বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
৩
পিঠ টনটন করছে, একটা কিছু দিয়ে ইচ্ছে মত
পেটালে কিছুটা আরাম লাগত।ঘুম ভেঙ্গেছে প্রায়
৫ মিনিট, আবির ঠিক বুঝতে পারছে না সে
কোথায়।ধীরে ধীরে গতকাল রাতের সব ঘটনা
মনে পড়ছে।মাথাটা ভার ভার লাগছে, পাখির
কোলাহলও অসহ্য লাগছে । ভাল করে চোখ
মেলতেই দেখল সেই মারমা মাঝিটা কুটিল
চোখে পিটপিট করে তার দিকে তাকিয়ে আছে।
সে উঠে বসতেই মাঝিটা হাঁটা শুরু করল, আবির তার
পিছু পিছু হাঁটছে।
-ও মারমা ভাই,আপনি বাংলা বোঝেন?
মাঝির নীরবতা তার প্রশ্নকে কটাক্ষ করল।
-আশেপাশে কবরস্থান আছে? কবর না পেলেও
হবে, মুর্দার ব্যবস্থা করা যায় না!
মাঝি ঘুরে তার দিকে তাকাল।
আবির নিজের গলা চেপে ধরে, জিভ কামড়ে,
চোখ উল্টিয়ে কি বোঝানোর চেষ্টা করল?
আর ওই মাঝি কি বুঝল কে জানে? সে ইশারায় একটা
পাহাড়ি খাড়ি-পথ দেখিয়ে দিয়ে একপাশে বসে
রইল।
আবির উপায় না দেখে সোজা সেই পথ ধরে হাঁটা
দিল। প্রায় ২৫ মিনিট পর একটা জায়গা চোখে পড়ল ,
যাকে গুহা বললে ভুল হবে। ঠিক তিনটা পাহাড় যেন
চেপে এসেছে। ভেতরটা প্রায় অন্ধকার ,
কলকল পানির শব্দ শোনা যাচ্ছে, এখানে
সেখানে নুড়ি পাথর ছড়িয়ে আছে। চোখে
একটু আলো সয়ে আসতেই সে দেখল কে
যেন ঘুমিয়ে আছে কাত হয়ে, আবির পাশে
যেয়ে একটু খেয়াল করতেই ভয়ে তীব্র
চিৎকার দিল, এতো ত্রংখা মারমার ক্ষতবিক্ষত লাশ।
আবির ধাক্কা সামলে উঠে,পানির জন্য ব্যাক-প্যাক
খুলল।ছ্যাঁত করে উঠল বুকটা, কালকে রাতের
সেই চাপাতিটা।আবিরের মাথা ঝিমঝিম করছে, সে
কিছুই মনে করতে পারছে না, কি ঘটেছিল গতকাল
রাতে? থাক যা হবার হয়েছে। সে যে মুর্দা
পেয়েছে এটাই সৌভাগ্য।চাপাতিটা দিয়েই দুহাত কবর
খুঁড়ে ফেলল সে। ত্রংখা মারমার বুক বরাবর চাপাতি
দিয়ে কুপিয়ে, চামড়া খণ্ডটা পুঁতে দিয়ে নিশ্চিন্ত
মনে একটু জিরিয়ে নিচ্ছিল আবির।ঠিক তখনই কোন
জন্তুর ঘোঁত ঘোঁত নিশ্বাস ফেলার শব্দে
চমকে উঠল সে।গর্তটার মুখ আগলে দাঁড়িয়েছে
একজোড়া বিশাল দেহী কালো কুচকুচে কুকুর।
আবছা আলোয় চোখগুলো জ্বলজ্বল করছে।
আবির ভীরু পায়ে রুটিগুলো নিয়ে এগিয়ে গেল
কুকুর গুলোর দিকে। সাবধানে হাত বাড়িয়ে
রুটিগুলো কুকুরগুলোর মুখে দিতেই খেয়াল
করল অসংখ্য কুকুর তাকে ঘিরে রেখেছে,
যেন ছিঁড়ে টুকরো টুকরো করে ফেলবে
এখনই। আবির প্রাণপণে ছুটে বের হয়ে এলো।
কুকুরগুলো পিছু নেয়নি কিন্তু সে ছুটছে তো
ছুটছেই, মাঝিটাকেও চোখে পড়ছে না।গাছের
শেকড়ে পা বেঁধে হুমড়ি খেয়ে পড়ল সে।
৪
গভীর রাতে ঘুম ভাঙল আবিরের,নাহ ভুল হতে
পারে না। সে পানির উপরেই আছে। এত দিনের
অভিজ্ঞতা! সে নৌকায় শুয়ে আছে কাঁথা মুড়ি দিয়ে,
আর মাঝি নৌকা বেয়ে চলেছে,একটু একটু কুয়াশা
আছে।অলস মস্তিষ্ক স্মৃতির ঝাঁপী খুলে
আবিরকে নিয়ে গেল প্রায় ৯ মাস আগের এমনই
কোন রাতে।
প্রায় ৪০ দিন নেটওয়ার্কের বাহিরে ছিল আবির,ভারত
মহাসাগর থেকে যাত্রা শুরু করে তাদের
ওয়েস্টার্ন মেরিনের কার্গো শিপটা
সেনেগালের দিকে যাচ্ছিল। নয়দিন পর ইঞ্জিনের
সমস্যা দেখা দেয়, প্রায় দুই সপ্তাহ মাঝ সমুদ্রে
কাটিয়েছে তারা, অন্য একটা জাহাজ এসে সাহায্য
করার পরই সবকিছু ঠিকঠাক হয়। প্রায় প্রতিটা রাতই সে
জাহাজের ডেকে বসে কাটাত, নীল সমুদ্রে
নেশা ধরা জোছনা,নাবিকদের মাদকতাময় গান আর
ডেক ক্যাডেটদের পাগলামি। গানগুলো বিভিন্ন
ভাষার হলেও সুরের ভাব কিন্তু এক,প্রিয়ার জন্য
নাবিকদের আর্তনাদ আর হাহাকার। প্রথম কয়েকদিন
ভালোই লেগেছে।এরপর সবাই কেমন যেন
নির্জীব হয়ে যেতে থাকে, শুধু আবির
একদৃষ্টিতে খোলা আকাশের পানে তাকিয়ে
নীরুর কথা চিন্তা করত। মেয়েটা বড় অভিমানী,
প্রায় ৫ বছর ধরে চিনে নীরুকে। নিশ্চিত নীরুও
এখন নীরবে চোখের জল ফেলছে ।আবির
অযথা অস্থির হয়ে মাঝে মধ্যে স্কাইপিতে
ঢোকার ব্যর্থ চেষ্টা করে,মনে মনে কথা
বলে নীরুর সাথে, নীরুও কি এমন করছে?
একটু জানাতেও পারেনি নীরুকে সে যে এতদিন
নেটওয়ার্কে থাকবে না, আসলে আবির নিজেও
জানত না যে এমন হবে। নীরুর কথা মনে হলেই
শেষ দেখার দিনের কথা মনে পড়ে, বুকের
মাঝে মাথা রেখে নিঃশ্বব্দে কান্না করছিল
মেয়েটা। আবির চোখের জল মুছে দিতে
গিয়ে পুরো মুখে কাজল লেপ্টে দিয়েছিল।
মনে পড়লেই হাসি পায় এখনও।
যেদিন নেটওয়ার্ক পাওয়া গেল, প্রায় ৪ ঘণ্টা পর
তার সময় হল একটু স্কাইপিতে বসার। নীরুকে
অনেক মেসেজ পাঠাল কিন্তু কোন খবর নেই!
দুই দিন পর নিরু রিপ্লাই দিল, সে আর যোগাযোগ
করতে পারবে না। ব্যাস এতটুকুই! আবির কিছুই
বুঝতে পারে না, তার ইচ্ছে করছিল তখনই
একছুটে নীরুদের বাসায় চলে যায়। তারপরের
ছয় মাস একটানা মেসেজ পাঠিয়েও কোন জবাব
পায়নি নীরুর।দিনগুলো যে কিভাবে কেটেছে
আবির জানে না।প্রবল জ্বরের ঘোরে মানুষ
যেমন সময় জ্ঞান হারিয়ে ফেলে,ঠিক তেমনি
করে ছয়মাস পানিতে ভাসার পর দেশে ফিরে
আবির একছুটে যায় নীরুদের বাসায়।
নীরুদের বাসার দরজা ১০ মিনিট ধাক্কাধাক্কি করার পর,
লোক জড় হয়ে যাওয়ার ভয়ে সে বাহিরে
আসে।কেমন যেন ফ্যাকাসে লাগছিল ওকে।
আবির খুব ভালো করে নীরুর চোখে তাকায়,
সেই সাদাকালো চোখে কোন রং নেই,শুধু
পুতুল নাচের ছলনা। আবির কিছু জানতে চাইল না,
চুপচাপ দাড়িয়ে ছিল কিছুক্ষন। নীরবতা ভেঙ্গে
অবশেষে নীরু বললঃআমি রাশেদকে বিয়ে করব
আবির! অনেক ভেবে দেখলাম, আমি আসলে
ওর মত কাউকেই খুজছিলাম এতদিন। ও আমাকে
অনেক ভালবাসে, তোমার মত দায়িত্বজ্ঞানহীন
নয় ও। তুমি আমাকে খুব করে চাও আমি জানি, কিন্তু
তোমার ছেলেমানুষি ভালবাসায় দায়িত্বজ্ঞান নেই।
অনিশ্চয়তার সাথে সংসার হয় না। তুমি চলে যাও,
রাসেদ পছন্দ করে না আমি অপরিচিত কারো সাথে
কথা বলি।
আবির নির্বাক অবিশ্বাসে নীরুর চোখে তাকিয়ে
ছিল,রাসেদ নামটা কানে বাজছে।মাঝে মাঝে বলতঃ
কোন এক রাসেদ তাকে মুঠোফোনে কল
দিয়ে বিরক্ত করে,হুমায়ুন আহমেদের বই
পাঠায়,হ্যালো বলেই ফোন রেখে দেয়। আবির
শুনত আর মুচকি হেসে কটাক্ষ করত আজকালকার
ছেলেদের প্রেম নিবেদনের ধরন দেখে।
ঘুণাক্ষরেও ভাবেনি নীরুও আজকালকারই মেয়ে।
পরিচিত-অপরিচিত শব্দের ব্যাখ্যা আবির বুঝতে পারে
না।
পায়ে হেঁটে উত্তরা থেকে নীলক্ষেত
আসে সে।কয়েকটা হুমায়ুন আহমেদের বই
স্পর্শ করে দেখে, এই বইতে কি এমন আছে
যা উপহার পেলে পরিচিত-অপরিচিতের সংজ্ঞা
বিপরীত হয়ে যায়?
নৌকাটা শক্ত কিছুর সাথে ধাক্কা খেল, আবির মাথা
বের করে ভাল করে তাকিয়ে দেখল তারা বিলছড়ি
চলে এসেছে।সময় ভোর ৪:৩০, কোন এক
বিচিত্র কারণে মারমা মাঝিটা তাকে লোকালয়
থেকে বহু দূরে নামিয়ে দিয়ে, দক্ষিণ-পশ্চিম
দিকে ইশারা করে বোঝাল, এইটাই বাস স্ট্যান্ডে
যাওয়ার শর্টকাট রাস্তা।
আবির হাসিমুখে তার দিকে ১০০০ টাকার নোট
বাড়িয়ে দিল।
-চাচা আপনাকে অনেক ধন্যবাদ,অনেক।আপনি না
থাকলে নির্ঘাত বাকী জীবন আমি জংলী বাবা
হয়ে কাটাতাম!
মারমা মাঝি ক্রুর চোখে তার দিকে তাকিয়ে ঠিক
হাসল নাকি উপহাস করল বোঝা গেল না। মাথা
নেড়ে নৌকা থেকে নামতে ইশারা করল। সে
নামতেই, মাঝি খুব জোরে আবার উলটো দিকে
দাড় বাওয়া শুরু করল।আবির হাতে টাকা নিয়ে কিছুক্ষন
অসহায় হয়ে দাড়িয়ে মাঝির দাড় বাওয়া দেখে লামা
শহরের দিকে হাঁটা দিল।মাঝির আচরণে বুঝতে
ব্যর্থ হওয়ার যন্ত্রণা তার ভাবনা-চিন্তাকে এতটাই
আছন্ন করে ফেলেছে যে, আবির ভুলেই
গিয়েছে সে এখন দুটো তাজা প্রাণের
হত্যাকারী ইফ্রিতের উপাসনাকারী পিশাচ!
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now