বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
মোহাম্মদ শাহজামান শুভ।
শহরের কোলাহল পেরিয়ে একটু দূরের একটি মফস্বলি বিদ্যালয়—চারদিকে ধুলোমাখা রাস্তা, খোলা মাঠ, আর পুরোনো দালানের ভেতর সারি সারি বেঞ্চ। সেই স্কুলেই শিক্ষকতা করেন রাশেদ স্যার। বয়স খুব বেশি নয়, কিন্তু চোখে এক ধরনের নিরবচ্ছিন্ন অনুসন্ধান—কীভাবে ছাত্রদের শেখাকে আরও সহজ, আনন্দময় আর ভয়মুক্ত করা যায়। বহু বছর ধরে তিনি লক্ষ করে আসছিলেন, ক্লাসে প্রশ্ন করলে অনেকেই মাথা নিচু করে রাখে, খাতার পাতায় চোখ গুঁজে থাকে, যেন ভুল করাই তাদের সবচেয়ে বড় অপরাধ। পরীক্ষার খাতায় লাল কালি দেখলেই কেউ কেউ আঁতকে ওঠে, কেউ আবার আগেই ধরে নেয়—সে পারবে না। এই ভয়টাই যেন শেখার পথে সবচেয়ে বড় দেয়াল হয়ে দাঁড়িয়েছে।
একদিন অষ্টম শ্রেণির অঙ্ক ক্লাসে তিনি হঠাৎ থামলেন। বোর্ডে লেখা সূত্রের নিচে চকটা নামিয়ে রেখে তাকালেন ছাত্রদের দিকে। বেশির ভাগ মুখে ক্লান্তি, কয়েকজনের চোখ জানালার বাইরে মাঠে ছুটে যাওয়া কাকের দিকে। তিনি বুঝতে পারলেন, আজও অনেকেই পুরোটা ধরতে পারেনি। কিন্তু জিজ্ঞেস করলেই নীরবতা নেমে আসবে—এই অভিজ্ঞতা তাঁর নতুন নয়। তখনই মাথায় একটা ভাবনা উঁকি দিল: যদি ভুল করাকে লজ্জা নয়, শেখার সিঁড়ি বানানো যায়?
পরের সপ্তাহের সোমবার ক্লাসে ঢুকে সবাইকে অবাক করে দিয়ে তিনি দেয়ালের এক পাশে ছোট্ট একটি বোর্ড টাঙালেন। চক দিয়ে বড় করে লিখলেন—“ভুল থেকে শেখা”। ছাত্ররা ফিসফিস করে কথা বলতে লাগল। কেউ কেউ ভাবল, হয়তো নতুন কোনো নিয়ম আসছে। রাশেদ স্যার হালকা হেসে বললেন, আজ থেকে এই বোর্ড আমাদের ক্লাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জায়গা হবে। এখানে কেউ নিজের নাম লিখবে না। শুধু আজকের পাঠে যে ভুলটা হয়েছে, সেটাই ছোট কাগজে লিখে লাগাবে। ভুল যত বড়ই হোক, কাউকে বকা দেওয়া হবে না—বরং আমরা সবাই মিলে দেখব, কোথায় গলদ ছিল।
প্রথম দিন কাজটা সহজ হয়নি। ঘণ্টা শেষে তিনি কয়েকটা কাগজ বিতরণ করলেন, কিন্তু বেশির ভাগই কাগজ ভাঁজ করে রেখে দিল। চোখেমুখে সংকোচ। যেন ভুল লিখে দিলে কেউ গোপনে চিনে ফেলবে! শেষমেশ তিনজন সাহস করল। ঘণ্টা বাজার আগমুহূর্তে বোর্ডে তিনটা কাগজ ঝুলল। তাতে লেখা—“আমি সূত্রটা উল্টো লিখেছি”, “আমি প্রশ্নটা ঠিক বুঝিনি”, আর “আমি ভেবেছিলাম উত্তর একটাই হবে।” রাশেদ স্যার সেগুলো পড়ে শুনালেন। কার লেখা, তা জিজ্ঞেস করলেন না। বরং বোর্ডে আবার সূত্রটা লিখে দেখালেন, কোথায় উল্টো হয়েছে। প্রশ্নটা ভেঙে ভেঙে ব্যাখ্যা করলেন, কেন একাধিক পথে সমাধান হতে পারে। ক্লাস শেষ হওয়ার সময় কয়েকজনের চোখে বিস্ময়—এভাবে ভুল নিয়ে কথা বলা যায় নাকি!
পরের দিনগুলোতে ধীরে ধীরে বোর্ডটা যেন আলাদা গুরুত্ব পেতে শুরু করল। শুরুতে দিনে তিন–চারটা কাগজ, তারপর পাঁচ–ছয়টা। কেউ লিখছে, “আমি দশমিকটা ভুল জায়গায় বসিয়েছি।” কেউ আবার, “আমি ভেবেছিলাম সব গ্যাসের ওজন নেই।” কেউ স্বীকার করছে, “আমি প্রশ্নটা পড়েই ভুল বুঝেছি।” প্রতিটি কাগজই হয়ে উঠছে আলোচনার নতুন জানালা। রাশেদ স্যার কখনো বলতেন, এই ভুলটা অনেকেরই হয়। কখনো আবার পুরো ক্লাসকে জিজ্ঞেস করতেন, তোমাদের কী মনে হয়, এখানে গণ্ডগোলটা কোথায়? ছাত্ররা তখন আর চুপ করে থাকত না—হাত উঠতে শুরু করল, মতামত আসতে লাগল।
একদিন দেখা গেল, শান্ত স্বভাবের রাকিবও হাত তুলছে। আগে যে ছেলেটা প্রশ্ন করতেই ভয় পেত, আজ সে বলছে, “স্যার, আমি মনে করি এখানে আমরা ধাপটা বাদ দিয়েছি।” তার কথা শুনে কয়েকজন মাথা নেড়ে সমর্থন করল। রাশেদ স্যার ভেতরে ভেতরে খুশি হলেন। বোর্ডের ওই ছোট্ট জায়গাটা যেন ছাত্রদের আত্মবিশ্বাসের চর্চাকেন্দ্র হয়ে উঠছে।
দুই সপ্তাহ পেরোতেই ক্লাসের পরিবেশ বদলাতে লাগল। আগে যেখানে ঘণ্টা বাজার সঙ্গে সঙ্গে সবাই ব্যাগ গোছাতে ব্যস্ত হয়ে পড়ত, এখন সেখানে অনেকেই দাঁড়িয়ে থাকে—বোর্ডে নতুন কাগজ লাগানোর জন্য। কেউ কেউ তো আগেই লিখে রাখে, যেন সুযোগ মিস না হয়। বিরতির সময়ও দুই–একজন এসে বোর্ডের সামনে দাঁড়িয়ে পুরোনো ভুলগুলো পড়ে। নিজেদের মধ্যে আলোচনা করে—এই ভুলটা আমি আগেও করেছি, তখন বুঝিনি কেন।
রাশেদ স্যার লক্ষ্য করলেন, পরীক্ষার খাতায় আগের মতো একই ভুল বারবার আসছে না। গণিতের সমস্যায় ধাপগুলো পরিষ্কার হচ্ছে, বিজ্ঞান প্রশ্নে ব্যাখ্যা লম্বা হচ্ছে। সবচেয়ে বড় পরিবর্তনটা চোখে পড়ে মুখের ভাষায়—ভয়ের বদলে কৌতূহল। কেউ আর প্রশ্ন করতে সংকোচ বোধ করে না। বরং কেউ বুঝতে না পারলে নিজেই বলে, “স্যার, এটা আমার বোর্ডে লেখার মতো ভুল।”
একদিন এক সহকর্মী ক্লাসে ঢুকে বোর্ডটা দেখে থমকে গেলেন। জিজ্ঞেস করলেন, “এটা কী নতুন পদ্ধতি নাকি?” রাশেদ স্যার হাসলেন। বললেন, নতুন কিছু না—শুধু ভুলকে শত্রু না বানিয়ে বন্ধু বানানোর চেষ্টা। সহকর্মী মাথা নেড়ে বললেন, “চমৎকার আইডিয়া। আমাদের ক্লাসেও试 করে দেখতে হবে।”
মাসখানেক পরে বোর্ডটা আর ছোট বোর্ড রইল না; স্কুল কর্তৃপক্ষ বড় একটা বোর্ড লাগিয়ে দিল। তার ওপর রঙিন কাগজে লেখা ভুলগুলো যেন ছোট ছোট বাতিঘর—যেগুলো দেখিয়ে দিচ্ছে শেখার পথ কোথায় বাঁক নিয়েছে। ছাত্ররা নিজেরাই নাম দিল—“ভুলের দেয়াল”। কিন্তু রাশেদ স্যার আগের নামটাই পছন্দ করলেন—“ভুল থেকে শেখা”।
তিনি বুঝতে পারলেন, শিক্ষা মানে কেবল সঠিক উত্তর দেওয়া নয়; বরং ভুলের ভেতর দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে সঠিক পথে পৌঁছানো। এই বোর্ড ছাত্রদের শিখিয়েছে, ভুল মানেই ব্যর্থতা নয়—ভুল মানেই নতুন করে ভাবার সুযোগ।
স্কুল ছুটির এক বিকেলে খালি ক্লাসরুমে দাঁড়িয়ে তিনি বোর্ডটার দিকে তাকালেন। বাতাসে রঙিন কাগজগুলো একটু দুলছে। মনে হলো, এগুলো কেবল কাগজ নয়—এগুলো সাহসের চিহ্ন, কৌতূহলের দলিল, আর শেখার গল্প। ছোট্ট একটা উদ্যোগ কীভাবে পুরো ক্লাসের মনোজগৎ বদলে দিতে পারে, সেটার জীবন্ত প্রমাণ এই বোর্ড।
রাশেদ স্যার মনে মনে বললেন, আগামীকাল আবার নতুন কিছু ভুল আসবে। আর সেই ভুলগুলোই হয়তো ছাত্রদের আরও এক ধাপ এগিয়ে নেবে। কারণ এখানে ভুল মানেই শেষ নয়—ভুল মানেই শুরু।
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now