বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
মোহাম্মদ শাহজামান শুভঃ
ঢাকার গরম যেন প্রতি বছরই একটু একটু করে বদলে যাচ্ছে। আগে বৈশাখের দুপুরে যতটা রোদ থাকত, এখন চৈত্রের শেষ সপ্তাহেই সেই আগুন নেমে আসে শহরের ওপর। বাসের ভেতর গরম, অফিসের সিঁড়িতে গরম, রিকশার ছাউনির নিচে গরম, এমনকি রাতে বারান্দায় দাঁড়িয়েও মনে হয় বাতাস নয়, কেউ যেন হালকা গরম পানি ছুঁড়ে দিচ্ছে মুখের ওপর।
মেহরিন এই গরম একদম সহ্য করতে পারে না। সকালে অফিসে যাওয়ার আগে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে খুব যত্ন করে মেকআপ করে, চুল বাঁধে, হালকা পারফিউম ব্যবহার করে। সে একটা বিজ্ঞাপনী প্রতিষ্ঠানে কাজ করে। ক্লায়েন্ট মিটিং, প্রেজেন্টেশন, কখনো ক্যামেরার সামনে দাঁড়ানো—সব মিলিয়ে তার নিজের চেহারাটা নিয়ে সবসময় একটা চাপ কাজ করে। সে মনে করে, তাকে সবসময় ফ্রেশ আর আত্মবিশ্বাসী দেখাতে হবে।
কিন্তু এই গরমে অফিসে পৌঁছাতে পৌঁছাতে সব এলোমেলো হয়ে যায়। রিকশা, বাস, একটু হাঁটা—এরপরই কপালে ঘাম, নাকের পাশে ঘাম, ঠোঁটের নিচে ঘাম জমে যায়। অফিসের ওয়াশরুমে গিয়ে আয়নায় নিজের মুখ দেখলেই তার বিরক্তি লাগে। মেকআপের ওপর ঘামের দাগ, চোখের নিচে হালকা কালচে ছোপ, আর মুখজুড়ে ক্লান্তির ছাপ।
এই সমস্যার সমাধান সে খুঁজে পেয়েছিল ছোট্ট একটা প্যাকেটে। ফেসিয়াল ওয়াইপস।
প্রথম দিনটা ছিল একেবারেই কাকতালীয়। অফিসের সহকর্মী তৃষা নিজের ব্যাগ থেকে একটা চকচকে নীল প্যাকেট বের করে বলেছিল, “দেখ, এটা ব্যবহার কর। একদম ঠান্ডা ঠান্ডা লাগবে।”
মেহরিন ওয়াইপসটা মুখে বুলিয়েই অবাক হয়েছিল। যেন মুহূর্তেই ঘাম উধাও। মুখে একটা শীতল ভাব। হালকা সুগন্ধ। আয়নায় নিজেকে আবার সুন্দর লাগছিল। সেই দিন থেকেই তার ব্যাগে, ড্রয়ারে, এমনকি বেডসাইড টেবিলেও ফেসিয়াল ওয়াইপসের প্যাকেট থাকতে শুরু করল।
সে দিনে চার-পাঁচবার পর্যন্ত ওয়াইপস ব্যবহার করত। অফিসে পৌঁছে একবার, দুপুরে লাঞ্চের পর একবার, বাসায় ফেরার আগে একবার, আর রাতে ঘুমানোর আগে মেকআপ তোলার জন্য তো ছিলই। কখনো কখনো মুখ ধোয়ার আলসেমি হলে সে শুধু ওয়াইপস দিয়ে মুখ মুছে ঘুমিয়ে পড়ত।
মা একদিন দেখে বলেছিলেন, “এই যে বারবার কী মুছিস মুখ?”
মেহরিন হাসতে হাসতে বলেছিল, “এইটা নতুন ওয়াইপস। খুব ভালো। মুখ ফ্রেশ থাকে।”
মা খুব একটা কিছু বলেননি। তবে চলে যেতে যেতে বলেছিলেন, “পানি দিয়ে মুখ ধোয়ার জিনিসের জায়গা কোনো কাগজ নিতে পারে না।”
মেহরিন কথাটা শুনে হেসে উড়িয়ে দিয়েছিল। তার মনে হয়েছিল, মায়ের যুগ আর এখনকার যুগ এক না। এখন সবকিছুর শর্টকাট আছে। আর সময়ও তো কম।
দিন যেতে লাগল। এক মাস। তারপর আরও কিছুদিন।
তারপর এক সকালে ঘুম থেকে উঠে সে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে চমকে উঠল। নাকের পাশে ছোট ছোট দানা উঠেছে। কপালে কয়েকটা ব্রণ। গালের ত্বক আগের মতো মসৃণ নেই। কোথাও কোথাও লালচে। মুখে হাত দিলে জ্বালা করছে।
প্রথমে সে গুরুত্ব দিল না। ভাবল, গরমের জন্য হয়েছে। সে আরও বেশি ওয়াইপস ব্যবহার শুরু করল। এবার নতুন একটা ব্র্যান্ড কিনল। প্যাকেটের ওপর লেখা ছিল—“ইনস্ট্যান্ট কুলিং”, “ডিপ ক্লিন”, “ডার্মাটোলজিক্যালি টেস্টেড”।
কিন্তু অবস্থার উন্নতি তো হলোই না, বরং আরও খারাপ হতে লাগল। কয়েকদিন পর অফিসে তৃষা তাকে বলল, “তোর মুখে কী হয়েছে? ব্রণ উঠছে নাকি?”
মেহরিন অস্বস্তিতে হেসে বলল, “হয়তো গরমের জন্য।”
তৃষা একটু চুপ করে থেকে বলল, “তুই কি খুব বেশি ওয়াইপস ব্যবহার করিস?”
“হ্যাঁ। কেন?”
“আমি একসময় খুব করতাম। তারপর আমারও এই অবস্থা হয়েছিল।”
মেহরিন অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল।
তৃষা বলল, “শুধু ‘ফ্রেশ’ লাগলেই সবকিছু ভালো হয় না। অনেক ওয়াইপসে অ্যালকোহল, পারফিউম, এমন কিছু কেমিক্যাল থাকে যেগুলো ত্বকের ক্ষতি করে।”
সেদিন অফিস শেষে মেহরিন বাসায় ফিরে আয়নার সামনে অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে ছিল। তার মনে হচ্ছিল, সে নিজের মুখটাকে চেনেই না। আগে যে মুখে এত যত্ন করে মেকআপ দিত, সেই মুখটাই যেন এখন তার বিরুদ্ধে চলে গেছে।
পরদিন সে চর্মরোগ বিশেষজ্ঞের কাছে গেল। হাসপাতালের চেম্বারে বসে থাকতে থাকতে তার খুব অস্বস্তি হচ্ছিল। অপেক্ষার ঘরে আরও অনেক মানুষ। কারও মুখে ব্রণ, কারও ত্বকে র্যাশ, কেউ চুল পড়ে যাওয়ার অভিযোগ নিয়ে এসেছে।
ডাক পড়ার পর সে ভেতরে ঢুকল। ডাক্তার ছিলেন শান্ত স্বভাবের এক নারী। তিনি ধীরে ধীরে সব শুনলেন। তারপর জিজ্ঞেস করলেন, “আপনি দিনে কতবার ওয়াইপস ব্যবহার করেন?”
মেহরিন একটু ইতস্তত করে বলল, “চার-পাঁচবার।”
ডাক্তার হালকা হেসে বললেন, “এটাই আপনার সমস্যার বড় কারণ।”
তিনি তার টেবিলের ওপর রাখা একটা ওয়াইপসের প্যাকেট হাতে নিয়ে দেখালেন। “দেখুন, এখানে কী কী উপাদান আছে। অ্যালকোহল, ফ্র্যাগরেন্স, প্রিজারভেটিভ। এগুলো সব মানুষের ত্বকের জন্য এক রকম না। আপনার ত্বক হয়তো সংবেদনশীল। বারবার ব্যবহার করায় ত্বকের প্রাকৃতিক তেল নষ্ট হয়ে গেছে। ফলে ত্বক শুকিয়ে যাচ্ছে, জ্বালা করছে, আর ব্রণ উঠছে।”
মেহরিন নিচু গলায় বলল, “কিন্তু প্যাকেটে তো লেখা ছিল ডার্মাটোলজিক্যালি টেস্টেড।”
ডাক্তার একটু হাসলেন। “এই কথাটা মানে এই না যে এটা সবার জন্য নিরাপদ। কারও জন্য ভালো, কারও জন্য খারাপ। সবসময় উপাদান দেখতে হয়। আর মনে রাখবেন, ওয়াইপস কখনোই ফেসওয়াশের বিকল্প না।”
তারপর ডাক্তার তাকে একটা কাগজে লিখে দিলেন—মাইল্ড ক্লিনজার, হালকা ফেসওয়াশ, আর একটা ময়েশ্চারাইজার। সঙ্গে বলে দিলেন, “ওয়াইপস যদি ব্যবহার করতেই হয়, তাহলে অ্যালকোহলমুক্ত আর কম সুগন্ধিযুক্ত ব্যবহার করবেন। তাও খুব দরকার হলে। বাইরে থাকলে, পানি না পেলে।”
চেম্বার থেকে বের হয়ে মেহরিনের মনে হচ্ছিল, ছোট্ট একটা অভ্যাস কীভাবে এত বড় সমস্যা তৈরি করতে পারে।
বাসায় ফিরে সে ড্রয়ার খুলে দেখল, সেখানে পাঁচ-ছয় রকম ওয়াইপসের প্যাকেট। গোলাপি, নীল, সবুজ, সাদা। কোনোটা “ফ্রেশ মিন্ট”, কোনোটা “ফ্লোরাল ব্লিস”, কোনোটা “আইস কুলিং”। এতদিন সে কখনো প্যাকেটের পেছনের লেখা পড়েই দেখেনি।
সে একটা একটা করে উল্টে পড়তে শুরু করল। কোথাও লেখা—অ্যালকোহল। কোথাও লেখা—ফ্র্যাগরেন্স। কোথাও আবার এমন সব নাম, যেগুলো সে কোনোদিন শোনেইনি।
হঠাৎ তার মায়ের কথাটা মনে পড়ল—“পানি দিয়ে মুখ ধোয়ার জিনিসের জায়গা কোনো কাগজ নিতে পারে না।”
সে নিজের অজান্তেই হেসে ফেলল।
এরপর ধীরে ধীরে সে নিজের অভ্যাস বদলাতে শুরু করল। সকালে উঠে প্রথমে মুখ ধোয়া, তারপর হালকা ময়েশ্চারাইজার। অফিসে ছোট্ট একটা পানির বোতল আর রুমাল রাখতে শুরু করল। খুব গরম লাগলে ওয়াশরুমে গিয়ে শুধু পানি দিয়ে মুখ ধুয়ে নিত।
প্রথম কয়েকদিন খুব বিরক্ত লাগত। মনে হতো, ওয়াইপস ব্যবহার করলে যেমন দ্রুত একটা ফ্রেশ ফিলিং পাওয়া যেত, সেটা আর পাওয়া যাচ্ছে না। কিন্তু এক সপ্তাহ পর সে বুঝল, তার মুখে জ্বালা কমে গেছে। দুই সপ্তাহ পর ব্রণ কমতে শুরু করল। এক মাস পর তার ত্বক আবার অনেকটা আগের মতো হয়ে গেল।
এই সময়ের মধ্যে তার ভেতরেও একটা পরিবর্তন এল। সে বুঝতে পারল, আমরা অনেক সময় সহজ সমাধানের পেছনে ছুটতে গিয়ে আসল যত্নটা ভুলে যাই। শরীর, মন, সম্পর্ক—সবকিছুর ক্ষেত্রেই।
একদিন অফিসে নতুন যোগ দেওয়া এক মেয়ে, নাম নীলা, তার কাছে এসে বলল, “আপু, আপনার কাছে কি একটা ওয়াইপস আছে? মুখটা খুব খারাপ লাগছে।”
মেহরিন ব্যাগের ভেতর হাত ঢুকিয়ে কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তার ব্যাগে এখনো একটা ওয়াইপসের ছোট প্যাকেট থাকে। জরুরি প্রয়োজনে। কিন্তু সে সেটা বের করার আগে পাশে রাখা পানির বোতলটা নীলার দিকে বাড়িয়ে দিল।
“চল, ওয়াশরুমে যাই। মুখ ধুয়ে নিলে আরও ভালো লাগবে।”
নীলা একটু অবাক হলো। “ওয়াইপস নেই?”
মেহরিন হেসে বলল, “আছে। কিন্তু সবসময় সবচেয়ে সহজ জিনিসটাই সবচেয়ে ভালো হয় না।”
ওয়াশরুমের আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নীলা যখন মুখে পানি দিল, তখন মেহরিন নিজের প্রতিচ্ছবির দিকে তাকাল। তার মুখে এখনো হালকা কিছু দাগ আছে। কিন্তু সেই দাগগুলো তাকে খারাপ লাগাচ্ছিল না। বরং মনে হচ্ছিল, এগুলো তাকে একটা দরকারি শিক্ষা দিয়েছে।
মানুষের জীবনে অনেক কিছুই আছে, যা প্রথমে খুব আরামদায়ক, খুব সহজ, খুব সুন্দর মনে হয়। কিন্তু তার আড়ালে হয়তো ধীরে ধীরে জমে ওঠে অদৃশ্য ক্ষতি। কখনো সেটা ত্বকে, কখনো সম্পর্কে, কখনো নিজের ভেতরে।
আর সেই ক্ষতি বোঝা যায় তখনই, যখন আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে হঠাৎ মনে হয়—যাকে এতদিন যত্ন করছি ভাবছিলাম, আসলে তাকে কি আমি একটু একটু করে কষ্টই দিচ্ছিলাম?
সেদিন অফিস থেকে ফেরার পথে বাসের ভেতর আবার প্রচণ্ড গরম ছিল। জানালা দিয়ে ধুলো ঢুকছিল। চারপাশে ক্লান্ত মানুষ। মেহরিন ব্যাগ থেকে ওয়াইপসের প্যাকেটটা বের করল। কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকল। তারপর আবার ব্যাগে রেখে দিল।
বাসা ফিরে সে ধীরে ধীরে কল খুলল। ঠান্ডা পানি হাতের তালু ভরে মুখে দিল। আর মনে হলো, এতদিন পর যেন সত্যিকারের একটা স্বস্তি পেল।
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now