বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
মোহাম্মদ শাহজামান শুভ।
ডিসেম্বরের কুয়াশা ভোরে যখন নদীর বুকে নরম চাদরের মতো নেমে আসে, তখন মনে হয় প্রকৃতি যেন ধীর কণ্ঠে কোনো প্রাচীন গান গাইছে। সেই গান ভেসে আসে সুন্দরবন–এর গহীন থেকে। পৃথিবীর বৃহত্তম অখণ্ড ম্যানগ্রোভ বন, যার শিকড় জালের মতো ছড়িয়ে আছে নদী, খাল আর জোয়ারভাটার বুক জুড়ে। বঙ্গোপসাগরের লোনা হাওয়ায় ভিজে থাকা এই বন কেবল গাছপালা আর প্রাণীর আশ্রয়স্থল নয়—এ যেন এক জীবন্ত মহাকাব্য।
শহরের ব্যস্ত জীবন থেকে ছুটি নিয়ে নওশাদ এসেছিল খুলনায়। পেশায় সে শিক্ষক, কিন্তু অন্তরে এক অদম্য অনুসন্ধিৎসা। বইয়ের পাতায় বহুবার পড়েছে এই বন সম্পর্কে—৬ ডিসেম্বর ১৯৯৭ সালে ইউনেস্কো বিশ্ব ঐতিহ্যের স্বীকৃতি পাওয়া, ১৯৯২ সালে রামসার সাইট ঘোষিত, আর শত শত প্রজাতির প্রাণ ও উদ্ভিদের আবাসভূমি। তবু সে জানত, কাগজে লেখা তথ্য আর বাস্তবের গন্ধ এক নয়। তাই এক শীতসকালে সে ট্রলারভর্তি পর্যটকদের সঙ্গে রওনা দিল বনভ্রমণে।
ট্রলার যখন পশুর নদীর বুক চিরে এগোচ্ছিল, গাইড কাদের মাঝি বনটির বিস্তার নিয়ে বলতে শুরু করলেন। “এই বন দশ হাজার বর্গকিলোমিটারেরও বেশি,” তিনি বললেন, “তার প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ আমাদের বাংলাদেশে।” নদীর দুই ধারে সারি সারি সুন্দরী, গেওয়া, গরান, বাইন আর কেওড়া গাছ মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে। নওশাদ ভাবল—এই সুন্দরী গাছের আধিক্য থেকেই তো নাম ‘সুন্দরবন’। প্রকৃতি যেন নিজেই নিজের নাম রেখেছে।
হঠাৎ দূরে কাদামাটির তীরে চিত্রা হরিণের একটি পাল দেখা গেল। তাদের সাদা ফোঁটাগুলো রোদের আলোয় চিকচিক করছে। গাইড ফিসফিস করে বললেন, “এখানে বিয়াল্লিশ প্রজাতির স্তন্যপায়ী প্রাণী আছে। তবে সবার আকর্ষণের কেন্দ্র যে—তা হলো রয়েল বেঙ্গল টাইগার।” কথাটি উচ্চারিত হতেই ট্রলারে হালকা শিহরণ বয়ে গেল। সেই রাজকীয় বাঘের নাম শুনলেই মানুষের মনে এক ধরনের ভীতি আর বিস্ময় জাগে। এই বনই তার শেষ আশ্রয়স্থল।
নওশাদ ভাবল, কী অদ্ভুত ভারসাম্যে দাঁড়িয়ে আছে এই পৃথিবী! একদিকে হিংস্রতা, অন্যদিকে কোমলতা। বাঘের শিকার চিত্রা হরিণ, আবার হরিণের বেঁচে থাকা বনের সুস্থতার প্রমাণ। প্রকৃতি যেন নিজেই এক কঠিন সমীকরণ।
বিকেলের দিকে ট্রলার থামল করমজল সংলগ্ন এক পর্যবেক্ষণ টাওয়ারে। সেখান থেকে দূরদূরান্ত পর্যন্ত সবুজের ঢেউ দেখা যায়। নদীগুলো জালের মতো ছড়িয়ে আছে—মাতলা, শিবসা, পশুর—সব মিলিয়ে যেন এক বিশাল জলরাজ্য। কাদের মাঝি বললেন, “এই নদীগুলোই বনের প্রাণ। জোয়ার-ভাটার সঙ্গে সঙ্গে এরা লবণাক্ততা বদলায়, মাটি বদলায়, জীবন বদলায়।”
নওশাদের মনে হলো, এই বন যেন কেবল গাছের সমষ্টি নয়; এটি এক চলমান শ্বাসপ্রশ্বাস। এখানে ৩৫০-এর বেশি উদ্ভিদ, ১২০ প্রজাতির মাছ, ২৭০ প্রজাতির পাখি আর অসংখ্য সরীসৃপ ও পোকামাকড় মিলে এক অবিশ্বাস্য জীববৈচিত্র্যের জগৎ গড়ে তুলেছে। প্রতিটি প্রজাতি যেন একেকটি শব্দ, আর সব মিলিয়ে বনটি এক বিশাল কবিতা।
রাতে ট্রলারের ডেকে বসে সবাই চাঁদের আলোয় নদী দেখছিল। দূরে কোথাও বকের ডানা ঝাপটানোর শব্দ, আবার কোথাও অদৃশ্য কিছুর ছলাৎ ছলাৎ শব্দ। কাদের মাঝি গল্প শোনাতে শুরু করলেন ঘূর্ণিঝড়ের কথা। “সিডর, আইলা—কত ঝড় গেছে। কিন্তু এই বন না থাকলে উপকূলের কত গ্রাম যে ভেসে যেত, তার হিসাব নেই।” বনটি কেবল সৌন্দর্য নয়, ঢালও বটে। মানুষের অজান্তে সে পাহারা দেয় উপকূলকে।
নওশাদ ভাবল, আমরা কত সহজে বন কেটে ফেলি, নদী দখল করি, অথচ বুঝি না—এই বনই আমাদের জীবনরক্ষক। ঘূর্ণিঝড়ের প্রচণ্ডতা কমিয়ে, জলোচ্ছ্বাসের ঢেউ ভেঙে দিয়ে, সে যেন নীরব প্রহরীর মতো দাঁড়িয়ে থাকে।
পরদিন ভোরে তারা আরও গভীরে প্রবেশ করল। হঠাৎ ট্রলার থামিয়ে মাঝি ইশারা করলেন—কাদায় বড় বড় থাবার ছাপ। সবার নিশ্বাস আটকে গেল। বাঘের পায়ের ছাপ! যদিও বাঘটি দেখা গেল না, তবু তার উপস্থিতি অনুভব করা গেল। যেন সে অদৃশ্য সম্রাট, যার সাম্রাজ্যে মানুষ অতিথি মাত্র।
এই উপলব্ধি নওশাদকে গভীরভাবে নাড়া দিল। মানুষ সবকিছু নিজের বলে দাবি করে, অথচ প্রকৃতির এই বিস্ময়কর সাম্রাজ্যে সে কেবল ক্ষণিক পথিক। বনটির সংবেদনশীল বাস্তুতন্ত্র সামান্য আঘাতেই ভেঙে পড়তে পারে। পর্যটনের আনন্দ আছে, কিন্তু দায়িত্বও আছে।
ফেরার পথে আকাশে ঝাঁকে ঝাঁকে পাখি উড়ছিল। শামুকখোল, মাছরাঙা, বক—তাদের ডানায় ভেসে বেড়াচ্ছিল স্বাধীনতার সুর। নওশাদ মনে মনে প্রতিজ্ঞা করল, ফিরে গিয়ে সে তার ছাত্রদের এই বনের গল্প শোনাবে। শুধু ভ্রমণের নয়, সংরক্ষণের গল্প।
সে ভাবল, এই বন আমাদের শেখায় সহাবস্থান। লবণাক্ত মাটিতেও জীবন ফোটে, ঝড়ের মাঝেও দাঁড়িয়ে থাকা যায়, আর বৈচিত্র্যের মাঝেই টিকে থাকে ভারসাম্য। সুন্দরবন কেবল ভূগোলের বিষয় নয়; এটি দর্শন, এটি সহিষ্ণুতা, এটি জীবনরক্ষার প্রতীক।
ট্রলার যখন শহরের ঘাটে ভিড়ল, নওশাদের মনে হচ্ছিল, সে যেন এক নতুন পৃথিবী দেখে ফিরেছে। জালের মতো ছড়িয়ে থাকা নদীগুলো তাকে শিখিয়েছে—জীবনও এমনই সংযুক্ত। একটি শিকড় কাটা পড়লে পুরো বন কেঁপে ওঠে।
সেদিন রাতে সে ডায়েরিতে লিখল—“সুন্দরবন মানে শুধু বাঘের গর্জন নয়, পাখির ডানা, গাছের শ্বাস, নদীর জোয়ার, আর মানুষের দায়বদ্ধতার সম্মিলিত সুর। এই বন বাঁচলে উপকূল বাঁচবে, উপকূল বাঁচলে মানুষ বাঁচবে।”
এভাবেই বনটি তার ভেতরে এক নতুন জাল বুনে দিল—দায়িত্বের, মমতার, আর প্রকৃতির প্রতি গভীর প্রেমের। আর নওশাদ বুঝল, পৃথিবীর সবচেয়ে বড় অখণ্ড ম্যানগ্রোভ বন শুধু ভূগোলের বিস্ময় নয়—এ এক অন্তহীন জীবনের গান।
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now