বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
মোহাম্মদ শাহজামান শুভ।
গ্রামের নাম চন্দ্রপুর। নদীর ধারে ছোট্ট এক জনপদ, যেখানে সূর্য ওঠে ধানক্ষেতের বুক ছুঁয়ে আর সন্ধ্যা নামে পাখির ডানার শব্দে। এই গ্রামেই জন্ম নিয়েছিল মেঘলা। নামটা তার দাদির দেওয়া—বলতেন, মেয়েটার চোখে নাকি আকাশের মেঘ জমে থাকে। কিন্তু সেই আকাশটা যে একদিন অর্ধেক হয়ে যাবে, তা কেউ ভাবেনি। মেঘলা যখন স্কুলে যেতে শুরু করল, তখন থেকেই সে বুঝতে শিখল—ছেলে আর মেয়ের আকাশ এক নয়।
প্রথম শ্রেণিতে পড়ার সময় মেঘলার বইখাতা ছিল পরিষ্কার, হাতের লেখা সুন্দর। মাস্টারমশাই একদিন ক্লাসে বলেছিলেন, “এই মেয়েটা পড়াশোনায় খুব ভালো করবে।” সেই কথাটা মেঘলার বুকের ভেতর আলো জ্বেলে দিয়েছিল। সে স্বপ্ন দেখতে শুরু করল—একদিন বড় হবে, অনেক পড়বে, হয়তো শিক্ষক হবে, কিংবা ডাক্তার। কিন্তু বাড়ি ফিরে সেই স্বপ্নগুলো ধীরে ধীরে কুঁকড়ে যেত। তার ভাই রুবেল স্কুল থেকে ফিরে মাঠে খেলতে যেত, আর মেঘলাকে যেতে হতো রান্নাঘরে, মায়ের পাশে বসে সবজি কাটতে বা বাসন মাজতে। বাবা বলতেন, “মেয়ে মানুষ, এসব শিখে রাখ। পড়াশোনা দিয়ে কী হবে?”
মেঘলা তখন বুঝত না কেন পড়াশোনা ছেলেদের জন্য দরকার, আর মেয়েদের জন্য নয়। সে শুধু অনুভব করত, তার সময়টা কম, তার শ্বাসটা ছোট। বই খুলে বসলে মা বলতেন, “এত পড়ে কী হবে? কাল তো আবার রান্না শিখতে হবে।” তবু সে পড়ত। রাতের বেলা কুপির আলোয়, সবাই ঘুমিয়ে পড়লে, সে চুপিচুপি খাতা খুলত। শব্দ না করে পাতা উল্টানোর মধ্যেই তার বিদ্রোহ লুকিয়ে থাকত।
ক্লাস ফাইভ পাস করার পরই বাড়িতে অন্য কথা শুরু হলো। পাশের গ্রামের এক ছেলের প্রস্তাব এসেছে। মা খুশি, খালা খুশি, বাবা নিশ্চিন্ত। মেঘলার বুকের ভেতর তখন ঝড়। সে কাঁদেনি, চিৎকার করেনি। শুধু একদিন সাহস করে বাবাকে বলেছিল, “আমি পড়তে চাই।” বাবা তাকিয়ে ছিলেন অনেকক্ষণ। তারপর ধীরে বলেছিলেন, “মেয়েদের বেশি পড়াশোনা ভালো না।” সেই বাক্যটা যেন দরজার মতো বন্ধ হয়ে গিয়েছিল তার সামনে।
কিন্তু চন্দ্রপুরে সবাই একরকম ছিল না। মেঘলার স্কুলের নতুন শিক্ষিকা অনন্যা ম্যাডাম ছিলেন শহর থেকে আসা। তাঁর কথা বলার ধরন আলাদা, চোখে ছিল দৃঢ়তা। তিনি মেয়েদের আলাদা করে বসতে দিতেন না, ছেলেমেয়েকে একই প্রশ্ন করতেন। একদিন তিনি খেয়াল করলেন, মেঘলা কয়েকদিন স্কুলে আসছে না। খোঁজ নিয়ে জানতে পারলেন বিয়ের কথা। সেই দিন বিকেলে তিনি মেঘলার বাড়িতে গেলেন।
ঘরের ভেতর একটা অস্বস্তিকর নীরবতা ছিল। অনন্যা ম্যাডাম শান্ত গলায় বললেন, “মেয়েটা খুব মেধাবী। পড়াশোনা করলে অনেক দূর যাবে।” বাবা বললেন, “মেয়ে মানুষ বেশি দূর গিয়ে কী করবে?” অনন্যা ম্যাডাম একটু হাসলেন। বললেন, “দূর যাওয়া মানে শুধু শহর না, নিজের পায়ে দাঁড়ানো।” সেই কথাটা মেঘলার মনে গেঁথে গেল। নিজের পায়ে দাঁড়ানো—এই প্রথম কেউ তাকে সেই ভাষায় ভাবতে শিখিয়েছিল।
অনেক কথা, অনেক তর্কের পর সিদ্ধান্ত বদলাল না সহজে। কিন্তু অনন্যা ম্যাডাম থামলেন না। তিনি স্কুল কমিটির সঙ্গে কথা বললেন, গ্রামের মুরুব্বিদের বোঝালেন। বললেন, মেয়েরা পড়লে পরিবারই উপকৃত হয়। ধীরে ধীরে একটা ফাটল ধরল পুরনো দেয়ালে। শেষ পর্যন্ত শর্তসাপেক্ষে বিয়ে পিছিয়ে গেল। মেঘলা আবার স্কুলে ফিরল, কিন্তু সে জানত, এই সুযোগটা সাময়িক।
সময় গেল। মেঘলা এসএসসি পাস করল ভালো ফল নিয়ে। কলেজে ভর্তি হলো। শহরে গিয়ে পড়ার স্বপ্ন এখনো অধরা, কিন্তু গ্রামের কলেজেই সে নিজের মতো করে লড়াই চালিয়ে যাচ্ছিল। পথে পথে কটূক্তি, “মেয়ে হয়ে এত পড়াশোনা?”—এই প্রশ্ন তার সঙ্গী হয়ে গেল। তবু সে থামেনি। কারণ সে দেখেছিল, অল্প অল্প করে বদল আসছে। তার ছোট বোন স্কুলে যেতে পারছে, মায়ের চোখে গর্ব জমছে, বাবা আর আগের মতো কঠিন নন।
কলেজ শেষ করে মেঘলা একদিন চাকরি পেল। গ্রামেরই এক প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা। প্রথম বেতন হাতে পেয়ে সে মাকে নতুন শাড়ি কিনে দিল। বাবার চোখে সেই দিন জল ছিল। হয়তো তিনি বুঝতে শুরু করেছিলেন, মেয়ের পড়াশোনা শুধু স্বপ্ন নয়, বাস্তব শক্তি। মেঘলা তখন গ্রামের মেয়েদের আলাদা করে পড়াতে শুরু করল। বিকেলের পর তার উঠোনে জড়ো হতো ছোট ছোট মুখ। তাদের চোখে সে নিজের শৈশব দেখতে পেত।
একদিন সেই উঠোনেই দাঁড়িয়ে মেঘলা বলেছিল, “তোমরা কেউ কম নও।” কথাটা সহজ, কিন্তু তার পেছনে ছিল দীর্ঘ লড়াই। গ্রামের মেয়েরা ধীরে ধীরে বদলাতে শুরু করল। কেউ কলেজে গেল, কেউ সেলাই শিখে নিজের আয় শুরু করল। ছেলেদের চোখেও বদল এলো। তারা বুঝতে শিখল, সমতা মানে কারও ক্ষতি নয়, বরং সবার লাভ।
চন্দ্রপুর আগের মতোই আছে—নদী, ধানক্ষেত, সূর্যাস্ত। কিন্তু আকাশটা আর অর্ধেক নয়। মেঘলা জানে, লিঙ্গ বৈষম্য এক দিনে শেষ হয় না। তবু সে বিশ্বাস করে, প্রতিটি শিক্ষিত মেয়ে, প্রতিটি বদলে যাওয়া পরিবার একেকটা আলো। সেই আলো জ্বলে জ্বলে একদিন পুরো আকাশ ভরিয়ে দেবে। আর তখন আর কোনো মেয়ের স্বপ্ন কুপির আলোয় লুকিয়ে পড়তে হবে না।
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now