বাংলা গল্প পড়ার অন্যতম ওয়েবসাইট - গল্প পড়ুন এবং গল্প বলুন
বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ

ইমাসকুলেশন

"জীবনের গল্প" বিভাগে গল্পটি দিয়েছেন গল্পের ঝুরিয়ান রিয়েন সরকার (০ পয়েন্ট)

X এক ও নদীরে... ও নদীরে ভেসে চলে, লখিন্দরের ভেলা উথাল পাথাল ভরা নদী ঢেউযে কুটিলা ... কন-নাগিনীর বিষে লখার দেহ হইলো কালা রে ভেসে চলে ... লখিন্দরের ভেলা ... একতারা বাজিয়ে গান গাইছে রমিজুদ্দিন । মাথায় লম্বা চুল, লম্বা গোঁফ । মেহেদী রাঙ্গা দাড়ি । পরণে লম্বা আলখেল্লা । পাশে রাখা একটা চটের ঝোলা । বাইরে থেকেই দেখা যাচ্ছে সেখানে কী কী আছে । কয়েকটা পুরনো কাপড় , থালা , বাটি ও মগ । রমিজের বয়স ৩৩ বছর । কিন্তু এখন বয়স আন্দাজ করা মুশকিল রমিজের । ৪০ এর আশেপাশেই হবে । হয়তো বেশি হবে । এমনভাবে নিজেকে সাজিয়েছে যাতে তাকে দেখেই বয়স ৫০ এর কোটায় মনে হয় । সুমন চেয়ারম্যানের বাড়ির সামনে বটগাছের তলায় বসেছে আসর । অনেকদিন পর মন খুলে গান শুনছে এলাকার লোকজন । উদাস-ভরাট কন্ঠে রমিজ শোনাচ্ছে বেহুলা লখিন্দরের কাহিনী । কান্দে বনের পশু পাখি কান্দে প্রিয়জন আকাশ কান্দে বাতাস কান্দে কান্দে ত্রিভুবন ঢেউ চলে বুকে নিয়ে...উজানী ঐ ভেলা কন-নাগিনীর বিষে লখার দেহ হইলো কালারে... ভেসে চলে...লখিন্দরের ভেলা... *** উপস্থিত শ্রোতাদের অনেকেরই চোখ ছলছল করছে । বিশেষ করে মহিলাদের । রমিজের মত আবেগ দিয়ে কে-ই বা গাইতে পারবে এই গান ? এই গান যে মিশে আছে রমিজের হৃদয়ের ভেতরে । রমিজের চোখও বারবার সিক্ত হয়ে আসে । আজও তার ব্যতিক্রম হলো না । গান শেষ হলে এক ফোঁটা অশ্রু তার গাল স্পর্শ করলো । মোবাইলের স্ক্রিনে ভিডিওটা পজ করলেন শিশির । ডাঃ শিশির । ইজি চেয়ারটায় হেলান দিয়ে ভিডিওটা দেখছিলেন তিনি । গোপন ক্যামেরায় ধারণ করা ভিডিও । রমিজের আবেগ তাঁকেও কিছুটা স্পর্শ করলো যেন। ডাঃ শিশির এখন বসে আছেন বান্দরবানের নিরিবিলি এলাকায় তাঁর ভাড়া করা বাংলোতে । যেখানে রমিজ এই গান গেয়েছিল, সেখান থেকে দুই মাইল পুবেই শুয়ে আছে রমিজের বেহুলা । হয়তো এতদিনে তার কিছুই আর অবশিষ্ট নেই , হয়তো সবকিছু মিশে গেছে মাটিতে । কিন্তু রমিজের মনে সে আছে অমলিন। মানুষরুপী কালনাগ সাপের ছোবলে প্রাণ দিতে হয়েছিল রমিজের বেহুলাকে । রমিজ তার কাজ ভালোমতই করেছে । তার এতবছরের সঞ্চিত ক্ষোভ এবার তার চোখের সামনেই মেটানো হবে । সার্জারিটা আজ সকালেই হবে । *** পরিকল্পনামত আসর সমাপ্ত করে চেয়ারম্যানের বাড়ির পেছনের দিকে গাছতলায় ছোট তাঁবু খাটিয়েছিল রমিজ।তিনদিন ধরে সেখানেই ছিল সে। খাবার দাবারও পেয়েছিল চেয়ারম্যানের বাড়ি থেকেই।চেয়ারম্যানের গতিবিধির সব তথ্য জানিয়ে দিয়েছিল সময়মত । গত রাতে সেই তথ্যের ওপর ভিত্তি করে ডাঃ শিশিরের স্পেশাল টিম রংপুর থেকে ধরে নিয়ে এসেছে সুমন চেয়ারম্যানকে । রাখা হয়েছে গোপন কক্ষে । ভ্রাম্যমান অপারেশন থিয়েটারের সবকিছু রেডি আছে । যদিও রাতের অভিযানের পর টিমের সবাই ক্লান্ত । তবুও অপারেশনটা আজ সকালেই করা হবে । কারো যেন তর সইছে না আর। রমিজকে ডাকলে কেমন হয় ? রমিজের কাছে তার জীবনের কথাগুলো আরেকবার শুনলে খারাপ হয় না । রমিজকে কল করলেন ডাঃ শিশির । কিছুক্ষণের মধ্যেই এসে পৌছলো রমিজ । এখন পুরোপুরি ফিটফাট । -রমিজ ভাই, বলো তোমার কাহিনী । অপারেশন শুরুর আগে আরেকবার শুনি। দুই অল্পবয়সে বিয়া করছিলাম ভাই । কতইবা হইবো তহন বয়স ? ২২ কি ২৩ । এরকম বয়সে মন থাকে রঙ্গিন। নারীর প্রতি আকর্ষন সবচেয়ে বেশি থাকে এসময়টাতেই ।বাপে ব্যবসা করতো । আমি বাপের এক পোলা । সেই জন্যে লেখাপড়া বেশি করলাম না । বাপে কয়- লাগবো না তোর এত লেহাপড়া । ব্যবসা দ্যাখ । অল্পবয়স থেইকাই আব্বার সাথে ব্যবসা দেখি । ব্যবসার কাজে পাশের জেলায় যাইতে হইছিল । সেখানেই জুলেখারে দেখলাম । প্রথম দেখাতেই চউখ আটকাইয়া গেল । খোজখবর নিলাম, ঠিকানাপাতি নিলাম । বাড়িতে আইসা লাজ লজ্জার মাথা খাইয়া আব্বাকে মুখ ফুটে বইলা দিলাম সেই কথা । সময় কইরা আব্বা গেলেন একদিন মাইয়া দেখতে । তারও পছন্দ হইলো । মেয়ে সুন্দরী, বংশও খারাপ না । আমার মা মারা গেছেন ৩ বছর । বাপ ছেলেই সংসার । বাড়িতে ছেলের বউ আসলে খারাপ হয়না । আর মেয়েও মাশাল্লাহ খুব সুন্দর। বিয়াটা হয়া গেলো । বউয়ের সাথে তহন কী উথাল পাথাল প্রেম । এক মাস তো বাড়ি থেইক্কা বাইরই হই নাই। বিয়ার তিন মাসের মাথায় চট্টগ্রাম যাইতে হইলো আমাকে । ১০ বছর আগের কথা । তখন আজকের মত মোবাইল ফোন আছিল না । টেলিফোনও আছিল না খুব একটা । জুলেখা খুব কানলো বিদায় বেলায় । নীল রুমালে সুতার গাথুনিতে লিখে দিলো ‘ভালো থেকো’,‘ভুলোনা আমায়’ । সেই রুমাল দিলো আমার পাঞ্জাবীর পকেটে । বারবার কইরা বললো সাবধানে থাকতে । আর তাড়াতাড়ি ফিরা আসতে । আমি বইলা গেলাম,যদি বাড়িতে একা একা ভালো না লাগে,বাবাকে বইলো,তোমাকে তোমার বাবার বাড়ি রাইখা আসব। চট্টগ্রাম হইতে তাড়াতাড়িই ফিরছিলাম।ফিরা দেখি বাড়ি খা খা করছে।কেউ নাই।জুলেখাকে নাকি হাসপাতালে ভর্তি করছে। রমিজ আবারো কাঁদতে শুরু করলো । যতবারই রমিজ তার কাহিনী বলা শুরু করে,এই পর্যন্ত এলেই আর নিজেকে আটকাতে পারে না।কাঁদুক রমিজ। ডাঃ শিশির নিজেই স্মরণ করেন রমিজের শেষের কথাগুলো । এর আগেও তো শুনেছেন তিনি রমিজের কাহিনী। রমিজ হাসপাতালে গিয়েছিল । জুলেখার তখন শেষ সময় উপস্থিত । অনেক কষ্টে কী ঘটেছে বলেছিলো জুলেখা । সে রাতেই জুলেখা সেই যে ঘুমিয়ে পড়লো আর তাকে জাগানো গেল না । সে বছরেই রমিজের বাবাও মারা গেলেন । সবকিছু বিক্রি করে দিয়ে এলাকা ছাড়ল রমিজ । কোথায় গেলো কেউ জানে না । বুকে নিয়ে গেলো প্রতিশোধের ধিকি ধিকি আগুন । তিন রমিজকে খুঁজে পেয়েছিলেন ডাঃ শিশির তাঁর ইন্টার্ণশিপ ট্রেনিং এর সময় । এমবিবিএসটা হলো ডাক্তারি পেশায় বলতে গেলে ‘মাদার ডিগ্রী’ । এমবিবিএস পাসের পর বেছে নিতে হয় কোন একটি সাবজেক্টকে – বিশেষজ্ঞ হবার জন্য । মেডিকেল সায়েন্স এত বিশাল একটা ব্যাপার, কোন একজন মানুষের পক্ষে সব বিষয়ে বিশেষজ্ঞ হওয়া সম্ভব না।ডাঃ শিশির সার্জারিকেই বেছে নেন । জীবনের দুইটি ঘটনা তাঁকে সার্জারি বিশেষজ্ঞ হতে প্রেরণা জোগায় । ঠিক প্রেরণা নয়, বলা চলে একপ্রকার ‘বাধ্য করে’ । এমবিবিএস পাস করে ইন্টার্ণশিপ করছেন তখন শিশির । শৈশবের সেই ভয়ংকর ঘটনা ভুলেই গিয়েছিল । ভুলে থাকতেই তো চেষ্টা করে সে । কিন্তু রমিজ আবারো সেটা মনে করিয়ে দেয় । আর তখনই নতুন একটা চিন্তা মাথায় আসে শিশিরের । সিদ্ধান্ত নেয় সার্জারিতেই ক্যারিয়ার করার। হাসপাতালের রোগীদের সাথে অতি আপনজনের মত মিশে যাওয়ার চেষ্টা করতো শিশির । হাসপাতালে আসা এই মানুষগুলো- কত অসহায় অবস্থায় আসে । কত কষ্ট । অসুস্থতার চেয়ে বড় দুঃখ আর কী ? খেতে ইচ্ছে করছে,খেতে পারছে না । পা আছে, হাঁটতে পারছে না । কারো পা-ই নেই । একজন তাগড়া মানুষ , বিছানায় নির্জীব হয়ে পড়ে আছে । কী কষ্ট ! গরীব হলে তার কষ্ট তো এমনিতেই আরো কয়েকগুন বেশি হয়ে যায়। প্রত্যেক অসুস্থ মানুষের পরিবার পরিজনের কষ্টটাও অপরিসীম । নিজে অসুস্থ না হয়ে , নিজের কেউ অসুস্থ না হলে হয়তো সেই অনুভূতিটা পাওয়া যায় না । ডাক্তাররা চেষ্টা করেন যতটুকু জ্ঞান, যতটুকু সামর্থ আছে তা দিয়ে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব শারীরিক কষ্টটা দূর করতে । যথাসম্ভব কমিয়ে আনতে। শিশির চেষ্টা করতো শারীরিক অসুস্থতার হিস্ট্রির বাইরে আরো কিছু জানতে । মানুষগুলোর মনের খবর জানতে।এভাবেই একদিন রমিজের কাহিনী জানতে পারে শিশির। তখন মেডিসিন ওয়ার্ডে প্লেসমেন্ট । একদিন একজন অজ্ঞান মানুষকে ভর্তি করা হলো । লোকটার পোষাক আশাক মলিন।শরীরের কোন যত্ন নেয় না বোঝাই যায়।পাগলের মত অবস্থা । এই লোক নাকি বাউল । গান গেয়ে গেয়ে শহরের বিভিন্ন প্রান্তে ঘুরে বেড়ায় । আজ সকালে এই শহরের এক আসরে গান গাইছিল । মানুষজন জড়ো হয়ে গান শুনছিল । গান গাইতে গাইতেই হঠাৎ অজ্ঞান হয়ে পড়ে গেছে । দুই- তিনজনে ধরে নিয়ে এসেছে সরকারি হাসপাতালে । ঐ রোগীর বেড পড়লো শিশিরের দায়িত্বে । তার ওষুধ কেনার মত টাকা পয়সাও নাই । শিশিরের উদ্যোগে ইন্টার্ণ ডাক্তাররা চাঁদা তুলে তার ঔষধের ব্যবস্থা করলো । দু-তিন দিনের মধ্যে তার খুব আপন হয়ে উঠলো শিশির । শিশির গল্পচ্ছলে জিজ্ঞেস করেছিল- আচ্ছা রমিজ ভাই, আপনি যে গান করেন-তা কোন গানটা আপনার বেশি প্রিয়? কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে রমিজ বলেছিল,ভাইজান,আমি শুধু একটা গানই গাই। - মাত্র একটা গান? অবাক হয় শিশির । -হ ভাইজান । -কিন্তু কেন?মাত্র একটা গান কেন? গানটা আমাকে শোনাবেন? রমিজ বলেছিল,ঠিক আছে ভাইজান,আপনার ওয়ার্ডে যেইদিন রোগী ভর্তি হয়না সেইদিন ব্যবস্থা করেন।এই খানেই শোনামু গান । সবাই শুনবে । এরপরে আপনারে কমু ক্যান আমি খালি একটা গান গাই। হাসপাতালের মেডিসিন ওয়ার্ডের ভেতরে গান- ব্যাপারটা কেমন হয় এ নিয়ে কিছুটা চিন্তায় ছিল শিশির । কিন্তু কথাটা তুলতেই ইন্টার্ণ ডাক্তাররা সবাই উৎসাহে হৈ হৈ করে উঠলো । ওয়ার্ডে রোগীরা এখন সবাই স্ট্যাবল । নন-এডমিশন ডে । কোন বাদ্যযন্ত্র নাই- শুধু একটা একতারার টুংটাং শব্দ আর খালিমুখে গান – সমস্যা নাই । অসাধারণ হবে ব্যাপারটা । সেদিন ইভেনিং রাউন্ডের পর রমিজ তার একতারা নিয়ে দাড়িয়েছিল মেডিসিন ওয়ার্ডের বিশাল রুমটার একপাশে । ইন্টার্ণ ডাক্তাররা পাশের দুটি খালি বেডে বসেছিল।ওয়ার্ডের বাকি রোগীরা হঠাৎ অবাক হয়ে শুনতে লাগলো রমিজের ভরাট গলায় দরদী কন্ঠের গানঃ ও নদীরে ভেসে চলে, লখিন্দরের ভেলা কন-নাগিনীর বিষে লখার , দেহ হইল কালারে... ভেসে চলে লখিন্দরের ভেলা... এত আবেগ দিয়ে কেউ গাইতে পারে ? চোখ বন্ধ ছিল রমিজের । চোখের কোণ হতে গড়িয়ে পড়ছিল অশ্রুবিন্দু । আবেগ স্পর্শ করেছিল শিশিরকেও । নিশ্চয়ই কোন ঘটনা আছে । জানতে হবে , কী সেই ঘটনা ? চার হাসপাতালে মৃত্যুশয্যায় রমিজকে কী বলেছিল জুলেখা ? প্রথম দিনও সেইসব কথা বলার সময় রমিজ কিছুটা কেঁদে ফেলেছিল । কিন্তু তারপরেও নিজেকে সামলে নিয়ে সবকথাই শিশিরকে বলেছিল রমিজ । সেইরাতে জুলেখার ওপর পাশবিক নির্যাতন হয়েছিল । মন্ডল চেয়ারম্যানের ছেলে, আজকের চেয়ারম্যান সুমন মন্ডল তার পাঁচ-ছয়জন সাঙ্গপাঙ্গ সহ গভীর রাতে হামলে পড়েছিল রমিজের বাড়িতে । প্রথমেই তারা হাত-পা মুখ বেঁধে ফেলে জুলেখার । তারপর কয়েকঘন্টা ধরে পশুগুলো তাদের পশুত্ব ফলায় জুলেখার ওপর । জুলেখার শ্বশুর, রমিজের বাবার কী হয়েছিল তা জুলেখা জানতে পারেনি । অজ্ঞান জুলেখাকে সকালে হাসপাতালে ভর্তি করায় প্রতিবেশিরা । রমিজের বাবাকেও অজ্ঞান অবস্থায় পাওয়া যায় । তাঁর হাত পা বাঁধা ছিল । মাথায় আঘাত ছিল । সেই আঘাতেই ঐ ঘটনার মাস চারেকের মাথায় মৃত্যুর কোলে নিজেকে সঁপে দেন তিনিও । একা হয়ে যায় রমিজ । বাড়ির প্রতিটি আসবাব, প্রতিটি বালুকণাও একসময় অসহ্য হয়ে ওঠে রমিজের কাছে । সবসময় শুধু জুলেখার কথা মনে পড়ে । হ্যালুসিনেশন হয় তার । সবকিছু অসহ্য হয়ে উঠলে একদিন এলাকা ছেড়ে অজানার উদ্দেশ্যে পাড়ি জমায় রমিজ । রেলস্টেশনে এক বাউল ফকিরের সাথে দেখা হয়ে যায় তার । দলে ভিড়ে যায় রমিজ । কী আছে আর এই জীবনে ? সব তো শেষ হয়ে গেলো । উস্তাদ বয়াতির সাথে থেকে একতারা বাজানো শেখে,গান শেখে। বেহুলা- লখিন্দরের গান যেন তার নিজেরই গান । সাপের বিষে লখিন্দর মারা গিয়েছিল, রমিজের বেলায় বেহুলাই মারা গেছে সাপের বিষে । এই সাপের নাম ‘মানুষ’ সাপ । সেই থেকে ঐ একটা গানই গেয়ে চলেছে রমিজ । কী দরকার অন্য গানের ? সবকিছু শুনে স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিলো শিশির । তাঁর মনে পড়ে গিয়েছিল নিজের ছোটবেলার কথা । পাঁচ রাতে নিজের রুমে ফিরে শিশির তাঁর ড্রয়ার থেকে ডায়েরিটা বের করেছিল । পত্রিকার একটি কাটিং-এর দিকে অনেকক্ষণ তাকিয়ে ছিল।শিরোনামঃ ধর্ষণের শিকার স্কুলছাত্রীর আত্মহত্যা খবরের বিবরণে জানা যায়,অষ্টম শ্রেণীর ছাত্রী শিথীকে বেশ কিছুদিন ধরে উত্যক্ত করে আসছিল স্থানীয় কয়েকজন বখাটে যুবক । গত বৃহস্পতিবার স্কুলে যাবার পথে স্কুলছাত্রী শিথীকে অপহরণ করে অজ্ঞাত স্থানে নিয়ে যায় মুখোশ পরিহিত বখাটেরা। পরে বিকেলে সেই ছাত্রীকে স্কুলের পাশে রেখে যায় তারা। পরদিন শুক্রবার সন্ধ্যায় নিজ ঘরে ফ্যানে ওড়না পেঁচিয়ে আত্মহত্যা করে স্কুলছাত্রী শিথী। ধারণা করা হচ্ছে,অপহরণ করার পর ঐ স্কুলছাত্রীকে ধর্ষণ করেছে বখাটেরা। অপমানে লজ্জায় আত্মহত্যার পথ বেছে নিয়েছে সে।পুলিশ অপহরনকারী বখাটদের খুঁজছে। বারকয়েক পুরনো খবরের কাগজটি পড়েছিল শিশির । শিথীর কথা খুব করে মনে পড়ছিল শিশিরের । শিথী ছিল শিশিরের কাজিন, খালাতো বোন।মনে মনে শিথীকে ভালোবাসতো শিশির।শিথীও তাই। শিশিরকে লেখা শিথীর নকশাকরা চিঠিগুলির পরতে পরতে কি তার ভালোবাসার কথা লেখা ছিল না? পারিবারিকভাবেও কিছুটা কথা হয়ে ছিল । শিশির নিজেই একদিন খালাকে আম্মার সাথে আলাপ করতে দেখেছে ওদের দুজনকে নিয়ে । শিশির একমাত্র ছেলে , শিথীরও কোন ভাইবোন ছিল না তখন।বয়স হলেই বিয়ে দিয়ে দেবে । লজ্জাও লাগতো , ভালোও লাগতো শিশিরের । কেমন যেন একটা অদ্ভুত ভালোলাগা শিরশিরে অনুভূতি হতো! কিন্তু তা আর হলো কই? পুলিশ সেই বখাটেদের ধরেছিল।কিন্তু এই দেশে কারো বিচার হয়?রাজনৈতিক কানেকশন আর টাকার জোরে ঠিকই ছাড়া পেয়ে যায় ওরা। দু-তিনটি চিঠি বের করে সেরাতে আবার চোখের জলেই ভিজিয়ে ফেলেছিল শিশির। আরো একটি নির্ঘুম রাত কাটিয়েছিল সে।ধীরে ধীরে চোয়াল শক্ত হয়ে উঠেছিল তার।তখনই সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত করে ফেলেছিল,সার্জারিতেই স্পেশালিস্ট হতে হবে। ছয় গত ছয় বছর ধরে রমিজকে সাথে নিয়ে পত্রিকা ঘেটে আরো কয়েকজনকে খুঁজে বের করেছে শিশির।যাদের নিকটাত্মীয় কেউ এমন বর্বরতার শিকার হয়েছে,কিন্তু বিচার পায়নি।তথ্য-প্রম াণ যোগাড় করে নিশ্চিত হয়েছে,প্রকৃত দোষী কে?তাদেরকে চোখে চোখে রেখেছে । প্ল্যান করেছে । কীভাবে তাদেরকে ধরা যাবে।এই দেশের আইনের প্রতি শিশিরের আর ভরসা নেই । সিদ্ধান্ত নিয়েছে- নিজেই শাস্তি দেবে এই নরপশুদের।গড়ে তুলেছে ভ্রাম্যমান অপারেশন থিয়েটার । আধুনিক তথ্য-প্রযুক্তির ব্যবহার শিখিয়ে তৈরি করেছে দক্ষ স্পেশাল টিম।সেই টিম প্রথম সফল অভিযান চালিয়ে ধরে এনেছে রমিজের স্ত্রী জুলেখার ওপর নির্যাতনকারী নরপশু চেয়ারম্যান সুমন মন্ডলকে। এরপরের টার্গেট শিথীকে অপহরণকারীরা। একে একে সবাইকে শাস্তি দেয়া হবে। ‘মেরে ফেললেই তো হয়?’ রমিজের প্রশ্ন ছিল। সেটা নিয়ে চিন্তা করেছিল শিশির।তারপর ওদেরকে বলেছে,নাহ, আমরা খুনী হতে পারি না।আর মেরে ফেললে তো শেষ হয়ে গেলো। আমরা বরং এমন শাস্তি দেবো ওদের,যেন জীবনের প্রতিটা মুহূর্ত এই নরপশুগুলোকে প্রায়শ্চিত্ত করতে হয়।কষ্ট পেতে হয়।আমরা ওদের লিঙ্গ কেটে দেবো।অণ্ডকোষ ফেলে দেবো।হাতের আঙুলগুলো কেটে ফেলে দেবো।এই হবে ওদের দুনিয়ার শাস্তি। আর বাকিটা পরকালে পাবে ওরা। সাত রমিজের কান্না থেমেছে । ডাঃ শিশিরের পাশের চেয়ারে চুপচাপ বসে আছে এখন। ডাঃ শিশির বললেন,ঠিক আছে রমিজ ভাই,ওকে দিয়েই আমরা আমাদের কাজ শুরু করছি।যাও,সবাইকে রেডি করো,দশ মিনিট পরে আমি আসছি। ওটিতে ঢুকে ডাঃ শিশির দেখলেন, সুমন চেয়ারম্যানকে বেঁধে ফেলা হয়েছে। অ্যানেস্থেশিয়া ছাড়াই,অর্থাৎ অজ্ঞান না করে,অবশ না করেই চরম কষ্ট দিয়ে করা হবে এই Emasculation and Castration (লিঙ্গ কর্তন) অপারেশন।পেনিস কেটে ফেলা হবে। অণ্ডকোষও রিমুভ করা হবে। পুরুষত্বহীন করে ফেলা হবে।কেটে ফেলা হবে হাতের আঙ্গুল। বাকি জীবনটা এই নরপশুদের এভাবেই কাটাতে হবে। অণ্ডকোষ (Testes) ফেলে দেয়ায় এদের শরীরে হরমোনাল ইম্ব্যালেন্স হবে । ফলে ধীরে ধীরে আরো নানারকম রোগের কবলে পড়বে এই নরপশুরা।জীবনে যতদিন বাঁচবে,প্রতিটি মুহূর্ত এরা যেন ভাবতে বাধ্য হয়,কী ভুল জীবনে করেছিলাম। একটা গভীর নিঃশ্বাস নিয়ে হাতে গ্লাভস পরলেন ডাঃ শিশির। উৎসর্গঃ নারী নির্যাতনকারী সকল নরপশুদের Copy


এডিট ডিলিট প্রিন্ট করুন  অভিযোগ করুন     

গল্পটি পড়েছেন ২১০৮৪ জন


এ জাতীয় গল্প

→ ইমাসকুলেশন

গল্পটির রেটিং দিনঃ-

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now