বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
¤¤¤ প্রাকপুরুষের চশমা ¤¤¤
(দশম পর্ব)
লিখেছেনঃ সানজিদা সুলতানা সুমা।
পরদিন ভোরের মিষ্টি রোদ চোখে পড়তেই
ঘুম ভাঙলো সুজানার। বিছানা থেকে নেমে
বেলকনিতে দাঁড়িয়ে ও সূর্যদয় টা প্রাণ ভরে
দেখলো। শেষ বিকাল আর ভোরের সুর্যের
মধ্যে তেমন কোন পার্থক্যই নেই। কিন্তু
ভোরের সুর্য হয় উদ্দমী আর বিকালের সুর্যটা
হল অস্তগামী। জীবনের শেষ বিকালে এসেও
শৈশবের প্রভাতীর প্রতি এক অমোঘ আকর্ষণ
অনুভব করে ও। আর একটিবার যদি সেই স্মৃতিময়
শৈশবে ফিরে যাওয়া যেত। ওদিকে আরিফ
বেডশীটটা দিয়ে মুখ ঢেকে নেয়। প্রভাতের
আভা থেকে মুখ লুকিয়ে দিব্যি ঘুম দেয় ও। কাল
রাতে একটুও ঘুম হয়নি তার। সারাটি রাত ও সানগ্লাসটা
পড়ে কাটিয়ে দিয়েছে। ও ভেবেছিলো
সেদিন সেই সাগর সৈকতেই ডাক্তার
আলফ্রেডের জীবনের যাবনিকা পাত হয়। কিন্তু
কাল রাতে ওর সে ধারণাটা ভুল প্রমাণিত হল। চশমা
পড়ে ও নিজেকে ডাক্তার আলফ্রেডের জায়গায়
জীবন্ত আবিষ্কার করে। বিষ্ফোরণের প্রথম
ধাক্কায় ও মাটিতে পড়ে যাওয়ায় বেশীরভাগ
স্পিন্টারই ওর দেহের উপর দিয়ে উড়ে যায়। মাত্র
তিনটে স্প্রিন্টার ওর বাহু, উরু আর পায়ের পাতায়
বিদ্ধ হয়। আরিফ ওগুলি সহজেই ফরসেপ দিয়ে
টেনে বের করে ক্ষতস্থানটা সেলাই করে
নেয়। তারপর খুড়িয়ে খুড়িয়ে সরে আসে যুদ্ধ
ক্ষেত্র থেকে। শুধু সেই একা নয়।
রেজিস্টান্টের জীবিত সকল সৈন্যকেই ময়দান
ছেড়ে পালিয়ে আসতে হয়। তারপর একসময়
ডেস্ট্রয়ারগুলি সৈকতে ভিড়ে। জার্মান সৈন্যরা
তীরে নেমে পলায়নরত রেজিস্টান্ট সৈন্যদের
পিছু ধাওয়া শুরু করে। ওদের নিষ্টুর বুলেট থেকে
সাদা এপ্রণ পড়া নার্সটাও রেহাই পায় না। দুহাত তুলে
আত্মসমর্পণ করলেও জার্মান সৈন্যরা ওকে গুলি
করে শেষ করে দেয়। ঘন ইউক্যালিপটাসের
ঝোপে লুকিয়ে সবই দেখতে পায় আরিফ। এক
অজানা বেদনায় ওর হৃদয়টা হাহাকার করে উঠে।
সেদৃশ্য দেখার পর আর নিজেকে স্থির রাখতে
পারে না আরিফ। লুকাবোর জায়গাটা থেকে
বেরিয়ে বিরাট ঝুঁকি নিয়ে রাস্তা ক্রস করে ও।
তারপর হাঁচড়ে পাঁচড়ে একটা পাহাড়ের ওপাশে
অদৃশ্য হয়ে যায়। তারপর ও নিজেকে আবিষ্কার
করে সৈকত থেকে দুরে মেইনল্যান্ডের
ভেতরের জঙ্গলে, একটা অস্থায়ি মেডিক্যাল
ক্যাম্পে। অসংখ্য আহত রেজিস্টান্ট সৈন্যরা সে
ক্যাম্পে এসে জড়ো হয়েছে। আহত শরীর
নিয়েই আরিফ ওদের চিকিৎসা করে যায়। এদের
মধ্যে একজন মারা যায়। ওর পেটের ভুরি
স্পিন্টারের আঘাতে ফেঁটে বেরিয়ে
পড়েছিলো। জেজুন্যাল আর্টারী ছিড়ে প্রচুর
রক্তক্ষরণ হচ্ছিলো ওর। আরিফ ওর বুকে পাম্প
করে হার্টকে সচল রাখে, তারপর পেঁচিয়ে যাওয়া
নাড়িভুঁড়িকে যথাসম্ভব স্বস্থানে রেখে, পেটটা
সেলাই করে বন্ধ করে দেয়। কিন্তু ও
নেগেটিভ রক্ত না পাওয়ায় সৈন্যটাকে আর বাঁচানো
যায় না। হাইপোভলিউমিক শক হয়ে ও মারা যায়। ওর
মৃত্যুতে আরিফ খুব মুষড়ে পড়ে। সৈন্যটা
দেখতে অনেকটা ওর ছেলের মতোই
ছিলো। ও মেডিক্যাল ক্যাম্পের তাঁবু থেকে
বেরিয়ে একটা গাছের গুড়ির উপর হেলান দিয়ে
বসে। ক্লান্তি আর হতাশায় চোখ বন্ধ হয়ে আসে
ওর। কিছুক্ষণের মধ্যেই একটা মেয়ের ব্যাস্ত
কণ্ঠ শুনে ও ফের চোখ মেলে। আরেকজন
নার্স, তবে সাদা আপ্রণের বদলে আকাশী
রঙের আপ্রণ গায়ে। মেয়েটা ভয়ার্ত কণ্ঠে
বলে উঠে, "ড্ডডাক্তারর। ২৪ নং সেলের
পেশেন্ট খুব উৎপাত করছে। ওর শরীরে খুবই
উচ্চমাত্রার আসক্তির লক্ষণ দেখা দিয়েছে। আরিফ
অবাক হয়ে ভাবে অস্থায়ি রেজিস্টান্ট ক্যাম্পে
সেল আসবে কোত্থেকে? ওরা তো
জঙ্গলের মধ্যে তাঁবু খাটিয়ে ক্যাম্প বানিয়েছে।
কিন্তু চারপাশে নজর বুলাতেই সে বুঝতে পারে
ও আর জঙ্গলে নেই। উন্মোক্ত জঙ্গলের
বদলে তার চারপাশটা ইট পাথরের দেয়ালে ঘেরা।
ও একটা সাজানো গোছানো পরিপাটি চেম্বারে
বসে আছে। চেম্বারের দেয়ালে ১৯৭২ সালের
একটা ক্যালেন্ডার ঝুলছে। ও সাড়া দিচ্ছে না
দেখে মেয়েটা কঁকিয়ে উঠলো, "ডাক্তার,
চলুন। ওই রোগীর অবস্থা খুবই সিরিয়াস। প্লীজ
ইমার্জেন্সি মুহুর্তে এভাবে বসে থাকবেন না।"
আরিফ এবার উঠে পড়ে, মেয়েটাকে অনুসরণ
করতে থাকে। সিড়ি বেয়ে ওরা দোতালায় যায়।
দোতালায় প্রথম তিনটে কক্ষ পেরুনোর পর
চতুর্থ কক্ষটাই ২৪ নং সেল। সেল গুলি অতিক্রম
করার সময় সেগুলির ভেতরের বাসিন্দারা ওকে
দেখে বিকট চিৎকার জুড়ে দেয়। ২১ নং সেল
থেকে চিৎকার আসে "ডাক্তার আমার পায়ের
ব্যাথাটা এখনো সারে নি। আমার আরো মরিফিন
দরকার। আর একটা ডোজ। প্লীজ।" ২২ নং
সেলের লোকটা দরজায় দমাদম কিল মারতে
মারতে আর্তনাদ ছাড়ে "ব্যাথায়আমি মারা যাচ্ছি ডাক্তার।
আমার পেটে একটা বুলেট ঢুকেছিলো। তারপর
থেকেই এ ব্যাথা সারছে না। আমায় ওই ঔষধটা
একটু দিন না প্লীজ।" ২৩ নং সেলের লোকটা
সকল ভদ্রতাকে উপেক্ষা করে হিসিয়ে গালি দিয়ে
উঠে, "শালা ডাক্তারের বাচ্চা। এই পোল্যান্ডের
জন্যে যুদ্ধ করতে যেয়ে দুহাত হারিয়েছি আমি,
আর তুই বলিস কিনা আমায় ঔষধ দিবি না! ঔষধ না দিলে
তোকে আজ মেরেই ফেলবো।" সেল গুলি
অতিক্রমের সময় আরিফ বুঝতে পারে এটা একটা
পাগলা গারদ। সে নিজেকে পাগলের ডাক্তার
হিসেবে আবিষ্কার করে। কিন্তু ও তো
পশুরডাক্তার! হঠাৎ বদলে পাগলের ডাক্তার হয়ে
গেল কি করে? এত কিছু মাথায় ঢুকে না ওর। ২৪ নং
সেলের সামনে এসে পড়েছে ওরা। প্রতিটা
সেলের দরজার উপর বড়বড় পোলিশ হরফে
লেখা, "ওয়ারশো সেন্ট্রাল সাইকোলজিক্যাল
ফ্যাসিলিটি।" আরিফের ছেলেটাও তো এখানেই
কাজ করে। কিন্তু ওতো চাকুরীতে ঢুকেছে
২০১২ সাল থেকে। আর এখন তো ১৯৭২ সাল।
আরিফ কিভাবে ৪৩ বছর পেছনে চলে
এসেছে। দরজা খুলার শব্দে আরিফের ভাবনায়
চ্ছেদ পরে। নার্সটা ইতিমধ্যেই সেলে প্রবেশ
করেছে। খানিক্ষণ ইতঃস্তত করে আরিফ ও তার
পেছন পেছন সেলে ঢুকে পড়ে। সেলের
ভেতরে বিছানায় একটা ছোট্ট টিনএজ মেয়ে
পড়ে আছে। সারা শরীরে প্রচন্ড কাঁপুনি হচ্ছে
তার। আরিফ দৌড়ে এগিয়ে যায় ওর কাছে। কাছে
যেয়েই বুঝতে পারে মেয়েটা ড্রাগ
এডিক্টেড। কোনভাবে হয়তো অত্যধিক ডোজ
গিলে ফেলেছে তাই এই যায় যায় দশা। নার্সের
দিকে ফিরে হাঁক ছাড়ে আরিফ। "জলদি কিছু ইমিটিক্স
নিয়ে আসুন। না পেলে এক বোতল লবণপানি।
ওকে বমি করাতে হবে।" নার্সটা দৌড়ে সেল
থেকে বেরিয়ে যায়। আরিফ ওর ফিরে আসার
অপেক্ষা করতে লাগলো। কিন্তু নার্সটা বড্ড
বেশী সময় নিচ্ছে। সহসাই ফিরলো না ও।
এদিকে সময় দ্রুত পেরিয়ে যাচ্ছে। মেয়েটা
মরতে বসেছে। অগত্যা আরিফ ইমিটিক্সের আশা
ছেড়েই দিলো। ইমিটিক্স ছাড়াই মেয়েটাকে বমি
করাতে হবে। ও বা হাতে মেয়েটার টুটি চেঁপে
ধরে হাঁ করালো। তারপর ডান হাতের মধ্যমাটা ওর
গলার যথাসম্ভব ভেতরে ঠেসে ধরলো।
এভাবে দু একবার ইরিটেশন দিতেই মেয়েটা
গড়গড়িয়ে বমি করে দিলো। বমি করার পর ও জ্ঞান
হারিয়ে বিছানায় নেতিয়ে পড়লো। শরীরের
কাঁপুনিও অনেকটাই কমে এসেছে। ওকে
দেখে আরিফের মুখে তৃপ্তির হাসি ফুটলো। যাক
বাবা। মেয়েটা শেষ পর্যন্ত টিকে গেল তাহলে।
হঠাৎ আরিফের খেয়াল হল মেয়েটার বমির খানিকটা
ওর কাপড়েও লেগে রয়েছে! যাহ। কি বিচ্ছিরি
অবস্থা। ও সেলের সাথে সংযুক্ত টয়লেটে
যেয়ে কাপড়টা পানির ঝাপটা দিয়ে পরিষ্কার করলো।
টয়লেট থেকে বেরুতেই চোখের কোন
দিয়ে ও একটা ছায়ামূর্তিকে সেল থেকে দ্রুত
বেরিয়ে যেতে দেখল। প্রথমে ও
ভেবেছিলো মনের ভুল, কিন্তু মেয়েটার
দিকে চোখ যেতেই বিষ্ময়ে ওর চোয়াল
ঝুলে পড়লো! কে যেন ওর কাপড় ছিড়ে
ওকে অর্ধনগ্ন করে দিয়েছে। সারা বিছানায় ওর
ছিড়া চুল ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে! আরিফ দ্রুত
এগিয়ে যায় মেয়েটার দিকে। মেয়েটার উপর
ঝুকে ওর পালস পরীক্ষা করে! ঠিক তখনই নার্সটা
সেলের ভেতরে ঢুকে। ভেতরের অনাকাঙ্খিত
দৃশ্য দেখে ও আর্তনাদ করে উঠে, "হায় হায়!
ডাক্তার! আপনি মেয়েটাকে রেপ করলেন? ছিঃ
ছিঃ। আপনি পশুর চেয়ে জঘন্য! আপনাকে আমি
পুলিশে দেব।" আরিফ কিছুক্ষণ কিংকর্তব্যবিমূঢ়
হয়ে ঠায় দাঁড়িয়ে থাকে। এ কি হয়ে গেল! কিছুই
বুঝতে পারে না ও। নার্সকে পাশ কাটিয়ে ও
নিজের চেম্বারের দিকে হাটা দেয়। নার্সটা
পেছনে দাঁড়িয়ে চিৎকার করতে থাকে, "তুই একটা
জানোয়ার। তোর কারণে এই প্রতিষ্ঠানের সুনাম
নষ্ট হচ্ছে। তোর বিরুদ্ধে পুলিশে সাক্ষি দেব
আমি। তোকে ফাঁসিতে ঝুলাবো শয়তান।"
এসবের কিছুই আরিফের কানে ঢুকে না। সব
কিছুকে উপেক্ষা করে ও চেম্বারে ঢুকে
দরজায় খিল দেয়। তারপর চেয়ারে বসে
ডেস্কে মাথা রেখে চোখ বন্ধ করে ও। খট
করে দরজা খুলার শব্দে চোখ খুলে আরিফ।
(চলবে)
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now