বাংলা গল্প পড়ার অন্যতম ওয়েবসাইট - গল্প পড়ুন এবং গল্প বলুন
বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ

নিজের ছায়ার সঙ্গে যুদ্ধ

"শিক্ষণীয় গল্প" বিভাগে গল্পটি দিয়েছেন গল্পের ঝুরিয়ান মোহাম্মদ শাহজামান শুভ (০ পয়েন্ট)

X মোহাম্মদ শাহজামান শুভ। রাত তখন প্রায় দেড়টা। জানালার বাইরে অন্ধকার শহর নিঃশব্দে ঘুমিয়ে আছে। অথচ আরাফাতের ঘরে যেন অন্য এক পৃথিবী। টেবিলের ওপর খোলা বই, পাশে নোটবুক, কিন্তু চোখ দুটো আটকে আছে মোবাইলের স্ক্রিনে। একের পর এক ভিডিও, ছবি, পোস্ট—অন্তহীন স্ক্রল। অথচ পরদিন তার জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা। এই পরীক্ষার জন্যই সে গত এক বছর ধরে প্রস্তুতি নিচ্ছে। কিন্তু আজ, ঠিক পরীক্ষার আগের রাতে, পড়ার টেবিলে বসে থেকেও সে পড়ছে না। নিজের অজান্তেই সে যেন এমন কিছু করছে, যা তার সব পরিশ্রমকে প্রশ্নের মুখে ফেলতে পারে। আরাফাত নিজেও মাঝে মাঝে অবাক হয়—সে কি সত্যিই নিজের ক্ষতি নিজেই করছে? অনেক সময় তার মনে হয়, কেউ যেন তাকে ভেতর থেকে ঠেলে দিচ্ছে ভুল পথে। ঠিক যখন সবকিছু সুন্দরভাবে এগোতে শুরু করে, তখনই সে এমন কিছু করে বসে, যাতে পুরো পরিকল্পনাটা ভেঙে পড়ে। কলেজে ভর্তি হওয়ার সময়ও এমন হয়েছিল। ভর্তি পরীক্ষার আগের দিন সে পড়া বাদ দিয়ে বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা দিয়েছিল। পরে পরীক্ষার হলে বসে মনে হয়েছিল—এটা সে কেন করল? এই প্রশ্নের উত্তর সে অনেক দিন খুঁজেছে, কিন্তু ঠিক ধরতে পারেনি। আরাফাতের শৈশব খুব সহজ ছিল না। তার বাবা ছিলেন কঠোর মানুষ। পড়াশোনায় সামান্য ভুল হলেই বলতেন, —“তোমারে দিয়ে বড় কিছু হবে না।” এই কথাটা এতবার শুনেছে যে একসময় আরাফাত বিশ্বাস করতেই শুরু করেছিল—হয়তো সত্যিই সে বড় কিছু করতে পারবে না। তবু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সে বদলাতে চেয়েছিল। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পর সে নিজের মতো করে নতুন জীবন শুরু করেছিল। নতুন বন্ধু, নতুন পরিবেশ—সবকিছু তাকে নতুন করে ভাবতে শিখিয়েছিল। সে নিয়মিত পড়াশোনা করত, নিজের লক্ষ্য ঠিক করেছিল। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো, যতই সে সাফল্যের কাছে পৌঁছাতে থাকে, ততই যেন অদৃশ্য এক ভয় তাকে গ্রাস করতে থাকে। একদিন তার বন্ধু সোহেল বলেছিল, —“তুই জানিস, তোর সবচেয়ে বড় সমস্যা কী?” আরাফাত হেসে বলেছিল, —“কি?” —“তুই নিজেই নিজের শত্রু।” প্রথমে কথাটা শুনে সে হেসেছিল। কিন্তু পরে ধীরে ধীরে বুঝতে শুরু করেছিল—সোহেলের কথাটা হয়তো সত্য। যেমন ধরো, কোনো গুরুত্বপূর্ণ কাজের সময় সে অকারণে অন্য কাজে ব্যস্ত হয়ে যায়। পড়তে বসে হঠাৎ ঘর গুছাতে শুরু করে। পরীক্ষার আগের দিন হঠাৎ মনে পড়ে—পুরনো মুভি দেখা দরকার। আবার কখনো কোনো কাজ শুরু করার আগেই মনে হয়—এটা তো নিখুঁতভাবে করা সম্ভব হবে না, তাহলে শুরু করেই বা লাভ কী? এই “পারফেকশন” ভাবনাটা তার জীবনে অনেক সমস্যার সৃষ্টি করেছিল। সে ভাবত—কাজটা যদি একদম নিখুঁত না হয়, তাহলে সেটার কোনো মূল্য নেই। ফলে অনেক সময় কাজ শুরুই করা হতো না। একদিন বিশ্ববিদ্যালয়ের লাইব্রেরিতে বসে সে একটা বই পড়ছিল মনোবিজ্ঞানের ওপর। সেখানে একটি শব্দ তার চোখে পড়ে—“সেলফ-সাবোটাজ।” নিজের অজান্তেই নিজের ক্ষতি করা। সে অবাক হয়ে পড়তে শুরু করল। বইটিতে লেখা ছিল—অনেক মানুষ যখন বড় কোনো সাফল্যের কাছাকাছি পৌঁছে যায়, তখন তাদের অবচেতন মন ভয় পেয়ে যায়। কারণ সফলতা মানে নতুন দায়িত্ব, নতুন প্রত্যাশা। মস্তিষ্ক তখন পরিচিত নিরাপদ জায়গায় ফিরে যেতে চায়। আর সেই কারণেই মানুষ নিজের পথ নিজেই নষ্ট করে ফেলে। বইটা পড়তে পড়তে আরাফাতের মনে হচ্ছিল—এটা যেন তার নিজের গল্প। সেদিন রাতে বাসায় ফিরে সে অনেকক্ষণ চুপচাপ বসে ছিল। জানালার বাইরে তাকিয়ে ভাবছিল—সে কি সত্যিই এতদিন নিজের ছায়ার সঙ্গে যুদ্ধ করে এসেছে? পরের দিন সে একটা ছোট সিদ্ধান্ত নিল। সে বড় কোনো লক্ষ্য নিয়ে ভাববে না। শুধু ছোট ছোট কাজ করবে। প্রথম দিন সে ঠিক করল—মাত্র দশ মিনিট পড়বে। দ্বিতীয় দিন—পনেরো মিনিট। এরপর ধীরে ধীরে সময় বাড়াতে লাগল। আশ্চর্যের বিষয়, এই ছোট ছোট পদক্ষেপগুলোই তাকে নতুন শক্তি দিল। কাজটা আর পাহাড় মনে হচ্ছিল না। মনে হচ্ছিল—একটা ছোট রাস্তা, যেটা ধীরে ধীরে এগিয়ে যাচ্ছে। আরাফাত আরেকটা অভ্যাস তৈরি করল। সে নিজের পরিচয় বদলানোর চেষ্টা করল। আগে সে বলত— “আমি পড়াশোনা করতে চাই।” এখন সে বলত— “আমি একজন পরিশ্রমী মানুষ।” এই ছোট বাক্যটা তার চিন্তার জগৎ বদলে দিল। একদিন সে একটা কাগজে লিখল— “যদি আমি কোনো বড় কাজ দেখে ভয় পাই, তাহলে আমি শুধু পাঁচ মিনিট সেই কাজের পেছনে দেব।” এই “যদি-তবে” পরিকল্পনা তাকে অনেক সাহায্য করল। কারণ ভয় পেলেও সে জানত—কমপক্ষে পাঁচ মিনিট তো কাজটা করতেই হবে। দিনগুলো ধীরে ধীরে বদলাতে লাগল। যে আরাফাত আগে গুরুত্বপূর্ণ কাজ এড়িয়ে যেত, সেই আরাফাত এখন কাজের তালিকা বানাত। সবচেয়ে কঠিন কাজটা তালিকার ওপরে রাখত। একদিন সন্ধ্যায় সোহেল তাকে জিজ্ঞেস করল, —“তোর মধ্যে এত পরিবর্তন হলো কীভাবে?” আরাফাত একটু হেসে বলল, —“আমি আগে ভাবতাম আমার শত্রু বাইরে কোথাও আছে। এখন বুঝেছি, আমার শত্রু আর বন্ধু—দুটোই আমার ভেতরে।” সোহেল হাসল। —“মানে?” আরাফাত জানালার বাইরে তাকিয়ে বলল, —“আমরা অনেক সময় নিজেরাই নিজের পথ আটকে রাখি। কিন্তু একবার যদি বুঝতে পারি, তাহলে সেই পথ আবার নিজেরাই খুলে দিতে পারি।” কয়েক মাস পর আরাফাত সেই পরীক্ষায় ভালো ফল করল। ফলের দিন সে খুব উচ্ছ্বসিত হয়নি। বরং শান্তভাবে হাসছিল। কারণ সে জানত—এই জয় শুধু পরীক্ষার নয়। এই জয় তার নিজের ভয়, দ্বিধা আর অবচেতন বাধার বিরুদ্ধে। সেদিন রাতে আবার সে জানালার পাশে দাঁড়িয়ে ছিল। শহর আগের মতোই নিঃশব্দ। কিন্তু এবার তার মনে হচ্ছিল—অন্ধকারের ভেতরেও আলো আছে। সে ধীরে ধীরে বলল, “আজ থেকে আমি আর নিজের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করব না। আজ থেকে আমি নিজের পক্ষেই থাকব।” জীবনের সবচেয়ে বড় যুদ্ধ অনেক সময় বাইরের কারও সঙ্গে নয়—নিজের ছায়ার সঙ্গেই। আর যে মানুষ সেই ছায়াকে চিনতে পারে, সে-ই একদিন আলোয় হাঁটার পথ খুঁজে পায়।


এডিট ডিলিট প্রিন্ট করুন  অভিযোগ করুন     

গল্পটি পড়েছেন ৫৩ জন


এ জাতীয় গল্প

গল্পটির রেটিং দিনঃ-

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now