বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
“আবেগের বারান্দায় দাঁড়ানো একটি ঘর”
মোহাম্মদ শাহজামান শুভ।
শহরের প্রান্তে দাঁড়িয়ে থাকা পুরোনো দোতলা বাড়িটিকে প্রথম দেখায় কেউ খুব একটা গুরুত্ব দিত না। খয়েরি রঙের দেয়ালে সময়ের দাগ, বারান্দার লোহার রেলিংয়ে মরিচা, আর ছাদের কোণে বুনো লতার জট—সব মিলিয়ে এটি যেন কালের সাক্ষ্য বহন করছিল। কিন্তু ভেতরে ঢুকলেই বোঝা যেত, এই বাড়ির প্রতিটি ইটের ফাঁকে ফাঁকে জমে আছে স্মৃতি, আবেগ আর সম্পর্কের অসংখ্য গল্প। এ বাড়িতেই থাকতেন অবসরপ্রাপ্ত স্কুলশিক্ষক রমিজ উদ্দিন, তাঁর স্ত্রী সালেহা বেগম, দুই ছেলে—বড় ছেলে আরিফ, ছোট ছেলে সায়েম—এবং আরিফের স্ত্রী নীলা ও তাদের কিশোরী মেয়ে রোদেলা।
রমিজ উদ্দিন ছিলেন কঠোর শাসনের মানুষ নন, কিন্তু তাঁর কথার ভেতরে একধরনের দৃঢ়তা ছিল। পঁয়ত্রিশ বছর স্কুলে পড়িয়ে তিনি শিখেছেন, মানুষকে বোঝাতে গেলে কণ্ঠস্বর নয়, অভিজ্ঞতাই বড় অস্ত্র। তবু বয়সের ভারে তাঁর ধৈর্যের বাঁধ মাঝে মাঝে আলগা হয়ে যেত। সকালে চা একটু দেরি হলে, বা খবরের কাগজ ঠিক জায়গায় না থাকলে তাঁর ভ্রু কুঁচকে যেত। সালেহা বেগম এসব বুঝতেন। তিনি নীরবে চুলায় পানি বসাতেন, চায়ে এলাচ দিতেন একটু বেশি, যেন স্বামীর মনটাও তাতে নরম হয়। কিন্তু নতুন প্রজন্মের কাছে এসব সূক্ষ্ম ইঙ্গিত ধরা পড়ত না সব সময়।
আরিফ কাজ করতেন একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে। প্রতিদিন অফিস শেষে ক্লান্ত শরীরে বাড়ি ফিরে তিনি চাইতেন একটু শান্তি, মোবাইল স্ক্রল করে সময় কাটাতে। নীলা, যিনি কলেজে পড়াতেন, সংসার আর পেশার মাঝখানে ভারসাম্য রাখার চেষ্টা করতেন। তাঁদের মেয়ে রোদেলা ছিল প্রযুক্তিপ্রেমী—ইয়ারফোন কানে দিয়ে গান শোনা, অনলাইনে বন্ধুদের সঙ্গে কথা বলা ছিল তার নিত্যদিনের আনন্দ। এসব দেখে রমিজ উদ্দিন কখনো কখনো দীর্ঘশ্বাস ফেলতেন। তাঁর মনে হতো, আগের দিনের পরিবারগুলো ছিল কাছাকাছি—সবাই একসঙ্গে উঠত, খেত, গল্প করত। এখন যেন সবাই আলাদা আলাদা জগতে বাস করছে।
একদিন সকালে ঘটল ছোট্ট একটি ঘটনা, যা ধীরে ধীরে বড় ঢেউ তুলল। রমিজ উদ্দিন বারান্দায় বসে পত্রিকা পড়ছিলেন। হঠাৎ বিদ্যুৎ চলে যাওয়ায় ঘরে অন্ধকার নেমে এল। রোদেলা মোবাইলের টর্চ জ্বালিয়ে পাশ দিয়ে যেতে যেতে বলল, “দাদু, আজকাল তো পত্রিকায় কিছুই থাকে না, সব খবর তো অনলাইনেই!” কথাটা বলার ভঙ্গিতে কোনো অবজ্ঞা না থাকলেও রমিজ উদ্দিনের কানে তা কেমন কটুকথার মতো শোনাল। তিনি পত্রিকাটা নামিয়ে বললেন, “সব কিছু কি ফোনেই হয় নাকি? বই, কাগজ—এসবের কদর বুঝবে কবে?”
রোদেলা একটু থমকে গেল। সে কিছু বলতে যাচ্ছিল, কিন্তু নীলা ইশারায় তাকে চুপ করাল। তবু রমিজ উদ্দিনের মনে একটা খচখচানি থেকে গেল—তিনি ভাবলেন, এখনকার ছেলেমেয়েরা বড়দের কথা শোনে না, সব জানে বলে মনে করে। অন্যদিকে রোদেলার মনেও একটা অস্বস্তি জমে উঠল; তার মনে হলো, সে তো কেবল কথার কথা বলেছিল, এতটা রাগ করার কী ছিল?
দিনের পর দিন এই ছোটখাটো ভুল বোঝাবুঝি জমতে লাগল। সায়েম রাতে দেরি করে ফিরলে রমিজ উদ্দিন বিরক্ত হতেন, নীলা রান্নায় নতুন কিছু করলে সালেহা বেগম একটু সন্দেহের চোখে তাকাতেন, আরিফ টেবিলে বসে ফোন ধরলে বাবা নীরবে মুখ ফিরিয়ে নিতেন। কেউই সরাসরি ঝগড়া করত না, কিন্তু ঘরের বাতাসে একটা চাপা অস্বস্তি ঘুরে বেড়াত।
এক সন্ধ্যায় হঠাৎ রমিজ উদ্দিন বুকে ব্যথা অনুভব করলেন। গুরুতর কিছু না হলেও সবাই ভয় পেয়ে গেল। হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলো, ডাক্তার বললেন বিশ্রাম আর মানসিক চাপ কমানো জরুরি। সেই রাতেই পরিবারের সবাই প্রথমবারের মতো একসঙ্গে বসে দীর্ঘক্ষণ কথা বলল। সালেহা বেগম চোখ মুছতে মুছতে বললেন, “এই বাড়িটা তো শুধু দেয়াল নয়, আমাদের জীবন। আমরা যদি একে অন্যকে না বুঝি, তবে কাকে বুঝব?”
নীলা প্রথম মুখ খুলল। সে বলল, “বাবা, আমরা হয়তো অনেক সময় আপনার অনুভূতিগুলো বুঝতে পারি না। কিন্তু সেটা অবহেলা নয়। কাজ, পড়াশোনা, প্রযুক্তি—সব মিলিয়ে আমাদের জীবন একটু আলাদা রকম। তবু আপনাদের অভিজ্ঞতা আমাদের জন্য অমূল্য।” আরিফ যোগ করল, “আমি হয়তো ক্লান্ত হয়ে চুপচাপ থাকি, কিন্তু আপনার কথা শুনতে চাই না—এমন নয়।”
রোদেলা লাজুক গলায় বলল, “দাদু, আমি যদি কখনো কিছু বলে আপনাকে কষ্ট দিই, সেটা ইচ্ছা করে নয়। আপনি গল্প করলে আমি শুনতে ভালোবাসি, শুধু বলতে পারি না সব সময়।”
রমিজ উদ্দিন চুপচাপ শুনছিলেন। তাঁর চোখে তখন জল চিকচিক করছিল। তিনি ধীরে বললেন, “আমরা বয়স্করা অনেক সময় ভাবি, আমাদের কথার দাম নেই। তাই ছোট কথাতেই কষ্ট পাই। তোমরা যদি একটু ধৈর্য ধরো, তাহলে আমরাও বুঝতে পারব সময় বদলেছে।”
সেই রাতের পর থেকে বাড়িটা যেন একটু বদলে গেল। সকালে রোদেলা দাদুর পাশে বসে খবর পড়তে লাগল, আর রমিজ উদ্দিন তাকে নিজের ছাত্রজীবনের গল্প শোনাতে শুরু করলেন। নীলা মাঝে মাঝে সালেহা বেগমের কাছে বসে পুরোনো রান্নার কৌশল শিখতে লাগল। আরিফ অফিস থেকে ফিরে বাবার সঙ্গে হাঁটতে বেরোত। ছোট ছোট এই মুহূর্তগুলো ধীরে ধীরে দূরত্বের দেয়াল ভাঙতে শুরু করল।
পুরোনো দোতলা বাড়িটা তখন আর শুধু স্মৃতির ভারে নুয়ে পড়া স্থাপনা ছিল না; সেটি হয়ে উঠল এক আবেগের আশ্রয়স্থল, যেখানে প্রবীণদের অভিজ্ঞতা আর নবীনদের উদ্দীপনা মিলেমিশে নতুন এক সংসারের রূপ নিল। তারা বুঝতে শিখল—পরিবার মানে নিখুঁত মানুষদের একসঙ্গে থাকা নয়, বরং অসম্পূর্ণ হৃদয়গুলোকে বোঝার চেষ্টা করা। সহনশীলতা আর স্বীকৃতির আলোয় সেই ঘর আরও উজ্জ্বল হয়ে উঠল, যেন প্রতিটি সন্ধ্যায় বারান্দায় বসে থাকা মানুষগুলো নতুন করে শিখছে—ভালোবাসা আসলে শেখারই আরেক নাম।
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now