বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
কুরআনের আয়াত থেকে নদী-প্রকৃতির পাঠ
------মোহাম্মদ শাহজামান শুভ
গ্রন্থালোচনা
পানি সম্পর্কিত কুরআনের আয়াত ও পরিবেশ প্রকৃতি
লেখকঃ মতিন সৈকত
প্রকাশকঃ প্রিয়মুখ প্রকাশন,ঢাকা
ISbn: 978-984-29324-65
গ্রন্থস্বত্তঃ লেখক
প্রচ্ছদঃ অবনীল
১০ ফর্মা,১৬০ পৃষ্ঠা
মূল্য ৪৯৯ টাকা
মানুষের সভ্যতার ইতিহাস মূলত পানির কাছেই লেখা হয়েছে। নদীর তীরে বসতি গড়ে উঠেছে, নদীকে কেন্দ্র করে কৃষি ও বাণিজ্যের বিস্তার ঘটেছে, সমুদ্র পেরিয়ে মানুষ আবিষ্কার করেছে নতুন ভূখণ্ড, আবার পানির অভাব কিংবা জলবায়ুর পরিবর্তন বহু সভ্যতার অস্তিত্বকেও বিপন্ন করেছে। পানি তাই কেবল একটি প্রাকৃতিক সম্পদ নয়; এটি জীবন, সভ্যতা, অর্থনীতি, সংস্কৃতি এবং মানুষের অস্তিত্বের সঙ্গে নিবিড়ভাবে যুক্ত একটি মৌল উপাদান। এই বহুমাত্রিক পানিকে পবিত্র কুরআনের আয়াত, প্রকৃতি-পরিবেশ এবং সমকালীন সংকটের আলোকে পাঠ করার প্রয়াস নিয়েছেন মতিন সৈকত তাঁর গ্রন্থ ‘পানি সম্পর্কিত কুরআনের আয়াত ও পরিবেশ-প্রকৃতি’-তে। গ্রন্থটি একই সঙ্গে ধর্মীয় পাঠ, প্রকৃতি পর্যবেক্ষণ, পরিবেশচেতনা ও ব্যক্তিগত অনুসন্ধানের দলিল।
এই গ্রন্থের বিশেষত্ব প্রথমেই এর বিষয় নির্বাচনে। কুরআনের সঙ্গে প্রকৃতির সম্পর্ক নিয়ে আলোচনা নতুন নয়; কিন্তু পানিকে কেন্দ্র করে কুরআনের আয়াত সংগ্রহের সঙ্গে বাংলাদেশের নদী-নালা, জলাশয়, সমুদ্র, জীববৈচিত্র্য এবং বৈশ্বিক পরিবেশ-বাস্তবতাকে একই পাঠের মধ্যে নিয়ে আসার প্রয়াসটি স্বতন্ত্র। লেখক পানি সম্পর্কে কুরআনের বক্তব্যকে শুধু ধর্মীয় বিধান বা আধ্যাত্মিক প্রতীকের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখেননি; বরং তা থেকে পরিবেশ-প্রকৃতি সম্পর্কে মানুষের দায়িত্বের প্রশ্নটি সামনে এনেছেন। ফলে গ্রন্থটির কেন্দ্রে রয়েছে একটি মৌল প্রশ্ন—প্রকৃতি ও পানি সম্পর্কে মানুষের আচরণ কেমন হওয়া উচিত?
গ্রন্থের ভূমিকা পাঠ করলে বোঝা যায়, এটি কোনো আকস্মিক বা বিচ্ছিন্ন লেখার ফসল নয়। লেখক জানিয়েছেন, তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে তিনি নদ-নদী, খাল-বিল, জলাশয়, পরিবেশ-প্রকৃতি ও জলবায়ু নিয়ে কাজ করছেন। নদীর প্রতি তাঁর দীর্ঘদিনের আগ্রহ তাঁকে কুরআনের আয়াতের দিকে নতুন করে তাকাতে উদ্বুদ্ধ করেছে। অর্থসহ কুরআন পাঠ করতে গিয়ে নদী, বৃষ্টি, মেঘ, বায়ু, সমুদ্র, নৌযান, ঝর্ণা ও জলধারা সম্পর্কে অসংখ্য আয়াত তাঁর দৃষ্টি আকর্ষণ করে। এখানেই গ্রন্থটির প্রথম গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য—ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে ধর্মীয় পাঠে এবং ধর্মীয় পাঠ থেকে পরিবেশ-চেতনায় পৌঁছানোর একটি স্বাভাবিক বৌদ্ধিক যাত্রা।
এই যাত্রাকে নিছক গবেষণার ভাষায় ধরলে গ্রন্থটির একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক আড়াল হয়ে যায়। কারণ মতিন সৈকতের কাছে নদী কেবল জলপ্রবাহ নয়। নদী তাঁর অভিজ্ঞতার অংশ, তাঁর পর্যবেক্ষণের বিষয় এবং তাঁর অনুভূতিরও অনুষঙ্গ। ফলে তাঁর নদীচিন্তায় তথ্যের পাশাপাশি মমত্ববোধ কাজ করে। “আমার নদ কালাডুমুর”, “যমুনা জাগায় জীবনের জয়গান”, “মেঘবতী মেঘনা”, “বাড়ির পাশে বঙ্গোপসাগর”—এই শিরোনামগুলোই তার প্রমাণ। এগুলো নিছক তথ্যভিত্তিক প্রবন্ধের শিরোনাম নয়; এর মধ্যে নদী ও জলভূমির সঙ্গে লেখকের এক ধরনের আত্মীয়তা প্রকাশ পায়।
গ্রন্থটির সূচিপত্রও লেখকের চিন্তার বিস্তারকে নির্দেশ করে। শুরু হয়েছে “পানি সম্পর্কিত কুরআনের আয়াত” দিয়ে; এরপর এসেছে কালাডুমুর, পদ্মা, যমুনা, মেঘনা, বঙ্গোপসাগর, বাংলাদেশের নদী-খাল-জলাশয়, নাগরিক বর্জ্য, পরিবেশ বিপর্যয় ও সুন্দরবন। তারপর আলোচনার পরিসর বিস্তৃত হয়েছে নীল নদ, আমাজন, ভারত মহাসাগর, অ্যান্টার্কটিকা, প্রশান্ত মহাসাগর, সুমেরু অঞ্চল, আন্দামান, আরব সাগর, লোহিত সাগর, ভূমধ্যসাগর, কাসপিয়ান সাগর ও আটলান্টিক মহাসাগর পর্যন্ত। এই বিন্যাসে একটি বিশেষ দৃষ্টিভঙ্গি কাজ করেছে—স্থানীয় ভূগোল থেকে বৈশ্বিক ভূগোলে এবং ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে বিশ্বপ্রকৃতির দিকে অগ্রসর হওয়া।
এই স্থানীয় থেকে বৈশ্বিক যাত্রাই গ্রন্থটির একটি বড় শক্তি। একজন বাংলাদেশের পাঠক যখন পদ্মা, যমুনা বা মেঘনার কথা পড়েন, তখন তিনি নিজের পরিচিত ভূগোলের মধ্যে প্রবেশ করেন। আবার সেই পাঠ যখন নীল নদ, আমাজন কিংবা আটলান্টিক মহাসাগরে পৌঁছে যায়, তখন তাঁর দৃষ্টিও বিস্তৃত হয়। প্রকৃতি তখন আর কেবল নিজের গ্রামের পুকুর, পাশের নদী কিংবা পরিচিত জলাভূমিতে সীমাবদ্ধ থাকে না; তা হয়ে ওঠে একটি বিশ্বজনীন পরিসর। এই দৃষ্টিতে গ্রন্থটি স্থানীয় পরিবেশ-সচেতনতার সঙ্গে বৈশ্বিক পরিবেশচিন্তার একটি সেতুবন্ধন নির্মাণ করে।
তবে গ্রন্থটির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক সম্ভবত ধর্মীয় পাঠ ও পরিবেশ-চেতনার সংযোগ। কুরআনে পানি সম্পর্কে যে বক্তব্যগুলো এসেছে, লেখক সেগুলোকে সৃষ্টিজগতের প্রতি মানুষের দায়িত্বের সঙ্গে যুক্ত করতে চেয়েছেন। “আমি পানি থেকে সব জীবন্ত বস্তুকে সৃষ্টি করেছি”—এই কুরআনিক বক্তব্যকে সামনে রেখে তিনি পানির অস্তিত্বগত গুরুত্বকে ব্যাখ্যা করেন। এখানে পানি শুধু পান করার বস্তু নয়; পানি জীবনচক্রের অংশ। বৃষ্টি কৃষিকে সমৃদ্ধ করে, নদী জনপদকে বাঁচিয়ে রাখে, জলাশয় জীববৈচিত্র্যের আশ্রয়স্থল হয়, আর সমুদ্র পৃথিবীর জলবৈশ্বিক ব্যবস্থার অপরিহার্য অংশ। অর্থাৎ পানি নিয়ে কথা বলতে গিয়ে লেখক শেষ পর্যন্ত জীবনের কথাই বলেন।
এই জায়গাতেই গ্রন্থটি পরিবেশ-সাহিত্যের সঙ্গে যুক্ত হয়ে ওঠে। পরিবেশ-সাহিত্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো মানুষ ও প্রকৃতির সম্পর্ককে নতুনভাবে দেখা। আধুনিক সভ্যতার এক বড় সংকট হলো প্রকৃতিকে কেবল ভোগের উপাদান হিসেবে বিবেচনা করা। নদী হয়ে ওঠে দখলের জমি, জলাশয় হয়ে ওঠে আবাসন প্রকল্পের সম্ভাব্য স্থান, বন হয়ে ওঠে সম্পদের উৎস এবং সমুদ্র হয়ে ওঠে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের বিস্তৃত ক্ষেত্র। মতিন সৈকতের লেখায় এর বিপরীতে প্রকৃতির একটি নৈতিক মর্যাদা প্রতিষ্ঠার চেষ্টা দেখা যায়। তাঁর বক্তব্যের অন্তর্নিহিত অর্থ হলো—যে পানি জীবন সৃষ্টি ও ধারণ করে, সেই পানিকে ধ্বংস করার অধিকার মানুষের নেই।
এই ভাবনার সঙ্গে “বাংলাদেশের অস্তিত্ব বিপন্ন হচ্ছে খাল-নদী জলাশয় সংকটে” শিরোনামটি বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। বাংলাদেশের মতো নদীমাতৃক দেশে নদী-খাল-জলাশয়ের সংকট কেবল পরিবেশের সমস্যা নয়; এটি কৃষি, জীববৈচিত্র্য, জনস্বাস্থ্য, অর্থনীতি এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের অস্তিত্বের সঙ্গেও যুক্ত। লেখকের উদ্বেগ তাই ব্যক্তিগত আবেগের সীমায় থাকে না; তা জাতীয় পরিবেশ-বাস্তবতার দিকে প্রসারিত হয়।
একইভাবে “নাগরিক বর্জ্য থেকে নাগরিক সার” বিষয়টি দেখায় যে লেখক শুধু প্রকৃতির সৌন্দর্য নিয়ে আবেগপ্রবণ নন; পরিবেশ ব্যবস্থাপনার ব্যবহারিক দিক নিয়েও তাঁর আগ্রহ রয়েছে। নগরায়ণ ও ভোগবাদী জীবনযাত্রার ফলে বর্জ্য আজ পরিবেশের অন্যতম বড় সংকট। বর্জ্যকে সম্পদে রূপান্তরের ধারণা পরিবেশচিন্তাকে বাস্তব ব্যবস্থাপনার সঙ্গে যুক্ত করে। ফলে গ্রন্থে পরিবেশপ্রেম কেবল নান্দনিক অনুভূতি নয়; এর মধ্যে সামাজিক দায়িত্বের প্রশ্নও আছে।
তবে এখানেই গ্রন্থটির সমালোচনামূলক পাঠের প্রয়োজন দেখা দেয়। কুরআনিক আয়াত এবং আধুনিক বৈজ্ঞানিক তথ্যকে পাশাপাশি রাখার ক্ষেত্রে একটি সূক্ষ্ম ভারসাম্য জরুরি। কুরআন একটি ধর্মীয় ও নৈতিক গ্রন্থ; আধুনিক পরিবেশবিজ্ঞান একটি প্রমাণনির্ভর জ্ঞানশাস্ত্র। দুটির মধ্যে ভাবগত সাদৃশ্য বা পারস্পরিক অনুপ্রেরণার জায়গা থাকতে পারে, কিন্তু একটির বক্তব্যকে সরাসরি অন্যটির বৈজ্ঞানিক সূত্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার প্রবণতা এড়িয়ে চলা প্রয়োজন। গ্রন্থটির ভবিষ্যৎ সংস্করণে এই পার্থক্যটি আরও স্পষ্টভাবে চিহ্নিত করা গেলে এর বৌদ্ধিক গ্রহণযোগ্যতা বৃদ্ধি পাবে। ধর্মীয় বিশ্বাসের শক্তি এবং বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধানের স্বাতন্ত্র্য—দুটিকে পাশাপাশি রাখাই এখানে অধিক ফলপ্রসূ পদ্ধতি হতে পারে।
গ্রন্থটির আরেকটি আলোচনাযোগ্য দিক হলো তথ্যসংকলনের বিস্তৃতি। লেখক বহু নদী, সাগর, মহাসাগর ও পরিবেশগত বিষয়কে এক গ্রন্থে অন্তর্ভুক্ত করেছেন। এই বিস্তৃতি পাঠককে একটি বিশ্বভূগোলের সঙ্গে পরিচিত করে; কিন্তু একই সঙ্গে একটি প্রশ্নও তৈরি করে—এই বৈচিত্র্যময় বিষয়গুলো কি সবসময় একটি অভিন্ন সাহিত্যিক কাঠামোর মধ্যে আবদ্ধ থাকে? কোথাও কোথাও বিষয়বৈচিত্র্য মূল কেন্দ্রীয় ভাবনাকে ছড়িয়ে দিতে পারে। কুরআনের পানি-ভাবনা, বাংলাদেশের নদী সংকট এবং বিশ্বজলভূগোল—এই তিনটি স্তরকে আরও সুস্পষ্ট বিভাগে বিন্যস্ত করা গেলে গ্রন্থটির স্থাপত্য আরও দৃঢ় হতে পারত।
তবু এই সীমাবদ্ধতা গ্রন্থটির মৌলিক গুরুত্বকে খাটো করে না। বরং বলা যায়, গ্রন্থটির বিস্তারই এর একটি স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য। লেখক এক জায়গায় থেমে থাকতে চাননি। তাঁর কৌতূহল নদী থেকে সমুদ্রে, সমুদ্র থেকে মহাসাগরে এবং পরিচিত ভূগোল থেকে অপরিচিত ভূগোলে ছড়িয়ে পড়েছে। এই অনুসন্ধিৎসাই গ্রন্থটির প্রাণ।
ভাষার ক্ষেত্রেও মতিন সৈকতের নিজস্বতা রয়েছে। তাঁর গদ্য একদিকে সরল ও পাঠযোগ্য, অন্যদিকে ধর্মীয় অনুভূতি ও প্রকৃতিপ্রেমে আবেগঘন। তিনি কঠিন তাত্ত্বিক পরিভাষার বদলে সাধারণ পাঠকের উপযোগী ভাষা ব্যবহার করেছেন। ফলে গ্রন্থটি বিশেষজ্ঞ পাঠকের পাশাপাশি সাধারণ পাঠকের কাছেও গ্রহণযোগ্য হওয়ার সম্ভাবনা রাখে। তবে সাহিত্য পত্রিকার বিচারে গদ্যের আরও সংহত সম্পাদনা, একই বক্তব্যের পুনরাবৃত্তি হ্রাস এবং তথ্যের সঙ্গে নান্দনিকতার ভারসাম্য রক্ষা করলে রচনাগুলোর শিল্পমান আরও উন্নত হতে পারে।
গ্রন্থটির একটি আবেগময় দিক রয়েছে লেখকের ব্যক্তিগত ঈমানি উপলব্ধিতে। তিনি কুরআনকে “জ্ঞানের উৎস” এবং “হিদায়েতের অমিয়বাণী” হিসেবে অভিহিত করেছেন এবং পাঠককে কুরআনের আলোয় উদ্ভাসিত হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। এই বক্তব্য তাঁর লেখার বিশ্বাসভিত্তিক চরিত্রকে স্পষ্ট করে। সাহিত্যিক বিচারে এর গুরুত্ব এই যে, এখানে প্রকৃতিপাঠ একটি আত্মিক পাঠে পরিণত হয়েছে। নদীর পানি শুধু নদীর পানি থাকে না; তা স্রষ্টার সৃষ্টির নিদর্শন হয়ে ওঠে। বৃষ্টির জল শুধু জলচক্রের অংশ নয়; তা হয়ে ওঠে রহমতের স্মারক। সমুদ্রের বিস্তার কেবল ভূগোল নয়; তা মানুষের সীমাবদ্ধতার বিপরীতে সৃষ্টির অসীমতার অনুভূতি জাগায়।
এই জায়গায় গ্রন্থটির সঙ্গে প্রকৃতিসাহিত্যের একটি গভীর সম্পর্ক তৈরি হয়। প্রকৃতিকে ভালোবাসা এখানে নিছক সৌন্দর্যবোধ নয়; এর সঙ্গে নৈতিকতা ও আত্মিকতার সম্পর্ক রয়েছে। নদীকে ভালোবাসা মানে নদীকে দখলমুক্ত রাখার দায় গ্রহণ করা, জলাশয়কে ভালোবাসা মানে তার দূষণ রোধ করা, সমুদ্রকে ভালোবাসা মানে তার জীববৈচিত্র্যের প্রতি দায়িত্বশীল হওয়া। এই নৈতিক প্রকৃতিপাঠই গ্রন্থটির সবচেয়ে সম্ভাবনাময় দিক।
তবে গ্রন্থটির পাঠ আরও সমৃদ্ধ হতে পারত যদি লেখক কুরআনিক আয়াতের পাশাপাশি বাংলাদেশের লোকসংস্কৃতি, নদীকেন্দ্রিক গান, কবিতা, লোককথা ও সাহিত্যেও পানির উপস্থিতির সঙ্গে তুলনামূলক সংযোগ স্থাপন করতেন। কারণ বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক পরিচয়ের সঙ্গে নদী ও পানি এত গভীরভাবে যুক্ত যে কুরআনিক প্রকৃতিচেতনার সঙ্গে বাংলা সাহিত্য ও লোকঐতিহ্যের নদীভাবনার সংলাপ একটি নতুন মাত্রা সৃষ্টি করতে পারত। রবীন্দ্রনাথ, জীবনানন্দ, জসীমউদ্দীন কিংবা নদীকেন্দ্রিক লোকসাহিত্যের নির্বাচিত অনুষঙ্গ যুক্ত হলে গ্রন্থটির সাহিত্যিক পরিসর আরও বিস্তৃত হতে পারত। তবে এটি বর্তমান গ্রন্থের ত্রুটির চেয়ে বরং এর সম্ভাব্য সম্প্রসারণের ক্ষেত্র।
সব মিলিয়ে মতিন সৈকতের ‘পানি সম্পর্কিত কুরআনের আয়াত ও পরিবেশ-প্রকৃতি’ এমন একটি গ্রন্থ, যেখানে ধর্মীয় বিশ্বাস, ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা, নদীপ্রেম, পরিবেশ-সচেতনতা এবং বিশ্বপ্রকৃতির প্রতি কৌতূহল একই প্রবাহে মিলিত হয়েছে। এর কেন্দ্রীয় প্রতীক পানি—কিন্তু সেই পানি ক্রমে জীবন, প্রকৃতি, সভ্যতা, নৈতিকতা এবং স্রষ্টার সৃষ্টিজগতের প্রতীকে পরিণত হয়েছে।
গ্রন্থটির সবচেয়ে বড় সাফল্য সম্ভবত এই যে, এটি পাঠককে পানির দিকে নতুন চোখে তাকাতে শেখায়। যে নদী প্রতিদিন চোখের সামনে দিয়ে বয়ে যায়, যে বৃষ্টি জানালার কাচে এসে পড়ে, যে জলাশয় গ্রামের পাশে নিঃশব্দে পড়ে থাকে কিংবা যে সমুদ্রকে আমরা দূর থেকে কল্পনা করি—এসবের প্রতিটির মধ্যেই লেখক একটি বৃহত্তর সৃষ্টিতত্ত্বের ইঙ্গিত খুঁজে পান। তাঁর পাঠে প্রকৃতি তাই কেবল দৃশ্য নয়; প্রকৃতি একটি পাঠ্য, একটি নিদর্শন, একটি দায়িত্ব।
আজকের পৃথিবীতে যখন নদী হারিয়ে যাচ্ছে, জলাশয় ভরাট হচ্ছে, ভূগর্ভস্থ পানির স্তর কমছে, জলবায়ু পরিবর্তন পানির স্বাভাবিক চক্রকে বিপন্ন করছে এবং নিরাপদ পানির প্রশ্ন ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে, তখন পানিকে কেন্দ্র করে এমন একটি আন্তঃবিষয়ক পাঠের প্রয়োজনীয়তা অনস্বীকার্য। মতিন সৈকতের গ্রন্থ সেই প্রয়োজনের একটি স্বতন্ত্র উত্তর। এর ভাষা ও বিন্যাসে আরও সম্পাদনাগত সংহতি এবং বৈজ্ঞানিক সূত্রনির্ভরতা যোগ হলে এর মূল্য আরও বাড়বে; কিন্তু এর অন্তর্নিহিত প্রকৃতিপ্রেম, কুরআন-অনুসন্ধান এবং পরিবেশনৈতিক আহ্বান ইতিমধ্যেই গ্রন্থটিকে একটি স্বতন্ত্র পরিচয় দিয়েছে।
‘পানি সম্পর্কিত কুরআনের আয়াত ও পরিবেশ-প্রকৃতি’ কেবল পানিকে নিয়ে লেখা একটি গ্রন্থ নয়; এটি পানির ভেতর দিয়ে জীবনকে দেখার, প্রকৃতির ভেতর দিয়ে স্রষ্টার নিদর্শন অনুধাবনের এবং পরিবেশ সংকটের ভেতর দিয়ে মানুষের দায়িত্বকে পুনর্বিবেচনার একটি প্রয়াস। মতিন সৈকতের নদী-অভিজ্ঞতা ও কুরআন পাঠের সংযোগ থেকে যে সাহিত্যিক বয়ান তৈরি হয়েছে, তার মূল সুর একটাই—প্রকৃতিকে ধ্বংস করে মানুষ নিজের ভবিষ্যৎ নির্মাণ করতে পারে না। পানি বাঁচলে জীবন বাঁচবে; নদী বাঁচলে জনপদ বাঁচবে; প্রকৃতি বাঁচলে মানবসভ্যতার ভবিষ্যৎও বেঁচে থাকবে। আর সেই বোধকে ধর্মীয় বিশ্বাস, ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা ও পরিবেশচেতনার সম্মিলিত আলোয় পাঠ করাই এই গ্রন্থের প্রধান তাৎপর্য।
পানি সম্পর্কিত কুরআনের আয়াত ও পরিবেশ প্রকৃতি লেখক মতিন সৈকতের পঞ্চম বই। ১৯৮৭ সালে এসএসসি পরীক্ষার সময় তার প্রথম বই কবিতা পত্র, ১৯৮৯ সালে অলংকার কাব্য গ্রন্থ প্রকাশিত হয়। ২০০৪-৫ সালে প্রকাশিত গল্প গ্রন্থ মুক্তি চাই, তোমরাও সুখেই আছো।
তিনি একাধারে কবি, গল্পকার, প্রাবন্ধিক। একসময়ে জাতীয় দৈনিকে প্রচুর লেখেন। তিনি সহকারী অধ্যাপক, রিসোর্স পারসন। কৃষি পরিবেশ সামাজিক উন্নয়নে তিনি চারবার জাতীয় পদক প্রাপ্ত এগ্রিকালচারাল ইম্পর্ট্যান্ট পারসন এআইপি। সাহিত্য চর্চার জন্য তিনি কৈশোরে রাষ্ট্রপতির অভিনন্দন পত্র পেয়েছেন।
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now