বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
‘তোমার বান্ধবীকে ধন্যবাদ জোসেফাইন। দোয়া করো, বিজ্ঞানী স্যারের যেন কোন বিপদ না হয়। যে উদ্দেশ্যে আমি এখানে এসেছিলাম জোসেফাইন, তা সম্পাদনে বোধ হয় ব্যর্থ হলাম। রাখি। দেখি ওদিকে কি অবস্থা।’ গম্ভীর অথচ ভাঙা কণ্ঠস্বর আহমদ মুসার।
‘তুমি তো ভেঙে পড়ার জন্যে নও। আল্লাহ তোমাকে সাহায্য করবেন। ইনশাআল্লাহ তুমি সফল হবে। আমি রাখছি, আসসালামু আলাইকুম।’ গভীর মমতা মাখানো কণ্ঠ জোসেফাইনের।
আহমদ মুসা মোবাইল রাখল পকেটে।
ড. বাজ ও ড. সেসুসি চোখ-মুখ ভরা উদ্বেগ নিয়ে আহমদ মুসার দিকে অপলক দৃষ্টি রেখে পাথরের মত স্থির হয়ে বসে আছে।
আহমদ মুসা তাকাল তাদের দিকে। বলল, ‘শুনেছেন তো সব। খবর সত্য হলে, ধরেই নিতে হবে ড. আন্দালুসি বিপদে পড়েছেন।’ গম্ভীর ও শান্ত কণ্ঠ আহমদ মুসার।
‘আমি কয়েকবার স্যারের মোবাইলে টেলিফোন করলাম। রিং হচ্ছে, কিন্তু কেউ এ্যাটেন্ড করছে না। এই মোবাইল সব সময় তিনি কাছে রাখেন।’ বলল ড. সেসুসি। কান্না ভেজা তার কণ্ঠ।
কিছু বলার জন্যে মুখ খুলেছিল ড. বাজ। আহমদ মুসা দ্রুত কণ্ঠে বলে উঠল তার আগেই, ‘আমি সিজলিতে যাচ্ছি। আপনারা অফিসে থাকুন।’
আহমদ মুসা উঠে দাঁড়াল।
ড. বাজ ও ড. সেসুসি উঠে দাঁড়াল।
‘স্যার, আমাদের জন্যে আর কোন নির্দেশ?’ বলল ড. বাজ।
‘আপনাদেরকেও সাবধান থাকতে হবে। ওরা ক্ষ্যাপা কুকুরের মত হয়ে গেছে। আসি। আসসালামু আলাইকুম।’
সালাম নিয়ে ড. বাজ সংগে সংগেই বলে উঠল, ‘স্যার, আপনার নিরাপত্তা আমাদের জন্যে বেশি প্রয়োজনীয়। হেলিকপ্টার ওয়ার্কশপে, আসতে বলি?’
‘না ড. বাজ। তাতে আরও দেরি হয়ে যাবে। আমাকে এখনই বেরুতে হবে। আর সিজলি তো বেশি দূরে নয়।’
কথা শেষ করেই আহমদ মুসা ঘুরে দাঁড়িয়ে হাঁটতে শুরু করল।
সিজলিতে বিজ্ঞানী ড. আন্দালুসির বাড়ির সামনে হেলিকপ্টার ল্যান্ড করতেই জেনারেল মোস্তফা হেলিকপ্টার থেকে লাফ দিয়ে নেমে ছুটল ড. আন্দালুসির বাড়ির দিকে। পুলিশ প্রধান নাজিম এরকেনের টেলিফোনে আগেই জেনেছেন ড. আন্দালুসির বাড়িতে ৭টি লাশ ছাড়া কিছু নেই। পুলিশ প্রধানের হেলিকপ্টারটিকেও একটু দূরে দাঁড়ানো দেখল।
সিকিউরিটি কর্মীদের স্যালুটের মধ্যে দিয়ে জেনারেল মোস্তফা কামাল বিজ্ঞানী আন্দালুসির বাড়িতে ঢুকে গেল।
পুলিশ প্রধান নাজিম এরকেন জেনারেল মোস্তফা কামালকে স্বাগত জানাল। বলল, ‘বেজমেন্টসহ গোটা বাড়ি সার্চ করা হয়ে গেছে স্যার। যে সাতটি লাশ পাওয়া গেছে, তার সবই আমাদের গোয়েন্দাদের।’
‘ওদের লাশ পড়লেও তা তারা রেখে যায়নি নিশ্চয়?’ গম্ভীর কণ্ঠ জেনারেল মোস্তফা কামালের।
‘অবশ্যই।’ বলল পুলিশ প্রধান।
‘চলুন, আমি একটু দেখতে চাই, বাড়িটাই আমাদের পুলিশ ও গোয়েন্দাদের যারা বাইরে পাহারায় ছিল, তাদের বক্তব্য কি?’
‘কোন গোলা-গুলীর শব্দ তারা পায়নি। মনে করা হচ্ছে, তাদের রিভলবার, ষ্টেনগান সবকিছুতেই সাইলেন্সার লাগানো ছিল।’ বলল পুলিশ প্রধান।
‘কিন্তু আমাদের লোকরা তাদের চলে যেতে দেখলো না কেন? তারা কিভাবে হাওয়া হয়ে গেল বুঝতে পারছেন কিছু?’ জিজ্ঞাসা জেনারেল মোস্তফার।
‘মাইক্রো দু’টি বাইরে পড়ে আছে। আমাদের লোকেরা তাদের কাউকে বাড়ি থেকে বের হতেই দেখেনি। এটা ঠিক হলে দু’টি বিকল্প থাকে, এক. তারা বাড়িতেই কোথাও লুকিয়ে আছে এবং দুই. তারা বাড়ি থেকে কোন বিকল্প পথে পালিয়েছে।’ পুলিশ প্রধান বলল।
‘বিকল্প পথটা কি?’ জিজ্ঞাসা জেনারেল মোস্তফার।
‘সুড়ঙ্গ পথ হতে পারে। কিন্তু আমরা বাড়ির একতলা ও বেজমেন্ট ইঞ্চি ইঞ্চি করে খতিয়ে দেখেছি। সুড়ঙ্গের কোন অস্তিত্ব আমরা পাইনি। আরেকটা কথা, আমরা এমনভাবে খুঁজেও কোন সুড়ঙ্গ পেলাম না, কিন্তু বাইরের লোকরা এসে তাড়াহুড়োর মধ্যে তা পেয়ে যাওয়া স্বাভাবিক নয়। সুতরাং তাদের অন্তর্ধান একটা বড় রহস্য!’ পুলিশ প্রধান বলল।
‘আসুন, আরেকবার আমরা দেখি বাড়িটা।’
বলে পা বাড়াল জেনারেল মোস্তফা কামাল। তার পেছনে পেছনে হাঁটতে লাগল পুলিশ প্রধান নাজিম এরকেনসহ আরও কয়েকজন পুলিশ অফিসার।
আন্ডার গ্রাউন্ড ফ্লোরসহ সব ফ্লোর ও ঘর দেখে জেনারেল মোস্তফা পুলিশ প্রধানসহ আবার ফিরে এল ড্রইংরুমে।
বসল দু’জনেই সোফায়। দু’জনের চোখে-মুখে উদ্বেগ।
পুলিশ প্রধান নাজিম এরকেন সোফায় সোজা হয়ে বসে মনে হয় কিছু শোনার জন্যে অপেক্ষা করল। তারপর বলল, ‘স্যার, কোন সুড়ঙ্গ পথ যদি না থাকে, তাহলে ধরে নিতে হবে পেছনের দরজা দিয়েই তারা পালিয়েছে। পেছনের পনের গজ দূরে বাউন্ডারি ওয়াল। ওয়ালের বাইরে একটা প্রাইভেট রোড আছে। সেখানে গাড়ি রেখে এসে থাকলে এ দিক দিয়ে পালিয়ে যাবার একটা সম্ভাবনা তৈরি হয়।’
সোফায় মাথা রেখে দু’হাত দু’দিকে ছড়িয়ে দিয়ে বসেছিল জেনারেল মোস্তফা কামাল। সেও সোজা হয়ে বসল। বলল, ‘দু’জন লোককে কিডন্যাপ করে ডজন খানেক লোক পেছনের বাউন্ডারি ওয়াল ডিঙিয়ে চলে যাবে, বাইরে মোতায়েন করা আমাদের কোন লোকের নজরে পড়বে না, এটা স্বাভাবিক নয় মি. নাজিম এরকেন।’
‘এ যুক্তিও ঠিক স্যার, কিন্তু বাড়ির তিনদিকে বাগান থাকলেও বাড়ির পেছনে গাছ-গাছড়াটা একটু বেশি। এছাড়া আমাদের লোকদের নজর কিন্ত বাড়ির সামনের গেট ও বাড়ির এ্যাপ্রোস রোডের উপর বেশি ছিল। বাড়ির ঠিক পেছনে সরাসরি কোন পাহারা ছিল না। ওয়ালের বাইরে প্রাইভেট রোডটার উপর চোখ রাখার ব্যবস্থা ছিল। আমি খোঁজ নিয়ে জেনেছি, তাদের চোখ ছিল রাস্তাটির দু’প্রান্তের মুখে। তাদের জিজ্ঞাসাবাদ ছাড়া বিস্তারিত কিছু বলা যাবে না।’
পুলিশ প্রধান নাজিম এরকেনের কথা শেষ হতেই ঘরে ঢুকল একজন পুলিশ অফিসার। বলল, ‘জনাব খালেদ খাকান সাহেব এসেছেন।’
জেনারেল মোস্তফা কামাল ও পুলিশ প্রধান নাজিম এরকেন দু’জনেই চমক ভাঙার মত নড়ে-চড়ে বসল। যেন প্রাণ পেল তারা!
‘হ্যাঁ, হ্যাঁ, নিয়ে এস। আমরা ওনার জন্য অপেক্ষা করছি।’ বলল জেনারেল মোস্তফা কামাল পুলিশ অফিসারকে লক্ষ্য করে।
পুলিশ অফিসার চলে গেল।
কয়েক মুহূর্ত পরেই আহমদ মুসা ঘরে ঢুকল।
জেনারেল মোস্তফা কামাল ও পুলিশ প্রধান নাজিম এরকেন দু’জনই উঠে দাঁড়িয়ে স্বাগত জানাল আহমদ মুসাকে। হাসি নয়, তার মুখে বেদনা যেন উথলে উঠছে! জেনারেল মোস্তফা জড়িয়ে ধরল আহমদ মুসাকে। বলল, ‘আমরা বিস্মিত, বিপর্যস্ত মি. খালেদ খাকান। আপনার জন্যে আমরা অপেক্ষা করছি।’
জেনারেল মোস্তফা কামাল আহমদ মুসাকে ধরে নিয়ে পাশের সোফায় বসাল। তারপর নিজের আসনে ফিরে গিয়ে বসতে বসতে বলল, ‘ভূতুড়ে ঘটনা ঘটেছে মি. খালেদ খাকান! বাড়ির চারদিকে পুলিশ পাহারায় ছিল। তাছাড়া বাড়ির ভেতরে কাজের লোক ও পরিবারের সদস্যের ছদ্মবেশে ছয়জন মহিলা ও দু’জন পুরুষ গোয়েন্দা অফিসারসহ সর্বমোট আটজন গোয়েন্দা কর্মী পাহারায় ছিল, অথচ দশজনের একটা দল বাড়িতে প্রাবেশ করে সাতজন গোয়েন্দা কর্মীকে খুন করে বিজ্ঞানী ও একজন গোয়েন্দা মহিলা কর্মীকে কিডন্যাপ করে হাওয়া হয়ে গেল। তারা কিভাবে পালাল তার হদিস পাওয়া যাচ্ছে না।’
‘মহিলা গোয়েন্দা অফিসারকেও হয়তো তারা বিজ্ঞানীর সাথে গ্রেফতার করেছে?’ আহমদ মুসা বলল।
‘তাই মনে হচ্ছে। কারণ তার লাশও নেই, পালাতেও পারেনি। কিন্তু অন্যদের খুন করে তাকে নিয়ে যাবে কেন?’ বলল পুলিশ প্রধান নাজিম এরকেন।
হাসল আহমদ মুসা। বলল, ‘তাকে ভুল করে নিয়ে গেছে।’
‘ভুল করে কিভাবে?’ জিজ্ঞাসা জেনারেল মোস্তফা কামালের।
‘মহিলা গোয়েন্দা অফিসারকে ওরা বিজ্ঞানীর স্ত্রী মনে করেছে এবং খুশি হয়ে তাকে তাদের প্রয়োজনের বড় অস্ত্র হিসেবে সাথে করে নিয়ে গেছে।’ বলল আহমদ মুসা।
বেদনার সাথে সাথে বিস্ময় নামল জেনারেল মোস্তফা ও নাজিম এরকেন দু’জনের চোখে-মুখেই। দ্রুত কথা বলে উঠল জেনারেল মোস্তফা কামাল। বলল, ‘বুঝেছি, স্ত্রী মনে করে নিয়ে গেছে। কারণ, বিজ্ঞানী কথা না বললে, কথা মত কাজ না করলে স্ত্রীকে লাঞ্জিত করে, তার উপর নির্যাতন চালিয়ে বিজ্ঞানীকে ওদের কথা মতো চলতে বাধ্য করবে। এটা খুবই উদ্বেগের বিষয় মি. খালেদ খাকান।’
‘অবশ্যই উদ্বেগের খবর জনাব! কিন্তু এর মধ্যেও আনন্দের বিষয় হলো, মহিলাটি আমাদের বিজ্ঞানীর স্ত্রী নন।’
‘খবরটা আনন্দের কেন? স্ত্রী না হলেও মেয়েটিকে লাঞ্জিত করতে পারে, সে নির্যাতিতা হতে পারে।’ বলল জেনারেল মোস্তফা কামাল।
‘আনন্দের এই কারণে যে, বিজ্ঞানী ড. আন্দালুসি মেয়েটি তার স্ত্রী নয় বলার পর মেয়েটিকে গিনিপিগ বানাতে পারবে না। অন্যদিকে বিজ্ঞানীকে তাদের ইচ্ছামত কাজ করাতে ও কথা বলাতে বাড়তি কোন সুযোগ তারা পাবে না।’ আহমদ মুসা বলল।
জেনারেল মোস্তফা কামাল ও পুলিশ প্রধান নাজিম এরকেন দু’জনের মুখেই কিছু উজ্জ্বলতা ফিরে এল। বলল জেনারেল মোস্তফা কামাল, ‘ধন্যবাদ খালেদ খাকান। এখন চলুন, ঘটনার সব জায়গা আপনিও একটু দেখুন। কোন দিক দিয়ে পালাল সেটা উদ্ধার হলে আমাদেরও সামনে এগোবার একটা পথ হয়।’
‘চলুন দেখি’ বলে উঠে আহমদ মুসা পুলিশ প্রধান নাজিম এরকেনকে জিজ্ঞেস করল, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ের সাথে কি যোগাযোগ হয়েছে, আটকে রাখা ছাত্র প্রতিনিধিদলের সদস্যরা মুক্ত হয়েছে, তদন্তে ওরা আমাদের কিছু সাহায্য করতে পারে?’
‘পুলিশ ছাত্র প্রতিনিধিদলকে সিজলি পাহাড় এলাকা থেকে সংজ্ঞাহীন অবস্থায় উদ্ধার করেছে। ওরা এখন হাসপাতালে। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ হয়েছে। তারাও তদন্ত শুরু করেছে। সব রকম সহযোগিতা তারা আমাদের করবে।’ বলল পুলিশ প্রধান নাজিম এরকেন।
আহমদ মুসা একবার জেফি জিনার কথা বলতে চাইল যে, সে মূল্যবান সাহায্য করতে পারে। কিন্তু আহমদ মুসা বলল না, চেপে গেল। কারণ আহমদ মুসা ইতোমধ্যেই বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ করেছে। বাইদিবাই বিশ্ববিদ্যালয়ে জেফি জিনা নামে কোন শিক্ষিকা বা গবেষক আছেন কিনা জিজ্ঞেস করেছিল। কিন্তু এ নামে বিশ্ববিদ্যালয়ে কেউ নেই বলে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ তাকে জানান। বিষয়টা আহমদ মুসার কাছে কিছুটা জটিল হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিজ্ঞানী ড. আন্দালুসির সাথে তিনি পরিচিত হলেন কি করে? আর বিশ্ববিদ্যালয়ের তিনি কেউ না হলে তিনি ছাত্রদের সাথে চায়ের দাওয়াত পেলেন কি করে? সুতরাং বিষয়টার কূল কিনারা করতে না পেরে আহমদ মুসা জেফি জিনা সম্পর্কে পুলিশ প্রধানকে কিছু বলল না। শুধু বলল, ‘মি. নাজিম এরকেন ছাত্র প্রতিনিধি দলের ছদ্মবেশে শত্রুদের যারা বিজ্ঞানীর বাড়িতে অভিযান পরিচালনা করেছিল, তাদের মধ্যে সাইন্স এন্ড টেকনোলজি বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন ছাত্রও ছিল।’
উজ্জ্বল হয়ে উঠল পুলিশ প্রধানের চোখ দু’টি। বলল, ‘স্যার, এটা তো অতি মূল্যবান ও সুনির্দিষ্ট ইনফরমেশন। তার নামটা জানা যাবে স্যার?’
‘এখনও জানা যায়নি। আমি চেষ্টা করব জানার।’ আহমদ মুসা বলল।
‘আলহামদুলিল্লাহ। আপনাকে ধন্যবাদ। আপনার পুলিশ বাহিনী, আপনার গোয়েন্দা বিভাগ নেই। কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ ও প্রয়োজনীয় তথ্য আপনার কাছেই আসছে। আমরা কৃতজ্ঞ।’ বলল জেনারেল মোস্তফা কামাল।
হাসল আহমদ মুসা। বলল, ‘একটা প্রবাদ আছে, ঝড়ে বক পড়ে, ফকিরের কেরামতি বাড়ে। ব্যাপারটা এই রকমই। অকল্পনীয় সব সোর্স থেকে তথ্য আসে। এটা মনে করি আল্লাহর খাস সাহায্য। আমার কোন কেরামতি নেই।’
হাঁটতে হাঁটতেই কথা বলছিল আহমদ মুসা।
আগে আগে হাঁটছিল পুলিশ প্রধান নাজিম এরকেন।
চলছিল উপর তলায় উঠার সিঁড়ির দিকে।
আহমদ মুসা দাঁড়িয়ে পড়ল। বলল, ‘নিহত সব লাশ এক তলায়।’ তাহলে বিজ্ঞানী ড. আন্দালুসি সাক্ষাৎকার দেয়ার জন্যে নিচে ড্রইংরুমে নেমেছিলেন নিশ্চয়! সুতরাং সবাই নিচে ছিলেন। সব ঘটনা এক তলায় ঘটেছে, উপর তলায় নয়। তারা পালিয়েছে হয় একতলা হয়ে না হয় আন্ডার গ্রাউন্ড কোন পথ দিয়ে। সুতরাং নিচের তলা ও আন্ডার গ্রাউন্ড ফ্লোরটাই শুধু দেখতে চাই।’
একটু থেমেই আবার বলে উঠল, ‘চলুন, পেছনের দরজা পর্যন্ত যাওয়া যাক।’
চলল সবাই। এবার আহমদ মুসা সকলের আগে।
ওপরে ওঠার সিঁড়ির ডান পাশ ঘেঁষে একটা করিডোর সামনে চলে গেছে। এ করিডোরটাই কয়েকটা বাঁক নেবার পর পেছনের দরজায় গিয়ে ঠেকেছে।
হাঁটছে আহমদ মুসা।
তার দৃষ্টি দু’পাশের দেয়াল ও মাটির দিকে। তার বিশ্বাস এ পক্ষের ৭ জন লোক নিহত। এরা একেবারেই অপ্রস্তুত ছিল, সুতরাং প্রস্তুত ও পরিকল্পিত অবস্থায় আক্রমণের সুযোগ তারা পেয়েছে। কিন্তু তাই বলে ওপক্ষ আহত-নিহত হওয়ার কোন ব্যাপার ঘটবেই না, এটা স্বাভাবিক নয়। আর যেহেতু দু’জনকে বন্দী করে তাড়াহুড়ো করে পালাতে হয়েছে, তাই তারা কিছু চিহ্ন রেখে যাবেই। তার মধ্যে রক্তের দাগ একটি।
কিন্তু আহমদ মুসা পেছনের দরজা পর্যন্ত হেঁটেও কোন চিহ্ন বা অস্বাভাবিক কিছু পেল না। দরজা খুলে বাগানটাও দেখল। কিছুই পেল না।
ফিরে এল আবার সিঁড়ির গোড়ায়।
সিঁড়ির বাম পাশ ঘেঁষে আর একটা করিডোর সামনে চলে গেছে। এ করিডোরের ডান পাশ দিয়ে বরাবর একটা দেয়াল। আর বাম পাশ দিয়ে যে দেয়াল তার মাঝ বরাবর বড় একটা দরজা।
ঐ দরজার দিকে ইংগিত করে জেনারেল মোস্তফা কামাল বলল, ‘ওটাই আন্ডার গ্রাউন্ড ফ্লোরে নামার দরজা মি. খালেদ খাকান।’
করিডোরের মেঝে ও দু’ধারের দেয়ালও পাথরের। বর্গাকৃতি পাথরের জোড়াগুলোও ধবধবে সাদা।
করিডোর ও দুই দেয়ালের উপর সূঁচ খোঁজার মত তীক্ষ দৃষ্টি ফেলে এগিয়ে চলছে আহমদ মুসা। দরজা পর্যন্ত যেতে বার দুয়েক দাঁড়াল।
দরজার সামনে এসে আবার দাঁড়াল আহমদ মুসা।
দরজা কালো রং করা ষ্টিলের স্লাইডিং ডোর। ডিজিটাল, ম্যানুয়াল দু’ভাবেই খোলা যায়। তবে ম্যানুয়াল সিষ্টেম অফ করে ডিজিটাল সিষ্টেম চালু করতে হয়। আবার ডিজিটাল সিষ্টেম অফ করে ম্যানুয়াল সিষ্টেম চালু করা যায়।
পুলিশ প্রধান এগিয়ে এসে দরজাটা খুলে দিল। সরে গেল ষ্টিলের স্লাইডিং ডোরটা দেয়ালের ভেতরে।
দরজার পরেই সিঁড়ির কাছে বড় একটা ষ্ট্যান্ডিং। ষ্ট্যান্ডিং-এর ডান ও বাম পাশ দিয়ে দু’পাশের দেয়াল ঘেঁষে দু’টি প্রশস্ত সিঁড়ি দু’দিকে নেমে গেছে।
ষ্ট্যান্ডিং-এর সামনেটা রেলিং ঘেরা। রেলিং ষ্ট্যান্ডিং-এর সামনেটা ঘুরে এসে দু’পাশে সিঁড়ির সাইড রেলিং হয়ে নিচের ফ্লোর পর্যন্ত নেমে গেছে। সিঁড়ি ও রেলিং দু’টোই ব্ল্যাক ষ্টিলের।
আহমদ মুসারা ষ্ট্যান্ডিং-এ এসে দাঁড়াল।
নীচে বড় একটা হলঘর।
সিঁড়ি বরাবর অংশটুকু ছাড়া গোটা হলঘর লাল কার্পেটে ঢাকা। চারদিক ঘিরে সোফার সারি। মাঝখানটা ফাঁকা।
গোটা হলঘরটা উজ্জ্বল আলোয় প্লাবিত। ষ্ট্যান্ডিং এর উপরে দেয়ালে দু’পাশে দু’টি লাইট। সে আলোতে কালো সিঁড়িতে সাদা প্রতিফলনের সৃষ্টি করেছে।
আহমদ মুসা সিঁড়ি দু’টোকে একবার তীক্ষ দৃষ্টিতে দেখল। ডানদিকে সিঁড়ির দ্বিতীয় ষ্টেপের রেলিং সংলগ্ন একটা জায়গায় একটু ঝুঁকে পড়ে বলল, ‘আসুন, আমরা ডান পাশের এ সিঁড়ি দিয়ে নামি।’
সবাই নেমে এল নিচে।
সিঁড়ি থেকে নেমে হলঘরে ঢোকার মত প্রশস্ত একটা জায়গা দু’প্রান্তে বাদ রেখে সোফা সাজানো। সিঁড়ি প্রান্তের সোফার সারিটা সিঁড়ি যতটা প্রশস্ত তার চেয়ে কিছু বেশি জায়গা রেখে সাজানো হয়েছে।
‘শত্রুরা বিজ্ঞানীকে কিডন্যাপ করে আন্ডার গ্রাউন্ড এই ঘরে নেমে এসেছিল। নিশ্চয়ই এই ঘর বা এই আন্ডার ফ্লোরের কোন স্থান দিয়ে সুড়ঙ্গ পথ আছে।’
কথা শেষ করেই আহমদ মুসা তাকাল জেনারেল মোস্তফার দিকে। বলল, ‘জেনারেল মোস্তফা ও জেনারেল তাহির তারিককে এই বাড়ির ইন্টারনাল, এক্সটারনাল ডিজাইন, লে-আউট, নকশা যোগাড় করতে বলেছিলাম। সেটা পেলে সহজেই বের হতো সিঁড়ি পথটা কোথায়।’
‘জেনারেল তাহির আমাকে বলেছিলেন, সেসব যোগাড় হয়েছে। আমার অফিসে এই বাড়ি সংক্রান্ত ফাইলে সব আছে। বলব কি সে ফাইল আনতে?’ বলল জেনারেল মোস্তফা।
‘ঠিক আছে। আমরা আর একটু দেখি। না হলে ফাইলের সাহায্য নেয়া যাবে।’ আহমদ মুসা বলল।
‘মি. খালেদ খাকান, আপনি কিভাবে নিশ্চিত হলেন কিডন্যাপটা এই আন্ডার গ্রাউন্ড ফ্লোরে নেমে এসে তারপর হয়েছে?’ জিজ্ঞাসা জেনারেল মোস্তফার।
‘কিডন্যাপারদের এক বা একাধিক লোক আহত হয়েছে। কিডন্যাপ করে পালাবার সময় পথে আহতদের থেকে রক্তের ফোটা পড়েছে। কেউ যাতে তাদের অনুসরণ করার সুযোগ না পায়, এজন্যে তারা রক্তের দাগ মুছে ফেলার চেষ্টা করেছে। এর পরও করিডোরে দুই জায়গায় এবং সিঁড়িতে এক জায়গায় সামান্য পরিমাণে হলেও শুকিয়ে যাওয়া রক্তের দাগ আমি দেখেছি।’ আহমদ মুসা বলল।
‘এবার নিয়ে তিনবার এ পথে এলাম, আমার কিন্তু তা চোখে পড়েনি। ধন্যবাদ আপনার চোখের দৃষ্টিকে।’ বলল পুলিশ প্রধান নাজিম এরকেন।
‘চোখের খুব বেশি কৃতিত্ব নেই। আমি আগেই ধরে নিয়েছিলাম এ পক্ষের ৭ জনকে হত্যা করতে ওদের কাউকে না কাউকে নিশ্চয় অন্তত আহত হতেই হবে। আহতদের নিয়ে তাড়াহুড়ো করে পালাবার সময় পথে তাদের পালানোর চিহ্ন হিসেবে রক্তের দাগ ফেলে যাওয়া খুবই স্বাভাবিক। এই ক্লুটা খোঁজার চেষ্টার ফলেই তা পেয়ে গেছি।’
‘ধন্যবাদ খালেদ খাকান। আপনি ঠিক চিন্তা করেছেন। দুর্ঘটনার সাইক্লোনের মধ্যেও আপনার মাথা ঠান্ডা থাকে। আপনি একটা দৃষ্টান্ত।’ বলল জেনারেল মোস্তফা কামাল।
আহমদ মুসার নজর তখন সিঁড়ির গোড়ার দিকে। জেনারেল মোস্তফার কথা শেষ হতেই আহমদ মুসা বলল, ‘জেনারেল দেখুন দু’পাশের সিঁড়ির লেভেল থেকে সোফায় সারির দূরত্ব একটু বেশি মনে হচ্ছে না?’
‘হ্যাঁ, এতটা দূরত্ব না রাখলেও হতো। সিঁড়ি থেকে নেমে হলরুমে প্রবেশের জন্যে যথেষ্ট জায়গা রাখার পরও এতটা জায়গা শূন্য রেখে দেয়া ‘অডলুকিং’ মনে হচ্ছে।’ বলল জেনারেল মোস্তফা।
‘অডলুকিং লাগছে আরও এই কারণে যে এই ফাঁকা জায়গা কার্পেটে ঢেকে না দেয়ার মধ্যে কোন যুক্তি নেই। ঘরের সৌন্দর্য নষ্ট করে এটা কেন করা হয়েছে সেটা একটা বড় প্রশ্ন।’ পুলিশ প্রধান নাজিম এরকেন বলল।
‘এই সৌন্দর্যহানির কারণ আছে। আমার সন্দেহ সত্য হলে আন্ডার গ্রাউন্ড স্পেসটা এখানেই আছে।’ বলল আহমদ মুসা।
চমকে উঠল জেনারেল মোস্তফা, পুলিশ প্রধান নাজিম এরকেনসহ উপস্থিত পুলিশ অফিসাররাও। চোখ বড় বড় করে জেনারেল মোস্তফা ও নাজিম এরকেন এক সাথেই দু’জনে বলে উঠল, ‘এখানে সুড়ঙ্গ রয়েছে?’
‘হ্যাঁ, এখানেই রয়েছে এবং আমরা এই যে সিঁড়ির গোড়ায় দাঁড়িয়ে আছি, আমি মনে করছি এখানেই রয়েছে সুড়ঙ্গের মুখ।’ বলল আহমদ মুসা।
‘মি. খালেদ খাকান আপনি - ভবিষ্যত বক্তার মত কথা বলছেন। এখানে সুড়ঙ্গের মুখ আছে, কোনো চিহ্ন দেখে নিশ্চয় এ কথা বলছেন, সেটা কি?’
‘আমি নিশ্চিত নই, তবে বিভিন্ন অসঙ্গতি, অস্বাভাবিকতা ও নানা কার্যকরণ থেকে এ ধারণা করছি। আপনারা দেখুন ওপাশের সিঁড়ির গোড়ায় শেষ পিলার একটাই, কিন্তু এ পাশের প্রান্তে জোড়া পিলার। মূল পিলারের সাথে আরেকটা পিলার। দ্বিতীয় পিলারটার মাথা হাতল আকারের এবং সাইড রেলিং-এর টপ বরাবর আসা ষ্টিল বার থেকে বিচ্ছিন্ন। দ্বিতীয় পিলারটার গোড়া দেখুন গাড়ির গিয়ারের মত রাবারের কভার। এ থেকে এ সিদ্ধান্ত স্বতঃসিদ্ধ হয়ে উঠে যে এর একটা ফাংশন আছে। কি সেই ফাংশন? এ প্রশ্নের উত্তরেই আমার সিদ্ধান্ত, গোপন সুড়ঙ্গের মুখ এখানেই।’
কথা শেষ করেই আহমদ মুসা দুই ধাপ এগিয়ে গিয়ে শেষ দ্বিতীয় পিলারের শীর্ষ হাতল দু’হাতে ধরে জোরের সংগে নিচের দিকে টানল।
সংগে সংগে সিঁড়ির গোড়া থেকে পাশের মেঝের সোফার সারির পাশ ঘেঁষে একটা আয়তাকার অংশ সরে গেল। বেরিয়ে পড়ল আলোকজ্জল একটা সিঁড়ি মুখ।
‘ও গড! আলহামদুলিল্লাহ।’ জেনারেল মোস্তফা কামাল ও নাজিম এরকেন এক সাথেই বলে উঠল।
‘আসুন, নামি।’
বলে সুড়ঙ্গের সিঁড়ির দিকে পা বাড়াল আহমদ মুসা।
‘গ্যাস মাস্ক তো লাগবে না আহমদ মুসা?’ জিজ্ঞাসা জেনারেল মোস্তফার।
‘না মি. জেনারেল। আমার মনে হয় সুড়ঙ্গ স্বল্প দীর্ঘই হবে এবং সুড়ঙ্গে আলো-বাতাসের ব্যবস্থা নিশ্চয় আছে।’ বলল আহমদ মুসা।
‘চলুন মি. খালেদ খাকান।’
বলে তাকাল জেনারেল মোস্তফা পুলিশ প্রধান নাজিম এরকেনের দিকে।
পুলিশ প্রধান তার পাশেই দাঁড়ানো সিজলি এলাকার পুলিশ কমিশনারকে তাদের সাথে যেতে বলল। আর সবাইকে সব ফরমালিটি শেষ করে লাশগুলো নিয়ে যেতে বলল। আর কয়েকজন পুলিশকে থাকতে হবে এই বাড়ির পাহারায় এ নির্দেশও দিল।
পুলিশ কমিশনার পাশের পুলিশ অফিসারদের সব নির্দেশ দিয়ে সুড়ঙ্গে নামার জন্যে সবার সাথে পা বাড়াল।
সিঁড়ি দিয়ে প্রায় পনের ফিট নামার পর একটা প্রশস্ত ল্যান্ডিং পাওয়া গেল যেখানে চার পাঁচ জন লোক এক সাথে দাঁড়ানো যায়। এখান থেকে সুড়ঙ্গের শুরু। সিঁড়িটা অন্ধকার। ল্যান্ডিং দেয়ালে রয়েছে একটা সুইচ বোর্ড। তাতে চারটি সুইচ। প্রথম সুইচের নিচে দু’টি এ্যারো চিহ্ন মুখোমুখি আর দ্বিতীয় সুইচের নিচে দু’টি এ্যারো চিহ্ন বিপরীতমুখী। তৃতীয় সুইচের নিচে একটা মশালের ছবি আর চতুর্থ সুইচের নিচে আঁকা একটা ছোট্ট হাতপাখা। জেনারেল মোস্তফারাও দেখছিল সুইচ বোর্ড।
জেনারেল মোস্তফা বলল, ‘এ্যারো চিহ্নিত সুইচ দু’টি সুড়ঙ্গের সিঁড়ির মূখ বন্ধ করা ও খোলার জন্য, মশাল চিহ্নিত সুইচটা চেপে সুড়ঙ্গে আলো জ্বালাতে হবে, আর বাতাসের জন্যে চাপতে হবে পাখার সুইচ।’
আহমদ মুসা একটু হাসল। বলল, ‘সুইচ চাপুন জনাব।’
জেনারেল মোস্তফা একে একে তিনটি সুইচই চাপল। কিন্তু সিঁড়ির মুখ যেমন বন্ধ হলো না, তেমনি সুড়ঙ্গে আলো জ্বললো না, বাতাসও এল না।
জেনারেল মোস্তফা কামাল তাকাল আহমদ মুসার দিকে। বলল, ‘সুইচগুলো ওয়ার্ক করছে না মি. খালেদ খাকান।’
‘সুইচগুলোর মধ্যে নির্মাতারা একটা ধাঁধাঁ তৈরি করে রেখেছে জেনারেল মোস্তফা। এবার আপনি বিপরীত এ্যারো চিহ্নিত সুইচ টিপুন এবং মশাল ও পাখা চিহ্নিত সুইচ এক সাথে চাপুন এবং মশাল ও পাখার সুইচ আগে চাপতে হবে।’ আহমদ মুসা বলল।
তাই করল জেনারেল মোস্তফা।
এবার সুড়ঙ্গে আলো জ্বললো, বাতাস এল এবং সিঁড়ি মুখ বন্ধ হয়ে গেল।
বিস্মিত জেনারেল মোস্তফা বলল, ‘মি. খালেদ খাকান, আপনি এই ধাঁধাঁটি কি করে ধরলেন?’
‘সুইচ বোর্ডটার সবটা বিষয় আপনি ভালোভাবে দেখে বুঝার চেষ্টা করলে আপনিও ধরতে পারতেন। দেখুন, এ্যারো আঁকা সুইচ দু’টোর উপরে দু’টো সুইচের স্থান কভার করে লম্বা দু’টো এ্যারো আঁকা। বোর্ডের মত একই কালারের হওয়ার কারণে এ তীর দু’টো খুব তাড়াতাড়ি চোখে পড়ছে না। এর অর্থ, এই তীর দু’টির একটির শুরু প্রথম সুইচ থেকে, কিন্তু মাথাটা দ্বিতীয় সুইচে, আর দ্বিতীয় তীরটির শুরু দ্বিতীয় সুইচ থেকে, মাথাটা প্রথম সুইচে। এর অর্থ হলো, প্রথম সুইচটির কাজ পাওয়া যাবে দ্বিতীয় সুইচ থেকে। মশাল ও পাখা আঁকা সুইচের মাথার উপরে দেখুন বোর্ডের মত একই কালারে দু’টি সমান্তরাল সরল রেখা সুইচ দু’টোকে যুক্ত করেছে। এটার ইংগিত হলো, এ সুইচ দু’টির ফাংশন এক সাথে, সুতরাং এদের অফ, অন একই সময়ে করতে হবে।’ বলল আহমদ মুসা।
‘মশাল ও পাখার সুইচ দু’টি কেন আগে চাপতে হবে, সে কথা কিন্তু বলেননি।’ জেনারেল মোস্তফা বলল।
‘মশাল ও পাখার সুইচ আগে অন না করে সিঁড়ি বন্ধের সুইচ অফ করলে সিঁড়ি মুখের দরজা বন্ধ হতো না। নির্মাতারা এটাই চেয়েছেন। কারণ সিঁড়ি মুখের দরজা আগে বন্ধ হলে সিঁড়ি মুখ থেকে আসা আলো-বাতাস বন্ধ হয়ে যেত। তাতে সুড়ঙ্গ অন্ধকারে ডুবে যেত, বাতাসও বন্ধ হতো। এই সংকট যাতে না হয়, এ জন্যে মশাল ও পাখার সুইচ দু’টি আগে অন করার ব্যবস্থা করা হয়েছে।’ বলল আহমদ মুসা।
জেনারেল মোস্তফা কামাল একদিকে কথা শুনছিল, অন্যদিকে তার চোখ দু’টি আঠার মত লেগেছিল সুইচ বোর্ডের উপর। আহমদ মুসার কথা শেষ হতেই জেনারেল মোস্তফা বলে উঠল, ‘পেয়েছি মি. খালেদ খাকান, আগে-পরের ক্লুটা পেয়ে গেছি। এই দেখুন, মশাল ও পাখার দুই সুইচের পাশেই বোর্ডের কালো অংশে ‘২’ লেখা ও এ্যারো চিহ্নিত দুই সুইচের পাশে একইভাবে ‘১’ লেখা।
‘ধন্যবাদ জেনারেল মোস্তফা। এবার আসুন, আমরা সামনে অগ্রসর হই।’
বলে আহমদ মুসা হাঁটতে শুরু করল।
সবাই হাঁটতে শুরু করল আহমদ মুসার পেছনে পেছনে।
হাঁটা শুরু করে জেনারেল মোস্তফা বলল, ‘মি. খালেদ খাকান, আপনি গোয়েন্দা ট্রেনিং-এর অদ্বিতীয় এক শিক্ষক হতে পারেন।’
আহমদ মুসা জেনারেল মোস্তফার কথার দিকে কান না দিয়ে বলল, ‘জেনারেল, ওদের পালানোর পথ তো পেয়ে গেলাম, ওদের ধরার পথ এখন আমাদের দরকার। আইআরটি কিংবা বিজ্ঞানী কারও কোন ক্ষতি হতে দিতে আমরা পারি না। এজন্যে ওদের কোন সময় দেয়া যাবে না।’
‘ঠিক মি. খালেদ খাকান। ওরা সময় পেয়ে আমাদের দারুণ ক্ষতি হবে। কিন্তু সামনে আমি অন্ধকার দেখছি। বিশ্ববিদ্যালয়ের কেউ না কেউ এই গ্যাং মানে ‘থ্রি জিরো’র সাথে জড়িত। আমি মনে করি এদের খুঁজে বের করাকে আমাদের প্রথম গুরুত্ব দিতে হবে। সিদ্ধান্ত আপনাকেই নিতে হবে।’ বলল জেনারেল মোস্তফা।
‘এ পর্যন্ত আমি যা জানতে পেরেছি, বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন ছেলে তাদের সাথে প্রত্যক্ষভাবে জড়িত আছে। এই সুড়ঙ্গ দিয়ে পালানোর সময়ও ছেলেটি তাদের সাথে ছিল।’ আহমদ মুসা বলল।
‘এটা তো স্পেসেফিক ইনফরমেশন। তাকে লোকেট করতে পারলে আমরা অনেক দূর এগিয়ে যেতে পারবো।’ বলল জেনারেল মোস্তফা।
‘তবে তার নামটা আমি এখনও জানতে পারিনি। চেষ্টা করছি।’ আহমদ মুসা বলল।
কথা বলতে বলতে হাঁটছে তারা।
একশ’ গজও তখন পার হয়নি তারা। সুড়ঙ্গ শেষ হয়ে গেল, তারা একটা সিঁড়ির ল্যান্ডিং-এ এসে হাজির হলো।
আহমদ মুসা পেছনে তাকিয়ে বলল, ‘আমার অনুমান ভুল না হলে আমরা বাড়ির উত্তর প্রান্তের সীমানা দেয়ালের কাছে এসে গেছি। এ দেয়ালের বাইরে রয়েছে ওয়াটার সাপ্লাই প্ল্যান্ট, তার সাথে বেশ ফাঁকা জায়গাও রয়েছে।’
‘তার মানে ওরা এখানে পালাবার জন্যে গাড়ি রাখার ব্যবস্থা করেছিল। চলুন উপরে ওঠা যাক।’
‘সিঁড়ির গোড়ায় ল্যান্ডিং এর দেয়ালে আগের মত সুইচ বোর্ড এবং সুইচ বোর্ডের চারটি সুইচ পাওয়া গেল। এখানেও ধাঁধাঁ সেই একই রকমের।
আহমদ মুসারা সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠে গেল।
সিঁড়ি মুখ যেখানে শেষ হয়েছে, সেটা ভাঙা, পরিত্যক্ত সামগ্রী ফেলার একটা ঘর। সুড়ঙ্গ মুখ জুড়ে রয়েছে এই ঘরটির মেঝেরই একাংশ।
আর ঘরটির উত্তর দেয়ালটাই আসলে সীমান্ত দেয়াল।
আহমদ মুসা ঘরে উঠে চারদিকে একটু তীক্ষ্ণ দৃষ্টি ফেলতেই দেখতে পেল, ঘরের উত্তর দিকের অর্থাৎ সীমান্ত দেয়ালের গায়ে দেয়াল রংয়ের একটা ষ্টিলের দরজা। এখানেও দেখল দরজার গায়ে দু’টি দেয়াল রংয়ের বোতাম। দুই বোতামের নিচে আঁকা এ্যারো চিহ্নের সেই ধাঁধাঁ।
আহমদ মুসারা দরজা খুলে বাইরে বেরিয়ে এল। বাইরে গাড়ির চাকার দাগও তাদের খুব সহজেই চোখে পড়ল।
‘আমাদের দুর্ভাগ্য, কিডন্যাপারদের এই সাফল্যের কারণ তাদের সফল পরিকল্পনা। তারা বাড়ির নকশা হাত করতে সফল হয়েছে। জেনারেল মোস্তফা, আপনারা দেখুন বাড়ির নকশা কারা বের করল, কিভাবে বের করল।’
‘অবশ্যই দেখছি। কিন্তু বলুন আমরা এগোবো কোন পথে? তাড়াতাড়ি কিছু করতে না পারলে ফলাফল ভয়াবহ হতে পারে। তুরষ্কও বেকায়দায় পড়েছে ওআইসি’র অন্যান্য সদস্যের কাছে।
গম্ভীর হয়ে উঠল আহমদ মুসার মুখ। বলল, ‘এই বিপর্যয়ের ভার আমার উপরই বর্তায় বেশি।’
‘না মি. খালেদ খাকান। আপনি যথাসাধ্য চেষ্টা করেছেন। আপনি যদি বিজ্ঞানী ড. আন্দালুসিকে এখানে আনার ব্যবস্থা না করতেন, বাড়িতেই যদি তাঁকে রাখা হতো, তাহলে তার স্ত্রী ও বাচ্চারাও আজ তার সাথে বন্দী হতো। সেটা হতো অত্যন্ত ভয়াবহ। তাতে বিজ্ঞানী তাদের সব কথা মানতে বাধ্য হয়ে তাদের হাতের পুতুলে পরিণত হতে পারতেন। সবকিছু আমাদের হাতছাড়া হয়ে যেত। বিজ্ঞানী কিডন্যাপ হলেও এই মহাদুর্যোগ থেকে আল্লাহ আমাদের বাঁচিয়েছেন।’ বলল জেনারেল মোস্তফা।
আহমদ মুসার চোখে-মুখে তখন গভীর চিন্তার ছাপ। যেন কোন গভীর ভাবনায় ডুবে গেছে আহমদ মুসা।
জেনারেল মোস্তফা থামলেও আহমদ মুসা কোন কথা বলেনি।
জেনারেল মোস্তফাই আবার কথা বলল, ‘কি ভাবছেন মি. খালেদ খাকান?’
আহমদ মুসা ধীরে ধীরে মুখ তুলে জেনারেল মোস্তফার দিকে তাকাল। বলল, ‘আমাকে এখুনি যেতে হবে। চলুন ফিরে যাই, গাড়ি তো ওখানে।’
‘চলুন। কিন্তু আপনি পরবর্তী পদক্ষেপ নিয়ে কি ভাবছেন, আমাদের আপনার কিছু বলার আছে কিনা? সময় নষ্ট করা যাবে না কিছুতেই।’
সীমানা ওয়ালের দরজা বন্ধ করে ঘর থেকে বেরিয়ে সবাই হাঁটা শুরু করেছে গাড়ির কাছে আসতে।
হাঁটতে হাঁটতে বলল আহমদ মুসা, ‘জেনারেল মোস্তফা, জনাব নাজিম এরকেন, আপনারা একটু চেষ্টা করুন বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের জ্ঞান ফিরে এলে তাদের কাছ থেকে জানুন কিডন্যাপকারীদের কাউকে তারা চেনে কিনা। নিশ্চয় তাদের সাথেরই কেউ কিডন্যাপারদের একজন বা কিডন্যাপারদের লোক। বিস্তারিত জিজ্ঞাসাবাদ করলে কোন ক্লু পাওয়া যাবেই। বাড়ির নকশা কারা পূর্ত দফতর থেকে যোগাড় করেছে, তাদের চিহ্নিত করতে পারলেও কিডন্যাপারদের কাছে পৌছা সম্ভব হবে। তাদের গাড়ি দু’টির ষ্টিয়ারিং হুইলে দু’জন ড্রাইভারের ফিংগার প্রিন্ট পাওয়া যাবে, তাও সাহায্যে আসতে পারে। আর আমিও একটা ক্লু সামনে রেখে বেরুচ্ছি। কিন্তু আল্লাহর সাহায্য ছাড়া কিছুই করতে পারবো না।’
‘নিশ্চয় আল্লাহ সাহায্য করবেন। আমরা ভয়ংকর এক বিপদের মধ্যে আছি। আল্লাহ আমাদের একমাত্র ভরসা।’ বলল জেনারেল মোস্তফা।
‘অবশ্যই।’ বলল আহমদ মুসা।
তারা পৌছে গেছে গাড়ির সামনে।
আহমদ মুসা এগোল গাড়ির দিকে।
জেনারেল মোস্তফা ছুটে এল আহমদ মুসার কাছে। বলল, ‘আপনি হেলিকপ্টারে যেতে পারেন মি. খালেদ খাকান।’
‘দরকার নেই জেনারেল। আমার নামে বরাদ্দ হেলিকপ্টার তো অফিসে আছে। দরকার হলে নিয়ে নেব। কিন্তু এই মুহূর্তে আমার পায়ের তলায় মাটি দরকার।’ হেসে বলল আহমদ মুসা।
জেনারেল মোস্তফা ও নাজিম এরকেনও হেসে ফেলেছে। জেনারেল মোস্তফা বলল, ‘দুঃখের মধ্যেও আপনি হাসতে পারেন, হাসাতেও পারেন মি. খালেদ খাকান। আমরা এখন হেলিকপ্টারে উঠব বটে, কিন্তু আমাদের পায়ের তলাতেও মাটি দরকার।’
‘পায়ের তলায় মাটি না থাকলে হেলিকপ্টার আকাশে উড়বে কি করে! হেলিকপ্টার আকাশে উড়ার জন্যে যেমন মাটি দরকার, তেমনি ল্যান্ড করার জন্যেও মাটি প্রয়োজন।’ হেসেই বলল আহমদ মুসা।
‘ধন্যবাদ মি. খালেদ খাকান। আল্লাহ আমাদের সাহায্য করুন।’
‘ধন্যবাদ। আসসালামু আলাইকুম।’ বলে আহমদ মুসা গাড়ির দিকে হাঁটতে লাগলো।
‘ওয়া আলাইকুম সালাম।’ বলল জেনারেল মোস্তফা। সেও ঘুরে দাঁড়িয়ে হাঁটতে শুরু করেছে।
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now