বাংলা গল্প পড়ার অন্যতম ওয়েবসাইট - গল্প পড়ুন এবং গল্প বলুন
বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ

শান্তি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র

"মজার গল্প" বিভাগে গল্পটি দিয়েছেন গল্পের ঝুরিয়ান মোহাম্মদ শাহজামান শুভ (০ পয়েন্ট)

X মোহাম্মদ শাহজামান শুভ আমাদের গ্রামে আগে একটি মাত্র প্রশিক্ষণ কেন্দ্র ছিল—সেটি ছিল চায়ের দোকান। সেখানে বসেই মানুষ রাজনীতি শিখত, অর্থনীতি শিখত, ক্রিকেট শিখত, এমনকি প্রতিবেশীর পারিবারিক কলহের কারণও বিশ্লেষণ করত। কিন্তু সময় বদলেছে। এখন সবাই বিশেষজ্ঞ। ফলে বিশেষজ্ঞদেরও বিশেষজ্ঞ লাগছে। গত মাসে উপজেলা সদরে একটি নতুন প্রতিষ্ঠান চালু হয়েছে—“জাতীয় শান্তি ও স্থিরতা উন্নয়ন প্রশিক্ষণ কেন্দ্র”। সাইনবোর্ডে বড় বড় অক্ষরে লেখা— “রাগ করবেন না, আগে ভাবুন।” বোর্ডের নিচে ছোট অক্ষরে আরেকটি লাইন— “ভর্তি ফি ফেরতযোগ্য নয়।” আমি সাংবাদিকতার নেশায় আক্রান্ত একজন সাধারণ মানুষ। তাই ঘটনাটি তদন্ত করতে গেলাম। প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের পরিচালক জনাব স্থিরচন্দ্র বাবু আমাকে স্বাগত জানালেন। তিনি বললেন, —আমাদের লক্ষ্য দেশের মানুষকে শান্ত করা। আমি বললাম, —চমৎকার উদ্যোগ। এখানে কী শেখানো হয়? তিনি গর্বভরে বললেন, —তিনটি বিষয়। এক, সঙ্গে সঙ্গে প্রতিক্রিয়া দেওয়া যাবে না। দুই, সমস্যা নয়, সমাধানে মনোযোগ দিতে হবে। তিন, দীর্ঘমেয়াদী চিন্তা করতে হবে। কথাগুলো শুনে আমি মুগ্ধ হলাম। কিন্তু মুগ্ধতা স্থায়ী হলো মাত্র পাঁচ মিনিট। হঠাৎ বাইরে প্রচণ্ড চিৎকার শোনা গেল। দৌড়ে গিয়ে দেখি, প্রশিক্ষণার্থীদের দুই গ্রুপ হাতাহাতির পর্যায়ে পৌঁছে গেছে। একদল চিৎকার করছে, —আমরা আগে শান্ত হব! অন্যদল পাল্টা বলছে, —না, আগে আমরা শান্ত হব! পরিস্থিতি ক্রমেই উত্তপ্ত হচ্ছে। আমি অবাক হয়ে পরিচালককে জিজ্ঞেস করলাম, —এরা কি আপনার ছাত্র? তিনি বিরক্ত মুখে বললেন, —হ্যাঁ। —তাহলে এরা মারামারি করছে কেন? তিনি দাঁত চেপে বললেন, —কারণ এখনো কোর্স শেষ হয়নি! আমি দেখলাম, একজন প্রশিক্ষক দৌড়ে এসে সবাইকে শান্ত করার চেষ্টা করছেন। তিনি চিৎকার করে বললেন, —কেউ সঙ্গে সঙ্গে প্রতিক্রিয়া দেখাবেন না! কথা শেষ হওয়ার আগেই এক ভদ্রলোক বললেন, —আপনি আমাকে নির্দেশ দিলেন কেন? অন্যজন বললেন, —আমাকে আগে বললেন না কেন? তৃতীয়জন বললেন, —এটা আমার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র! তারপর সবাই মিলে “প্রতিক্রিয়া না দেওয়ার” প্রতিবাদে জোরালো প্রতিক্রিয়া দেখাতে শুরু করলেন। পরিস্থিতি সামাল দিতে কর্তৃপক্ষ জরুরি সভা ডাকল। সভায় সিদ্ধান্ত হলো, গ্রামের সব জনপ্রতিনিধি, ব্যবসায়ী, শিক্ষক এবং সামাজিক কর্মীদের জন্য বিশেষ শান্তি প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হবে। প্রথম ব্যাচেই ইউনিয়নের কয়েকজন নেতা ভর্তি হলেন। ক্লাসে প্রশিক্ষক প্রশ্ন করলেন, —ধরুন কেউ আপনাকে অপমান করল। তখন কী করবেন? এক নেতা সঙ্গে সঙ্গে দাঁড়িয়ে বললেন, —প্রথমে প্রতিবাদ মিছিল করব। প্রশিক্ষক বললেন, —না, শান্ত থাকতে হবে। নেতা মাথা নেড়ে বললেন, —ঠিক আছে। আগে শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ মিছিল করব। আরেক নেতা বললেন, —আমি ফেসবুকে লাইভে এসে বলব, আমি খুবই শান্ত আছি। যারা বলছে আমি রেগে গেছি, তারা দেশের শত্রু। প্রশিক্ষক কপালে হাত দিলেন। এদিকে ব্যবসায়ীদের ক্লাসে নতুন সমস্যা দেখা দিল। তাদের শেখানো হলো, সমস্যা নয়, সমাধানে মনোযোগ দিতে হবে। পরদিন বাজারে গিয়ে দেখা গেল এক ব্যবসায়ী দুধে পানি মিশিয়ে বিক্রি করছেন। ক্রেতা অভিযোগ করলেন, —ভাই, দুধে পানি কেন? ব্যবসায়ী হাসিমুখে বললেন, —সমস্যা নিয়ে ভাববেন না। সমাধানে মনোযোগ দিন। —মানে? —এখন আপনার কাছে দুধও আছে, পানিও আছে। আলাদা করে পানি কিনতে হচ্ছে না। ক্রেতা হতবাক। কিন্তু ব্যবসায়ী অত্যন্ত শান্ত। কারণ তিনি প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত। অন্যদিকে স্থানীয় একটি বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা এই প্রশিক্ষণে বিশেষ উৎসাহ দেখালেন। তাদের শেখানো হলো, কোনো সমস্যা দেখলে দীর্ঘমেয়াদী চিন্তা করতে হবে। পরের সপ্তাহে স্কুলের ছাদ চুঁইয়ে পানি পড়তে শুরু করল। এক শিক্ষক বললেন, —এখনই মেরামত করা দরকার। অন্য শিক্ষক শান্তভাবে বললেন, —এক বছর পরে এই সমস্যার গুরুত্ব থাকবে? প্রথম শিক্ষক বললেন, —তখন তো পুরো ছাদ ভেঙে পড়বে! দ্বিতীয় শিক্ষক বিজয়ীর হাসি হেসে বললেন, —দেখলেন? তখন বর্তমান সমস্যাটা আর থাকবে না। দীর্ঘমেয়াদী চিন্তার জয় হলো। এদিকে প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের জনপ্রিয়তা দ্রুত বাড়তে লাগল। কারণ মানুষ এখন শান্ত থাকার চেয়ে শান্ত দেখাতে বেশি আগ্রহী। একজন জনপ্রতিনিধি সংবাদ সম্মেলনে ঘোষণা দিলেন, —আমি অত্যন্ত শান্ত মানুষ। সাংবাদিক প্রশ্ন করলেন, —আপনার বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ আছে। তিনি শান্তভাবে টেবিলে ঘুষি মেরে বললেন, —মিথ্যা! সম্পূর্ণ মিথ্যা! আরেকজন সাংবাদিক প্রশ্ন করলেন, —আপনি কি রেগে গেছেন? তিনি আরও জোরে ঘুষি মেরে বললেন, —আমি রাগিনি! আমি রাগিনি! আমি কখনো রাগি না! সেদিন টেবিলটি ভেঙে গিয়েছিল, কিন্তু তাঁর শান্ত ভাবমূর্তি অটুট ছিল। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও শান্তির জোয়ার বয়ে গেল। প্রতিদিন মানুষ পোস্ট দিতে লাগল— “আমি খুব শান্ত মানুষ।” পোস্টের নিচে পাঁচশো মন্তব্য। “আপনি শান্ত না।” “তুমি কে?” “তোর সাহস কত?” “ব্লক করলাম।” “আনফ্রেন্ড।” “দেখে নেব।” এভাবেই ডিজিটাল শান্তির চর্চা চলতে লাগল। আমাদের গ্রামের মিজান চা-স্টলও পিছিয়ে রইল না। সেখানে এখন প্রতিদিন “শান্তি আলোচনা সভা” হয়। আলোচনার বিষয়—মানুষ কেন রাগ করে? দুই মিনিটের মধ্যেই আলোচনা রূপ নেয় তর্কে। পাঁচ মিনিট পরে তর্ক রূপ নেয় বিতর্কে। দশ মিনিট পরে বিতর্ক রূপ নেয় ব্যক্তিগত আক্রমণে। পনেরো মিনিট পরে সবাই ঘোষণা করে— “আমরা শান্ত আছি।” তারপর আবার নতুন করে ঝগড়া শুরু হয়। সবচেয়ে মজার ঘটনা ঘটল প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের বার্ষিক সম্মেলনে। সেখানে “বর্ষসেরা শান্ত মানুষ” পুরস্কার দেওয়া হবে। পুরস্কার পাওয়ার জন্য শতাধিক আবেদন জমা পড়েছে। বিচারকরা যখন অন্য একজনের নাম ঘোষণা করলেন, তখন বাকি নিরানব্বইজন প্রার্থী ক্ষুব্ধ হয়ে উঠলেন। একজন বললেন, —আমার চেয়ে শান্ত মানুষ পৃথিবীতে নেই! অন্যজন বললেন, —এই নির্বাচন কারচুপিপূর্ণ! তৃতীয়জন বললেন, —আমি প্রতিবাদে শান্তি ত্যাগ করছি! অবশেষে সম্মেলন স্থগিত করতে হলো। কারণ সবাই প্রমাণ করতে ব্যস্ত ছিলেন যে তিনিই সবচেয়ে শান্ত। বাড়ি ফেরার সময় পরিচালক স্থিরচন্দ্র বাবুকে কিছুটা বিষণ্ন দেখাল। আমি জিজ্ঞেস করলাম, —আপনার এত কষ্ট কেন? তিনি দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, —মানুষ শান্ত থাকার কৌশল শিখতে আসে, কিন্তু বেশিরভাগই শান্ত থাকার সনদ নিতে আসে। আমি বললাম, —তাহলে সমাধান কী? তিনি কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন। তারপর বললেন, —সমস্যা হলো, সবাই অন্যকে বদলাতে চায়; নিজেকে নয়। সবাই শুনতে চায়, কিন্তু শোনার জন্য নয়—উত্তর দেওয়ার জন্য। সবাই ভবিষ্যৎ নিয়ে কথা বলে, কিন্তু পাঁচ মিনিট অপেক্ষা করতে রাজি নয়। তাই শান্তি শেখার সবচেয়ে বড় বাধা হলো মানুষ নিজেই। ফেরার পথে আমি ভাবলাম, সত্যিই তো—আমরা এমন এক যুগে বাস করছি, যেখানে সবাই শান্তির পক্ষে, কিন্তু কেউ নিজের মতের বিরুদ্ধে একটি বাক্যও শান্তভাবে শুনতে প্রস্তুত নয়। আমরা সমস্যা সমাধানের কথা বলি, অথচ সমস্যার চেয়ে বড় করে তুলি নিজের অহংকে। আমরা দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনার কথা বলি, কিন্তু মোবাইলের ধীরগতির ইন্টারনেটও এক মিনিট সহ্য করতে পারি না। তাই মনে হয়, দেশের সবচেয়ে প্রয়োজনীয় প্রতিষ্ঠান হয়তো আরেকটি শান্তি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র নয়; বরং একটি “ধৈর্য সংরক্ষণাগার”, যেখানে মানুষ অন্তত কয়েক মিনিট নিজের মতামতকে বিশ্রাম দিয়ে অন্যের কথা শুনতে শিখবে। সেদিন হয়তো সত্যিকারের শান্তির ক্লাস শুরু হবে। আর তার আগে পর্যন্ত আমরা সবাই শান্তির সার্টিফিকেট হাতে নিয়ে অশান্তির মিছিলে অংশ নিতে থাকব।


এডিট ডিলিট প্রিন্ট করুন  অভিযোগ করুন     

গল্পটি পড়েছেন ৭ জন


এ জাতীয় গল্প

গল্পটির রেটিং দিনঃ-

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now