বাংলা গল্প পড়ার অন্যতম ওয়েবসাইট - গল্প পড়ুন এবং গল্প বলুন
বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ

প্রাকপুরুষের চশমা-০১

"ভৌতিক গল্প " বিভাগে গল্পটি দিয়েছেন গল্পের ঝুরিয়ান রিয়েন সরকার (০ পয়েন্ট)

X প্রাকপুরুষের চশমা (প্রথম পর্ব) লিখেছেনঃ সানজিদা সুলতানা সুমা জীবনের সায়ান্নে উপস্থিত এক প্রবাসী বাংলাদেশী দম্পতী আরিফ আর সুজানা। পারিবারিক সম্পর্কে ওরা ফুপাতো ভাইবোন ছিলো বলে সেই ছোটবেলা থেকেই একসাথে বেড়ে উঠা। তারপর কৈশরে প্রেম, যৌবনে বিয়ে, তারপর জন্ম নিলো দুটো দ্বিভ্রুণীয় জমজ ছেলে- মেয়ে। সন্তানদের ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করেই বাংলাদেশ ছেড়ে পোল্যান্ডে পাড়ি জমানো। প্রবাসে ব্যাস্ত পেশাগত জীবনে সুজানা ছিলো একজন সফল ব্যাংকার আর আরিফ ছিলো একজন প্রখ্যাত পশুচিকিৎসক। পেশাগত জীবন আর সন্তানদের বড় করে তুলতে যেয়ে কোনদিকে যে ওদের যৌবনটা পেরিয়ে গেছে তা তাদের খেয়ালই ছিলো না। কিন্তু তাদের সদ্য চাকুরী পাওয়া লেকচারার মেয়েটার যেদিন ধুমধাম করে বিয়ে হয়ে গেলো সেদিনই ব্যাপারটা ওদের মাথায় ঢুকলো। অনেক তো হলো চাকুরী বাকরী। ওরা সিদ্ধান্ত নিলো এবার এসব ছেড়ে দিয়ে বাকিটা জীবন কোন সমুদ্রতীরে এক বাংলো কিনে তাতেই কাটিয়ে দেবে। কিন্তু ঘাড় তেড়া ছেলেটা তাতে বাধ সাধলো। তাদের মনোচিকিৎসক ছেলেটা কিছুতেই বাবা মা কে একা ছাড়তে রাজি নয়। ওর মতে এই বয়সে দুই বুড়োবুড়ি একা থাকলে তাদের ডিপ্রেশনে পেয়ে বসতে পারে। কিন্তু সুজানার মতে ছেলেটা আস্ত একটা পাগল। পাগলের চিকিৎসা করতে করতে নিজেই কবে যেন পাগল হয়ে গেছে। সুজানা চেয়েছিলো ছেলে মেয়ে দুটোর একসাথে বিয়ে দিবে। ছেলেটার জন্যে কন্যাও খুজে রেখেছিলো সে। কিন্তু পাগলাটার একই কথা। এত তাড়াতাড়ি বিয়ে ও করবে না। যে ছেলে মা বাবার একাকীত্ব ঘোচানোর জন্যে একটা বউ এনে দিতে পারে না সে আবার মা বাবার একাকীত্বের কথা ভেবে দুশ্চিন্তা করছে! এ যেন কুমিরের মায়া কান্না! সুজানার ইচ্ছা হয় ছেলেটার গালে সশব্দে একটা চড় বসিয়ে দিতে। কিন্তু বাঁদরটা এতো লম্বা হয়ে গেছে যে ও গালটা ঠিক মতো নাগাল পায় না। অগত্যা সেই চিন্তাটা ঝেড়ে ফেলে কেবল খেঁকিয়ে উঠে, "বটে রে। এই ইট কাঠের খাঁচায় আর আমি এক মুহুর্তও থাকছি না। তোর বাপ যদি থাকতে চায় থাকুক। আমি চললাম।" ওদিকে আরিফেরও শহুরে জীবনে ঘৃনা ধরে গেছে। সে এটা থেকে পালিয়ে বাঁচতে চাইছে যেন। ও সুজানাকে সমর্থন দিয়ে ছেলেটাকে বলে, "আমাদের জন্যে তোকে ভাবতে হবে না খোকা। বরং এই শহুরে জীবনেই আমরা ডিপ্রেশনে আছি। আর ভুলে যাস নে তোর বাপটাও একটা ডাক্তার। ডিপ্রেশন কিভাবে এড়িয়ে চলতে হয় তা আমিও একটু আধটু জানি।" দুসপ্তাহের মধ্যেই ওরা ওয়ারশো থেকে দুরে, সুদুর বাল্টিসে একটা নির্জন বাংলো কিনে নেয়। মালপত্র গোছিয়ে চলে যাবার ঠিক আগ মুহুর্তে ওদের ছেলেটা ছুটে আসে ওদের বিদায় জানাতে। এসেই প্রথমে ও কৈফিয়ত দেয়, "সরি বাবা। হসপিট্যালে আজ অনেক কাজ ছিলো, তাই ফিরতে একটু দেরি হয়ে গেছে।" সুজানা মুখ বাঁকায়। কি ছেলে রে বাবা! কই বৃদ্ধ মা বাবা কে সবকিছু গোছগাছ করতে একটু সাহায্য করবে, তা না। ও আছে ওই পাগলদের সাথে পাগলামি নিয়ে। ওর চড় মারার ইচ্ছাটা আরো প্রকট হয়। কিন্তু ততক্ষণে ছেলেটা ওদের ব্যাগ ল্যাগেজ ঘাড়ে তুলে গাড়ির দিকে হাটা ধরেছে। ওর চোখ যায় আরিফের দিকে। বুড়োটা এখনো চশম মুছতে ব্যাস্ত। সুজানার মনে হয় আরিফ বোধ হয় ৬৫ বছর জীবনের অন্তত অর্ধেকটাই কেবল চশমার পেছনেই কাটিয়ে দিয়েছে। ছোটবেলায় পড়তো মাইনাস পাওয়ারের একটা পিচ্চি চশমা, যৌবনে রঙ বেরঙের সান গ্লাস, আর এখন বার্ধক্যে একটা হাই পাওয়ারের পুরো কাঁচের চশমা। সে জীবনে এই হাদাটাকে খুব কমই চশমা ছাড়া থাকতে দেখেছে। সুজানা এবার ছেলের বদলে তার বাপের দিকে খেঁকিয়ে উঠে, "কিরে? তুই যাবি না? নাকি সারাদিন এই চশমা খুঁচিয়েই পার করে দিবি? " ছোটবেলা গড়ে উঠা বন্ধুত্বের রেশটা পরবর্তীতে ওদের দুজনের কেউই কাঁটিয়ে উঠতে পারে নি। তাই ওদের কথার মধ্যে তুই তোমারিই বেশী চলে। শয়তান বুড়োটা এবার টিম্পনি কেটে বলল, "আরে, কাটতে দে না দিনটা। দিন না কাঁটলে সোহাগরাত আসবে কি করে? " বয়সের ভারে সুজানার মেজাজটা খিটখিটে হয়ে গেছে। এমনি মিষ্টি টিম্পনিটাও ওকে রাগিয়ে দিলো। সুজানা: "লম্পট বুইড়া। এই বয়সে সোহাগরাতের স্বপ্ন দেখিস! বুড়ো বয়সে ভিমরতি!" আরিফও এই অনাকাঙ্খিত দুর্ব্যবহারটা সহ্য করতে পারে না। সেও পাল্টা খেঁকিয়ে উঠে, "আমি যদি বুইড়া হই তো তুই আস্ত একটা কুটনি বুড়ি।" সুজানা পুরো চটে গেলো। যৌবনটা যে পেরিয়ে গেছে সেটা ও কিছুতেই মেনে নিতে চায় না। সুজানা: "কে বলেছে তোকে আমি বুড়ি হয়ে গেছি? জানিস, অডিশন দিলে এখনো হলিউডের নায়িকা হতে পারি। আর তুই কি না বলিস আমি বুড়িয়ে গেছি! বুড়া ধাম! সবাইকে নিজের মতো বুড়ো ভাবছিস কেন? " আরিফ: " এই বয়সে হলিউডের নায়িকা হবি ,তুই! আচ্ছা, শেষ কবে তুই আয়নায় নিজের চেহারা দেখেছিলি? ২০-৩০ বছর আগে বুঝি?" সুজানা রেগে মেগে আরো কিছু একটা বলতে যাচ্ছিলো কিন্তু ছেলেটা ফিরে আসায় ও থেমে গেলো। ছেলেটা ফিরে এসে বলল, "তোমাদের ল্যাগেজগুলি গাড়িতে রেখে এসেছি মা। আর ওষুধের বাক্স গুলি গাড়ির ড্যাশবোর্ডে আছে। তোমাদের ফোন দুটোও সেখানেই। প্রতিদিন বিকালে আমি তোমাদের ফোন দিবো। ধরতে ভুল না কিন্তু। সুজানার কেন জানি ছেলেটার প্রতি মায়া পড়ে গেলো। ছেড়ে যেতে ইচ্ছা করছে না। সুজানা: "আয় না রে বাবা। তুই ও চল আমাদের সাথে। প্রথম কটা দিন আমাদের সাথেই থাকবি।" ছেলেটা আমতা আমতা করে বলল, "আসলে হয়েছে কি মা, আমাদের হসপিট্যালে একজন ডাক্তার গর্ভবতী, অন্যজন হানিমুনে গেছে। বিশজনের কাজ আমরা মাত্র ১৮ জনে চালাচ্ছি। এই অবস্থায় যে ছুটি ম্যানেজ করা সম্ভব না।" সুজানার মেজাজটা আজ সকাল থেকেই বিগড়ে আছে। তার উপর আরিফ ওটাকে আরো উসকে দিয়েছে। এতক্ষণ ওর রাগ ঝাড়বার যথার্থ সুযোগ পাচ্ছিলো না। কিন্তু এবার পেয়ে গেলো। সুজানা: "তোমার সহকর্মীদের একজন প্রেগন্যান্ট, অন্যজন বিয়ে করে হানিমুনে গেছে। কিন্তু তুমি কি করেছো এতোদিন? সারাক্ষণ ঘোড়ার ঘাস কাট না কি? ওদের মতো একটা বিয়ে করতে পারো না? অপদার্থ ছেলে কোথাকার।" ছেলেটা আমতা আমতা করে বলল, "না মা। আমিও বিয়ে করবো। কিন্তু এখন একটু ব্যাস্ত আছি তো তাই। আসলে সময় হয়ে উঠছে না।" সুজানা আবারো খেকিয়ে উঠতে যাচ্ছিলো, কিন্তু আরিফ ওকে থামিয়ে দিয়ে বলল, "থাক না সুজানা। এখন এসব নিয়ে কথা বলছিস কেনো। খোকার কি বিয়ের বয়স পেরিয়ে যাচ্ছে নাকি? প্রথমে ওর জীবনকে একটু গোছিয়ে নিতে দে। তারপর দেখবি ও নিজেই একটা মেয়েকে বিয়ে করে নিয়ে এসেছে।" সুজানা বুঝে যায়, বাপ ছেলে আজ এক হয়ে গেছে। এদের বিরুদ্ধে একা কথায় পেরে উঠবে না সে। তাই কথা থামিয়ে, অগ্নি দৃষ্টি দিয়ে ভষ্ম করে দিতে চায় ওদের। ছেলেটা মাথা নিচু করে মেঝের দিকে তাকিয়ে থাকে। কিন্তু বজ্জাত বুড়োটা দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ফোকলা দাঁত বের করে হাসতে শুরু করে। ছেলেটা সামনে দাঁড়ানো না থাকলে এক ঘুসি মেরে বুড়োর সবগুলি দাঁত পেটের ভেতর চালান করে দিতো সুজানা। কিন্তু বাচ্চাদের সামনে মারামারিতে জড়াতে চায় না সে। তাই বুড়োর বিদঘুটে হাসিটা অনেক কষ্টে মুখ বুজে হজম করলো। বুড়োটা ইতিমধ্যেই গাড়ির দিকে হাটা ধরেছে। অগত্যা বাধ্য হয়েই সুজানাও বুড়োর পিছন পিছন হাটতে হাটতে গাড়িতে উঠলো। গাড়িতে উঠে আরিফ হন্য হয়ে ইগনিশন কি খুজতে শুরু করে। কোথায় যে রেখেছিলো ওটা মনে আসছে না। ইদানিং কিছুই মনে থাকে না তার। তাই গাড়ির চাবিটা নিজের সাথে না রেখে গাড়ির ড্যাশবোর্ডেই রেখে যায় সে। কিন্তু আজ সারাটি ড্যাশবোর্ড তন্নতন্ন করেও চাবিটা পেলো না। আচ্ছা, চাবিটা ঘরে ফেলে আসে নি তো? অগত্যা দরজার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা ছেলেটার দিকে ও হাঁকিয়ে উঠে বলে, " এই খোকা, ঘরে যেয়ে দেখতো আমি ড্রয়ারে চাবিটা ফেলে এসেছি কি না। চাবিটা যে কোথায় গেলো। ধ্যাত।" ছেলেটা ফের ঘরে ঢুকলো চাবি খুঁজতে। ছেলেটা চোখের আড়াল হতেই আরিফ শার্টের বুকপকেট থেকে চাবি বের করে গাড়িটা স্টার্ট দিলো। তারপর আক্সেলারেটর দাপিয়ে দ্রুত পার্কিংলট থেকে বেরিয়ে এলো। আরিফের এই অভিনয়টা সুজানার কাছে নতুন কিছু নয়। ও সব সময়ই বিদায়ের মুহুর্তটাকে এড়িয়ে যেতে চাইতো। ও কারো ফেয়ারওয়েল বা ফিউনেরালে যেতো না। তাই বলে যে ও একটা পাষাণ হৃদয়ের অধিকারী তা কিন্তু নয়। বিদায়ের মুহুর্তে বিচ্ছেদের যাতনা ওর নরম হৃদয়টাকে ভেঙ্গে টুকরোটুকরো করে দেয়। তাই সে বিদায়কে এড়িয়ে চলে। ছেলেটার কাছ থেকে যেন আবার বিদায় নিতে না হয় তাই ওর এই ছলনা। গাড়ি চালাতে চালাতে আরিফ একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে। ওদিকে সুজানার চোখ দুটো ও ধীরেধীরে ঝাপসা হয়ে যায়। তারপর কুঁচকে যাওয়া গাল বেয়ে মুক্তোদানার মতো এক ফোটা অশ্রুকণা গড়িয়ে পড়ে। (চলবে)


এডিট ডিলিট প্রিন্ট করুন  অভিযোগ করুন     

গল্পটি পড়েছেন ২১১৪৬ জন


এ জাতীয় গল্প

গল্পটির রেটিং দিনঃ-

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now