বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
মোহাম্মদ শাহজামান শুভ।
মহাকাশ মানেই রহস্য—এই কথাটা রহমান স্যার বহুবার বলেছেন। তিনি বলতেন, মানুষ যতটুকু জানে, তার চেয়ে বহু গুণ বেশি অজানা লুকিয়ে আছে মাথার ওপরের অন্ধকারে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জ্যোতির্বিজ্ঞান বিভাগের ছোট্ট কক্ষে বসে তিনি যখন কথা বলতেন, জানালার বাইরে আজানের ধ্বনি আর রিকশার ঘণ্টা মিশে এক অদ্ভুত পৃথিবী তৈরি করত। সেই পৃথিবীর ভেতর দাঁড়িয়েই তিনি ছাত্রীদের বোঝাতেন, কত অসীম এই ব্রহ্মাণ্ড।
সেদিন ক্লাসে ঢুকেই তিনি খবরটা বললেন। নতুন একটি গ্রহের সন্ধান পাওয়া গেছে। আকারে বৃহস্পতির সমান, কিন্তু গোল নয়। লেবুর মতো লম্বাটে। ছাত্রছাত্রীরা প্রথমে হাসল। লেবুর মতো গ্রহ—শুনতে গল্পের মতো। কিন্তু রহমান স্যারের চোখে হাসি ছিল না। সেখানে ছিল বিস্ময় আর অদ্ভুত এক শঙ্কা।
তিনি বললেন, গ্রহটা কোনো সাধারণ নক্ষত্রকে ঘিরে ঘোরে না। ঘোরে একটি পালসারের চারপাশে। মৃত নক্ষত্রের হাড়গোড়ের মতো শক্ত একটি বস্তু, যার অভিকর্ষ এত প্রবল যে পাশের গ্রহটাকে টেনে টেনে বিকৃত করে ফেলেছে। তাই গ্রহটা গোল নয়, লেবুর মতো। সেখানে দিন আর রাতের তাপমাত্রার পার্থক্য ভয়াবহ। সেখানে কার্বন আছে, কিন্তু অক্সিজেন নেই, নাইট্রোজেন নেই। যেন শ্বাস নেওয়ার সব পরিচিত উপাদান একে একে মুছে গেছে।
ক্লাসের শেষ বেঞ্চে বসে থাকা আরিফ চুপচাপ শুনছিল। সে বিজ্ঞান ভালোবাসে, কিন্তু বাস্তবতা তাকে সব সময় টেনে ধরে। তার বাবা একটি সরকারি অফিসে কেরানি। ছোটবেলা থেকে আরিফ দেখেছে, বাবার অফিসে নিয়ম আছে, কিন্তু ন্যায্যতা নেই। ফাইল আছে, কিন্তু গতি নেই। বাইরে থেকে দেখলে অফিসটা শক্তপোক্ত—ভেতরে ঢুকলে বোঝা যায়, কত ফাঁপা।
রহমান স্যারের কথায় হঠাৎ আরিফের মনে হলো, এই লেবুর মতো গ্রহটা যেন তার নিজের দেশের মতো। বাইরে থেকে বড়, ভারী, শক্তিশালী মনে হয়। ভেতরে ঢুকলে দেখা যায়—সবকিছু টেনে লম্বাটে করে দিয়েছে এক অদৃশ্য অভিকর্ষ। ক্ষমতার টান, স্বার্থের টান, ভয় দেখানোর টান।
ক্লাস শেষে আরিফ স্যারকে জিজ্ঞেস করল, এই গ্রহে কি কখনো প্রাণের সম্ভাবনা ছিল?
রহমান স্যার একটু চুপ করে বললেন, হয়তো ছিল। কিন্তু এমন পরিবেশে তা টিকতে পারেনি। যখন অক্সিজেন আর নাইট্রোজেন হারিয়ে যায়, তখন জীবন শুধু স্মৃতি হয়ে থাকে।
এই কথাটা আরিফের মাথায় ঘুরতে থাকল। সে বাসে করে আজিমপুরের বাসায় ফিরছিল। জানালার বাইরে পোস্টার, বিলবোর্ড, দেয়ালে লেখা স্লোগান। সবকিছুই যেন বড় বড় শব্দে ভরা, কিন্তু বাতাসে অক্সিজেন কম। মানুষ কথা বলে, কিন্তু শ্বাস নিতে কষ্ট হয়।
পরদিন বাবার অফিসে গিয়েছিল আরিফ। বাবার টেবিলে ফাইলের স্তূপ। প্রতিটি ফাইলে মানুষের গল্প। জমির কাগজ, পেনশনের আবেদন, চিকিৎসার টাকা। কিন্তু ফাইলগুলো যেন নড়তে চায় না। আরিফ লক্ষ করল, ফাইলগুলোও লেবুর মতো—একদিকে টানা, অন্যদিকে চেপে ধরা।
বাবা ফিসফিস করে বললেন, নিয়ম আছে, কিন্তু নিয়মের চেয়ে শক্ত কিছু আছে। সেই শক্তির নাম কেউ মুখে আনে না। ঠিক যেমন নিউট্রন স্টারের নাম শুনেই মানুষ ভয় পায়।
আরিফ সেদিন রাতে আকাশের দিকে তাকাল। ঢাকা শহরের আলোয় তারারা খুব স্পষ্ট নয়। তবু সে জানে, ওই অন্ধকারের ভেতরে কোথাও লেবুর মতো একটি গ্রহ ঘুরছে। মাত্র সাত ঘণ্টায় তার একটি বছর শেষ হয়। সময় সেখানে ছোট, কিন্তু চাপ অসীম।
সে ভাবল, যদি কোনো দিন এই গ্রহের মানুষ থাকত, তারা কেমন হতো? হয়তো তারাও দ্রুত বড় হয়ে যেত। কারণ সেখানে অপেক্ষা করার সময় নেই। সেখানে বাঁচতে হলে মানিয়ে নিতে হয়, লম্বা হতে হয়, বাঁকতে হয়।
কয়েক দিন পর সংবাদপত্রে আরেকটি খবর এল। দেশে আবার নতুন একটি প্রকল্পের উদ্বোধন। বড় বড় কথা, বড় বাজেট। আরিফ পড়তে পড়তে থমকে গেল। তার মনে হলো, আমরা কি সত্যিই গোল পৃথিবীতে বাস করছি, নাকি ধীরে ধীরে লেবুর মতো হয়ে যাচ্ছি? বাইরে চকচকে, ভেতরে টানাপোড়েন।
রহমান স্যার একদিন তাকে ডেকে বললেন, বিজ্ঞান শুধু দূরের গ্রহ বোঝার জন্য নয়। নিজের সমাজ বোঝার জন্যও। আমরা যখন কোনো গ্রহের বায়ুমণ্ডল বিশ্লেষণ করি, তখন আসলে নিজেদের শ্বাস-প্রশ্বাস নিয়েও প্রশ্ন করি।
আরিফ বুঝতে পারল, অক্সিজেন শুধু রাসায়নিক উপাদান নয়। অক্সিজেন মানে ন্যায্যতা, স্বচ্ছতা, কথা বলার সুযোগ। আর নাইট্রোজেন মানে ভারসাম্য। যখন এগুলো হারিয়ে যায়, তখন কার্বন ঘনীভূত হয়ে হিরা হয় ঠিকই, কিন্তু সেই হিরা খুব অল্প মানুষের হাতে যায়। বাকিরা পুড়ে যায় তাপে।
একদিন সে স্বপ্ন দেখল। সে ওই লেবুর মতো গ্রহে দাঁড়িয়ে আছে। চারদিকে কালো আকাশ, মাথার ওপর মৃত নক্ষত্র। বাতাস ভারী, নিঃশ্বাস নিতে কষ্ট। দূরে কিছু অবয়ব দাঁড়িয়ে আছে—দেখতে মানুষ, কিন্তু কাছে গেলে বোঝা যায়, তারা খড়ের মতো হালকা। ভেতরে কিছু নেই।
ঘুম ভেঙে গেলে আরিফ জানালার কাছে গিয়ে দাঁড়াল। ভোরের আলো ফুটছে। শহর জাগছে। সে ভাবল, এই পৃথিবী এখনো গোল। এখনো এখানে অক্সিজেন আছে। কিন্তু যদি আমরা সাবধান না হই, যদি সবকিছু টানাটানিতে রাখি, তাহলে একদিন হয়তো আমরাও লেবুর মতো হয়ে যাব।
রহমান স্যার বলতেন, মহাকাশ আমাদের ভবিষ্যতের আয়না। আরিফ বুঝল, সেই আয়নায় তাকিয়ে শুধু বিস্মিত হলেই চলবে না। আয়নাটা ভেঙে না যায়, সেটাও নিশ্চিত করতে হবে।
সে আবার আকাশের দিকে তাকাল। দূরে কোথাও একটি অদ্ভুত গ্রহ ঘুরছে, নিঃশব্দে। তার নীরবতা যেন সতর্কবার্তা। বলছে—সব গ্রহই গোল থাকে না। সব সমাজও না। কিছু কিছু জায়গায় অভিকর্ষ এত প্রবল হয়ে ওঠে যে, মানুষকেও লেবুর মতো বাঁকিয়ে দেয়। আর তখন প্রশ্ন থাকে একটাই—আমরা কি সেই টান ভাঙতে পারব, নাকি চুপচাপ ঘুরতেই থাকব সাত ঘণ্টার বছরে, নিঃশ্বাসহীন এক ভবিষ্যতের দিকে?
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now