বাংলা গল্প পড়ার অন্যতম ওয়েবসাইট - গল্প পড়ুন এবং গল্প বলুন
বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ

**শেকড়ের ভাষা**

"পৌরাণিক গল্প" বিভাগে গল্পটি দিয়েছেন গল্পের ঝুরিয়ান মোহাম্মদ শাহজামান শুভ (০ পয়েন্ট)

X মোহাম্মদ শাহজামান শুভ। গ্রামের শেষ প্রান্তে একটি প্রাচীন বটগাছ ছিল, যার ছায়া পেরিয়ে গেলে আর কোনো পাকা রাস্তা নেই—শুধু মাটির পথ, ধুলো আর স্মৃতি। সেই বটগাছটাকে সবাই ডাকত “নিশ্বাসী বট” নামে। কেউ জানত না নামটা কে দিয়েছে, কিন্তু সবাই বিশ্বাস করত—ও গাছের নিচে দাঁড়ালে বুকটা একটু হালকা হয়ে আসে, শ্বাসটা গভীর হয়। যেন গাছটা শুধু অক্সিজেনই দেয় না, মানুষের ক্লান্তিও শুষে নেয়। এই বটগাছের সঙ্গেই জড়িয়ে ছিল অনির্বাণের জীবন। শহর থেকে চাকরি ছেড়ে সে যখন গ্রামে ফিরে এল, তখন তার বয়স ত্রিশের কাছাকাছি। চোখে ছিল ক্লান্তি, মনে ছিল ব্যর্থতার ধুলো। কর্পোরেট অফিসের চকচকে দেয়ালের ভেতরে সে শিখেছিল সংখ্যার হিসাব, কিন্তু ভুলে গিয়েছিল নিঃশ্বাসের মূল্য। গ্রামে ফিরে প্রথম দিনই সে বটগাছের নিচে বসেছিল। মাথার ওপর ঘন পাতার ছাতা, চারদিকে পাখির ডাক, বাতাসে কাঁচা পাতার গন্ধ—সব মিলিয়ে তার মনে হয়েছিল, এই গাছটা যেন তাকে চেনে। শৈশবে অনির্বাণ এই গাছটার সঙ্গেই বড় হয়েছে। স্কুল থেকে ফিরে সে এখানে বসে বই পড়ত, আম কুড়োত, কখনো ঘুমিয়ে পড়ত। তার বাবা বলতেন, “দেখিস, গাছ মানুষের মতোই। যত দেয়, ততই বড় হয়।” তখন কথাটা সে বুঝত না। এখন, শহরের অভিজ্ঞতা নিয়ে ফিরে এসে, কথাটার মানে ধীরে ধীরে তার ভেতরে গেঁথে যাচ্ছিল। গ্রামটা আগের মতো নেই। অনেক গাছ কাটা পড়েছে, মাঠে মাঠে পাকা ঘর উঠেছে। নদীটা চিকন হয়ে এসেছে, বর্ষায় আর আগের মতো ফুলে ওঠে না। মানুষজন ব্যস্ত—কেউ বিদেশ যাবে, কেউ শহরে কাজ খুঁজবে। এই পরিবর্তনের ভিড়ে বটগাছটা দাঁড়িয়ে আছে নীরব প্রহরীর মতো, যেন সময়ের সঙ্গে লড়াই করছে। একদিন বিকেলে অনির্বাণ দেখল, কয়েকজন লোক গাছটার চারপাশে মাপজোক করছে। জানতে পারল, রাস্তা প্রশস্ত করার জন্য বটগাছটা কাটতে হবে। কথাটা শুনে তার বুকের ভেতর কিছু একটা ভেঙে গেল। এটা শুধু একটা গাছ নয়—এটা গ্রামের ফুসফুস, স্মৃতির আধার, জীবনের সাক্ষী। সে প্রতিবাদ করল। প্রথমে কেউ শুনল না। “একটা গাছের জন্য এত কথা?”—এই প্রশ্ন ছুড়ে দিল সবাই। তখন অনির্বাণ বুঝল, মানুষ কেবল তখনই কোনো কিছুর মূল্য বোঝে, যখন সেটা হারিয়ে যায়। সে সিদ্ধান্ত নিল, কথা দিয়ে নয়, কাজ দিয়ে বোঝাবে। পরদিন থেকেই সে গ্রামের স্কুলের শিশুদের নিয়ে গাছের নিচে বসতে শুরু করল। গল্প বলত—কীভাবে গাছ আমাদের শ্বাস বাঁচায়, কীভাবে মাটিকে আঁকড়ে ধরে বন্যা ঠেকায়, কীভাবে ফল-ফুল দিয়ে নিঃস্বার্থভাবে দেয়। সে বলত, “তোমরা যখন নিঃশ্বাস নাও, তখন এই গাছটা তোমাদের পাশে দাঁড়িয়ে থাকে।” শিশুরা অবাক চোখে শুনত, গাছের গায়ে হাত রাখত, যেন নতুন করে তাকে চিনছে। ধীরে ধীরে বড়রাও জড়ো হতে লাগল। কেউ বলল, “এই গাছের ছায়ায় আমার বিয়ে হয়েছিল।” কেউ বলল, “আমার বাবা অসুস্থ থাকাকালে এখানেই বসে থাকত।” স্মৃতিগুলো যেন পাতার ফাঁক দিয়ে ঝরে পড়ল। মানুষ বুঝতে শুরু করল—এই গাছ কেবল কাঠ নয়, এই গাছ জীবন। অনির্বাণ শুধু আবেগে থামেনি। সে দেখাল, গাছ কেটে ফেললে কীভাবে গরম বাড়বে, মাটি শুকিয়ে যাবে, বন্যার পানি দ্রুত গ্রামে ঢুকবে। কৃষকরা মাথা নেড়ে সম্মতি দিল। তারা জানত, গাছ না থাকলে জমি উর্বর থাকে না। ফলন কমে যায়। অর্থনীতি, জীবন—সবই গাছের সঙ্গে বাঁধা। কয়েক সপ্তাহের মধ্যে আন্দোলন গড়ে উঠল। স্থানীয় পত্রিকায় খবর বেরোল, প্রশাসন সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করল। শেষ পর্যন্ত রাস্তার নকশা বদলানো হলো, বটগাছটা রক্ষা পেল। সেদিন সন্ধ্যায় গ্রামের মানুষ গাছের নিচে জড়ো হয়েছিল। কেউ মিষ্টি এনেছে, কেউ প্রদীপ জ্বালিয়েছে। বটগাছের পাতা বাতাসে নড়ছিল, যেন সে নিজেও খুশি। সেই দিন থেকে অনির্বাণ গ্রামেই থেকে গেল। সে বৃক্ষরোপণ শুরু করল—স্কুল, রাস্তার ধারে, খালের পাড়ে। মানুষকে বোঝাল, গাছ লাগানো মানে শুধু ভবিষ্যতের জন্য নয়, বর্তমানের জন্যও। কারণ প্রতিটি গাছ আজই অক্সিজেন দেয়, আজই ছায়া দেয়, আজই মাটিকে শক্ত করে ধরে। বছর কয়েক পরে গ্রামটা বদলে গেল। সবুজ বেড়েছে, পাখি ফিরেছে, বাতাস ঠান্ডা। মানুষজনও বদলেছে। তারা বুঝেছে, সার্থক জীবন মানে শুধু নিজের জন্য বাঁচা নয়। যেমন গাছ ফল দেয় নিজের জন্য নয়, তেমনি মানুষও যখন অন্যের জন্য কিছু করে, তখনই পূর্ণ হয়। অনির্বাণ একদিন বটগাছের নিচে বসে ভাবছিল—এই গাছটা যেমন নিঃশব্দে সেবা করে, তেমনি মানুষ যদি একটু কম কথা বলে, একটু বেশি কাজ করে, তবে পৃথিবীটা হয়তো আবার শ্বাস নিতে পারবে। সে বুঝেছিল, জীবন আর বৃক্ষ আসলে আলাদা নয়। দুটোই শেকড়ে বাঁধা, দুটোই নিঃস্বার্থতায় বড় হয়। বটগাছের ছায়া লম্বা হয়ে আসছিল। দূরে সূর্য ডুবছিল, আকাশে লাল আভা। অনির্বাণ চোখ বন্ধ করে গভীর শ্বাস নিল। মনে হলো, গাছটা তার পাশে দাঁড়িয়ে আছে—নীরবে, অথচ সমস্ত শক্তি নিয়ে। ঠিক যেমন একটি সার্থক জীবন—চুপচাপ, কিন্তু পৃথিবীকে বাঁচিয়ে রাখে।


এডিট ডিলিট প্রিন্ট করুন  অভিযোগ করুন     

গল্পটি পড়েছেন ৭২ জন


এ জাতীয় গল্প

গল্পটির রেটিং দিনঃ-

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now