বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
৩
আমি তখন বি.এ. সেকেন্ড ইয়ারে পড়ি, তোর
দাদু রিটায়ার্ড করেছেন প্রায় ১ বছর । এল-পি-আর
এর টাকা আসা বন্ধ হয়েছে সবেমাত্র । ফ্যামেলি
ইনকাম বলতে বড় ভাইয়ের ছোট খাট একটা
চাকরী থেকে আসা অল্প কিছু পয়সা । তাই
আমাদের বাসার অবস্থা টায়ার পাংচার হয়ে যাওয়া গাড়ীর
মত হয়ে গেল, যেই কোন মুহূর্তে রাস্তায়
বসে যাবে । সব দেখে শুনে আমি পড়াশুনা
ছেড়ে একটা প্রাইভেট কোম্পানিতে চাকরী
নিলাম কেরানী হিসেবে । ভালোই যাচ্ছিল দিনকাল
। ১০ থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত ডিউটি এরপর গভীর
রাত পর্যন্ত বন্ধুদের সাথে আড্ডা , কার্ড খেলা ,
সিনেমা দেখা এই সেই হেন তেন ! যা ওই
বয়সের ছেলেরা করে আরকি । প্রথম
বেতনের টাকা দিয়ে আমি পুরো এক প্যাকেট
বেনসন সিগারেট কিনে ফেলেছিলেম , তারপর
কয়েকদিন ওই প্যাকেট পকেটে নিয়ে বন্ধুদের
আড্ডায় গিয়ে ভাব মারতাম । রাতে ঘুমানোর আগে
প্যাকেট খুলে একটা সিগারেট খেতাম আর ভাবতাম,
কেন মানুষ সুখ খুঁজে মরে ! এই সব করে যা
টাকা বাঁচত বাবার হাতে তুলে দিতাম । বাবা যখন একটু
করে মুচকি হাসত আমার হৃদপৃন্ডের দুপদুপ শব্দ
আমি নিজ কানে শুনতে পেতাম ।
এর মাঝেই আমার পাশের ডেস্কে শাড়ি পরা একটা
নতুন মেয়ে আসল, পিউ না কি যেন নাম ছিল !
টাইপিস্ট, তাকে আসলে গ্রামার দেখে না গ্ল্যামার
দেখে নেয়া হয়েছিল তা নিয়ে আমার খুব
সন্দেহ ছিল । হাজারটা বানান ভুল । টাইপ করার সময়
হাতের চুড়িগুলো রিনরিন শব্দ করত । প্রথম দিকে
আমি তেমন একটা পাত্তা দিতাম না , কাজের ফাঁকে
টুকিটাকি কথা হত এই যা । একসময় আবিস্কার করলাম তার
বাসা আমাদের কাছাকাছি । রাতে কাজ শেষ হতে
একটু দেরী হলেই আমি তাকে পৌঁছে দিতাম
সৌজন্যতার খাতিরে অথবা পিউ আমার জন্য অপেক্ষা
করত কাজের বাহানা দেখিয়ে । একসময় আবিস্কার
করলাম, আমরা প্রতিরাতেই কাজের শেষে
একসাথে হেঁটে হেঁটে ঘরে ফিরছি। কি বৃষ্টি, কি
শীত আর গরম ! তবে বৃষ্টির দিনগুলো ছিল
একেবারেই আলাদা । একই ছাতার নিচে কাকভেজা
হয়ে ঘরে ফেরা, বড় রাস্তার মোড়ে দাড়িয়ে
গরম পেয়াজু আর চা খাওয়া । পরদিন গায়ে জ্বর
নিয়ে সকালে উঠে ওর জন্য বাস স্ট্যান্ডে
অপেক্ষা করার মাঝে অপার্থিব কোন অনুভূতি
খুঁজে পেতাম আমি । গুন গুন করে পিউ গান গাইত
আর আমি মুগ্ধ হয়ে শুনতাম । নীরবে চুপচাপ
ভাবনার জগতে হারিয়ে গেলে পিউ টুক করে
একটা খোঁচা দিত । মাঝে সাঝে দুজন একসাথে
অফিস ফাঁকি দিয়ে ঘুরতে যেতাম নিরিবিলি কোন
জায়গায় । আমি পিউর কোলে মাথা রেখে ঘুমিয়ে
যেতাম ,কখনও কখনও ওর দু'একফোঁটা
চোখের জল আমার গালে এসে পড়ত , আমি
জেগে গেলেও ওকে বুঝতে দিতাম না ।
কারো কাজল ভেজা চোখের চাহনি যে এত
সুন্দর হতে পারে আমার বিশ্বাস হত না । কে
আগে বলেছিল সেই শব্দটা আমার মনে নেই ,
কে আগে হাত ধরেছিলাম তাও মনে নেই । আমি
বুঝতেই পারিনি কখন অবচেতনে ওকে নিয়ে
ভাবতে শুরু করলাম, পিউকে ছাড়া আমি যেন
অন্যকেউ । বন্ধুদের আড্ডা বিরক্তিকর লাগে,
বেনসন টানতে ইচ্ছে হয়না । দিন রাত শুধু মাথার
মাঝে ওর বলা, না বলা কথাগুলো ঘোরে । ঘুম
ভাঙলে ওর কথা মনে হত, ঘুমাতে গেলে ওর
কথা মনে হত, ঘুমের ভিতরেও ওর হাসির শব্দ
শুনতে পেতাম ।
এর মাঝেই আমাদের অফিসে শাহারিয়ার ইকবাল নামে
চোখে কালো রিমের চশমা বিশিষ্ট নতুন বস
জয়েন করেন । দুর্দান্ত মেধাবি, চটপটে কাজ
করেন । কিছু দিনের মাঝেই আমাদের সবার প্রিয়
হয়ে ওঠেন তিনি । হীরে চিনতে ওনার ভুল হত না
। শাহারিয়ার সাহেব পিউকে এক বছরের মাথায় অফিসার
বানিয়ে দোতালায় নিয়ে যান । অফিসারদের নাইট
পার্টিতে আসা যাওয়া শুরু হয় পিউর, কয়েক মাসের
ব্যবধানেই আমি সেই পিউ আর এই পিউর মাঝে
কোন মিল খুঁজে পেতে ব্যর্থ হলাম । কাজ
শেষে রোজ দাড়িয়ে থাকতাম অফিসের বাহিরে,
ইকবাল সাহেবের গাড়িতে ওঠার আগে পিউ একটু
ফিরেও চাইত না । কখনো কখনো আমি একা একা
হেঁটে ঘরে ফিরতাম, আবার কখনও ফিরতাম না । খুব
গভীর রাত পর্যন্ত যখন পিউ আর ইকবাল সাহেব
মিটিং করতেন , আমি রাতের শহরের ঘুমন্ত
নীরবতার মাঝে কান পেতে পিউর হাসির শব্দ
শুনতাম । আমাদের ভালবাসার অপমান সহ্য না করতে
পেরে অবুঝ চোখগুলো নীরবে পানি ঝরাত ।
কখনও কখনও বৃষ্টি সেই অভিমান মুছে দিত, নাহয়
সেই ভেজা চোখ বিষন্ন ক্লান্তিতে ঘুমিয়ে
যেত পার্কের বেঞ্চে !
আশ্চর্য এত বছর পরেও রায়হান সাহেবের
বুকের মাঝে কষ্টের তীব্র মাদকতাময় অনুভূতি
হচ্ছে , চশমাটা কিছুতেই চোখের কোনে
জমে থাকা পানি লুকোতে পারছে না ।
বাবন মাথা তুলে বাবার কাঁধে হালকা করে মাথা
ছোঁয়াল। মৃদু কণ্ঠে নীরবতা ভাঙলঃ বাবা !
-বল বাবন!
-তুমি কি পিউকে খুব ঘৃণা কর ?
-হু !
-আজো ?
-হুম্ম !
-কেন বাবা ?
রায়হান সাহেব ছেলের হাত ধরে দাঁত চেপে
বললেনঃ ও আমার প্রথম সন্তানকে খুন
করেছে !
-মানে কি ? বাবন চমকে উঠল ।
-আমরা কাউকে না জানিয়ে বিয়ে করেছিলাম এর ছয়
মাস আগে ! আমি আমার সন্তানের দোহাই দিয়ে
পিউ কে ফিরে আসার কথা বলায় ও এব্রোশান
করিয়ে ফেলে । এরপরই আমি ওই অফিসের
চাকরিটা ছেড়ে দিয়েছিলাম !
-উনি এখন কোথায় আছেন জান তুমি ?
-হুম্ম !
-ইকবাল সাহেবের সাথেই আছেন ?
-নাহ !
-উনি এখন কেমন আছেন জান ?
-হৃদয়হীনারা সুখেই থাকে অন্য কারো হয়ে,
অলীক কল্পনায় !
-বাবা ! মা কি জানত সব কথা ?
-এই ঘটনার পর আমার খুব ভয়ানক জন্ডিস হয়েছিল।
ডাক্তাররা তো বলেই দিয়েছিল কবর খুঁড়ে
ফেলতে । আমিও সমস্ত যন্ত্রণা থেকে মুক্তি
পাওয়ার অপেক্ষায় প্রহর গুনতাম । রুমুরা আমাদের
পাশের বাসাতেই থাকত , মৃত্যুপথযাত্রীকে সেই
যে দেখতে এসেছিল, নিজে সেই পথের
যাত্রী হওয়ার আগ পর্যন্ত আমাকে ছেড়ে যায়নি
। তুই তো জানিস বাকী কথা ! তোর মা তখন
আমার হাত শক্ত করে ধরেছিল বলেই তো শুধু
ওর জন্য আবার বেঁচে থাকতে ইচ্ছে
হয়েছিল !
-তুমি কি মাকে কখনও পিউর মত ভালবাসতে
পেরেছিলে ? বাবনের কণ্ঠ হালকা কেঁপে উঠল
।
-ভালবাসা শব্দটা একই হলেও সব ভালবাসা আর ঘৃণা
একহয়না । রুমু আমাকে কেমন ভালবাসত , আমি ঠিক
বোঝাতে পারব না । কোন মানুষ কাউকে এতটা
মায়ায় বাঁধতে পারে না ।
বাবন তার বাবার চোখে তাকিয়ে জানতে চাইলঃ বাবা,
তুমি বেঁচে আছ কী নিয়ে ?
-জীবন-মৃত্যুর যিনি সৃষ্টিকর্তা, তিনি এরপর আর
একটা জীবন রেখেছেন । হয়ত সেই
জীবনে সব না পাওয়া পুরন হবে সেই আশায় !
-কেন এমনই হয় সবসময় বলত বাবা ?
-এই এক জীবন সব ইচ্ছে পুরনের জন্য
যথেষ্ট নয় বাবন !
-আমি মানি না বাবা !
-আমাদেরকে এই চক্র ভাঙ্গার বা বোঝার ক্ষমতা
দেয়া হয়নি । মানুষ আসলে খুব অসহায় সৃষ্টি, প্রিয়
মানুষের নগন্য অবহেলাও সে সহ্য করতে পারে
না ।
বাবন তার বাবার চেহারায় একদৃষ্টিতে তাকিয়ে
থেকেও বুঝতে পারছে না কতটা দুঃখ পেলে
মানুষ এতটা হাসতে পারে !
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now