হ্যান্ডেল ধরে উঠে পড়লাম। ঈমাম ভদ্রলোক তখনো হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছেন প্লাটফর্মে। ট্রেনটা ছেড়ে দিল। ঈমাম সাহেবের সঙ্গে এটাই আমার শেষ দেখা।
পৃথিবীতে অতিপ্রাকৃত কিছু আছে কিনা আমি ঠিক জানি না। কিন্তু এখন একটা জিনিস আমি জানি। অতিপ্রাকৃত কিছু মানুষ ঠিকি রয়েছে।
প্রকৃতি যখন সিদ্ধান্ত নেয় তার সৃষ্ট মানুষ গুলোর মাঝ থেকে কাউকে সে বিচ্ছিন্ন করবে- তখন একই সঙ্গে সেই সিদ্ধান্তের পরিপুরোক অন্য কোথাও একটা মানুষকে সৃষ্টিও করেন।
আর প্রকৃতি তার সিদ্ধান্ত মাঝ পথে বদলে ফেলার জন্য তৈরি করেছেন কিছু মাধ্যম।
সেই রকম একজন মাধ্যম হল “মোঃ নজরুল হোসেন” কিংবা “জুবায়ের আলী”।
আমি ৩১ জুলাই রাতে জুবায়ের আলীর দ্বিতীয় সত্ত্বাকে বাঁচাতে পারিনি। সেদিন কবর দেয়া হয়েছিল জুবায়ের আলীর দ্বিতীয় অস্তিত্বকে।
আসল জুবায়ের আলীকে নয়। কবরের ভেতর মারা যাওয়া বাচ্চাটা ছিল “মোঃ নজরুল হোসেন”এর সেই দ্বিতীয় জনের মত।
আসল জুবায়ের আলী আমার মত এখনো বেঁচে আছে কোথাও না কোথাও। পালিয়ে বেরাচ্ছে ভয়ের হাত থেকে বাঁচতে- কারণ সে এখনো ছোট।
ভয়টাকে সহ্য করার মত শক্তি তার এখনো হয়নি।
আমার এ অদ্ভূত ব্যাখ্যার অর্থ অনেকেই বুঝতে পারবেন না।
তাই একটু বুঝিয়ে বলছি- জুবায়ের আলী নামের সেই বাচ্চা ছেলেটা খুব ছোট থাকতেই একটা জিনিস জেনে গিয়েছিল।
প্রকৃতি তার সৃষ্ট মানুষদের নির্দিষ্ট সময়ের আগে যদি টেনে নেন- মাঝে মাঝে তাদের ফিরিয়েও দেন। কিন্তু সেটা খুবই অল্প সময়ের জন্য।
সেই অল্প সময়ে নির্দিষ্ট কিছু মানুষ আছে যারাই কেবল বুঝতে পারে প্রকৃতি সেই মানুষটাকে আবার ফিরিয়ে দেয়ার চেষ্টা করছে।
তখন তাদের কাজ হয় সেই মৃত মানুষটাকে বাঁচানোর চেষ্টা করা।
জুবায়ের আলী নতুন কবরের নাম, তারিখ, সাল দেখে বলে দিতে পারত এই কবরের ব্যক্তি কি দ্বিতীয় বার বেঁচে উঠবে নাকি।
সে এসব কিভাবে জানতে পেরেছিল সেটা আমার কাছে ধোঁয়াটে। হতে পারে সেই ন্যাড়া ফ্যাকাসে মেয়েটার মাধ্যমে জানতে পারতো।
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now