বাংলা গল্প পড়ার অন্যতম ওয়েবসাইট - গল্প পড়ুন এবং গল্প বলুন
বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ

মরিচীকা

"রোম্যান্টিক" বিভাগে গল্পটি দিয়েছেন গল্পের ঝুরিয়ান রিয়েন সরকার (০ পয়েন্ট)

X গল্পের নাম: মরিচীকা লেখক: আবিদ হোসেন জয় |১| পূব দিকের দেয়ালে ঝুলানো আয়নাটা বেশ বিশাল। যেমন তার দৈর্ঘ্য তেমন তার প্রস্থ। রফিক সাহেব অপ্রস্তুত ভঙ্গিতে আয়নার দিকে তাকালেন। নিজেকে আজ বেশ অচেনা লাগছে। মাথা ভর্তি ঘন চুলে আজ কোন সাদা রেখা নেই। সবগুলো চুল কালো। বেশ কালো। বয়স যেন বিশ বছর কমে গেছে। শুধু শরীরের ভেতরকার দূর্বলতাগুলো কমেনি। রফিক সাহেব আয়নার সামনে থেকে সরে এলেন। কলিংবেল বাঁজছে। এ বাড়ির কলিংবেলটা বেশ বিরক্তিকর। কানে লাগে। রফিক সাহেব অলস পায়ে দরজার নিকট পৌছালেন। দরজা খুললেন কেউ নেই। দরজার ওপারে কারও উপস্থিতি চোখে পড়ছে না। রফিক সাহেব চোখে মুখে বিরক্তিকর ছাপ নিয়ে দরজা লাগালেন। এ ঘটনা রফিক সাহেবের কাছে নতুন কিছু নয়। মাঝেমাঝেই কলিংবেল বাজে। সে তরিঘরি করে দরজা খুলেন। কিন্তু কারও অস্তিত্ব চোখে পড়ে না। তখন মেজাজ চড়ে বসে। কড়া করে এক কাপ চা খান। অতঃপর মাথা ঠান্ডা হয়। রফিক সাহেবের এখন চা খেতে ইচ্ছে করছে । কড়া করে এক কাপ চা। লিকার বেশি চিনি কম। চা এর কথা ভাবতেই মনে পড়ল বাসায় চিনি নেই। গত রাতে চিনি শেষ হয়ে গেছে। বাড়িওয়ালা কবির সাহেব এসেছিলেন। তিনি প্রতি সপ্তাহে একবার করে আসেন। ঘরে ধুকেই প্রকান্ড বিছানায় পা তুলে বসেন। গল্প করেন। গুনে গুনে দু'কাপ চা খান। তারপর বিদায় হন। এখন তাকে চিনি আনতে হবে। তারসাথে দোকানের বাকি শোধ করতে হবে। ১০০০টাকা বাকি পড়ে আছে। মুদির দোকানদার আবুল মিয়া সুযোগ পেলেই তাকে খোঁচা দেয়। দুনিয়ার সব কিছু সহ্য হলেও রফিক সাহেবের খোঁচা সহ্য হয় না। চাবুকের মত আঘাত লাগে। মাঝেমাঝেই তার ইচ্ছা করে আবুল মিয়ার মাথায় লাঠি দিয়ে প্রচন্ড জোরে আঘাত করতে। কিন্তু চাইলেই সব কিছু করা যায় না। দেশেতো আইন বলে একটি জিনিস আছে। রফিক সাহেব মানি ব্যাগ পকেটে নিলেন। পাতলা একটি গেন্জির উপর শার্ট পড়লেন। বাইরে ঠান্ডা। শুধু শার্ট পড়ে যাওয়া ঠিক হবে না। হঠাৎ কলিংবেল বেজে উঠলো। রফিক সাহেবের মেজাজ আবারও চড়ে বসলো। রফিক সাহেব ভুরু কুঁচকে তাকালেন দরজার দিকে। এবার দরজায় ঠক ঠক শব্দ হচ্ছে। পর পর দু'বার ঠক ঠক শব্দ। দরজার ওপাশে দাড়িয়ে থাকা মানুষটি নিঃসন্দেহে ভদ্র। রফিক সাহেবের মতে যারা দরজার ওপাশে দাড়িয়ে বিনয়ের সহীত পরপর দু'বার ঠক ঠক শব্দ করে তারা বেশ ভদ্র হয়। রফিক সাহেবের মাথা ঠান্ডা হয়ে গেছে। সে ভীষন শান্ত গলায় জিজ্ঞেস করলেন,"কে?" । আর কোন ঠক ঠক শব্দ হল না। কলিংবেল বাজলো না। শুধু দরজার ওপাশ থেকে তরঙ্গ আকারে এক কন্ঠ ভেসে এলো "স্যার আমি লাবিব"। রফিক সাহেব দ্রুত দরজা খুললো। লাবিব দাড়িয়ে আছে। গায়ে কালো প্যান্ট আর নীল শার্ট। শার্টের প্রত্যেকটি বোতাম যত্ন সহকারে লাগানো। লাবিব অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে রফিক সাহেবের চুলের দিকে। রফিক সাহেব তার প্রকান্ড মুখের এক ক্ষুদ্র অংশে কিঞ্চিত হাসি নিয়ে বললেন," এসো লাবিব ঘরে এসো,বাইরে থেকে এসেছো পাখা ছেড়ে দিয়ে বিছানায় গিয়ে বসো।" লাবিব বাইরে স্যান্ডেল রেখে ঘরে ধুকলো। পাখা ছাড়লো। বাধ্য ছেলের মতো বিছানায় গিয়ে বসলো। রফিক সাহেব দরজা বন্ধ করে লাবিবের দিকে তাকিয়ে বললেন, "আজ মাথায় কলপ দিয়েছি,নাম সুপারস্টার,প্যা কেটের উপর সাদা অক্ষরে লিখা ১০ মিনিটেই এ্যাকশেন,কেমন লাগছে আমাকে বলো লাবিব"। লাবিব ভুরু কুঁচকে তাকিয়ে আছে রফিক সাহেবের দিকে। রফিক সাহেব সাধারনত তাকে তুমি করে বলে না। ছাত্রজীবন থেকে বেশিরভাগ সময় স্যারের মুখে তুই শুনেই অভ্যস্থ। লাবিব তুমি বলার কারনটা ধরতে পারছে না। পৃথিবীতে এক শ্রেনীর মানুষ আছে, শিক্ষক শ্রেনীর, তারা কখন তুমি বলবে আর কখন তুই বলবে তা বোঝা বড়ই মুশকিল। লাবিব তার চিন্তার অবসান ঘটাল। এক চিলতে হাসি দিয়ে বললো,"স্যার দারুন লাগছে আপনাকে । কিন্তু হঠাৎ চুলে কলপ? বিশেষ কোন কারন আছে কি?" রফিক সাহেব শব্দ করে হাসলেন। -"বিশেষ কারন তো আছেই। তুমি যখন এসেছো তোমায় বলছি শোনো, আমি তো রিটায়ার্ড করেছি বেশ কয়েক বছর হয়েছে এখন হাতে কোন কাজ নেই। তাই একটি মিশনে নেমেছি। ইচ্ছে পূরনের মিশন।" লাবিব কিঞ্চিত আগ্রহ প্রকাশ করে বলল, "কি ইচ্ছে স্যার?" রফিক সাহেব বলল," আপাতত তিনতে ইচ্ছে আছে। প্রথম ইচ্ছে যৌবনকালে ফিরে যাওয়া,নামের পাশ থেকে সাহেব শব্দটি উঠে যাবে,আমি হব রফিক অনলি রফিক। এই ইচ্ছে পূরনের কাজ শুরু হয়ে গেছে,আপাতত চুলে কলপ দিয়েছি বাকি কাজ পরে হবে।" লাবিব কৌতুহল আর বিস্ময় মিশ্রিত স্বরে বলল," স্যার দ্বিতীয় ইচ্ছে কি?" রফিক সাহেব চোখে মুখে চিন্তার ছাপ নিয়ে এলেন। চিন্তিত ভঙ্গিতে মেঝের দিকে তাকিয়ে বললেন," জেলে যাওয়া, এক রাত জেলে কাটাব,নিদ্রাহীন রজনী কাটবে,চা এর ব্যবস্থা থাকবে,কড়া চা,লিকার বেশি চিনি কম আর থাকবে রবীন্দ্রসংগীতের ব্যবস্থা। রবীন্দ্র আসর বসাব আমি জেলে, রবীন্দ্র আসর।" লাবিব বলল,"এতো বেশ ভয়ংকর ইচ্ছে" -"হুম ভয়ংকর। যেসব ইচ্ছে গুলো পূরন হওয়ার সম্ভাবনা কম থাকে সেগুলো সাধারনত ভয়ংকরই হয়। এবার শুনো তৃতীয় ইচ্ছে। কেউ একজন প্রতিদিন আমার বাসার কলিংবেল দিয়ে চলে যায়। আমার ধারনা এটা বাড়িওয়ালা কবির সাহেবের মেয়ের কাজ। নিলা ফিলা কি যেন নাম মেয়েটার। আমি চাই ও নিজে এসে আমার কাছে ক্ষমা চাবে আর আমি এক হাত ঐ মেয়ের মাথার উপরে রেখে বলব,যাও মা ক্ষমা করে দিলাম"। লাবিব চিন্তিত ভঙ্গিতে স্যারের মুখের দিকে কিছুক্ষন তাকিয়ে রইল। দৃষ্টি না সরিয়েই ক্লান্ত স্বরে বলল," স্যার আমি আপনার এই মিশনের একটা অংশ হতে চাই। আমি আপনাকে সাহায্য করব"। রফিক সাহেব হাসিমুখে বললেন," ধন্যবাদ। তুমি কি চা খাবে?" -"খাব স্যার"। -"রং চা নাকি দুধ চা?" -"স্যার রং চা"। -"চিনি কম না বেশি?" -"স্যার চিনি বেশি" -"বেশি চিনি খাওয়া শরীরের জন্য খারাপ" -"তাহলে স্যার চিনি কম"। -" চিনি কম খেলেও সমস্যা আছে। চিনি কম খেলে তোমার শরীর ভাল থাকবে ঠিকই কিন্তু তৃপ্তি মেটবে না ,মনের তৃপ্তি বলে একটা ব্যাপার আছে, চা খেয়ে যদি সেই তৃপ্তিই না মেটে তবে চা খেয়ে লাভ কি!এবার বলো চিনি কম দিব নাকি বেশি?" লাবিব বুঝতে পারল সে রফিক সাহেবের খেলার একটা অংশ হয়ে গেছে । রফিক সাহেব মানুষকে কনফিজ্ড করতে পছন্দ করেন। এটা তার পুরোনো খেলা। লাবিব চোখে মুখে কৃত্রিম চিন্তার ছাপ এনে বলল,-"স্যার আমি কনফিউজ্ড"। রফিক সাহেব এক চিলতে হাসি দিয়ে বললেন,"স্মার্ট এ্যান্সার।তুমি বরং দোকান থেকে এক কাপ চা খেয়ে নিও এমনিতেও আমার বাসায় এখন চিনি নেই।" লাবিব বোকা বোকা ভাব নিয়ে তাকিয়ে রইল রফিক সাহেবের দিকে। খেলার শেষটা যে এরকম হবে সে তা ভাবেনি। লাবিব উঠে দাড়াল । স্যারের পা ছুঁয়ে সালাম করে বলল,"স্যার আমি এখন যাই। আমাদের একটা স্কুল আছে। নাম শান্তি নিকেতন। সেখানে কিছু গরীব বাচ্চাদের পড়াই। আমাকে এখন ক্লাস নিতে হবে।" রফিক সাহেব বললেন,"আমিও যাই চলো। একটা কেমিস্ত্রি ক্লাস নিয়ে আসি। ওদের কেমিস্ত্রি জানার দরকার আছে,যে ক্যামিস্ত্রি পারে সে সব পারে"। -"স্যার ওরা অনেক বাচ্চা। কেমিস্ত্রি ফিজিক্স বুঝে না। রফিক সাহেবের মনটা খারাপ হয়ে গেল। অনেক দিন ক্লাস নেওয়া হয় না। ক্লাসরুমের সেই পুরেনো কোলাহল এখনও তার কানে বাজে। রফিক সাহেব শান্ত গলায় বললেন,"আচ্ছা যাও তুমি"। লাবিব বের হয়ে গেল। ঘরটা আবার খালি হয়ে গেছে। রফিক সাহেব বিষন্ন মুখে দরজা বন্ধ করলেন। দরজা বন্ধ করে ঘুরে তাকাতেই এক মরিচীকাময় পরিবেশের সৃষ্টি হল। তার চোখের সামনে সেই বিশাল প্রশস্থ ক্লাসরুম। বেঞ্চ ভর্তি বয়েজ কলেজের ছাত্ররা। সামনের বেঞ্চটায় লাবিব বসে আছে। রফিক সাহেবের হাতে চক আর ডাস্টার। আর তার পেছনে বিশাল ব্লাক বোর্ড। রফিক সাহেব হাত ইশারা করে লাবিবকে দাড়াতে বললেন। লাবিব ভয়ে ভয়ে দাড়াল। তার পা ধীরে ধীরে কাঁপছে। -"বল আর্সেনিক টেট্রাহাইড্রাইড এর সংকেত কি?" লাবিব কথা বলছে না। রফিক সাহেব উচ্চস্বরে আবার বললেন -" বল আর্সেনিক টেট্রাহাইড্রাইড এর সংকেত কি?" -"স্যার জানিনা"। রফিক সাহেব হুংকার দিলেন। -"বেঞ্চ থেকে বের হয়ে কান ধরে দাড়া"। লাবিব বেঞ্চ থেকে বের হল। কান ধরে দাড়াল। হঠাৎ ঘন্টা পড়ল। ক্লাস শেষ। সেই সাথে অবসান ঘটল অদ্ভুত সেই মরিচীকাময় পরিবেশের। রফিক সাহেব আর কোন ক্লাসরুম দেখতে পারছেন না। তার ঘরটা আগের মত হয়ে গেছে। কিন্তু ঘন্টার শব্দ এখনও হচ্ছে। রফিক সাহেব খেয়াল করে দেখলেন কলিংবেল বাজছে। বিরক্তিকর শব্দ। কানে লাগে। রফিক সাহেব পেছন ফিরে দরজা খুললেন। কিন্তু দরজার ওপাশে জনশূন্য পরিবেশ। সেখানে কেউ নেই। |২| বিশাল এক বট গাছের তলায় শান্তিনিকেতন স্কুল। গাছের গায়ে পেরাক মেরে ঝুলানো মাঝারি সাইজের ব্লাক বোর্ড। এতক্ষন লাবিব গণিত ক্লাস নিচ্ছিল। এখন ক্লাস শেষ। তবে ব্লাক বোর্ড মুছা হয়নি। এখনো তাতে লিখা দুই যোগ দুই চার। বাচ্চারা সব বাসার দিকে হাটতে শুরু করেছে। লাবিব মাথা নিচু করে বটতলায় বসে আছে। এক মিষ্টি অপেক্ষার প্রহর চলছে। নিলার জন্য অপেক্ষা। লাবিব মাথা উঁচু করে সামনে তাকাতেই তার চোখে মুখে আনন্দের রেখা দেখা গেল। কারণ নিলা আসছে। তার চেয়েও আনন্দের ব্যাপার নিলা আজ শাড়ি পড়ে এসেছে। সবুজ শাড়ি। চোখে কাজল দিয়েছে কিনা তা দূর থেকে বোঝা যাচ্ছে না। কাছ থেকে দেখতে হবে। নিলা দ্রুত পায়ে হেটে লাবিবের পাশে এসে বসলো। লাবিব নিলার চোখের দিকে তাকাতে পারেনা। তার কারণ লাবিবের জানা নেই। হয়তো অদ্ভুত ধরনের কোন ভয় কাজ করে। লাবিব তারপর ও নিলার চোখের দিকে এক নজর তাকালো। না কোন কাজলের রেখা দেখা যাচ্ছে না। লাবিবের মনটা কিঞ্চিত খারাপ হয়ে গেল। সামান্য কাজল থাকলে বেশ লাগতো। লাবিব নিচের দিকে তাকিয়ে শান্ত গলায় বলল,"অবশেষে এসেছ তুমি"। নিলা লাবিবের দিকে তাকিয়ে বলল,"হুম আসলাম আর আসার সময় তোমার স্যারের বাসায় একবার কলিংবেল দিয়ে আসলাম"। লাবিবের হঠাৎ রাগ হল। তবে ভীষন না সামান্য রাগ। লাবিব কড়া করে কিছু কথা বলতে চাইলো কিন্তু পারল না। বলতে গেলেই নিলা খিলখিল করে হেসে উঠলো। বেশ সুন্দর হাসি। এই হাসির পরে আর কারো শরীরে রাগ থাকে না। লাবিবের রাগ সেই হাসির কাছে হার মানলো। ভীষন ক্লান্ত গলায় বলল,"তুমি এগুলো কেন কর? শুধু শুধু একজন মানুষকে কষ্ট দেওয়ার কি দরকার? পারলে ক্ষমা চেয়ে নিও"। নিলা হাসি থামিয়ে বলল,"তুমি স্যারের এত বড় ভক্ত কেন?স্যার কি তোমাকে অনেক ভালবাসে?" -"হুম বাসে তবে আগে বাসতো না। একসময় আমি রোজ স্যারের ক্লাসে কান ধরে দাঁড়িয়ে থাকতাম। পড়া পারতাম না। স্যার রবীন্দ্র সংগীতের অনেক বড় ভক্ত, একবার আমাদের কলেজের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে আমি রবীন্দ্র সংগীত গেলাম, স্যার আমার সেই গান শুনলেন বেশ মনযোগ দিয়ে শুনলেন,তারপরের দিন থেকে আমি স্যারের পছন্দের ছাত্র হয়ে গেলাম মাঝে মাঝেই সে আমার কাছে গান শুনতে চাইতেন"। -"তাই নাকি?" -"হুম তাই একবার কি হল শুনো স্যার আমাদের ক্যামিস্ত্রি ক্লাস নিচ্ছেন,পড়ানো হচ্ছে উর্টজ বিক্রিয়া,অ্যালকাইল হ্যালাইড ও সোডিয়াম ধাতু বিক্রিয়া করে প্যারাফিন গঠিত হবে,হঠাৎ করে স্যার পড়া থামিয়ে দিলেন,চক ছুড়ে মারলেন জানালার দিকে,হাত ঝাড়লেন তারপর আমার দিকে তাকিয়ে বললেন লাবিব দাড়া একটা গান ধর অবশ্যই রবীন্দ্র সংগীত। আমি ভেবাচেকা খেয়ে গেলাম, হা করে তাকিয়ে থাকলাম স্যারের দিকে,স্যার ডাস্টার দিয়ে টেবিলে আঘাত করলেন, কিরে গান গাচ্ছিস না কেন? আমি গান ধরলাম পুরো ক্লাস শুনলো সেই গান,উর্টজ বিক্রিয়া রয়ে গেল অসম্পূর্ণ "। এ গল্প শুনেই নিলা আবারো খিলখিল করে হাসতে শুরু করল। লাবিবের অনেক ইচ্ছে হচ্ছে নিলার চোখের দিকে তাকাতে। হাসলে চোখ দুটো কি রকম দেখায় বেশ দেখতে ইচ্ছে করছে। কিন্তু লাবিব তাকালো না। সে তার দৃষ্টি নিবদ্ধ করল মাটির দিকে। মাটিতে সবুজ ঘাস। আর নিলার গায়ে সবুজ শাড়ি। লাবিবের মনে হচ্ছে নিলা যেন প্রকৃটিরই একটা অংশ আর তার অসম্ভব সুন্দর হাসি বয়ে যাওয়া বাতাসের শব্দ। . . ঘড়িতে সময় বিকাল পাঁচটা। রফিক সাহেব শফিক মিয়ার চায়ের দোকানে বসে আছেন। তার এক হাতে চায়ের কাপ। আর এক হাতে সিগারেট। বেশ আরাম করে সিগারেট খাচ্ছেন। অন্যদিকে শফিক মিয়া বেচা কেনা বাদ দিয়ে তার দিকে অবাক ভঙ্গিতে তাকিয়ে আছেন। একটু পর পর মাথা চুল্কাচ্ছেন তো মোটা মোটা আঙ্গুল দিয়ে দাড়ি গোঁফে বিলি কাটছেন। আবারো একই ভঙ্গিতে রফিক সাহেবের দিকে তাকিয়ে থাকছেন। তার পেছনে এক বিশেষ কারন আছে। রফিক সাহেবকে আজ চেনাই যাচ্ছে না। তার গায়ে টকটকে লাল রঙের শার্ট। নীল রঙের জিন্স প্যান্ট। মাথা ভর্তি কালো চুল। দোকানে আসার পর থেকেই বলছেন আমাকে রফিক সাহেব বলবেন না আমি রফিক,অনলি রফিক। লোকটা কি আবার পাগল হয়ে গেল কিনা শফিক মিয়া ব্যাপারটা বুঝতে পারছেন না। সে হঠাৎ খেয়াল করলেন করিম সাহেব তার দোকানের দিকে আসছেন। করিম সাহেব তার দোকানে পৌছাতেই সে তার কানে ফিস ফিস করে বলতে লাগলেন,"শুনেন ভাই রফিক সাহেবের মাথাটা মনে হয় গেছে"। করিম সাহেব বললেন,"গেছে মানে?" "গেছে মানে গেছে, দোকানে আহনের পর থিকাই উল্টাপাল্টা কথা কইতেছে আপনি তার লগে কথা কইলেই বুঝতে পারবেন"। করিম সাহেব রফিক সাহেবের দিকে ভুরু কুঁচকে তাকালেন। তার নিকট গেলেন। লম্বা সালাম দিলেন,"রফিক সাহেব আসসালামু আলাইকুম,কখন আসলেন"? রফিক সাহেব আকস্মিক চমকে উঠলেন। হাত থেকে সিগারেট ফেলে দিয়ে বললেন,"চাচা ভাল আছেন"? করিম সাহেব অবাক হলেন। -"কাকে চাচা বলছেন"? -"কেন আপনাকে বলছি"। -"আমি আপনার চাচা কেন হব? আমাকে চিনতে পারেন নি? আমি আপনার বাড়িওয়ালা করিম সাহেব,আপনার কি হয়েছে রফিক সাহেব"? -"আমাকে রফিক সাহেব বলবেন না চাচা, আমি রফিক অনলি রফিক।" -"আমাকে বার বার চাচা বলছেন কেন? আমরা তো সমবয়সী "। -"কি বলছেন? সমবয়সী হতে যাব কেন? আমার চুলকি আপনার মত পাকা নাকি,আপনি আমার চাচা আমি আপনার ভাতিজা,ভাল থাকবেন চাচা আসসালামু আলাইকুম"। এ বলেই রফিক সাহেব হাটা ধরলেন। কিছু দূর গিয়ে আবার ফিরে এসে বললেন,"করিম চাচা, আমি যে দোকানে বসে সিগারেট খাচ্ছিলাম এ কথা আমার বাবাকে দয়া করে বলবেন না"। করিম সাহেব হা করে তাকিয়ে থাকলেন। রফিক সাহেব দ্রুত পা ফেললেন বাড়ির দিকে। করিম সাহেব এখনো হা করে আছে। বিশাল হা। মশা মাছি দু বার মুখের ভেতর থেকে ঘুরে এলেও সে টের পাবে না। . . |৩| বিসমিল্লাহ বিরিয়ানি হাউজ থেকে দুই প্যাকেট বিরিয়ানি নিয়ে লাবিব তার স্যারের বাসায় উপস্থিত হল। দরজায় দু বার ঠক ঠক শব্দ করল। রফিক সাহেব দরজা খুললেন। "আরে লাবিব তুই,আয় ভেতরে আয়"। লাবিব ভেতরে ধুকল। "স্যার আপনার জন্য বিরিয়ানি নিয়ে আসলাম,ভাবলাম এক সাথে ডিনার করি"। -"ভাল করেছিস,তোর কথাই ভাবছিলাম শোন কি হয়েছে আজ, আমি পুরো যুবক সেজে বিকালে ঘর থেকে বের হলাম সবাই অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকল আমার দিকে,চায়ের দোকানদার শফিক মিয়া তো চোখই ফেললনা"। রফিক সাহেব শব্দ করে হাসতে লাগলেন। হাসি থামিয়ে আবার বললেন,"আমি একটা ব্যাপার নিয়ে চিন্তা করছি তোকে আমাকে সাহায্য করতে হবে"। লাবিব বলল,"কি সাহায্য স্যার?" -"আমার একটা ইচ্ছে পূরন হয়েছে,আরো দুটো বাকি, আমি এখন জেলে যাওয়া নিয়ে ভাবছি,চাইলেই তো আর জেলে যাওয়া যায় না,একটা অপরাধ করতে হবে তারপর যেতে হবে"। -"স্যার কি করবেন আপনি?" -"'ছোটখাটো কিছু অপরাধ, এই ধর ট্রাফিক সিগনাল ভাঙ্গা,সিগনাল দেওয়ার আগেই দৌড় দিয়ে রাস্তা পাড় হলাম"। -"স্যার আমার মনে হয় না এতে কিছু হবে,ট্রাফিকের এত সময় কই আপনার দিকে ফিরে তাকানোর বরং এক্সিডেন্ট হবার একটা ঝুঁকি আছে,এই ধরেন রাস্তা পাড় হতে গিয়ে এক্সিডেন্ট করে বসলেন তখন কেউতো এসে বাঁচাবেই না উল্টো আপনার ছবি তুলতে ব্যস্ত হয়ে পড়বে"। এ কথা শুনে রফিক সাহেবের মুখে চিন্তার ছাপ দেখা গেল। চিন্তিত মুখে লাবিবের দিকে তাকিয়ে বললেন,"পুলিশের গায়ে হাত তুললে কেমন হয়?" লাবিব লাফ দিয়ে ওঠার মত ভঙ্গি করল। "কি বলছেন স্যার! পরে কোন না কোন মামলায় ফাসিয়ে দেয় তার ঠিক নেই,আমরা বরং এক কাজ করি কাল দুপুরের দিকে বেরিয়ে পড়ি,যেখানে পুলিশ দেখব সেখানেই সন্দেহজনক আচরণ করা শুরু করব দেখবেন এমনিতেই গাড়িতে করে তুলে নিয়ে গেছে"। এ কথা শুনতেই রফিক সাহেবের মুখে হাসি দেখা গেল। "ঠিক বলেছিস,তাই করতে হবে আমাদের,চল এখন খেয়ে নেই"। হঠাৎ কলিংবেল বেজে উঠল। লাবিব প্রশ্ন করল,"এখন কে এসেছে স্যার?" "কে আর আসবে? তুই আর করিম সাহেব ছাড়া আমার কাছে আসার মত কেউ নেই গিয়ে দেখ ঐ ফাজিল মেয়েটাই কলিংবেল দিয়ে পালিয়েছে"। লাবিব উঠে দাঁড়াল। দরজার দিকে গিয়ে দরজা খুলল। দরজার অপাড়ে নিলা দাঁড়িয়ে আছে। নিলার দিকে তাকাতেই লাবিবের চোখ পড়ল নিলার চোখে। নিলার চোখে কাজল। বেশ সুন্দর লাগছে। নিলা প্রশ্ন করে বসল,"রফিক চাচা আছেন"? লাবিবের উত্তর দিতে হল না। রফিক সাহেব নিজে এসে দাড়ালেন নিলার সামনে। নিলা লাজুক ভঙ্গিতে মেঝেতে দৃষ্টি রেখে বলল,"আমাকে ক্ষমা করে দিবেন,আমি রোজ আপনার বাসার কলিংবেল দিয়ে পালিয়ে যাই"। রফিক সাহেব এক চিলতে হাসি দিলেন। তারপর নিলার মাথার উপর হাত রাখলেন। শান্ত গলায় বললেন,"যাও মা তোমাকে ক্ষমা করে দিলাম"। . . আবুল মিয়ার মুদির দোকানের সামনে নতুন আসন বসানো হয়েছে। কাঠের আসন। তার কারন তার দোকানের একটা অংশে এখন থেকে চা বানানো হবে। মাঝে মাঝে কফিও হবে। লোকেরা কাঠের আসনে বসে পায়ের উপর পা তুলে চা কফি খাবে। এখন সময় বিকেল। রফিক সাহেব এবং লাবিব আবুল মিয়ার দোকানের নতুন আসনে বসে আছে। আবুল মিয়ার অনুরোধ রফিক সাহেব ফেলতে পারেননি। রাস্তায় দেখা হতেই হাত ধরে বসল,"ভাইজান একটা বার আমার দোকানের চা খাইয়া জান,নতুন আয়োজনের ব্যবস্থা করছি,এখন থেকে চা বিক্রি হবে,সাথে কফিও আছে,আমি চাই আপনাকে সবার আগে এক কাপ চা খাওয়াইতে"। রফিক সাহেব মানা করতে পারলেন না। সোজা বসে গেলেন। "ভাইজান কি চা খাবেন?" রফিক সাহেব গম্ভীর কন্ঠে বললেন,"রঙ চা, চিনি কম লিকার বেশি"। -"দাড়ান ভাইজান এক্ষুনি দিতাছি এক্ষুনি"। রফিক সাহেব দোকানে বসেছে পাচ মিনিটের বেশি হয়েছে এখনো চা বানানো হয়নি। চা বানাতে এত সময় লাগেনা। রফিক সাহেবের রাগে গা আগুনের মত গরম হয়ে আছে। রাগের অবশ্য অন্য কারন আছে। গত কালকের পরিকল্পনা অনুযায়ী তিনি এবং লাবিব দুপুরের বের হয়েছেন। কিন্তু এখনো তাদের পুলিশ ধরে নিয়ে যায়নি। বেশ কয়েকবার চেষ্টা করেছেন কিন্তু কোন লাভ হয়নি। শেষবার রফিক সাহেব রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকা এক পুলিশের সামনে মাতালের মত অভিনয় করতে শুরু করলেন। তাতে পুলিশ সন্দেহ করাতো দূরে থাক এসে লাবিবের দিকে মায়া ভরা কন্ঠে বললেন,"উনি কি আপনার বাবা? উনাকে তো দেখে অসুস্থ মনে হচ্ছে,তাকে হাসপাতালে নিয়ে যান"। পুলিশ অফিসার লাবিবকে কোন কথা বলতে দিলেন না। রিক্সা ঠিক করলেন। তারপর সোজা হাসপাতালের রাস্তা ধরে পাঠিয়ে দিলেন। আবুল মিয়ার চা বানানো হয়ে গেছে। -"ভাইজান এই নেন চা,ভুল ত্রুটি হইলে ক্ষমার চোখে দেখবেন"। রফিক সাহেব চা নিলেন। লাবিব ও নিল। চায়ের কাপে পরপর দু'বার চুমুক দিয়ে ডানে তাকাতেই রফিক সাহেব দেখলেন একটা পুলিশের গাড়ি দাঁড়িয়ে আছে। রফিক সাহেব দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। আর চেষ্টা করার কোন মানে হয় না। রফিক সাহেব বিষন্নমুখ নিয়ে চায়ের কাপে তৃতীয় চুমুক দিলেন। আবুল মিয়া অনেক্ষন ধরেই খচখচ করছেন। কিছু বলতে চান মনে হয়। দু'বার খুক খুক করে কাশলেন। -"ভাইজান একটা কথা ছিল"। রফিক সাহেবের কন্ঠ এখনো গম্ভীর। গম্ভীর কন্ঠেই তিনি বললেন,"হুম বলো"। -"ভাইজান চায়ের টাকার সাথে কি আগের বাকি এক হাজার টাকা আজকে দিবেন নাকি চায়ের টাকা টাও বাকি রাখবেন?" আবুল মিয়ার এই খোঁচা রফিক সাহেবের সহ্য হল না। তার রাগ আরো চড়ে বসলো। সব কিছুর একটা সীমা থাকে। মানুষের রাগের ও একটা সীমা আছে। সেই সীমা পার হলে আর রাগ কন্ট্রোল করা সম্ভব হয় না। রফিক সাহেবের রাগে আর তার কন্ট্রোলে নেই। তার রাগের সীমা পাড় হয়ে গেছে। সীমা পাড় হতেই দ্রুত কিছু ঘটনা ঘটল। রফিক সাহেব তার চায়ের কাপ আবুল মিয়ার মাথায় ছুঁড়ে মাড়লেন। আবুল মিয়া বিকট চিৎকার দিয়ে উঠলেন। মুহূর্তের মধ্যে আশেপাশে লোক জড়ো হয়ে গেল। মানুষের ভীড় দেখে পুলিশের গাড়ি থেকে পুলিশ নেমে এলো। তারা সব কিছু বিবেচনা করলেন। লাবিব আর রফিক সাহেবকে তোলা হল পুলিশের গাড়িতে। সাই সাই করে চলে গেল সেই গাড়ি থানার দিকে। দ্রুত, বেশ দ্রুত। . . |৪| লাবিব এবং রফিক সাহেব ত্রিশ মিনিট ধরে মশার কামড় খাচ্ছেন। তাদেরকে থানার লকাপে রাখা হয়েছে। লাবিব এক কোণায় বসে মশার প্রতি বিরক্তিপ্রকাশ করছে অন্যদিকে রফিক সাহেব হাসি হাসি মুখে পাইচারি করছেন। লকাপে আরও দুইজন আছেন। একজনের নাম আলাল আর একজনের নাম দুলাল। দুই ভাই। আজকেই ছিনতাই করতে গিয়ে ধরা পড়েছে। তবে তাদের চোখে মুখে কোন চিন্তার ছাপ নেই। দেখেই মনে হয় তাদের নিয়মিত থানায় আসা যাওয়া হয়। রফিক সাহেব ব্যস্ত ভঙ্গিতে হাত ঘড়ির দিকে তাকালেন। তিনি ওসি সাহেবের জন্য অপেক্ষা করছেন। ওসি সাহেব থানায় নেই। ওসি সাহেব আসলেই বোঝা যাবে তাদের জন্য কি ব্যবস্থা নেওয়া হবে। সন্ধ্যা পাড় হয়ে রাত হতেই ওসি সাহেবের থানায় আগমন ঘটলো। ওসির নাম বাবুল আহমেদ। দেখতে গোলগাল ধরনের। চ্যাপ্টা নাকের নিচে কালো গোঁফ। কিছু সময় বাদে ওসি সাহেবের অনুমতি তে রফিক সাহেব এবং লাবিবকে তার সামনে আনা হল। ওসি সাহেব বেশ ক্লান্ত। চেয়ারে আরাম করে বসে আছেন। রফিক সাহেবকে দেখে তিনি আকস্মিক চমকে উঠলেন। এক লাফ দিয়ে উঠে রফিক সাহেবের পা ধরে বসে পড়লেন। হাউমাউ করে বলতে লাগলেন,"স্যার আপনি এইখানে! আপনাকে এখানে কে ধরে এনেছে ,কার এত বড় সাহস,একবার বলেন স্যার একবার বলেন"। রফিক সাহেব বিস্ময় নিয়ে বললেন,"কি করছেন এসব কি করছেন?" ওসি সাহেব উঠে দাড়ালেন। নিজের দিকে আঙ্গুল দেখিয়ে বললেন,"স্যার আমাকে আপনি চিনেন নাই?" রফিক সাহেব মাথা চুলকাতে শুরু করলেন। তিনি চিনতে পারছেন না। ওসি সাহেব আবার বলতে লাগলেন," স্যার মনে নেই? আমি রোজ আপনার ক্লাসে টিফিন খেতাম তাই আপনি আমাকে কান ধরে দাড় করিয়ে রাখতেন,একদিন আপনি আমার নাম দিলেব মোটু,মোটু বাবুল"। এ কথা শুনে রফিক সাহেব হাসতে শুরু করলেন। শব্দ করে হাসি। হাসি থামতে সময় লাগল। -"হ্যা চিনতে পেরেছি এখন,তুই যে বড় হয়ে পুলিশ হবি তা আমি চিন্তাও করি নি"। রফিক সাহেব আবারো হাসতে শুরু করলেন। ওসি সাহেব বললেন,"স্যার আমি আপনার বাসায় যাবার ব্যবস্থা করছি,আপনি কোন চিন্তা করবেন না"। রফিক সাহেব বললেন, "না না আমি আজকের রাতটা এখানেই থাকব"। -"কি বলছেন স্যার! আমি থাকতে আপনি থানায় থাকবেন তা হয় না, আমার চাকুরি গেলে যাক আপনাকে আমি বাসায় পাঠাবোই"। রফিক সাহেব লাবিবকে চোখ দিয়ে ইশারা করলেন। লাবিব ইশারা বুঝতে পেরেছে। সে ওসি সাহেবকে একপাশে নিয়ে সব খুলে বলল। ওসি সাহেব ফিরে এলেন। রফিক সাহেবের পায়ে সালাম করে দাঁড়িয়ে মুখে হাসি নিয়ে বললেন,"স্যার আপনার সব বিচিত্র ইচ্ছা,তবে আমি আপনার ইচ্ছা পূরন করবই,কোন কিছুর ত্রুটি থাকবে না"। . . ওসি সাহেব বাবুল আহমেদ বেশ ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন। এদিক ওদিক ছোটাছুটি করছেন আর নিজে নিজে বিড়বিড় করে বলছেন-চাকুরি গেলে যাক আমি স্যারে ইচ্ছা পূরন করবই। তার আদেশে থানার লকাপ রুমের চেহারা পাল্টে গেছে। মেঝেতে চাঁদর বিছানো হয়েছে। সাদা চাঁদর। লকাপ রুমের এক দিকে ধরানো হয়েছে মশার কয়েল অন্যদিকে সুগন্ধিযুক্ত আগরবাতি। দুই ভাই আলাল এবং দুলাল বেশ আগ্রহ নিয়ে সব আয়োজন দেখছে। তাদের কাছে সব কিছু স্বপ্নের মত মনে হচ্ছে। থানার কন্সটেবল আজগর মিয়া চা বানিয়ে এনেছেন। বিশাল এক প্লেটে করে পেয়ালা ভর্তি চা। চা বানানো হয়েছে রফিক সাহেবের আদেশ অনুযায়ী। কড়া চা। লিকার বেশি,চিনি কম। প্লেটে কিছু বিস্কুট ও আছে। এনার্জি বিস্কুট। রফিক সাহেব ওসি কে বললেন,"বাবুল আমি প্রস্তুত"। ওসি সাহেব হাসি মুখে লকাপে ধুকলেন। তার সাথে সাথে আজগর মিয়াও ধুকলেন। বাকি কন্সটেবলরা নিজ নিজ কাজ করতে লাগলেন। আজগর মিয়া এবং ওসি সাহেব জুতো খুলে সাদা চাঁদরের ওপর পা ভাজ করে বসলেন। লাবিব আর রফিক সাহেব বসেছেন পাশাপাশি। আলাল ও দুলাল দুই ভাই ও এসে বসেছে। সবার হাতে পেয়ালা ভর্তি চা। হঠাৎ রফিক সাহেব বলে উঠলেন-"আসল জিনিসের ব্যবস্থাই তো এখনো করা হল না, আমার রবীন্দ্র সংগীত কোথায়?" ওসি সাহেব মাথায় হাত দিলেন। -"এক্ষনি ব্যবস্থা করছি স্যার দাঁড়ান,মোবাইলে গান বাজানো হবে,চিন্তা করবেন না আপনি"। -"না কোন মোবাইলে গান শুনব না আমি,কোন কৃত্রিম পদ্ধতি অবলম্বন হবে না। যা হবে তা হবে প্রাকৃতিক," -"তাহলে কি করবেন স্যার?" রফিক সাহেব চুপ হয়ে গেলেন। তিনি চিন্তায় পড়ে গেছেন। হঠাৎ চিন্তার অবসান ঘটালেন। লাবিবের দিকে আঙ্গুল ইশারা করে বললেন,"লাবিব,তুই গাবি গান, যেভাবে তুই আমাকে ক্লাসে গান শুনাতি সেভাবেই আজ শুনাবি,ধর গান"। লাবিব হা করে তাকিয়ে থাকল তার স্যারের দিকে। রফিক সাহেব হঠাৎ ডাস্টার খুঁজতে শুরু করলেন। তিনি ডাস্টার পেলেন না। পেয়ালা দিয়ে প্লেটে আঘাত করে বললেন,"কিরে হা করে তাকিয়ে আছিস কেন,গান ধর"। লাবিব হঠাৎ খেয়াল করল তার হাত কাঁপছে। চা উপড়ে পড়ছে চায়ের কাপ থেকে। সে ধীরে ধীরে চায়ের কাপ প্লেটে রাখলো। সে নিজেকে গান গাওয়ার জন্য প্রস্তুত করছে। একবার চোখ বন্ধ করে নিল। চোখ খুলতেই সৃষ্টি হল এক মরীচিকাময় পরিবেশের। লাবিব দেখতে পেল তার আশেপাশে বয়েজ কলেজের ছাত্ররা গিজগিজ করছে। সবাই আগ্রহ নিয়ে বসে আছে তার গান শুনতে। তার সামনে বিশাল ব্ল্যাক বোর্ড। আর ব্ল্যাক বোর্ডের সামনে দাঁড়িয়ে আছেন তাদের ক্যামিস্ত্রি শিক্ষক রফিক স্যার। সবাই অপেক্ষা করছে। লাবিব অপেক্ষার প্রহর ভেঙ্গে গান ধরলো, আমার মাথা নত করে দাও হে তোমার চরণধুলার তলে। সকল অহংকার হে আমার ডুবাও চোখের জলে আমার মাথা নত করে দাও হে তোমার চরণধুলার তলে... . . (সমাপ্তি)


এডিট ডিলিট প্রিন্ট করুন  অভিযোগ করুন     

গল্পটি পড়েছেন ২১০৮৪ জন


এ জাতীয় গল্প

গল্পটির রেটিং দিনঃ-

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now