বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
স্মৃতির সরকারি সংস্করণ: ইতিহাস, বিস্মৃতি ও রাষ্ট্রনির্মিত সত্যের এক ব্যঙ্গাত্মক মহাকাব্য
X
মোহাম্মদ শাহজামান শুভ
সমকালীন বাংলা সাহিত্যে রাজনৈতিক রূপক, ডিস্টোপিয়ান কল্পবাস্তবতা এবং সামাজিক ব্যঙ্গকে একত্রে ধারণ করে যে অল্পসংখ্যক উপন্যাস পাঠককে একই সঙ্গে আনন্দ, অস্বস্তি ও আত্মসমালোচনার দিকে ঠেলে দেয়, মোহাম্মদ শাহজামান শুভের “স্মৃতির সরকারি সংস্করণ” সেই ধারার একটি উল্লেখযোগ্য সংযোজন বলেই বিবেচিত হতে পারে। এটি কোনো নির্দিষ্ট রাষ্ট্র, সরকার কিংবা রাজনৈতিক মতাদর্শের বিরুদ্ধে লেখা সরাসরি আক্রমণাত্মক উপন্যাস নয়; বরং স্মৃতি, ইতিহাস, ক্ষমতা এবং মানুষের মানিয়ে নেওয়ার প্রবণতা নিয়ে রচিত এক গভীর ব্যঙ্গাত্মক রূপক। লেখক এমন এক কাল্পনিক রাষ্ট্র “অলিখিতপুর” নির্মাণ করেছেন, যেখানে ইতিহাস আর অতীতের দলিল নয়, বরং চলমান প্রশাসনিক প্রকল্প। ফলে ইতিহাস বই কখনো পুরোনো হয় না, কারণ প্রতি বছরই তা নতুন করে লেখা হয়।
উপন্যাসটির মূল শক্তি এর মৌলিক ধারণায়। রাষ্ট্র যদি একসময় সিদ্ধান্ত নেয় যে অতীত মানুষের জন্য ক্ষতিকর, তাহলে কী ঘটতে পারে? যদি সরকার ঘোষণা করে যে মানুষের মানসিক প্রশান্তির জন্য অস্বস্তিকর ইতিহাস মুছে ফেলা প্রয়োজন, তাহলে ইতিহাসের ভাগ্যে কী ঘটে? আরও বড় প্রশ্ন—মানুষের স্মৃতির কী হয়? লেখক এই প্রশ্নগুলোকে সরাসরি রাজনৈতিক বিতর্কে না নিয়ে গিয়ে এক ধরনের নরম ব্যঙ্গের মাধ্যমে অনুসন্ধান করেছেন। আর সেই কারণেই “স্মৃতির সরকারি সংস্করণ” কেবল একটি রাজনৈতিক উপন্যাস নয়; এটি স্মৃতি ও পরিচয়ের দার্শনিক অনুসন্ধানও।
অলিখিতপুর নামের কাল্পনিক রাষ্ট্রটি পাঠককে প্রথমে হাসায়। “জাতীয় মানসিক প্রশান্তি আইন”, “স্মৃতি সংশোধন দপ্তর”, “স্মৃতিভ্রংশ প্রতিযোগিতা”, “স্মৃতির ট্যাক্স”, “ভুলে যাওয়ার ওষুধ”—এসব নাম শুনে মনে হয় যেন কোনো ব্যঙ্গাত্মক নাটকের জগতে প্রবেশ করেছি। কিন্তু ধীরে ধীরে এই হাসির ভেতর থেকে ভয় জন্ম নিতে থাকে। কারণ পাঠক উপলব্ধি করতে শুরু করেন, এই কল্পিত সমাজের অনেক উপাদান বাস্তব পৃথিবীর নানা রাষ্ট্র, সমাজ কিংবা প্রতিষ্ঠানের আচরণের সঙ্গে আশ্চর্যরকমভাবে মিলে যায়। এখানেই উপন্যাসটির সাফল্য। এটি সরাসরি অভিযোগ তোলে না; বরং আয়নার মতো বাস্তবতাকে প্রতিফলিত করে।
উপন্যাসের কেন্দ্রীয় চরিত্র মাহতাব উদ্দিন একজন সাধারণ ইতিহাস শিক্ষক। সাহিত্যের দৃষ্টিতে এই চরিত্র নির্বাচন অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। লেখক কোনো বিপ্লবী নেতা, সাংবাদিক বা রাজনৈতিক কর্মীকে নায়ক করেননি। বরং এমন একজন মানুষকে বেছে নিয়েছেন, যার কাজই হলো অতীতকে মনে রাখা এবং অন্যদের মনে করিয়ে দেওয়া। ফলে যখন রাষ্ট্র অতীত মুছে ফেলার প্রকল্প হাতে নেয়, তখন সবচেয়ে বড় সংকটের মুখোমুখি দাঁড়ায় মাহতাব। সে গোপনে পুরোনো সংবাদপত্র, ডায়েরি, চিঠি এবং মানুষের মুখে মুখে প্রচলিত স্মৃতিগুলো সংগ্রহ করতে থাকে। কিন্তু উপন্যাসের সবচেয়ে ভয়াবহ ও মর্মস্পর্শী দিক হলো—একসময় সে আবিষ্কার করে, তার নিজের স্মৃতিও বদলে যাচ্ছে। এই আত্মসন্দেহই উপন্যাসটির কেন্দ্রীয় ট্র্যাজেডি।
“নতুন ইতিহাস আইন” এবং “বইয়ের প্রথম সংস্কার” অধ্যায় দুটি পুরো আখ্যানের ভিত্তি নির্মাণ করে। এখানে লেখক দেখিয়েছেন, ক্ষমতা কখনো কেবল বর্তমানকে নিয়ন্ত্রণ করে না; সে অতীতকেও নিজের প্রয়োজনমতো সাজাতে চায়। ইতিহাসকে পুনর্লিখনের এই প্রবণতা মানবসভ্যতার বহু পুরোনো বাস্তবতা। কিন্তু “স্মৃতির সরকারি সংস্করণ”-এ সেটি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে, যেখানে ইতিহাস আর গবেষণার বিষয় নয়; বরং প্রশাসনিক বিজ্ঞপ্তির অংশ। ফলে সত্য একটি চলমান নথিতে পরিণত হয়, যা প্রয়োজন অনুযায়ী সংশোধিত হতে পারে।
উপন্যাসের অন্যতম বড় সাহিত্যিক অর্জন হলো এর প্রতীক ব্যবহারের দক্ষতা। “পুরোনো ছবির নতুন মানুষ”, “যে কবি ছিলেন না”, “যে শহীদ পরে জন্মেছিল”, “যে রাস্তাটার নাম বদলায়” কিংবা “যে শহর নিজের জন্মদিন ভুলে গেল”—এসব অধ্যায়ের নামই একটি পূর্ণাঙ্গ ব্যঙ্গাত্মক দর্শন বহন করে। লেখক দেখিয়েছেন, ইতিহাস বিকৃতির সবচেয়ে বড় প্রভাব কেবল বইয়ে পড়ে না; তা মানুষের পরিচয়ের ওপরও আঘাত হানে। যখন একটি জাতি জানে না তার বীর কারা ছিলেন, কোন ঘটনা কখন ঘটেছিল, কিংবা কেন একটি রাস্তার নাম রাখা হয়েছিল, তখন সে ধীরে ধীরে নিজের অস্তিত্বের ভিত্তিও হারিয়ে ফেলে।
“অদৃশ্য লাইব্রেরি” অধ্যায়টি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। লাইব্রেরি আছে, কিন্তু বই নেই; বই আছে, কিন্তু মূল সংস্করণ নেই; ইতিহাস আছে, কিন্তু সত্য নেই। এই প্রতীকী নির্মাণ জর্জ অরওয়েলের ডিস্টোপিয়ান সাহিত্যের কথা মনে করিয়ে দেয়, যদিও মোহাম্মদ শাহজামান শুভের ভাষা ও সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডল সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র। তিনি আন্তর্জাতিক ডিস্টোপিয়ান ধারার প্রভাবকে স্থানীয় অভিজ্ঞতা ও বাঙালি ব্যঙ্গরীতির সঙ্গে মিশিয়ে নতুন এক বয়ান তৈরি করেছেন।
উপন্যাসে ব্যঙ্গের ব্যবহার অত্যন্ত সূক্ষ্ম। “স্মৃতিভ্রংশ প্রতিযোগিতা” অধ্যায়ে হয়তো নাগরিকদের মধ্যে এমন প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হয়, যেখানে সবচেয়ে বেশি ভুলে যেতে পারা মানুষ পুরস্কার পায়। পাঠক প্রথমে হাসে, কিন্তু কিছুক্ষণ পর উপলব্ধি করে—সমাজে এমন প্রবণতা কি সত্যিই নেই? আমরা কি প্রায়ই অস্বস্তিকর ইতিহাস ভুলে যেতে চাই না? আমরা কি সুবিধার জন্য অতীতের অনেক ঘটনাকে উপেক্ষা করি না? লেখক এই আত্মসমালোচনার জায়গাটিই পাঠকের সামনে খুলে দেন।
“বৃদ্ধ মুক্তিযোদ্ধার সাক্ষাৎকার” এবং “বৃদ্ধদের নীরবতা” অধ্যায় দুটি সম্ভবত উপন্যাসের সবচেয়ে আবেগঘন অংশ। কারণ এখানে স্মৃতির সঙ্গে সময়ের সংঘাত দেখা যায়। প্রবীণরা জানেন কী ঘটেছিল, কিন্তু তাদের কথা শোনার মানুষ কমে যাচ্ছে। নতুন প্রজন্ম বইয়ে যা পড়ছে, সেটাই সত্য বলে বিশ্বাস করছে। ফলে ব্যক্তিগত স্মৃতি ও সরকারি ইতিহাসের মধ্যে একটি ভয়াবহ দ্বন্দ্ব তৈরি হয়। এই দ্বন্দ্ব কেবল রাজনৈতিক নয়; এটি গভীর মানবিক সংকট।
লেখকের ভাষা সরল, প্রাঞ্জল এবং ব্যঙ্গময়। তিনি জটিল দার্শনিক প্রশ্নকে সহজ বর্ণনায় উপস্থাপন করেছেন। ফলে সাধারণ পাঠক যেমন উপন্যাসটি উপভোগ করতে পারবেন, তেমনি গবেষক বা সাহিত্যসমালোচকরাও এর অন্তর্নিহিত রূপক ও রাজনৈতিক তাৎপর্য বিশ্লেষণের সুযোগ পাবেন। বিশেষভাবে লক্ষণীয়, লেখক কোথাও অতিরিক্ত বক্তৃতামূলক হয়ে ওঠেননি। বরং ঘটনা, চরিত্র এবং পরিস্থিতির মধ্য দিয়েই বক্তব্য প্রকাশ করেছেন।
“স্মৃতি আদালত”, “গল্পকারদের সেন্সর”, “স্মৃতি পুলিশ” এবং “ভুল স্মৃতির বাজার” অধ্যায়গুলো উপন্যাসটিকে নতুন মাত্রা দিয়েছে। এখানে লেখক দেখিয়েছেন, ইতিহাস নিয়ন্ত্রণের কাজ কেবল রাষ্ট্র করে না; সমাজের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান, গণমাধ্যম, সংস্কৃতি এবং কখনো কখনো সাধারণ মানুষও সেই প্রক্রিয়ার অংশ হয়ে ওঠে। ফলে স্মৃতি বিকৃতি কোনো একক ষড়যন্ত্র নয়; এটি একটি সমষ্টিগত অংশগ্রহণের ফল।
উপন্যাসের শেষাংশ ক্রমশ আরও দার্শনিক হয়ে ওঠে। “স্মৃতির শেষ বই”, “খালি পৃষ্ঠার ইতিহাস”, “নিজের স্মৃতি হারানো মানুষ” এবং “শেষ সংস্করণ” অধ্যায়গুলো কেবল কাহিনির সমাপ্তি নয়; এগুলো মানুষের অস্তিত্ব নিয়ে প্রশ্ন তোলে। যদি একজন মানুষ নিজের অতীত ভুলে যায়, তাহলে সে কি একই মানুষ থাকে? যদি একটি জাতি নিজের ইতিহাস হারায়, তাহলে কি তার জাতীয় পরিচয় অটুট থাকে? লেখক এসব প্রশ্নের সরাসরি উত্তর দেননি। বরং পাঠককে ভাবার সুযোগ দিয়েছেন।
সাহিত্যতাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে “স্মৃতির সরকারি সংস্করণ”কে রাজনৈতিক-রূপকধর্মী ডিস্টোপিয়ান উপন্যাস বলা যায়। তবে এটি কেবল রাজনৈতিক ব্যঙ্গ নয়; এটি স্মৃতি, পরিচয়, ভাষা এবং সত্যের সম্পর্ক নিয়ে গভীর অনুসন্ধান। এখানে রাষ্ট্র যেমন সমালোচিত হয়েছে, তেমনি নাগরিকের সুবিধাবাদ, সামাজিক ভণ্ডামি এবং ইচ্ছাকৃত বিস্মৃতিও সমালোচনার মুখে পড়েছে। ফলে উপন্যাসটি একমুখী রাজনৈতিক বক্তব্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি।
সবশেষে বলা যায়, “স্মৃতির সরকারি সংস্করণ” আমাদের সময়ের স্মৃতি-সংকট, ইতিহাস-রাজনীতি এবং সত্যের পরিবর্তনশীল প্রকৃতি নিয়ে রচিত এক গুরুত্বপূর্ণ সাহিত্যকর্ম। এটি পাঠককে শুধু একটি কাহিনি দেয় না; বরং নিজের স্মৃতি, নিজের বিশ্বাস এবং নিজের ইতিহাস সম্পর্কে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করে। উপন্যাসটি শেষ হওয়ার পরও একটি প্রশ্ন দীর্ঘদিন মনে থেকে যায়—যদি কোনোদিন ইতিহাস বইয়ের সব কথা বদলে যায়, তাহলে আমরা কীভাবে জানব, আমরা আসলে কারা ছিলাম?
এই প্রশ্নই “স্মৃতির সরকারি সংস্করণ”-এর সবচেয়ে বড় অর্জন। কারণ মহান সাহিত্য উত্তর দেয় না; মহান সাহিত্য এমন প্রশ্ন রেখে যায়, যার উত্তর খুঁজতে পাঠক বইয়ের শেষ পৃষ্ঠা পেরিয়েও ভাবতে থাকে। “স্মৃতির সরকারি সংস্করণ” সেই ধরনেরই একটি উপন্যাস—ব্যঙ্গাত্মক, বেদনাময়, চিন্তাপ্রবণ এবং গভীরভাবে সমকালীন।
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now