বাংলা গল্প পড়ার অন্যতম ওয়েবসাইট - গল্প পড়ুন এবং গল্প বলুন
বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ

অন্ধকার পাড়ায় আলোর ডাক

"গ্রাম্য লোককথা" বিভাগে গল্পটি দিয়েছেন গল্পের ঝুরিয়ান মোহাম্মদ শাহজামান শুভ (০ পয়েন্ট)

X মোহাম্মদ শাহজামান শুভ। শহরতলির ছোট্ট মহল্লাটার নাম ছিল শান্তিপাড়া, যদিও নামের সঙ্গে তার বাসিন্দাদের মানসিক অস্থিরতার বেশ অমিল ছিল। প্রতিদিনই সেখানে কোনো না কোনো গুজব ছড়াত—কখনো কারও কোমর ব্যথা নিয়ে, কখনো কোনো গর্ভবতী নারীকে ঘিরে, কখনো আবার আচরণে অস্বাভাবিক কাউকে নিয়ে। সকালবেলা চায়ের দোকানে বসে বয়স্করা এসব নিয়ে আলোচনা করতেন, আর বিকেল হলেই পাড়া জুড়ে সেই কথাগুলো এমনভাবে ছড়িয়ে পড়ত যেন সেগুলোই শেষ সত্য। শান্তিপাড়ায় নতুন বদলি হয়ে এসেছেন ডাক্তার আরিফ রহমান। তিনি সরকারি হাসপাতালের মেডিকেল অফিসার, কিন্তু বিকেলবেলা ফ্রি সময়ে নিজের বাসার বারান্দায় বসে আশপাশের মানুষদের বিনা পয়সায় পরামর্শ দেন। প্রথম দিকে অনেকে লজ্জায় বা ভয়ে আসতে চাইত না। কেউ ভাবত, ডাক্তার মানেই বড় খরচ, আবার কেউ মনে করত, রোগব্যাধির আসল সমাধান তো পীর-ফকির বা ঝাড়ফুঁকেই আছে। তবু ধীরে ধীরে আরিফের নাম ছড়িয়ে পড়তে শুরু করল—তিনি ধৈর্য ধরে কথা বলেন, কাউকে তুচ্ছ করেন না, আর বোঝানোর চেষ্টা করেন। একদিন দুপুরের দিকে বৃদ্ধা রহিমা বেগম তার ছেলেকে নিয়ে এলেন। ছেলেটার কোমরে তীব্র ব্যথা। রহিমা বেগম দুশ্চিন্তায় কাঁপা গলায় বললেন, “ডাক্তার সাহেব, বুঝি আমার ছেলের কিডনি নষ্ট হয়ে গেছে। কোমর ব্যথা মানেই তো কিডনি!” আরিফ শান্তভাবে পরীক্ষা করে বললেন, “সব কোমর ব্যথা কিডনির জন্য হয় না, মা। কিডনির সমস্যায় প্রস্রাবের পরিমাণ কমে যেতে পারে, মুখ ফুলে যেতে পারে, বমি ভাব হয়, খাওয়ার রুচি কমে যায়। আপনার ছেলেরটা মনে হচ্ছে মাংসপেশির টান বা ডিস্কের সমস্যা।” রহিমা বেগম অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলেন। তার চোখে যেন প্রথমবারের মতো অন্য এক দরজা খুলল। এর কয়েকদিন পর পাশের বাড়ির রাশেদ চাচা এলেন। তিনি সারাদিন বারবার বাথরুমে যাচ্ছেন বলে ভয় পেয়ে গেছেন। পাড়ার লোকেরা বলে দিয়েছে, নিশ্চয়ই তার ডায়াবেটিস হয়েছে। আরিফ রক্ত পরীক্ষা করিয়ে দেখলেন, শর্করা মাত্রা স্বাভাবিক। তিনি বোঝালেন, “ডায়াবেটিস হলে শুধু ঘন ঘন প্রস্রাব নয়, অনেক সময় দুর্বল লাগে, ওজন কমে যায়, ক্ষুধা বেড়ে যায়, মুখে গন্ধ হতে পারে, ক্ষত শুকাতে দেরি হয়। আপনার ক্ষেত্রে অন্য কারণ থাকতে পারে।” রাশেদ চাচা যেন হাঁফ ছেড়ে বাঁচলেন, কিন্তু আরও অবাক হলেন—এতদিন যা শুনেছেন, সব যে ঠিক নয়! শান্তিপাড়ায় গুজবের রাজত্বটা সবচেয়ে বেশি ছিল গর্ভবতী নারীদের নিয়ে। শিলা নামে এক তরুণী প্রথম সন্তানের অপেক্ষায়। তার পা একটু ফুলে উঠেছে দেখে শাশুড়ি বারণ করে দিয়েছেন বেশি পানি খেতে। পাশের বাড়ির খালাও বলেছে, আয়রন-ক্যালসিয়াম খেলেই নাকি বাচ্চা অস্বাভাবিক বড় হয়ে যাবে, তাই ডাক্তাররা সিজার করানোর জন্যই এসব দেন। ভয়ে শিলা প্রায় সব ওষুধই বন্ধ করে দিয়েছিল। আরিফ জানতে পেরে তাকে ডেকে বললেন, “প্রোটিন কম খেলে আর কার্বোহাইড্রেট বেশি হলে শরীরে পানি জমতে পারে। পানি খাওয়া বন্ধ করা সমাধান নয়। আর আয়রন-ক্যালসিয়াম না খেলে বাচ্চার মারাত্মক সমস্যা হতে পারে, এমনকি স্নায়ুর গঠনেও ত্রুটি দেখা দিতে পারে।” শিলা ধীরে ধীরে মাথা নাড়ল। তার চোখে ভয় আর স্বস্তি একসঙ্গে খেলছিল। এক সন্ধ্যায় পাড়ার সবাই হৈচৈ করছে। এক তরুণের আচরণ হঠাৎ বদলে গেছে—কখনো চিৎকার করছে, কখনো ভাঙচুর। লোকজন বলাবলি শুরু করেছে, নিশ্চয়ই সে জ্বিনে ধরেছে। কেউ ঝাড়ফুঁকের ব্যবস্থা করতে ছুটছে। আরিফ খবর পেয়ে ছেলেটার বাড়িতে গেলেন। কিছুক্ষণ কথা বলে বুঝলেন, এটি মানসিক রোগের লক্ষণ হতে পারে। তিনি পরিবারের লোকজনকে বোঝালেন যে এমন অবস্থার পেছনে বাইপোলার ডিসঅর্ডার বা সিজোফ্রেনিয়ার মতো রোগ থাকতে পারে, যেগুলোর চিকিৎসা আছে। প্রথমে কেউ বিশ্বাস করতে চাইছিল না, কিন্তু আরিফের শান্ত কণ্ঠ আর যুক্তির কাছে ধীরে ধীরে তাদের ভয় নরম হয়ে এল। পাশের গলিতে এক নবজাতক জন্মেছে, যার ঠোঁট কাটা। কেউ কেউ ফিসফিস করে বলছে, এটা নাকি কোনো অশুভ লক্ষণ, কিয়ামতের আলামত। শিশুটির মা কান্নায় ভেঙে পড়েছেন। আরিফ সেখানে গিয়ে বললেন, “এটা জন্মগত সমস্যা, জিনগত কারণে হতে পারে। চিকিৎসায় অনেক ক্ষেত্রেই ঠিক করা যায়। কোনো অলৌকিক শাস্তি নয়।” কথাগুলো যেন মায়ের বুকের উপর থেকে ভারী পাথর নামিয়ে দিল। শহরের চায়ের দোকানটা ছিল গুজবের কেন্দ্র। একদিন সেখানে আরিফ নিজেই বসে পড়লেন। কেউ বলল দাঁত তুললে চোখ আর মাথা নষ্ট হয়ে যায়, কেউ বলল কিছু অভ্যাসে চোখের জ্যোতি কমে যায়, আবার কেউ দাবি করল টক বা ডিম খেলে ক্ষত শুকাতে দেরি হয়। আরিফ হাসিমুখে একের পর এক ভুল ভাঙাতে লাগলেন। বললেন দাঁতের স্নায়ু আলাদা, চোখের আলাদা; চোখ ভালো রাখতে পুষ্টিকর খাবার দরকার; আর ক্ষত সারতে প্রোটিনসমৃদ্ধ খাবারই উপকারী। দোকানে বসা লোকজন প্রথমে মজা করে শুনছিল, পরে ধীরে ধীরে গম্ভীর হয়ে গেল। তাদের চোখে যেন প্রশ্নের জন্ম নিল—তবে এতদিন যা জেনে এসেছি, তার কতটুকু সত্য? দিন গড়াতে শান্তিপাড়ার বাতাস বদলাতে শুরু করল। আগের মতো অন্ধ ভয় আর ফিসফিসানি কমে এল। কেউ অসুস্থ হলে আগে গুজব ছড়াত, এখন অনেকেই বলছে, “ডাক্তার আরিফকে দেখাও।” গর্ভবতী নারীরা আর লুকিয়ে ওষুধ ফেলছে না, বরং ঠিকমতো খাচ্ছে। মানসিক সমস্যায় ভোগা ছেলেটাকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। নবজাতক শিশুটির চিকিৎসার ব্যবস্থাও হয়েছে। এক সন্ধ্যায় আরিফ বারান্দায় বসে চা খাচ্ছিলেন। দূরে মসজিদের আজানের শব্দ ভেসে আসছে, আর পাড়ার শিশুরা খেলছে। তিনি মনে মনে ভাবলেন, সব গুজব একদিনে শেষ হবে না। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে জমে থাকা ভয় আর ভুল ধারণা সহজে ভাঙে না। কিন্তু যদি কথা বলা যায়, যদি মানুষকে সম্মান দিয়ে বোঝানো যায়, তবে অন্ধকারের মাঝেও আলো জ্বলে ওঠে। শান্তিপাড়া তখনো নিখুঁত হয়নি, তবু বদলের বীজ বপন হয়েছে। গুজবের ছায়ার নিচে ধীরে ধীরে জ্বলে উঠছিল আলোচনার প্রদীপ—যার আলোয় মানুষ শিখছে প্রশ্ন করতে, বুঝতে, আর ভয় নয়, জ্ঞানকে ভরসা করতে।


এডিট ডিলিট প্রিন্ট করুন  অভিযোগ করুন     

গল্পটি পড়েছেন ৬৬ জন


এ জাতীয় গল্প

গল্পটির রেটিং দিনঃ-

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now